তোমাকে ঘিরে আমার অনুভূতি ২ পর্ব-২৬+২৭

0
2488

#তোমাকে_ঘিরে_আমার_অনুভূতি💖 (সিজন-২)
#পর্ব_২৬
#Anika_Fahmida

গাড়ি অনুর বাসার সামনে পৌঁছে যায়। আদ্র অনুকে সাথে করে নিয়ে অনুর বাসায় কলিংবেল চাপ দিলো। আরমান রহমান দরজা খুলল। আরমান রহমান অনুকে আদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠলো। অনু আরমান রহমানকে হাসিমুখে বলল,

‘আব্বু আমি ফিরে এসেছি। আর আম্মু কোথায়?’

আরমান রহমান গম্ভীর স্বরে বলল,

‘তোমরা ভিতরে আসো।’

অনু মনে মনে ভয় পেল। আব্বু এতো গম্ভীর হয়ে কথা বলছে কেন? অনু বুঝতে পারলো না। আদ্র অনুর হাত চেপে ধরেই ড্রইংরুমে প্রবেশ করলো। আরমান রহমান আদ্রের দিকে তাকিয়ে রাগী স্বরে বলল,

‘কেন তুমি এমন করলে বাবা আদ্র?’

আদ্র শান্ত স্বরে আরমান রহমানকে বলল,

‘আংকেল আমি আপনাকে সবটা বুঝিয়ে বলছি৷ আপনি আগে প্লিজ শান্ত হোন।’

আরমান রহমান ধমক দিয়ে আদ্রকে বলল,

‘তুমি আমাকে শান্ত হতে বলছো? তামাশা করছো? আমার মেয়েকে তুমি আমাদের কাছ থেকে এতোদিন কোথায় দূরে সরিয়ে রেখেছিলে?আবার বলছো চুপ থাকতে? আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করে অনুকে তোমার সাথে যেতে দিয়েছিলাম। আর তুমি আমার বিশ্বাসের এই মূল্য দিলে আদ্র? আমার বন্ধুর ছেলে এতো খারাপ হবে আমি ভাবতেও পারি নি। ছিহ্!’

অনু আরমান রহমানের কথা শুনে অবাক হলো। আরমান রহমানকে অনু জিজ্ঞেস করলো,

‘আব্বু তোমাকে আর আম্মুকে আদ্র বলে নি যে আমাকে আদ্র জোর করে সুইজারল্যান্ড নিয়ে গিয়েছিল?’

আরমান রহমান অনুকে হতাশ গলায় বলল,

‘নারে মা আদ্র আমাদের কিছুই বলে নি। এই কয়েকদিন আমরা তোর জন্য অনেক চিন্তা করেছি। আমাদের মেয়েটাকে আদ্র কোথায় নিয়ে গেলো এই চিন্তায় আমি আর তোর আম্মু পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আদ্রের বাবা আনোয়ারকে জিজ্ঞেস করেও আমি তোর কোনো খবর এতোদিন পাই নি।’

অনু মনে মনে আদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘তারমানে আদ্র আব্বু আর আম্মুকে কিছুই বলে নি! আমাকে আদ্র মিথ্যা কথা বলেছিল। আব্বু-আম্মু তাহলে এতোদিন আমার জন্য অনেক চিন্তা করছিল।’

আদ্র অনুর দিকে তাকিয়ে দেখল অনু ঘৃণার দৃষ্টিতে আদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। আদ্রের মনে ভয় হতে লাগলো অনু আবার ভুল বুঝবে নাতো? আদ্র আরমান রহমানকে শান্ত স্বরে বলল,

‘আংকেল আমি অনুকে সুইজারল্যান্ড নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। এছাড়া আমার কাছে অন্য কোনো উপায় ছিল না। আপনাকে আমি সবটা বলতাম কিন্তু তেমন সময় আমি পাই নি। ভেবেছিলাম অনুকে নিয়ে দেশে ফিরে এসে সবটা আমি আপনাদের খুলে বলবো। আমাকে আপনি ভুল বুঝবেন না।’

আরমান রহমান আদ্রকে কড়া গলায় বলল,

‘সমাজে আমার মান সম্মান তুমি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছো আদ্র। আমার মেয়েকে তুমি জোর করে বিদেশ নিয়ে গিয়েছো তা আশেপাশের সব মানুষ এখন জেনে গিয়েছে। সবাই এখন ছি ছি করছে। তোমার কি এইটুকু বুঝার উচিত ছিল না যে এতে আমাদের কতোটা মান সম্মানহানি হতে পারে?’

আদ্র আরমান রহমানকে শান্ত স্বরে বলল,

‘আমি আজই অনুকে বিয়ে করবো আংকেল। তাহলে তো আর সমাজের মানুষ আপনাদের কিছু বলবে না। আপনাদের মান সম্মানহানিও হবে না।’

আমেনা বেগম রুমের ভিতর থেকে এতক্ষণ সব শুনছিল। তিনি ড্রইংরুমে এসে আদ্রকে বলল,

‘তুমি আমার মেয়েকে জোর করে সুইজারল্যান্ড নিয়ে গিয়ে আমার মেয়ের মান সম্মান ডুবিয়েছো। তোমার সাথে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দিবো না। অনুর বাবা রাজি হলেও আমি কিছুতেই আমার মেয়ের বিয়ে তোমার মতো ছেলের সাথে হতে দিবো না।’

আদ্র আমেনা বেগমকে হতাশ গলায় বলল,

‘আন্টি আপনিও আমাকে ভুল বুঝছেন? আন্টি আমি যদি অনুকে জোর করে সুইজারল্যান্ড নিয়ে না যেতাম তাহলে অনু আমাকে কোনোদিনই বুঝতো না। সারাজীবন অনু আমাকে ভুল বুঝতো।’

আমেনা বেগম গম্ভীর স্বরে আদ্রকে বলল,

‘এখানে ভুল বোঝার কিছু নেই। তুমি মিথ্যা কথা বলে আমাদের কাছ থেকে অনুকে নিয়ে গিয়েছো। তোমার কাছে আমি এবং অনুর বাবা এমন আচরণ আশা করি নি। তুমি এখনই বাসা থেকে বেরিয়ে যাও।’

আদ্র মন খারাপ করে এবার অনুর দিকে তাকাল। অনু আদ্রের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আমেনা বেগম এবং আরমান রহমানকে জোর গলায় বলল,

‘আম্মু-আব্বু তোমরা ঠিক বলেছো। আদ্র আমাকে জোর করে সুইজারল্যান্ড নিয়ে গিয়েছিল। এই আদ্রের জন্য তোমাদের কাছ থেকে আমাকে এতোদিন দূরে থাকতে হয়েছে। আবার আদ্র আমার ব্যাপারে তোমাদের কিছুই জানায় নি। আমাকেও আদ্র মিথ্যা বলেছে যে তোমাদের নাকি সবটা জানিয়েছে। আদ্রের জন্য আমার পড়াশোনারও প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। আমি তো এখন এই আদ্রকে এখানে আর এক মুহুর্তের জন্যও সহ্য করতে পারছি না। অসহ্য লাগছে আমার।’

আদ্র অবাক হয়ে অনুকে বলল,

‘অনু তুমি আমার সাথে এমন আচরণ কেন করছো?’

অনু আদ্রকে গম্ভীর স্বরে বলল,

‘কেমন আচরণ করছি? যা ঠিক তাই তো বলছি। তুমি আমার উপর প্রচুর অত্যাচার করেছো। আবার আমাকে তুমি মিথ্যা কথাও বলেছো। তুমি আম্মু আব্বুকে আমার সুইজারল্যান্ডে জোর করে নিয়ে আসার ব্যাপারটাও জানাও নি। তোমার জন্য আমার আম্মু- আব্বু এতোদিন এতো চিন্তার মধ্যে ছিল। তোমাকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। বাসা থেকে বের হও তুমি আদ্র।’

অনু নিজের রুমে চলে যেতে নিলে আদ্র অনুর দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বলল,

‘অনু তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। এই সামান্য কারণে এমন করে প্লিজ বদলে যেও না?

অনু ফিরে তাকিয়ে আদ্রকে বলল,

‘আমি মিথ্যাবাদীদের ঘৃণা করি।’

অনু নিজের রুমে চলে গেল। আদ্র অনুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। অনুর এমন ব্যবহারের আদ্র ভীষণ কষ্ট পেল। আরমান রহমান শক্ত গলায় আদ্রকে বলল,

‘অনু কি বলেছে শুনতে পাও নি? এই মুহুর্তে বাসা থেকে তুমি বেরিয়ে যাও।’

আদ্র জোর করে হেসে আরমান রহমানকে বলল,

‘যাচ্ছি আংকেল। এখনই চলে যাচ্ছি।’

আদ্র অনুর বাসা থেকে বের হয়ে হতাশ মনে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভিতরের কষ্ট গুলো যেন আদ্রকে আরও চেপে ধরলো। অনুর মা-বাবা আদ্রের সাথে খারাপ আচরণ করেছে তা মানা যায়। কিন্তু অনুও আদ্রের সাথে এমন আচরণ করতে পারলো? আদ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

‘কেন আমার সাথে তুমি এমন করলে অনু? এই সামান্য কারণে এভাবে আমাকে ভুল বুঝলে? সবকিছুই কি তাহলে তোমার নাটক ছিল? তারমানে কি তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না? ওহ্ হ্যা তুমি তো আমাকে বলোনি যে তুমি আমাকে ভালোবাসো। আমিই মনে মনে ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে বিদেশ নিয়ে গিয়ে একান্তে নিজের ভালোবাসার কথা বলবো। তুমি আমাকে মানতে না চাইলে জোর করে মানাবো। কিন্তু তুমি এভাবে আমাকে ভুল বুঝলে কেন? নাকি সব তোমার অভিনয় ছিল। তুমি আমার অনুভূতি নিয়ে খেলতে পারো আমি মানতে পারছি না অনু।’

আদ্র টের পেল তার দু’চোখ খুব জ্বলছে। হয়তো এখনই আদ্রের চোখে জল চলে আসবে। কিন্তু নিজেকে আদ্র সামলে নিলো। গাড়িতে উঠে বসে বাইরে তাকিয়ে রইল আদ্র। অনুর কথাই আদ্র ভাবতে লাগল।

অনু রুমের দরজা লাগিয়ে মাটিতে বসে আছে। নিজের মাথায় হাত রেখে অনু মনে মনে বলল,

‘আমি কি এটা ঠিক করলাম? হ্যা আমি ঠিকই তো করেছি। আমি তো কখনো আদ্রকে বলিনি যে আমি আদ্রকে ভালোবাসি৷ তাছাড়া আদ্র আমাকে মিথ্যা কথা বলেছিল। আদ্র আমাকে বলেছিল আমার আম্মু আব্বুকে জানিয়েছে আমি ওর সাথে সুইজারল্যান্ড আছি কিন্তু আদ্র তা জানাই নি। আদ্র খুব মিথ্যাবাদী।’

হাত পা গুটিয়ে অনু মাটিতে বসে আছে। কেন যেন অনুর বুকের ভিতরটা ব্যথায় মোচড় দিচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন? শ্বাস নিতেও যেন ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। অনুর মা দরজার কাছে এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে বলল,

‘অনু ফ্রেশ হয়ে খেতে আয়। কতদিন পর আমার মেয়েটা আজ বাড়ি ফিরলো। আয় মা তাড়াতাড়ি আয়।’

অনু চোখের জল মুছে আমেনা বেগমকে বলল,

‘হ্যা আম্মু আমি আসছি। একটু অপেক্ষা করো।’

আদ্র হতাশ মনে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। বেশ অনেকক্ষণ পর ড্রাইভার আদ্রকে বলে উঠল,

‘স্যার আপনার বাসার সামনে এসে পড়েছি।’

ড্রাইভারের কথা শুনে আদ্রের ধ্যান ফিরলো। গাড়ি থেকে নেমে বাসায় পৌঁছাতেই আনোয়ার হোসেনকে দেখল মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি যেন আদ্রের জন্যই অপেক্ষা করছিল। আদ্র আনোয়ার হোসেনকে কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে চলে যেতে নেওয়ার আগেই আনোয়ার হোসেন আদ্রকে বলল,

‘দাঁড়াও আদ্র। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।’

আদ্র আনোয়ার হোসেনকে গম্ভীর স্বরে বলল,

‘তোমার কথা পড়ে শুনবো বাবা। আমাকে এখন একটু একা থাকতে দাও প্লিজ।’

আনোয়ার হোসেন আদ্রকে শান্ত স্বরে বলল,

‘কথাটা ভীষণ জরুরি। এই কথা বলার জন্যই তোমাকে দেশে ফেরার জন্য এত অনুরোধ করেছিলাম।’

আদ্র চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে আনোয়ার হোসেনকে বলল,

‘কি কথা বলো বাবা?’

আনোয়ার হোসেন একটু ঘাবড়ে গেল। কথাটা যে কিভাবে আদ্রকে বলবে তিনি ভেবে পাচ্ছেন না। তবুও সাহস করে আনোয়ার হোসেন আদ্রকে বলল,

‘তুমি অনুকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড গেছো জেনেও আমি আরমানকে এই ব্যাপারে কিছু বলি নি। কারণ তুমি বলতে নিষেধ করেছিলে তাই। আমি তোমার কথা রেখেছি। এবার আমার কথা তোমার রাখতে হবে। আমি তোমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি আদ্র। সামনে মাসের এক তারিখ সুমির সাথে তোমার বিয়ে।’

আদ্র চমকে উঠে আনোয়ার হোসেনকে বলল,

‘হুয়াট?এসব তুমি কি বলছো বাবা? পাগল হয়ে গেছো তুমি?এসব বলার জন্য তুমি আমাকে দেশে ফিরে আসতে বলেছিলে? বাবা তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি অনুকে ভালোবাসি। সুমিকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না।’

আনোয়ার হোসেন কিছু বলার আগেই আদ্রের মা রেহেনা পারভিন এসে আদ্রকে বলল,

‘কেন সম্ভব নয় আদ্র? সুমি মেয়েটা খুব ভালো। সুমি শিক্ষিত, স্মার্ট, সুন্দরী। তাছাড়া আমাদের ফ্যামিলির সাথে সুমির ফ্যামিলি একদম উপযুক্ত। আমার তো সুমিকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। অনুকে তুই ভুলে যা আদ্র। ঐ মেয়েকে আমার একটুও পছন্দ নয়। যে মেয়ে সবার সামনে আমার ছেলেকে অপমান করেছে সেই মেয়ের সাথে আমি আমার ছেলের বিয়ে কিছুতেই হতে দিবো না। তুই তোর মায়ের কথা রাখবি না আদ্র?’

আদ্র হতাশ গলায় রেহেনা পারভিনকে বলল,

‘আমাকে তুমি ক্ষমা করো মা। আমি তোমার আর বাবার কথা রাখতে পারলাম না। অনুকে ছাড়া আর কাউকে আমি বিয়ে করতে পারবো না। কাউকে না।’

আনোয়ার হোসেন চিৎকার করে বলল,

‘আমার কথাও শুনছো না। তোমার মায়ের কথাও শুনছো না। এটা কেমন ধরনের বেয়াদবি আদ্র? নিজের মা-বাবার কথা শুনতে হয়। আমরা তোমাকে এমন বেয়াদবি করার জন্য বিদেশে পড়াশোনা করিয়েছি? তুমি তোমার মা-বাবার কথা এভাবে অমান্য করতে পারছো কি করে?’

আদ্র হেসে আনোয়ার হোসেনকে বলল,

‘হ্যা বাবা আমি বেয়াদব। তোমার ছেলে বেয়াদব হয়ে গেছে। আমি কি করবো বলো তো বাবা? আমার মন যদি আমি অনুকে দিয়ে ফেলি সেই মন আবার অন্য কাউকে কি করে দেই তুমিই বলো?’

আনোয়ার হোসেন গম্ভীর স্বরে আদ্রকে বলল,

‘এসব পাগলামি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।’

আদ্র রক্তলাল চোখে আনোয়ার হোসেনকে বলল,

‘অসম্ভব বাবা। এই পাগলামি ছেড়ে দেওয়ার নয়।’

আদ্র সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের রুমে চলে গেল। রেহেনা পারভিন আনোয়ার হোসেনকে হতাশ হয়ে বলল,

‘আমাদের ছেলেটাকে ঐ অনু পাগল বানিয়ে দিয়েছে। সুমিকে তো আদ্র কিছুতেই বিয়ে করতে চাইছে না। কি করবে এখন বলো?’

আনোয়ার হোসেন রেহেনা পারভিনকে বলল,

‘যেভাবেই হোক রাজি করাতে হবে। নাহলে জোর করে রাজি করাতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে আদ্রের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। এটা তো কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। আমার একমাত্র ছেলেকে এভাবে ধ্বংসের মুখে আমি ফেলে দিতে পারি না।’

রেহেনা পারভিন আনোয়ার হোসেনকে বলল,

‘হ্যা তাই করো। আমার ছেলেকে বাঁচাও।’

আদ্র নিজের রুমে গিয়েই চুপ করে বিছানায় বসে পড়ল। অনু তাহলে এতোদিন অভিনয় করলো? নেহাতই অনুর মা-বাবা সামনে ছিল। নাহলে ঐসময় যে আদ্র অনুকে কি করতো তা আদ্র নিজেই জানে না। ঘন নিশ্বাস ফেলে আদ্র রেগে মনে মনে বলল,

‘সামান্য কারণে আমার সাথে এমন আচরণ অনুর করার কথা নয়। আমাকে জানতে হবে অনু কি আমাকে ভালোবাসে নাকি সবকিছু অনুর অভিনয় ছিল? যদি তুমি আমার সাথে সত্যি অভিনয় করে থাকো অনু তাহলে আমার কাছ থেকে তুমি বেশিদিন পালিয়ে বেড়াতে পারবে না। আমার সাথে অভিনয় করার শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।’

#চলবে…

#তোমাকে_ঘিরে_আমার_অনুভূতি💖 (সিজন-২)
#পর্ব_২৭
#Anika_Fahmida

অনু ডাইনিং টেবিলে তার মা-বাবার সাথে খাবার খাচ্ছিল। কিন্তু কেন যেন অনুর গলায় খাবার নামছে না৷ কোনোরকম জোর করে খাবার খাচ্ছে অনু। আরমান রহমান এবং আমেনা বেগম ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছেন। আরমান রহমান গম্ভীর স্বরে অনুকে বলল,

‘অনু আমাদের তুই ক্ষমা করে দিস মা। আমরা না জেনে শুনে আদ্রের জন্য তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। আদ্র এমন পঁচা ছেলে আমরা জানতাম না। তুই কি এখনও আমার আর তোর মায়ের উপর রেগে আছিস?’

অনু শান্ত স্বরে আরমান রহমানকে বলল,

‘না আব্বু। আমি তোমার আর আম্মুর উপর রেগে নেই।’

অনুর কথা শুনে আরমান রহমান খুশি হলেন। আমেনা বেগম গম্ভীর স্বরে অনুকে বলল,

‘আমাদের কাছ থেকে আদ্র তোকে কতদিন দূরে সরিয়ে রেখেছিল। তোকে কি আদ্র খুব অত্যাচার করেছে অনু?’

অনু খাবার খেতে খেতেই আমেনা বেগমকে বলল,

‘আম্মু আদ্র আমার উপর কোনো অত্যাচার করে নি। শুধু আমাকে এভাবে জোর করে বিদেশে তুলে নিয়ে যাওয়াটা আমার খারাপ লেগেছিল। আর কিছু না।’

তারপর অনু হতাশ হয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। আমেনা বেগম অনুর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,

‘থাক মা মন খারাপ করিস না।’

অনু আমেনা বেগমের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। সারাটা দিন অনুর তিক্ততায় কাটলো। কোনোকিছুই ভালো লাগছে না৷ নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। হয়তো আদ্রের সাথে অনু একটু বেশিই খারাপ আচরণ করে ফেলেছে। নিজের মোবাইল ফোনটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল অনু। কিন্তু আদ্র এখনও অনুকে একটিবারও ফোন দিলো না৷ হয়তো খুব অভিমান করেছে। রাগ উঠলে অনুর মাথা ঠিক থাকে না। অনু হতাশ হয়ে মনে মনে বলল,

‘আদ্র কি আমাকে ভুল বুঝলো? ঐসময় আদ্রের উপর খুব রাগ উঠেছিল। আমি ইচ্ছে করে আদ্রের সাথে ওমন ব্যবহার করতে চাইনি। কেন যে এতো রেগে যাই! আচ্ছা আমি কি এখন একটা ফোন দিবো? না থাক৷ আদ্রের রাগ কমুক তারপর নাহয় আমি ফোন দিবো।’

আদ্র মন খারাপ করে বিছানায় শুয়ে আছে। রাতের খাবার খাওয়ারও বিন্দু মাত্র আদ্রের ইচ্ছে নেই। আনোয়ার হোসেন আর রেহেনা পারভিন আদ্রকে খাবার খাওয়ার জন্য অনেক জোর করেছিল কিন্তু আদ্র তাদের না বলে দিয়েছে। অনুর কথাগুলো আদ্রের মনকে ক্ষতবিক্ষত করার জন্য যথেষ্ট। এখনও আদ্র ভেবে পাচ্ছে না অনু এমন কেন করলো? কই যখন আদ্র অনুকে কাছে টেনে আদর করলো তখন তো অনু বাঁধা দেয় নি! তাহলে অনু কি রেগে এমন করলো নাকি আসলেই সব অভিনয় ছিলো? আদ্রের চোখে ঘুম আসছে না। অনুকে একটা মেসেজ সেন্ড করতে গিয়েও থেমে গেল আদ্র। একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় মন খারাপ করে বসে সারা রাত্রী আদ্র পাড় করে দিল।

অনু পরেরদিন সকালেই ভার্সিটিতে গেল। ভার্সিটির গেটের সামনে আসতেই অনু সামনে পল্লবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। অনু কিছুটা অবাক হয়ে পল্লবের দিকে তাকাল। পল্লব অনুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

‘হাই অনু, কেমন আছো? অনেকদিন হয়ে গেল তোমার সাথে আমার দেখা হয় না।’

পল্লবকে দেখেই অনুর রাগ হলো। এই ছেলে আবার এখানে কেন? এতো অপমান করেও শান্তি হয় নি? অনু ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে পল্লবকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই পল্লব অনুর হাত চেপে ধরলো। অনু রেগে পল্লবের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,

‘আবারও আপনি আমার হাত চেপে ধরেছেন কেন? সমস্যা কি আপনার? আমার হাত ছাড়ুন।’

পল্লব শান্ত স্বরে অনুকে বলল,

‘তুমি কি জানো অনু? আমি শুধু তোমার জন্য প্রতিদিন এই ভার্সিটিতে আসি। কিন্তু এই কয়েকদিন তোমাকে খুঁজেও আমি পাই নি। তুমি কোথায় ছিলে এতোদিন? আমি আগে ভার্সিটিতে মাঝে মাঝে ঘুরে যেতাম। কিন্তু যখন থেকে তোমার সাথে আমার দেখা হয় তখন থেকেই আমার মনটা তুমি কেড়ে নিয়েছো।’

অনু ভুরু কুঁচকে পল্লবকে বলল,

‘আপনি কি আবারও আমাকে অপমান করার জন্য এমন নাটক করছেন? দেখুন আপনি ঐদিন আমাকে অনেক অপমান করেছেন। আর এমন করবেন না। এই ভার্সিটি থেকে আমাকে বের করে দিবেন না৷ আমি একটু শান্তিতে পড়াশোনা করতে চাই। কোনো ঝামেলা আমার ভালো লাগে না।’

পল্লব হেসে অনুকে বলল,

‘ঝামেলা বলছো কেন? আমি কি বলেছি তুমি শুনতে পাও নি? তুমি আমার মন কেড়ে নিয়েছো। তোমাকে ঘিরে আমার অনুভূতি কি করে যাবে বলো তো অনু? এই অনুভূতি তো যাওয়ার নয়।’

অনু দাঁতে দাঁত চেপে পল্লবকে বলল,

‘আমার ক্লাসের সময় পাড় হয়ে যাচ্ছে। আমার হাত ছাড়ুন বলছি। রেগে গেলে কিন্তু আমি আপনাকে আবারও চড় মেরে দিবো। তাই ভালো করে বলছি আমার হাতটা ছেড়ে দিন।’

পল্লব অনুর শক্ত করে চেপে রাখা হাতটার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে অনুর হাত ছেড়ে দিল। শান্ত স্বরে পল্লব অনুকে বলল,

‘এবার খুশি তো?’

অনু বিরক্তি স্বরে পল্লবকে বলল,

‘আমাকে আর বিরক্ত করবেন না।’

অনু ক্লাসরুমে চলে গেল। পল্লব মনে মনে বলল,

‘তোমাকে বিরক্ত না করলে কি করে হয়? তোমাকে বিরক্ত করতেই যে আমার খুব ভালো লাগে। এই কয়েকদিন তোমার অনুপস্থিতিতেই আমি বুঝতে পেরেছি আই লাভ ইউ সো মাচ অনু। ‘

পল্লব আনমনে হাসলো। ক্লাস শেষ হওয়ার পর অনু গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় দেখতে পেল পল্লব এখনও যায় নি। সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। পল্লবকে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনু মনে মনে বলল,

‘এই ছেলের মাথার তার কি ছিঁড়া? এখনও দাঁড়িয়ে আছে কেন? হয়তো তার ছিঁড়া পোলাপান তাই।’

অনু পল্লবের সামনে দিয়ে যেতে গিয়েও ভয় পেল। আবার যদি বিরক্ত করে তখন? পল্লব হাত যেভাবে চেপে ধরেছিল আরেকটু হলেই অনুর হাত ভেঙে যেত। অনু মাঠের একপাশে বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু না এই পল্লবের যাওয়ার তো নামই নেই। সবায় যার যার মতো বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছে। আর অনু এখানে বসে বসে মুড়ি খাবে? কখনোই না। অনু ঠিক করলো যা হওয়ার হবে। এই ছেলেকে ভয় পেলে চলবে না। তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়েও অনু ধরা পড়ে গেল। কারণ পল্লব অনুকে দেখে গম্ভীর স্বরে বলল,

‘আমার সাথে কথা না বলে চলে গেলে খুব খারাপ হয়ে যাবে অনু৷ তাই দাঁড়াও বলছি।’

অনু চোখ বন্ধ করে রাগে ফুঁসতে লাগলো। এই পল্লবকে আছাড় মেরে ভর্তা বানাতে মন চাইছে। অনু মনে মনে দোয়া করলো যাতে আদ্র এই সময়ে আবারও সেদিনের মতো ভার্সিটিতে না এসে পড়ে। নাহলে হয়তো পল্লবকে দেখে আরও রেগে যাবে। অনু হেসে পল্লবকে বলল,

‘কিছু বলবেন ভাইয়া?’

পল্লব রাগী স্বরে অনুকে বলল,

‘কে ভাইয়া?’

অনু অবাক হওয়ার ভান করে পল্লবকে বলল,

‘কে আবার? আপনি ভাইয়া।’

পল্লব রেগে দাঁতে দাঁত চেপে অনুকে বলল,

‘আরেকবার আমাকে ভাইয়া বললে তোমাকে শক্ত চড় মেরে তোমার স্মৃতিশক্তি সব ভুলিয়ে দিবো।’

পল্লবের হুমকিতে অনু ভয় পেলেও রাগী স্বরে বলল,

‘কি আপনি আমাকে চড় মারবেন? আমি কি আপনাকে ছেড়ে দিবো নাকি? আমিও আপনাকে চড় মেরে দিবো।’

পল্লব হেসে অনুকে বলল,

‘ অনু এখন কি তুমি আমার সাথে মারামারি করবে?’

অনু মুখ ফুলিয়ে পল্লবকে বলল,

‘আপনার সাথে মারামারি করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। কি যেন বলবেন বলছিলেন? তাড়াতাড়ি বলুন।’

পল্লব কপাল কুঁচকে অনুকে বলল,

‘এতো যাওয়ার তাড়া কেন তোমার?’

অনু বিরক্তি স্বরে পল্লবকে বলল,

‘আজব তো! আমাকে আমার বাসায় যেতে হবে। নাহলে আম্মু দেড়ি করে ফেরার জন্য আমাকে বকা দিবে।’

পল্লব হেসে অনুকে বলল,

‘আচ্ছা আসল কথাটা বলি। আদ্র নামের ঐ ছেলেটা কি তোমার বয়ফ্রেন্ড?’

অনু কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে পল্লবকে বলল,

‘আপনাকে কেন আমি বলবো?’

পল্লব শক্ত গলায় অনুকে বলল,

‘যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দাও।’

অনু অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পল্লবকে বলল,

‘হ্যা আদ্র আমার বয়ফ্রেন্ড। তো কি হয়েছে?’

পল্লব অনুর দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পল্লব কোনো কথা বলছে না দেখে অনু পল্লবের দিকে তাকিয়ে দেখল পল্লব অনুর দিকেই তাকিয়ে আছে। অনু মাথানিচু করে তাকিয়ে রইল। পল্লব চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও অনুর দিকে তাকিয়ে বলল,

‘আদ্রকে তুমি ভুলে যাও অনু। আজ থেকে আমি পল্লব তোমার বয়ফ্রেন্ড।’

অনু অবাক হয়ে পল্লবের দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বলল,

‘কি বললেন আপনি? মাথা ঠিক আছে আপনার?’

পল্লব হেসে অনুকে বলল,

‘মাথা আমার ঠিকই আছে অনু।’

#চলবে…