তোমাতেই আমি শেষ পর্ব (১১)

0
3443

তোমাতেই_আমি
#শেষ_পর্ব (১১)
#Tabassum_Kotha

রাতের নিস্তব্ধ সময়, বিয়ে বাড়ির কোলাহল অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। সাজ-সজ্জায় পরিপূর্ণ বাড়িটা এখন শুনশান হয়ে আছে। সারাদিন চেষ্টা করেও মীরা অর্ণবের মত পাল্টাতে পারে নি। হয়ে গেছে মীরার হলুদের ফাংশন। হলুদ শাড়ি আর ফুলের গয়নায় সেজে আছে মীরা।

?

ছাঁদে গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে অর্ণব আর মীরার সামনে দাড়িয়ে আছে দিয়া। গালে হাত দেওয়ার কারণ হলো এই মাত্র অর্ণব তার গালে ঠাঁটিয়ে একটা চড় মেরেছে। মীরা প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অর্ণব আর দিয়ার দিকে। হয়তো জানতে চায় অর্ণব এমন কাজ কেনো করলো।

— সো দিয়া, নিজের মুখে নিজের কুকীর্তি গুলো বলবে নাকি আমার বলাতে হবে?

দিয়া গালে হাত দিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,
— আই এম সরি অর্ণব। তুমি আর মীরা একসাথে একঘরে থাকতে এটা আমি সহ্য করতে পারি নি। তুমি শুধু আমার অর্ণ তোমার অন্য কারো সাথে থাকা আমি কিভাবে মানতাম বলো! তাই তো নিতাকে টাকা দিয়ে মীরার খাবারে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিলাম। তোমার সাথে বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই আমি আমার ভাড়া করা গুন্ডাকে বলে দিয়েছিলাম সব। তোমার সামনে মীরাকে ক্যারেক্টারলেস প্রমাণ করার জন্যই এতো কিছু ছিল।

অর্ণব দিয়ার গালে আরেকটা চড় মারলো। টাল সামলাতে না পেরে দিয়া নিচে পরে গেলো। মীরা দৌড়ে গিয়ে দিয়াকে ধরে উঠালো।

— দিয়াকে চড় মেরে কি নিজেকে ধোয়া তুলসি পাতা প্রমাণ করতে চান? দিয়া তো শুধু আমার ঘরে একটা ছেলেকে পাঠিয়েছিল কারণ সে আমাকে ঘৃণা করতো। আর আপনি! আপনি তো আমাকে ভালোবেসেও বিশ্বাস করতে পারেন নি! ভালোবাসার ভিত্তিই যেখানে বিশ্বাস, সেখানে আপনি তো আমাকে বিশ্বাসই করতে পারেন নি। দিয়া তো তবুও নিজের ভালোবাসা কে আপন করে পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছে। আপনি! আপনি তো নিজের ভালোবাসা কে দান করতে বসেছেন।

— মীরা তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। আমার কথা টা তো শোনো।

— কি শুনাবেন আপনি? এই যে বিয়ের পর সিদরাতেকে কিভাবে সুখে রাখবো এই? আপনার আর কোনো কথা আমি শুনতে চাই না।

— আমাকে ক্ষমা করে দাও মীরা। আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি। (দিয়া)

— জানি না দিয়া অন্যায় করেছো নাকি আমার চোখে আঙুল দিয়ে সত্যি টা দেখিয়ে দিয়েছো!! তোমার প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। ভালো থেকে।

মীরা আর এক মিনিট সেখানে না দাড়িয়ে ছুটে তার ঘরে চলে যায়। দিয়া এখনও অর্ণবের সামনে দাড়িয়ে আছে। আর অর্ণব আহত দৃষ্টিতে মীরার যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে।

— আমাকে প্লিজ ক্ষমা করে দাও অর্ণ। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম।

— দিয়া, তুমি আমাকে শাস্তি দিতে পারতে তোমাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। বিশ্বাস করো আমি হাসি মুখে মাথা পেতে নিতাম। এভাবে মীরাকে কেনো কষ্ট দিলে?

— সরি!!





ওয়াশরুমে শাওয়ারের নিচে দাড়িয়ে ভিজে যাচ্ছি। পরণের হলুদ শাড়িটা আর ফুলের গয়না গুলোও অনবরত ভিজে যাচ্ছে। গায়ে লাগানো হলুদগুলো অনেক আগেই পানির সাথে ধুয়ে গেছে। রাতের প্রায় অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আর অল্পকিছু সময় বাকি আছে। বুকের বা পাশ টা অনবরত ব্যথা করছে।

আজকের এই অর্ধেক রাতটাই সময় বাকি আছে আমার হাতে। এরপর আমি অন্যকারো বউ হয়ে যাবো। আমার শরীর মন সবকিছুতে অন্য কারো অধিকার হবে। অর্ণব কে ভুলে যেতে হবে। অর্ণবকে ভালোবাসার কোনো কারণ আমার কাছে ছিল না। তবুও তাকে ভালোবেসে ফেললাম। আর সিদরাতের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে কতোদিন আগে। তবুও ভালোবাসতে পারি নি। কেনো? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আমার আর খোঁজা হবে না। আমি অর্ণবকে ভালোবাসার কারণ খুঁজতে চাই না। শুধু জানি ভালোবাসি!! সিদরাতকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সারাজীবন কি এইভাবে ধোঁকা দেবো সিদরাতকে?? ভাবনার সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েও কোনো প্রশ্নের উত্তর পেলাম না।



রাতের প্রায় শেষ প্রহর চলছে। কিছুক্ষণ পরেই ভোরের আলো ফুঁটে উঠবে। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো দিশাহীন ভাবে ছরিয়ে পরবে। ছাঁদে দাড়িয়ে স্মোক করে যাচ্ছে অর্ণব। ইদানিং তার স্মোকিং টা বেশি হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থের জন্য এটা ক্ষতিকর সে জানে তবুও মনের আগুন নিভানোর জন্য সিগারেট পুড়ায় সে। হঠাত পিছন থেকে কেউ কাঁধে হাত রাখলে খানিকটা চমকে উঠে অর্ণব। পিছনে তাকাতেই করুণ হয়ে থাকা চোয়াল টা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠে। অর্ণবের বাবা দাড়িয়ে আছে সামনে।

— এভাবে এই সময় স্মোক করার বিষয় টা জানতে পারি কি?

— আপনার প্রয়োজনীয় কিছু হবে বলে মনে করি না।

— অর্ণ। আসো আমরা একটু কথা বলি। গত উনিশ বছর ধরে কথা হয় না আমাদের। অনেক কথা জমে আছে।

অর্ণব তার বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চেয়ারে বসে পরলো।

— তোমার মা কে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। অনু আমার জীবনে একটা দমকা হাওয়ার মতো এসে আমার জীবন এলোমেলো করে দিয়েছিল। অনুর সাথে বাঁচার জন্যই পুরো দুনিয়ার বিরুদ্ধে গিয়েছিলাম। সেই অনু যখন স্বার্থপরের মতো আমাকে ছেড়ে চলে গেলো,, সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারি নি। নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখতাম যাতে অনুর বিশ্বাসঘাতকতা ভুলে যেতে পারি। আমার অনেক ভুল ছিল অর্ণ। আমি নিজের কষ্টে এতো ডুবে গিয়েছিলাম যে তোমার দিকটা ভুলেই গিয়েছিলাম। আট বছরের একটা বাচ্চা একাকিত্বে কিভাবে সময় কাটিয়েছে আমি সেটা বুঝতে চাই নি।

তোমার স্কুল থেকে প্রতিদিন আসা কমপ্লেইন গুলোর প্রতি বিরক্ত না হয়ে তোমাকে সময় দেওয়া উচিত ছিল আমার। কিন্তু আমি সেটা করি নি। এতোটাই স্বার্থপর হয়েছিলাম যে নিজের সুখটাই দেখেছি। অন্তির মা কে বিয়ে করে নিজে সুখী হয়েছি। কিন্তু তোমাকে সময় দেওয়া প্রয়োজন মনে করি নি। এখন জীবনের বেশির ভাগ সময় পার করে এসে বুঝতে পেরেছি তোমার প্রতি কতোটা অন্যায় করেছি। জানি ক্ষমা চাওয়ার মুখ আমার নেই। তবুও বলবো, পারলে ক্ষমা করে দিও বাবা!

অর্ণব অন্য দিকে ফিরে অঙ্কুরের অগচোড়ে চোখের পানিগুলো আঁড়াল করে ফেললো। অঙ্কুর মাথা নিচু করে আছে। হয়তো অনুতপ্ত সে! হঠাত অর্ণব তার বাবা কে জরিয়ে ধরে ঢুকরে কেঁদে উঠলো। অর্ণবের এভাবে কেঁদে ফেলায় অঙ্কুরও নিজেকে সামলাতে পারে না। অতঃপর এতোগুলো বছরের দুরত্বের পর বাবা ছেলের সম্পর্কের উন্নতি ঘটে।

বেশকিছুক্ষণ বাবাকে জরিয়ে ধরে রাখার পর অর্ণব স্বাভাবিক হয়। অর্ণবকে ছেড়ে দিয়ে অঙ্কুর বলতে শুরু করে,
— মীরাকে ভালোবাসো!

— কি বলছো বাবা?

— ইয়াং ম্যান তোমার বাবা আমি। এতোটুকু তো বুঝতেই পারি। সন্দেহ তো আগেই হয়েছিল মীরাকে তোমার ঘরের বাইরে পরে থাকতে দেখে। আর সন্দেহ প্রমাণ হয়ে গেলো তোমার ফোলা লাল লাল চোখ আর সিগারেটের স্মেলে!

— আমি মীরাকে ভালোবেসে ফেলেছি। জানি না কিভাবে ভালোবেসে ফেললাম! কিন্তু ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মেনে নিতে যে মীরা আজ অন্যকারো হয়ে যাবে।

— মীরাও তো তোমাকে ভালোবাসে তাই না! মীরার চোখ বলে দেয় সে তোমাকে ভালোবাসে।

— জানি। কিন্তু আমি মীরাকে বিয়ে করতে পারবো না। মামা অপমানিত হবেন।

— যাও ঘুমিয়ে পড়ো। আর বেশি সময় বাকি নেই। কিছুক্ষণ পরেই বিয়ে বাড়ির কোলাহল পুনরায় শুরু হয়ে যাবে।

অর্ণব কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ছাঁদ থেকে নিচের দিকে চেয়ে থেকে সেখান থেকে চলে গেলো। অঙ্কুর আধো আলো ফোঁটা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মুখে ম্লান হাসি ফুঁটে উঠেছে তার।

?

?

অপেক্ষার প্রহর প্রায় শেষ। অবশ্য মীরার বেলা সেটা অপেক্ষা নয়, অনাকাঙ্খিত ঘটনা। লাল বেনারসি শাড়ি আর ভারী গয়নায় নিজেকে জরিয়ে অস্থির হয়ে পায়চারি করে মীরা। একটু আগেই বিউটিশিয়ান এসে বধু বেসে সাজিয়ে দিয়ে গেছে তাকে। ভীষণ সুন্দর লাগছে মীরাকে। যেকেউ দেখেই হয়তো নজর লাগিয়ে দেবে। কিন্তু এতো সৌন্দর্য পুরোই বৃথা, কারণ মীরার মনে যে শান্তি নেই। মন বারবার বলছে সমস্ত দায়িত্বের সংসার বানের জলে ভাসিয়ে দিয়ে অর্ণবের হাত ধরে অজানায় হারিয়ে যেতে। কিন্তু সেই উপায়টাও নেই। অর্ণব মাঝ রাস্তায় তার হাত ছেড়ে দিয়েছে। হাতে একটা ছুড়ি নিয়ে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ করছে সে। ইচ্ছে করছে ছুড়িটা বাম হাতের শিরা বরাবর চালিয়ে দিতে। একটু হলে ছুড়ি চালিয়ে দিতো, যদিনা তার বাবার মুখ খানা চোখের সামনে ভেসে উঠতো।

বাইরে হৈ চৈ শোনা যাচ্ছে, সবাই এক সুরে বলে চলছে,,, “বর এসেছে, বর এসেছে।” এই তো সময় এসে গেছে। সেই অনাকাঙ্খিত সময়টা এসে হাজির হয়েছে মীরার চৌকাটে। এখনই সময় পুরোনো সব আবেগকে গলা চেপে মেরে ফেলার। অর্ণবের প্রতি তার ভালোবাসাকে দাফন করার সময় হয়ে গেছে।

মনের কষ্ট সাজসজ্জার আঁড়ালে লুকিয়ে, মুখে একটা কৃত্তিম হাসি ফুঁটিয়ে তৈরি মীরা,,, তার কর্তব্য পালন করতে। মেয়ে হিসেবে দায়িত্ব পালন না করলে তো সে স্বার্থপরদের খাতায় নাম লেখাবে। মীরার ভাবনার সুতো ছিড়ে এক গাদা মেয়ে হুরমুরিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পরলো।

বিয়ের সময় যতো এগিয়ে আসছে আমার শক্তি যেনো ততোই কমে যাচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে কলিজাটা ছিদ্র হয়ে যাচ্ছে। বুকের বা পাশে অসম্ভব যন্ত্রণা করছে। কিভাবে সহ্য করবো এই যন্ত্রণা আমি সারাজীবন!! বিয়ের আসরে বসিয়ে দিয়েছে সবাই আমাকে। মাথা তুলে সবাইকে দেখছি। সবাই বেশ খুশি। বাবা অঙ্কুর আঙ্কেল, অন্তি সবার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা আনন্দ করছে। এতো ভীরের মধ্যে আমার চোখ দুটো অর্ণবকে খুঁজছে। শেষ বারের মতো দুচোখ ভরে তাকে দেখার ভাগ্য কি আমার আর হবে না!

হয়তো অর্ণবকে মন ভরে দেখার আর অধিকার নেই আমার। তাই তো বিয়ের আগ মুহূর্তেও তাকে কোথাও দেখছি না। ভালোবাসার মানে তো ভালোবেসে আগলে রাখা। আর অর্ণব! আমাকে আগলে রাখা তো দূরে থাক সাহস করে আমার হাত টা পর্যন্ত ধরে নি। কেনো যে এই মানুষটাকে আমি ভালোবেসেছিলাম! আগে যদি জানতাম রাগী খোলসটার আঁড়ালে এমন ভীত একটা ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে আছে তাহলে হয়তো কখনই অর্ণবের মতো একটা গাঁধা কে ভালোবাসতাম না। অর্ণবকে গাঁধা বললে গাঁধারও অপমান হবে। একটা অকর্মার ঢেঁকি। যখন তার থেকে দূরে ছিলাম তখন কাছে টেনে নিয়েছে। এখন যখন কাছে না গিয়ে উপায় নেই তখন সে পিঠ দেখিয়ে পালিয়ে গেছে।

আমি হয়তো অতি শোকে পাগল হয়ে গেছি। এতোক্ষণ অনেক কষ্ট লাগছিল এখন অনেক রাগ লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে অর্ণবকে কুচিকুচি করে কেটে ফেলি আর নাহলে গলা চেপে মেরে ফেলি। তারপর আমি নিজেও মরে যাবো। যাই করি না কেনো বিয়ে করতে পারবো না।

হঠাত পিছন থেকে কারো হালকা ধাক্কা খেয়ে হুশ ফিরে পেলাম। কাজী সাহেব কবুল বলতে বলছেন। এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে আমার পৃথিবী ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। না আমি পারবো না এই বিয়ে করতে।

বসা থেকে এক লাফে উঠে দাড়িয়ে পরলাম। দিক বেদিক চিন্তা না করেই সজোরে বলে ফেললাম,
“আমি এই বিয়ে করতে পারবো না, বাবা! আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা। আমি পারবো না। আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কিছুতেই কান্না থামাতে পারছি না।

— এসব কি বলছিস মীরা? বিয়ে করতে পারবি না মানে? (আবরার)

— আমি পারবো না বাবা। আমাকে ক্ষমা করে দাও। অন্যকাউকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি জানি আমার এই ধরনের বিহেভিয়ারে তোমার সম্মাণহানী হচ্ছে সবার সামনে কিন্তু বিশ্বাস করো আমি নিরুপায়। আর কোনো উপায় অবশেষ নেই আমার কাছে। তুমি চাইলে আমাকে মেরে ফেলো। তবুও আমি পারবো না অন্য কাউকে বিয়ে করতে।

আবরার আর অঙ্কুর অবাক চোখে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। উপস্থিত জনতাও হা করে দেখছে সব টা। এতোবড় হা করেছে যে মুখে আলু ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে। বিয়ের দিন কনের এরকম করা যেনো তাদের জন্য ফ্রিতে তামাশা দেখার সুযোগ করে দিলো। সবাই খুব উৎসুক হয়ে আছে জানার জন্য এখন কি হবে। তখন সেখানে বেচারা বর হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো। মীরা এখনও হাটুতে মুখ গুঁজে কেঁদে যাচ্ছে।

“মীরা তুমি বিয়েতে মানা করছো কেনো? কালকে রাতেও তো তুমি বললে ইউ লাভ মি। আর আজকে বলছো বিয়ে করবে না? হোয়াই?”

বরের কন্ঠ শুনে মাথা তুলতেই দেখি অর্ণব আমার সামনে দাড়িয়ে আছে,, তাও আবার বর এর বেশে। মুখ তিন ইঞ্চি পরিমাণ হা করে উঠে দাড়ালাম আমি। কিছুই বুঝতে পারছি না,, অর্ণব বরের বেশে কেনো? আর সিদরাত কোথায়? বাবা আর আঙ্কেল একসাথে দাড়িয়ে মুচকি হাসছেন কেনো? হচ্ছে টা কি?

“হচ্ছে টা কি তাই ভাবছো? তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার নামে বুদ্ধু বানানো হয়েছে মীরা ভাবি।”– অন্তি কথাটা বলতেই বাড়ির সবাই দম ফাঁটানো হাসি শুরু করলো।

আমি কিছু বুঝতে না পারলেও অর্ণবের মুখে লেগে থাকা মুচকি হাসি টা দেখে রাগ মাথায় উঠে গেলো। খপ করে অর্ণবের কলার চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— সবকিছু কি আপনার কাছে খেলা মনে হয়? আমি আপনাকে ভালোবাসি! আমার কতোটা কষ্ট হচ্ছে সেই আইডিয়া আছে আপনার? আপনার জন্যই আমি সিদরাতকে বিয়ে করার জন্য এতোদূর এগিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি জানেন আমার কি অবস্থা এখন? আমি সত্যি আপনার মতো একটা পাষান্ডকে ভালোবাসি।

— আরেহ কি করছিস ছাড় ছাড়! বিয়ের শেরওয়ানি টা ছিড়ে গেলে এখন আমি শেরওয়ানি পাবো কোথায় অর্ণবের জন্য! (আবরার)

— কি বলতে চাইছো? তোমরা সবাই আমার সাথে এমন কেনো করছো?

— কি বলবো? তোকে বলতে যাবো কেনো আমি? তোর বাবা আমি! তোর জীবন সম্পর্কে এতোটুকু ফয়সালা আমি করতেই পারি।

— মানে!

— তুই আর অর্ণব একে অপরকে ভালোবাসিস সেটা কি একবারের জন্যও আমাকে বলেছিস? এতোটা পর ভাবিস আমাকে? একবার বলেই দেখতি, হাসি মুখে রাজি হয়ে যেতাম। অনুর সাথে যেই ভুল টা করেছিলাম সেই একই ভুল আরেকবার করবো ভাবলি কি করে!! অনুকে হারিয়েছি এখন তোদের হারানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। সেদিন অঙ্কুর তোদের ভালোবাসার কথা না বললে আমি জানতেই পারতাম না। তোর বিয়ের পরে এই সত্যি টা জানতে পারলে সারাজীবন আমাকে অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচতে হতো।

— আই এম সরি বাবা।

— এখন কান্নাকাটি শেষ করেন বেয়াই মশাই, আমাদের বউমা কে আমরা নিয়ে যাবো তো। দেরি হয়ে যাচ্ছে। (অঙ্কুর)

সেদিন মীরা আর অর্ণবের ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অঙ্কুর আবরার খানকে সবকিছু জানায়। এরপর আবরার আর অঙ্কুর মিলে সিদরাত আর ওর পরিবারকে বুঝিয়ে অর্ণব আর মীরার বিয়ের আয়োজন করে।

?

অতঃপর ধুমধামের সাথে হয়ে গেলো মীরা আর অর্ণবের বিয়ে। আবরার খান নিজের মনের সব আশা পূর্ণ করে মেয়েকে পাত্রস্থ করলেন। বিদায়ের পাট চুকিয়ে অর্ণব আর মীরা যাত্রা শুরু করলো এক নতুন জীবনের পথে।।






বাসর ঘরে এক হাত লম্বা ঘোমটা টেনে বসে আছে মীরা। পুরো ঘর কাঠগোলাপ আর রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো হয়েছে। রোমান্টিক পরিবেশ বিরাজ করছে সর্বত্র। মীরা বসে বসে অপেক্ষা করছে তার অর্ণবের। মনের মধ্যে হাজার টা অনুভূতি উঁকি দিচ্ছে। কখনও বা লজ্জা পেয়ে আনমনেই হেসে উঠছে।

দরজার বাইরে চোখে মুখে বিরক্তি ফুঁটিয়ে দাড়িয়ে আছে অর্ণব। অন্তি আর অন্যসব বোনেরা এতোক্ষণ দরজায় দাড়িয়েছিল টাকার জন্য। সব ঝামেলা মিটাতে গিয়ে হাপিয়ে উঠেছে অর্ণব। বিরক্তি সংবরণ করে ভিতরে ঢুকতে থ হয়ে গেলো সে। মীরা ঘরের কোথাও নেই। একটু আগাতেই পিছন থেকে কেউ একজন অর্ণবের গলায় ছুড়ি ধরলো।

— ওই সাতটা শাঁকচুন্নির একটা জামাই, আমাকে মিথ্যা কেনো বললা? আরেকটু হলে আমি হার্ট অ্যাটাক করে মারা যেতাম।

— হুশ এসব বলে না। আর এই ব্রেডে বাটার লাগানো নাইফ দিয়ে আমার মতো খচ্চরকে কাটা যাবে না।

— তুমি সত্যি একটা খচ্চর। (অর্ণবকে জরিয়ে ধরলো মীরা)

— আর তুমি সাতটা শাঁকচুন্নির একটা জামাইর আট নাম্বার বউ।

অর্ণবও মীরাকে পরম আবেশে জরিয়ে ধরলো।

— #তোমাতেই_আমি আমার সব সুখ খুঁজে পেয়েছি অর্ণব।

— #তোমাতেই_আমি আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত কাটাতে চাই।

— ভালোবাসি।

— ভালোবাসি।

অর্ণব মীরার ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁট দিয়ে দখল করে নিলো। কিছুক্ষণ পর মীরাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিলো অর্ণব। ডুব দিলো দুজনে ভালোবাসার সাগরে। এভাবেই ভালোবাসা আর খুনশুটিতে কেটে যাক তাদের জীবন।

—— সমাপ্ত ——