তোমাতে আমাতে পর্ব-০৩

0
1420

#তোমাতে_আমাতে
লেখা আশিকা জামান
পর্ব ০৩

সকাল সকাল মায়ের চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভাংলো।
— মা প্লিজ আরেকটু ঘুমাই।
এটা বলেই আমি আবার কম্বল মাথায় দিতে যাবো তখন মা কম্বল টেনে নিয়ে চলে গেল।
বুঝতে পেরেছি মা খুব রেগে আছে আর হয়তবা অনেক্ষন যাবৎ আমাকে ডেকেছে। কিন্তু আমি বরাবরের মতই ঘুমকাতুরে।
আমি একরাশ বিরক্তি নিয়ে যখনি উঠতে যাবো তখন খেয়াল হলো আমার উড়না নেই। তখন ইমনের কথা মনে পড়লো সিরিয়াসলি আমার এতক্ষন ওর কথা মনেই ছিলোনা। এদিক সেদিক তাকাতেই দেখি ইমন চেয়ারে বসে আমার দিকে অসভ্যের মত তাকিয়ে আছে।
আমি লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছি। ইমন এটা বুঝতে পেরে ব্যালকনিতে চলে যায়।
আমি বিছানা থেকে উড়না খুজে নিয়ে ফ্রেস হয়ে আসলাম।
বেড সাইড টেবিলে থেকে ফোন দিয়ে দেখি ১০:৩০ বাজে।
ইমন বেচারি তরক্ষনে আবার বিছানায় শুয়ে পড়েছে।
— আপনি ব্রেকফাস্ট করেছেন?
— হুম। তোমার আশায় বসে থাকলে এতক্ষন আমার পেটে পিত্তি পড়ে যেত। এইজন্যেই তো তোমার স্বাস্থ্যের এই অবস্থা। এইভাবে টাইম মত না খেলে গ্যাস্ট্রিক তো হবেই।
— এই দেখুন ফ্রিতে এডভাইস দেয়া বন্ধ করোন।
আমি কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ওখান থেকে চলে আসি।
আমি টেবিলে বসতেই মা রেগে মেগে ফায়ার।
— এই তুই কিরে? তোর কোন কমন সেন্স আছে। তোর কালকে বিয়ে হয়েছে এটা মনে হয় ভুলেই গেছিস।
আমি প্লেটে খাবার নিতে নিতে বলি,
— আসলেই ভুলে গেছিলাম ভাগ্যিস তুমি মনে করিয়ে দিলে।
— আদৃতা তোকে আমার কিছু বলার নাই..
যা মন চায় তাই কর.।
— আচ্ছা মা আমি তো প্রতিদিনই লেট করে উঠি তাহলে আজকে এত কথা শোনাচ্ছো কেন?
— শোনাচ্ছি তোমার ভালোর জন্য। তুমি এখন একজনের ওয়াইফ এটা যেন মাথায় থাকে। আগে যা করেছে ওগুলা সব বাদ। তোমারতো উচিৎ ছিলো ইমনের দিকে খেয়াল রাখা। ও সকালে কি খেয়েছে না খেয়েছে, কি দরকার ওগুলা তুমি দেখেছো? দেখোনিতো..
আচ্ছা ও কি ভাবলো বলোতো?
তুমি এখন থেকে ইমনের প্রতি খেয়াল রাখবা। ইমনের সব কথা শোনার চেষ্টা করবা কেমন..
কোনরকম খেয়ে চলে আসতে লাগলাম। তখনি ভাইয়া এসে হাজীর।
— আদৃতা এইভাবে উঠে যাচ্ছিস কেন? ঠিক করে খাওয়া দাওয়া না করলে শরীর কি করে ঠিক থাকবে।
আচ্ছা বোস এক্টু কথা বলি।
আমি আবার চেয়ারে বসে গেলাম।
— জানি বিয়েটা তোর উপর একেবারে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে । আসলে আমরা বুঝতেই পারিনি হুট করে এতকিছু ঘটে যাবে। আর কি জানিস তো সব কিছু ওই আল্লাহর হাতে। আমাদের কিছু করার নেইরে। এখন সব থেকে বড় কথা হলো ইমনকে তোর কেমন লেগেছে। মানে ইমনের সাথে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে পারবিতো।
— জানি নাহ..
— মানে কি? বোন এগুলা বললে হবে। আমিতো তোমাকে স্ট্রেট ফরোয়ার্ড কথা বলতে শিখিয়েছি..
নইলেতো আমি শান্তি পাচ্ছি না।
আমি কেন জানি মুখ ফসলে বলে ফেললাম,
— অসভ্য একটা লোক।
কিন্তু আমি এইটা বলতে চাইনি।
ভাইয়া আর মা অদ্ভুত বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছি।
এইবার আমার কপালে মার ছাড়া আর কিছু জুটবে না।
কোনরকমে এখান থেকে কেটে পড়লে বাচি।
— ওই শোনেছিস আহির। তোর শিক্ষা হয়েছে এই মেয়েকে এত কিছু জিজ্ঞাস করার। এই মেয়ে তুই ভালো মন্দের কি বুঝিস?
এত ভদ্র একটা ছেলেকে বলে কিনা অসভ্য। কি অসভ্য মেয়ে আমি পেটে ধরেছিরে বাবা।
বিয়ের পর আমাদের কেউ স্বামী সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারতাম না। আর এই মেয়ের মুখেতো কোন লাগামই নেই।
ভাইয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো,
— মা প্লিজ তুমি থামবে। ইমন শুনতে পেলে কি ভাববে।
মা মনে হয় কিছুটা চুপ করলো। কিন্তু না পরে আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
— এই মেয়ে যে আমাদের মান সম্মান ডুবাবে এটা আমি বুঝে গেছি।
— আদৃতা প্লিজ তুই রুমে যা। আর মা তুমি এত কথা বলো কেন? ভাল্লাগেনা..
আমি রাগে গজগজ করতে করতে রুমে চলে আসি।
আমি কি এমন বলেছি যার জন্য আমাকে এত কথা শুনতে হবে। একটু অসভ্যইতো বলেছি আরতো কিছু নয়।
খুব কান্না পাচ্ছে। মা তুমি আমার সাথে এমনটা কিছুতেই করতে পারোনা।
বিছানায় বসেই কাঁদতে লাগলাম নিঃশব্দে। ইমন শুনতে পেলে শুনুক তাতে আমার যায় আসে না। সব এই ছেলের জন্য।
ইমন বিছানা থেকে হকচকিয়ে উঠলো।
আমি হাটু ভাজ করে দুই হাত এর উপর মাথা রেখে চোখের জল ফেলছিলাম।
আমার কান্না দেখে ইমন হতবিহ্বল হয়ে যায়।
— আদৃতা হুয়াট’স প্রবলেম?
আমি কোন উত্তর দিচ্ছিলাম না।
— আর ইউ ওকে?
হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়লো। নাহ আমিতো বাবার লক্ষী মেয়ে তাদের মান সম্মান কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না।
চোখ মুছে ওনার দিকে তাকালাম।
— হুম আমি ঠিক আছি।
আপনার কিছু লাগবে?
— উহু তোমার চোখতো অন্য কথা বলছে। কি হয়েছে আমি কি জানতে পারি?
— কিছু না।
আমি আমার হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
— আচ্ছা তোমার মনে হয় এই রিংটা প্রছন্দ হয় নাই। আর এক্সট্রেমলি সরি কালকে ওইভাবে জোড় করে রিং পড়ানোর জন্য। তুমি চাইলে খুলে ফেলতে পারো।
আমি ভ্রুকুচকে ইমনের দিকে তাকাই,
— কক্ষনো নাহ, আমি এইটা জীবনেও খুলতে পারবোনা।
ধুর এইটা আমি কি বললাম। ইমন কি ভাববে।
ও আমার কথাটা শুনে কেমন চুপ হয়ে গেল।
তারপর নিজে থেকেই বলতে লাগলো,
— আচ্ছা কেন কাদছিলে আমাকে বলা যায়?
যদি তুমি আমাকে ফ্রেন্ড ভাবো। আচ্ছা আমরা ফ্রেন্ড হতে পারি?
আমার ওর কথাটা খুব মনে ধরলো।
— হুম বেস্টু।
— আচ্ছা বেস্টু হতেই হবে? শুধু ফ্রেন্ড থাকি।
— কেন আপনার আরো বেস্টু আছে তাই নাহ..
আর আপনি আপনার গার্লফ্রেন্ড কে বিয়ে না করে আমাকে খামোকা কেন বিয়ে করতে গেলেন।
আমার এই প্রশ্ন শুনে ইমন অহেতুক ঘামতে লাগলো। তারপর একদম চুপ করে গেল..
— কি হলো? ঘামছেন কেন?
ইমন অগ্নি চোখে আমার দিকে তাকালো।
— এমন অহেতুক প্রশ্ন করার মানেটা কি? কোথায় কি বলতে হয় না বলতে হয় সেটা তোমার বুঝা উচিৎ।
আর আমার গার্লফ্রেন্ড আছে এটা তোমাকে কে বললো? এই দেখো ফ্রেন্ড বলেছি বলে তুমি আজেবাজে কুয়েশ্চেন করবে এটাও আমাকে মেনে নিতে হবে।
ইমনের এমন অহেতুক রাগের কারন আমি বুঝতে পারছি না। কি এমন বলেছি আমি?
তার জন্য এতো রাগতে হয়।
ধুর মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল।
— আপনি এমন রেগে যাচ্ছেন কেন?
আর আমিতো মজা করছিলাম।
— দেখো সব বিষয় নিয়ে মজা করা আমার ভালো লাগেনা। আর তুমি জানোনা তোমাকে কেন বিয়ে করেছি?
নাকি এইটা নতুন করে তোমার আমার মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছা হয়েছে।
— প্লিজ চুপ করোন। আমার ভালো লাগছে না।
আমি যাই বলি তাতেই সবাই আমার উপর লাফিয়ে পড়ে রাগ দেখাচ্ছে।
ইমন খাট থেকে নেমে পড়লো।
রাগে নাকটা লাল হয়ে গেছে। একদম নাকের ডগায় রাগ। আমার এখন চরম রাগ হওয়ার কথা কিন্তু উলটো বুকের ভিতর চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে। কেন তা আমি জানিনা। আচ্ছা ও ব্যাগের কাছে যাচ্ছে কেন? ও কি চলে যাবে।
হুম ইমন ব্যাগটা এক কাধে তুলে নিলো।
— আদৃতা..
বলেই ইমন থেমে গেলো।
আমি আকুল হয়ে ইমনের দিকে তাকালাম যেন এই ডাক শোনার জন্য এতকাল ধরে অপেক্ষা করে ছিলাম।
— কি? বলুন..
— আমি চলে যাচ্ছি। তুমি বলে দিও সবাইকে..?
সর্বনাশ এই ছেলে বলে কি? আমার বুকের ভিতর চিনচিনে ব্যাথাটা বেড়েই চলেছে।
আচ্ছা ও যদি চলে যায় তাহলে মা আমাকে সোজা বাসা থেকে বের করে দিবে। উহু কিছুতেই না।
— কি হলো চুপ করে আছো কেন?
আমি বিছানা থেকে নেমে পড়লাম।
— নিয়ম অনুযায়ী আপনারতো কালকে যাওয়ার কথা। আপনি যদি সত্যিই এখন চলে যান তাহলে আমি নিজে নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যাবো।
— দেখো আমার এখানে শুয়ে বসে থাকতে ভালো লাগছে না। বুঝতে পারছোতো..
— উহু আপনি রেগে আছেন আমি জানি। আচ্ছা কি করলে আপনি থেকে যাবেন?
আমি কানে ধরি? কয়বার উঠ বস করবো?
— আচ্ছা তুমি এমন ছেলেমমানুষ কেন?
পিচ্চি কোথাকার?
— এই শুনুন আমাকে পিচ্চি বললে কিন্তু আমি রেগে যাই।
আর তখন যা ইচ্ছে তাই করি।
— কি কি করো একটু শুনি।
— ওইটা পরিস্থিতি বুঝে। যেমন..
আমি হঠাৎ করেই ওর ব্যাগটা কাধে থেকে নিয়ে নিলাম।
— আরে করছো কি?
— এই যে পিচ্চি বলার অপরাধে ব্যাগটা নিয়ে নিলাম। এখন এইটা আলমারিতে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেওয়া হবে।হুম.
— আচ্ছা আমি এখানে থেকে কি করবো?
— বাকী সব জামাইরা শ্বশুরবাড়ি এসে যা করে আপনিও তাই করবেন।
বলেই জিভে কামড় দিলাম। ছিঃ এইটা আমি কি বললাম। ও কি ভাববে?
— মানে??
আমি দ্রুতগতিতে টপিক চেঞ্জ করার চিন্তায় পড়ে গেলাম।
— আসুন ছাদে যাই। আপনার মনটা একটু হলেও ভালো হবে।
— আচ্ছা তাই চলো। অন্তত জামাই এর একটা দায়িত্ব পালন করি।
(চলবে)