তোমাতে আমাতে পর্ব-০৮

0
1370

#তোমাতে_আমাতে
লেখা আশিকা
পার্ট ০৮

সকালের মিষ্টি আলোটা চোখে পড়তেই আমি একটু একটু করে চোখ খুলতে লাগলাম। এক কাত থেকে আরেক কাত হয়ে দেখি আমি বিছনার এক পাশে আর ইমন অন্যপাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে । আচ্ছা আমি বিছানায় কখন আসলাম কিছুই মনে পড়ছেনা। কম্বলটা সরিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। কালকে রাতের কথা মনে করতে চেষ্টা করলাম।
হ্যা আমিতো পড়তে পড়তে টেবিলে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। এখানে কখন আসলাম সেটাই মনে পড়ছিলো না।
সাইড টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই দেখি খাবার প্লেট রাখা। তারমানে আমি না খেয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
আমি ইমনের দিকে ঘুরে তাকালাম,
ইমন উঠে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আমি পা টা নামালাম বিছানা থেকে নামার জন্য।
— আদি..
আমি আবার পিছনে তাকালাম।
ও বিছানা থেকে উঠে বসে পড়লো।
— সরি কালকে ওইভাবে তোমার সাথে কথা বলাটা আমার উচিৎ হয়নি।
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আবার নিচে তাকালাম।
— না আসলে আমারো ভুল ছিলো। আমার তোমার প্রতি আরো কেয়ারফুল হওয়ার দরকার ছিলো।
ছোটবেলা থেকেই নিজের ঘাড়ে দোষ চেপে কথা বলার স্বভাব আমার।
ইমন গলাটা নিচু করে বললো,
— তুমিতো এখনো রেগে আছো?
তুমি কালকে কান্নাকরে টেবিলে ঘুমিয়ে পড়েছিলে সত্যি আমার খুব খারাপ লেগেছিলো।
এমনকি রাতে খাওও নাই। আমি অনেকবার তোমাকে জাগানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু তুমি উঠোনি।
ওই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম,
— আচ্ছা আমিতোটেবিলে ঘুমিয়ে ছিলাম তাহলে বিছনায় কি করে আসলাম?
ও আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে নিচে তাকিয়ে বললো,
— তোমারতো ঘুমের মধ্যে হাটার অভ্যেস আছে আমিতো কালকে পুরাই অবাক। তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হেটে হেটে বিছানায় চলে আসলা।
আমি ভ্রুকুচকে ওর দিকে তাকালাম,
অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলাম
— কিহ্?
কিন্তু ও কোন উত্তর দিলোনা।
আমিও আর কিছু জিজ্ঞাস করলাম না।
আর ওই গল্পটা যে আমি বিশ্বাস করে নিলাম এমনটাও না। যা বোঝার আমিতো বুঝেই গেলাম।
তারপর দুইদিন ইমন আর বাসায় এলোনা।
আমার অস্থিরতা বেড়েই চললো, আমি না পেরে ওকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাস করেই বসলাম।
— তুমি না আমাকে পড়াতে চেয়েছিলে? তাহলে আসছোনা কেন?
— হুম আমি চাইলেই কি সবকিছু হবে। যার তৃষ্ণা সেতো একাই গঙ্গার ঘাটে যাবে।
মেজাজ পুরা খারাপ হয়ে যায় এই ছেলের কথাবার্তা শুনলে। নিজেরে যে কি মনে করে আল্লাহই জানে। আমি সাতপাঁচ না ভেবে বলেই ফেললাম,
— দেখো আমি আর নতুন করে কিছু শুনতে চাইনা। তুমি একটুপর বাসায় আসছো এটাই ফাইনাল।
বলেই ফোনটা রেখে দিলাম।
এক্টুপর যখন কলিংবেল বেজে উঠলো ইমনের আসার ধ্বনি আমাকে যেন উন্মাদ করে দিচ্ছিলো। এক অন্যরকম ভালোগা আমার হৃদয় ছুয়ে গেল।
আমি ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম।
ইমন দরজার ওপাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখেই কিছু না বলে রুমে চলে আসলো।
ওর এতটা উদাসীনতা আমকে ভিতরে ভিতরে খুবই পীড়া দিতে লাগলো।
— বাসা থেকে আসছো? নাকি হসপিটালে ছিলা।
এইরকম লাগছে কেন?
টায়ার্ড?
আচ্ছা তোমার কি মুড অফ?
খাওদা দাওয়া কিছু করছো?
এত দিন দিন শুকাচ্ছো কেন?
— আদি জাস্ট স্টপ ইট। এত কুয়েশ্চেন একবারে করলে আমি কি এ্যান্সার দিব।
আমি ফুলা বেলুন থেকে পুরা চুপসে গেলাম।
গলাটা নরম করে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিলো,

— আদি একগ্লাস পানি দিবা।
আমি ছুটে গিয়ে পানির গ্লাস নিয়াসলাম। ইমন ঢকঢক করে পানির পুরো গ্লাস শেষ করে ফেললো।
যখন ও বুঝতে পারলো আমি ওর দিকেই তাকাই আছি তখন চোখ দিয়ে ইশারা করে বললো,
— এইভাবে তাকিয়ে আছো কেন? টেবিলে যাও?
— নাহ মানে মাত্রইতো আসলা?
— তো?
ওর সাথে কথা বাড়ালেই ঝামেলা। আমি টেবিলে গিয়ে বই বের করলাম।
ইমন চেয়ার টেনে বসে পড়লো।
ফিজিক্স বই বের করে আমাকে পড়াতে লাগলো। ওর পড়নোর স্টাইলটা অন্যরকম। পড়াতে পড়াতে ও ওর চুলগুলো কপাল থেকে উপরের দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো। আর কথা বলার সময় ওর সামনের দাত দুটো বেশী দেখা যচ্ছিলো। ওই দুটো একদম ইদুরের দাতের মত লাগছিলো। একদম হুয়াইট..
ইদুরের দাতের কথা মনে হতেই আমার হাসি পেয়ে গেল। আমি ফিক করে হেসে দিলাম। ও অগ্নি চোখে আমার দিকে তাকালো।
— হাসলে কেন? আমি কি তোমাকে কোন জোক্স পড়াচ্ছি?
আমি ভয় পেয়ে চুপসে গেলাম।
— কি হলো হাসছো কেন বললে না।
— এমনি একটা কথা মনে পড়ে গেলোতো তাই..
— আমি তোমাকে পড়াচ্ছিলাম তো তাই না। তাহলে মনযোগ অন্য দিকে থাকে কি করে?
হুয়াই? এ্যন্সার মি?

মনযোগতো তোমার দিকেই ছিলো চান্দু । তুমি সামনে মানে গোটা দুনিয়াই তুচ্ছ কি করে বোঝায় এটা এই ছেলেকে? রাগ নাকের ডগায় সবসময়..
উফ আর পারিনা। যা করতে চাই সেটাই উলটো হয়ে যায়।
মাথায় কলমের গুতো খেয়ে ইমনের দিকে চমকে তাকালাম।
— কোথায় হারাই গেছিলা। আচ্ছা আমি কোন পর্যন্ত পড়াইছিলাম যেন?
আমি পুরা থতমত খেয়ে গেলাম। কিছুই বলতে পারলাম না।
ইমন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো।
— আচ্ছা কি পড়াচ্ছিলাম যেন?
আমি সেটাও বলতে পারলাম না। ইমন অষ্টমাশ্চর্য হয়ে যেন আমাকেই দেখতে লাগলো।
চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে যেতে লাগলো।
আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।

— ওইভাবে উঠে পড়লে কেন?
তীক্ষ্মদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো ইমন।
— তাহলে কি করবো?
তোমার কি মনে হয় আমি কি এখন প্রেম করতে আসছি। শোন মন থেকে যা আসেনা সেটা জোড় করে কেন করতে যাও। আচ্ছা আমাকে ওইভাবে ডেকে কেন নিয়াসলা? পড়াশোনা কোন ফাজলামোর যায়গা না এগেইন বলছি। অদ্ভুত আমি পড়াই আর সে অন্য দুনিয়ায় বিচরণ করে। এতক্ষন ধরে প্যাচাল পাড়ার কোন মুল্যই তোমার কাছে নেই।

— আসলে তুমি সামনে থাকলে..
— আমি কি? বাঘ? না ভাল্লুক।
যত্তসব।
এই দেখ আমি হস্পিটালে যাচ্ছি অকারণে আমাকে ফোন করে ডেকে আনবা না।

— ওকে আমি আপনাকে আর ডেকে আনবো না। ইচ্ছে হলে আসবেন না হলে আসিয়েন না।
বিড়বিড় করে বললাম
যেন সব দায় আমারি পড়েছে।
— এই কি বললা তুমি?
— কিছু নাহ্
বলেই আমি ওখান থেকে চলে আসলাম।
একটুপর ইমন আমার নাম ধরে চিল্লাই চিল্লাই ডাকতে লাগলো। আমি না শুনার ভান ধরে বসে থাকলাম।

মা দৌড়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাস করতে লাগলো,
— ইমন ডাকছে তুই এখানে বসে আছিস কেন?
কখন আসছে ও?
আমি ঠাই বসে আছি।
— এই তুই যাবি ছেলেটা কিভাবে ডাকছে?
তোর কান্ডজ্ঞান কবে হবে? নাহ আমি আর পারিনা তোকে নিয়ে? কেন এমন করছিস?
উফ আমাকে কি তুই শান্তি দিবি না দিবি ন।
— উফ মা যাচ্ছি। অসহ্য লাগছে সব কিছু। আচ্ছা কি দোষ আমার বলোতো? জোড় করে সব কিছু আমার ঘাড়ে চাপাতে পারলেই কি শান্তি পাও…
আমি উঠে চলে যেতে লাগলে মা আমার হাত ধরে ফেললো,
— কি হয়েছে মা? ইমন কিছু বলেছে? তুই কাঁদছিস কেন?
— কিছু না। ছাড়।
মায়ের হাত ছাড়িয়ে চলে আসলাম।
আমি নিঃশব্দে রুমে ঢুকলাম।
আমার পায়ের শব্দ পেয়ে ইমন চিল্লাই চিল্লাই বলতে লাগলো,
— আমার ব্যাগ কোথায়?
চোখের সামনে ব্যাগ তাও আমাকেই ডাকছে।
ব্যাগটা হাতে নিয়ে ওর সামনে এগিয়ে দিলাম..
ব্যাগটা খামচা দিয়া নিয়ে নিলো। এমন ভাবে নিলো যেন সমস্ত রাগ ব্যাগের উপর। আমি আর কোন কথা বলছিলাম না।
— আমার ওয়ালেট কোথায়?
ওটাও বিছানায় দেখতে পাচ্ছে তারপরো ইচ্ছে করেই আমার কাছে চাইছে।
যেন আমি ওর কেনা গোলাম ওর হুকুম তামিল করার জন্যই আমার জন্ম হয়েছে। আমিও তাই হুকুম তামিল করার জন্যই ওয়ালেট টা হাতে তুলে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম।
আমি নিচেই তাকাই আছি ওর দিকে তাকালেই এখনি কান্না চলে আসবে । অনেক ভাবে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছি।
কিন্তু শ্রাবণ ধারা যেন বাধ না মেনে সজোরে বের হওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়ে আছে।
ওয়ালেটটা হাতে দিতেই ইমনের হাতের স্পর্শে আমি চমকে উঠে ওর দিকে তাকাতে লাগলাম। পরক্ষনেই চোখ নিচে নামিয়ে নিলাম।
ইমন আধো গলায় বলতে লাগলো,
— কি হয়েছে? এমন করছো কেন?
কিছু না বলতে গিয়েও গলাটা ধরে এলো। নিঃশব্দে নিচে তাকালাম। কপালের সামনের চুলগুলো উড়ে এসে বারবার চোখগুলো ঢেকে দিচ্ছিলো।
ইমন সহসাই আমার দুই গালে হাত রাখলো। ওর হিমশীতল হাতের স্পর্শ আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে আলোড়িত করে তুলছে। আমি সামলাতে না পেরে এক পা করে পিছিয়ে পিছিয়ে শেষ সীমানা মানে ওয়ালে এসে ঠেকে যাই। ইমন সামনে এগিয়ে এসে আবার আমার দুই গাল স্পর্শ করে। চোখের জল কোটর ছেড়ে বের হতে আসতে চাইছে। ইমন আমার কপালের চুলগুলো সরিয়ে কানের পিছে গুজে দিলো
— আদি চুপ করে আছো কেন? কিছুতো বলো? আসলে পড়াশোনাতে আমি বরাবরের মতই সিরিয়াস তাই ওইটা নিয়ে ফাজলামো আমার সহ্য হয়না। জানোতো তোমাদের বাসায় আসার আগে আমি পড়ছিলাম তোমার কথায় আমি আমার নিজের পড়া রেখে ছুটে চলে আসছি..
ওর কথা আমার সমস্ত আবেগকে জাগ্রত করে তুলছে। আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিনা। দুচোখের জল গড়িয়ে পড়তেই ইমন দুই হাতে তা ধরে ফেললো। আমি ওকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। চোখেত জলে ওর শার্ট ভিজে যাচ্ছে। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে দ্বিগুন শক্তিতে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে ফেললো। অদ্ভুত ভালোলাগা ছুয়ে যাচ্ছে। জানিনা কতক্ষন এভাবে ছিলাম।
ইমনই ঘোর লাগানো কন্ঠে বলতে লাগলো,
— আদি প্লিজ এইবার কান্না বন্ধ করো। আমার শার্ট ভিজে যাচ্ছে। হস্পিটালে যাবো কি করে?
আমিই লজ্জা পেয়ে প্রথমই ওকে ছাড়িয়ে দিলাম তারপর দৌড়ে বের হয়ে গেলাম। একটুপর ইমনও বাসা থেকে চলে গেল।
চলবে।।