তোমাতে আমাতে পর্ব-১০

0
1360

#তোমাতে_আমাতে
পার্ট ১০
লেখা আশিকা

হঠাৎ কারো হাতের স্পর্শে আমার ঘুম ভাংগে। হকচকিয়ে সোফায় বসে পডি। পরিস্থিতটা বুঝতে একটু সময় লাগে। চোখ মেলে সামনে তাকাই দিকে ইমন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তখনি আমার মনে পড়ে গেল আরেকটু আগে ঘটে যাওয়া সেই বিশ্রি ঘটনাটা । আমি সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেললাম।
সহসাই ইমন আমার হাত টেনে ধরে রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো।
আমি ওর হাত ছাড়িয়ে দিলাম। রাগান্বিত হয়ে ওর দিকে তাকালাম।
— মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে দিয়ে এইটা কি ধরণের ফাজলামো হচ্ছে।
— ফাজলামোতো তুমি করছো?
রুমে না এসে এখানে এই শীতের মাঝে পরে পরে ঘুমুচ্ছো কেন?
আমি কতক্ষন ধরে তোমার জন্য ওয়েট করছিলাম তুমি জানো! রুমে আসো নাই কেন?
— আমার কি রুমে আসার কথা ছিল?
— এই আজবতো। এত কথা বলো কি করে?
— আমিতো কিছুই বলিনি যা বলার তুমি বলেছো আমি নিরিবে সহ্য করেছি। আমিতো পুতুল সবাই আমাকে যেভাবে নাচায় আমিও সেভাবেই তালে তালে নাচি। আই হ্যাভ নো ক্রেডিট। তুমি গিয়ে ঘুমোও আমি তোমার রুমে যাবো না।
— কেন যাবে না।
— যাবোনা বলেছি যখন যাবোনা।
— সিনক্রিয়েট না করলে তো তোমার শান্তি হচ্ছে না। তাই ইচ্ছে করে এমনটা করছো। মামননী বাবাই জেগে গেলে কি হবে বুজতে পেরেছো।
— সেটাতো আমার বুঝা কথা নয়। তুমি এখান থেকে যাও বলছি। এগেইন বলছি আমি যাবোনা। প্লিজ গিভ মি এলোন।
ইমন কথা না বাড়িয়ে আমাকে জোড় করে কোলে তুলে নিলো।
— এই নামাও বলছি আমি যাবোনা। যাবোনা বলছিতো..
ও আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আর একবার যাবোনা বললে সোজা ফ্লোরে ফেলে দিবো। তখন কোমড় ভেংগে সারাদিন ঘরে বসাই রাখবো তখন দেখবো তোমার কত জেদ!!
আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরে এলাম।
ও আমাকে বিছানায় সজোরে ফেলে দিলো। ইমম। কোন রিক্স না নিয়ে দরজাটা জোড়ে লাগাই দিলো।
অভিজ্ঞ পুরুষের মত সামনে এসে বসলো।
আমার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
— সুন্দরী এইবার য্যান।
আমি ওকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফালাই দিয়ে বিছানা থেকে এক পা নামাতেই ও আমার কোমড় জড়িয়ে ধরলো। আমি নড়তে পারলাম না।
আমাকে টেনে একদম ওর কাছে নিয়ে গেল।
আমার এই মূহূর্তে মিশ্র অনুভুতি কাজ করছে। কষ্ট, রাগ, অভিমান, ভালোলাগা সব একবারেই মাথায় কাজ করছে। কিন্তু চোখে মুখে স্পষ্ট রাগ ফুঁটে উঠেছে। ইমন কি বুঝেও বুঝে উঠতে পারছে না। এই মূহূর্তে ইমনকে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বালক হিসেবে আখ্যায়িত করতে ইচ্ছা হচ্ছে।
সহসাই আমার কানে শিরশিরানি অনুভুত হলো, আমি চমকে উঠে চোখটা ওর দিকে ঘুরালাম।
কানের কাছে মুখ নিয়ে বলতে লাগলো,
— সুন্দরি আপনার এত শক্তি হয় নাই। অযথাই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে যান কেন?
তার থেকে আমার কাছে হেরে যাওয়াটাই কি বেটার নয়?

আমার চোখ ছলছল করে উঠলো। আমি হেরে গিয়ে পুতুলের মত বসে থাকলাম। ও ওর একহাত দিয়ে আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে আরেক হাত গলায় রাখলো।

— এই না প্লিজ মাঝরাতে স্ত্রীর চোখে অশ্রুবর্ষণ হোক এটা মোটেই কোন স্বামীর কাছে কাম্য নয়।

ও এইটা কি বললো? আদৌ কি আমার আর ওর সম্পর্কটা চার পাঁচটা স্বামী স্ত্রীর মত।
এই প্রথম ও আমার স্বামী বলে নিজেকে সম্বোধন করলো। আমার কি করা উচিৎ। কিছুক্ষণ আগেও যে ইমন আমার সাথে চুড়ান্ত খারাপ ব্যাবহার করলো। সে হঠাৎ ভালোমানুষের তকমা লাগিয়ে আমাকে ভুলনোর পায়তারায় ব্যাস্ত!!
ব্যাপারটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।

আমার থুতনি ধরে উপরে তুলে ধরলো।
— আচ্ছা আমার মত ইয়াং, ড্যাশিং, হ্যান্ডসাম, স্মার্ট, সুদর্শন একটা পুরুষ সামনে থাকতেও তুমি কি সব ভেবে যাও?
তোমারতো ফুল কনসেন্ট্রেশন আমার দিকে থাকা উচিৎ।
নির্লিপ্ত গলায় বলেই ফেললাম,
— কি হবে এতো কনসেন্ট্রেশন ক্রিয়েট করে? যে আমার নয় বেকার তার জন্য কষ্ট পেয়ে কি হবে। যার চোখে কোন ভালবাসার আধাঁর কোনদিন আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। আজ কি তবে ধরে নিবো সেও আমায় ভালোবাসে…??

ইমন চমকে উঠে আমাকে ছেড়ে দিলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেলাম।
ও বিছানা থেকে নেমে পড়লো।
নাহ এইবার ওকে ছেড়ে দিতে আমি পারবোনা।
এতটা উদাসীনতা আমাকে ব্যাকুল করে দিচ্ছে।
বুক ফেটে চিৎকার আসছে কিন্তু পারছিনা।
প্রশ্নটা ছুড়েই দিলাম,
— কি ভয় পেলে?
কিছুক্ষন চুপ থেকে আমার দিকে তাকালো,
— আজব!! ভয় কেন পাবো? তাছাড়া আমি ভালবাসায় বিশ্বাসী নই। ভালবাসা বাসি বিষয়গুলা আমার মাথার উপর দিয়ে যায়। ফার্দার এই ভালবাসা বাসি বিষয়ে কোন কথা তুমি আমাকে বলবে নাহ। আর হ্যা তুমি আমার স্ত্রী, সেই হিসেবে তোমার প্রতি আমার সমস্ত দায়িত্ব, কর্তব্য কে তুমি ভালবাসা হিসেবে আখ্যায়িত করলে করতে পারো সেটা একান্তই তোমার ব্যাক্তিগত ইচ্ছে। আমি তোমাকে যেহেতু বিয়ে করেছি সেহেতু আমার সবটুকু দিয়ে তোমাকে সুখী করার চেষ্টা করবো।

ইমনের কথাগুলো আমার কান ভারী করে ফেলছে। নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে। আজকে রাতটা হয়তবা চাওয়া পাওয়ার হিসেব নিকেশ করতেই কেটে যাবে। যোগ হবে আরো একটি নির্ঘুম রাত।

আমার নিরবতা ভাঙ্গে ইমন যখন আমার পাশে এসে আবার হাত ধরতে আসে।
আমি হাত ছাড়িয়ে দেই।
ও হতবিহ্বল হয়ে মুখপানে তাকিয়ে থাকে।

— আমার ঘুম পাচ্ছে। সকালে টিউশন আছে।
আমি গুটিসুটি মেরে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে পড়লাম।

নির্ঘুম রাত আর নীরব অশ্রুজলের সাক্ষী হলো কালকের সেই রাত। আমি ওইটা আর মনে করতে চাইনা। ভুলে যেতে চাই চিরতরে।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে সব কিছু আবার ফ্ল্যাশ ব্যাক হচ্ছিলো।
খুব মাথা ক্যানক্যান করিছিলো তাই নিজেই চা বানিয়ে এনেছি।
মামনীর হাতের স্পর্শে আমি-বর্তমান এ ফিরে আসি।

— মা আমার এতো সকালে উঠেছে কেন?
— আসলে আমাকে না বাসায় যেতে হবে। ৭:৩০ একটা টিউশন আছে।

— আদৃতা মা চেহারাটা ওমন লাগছে কেন? ভালো ঘুম হয়নি।
— নাহ ঘুমিয়েছিতো। মাত্র ঘুম থেকে উঠলাম তো তাই ওমন লাগছে।
— মা কবে যে তোকে একেবারে বাসায় আনতে পারবো। কিছুই ভালোলাগেনারে একা একা।
আমি নিচে তাকাই আছি। কি বলবো বুঝতে পারছি না।
বাবা এসে সোফায় বসে পড়ে।
— গুড মর্নিং মামনী, এত চুপচাপ কেন?
— গুড মর্নিং বাবা। না আমিতো ঠিকি আছি। বাবা আপনার কথা বলুন শরীর ঠিক আছেতো।
— এইতো আলহামদুলিল্লাহ। তোমাদের সবার ভালবাসা দোয়ায় আবার ফিরে এলাম।

আমি মুচকি হাসি দিয়ে বাবার দিকে তাকালাম,
— বাবা আমাকে যে বাসায় দিয়াসতে হবে।
— ব্রেকফাস্ট করে তারপর তোমার বাবা দিয়াসবে।
— নাহ মামনী প্লিজ আমি ব্রেকফাস্ট করতে পারবো না। সকালে খেতে আমার ভালোলাগেনা তাছাড়া টিউশন লেট হয়ে যাবে। আমার ইম্পোর্টেন্ট লেসন আজকে..
— আচ্ছা ঠিক আছে বাবা। আমি তোমাকে দিয়াসছি। ইমনকে বলেছো?
— হুম বলেছি। ও এখন ঘুমুচ্ছে। আপাতত ঘুমাক রাতে অনেক রাত অব্দি পড়েছেতো তাই।
(চলবে)