তোমাতে আমাতে ২ পর্ব-০৩

0
672

#তোমাতে_আমাতে ২
লেখা আশিকা জামান
পর্ব ০৩

ডাইনিং থেকে কাঁটাচামচ আর প্লেটের টুংটাং শব্দ আসছে। সবাই আমাকে ছাড়াই খেতে বসেছে! কথাটা মাথায় আসতেই এক বুক কষ্ট নিয়ে ইমনের দিকে তাকাই। সবার আর কি দোষ বহুবার ডেকে গেছে বাট উই আর লেট গাই।
সব ইমইন্যার জন্য। সারারাত জ্বালিয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। ঘুমাবিতো বেশ একাই ঘুমা। আমাকে লতার মত জড়িয়ে ঘুমানোর কি খুব দরকার ছিলো। শত চেষ্টাতেও যে ছাড়াতে পারছিনা। নাহ! এইবার ঘর থেকে বের হতেই হবে। কালকে থেকে ঢুকে বসে আছে সবাই কি ভাবছে কে জানে?
আমি একদম ওর কানের কাছে গিয়ে সজোরে চিৎকার দিতেই ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে।
আমি ওর দিকে মুচকি হাসি দিয়ে তাকাই।
ইমন ভ্রুকুটি করে বললো,
” আর ইউ ম্যাড?
আমার এক্ষুণি ডক্তরের এপোয়েন্ট নিতে হবে। কি গলারে বাবা! মেবি পর্দা ফেটে গেছে।
উফ্ এভাবে কেউ চিল্লায়।”
” বেশ করেছি। আগে উঠে ফ্রেস হও তারপর ডাক্তার ফাক্তার যেখানে খুশি সেখানে যাও। নো প্রবলেম।”
কথাটা বলতেই ইমন বিস্মিত হয়ে তাকায়। আমি ওর হাত ধরে বিছানা থেকে ঠ্যালে নামাই। তারপর ইমন রেগে মেগে বিড়বিড় করতে করতে ওয়াশরুমে ঢুকে।
মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে যেইনা বসতে যাবো তখনি ওয়াশরুম থেকে ওর চিৎকার ভেসে আসে।
” এই কি হয়েছে। চিৎকার করছো কেন?”

আবার ওয়াশরুম থেকে চিৎকার ভেসে এলো,
” টাওয়াল কোথায়? এই প্লিজ টাওয়ালটা দাও।”
আমি টাওয়ালটা খুঁজে বের করে দরজায় নক করি আনমনে। ও দরজা খুলতেই কিছু বোঝার আগেই নিজেকে ওয়াশরুমে আবিষ্কার করি।
ওকে দেখেতো আমার চোখ ছানাবড়া। দিব্যি টাওয়াল পড়ে মাথায় একগাদা শ্যাম্পু দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমনের টাওয়াল খুঁজে না পাওয়ার রহস্য এখন উদঘাটিত হলো।
” এইভাবে কেউ টেনে আনে? যদি পড়ে যেতাম।”
” বেশ হতো কোলে নিয়ে ঘুরতাম। এক্ষেত্রেতো তোমারি ভালো হবে। খালি সারাদিন কোলে চড়বা। ”
ইমন দাতবের করে হাসতে লাগলো।
” এই ছাড় প্লিজ! ঢং রাখো। তখন কত কোলে নিয় ঘুরতে জানা আছে।”
” উঁহু ছাড়ার জন্যতো ধরিনি। আমার কান বধির করার শাস্তিতো সুদে আসলে ফেরত দিব।”
” তোমার কান বধির! দাড়াও এইবার সত্যি সত্যি বধির করে দিব। ”
আমি চিৎকার করার জন্য মুখ খুলতেই ইমন আমার ঠোট চেপে ধরলো। ঠোটের উপর অশ্লীষ্ট দুটি ঠোট চেপে বসতেই আমার হাত পা অবশ হতে থাকলো। আমি সজোরে ওর পিঠ খামচে ধরলাম। আমার শরীর ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। হবারই কথা যেভাবে ভেজা শরীরে আমকে জড়িয়ে ধরে আছে।
একটু একটু করে মনে হচ্ছে সময় যেন থমকে গেছে। এভাবেই যেন অনন্তকাল চলতে থাকে। কত সময় পার হয়েছে তা এইমুহুর্তে আমাদের চিন্তার বিষয় না হলেও বাকী সবার অলরেডি মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে।
একেকবার দরজার ধাক্কানোর শব্দ আমার কাছ বাজ পড়ার মতো মনে হচ্ছে।
অগত্যা ইমনকে ধাক্কা দিয়ে সরানো ছাড়া আর কোন উপায় ছিলোনা। জানি ইমন খুব রেগে যাবে?

” এটা কি হলো?
হমধাক্কা দিলে কেন? সসবসময়তো খালি খ্যাচখ্যাচ করো। আমি কাছে নেই! এই হ্যাভ এনাফ টাইম বাট আমি রোমান্সের ধারে কাছেও নেই।
আর এখন কি হলো? তুমি নিজে আমাকে সরিয়ে দিচ্ছো। ধুর ভাল্লাগেনা । ”
আমি ওর কপালে একটু টোকা মেরে বললাম,
” তুমি সত্যি বধির হয়ে গেছো। হিয়ারিং পাওয়ার দিনদিন সত্যিই কমে যাচ্ছে। ”
আমি ওয়াশরুমের কল বন্ধ করে দিয়ে আবার বলি,
” এবার শুনতে পাচ্ছো?”

ও কপাল ভাজ করে আমার দিকে তাকায়,
” এই তোমার বাড়ীর সবার কি মাথা খারাপ হইছে। মেয়ের জামাই আর মেয়ে রুমে আছে তাও দরজা ধাক্কাতেই আছে। উফ এরা বুঝেনা কেন, কত রকমের প্রাইভেট মোমেন্ট ক্রিয়েট হতে পারে?”
” সারা সন্ধ্যা থেকে ফুল নাইট কাটিয়ে সকাল ১১ টা পর্যন্ত একটু পর পর তোমার প্রাইভেট মোমেন্টের প্রয়োজন পড়বে ওটাতো সবার বুঝতে হবে। ইনফ্যাক্ট সবারতো চিন্তা হয়। এটা একটা বিয়েবাড়ি ইউ হ্যাভ টু আন্ডারস্টোড!”
” যাও সব বুঝছি। দরজা খোল।”
” আমি কেন খুলবো। এই ভেজা শাড়ী পড়ে যাবো? মানসম্মান থাকবে?”
” আচ্ছা তোমার যেতে হবেনা। এবারের মত মানসম্মান রক্ষা হলেই হয়।”
ইমন গটগট করে দরজা খোলার জন্য বের হতেই আমার খেয়াল হয় ও তোয়ালে পড়ে আছে।
আমি উদ্ভান্তের মত ওয়াশরুম থেকে বের হই।
ততক্ষণে বেকুবটা ঠিক দরজা হা করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার সব কাজিন, ভাবীরা একে অন্যের দিকে চোখ টাটাতে টাটাতে রুমে ঢুকে। ওদের দুষ্টুমি ভরা হাসিতে আমি হাজার ভোল্টের শক খেয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। ইনফ্যাক্ট পালানোর পথ পেলে আমি ঠিক পালাতাম।
” কি হয়েছে? সবাই এভাবে হাসছেন কেন? এমনিতেই সাত সকাল এমনভাবে দরজায় ধাক্কাচ্ছেন যেন ডাকাত পড়েছে। ঠিক এই কারণেই শ্বশুরবাড়ী আসতে ইচ্ছে হয়না। অদ্ভুত কোন প্রাইভেসি নেই! হুয়াই?”
ইমন দাতমুখ খিচিয়ে কথাগুলো বললো। আমি অবাক হয়ে রইলাম। ও ঠিক এইভাবে কথা বলছে কেন? আমার মাথায় কিছুই ঢুকছেনা।
ইমনের কথায় বাকীসবার ব্যাবহারের খুব পপরিবর্তন হলোনা।
আমার কাজিন স্মিতা গালে আংগুল ঠেকিয়ে বললো,
” জিজু, ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন এখন কিন্তু মোটেও সাতসকাল নয়। অলমোস্ট সাড়ে এগারো বাজতেছে। এই দেখুন আমাদের বলেছেন সে বলেইছেন অন্য কাউকে আবার ভুলেও এই কথা বলবেন না।”

তিথি ভাবী হেসে হেসে বললো,
” ই যে ননদের স্বামী। আপনি সেই এসে থেকে মেয়েটাকে বগলদাবা করে নিয়েছেন এবারতো আমাদের কাছে ছাড়তে হয়।”
• ” সে যেখানে খুশি নিননা। বাধা দিয়েছে কে?”
আমাদের ফ্যামিলির সবচেয়ে পিচ্চি তিশা একটুপর পরই ফ্যাচফ্যাচ করে হাসছে। আমারতো ভারী বিরক্ত লাগছে।
এরপরেতো ইমনের দিকে তাকিয়ে বলেই দিলো,
” জিজু, তোয়ালে পড়েছ কেন?
তুমি কোন ড্রেস আনোনি? আর তোমরা দুজনেই একসাথে ভিজেছো কেন? আপু তোমার শাড়ীর অর্ধেকটাইতো ভেজা?”
তিশার কথা শুনে ইমন তাড়াহুড়ো করে নিজের দিকে তাকিয়ে বিষম খায়।
সবাই আবার মহাউৎসাহে হাসতে লাগলো। মনে হচ্ছে তিশা যেন হাসির আগুনে ঘি ঢেলে ওটাকে আরো উসকে দিলো।
” তিশা, তোমার আপু আর জিজু একচুয়ালি জলকেলি খেলছিলো। তাই অমন ভিজে গেছে। ব্যাপার নাহ্।”

তিথি ভাবীর সুক্ষ্ম খোঁচা তো এবার বিরক্ত লাগছে।
” এই তোমরা এখনো বিয়ের পাচ বছর পরেও এমন নিউলি মেরিড কাপলদের মত বিহেভিয়ার দেএখাচ্ছো কিভাবে? এত প্রেম এখনো থাকে কি করে? বুঝিনা বাপু?”
রিনি ভাবি এই প্রথম এই টাইপের কথা বলছে? কিন্তু কেন? সবার নিশ্চয় জ্বলছে।
” ওহ তাইতো এত প্রেম কিভাবে থাকে আসুন শিখাই। এক দিন আমার কাছে সময় করে একা একা আসবেন ট্রাস্ট মি শিখাই দিব। তবে এখন আসুন জলকেলি খেলি। একা একা বউ এর সাথে খেলতে মোটেও ভালো লাগছে না। ধুর শালিকা আর ভাবীরা না থাকলে কি খেলা জমে?”
আমি বিস্মিত হয়ে ইমনের দিকে তাকাই। ও দৌড়ে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে পানির মগ নিয়ে এসে সবার উপর ছিটিয়ে দিতেই এক লাফে সবাই দৌড়।
” কি দুষ্টু জামাইরে! ”
ওদের এই কথা কানে আসতেই আমি হি হি করে হাসতে লাগলাম।

” এই একদম হাসবা না? সব কয়টাকেতো বিদেয় করলাম তবে তোমার রক্ষে নাই।”
ইমন আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বললো।
” আমি আবার কি করলাম?”
” কি করলে মানে? আমি তোয়ালে পড়ে আছি এটা আগে কেন বললেনা?”
” বলতে চেয়েছিলাম তার আগেইতো তুমি হাসপাতাল খুলে দাঁড়িয়ে আছো।
নিজে কি পড়ে আছো নিজের খেয়াল নেই?”
” না নেই। তুমি সামনে মানে সব কিছু গুলিয়ে ঘেটে ঘ। এটাকি আজো তোমাকে মুখে বলতে হবে। বুঝোনা তুমি?”

” এই না আমি কিছু বুঝিনা। কিছু বুঝিনা।”
” আমি বুঝাচ্ছি। জাস্ট ওয়েট।”
” ইমন ভাল হচ্ছে না। আরে বিছানা ভিজে যাবেতো। সবাই ডাকছেতো।
উহু দরজা খোলাতো।”
ইমন কিছু না বলেই দরজা লাগাতে যায়। আমার প্রচণ্ড লজ্জা পাচ্ছে। আমারতো লজ্জা পাওয়ার কথা না। তবে পাচ্ছে কেন?
চলবে…