তোমাতে_আমাতে পার্ট ৪+৫

0
1396

#তোমাতে_আমাতে
পার্ট ৪+৫
লেখা আশিকা জামান

যত দেখছি তত যেন মোহে জড়িয়ে পড়ছি। ওর দিক থেকে চোখ ফেরানো দায় হয়ে যাচ্ছে। আমি একটু একটু করে ওর দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছি। একটু বাহিরে গেছে এটাও আমার কেন যে সহ্য হচ্ছেনা। আর কেন যে ওকে ছাড়া ভালো লাগছে না বুঝতে পারছি না। আচ্ছা সদ্য বিয়ে করা বউকে ফেলে কেউ এইভাবে বাহিরে যায়? আচ্ছা ও কি আমার মত করেই আমাকে নিয়ে ভাবছে? কি জানি বাপু ওকেতো আমি বুঝতেই পারছি না।
নিজের মনে নিজেই হেসে উঠছি…
খেয়ালে বেখেয়ালে..
হঠাৎ করে দরজা ধাক্কানোর শব্দ হলো..
দুই তিনবার শব্দ হতেই আমার খেয়াল হলো।
আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি ইমন মুচকি হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি একটা মুচকি হাসি দিয়ে নিচে তাকালাম।
— তুমি শাড়ী কখন পড়লে?
— ওই পড়েছিলাম একসময়।
— হুম ভাবছি পিচ্চিটা হঠাৎ করে বড় হয়ে গেল কি করে।
সব এই শাড়ীর ক্রেডিট..
— মোটেও আমি পিচ্চি নই। আমি সবকিছুই বুঝি এবং যথেষ্ট ম্যাচিউর.

— ওহ মা তাই সব বোঝ! তাহলেতো খুব সমস্যা..
আচ্ছা তুমি বুড়ী কেমন.
— আমি আদৃতা…
আমাকে এই নামে ডাকলেই খুশি হবো।
— তোমার নামটা নাহ বড্ড কঠিন। আচ্ছা আদি ডাকলে কি খুব বেশি সমস্যা হবে?
ওর মুখে এই আদি ডাকটা শুনে আমার বুকে কাপন শুরু হয়ে গেছে। আচ্ছা ও আমাকে সবার সামনে আদি বলে ডাকলেতো আমি লজ্জায় শেষ হয়ে যাবো। এটা কি ও বুঝতে পারছেনা! নাকি চাইছেনা?
আমার চোখের সামনে একটা তুড়ি বাজিয়ে আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় ইমন,
— কি হলো ম্যাম? কি ভাবছো?
বলেই হি হি করে একটা হাসি দিলো।
ওয়াও কি সুন্দর হাসি, কারো হাসি এত সুন্দর হতে পারে। আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
— কিছুনা। এই আপনি একটু উলটো ঘুরুনতো??
— কেন??
— আহা ঘুরোন নাহ..
ইমন আর কিছু না বলে উলটো ঘুরলো।
— এমা আপনার শার্টেতো কাদা লেগে আছে।
— কই কই দেখিতো..?
আমি ওর শার্ট ধরে ওকে দেখাতে লাগলাম। আর ও পিছন দিক থেকে হাত নিয়ে ওই কাদাযুক্ত স্থান ধরতে গিয়ে খপ করে আমার হাত ধরে ফেলে।
তারপর কিছুক্ষন নিশ্চুপ। অদ্ভুত রকম ভালোলাগা খেলে যাচ্ছে আমার শরীর জুড়ে। আচ্ছা ও কি এটা বুঝতে পারছে?
আমার হাত সরিয়ে দিয়েই একে একে শার্ট এর বোতাম খুলতে লাগলো।
ওর উন্মুক্ত খোলা বুক আমাকে ঘোরের মাঝে ফেলে দিছে। এইরকম খালি গায়ে কোন পুরুষ কে দেখেতো আগে আমার এমন অনুভুতি জাগেনি। ফর্সা বুকে লোমগুলো চিকচিক করছে। আর মাসেল দেখেতো আমার চক্ষু সরিয়ে রাখা দায় হয়ে গেছে। কেমন লজ্জা লাগছে তাকিয়ে থাকতে আবার না তাকালেও কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। বুকের কাঁপুনিটা বেড়ে গেছে। ইমন মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করে উপরের দিকে উঠাতে লাগলো। কপালটা অনেক প্রশস্ত চুল দিয়ে ঢেকে থাকার জন্য ছোট মনে হয়।
— আদি, এই শার্টটা কোথায় রাখবো?
— আমাকে দিন আমি রেখে দিচ্ছি।
শার্টটা ইমনের থেকে নিয়ে লন্ড্রি বক্স এ রেখে এলাম।
তখনি ঠাই খালি গায়ে বসে আছে ও।
আমি ইমনের ব্যাগ থেকে একটা হুয়াইট টি শার্ট বের করে ওকে পড়তে বললাম।
ইমন ওইটা হাতে নিয়ে ঠিক আগের মতই রিলাক্স মুড়ে বসে থাকলো।
— আচ্ছা আপনি ফ্রেশ হচ্ছেন না কেন?
খিদা লাগেনি?
— হুম আসছি। তুমি ডিনার করেছো??
— নাহ একসাথে করবো।
ইমন ফ্রেশ হতে গেছে। আমি ডাইনিং এ গিয়ে দেখি মা খাবার রেডি করছে।
— মা আমি তোমাকে হেল্প করবো?
— তেমন কিছু করা লাগবে না প্লেটগুলো নিয়ায়।
আমি প্লেটগুলো কিচেন থেকে এনে টেবিলে সাজাতে লাগলাম। বাবা চেয়ার টান দিয়ে বসে পড়লো। বাবার সাথে এই একটা বার টাইম পাই একসাথে খাওয়ার। তাই এইটা কখনোই মিস করতে চাই না।
— মামনী ইমন কোথায়? ওকে আসতে বললে নাহ..
— বাবা ওইতো আসছে।
ইমন এসেই চেয়ার টানতে টানতে বসে যায় । বাবার দিকে তাকায় অদ্ভুত সুন্দর নীল চোখ দিয়ে,
— স্লামালেকুম বাবা, ভালো আছেন?
— এইতো বাবা আলহামদুলিল্লাহ। তোমাকে আমি একদম সময় দিতে পারছি দেখতেইতো পারছো।কোন অসুবিধা হচ্ছে নাতো বাবা?
— নাহ সবি তো ঠিকি আছে । মা, আদৃতা , ভাইয়া এরা আমার যথেষ্ট খেয়াল রাখছে। আর প্লিজ আমাকে বাড়ীর ছেলে ভাবলে বেশী খুশি হবো।
বলেই একটা মুচকি হাসি দিলো।
— দেখেছো কেমন সুন্দর কথা বলে ছেলে আমার। আল্লাহ তোমার সমস্ত ইচ্ছা পুরণ করোক বাবা। আদৃতা দেখে শিখো কিছু..??
জানতাম মায়ের মুখ থেকে এই টাইপের কথা ছাড়া ভালো কিছু আশা করাটাই দায়। সবেতে কথা শুনাতে পারলেই শান্তি পায়।
আমি নিশ্চুপ প্লেট নিয়ে বসে আছি। ওয়াও সবিতো আমার প্রছন্দের ডিশ ফ্রাইড রাইস, রোস্ট, চিকড়ি মাছ, কাবাবা উফ আবার মাংসের এ একটা কারী, সাথে আবার চাটনি!!
মা এতো কিছু করেছে কেন? আমরাতো রাতে এত রিচ ফুড খাই না । ধুর আগেতো খেয়ে নেই।
— আদি আর ইউ ওকে? এমন চুপ মেরে গেলে কেন? আর প্লেটে খাবার নিয়েতো বসে আছো কি ভাবছো?
— নাহ মানে..?
আমি বেকুবের মত ইমনের দিকে তাকালাম।আর এই ছেলে আমাকে কি ডাকলো হায় সর্বনাশ আদি!!
মা আর বাবা দুইজনেই মুচকি মুচকি হাসছে।
নির্ঘাত এই নাম শুনে..?
হায় আল্লাহ আমার খাওয়া কেন, বসে থাকতেই লজ্জা লাগছে। কান গরম হয়ে যাচ্ছে।
যাক টপিক চেঞ্জ করা দরকার।
আমি জানি ভাইয়া ইশিতা আপুর সাথে ডিনারে গেছে। ইশিতা আপু হচ্ছে আমার ভাইয়ের ওয়ান এন্ড অনলি জি এফ। যাই হোক ও আমাকে বলেই গেছে তাও আমি মার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলাম,
— মা, ভাইয়াকে দেখছি না কেন?
— আমাকে বলেছে লেট হবে। কোথায় গেছে আমি জানিনা?
— ওহ আচ্ছা।
আমি চুপচাপ খেয়ে চলে আসলাম।
একটু পর ইমন দাত কেলাতে কেলাতে রুমে আসলো।
এসেই প্রশ্ন করতে লাগলো,
— আদি তুমি এত কি ভাবো? আমি বুঝিনা। আর হ্যা ঠিক করেতো খাও ও না?
— কিছু না।
বলেই চুপ করে গেলাম।
তারপর আবার বললাম গাল ফুলিয়ে,
— প্লিজ আপনি সবার সামনে এই নামে ডাকবেন না।
— কেন? প্রছন্দ হয় নাই?
— দেখছেন সবাই কেমন মুখ টিপে হাসছিলো । আমার লজ্জা লাগে প্লিজ!
— ওহ মা তাই। তোমার লজ্জা আছে তাহলে?
রাগে আমার শরীর জ্বলে যাচ্ছে। এই ছেলে কি অসভ্যরে বাবা। এইটাকে এত ভালো মনে করাই আমার ভুল হইছে।
— আদি কি হলো?
এইভাবে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লে যে?
ধুর কোন কথাই বলবো না এর সাথে।
— কি হলো কথা বলবে না। ঘুমিয়ে গেছো?
জানো আমি না প্রচণ্ড গল্প করতে ভালোবাসি।চুপচাপ একদম থাকতে পারিনা। আমার তো আর ভাই বোন নেই তাই আমি আর মামনি একদম বন্ধুর মত গল্প করি। জানো মামনি না বড্ড একা বাবাই একদম সময় দিতে পারে না তবুও বাবাই এর প্রতি কোন অভিযোগ নেই। এক্টুও ভালবাসার খামতি নেই। আমার দেখা বেস্ট কাপল হচ্ছে মামনি আর বাবাই।
কি হলো এখনো রেগে আছো?
বলেই আমার কম্বল টেনে নিয়ে যেতে লাগলো আমিও উঠে কম্বল টানতে লাগলাম কিন্তু কিছুতেই ওর সাথে পেরে উঠলাম না। কি যেন হলো আমি কম্বলের সাথে পেচিয়ে নিচে পড়ে যেতে লাগলাম আর আমাকে ইমন দুই হাত দিয়ে ধরে বিছানায় তুলে ফেললো। আমিও তখন উপরে উঠার জন্য দুই হাত দিয়ে ওর কোমড় ঝাপটে ধরি। ইমন আর আমি খুব কাছাকাছি ও ওর দুই হাত দিয়ে এখনো আমাকে ধরে আছে। আমার শ্বাস প্রশ্বাস খুব দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। ইমনের ভারী নিঃশ্বাস আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। ওকে খুব আকড়ে ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে।
আমার গলায় কয়েকটি ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ইমন ঘোর লাগানো কন্ঠে বলতে লাগলো,
— আরেকটু হলেইতো পড়ে যেতে।
তখন কতটা ইনজিউর হতো ভেবে দেখেছো?
— নাহ, আমার বিশ্বাস ছিলো আপনি আমায় ধরবেন।
— তুমি একদিনেই আমাকে এতটা ট্রাস্ট করে ফেললে..??
— হুম প্রতিটা সম্পর্কের ভিত তৈরী হয় এই বিশ্বাস থেকে।
ইমন হো হো করে হেসে আমাকে ছেড়ে দিলো।
ওর এই হাসি আমার কাছে অদ্ভুত লাগছে।
— আদি তুমি না বড্ড ছেলে মানুষ!
— আপনি হাসলেন কেন?
আমি কি কোন হাসির কথা বলেছি।
— জানোতো সিরিয়াস মূহূর্তে আমি বরাবরের মতই হেসে ফেলি। তাছাড়া আমার কাছে ভালবাসার অর্থ হচ্ছে ত্যাগ, কর্তব্যবোধ, দায়িত্বশীলতা। তবে এটা তোমার বেলায় ও প্রযোজ্য। জানোতো আমার লাইফে বাবা আর মায়ের চাওয়ার মুল্য অনেক। আমি ওনাদের খুশির জন্য নিজের সমস্ত কিছু ত্যাগ করতে পারি।
আমি স্পষ্ট দেখলাম ইমনের নীল চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে । আমি বুঝতে পারছিনা এই মূহূর্তে আমার কি করা উচিৎ ।
— আদি অনেক রাত হয়েছে শুয়ে পড়ো।
আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ও শুয়ে পড়লো।

#পর্ব_৫

সকালের মিষ্টি আলোটা জানালার পর্দার
ফাক দিয়ে চোখে লাগছে।
তবে এই মূহূর্তে এই আলোটা অসহ্য লাগছে। আস্তে আস্তে চোখটা খোলার চেষ্টা করললাম। চোখ খুলতেই ওয়ালে ফ্রেমে বাধানো ভাইয়া আর আমার একসাথে তুলা সেই ছোটবেলার ছবিটার দিকে চোখ পড়ে গেল। আহা কত কিউট ছিলাম ছোটবেলায়!
ঘুম ভালো করে ভাঙ্গতেই খেয়াল হলো আমি আর ইমন খুব কাছাকাছি। আমার পায়ের উপর পা তুলে পেছন থেকে আমার কোমড় জড়িয়ে আছে । আমি ওর দিকে ঘুরে তাকালাম কিন্তু পা সোজা করতে পারছিলাম না।
হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু আমার চেষ্টাকে ব্যার্থ প্রমাণ করে দিয়ে আবার পিঠে হাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে গেল। আমি নিজেকে কিছুতেই ছাড়াতে পারছি না।
ওর নিঃশ্বাসের শব্দ আমার মাঝে সুপ্ত থাকা নারী সত্তাকে জাগিয়ে তুলছে। আমারো ওকে ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না। আমি আমার দুই হাত দিয়ে ওর টি শার্ট শক্ত করে খামচে ধরলাম।
ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগলাম ওর গলায়।
ওর বুকের মাঝে মিশে যেতে লাগলাম আস্তে আস্তে। ওর শরীর জুড়ে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ বিরাজ করছে আর আমার বুকের ভেতরটা অনবরত তোলপাড় করে দিচ্ছে। হঠাৎই ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো..
আমার অসহ্য লাগছে এটা ইমনের ফোনের রিংটোন।
ইমন ঘুমঘুম চোখে ফোন খুজতে লাগলো আর হঠাৎ ই আমার শরীরের উষ্ণ স্পর্শে ও চমকে উঠে। ঘোর লাগানো চোখে আমার দিকে তাকায়।ফোনটা বেজেই চলেছে ওইটা ধরে বেকার সময় নষ্ট করার মুড়ে হয়তবা ইমন এখন নেই।
আমাকে ছেড়ে দিয়ে সযত্নে বালিশে শোয়ায়। আমার কপালের চুলগুলো সরিয়ে একটা শক্ত করে চুমু খায় ইমন। আমার বুকের কাপুনিটা বেড়েই চলেছে। আমি আমার এক হাত দিয়ে ইমনের গলা জড়িয়ে ধরলাম। ইমনের নীল চোখে অদ্ভুত লাল আভা দেখা যাচ্ছে। এই মূহূর্তে ওর দৃষ্টি অদ্ভুত লাগছে। ওর চোখ মুখে খেলে যাওয়া অন্যরকম চাহিদার আভাস যে আমাকেও সাথে সাথে আলোড়িত করছে। আমি নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছি।
ইমন ওর ঠোট আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা ও কি করতে চাইছে।
আমি নিমিষেই চোখ বন্ধ করে ফেলে ঢোক গিলে আবার তাকালাম। হঠাৎ ফোনটা আবার বেজে উঠলো।
ইমন আমাকে সযত্নে ছেড়ে দিয়ে উঠে যেতে লাগলো। আমি আমার এক হাত দিয়ে ইমনের হাত টেনে ধরলাম।
ইমন আমার দিকে না তাকিয়েই বললো,
— সরি…
ফোনটা সাইড টেবিল থেকে নিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেল।
আমি জানিনা হঠাৎ করে ওর কি হলো?
ওকে বড় অচেনা মনে হয়।
কিছু ভালো লাগেনা..
জানিনা কেন দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
ইমনের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে ও হয়তবা এদিকেই আসছে। চোখের জল দেখতে পেলে কি ভাববে? তাড়াতাড়ি করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লাম। ফ্রেশ হয়ে এসে
দেখি ইমন শুয়ে আছে কপালে এক হাত দিয়ে। ওকে এত নিষ্পাপ লাগে কেন? ওর ওই মুখ দেখে যেন সারা জীবন এমনিভাবেই পাড় করা যাবে কোনরকম চাহিদা ছাড়াই। উফ এত ভালবাসতে কেন বাসতে ইচ্ছে করে?
ইমন কপাল থেকে হাত নামিয়ে আমার দিকে চোখ পড়তেই ও বুঝে ফেলে আমি ওর দিকেই তাকিয়ে আছি।
ও তাড়াতাড়ি করে বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমে চলে যাই।
আমি আমার ফোনটা হাতে বিয়ে দেখি মা ফোন করেছিলো ৫ বার। ফোন সাইলেন্ট থাকায় ধরতে পারিনি। তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়। মা আমাকে দেখেই বলে উঠলো,
— আদৃতা, তোমার শ্বশুর শাশুড়ি এসেছেন সেই কখন। আমিতো তোমাকে ফোন দিয়েছিলাম ধরলে নাতো?
— সাইলেন্ট ছিলো।
— আচ্ছা মাথায় কাপড় দাও।আর ওনাদের সামনে সালাম দিও। আসো এইবার..
মা আমাকে ড্রয়িংরুম এর দিকে নিয়ে যেতে যেতে প্রশ্ন করে,
— ইমন উঠেছে?
— হ্যা।
আমি ড্রয়িংরুম এ যেতে যেতেই আমার শ্বাশুড়ী আমাকে দেখেই বলে উঠলো,
— ওইতো আমার মা আসছে।
আমি ওনাদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেলাম।
কিন্তু শাশুড়ি মা আমাকে ধরে ফেললেন।
— থাক মা সালাম লাগবেনা। তুমি আমার বুকে আসো।
এটা বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমি আমার শ্বশুরকে সালাম করতে গেলে উনি আমাকে আগেই ধরে ফেলেন।
— মা আমার পিচ্চি মা। সালাম করা লাগবেনা আমি এমনিতেই তোমাদের জন্য দোয়া করবো। জীবনে খুব সুখী হবে তুমি। আমার পাশে এসে বসো।
আমাকে উনাদের মাঝখানে বসালো।
আমি উনাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করলাম,
— মামনি, বাবা ব্রেকফাস্ট করেছেন।
— এই যে তুমি আমাকে বাবা বলে ডাকলে আমার কলিজাটা জুড়িয়ে যাচ্ছে।
এইবার মরেও শান্তি।
আমি আমার শাশুড়ির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি উনার চোখ ছলছল করছে।
আমার খুব কান্না পাচ্ছে।
— বাবা প্লিজ এমন করে বলবেন না। আমার খুব খারাপ লাগছে। আপনি ঠিক সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।
আমি টপিক চেঞ্জ করার জন্য মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— মা তুমি এখনো খেতে দাও নাই কেন?
— আমি তো দিতেই চাইছিলাম। তোমরা না এলে খাবে না। কি আর করবো বলো।
একটুপর ভাইয়া আর ইমন আসে।
ইমন এসে চুপটি করে শাশুড়ি মায়ের পাশে বসে পড়ে। আমার দিকে একটুকুও তাকায় না।
— স্লামালেকুম আন্টি আংকেল ভালো আছেন।
— এইতো বাবা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।
তুমি ভালো আছো?
— হুম এইতো আলহামদুলিল্লাহ।
শাশুড়ি মা ভাইয়াকে বসতে বললো।
ভাইয়া এসে বাবার পাশে বসে পড়লো।
মামনি তখন আমার দিকে ঘুরে বলে,
— মা তুমি ইমনের পাশে গিয়ে বসোতো। দেখে একটু চক্ষু সার্থক করি।
সবাই একটা করে মুচকি হাসি দিলো। শুধু ইমনের মুখে হাসি নেই।
বাবাতো বলেই বসলো,
— কিরে ইমন, তোর শ্বশুরবাড়ী এলাম কিছুইতো বলছিস না।
— বাবা মাত্র ঘুম থেকে উঠলামতো। আর আমিতো কথা বলতামই । তোমরাতো বেশ গল্প করছো আমার আজকে শুনতেই ভালো লাগছে।
মামনী আদিখ্যেতা করে বলতে লাগলো,
— ভাবি দেখছেন আমার ছেলের কথা। আরে বাপ আমার কয়দিন পর বাচ্চার বাবা হবা এইবার ছেলেমানুষি টা ছাড়ো। আর ভাবী আমি কিন্তু এইসব বেয়াই বেয়াইন ডাকতে পারবোনা আগে যা ছিলাম তাই।
বাচ্চার বাবা হবা কথাটা শুনে আমি লজ্জায় লজ্জাবতী হয়ে যাচ্ছি।
বাবা ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকায়,
— যাও ইমনের পাশে বোস।
আমি ইমনের পাশে গিয়ে বসলাম। ওর দিকে আরেকদফা চোখাচোখি হলো।
আমি লজ্জায় নিচু হয়ে গেলাম কারণ সবার দৃষ্টি এখন আমাদের দিকে।
ব্রেকফাস্ট এরপর মামনী আর বাবাই ইমনকে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন। উনাদের আবার পরশুদিন সিঙ্গাপুর ফ্লাইট। সাথে ইমনদের কোম্পানির ম্যানেজার ও ওর ছোট মামা যাবেন। ওনারা চলে গেলে ইমন আবার এখানে এসে থাকবে।
আমার কেন জানি খুব খারাপ লাগছে।
নিজেকে সামলাতে পারছি না।।আমি দ্রুত রুমে গিয়ে দেখি ও ব্যাগ গুছাচ্ছে। আমি বিছানায় ওর পাশে গিয়ে বসি।
ইমন বিছানা থেকে উঠে পড়ে ব্যাগটা কাধে নিলো তারপর সাইড টেবিল থেকে ফোন, আর ওয়ালেট নিলো। ঘড়ি পড়তে পড়তে আমার দিকে তাকিয়ে বোললো,
— আদি কিছু বলবা? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলবা।
আমি মুখ মুছে ওর দিকে তাকালাম,
— কই নাতো।
— আচ্ছা আমি আপাতত চলে যাচ্ছি। ভালো করে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো।
( চলবে)