তোমাতে_আমাতে পার্ট ৬+৭

0
1337

#তোমাতে_আমাতে
লেখা আশিকা জামান
পার্ট ৬+৭

ইমন চলে যাবার পর বাসায় পৌছে ফোন করেছিলো। এরপর আর কথা হয়নি। আমি মাথা থেকে বিয়ের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে পড়াশোনায় মনযোগী হওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু একটু পর বুঝতে পারলাম আমার চেষ্টা ব্যার্থ। ইমন আমার মগজে ঢুকে গেছে এটাকে বের করা অসম্ভব।
পরেরদিন সকালে আমি ওকে ফোন করেছিলাম প্রথমে পিক করতে পারেনি। পরে ব্যাক করে বলেছিলো যে ও বিজি হস্পিটালে আছে পরে কথা বলবে। কিন্তু আমি সারাদিন অপেক্ষা করার পর রাতে ফোন করে বলে,
— আদি আমি সারাদিন অনেক বিজি ছিলাম। এখন বলো কিছু বলবা?
— নাহ, তেমন কিছু নাহ।
— আচ্ছা তুমি পড়া শেষ করে ঘুমিয়ে যাও।আর কালকে সকাল সকাল এসো। রাখছি বাই।
আমি চুপ করে ছিলাম। কিছুই বলছিলাম নাহ। আমার সব কিছু উল্টাপাল্টা লাগছে। কেমন যেন একটা এভোয়েড এর গন্ধ আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে আলোড়িত করছে। কিন্তু আমি যে ভালবাসার মোহে অন্ধ। সবকিছুর উর্ধে থেকে যে আমি ইমনকেই ভালবাসি তাই আমি নিশ্চুপ।
— কি হলো। কথা বলছোনা যে?
আমার কথা প্রছন্দ হয়নি। আমি সত্যিই ব্যাস্ত ছিলাম আর এখন খুব টায়ার্ড। একটা ফ্রেস ঘুম দরকার।
— নাহ তেমন কিছু না। আপনি ঘুমান আর আমিও এখন ঘুমাবো কেমন।
আমি ফোনটা কেটে দিলাম।
সুক্ষ্ম অভিমান সারা রাত আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
সকালে মায়ের চিৎকারে আমার ঘুম ভাংগে। আমি কচলাতে কচলাতে চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকাই,
— মা কি হয়েছে? আরেকটু ঘুমাতে দাও না।
— এই উঠ। কোন কথা না।
বলেই মা আমার হাত ধরে টেনে তুলতে লাগলো।
— তোর মনে নেই আজকে যে শ্বশুর বাড়ী যেতে হবে?
— কার শ্বশুরবাড়ি, কিসের শ্বশুরবাড়ি? ধুর কি উল্টো পালটা বলছো আমারতো বিয়েই হয়নি।
ভাইয়া রুমের সামনে দিয়েই যাচ্ছিলো আমার এই টাইপের কথা শুনে হাসতে হাসতে রুমে ঢুকে।
মা ও ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আবার হাসিতে ফেটে পড়ে।
ওদের হাসি আমার অসহ্য লাগছে। ধুর আমি কি এমন বলেছি যে এইভাবে হাসতে হবে।পরক্ষনেই মনে পড়ে গেল ছিঃ আমি এইটা কি বলমাম। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম।
— ইমন যদি শুনে তুই দুইদিন যেতে না যেতেই ওকে এইভাবে ভুলে গেছিস তাহলেতো
বেচারা শেষ হয়ে যাবে।
এইটা বলে ভাইয়া আবার হাসতে লাগলো।
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
— ওই বাড়ীতে গিয়ে আবার ভুলভাল কিছুই বলিস না। তাহলে আমরা লজ্জায় শেষ হয়ে যাবো।
আর শোন একেবারে রেডি হয়ে নিচে আসো। ব্রেকফাস্ট করেই বেরোবো ঠিক আছে। তোমার বাবা খুব আফসোস করে একদিনো তোমার সাথে ব্রেকফাস্ট করতে পারে না।
মা আর ভাইয়া চলে গেলে আমি আলমারি থেকে ড্রেস বের করতে লাগলাম। কিছুতেই প্রছন্দ করতে পারছিলাম। তারপর একটা হুয়াইট চিকেন জামা আর মেরুন চিকেন প্লাজো সাথে ব্ল্যাক কালারের ভিতর হুয়াইট, মেরুন, পার্পল কালার সুতোর কাজ করা ফুলকারী দোপাট্টা বের করলাম। এটা কেন জানি আজকে পড়তে ইচ্ছা হলো।
আমি একেবারে শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলাম। চুলগুলো হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিলাম। কোমড় ছাড়ানো লম্বা চুলে কি স্টাইল করবো সেটাই বুঝতে পারছিলাম। আমার আবার কোন যায়গায় গেলে সবচেয়ে বেশি টাইম লাগে এই হেয়ার স্টাইল নিয়ে। পরে চুলগুলো সামনে থেকে নিয়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে পিছনের গুলো ছেড়ে দিলাম। হালকা কাজল আর লাইনার দিয়ে চোখ একে নিলাম। ঠোটে হালকা লিপিস্টিক দিয়ে নিচে নেমে এলাম।
মাকেও দেখলাম রেডি হয়ে আমার জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করছে। আমার কিছুতেই খেতে ইচ্ছে করছে না। কোন যায়গায় গেলে বরাবরের মতই আমার খেতে ইচ্ছে করেনা। কিন্তু মায়ের জোড়াজোড়িতে অনলি ডিম টা খেয়ে নিলাম।
ভাইয়া আর বাবা রেডি হয়ে আসলে সবাই আমাদের গাড়িতে বসে রওয়ানা হলাম।
আমাদের বাসা থেকে ওদের বাসায় আসতে বড়জোর কুড়ি মিনিটের মত লাগলো। দারোয়ান গেট খুলতেই সালাম দিয়ে ভেতরে যেতে বললো। নয় তলা বাসাটার লিফটে আমরা দোতলায় উঠলাম। ভাইয়া কলিং বেল চাপ দিতেই কিছুক্ষন পর ইমন এসে গেট খুলে দিলো। ও একটা মেরুন টি শার্ট আর অফ হুয়াইট প্যান্ট পড়েছে।
আমাদের দেখেই সালাম দিয়ে ভেতরে বসতে বললো। সামনেই ড্রইং রুম সবাই বসে পড়লো। মামনি আর বাবাই এসে সবার কুশল জিজ্ঞাস করলো। আসতে অসুবিধা হলো কিনা এটাও জিজ্ঞাস করলো। আমার ওদের বাসাটা ভালোই লাগলো।
ইমন আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
— আদি আসো তোমাকে বাসাটা ঘুরে দেখাই।
আমি ওর কথা শুনে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম।
মামনি এটা বুঝে ফেলে। আমার দিকে তাকিয়েই বলে,
— যাও লজ্জা পেয়ো না । এটাতো তোমারই বাড়ী। আসলে তোমাকেতো এইভাবে আমি নিয়াসতে চাই নি। স্বপ্নটা অনেক বড় ছিলো আমার একমাত্র ছেলের বউ বলে কথা…
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
— মামনি প্লিজ কষ্ট পাবেন না। আমি সত্যি হ্যাপি আপনাদের মত মা বাবা পেয়ে আমার আর কিচ্ছু চাই না।
মামনী এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
— এইতো আমার লক্ষী মা। এবার তোমরা যাও আমরা বুড়ো বুড়িরা একটু নিজেদের মধ্যে কথা বলি।
— উহু বুডু বুড়ী না আপনারা আমার কাছে অলওয়েজ ইয়াং।প্লিজ এইগুলা আর বলবেন নাহ।
বাবাই আমার মাথায় হাত রেখে বলেন,
— আমি খুব খুশি তোমাকে ছেলের বউ করে পেয়ে। ইমন আমার বৌমাকে সবসময় হাসিখুশি রাখবি এটা তোর দায়িত্ব।
ইমন নিশ্চুপ ভাবে তার বাবার কথা শুনে। আমি বসা থেকে উঠে ইমনের পাশে গিয়ে দাড়ালে ও আমাকে ইশারা করে ওর সাথে যাওয়ার জন্য।
ও আমাকে ওর রুমে নিয়ে যায়। গিয়েই দেখি রুমের কি অবস্থা করে রেখেছে বিছানা এলোমেলো, বালিশ নিচে ফেলানো আরেকটা বালিশ বিছানার উপর কুকড়ানো বইগুলো এলো মেলোভাবে বিছানায় ছড়ানো ছিটানো। এক মূহূর্ত দেখেই আমার মাথা ঘুরানো শুরু করলো।
আমার দিকে তাকিয়ে ইমন বললো,
— দাঁড়িয়ে না থেকে বসো।
— কোথায় বসবো?
ইমন বিছানার চাদর টানতে লাগলো।
— আচ্ছা আপনি কি বিছানার সাথে অলওয়েজ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেন?
ও ভ্রুকুচকে আমার দিকে তাকালো।
— নাহ মানে বুঝি নাই।
— এইরকম এলোমেলো রুমে কেউ থাকতে পারে? আর আপনি বাহিরেতো খুবই স্মার্ট এইরকম এলোমেলো রুম দেখলে সব মেয়েই পেছনের দরজা দিয়ে পলায়ন করবে।
হো হো করে হেসে উঠলো ইমন।
— আচ্ছা তোমার কি এখন পালাতে ইচ্ছে হচ্ছে?
— নাহ, আমার এই ঘর এখন গুছাতে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা আপনি আমাকে হেল্প করুন।
বইগুলো গুছিয়ে ইমনের হাতে ধরিয়ে দিলাম।
— এই শোনেন এই বাজে অভ্যাসগুলো এইবার থেকে অফ রাখুন। এইগুলো স্টাডি রুমে রেখে আসুন।
হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো ও।
আমি ততক্ষনে পুরো রুম গুছিয়ে নিলাম।
— এইরে তুমিতো দেখি খুব কাজের। কেমন তাড়াতাড়ি ঘর গুছিয়ে ফেললে। নাহ বাবাই একটা কাজের কাজ করেছে।
আমি ইমনের দিকে লজ্জাজনক ভঙ্গিতে তাকালাম।
— আচ্ছা এতো লজ্জা পেতে হবেনা।
তোমার পড়াশোনার কি খবর?
পড়াশোনাতো সব আপনার চিন্তাই গোল্লায় গেছে। এটা আপনাকে বলি কেমনে?
— কি হলো? কথা বলোনা কেন? তুমি এত নিশ্চুপ থাকো কেন?
কালকে থেকে আমি তোমাকে পড়াবো।
— কিহ। এই নাহ..
— নাহ মানে কি? আমি যা বলেছি তাই হবে। আর এটা আমার একটা দায়িত্ব। আমি কিন্তু খুব কড়া টিচার। পড়া না পাড়লে কঠিন শাস্তি দিবো।
— কি শাস্তি দিবেন?
— ওইটা পরিস্থিতি বুঝে।
ইমন বাবা ও ইমন বাবা ডাকতে ডাকতে ইমনদের বাসার বুয়া রহিমা খালা রুমের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
ইমন দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— খালা ভিতরে আসো।
— নাহ আমি অহন ভিতরে যামু না, আফায় তোমাগো খাওতে ডাকছে। তাড়াতাড়ি আহো।
— তুমি খেয়েছো?
— হ খাইছি। আর পল্টু আর ওর বাপের লাইগ্যাও দিয়া দিছে।
— আচ্ছা তুমি যাও। আমরা আসিছি।
— আদি আসো খাওয়া দাওয়া করি খুব খুদা লাগছে।
আমি ইমনের পিছু পিছু নিচে গেলাম।
সবাই মিলে খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ করলাম।
এর মধ্যে ইমনের নানু বাড়ীর সবাই আসেন। সবার সাথেই পরিচয় করাই দিলো আমাকে।
বিকেল পর্যন্ত সবার সাথেই গল্প গুজব করা হলো।
এরপর সবাই মিলে এয়ারপোর্ট গেলাম। রাত নয়টার সময় মামনী আর বাবাই এর ফ্লাইট। খুব কষ্ট লাগছিলো ওনাদের জন্য। ইমনের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। বিদায় বেলায় বাবাই আমাকে আর ইমনকে ধরে কান্না শুরু করে দিলো। তারপর সবাই চোখ মুছে ওনাদের বিদায় দিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো ইমন আমার পাশে নেই। এতক্ষনতো এখানেই ছিলো। কিন্তু কোথায় গেল। আমি সবার ভীড় ঠেলে ইমনকে খুঁজতে লাগলাম।
ভাইয়া আমাকে চিল্লায় চিল্লায় ডাকতে থাকে,
— আদৃতা কোথায় যাচ্ছিস?
আমি কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই হাটতে লাগলাম।
কিছুদুর যাওয়ার পর দেখি ইমন ওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনের দিক দেখেই বুঝে গেলাম এ আমার ইমন।
আমি ওর পিঠে হাত রাখলাম।
ইমন আমার দিকে ঘোরে তাকাতেই দেখলাম ওর নীল চোখে অশ্রু।
এই প্রথম আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না । ওকে তুমি করে বলেই ফেললাম,
— ইমন, প্লিজ এইভাবে কেদো না। তুমি দেখো বাবা একদম সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। প্লিজ শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া কর। নিরাশ হইয়ো না।
আমি ওর দুই গালে দুই হাত দিয়ে টানতেছিলাম।
ইমন হঠাৎ ই আমাকে ওর দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার বাচ্চাদের মত কাঁদতে লাগলো।

#পার্ট_৭

কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম নাহ। ইমনকে এত করে বলার পরো ও আমাদের বাসায় আসলো না এটা আমি স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছিলাম না। মনের ভেতর একটা দ্বন্ধ বারবার উঁকিঝুঁকি করছিলো। কিন্তু প্রকাশ করতে পারছিলাম না। দুই দিন ইমনকে আর এবাসামুখো হতে দেখলাম না। আমিও আর যেচে আর আসতে বলিনি।
কলেজ থেকে ফিরে খুব টায়ার্ড লাগছিলো। শুয়েই থাকবো সারাটা বিকাল সেটাই ভেবেছিলাম। হঠাৎ ই কলিং বেল বেজে উঠলো। মা হয়তবা নামাজ পড়ছিলো তাই আমাকেই যেতে হলো।
দরজা খোলে আমি খুবি অবাক হলাম আমার স্কুলের বন্ধু ইশান আর ইরানকে দেখে। ইরান আর আমি এখনো একি কলেজে পড়ি। কিন্তু ইশান ক্লাস নাইনে থাকতে কানাড়া চলে যায় এরপর আর দেখা হয়নি।
আমাকে দেখেই ইশান তার সেই পূর্বের গগনবিদারী হাসি দিয়ে দিলো।
— কিরে ভিতরে আসতে বলবি না? নাকী ভুলেই গেছিস?
— আয় ভিতরে আয়।
আমি ড্রইংরুমের সোফাটা ইশারা করতেই ইশান আর ইরান বসে পড়লো। মুচকি হাসি দিয়ে ওদের দিকে তাকালাম।
— ধুর কি যে বলিস তোকে কি ভোলা সম্ভব। তোর সেই কানাডার চকলেট এর কথা কি এত সহজেই ভুলে যাবো।
— আদৃতা খালি ওই চক্লেটের জন্যই আমাকে মনে রাখছিস?
— উহু তোর ওই আম্মু বকা দিবে এই ডায়লগটা কি ভোলার মত?
আমি আর ইরান শব্দ করে হেসে ফেললাম।
ইশান লজ্জা পেয়ে নিচে তাকালো।
— আচ্ছা তুই লজ্জা পাচ্ছিস কেন? তুইতো স্কুলে সবার ক্রাশ ছিলি। তোর জন্য তো সব মেয়েই একদম ফিদা ছিলো।
ইরান আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো,

— দেখ ওরকম চকলেট সবাইকে গিফেট করলে আমিও সবার ক্রাশ হইতাম। এইটা মোটেও ওর ক্রেডিট না।
— আচ্ছা বাদ দে? তোর খবর বল? বিয়েটা তবেই করেই ফেললি?
— হুম করেই ফেললাম।
তোর কি খবর কানাডিয়ান মেয়ে কিছু পটাতে পারলি?
— নাহ তোরাই পাত্তা দিলি না আবার কানাডিয়ান মেয়ে?
— ওই একটা কথা জানিস না, দেশের ফকির দেশে ভিক্ষা পায়না।
এই কে এসেছে? কার সাথে কথা বলছিস?
মায়ের ডাকে পিছন ফিরে তাকাই।
— ওমা, ইশান নাহ! কত বড় হয়ে গেছো? কবে আসছো? তোমার মা কেমন আছে?
— আসসালামু আলাইকুম আন্টি। এইতো এক সপ্তাহ আগে এসেছি। আম্মু ভালোই আছে । আপনি বাসায় যাবেন কিন্তু আম্মু খুব খুশি হবে। ইনফ্যাক্ট আম্মু আমাকে বলেও দিছে আপনাকে বাসায় যাওয়ার কথা বলতে।
— আল্লাহ কতদিনপর দেখলাম। তোমার আম্মু আর আমি যে কত ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলাম তা আর কি বলবো। আমারতো ইলার সাথে ১৫ দিন আগেও কথা হলো তখনতো ও বললো না দেশে আসার কথা।
— ওহ আসলে হূট করেই আসা হয়েছে।
— আন্টি বসে কথা বলেন। দাঁড়িয়ে কেন?
আল্লাহ মা যদি এখন এখানে বসে তাহলে তার আর ইলা আন্টির গপ্পো করতে করতে আমাদের তিনজনের মাথা খারাপ করে দিবে। উফ আল্লাহ মা যেন না বসে।
– না বসবো না, আমি কিচেনে যাই তোমরা কথা বলো।
উফ্ বাচা গেল।
ইরান আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলেই ফেললো,
— এই তোর ডাক্তারবাবুকে তো এখনো দেখালি না?
আর ট্রিট টাও দিলি না। এইগুলা কিন্তু সুদেআসলে পরে নেওয়া হবে। যদি সময় মত পাওনা না পরিশোধ করিস?
— আহা, তুই যে নতুন জি এফ পাইলি ট্রিট কই?
মায়ের গলা শোনা গেল রান্নাঘর থেকে।
— মা ডাকছো?
— হ্যা বৃষ্টি আসতেছে আমার রুমের জালালাটা খোলা লাগাই দিয়াসো।
— হ্যা যাচ্ছি।
বলেই আমি উঠে চলে এলাম।
ব্যালকনিতে কিছু কাপড় ও ছিলো ওইগুলো তুলে গুছিয়ে রেখে তারপর আবার ড্রয়িংরুম এ গেলাম।
— এই তোদের বসিয়ে রাখলাম অনেক্ষন।
ইরান আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
— এই কে যেন আসলো ফরসা মতন লম্বা বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে। আমি দরজা খুলে দিলাম। তারপর আর কাউকে কিছু জিজ্ঞাস না করে সুড়সুড়ি ভিতরে ঢুকে গেল।

ইমন এসেছে? ওদের কথা শুনেতো তাই মনে হচ্ছে।
— এই তোরা একটু বোস। আমি দেখে আসছি।
উঠে দাড়াতেই দেখি মা নাস্তার ট্রে হাতে হাজীর।
ইশান মা কে দেখেই বলে উঠলো।
— আন্টি কষ্ট এত কিছু কেন আবার করতে গেলেন?
আমি ইশানের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— তুইতো মায়ের হাতের চিকেন ফ্রাইএর যে প্রশংসা করেছিস! মা কি এতদিন পর তোকে এটা না খাইয়ে রাখতে পারে। মায়ের একটা বেড হ্যাবিট কি জানিস তো কোন জীনিস প্রশংসা করলেই সেইটা বেশিবেশি করবে।
মা অগ্নি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
— মা হও তারপর বুঝবা।
— আন্টি আদৃতাতো একটু বজ্জাতের হাড্ডি এইটা আর নতুন করে কি বলবো।
আন্টি প্লিজ বসুন।
তিনজন মিলে এখন আমার গুষ্ঠি উদ্ধার করবে এটাই উপু্যুক্ত সময় কেটে পড়ার।
আমি দ্রুতগতিতে আমার রুমে গেলাম।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুমের চারপাশে তাকাতে লাগলাম।
খালি গায়ে বিছানায় শুয়ে আছে ইমন। কিন্তু শার্ট টা খুলে শুয়েছে কেন?এমা এতো ভেজা মনে হয়। ভেজা টাওয়েল, শার্ট বিছানার এক কোণে দলাইমলাই করে রেখেছে। আমি শার্ট আর টাওয়েল নিয়ে ব্যালকনিতে মেলতে গেলাম।
আমার পায়ের শব্দ পেয়ে ও বিছানায় উঠে বসেছে?
কি হাল বানিয়েছে চেহারার। মনে হয় ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করেনি।
আমাকে দেখেই ইমন মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো,
— খিদা লাগছে আফা চাইড্যা খাওন দ্যান ?
আমি শব্দ করে হেসে উঠলাম।
— হয় হয় গরীবেরা খাওন চাইলেই বড়লোকেরা এমন করেই হাসে।
মুচকি হাসি দিয়ে আবার আমার দিকে তাকালো।
— আচ্ছা শুনুন আমি খেতে দিব কিন্তু এখন যে কথাটা বলিলেন ওইটা উইথড্রো করতে হবে।
কোন কিছু বুঝার আগেই ও আমার হাত টান দিয়ে বিছানায় বসালো। ওর এইরকম একটা কান্ডের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। একজোড়া নীল চোখ আমার দিকে খুবই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি নীল চোখের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। আচ্ছা ও কি বুঝেনা আমি যে ওই চোখের দিকে তাকালে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারি না। এতটা মিস্ট্রিয়াস কারো চোখ কি করে হতে পারে?
আমার চোখের সামনে তুড়ি মেরে বলতে থাকে,
— ওই, কালকে পর্যন্ততো সব ঠিকি ছিলি। আজকে হঠাৎ আপনি হয়ে গেলাম। কাহিনী কি?
— কিছু না।
বলেই লজ্জা পেয়ে উঠতে লাগলাম কিন্তু হাতে টান পড়াতে পিছনে তাকালাম।
— আরে কই যাও।
— হাতটা ছাড়ুন?
— উহু এভাবে বললেতো ছাড়বোনা।
আমি হেসেই বললাম,
— আচ্ছা ছাড়।
ও পুনরায় হেসে হাতটা ছেড়ে দিলো।
আমি আলমারি থেকে একটা টি শার্ট বের করে ওকে দিলাম।
— এইটা তোমার কাছে কিভাবে আসলো। আমি বাসায় গিয়ে এই টি শার্ট এত খুঁজেছি।
— ওইদিন রেখে গিয়েছিলে।
আচ্ছা তুমি কারো সাথে কথা না বলে এইভাবে সরাসরি রুমে আসলে কেন?
— ওই ছেলে দুইটা কে?
— আমার ফ্রেন্ড। একটা ইশান ও কানাডা থাকে আমার সেই ছোটবেলার ফ্রেন্ড। অনেকদিন পর দেখা হলো। আরেকজন..
এইটুকু বলতেই ও আমাকে থামিয়ে দেয়।
— ব্যাস ব্যাস এত ডিটেইলস আমি শুনতে চাইনি।
যাও খাবার সার্ভ করো।
আমি আর কথা না বাড়িয়েই খাবার গরম করতে গেলাম।
খাবার বাটি টেবিলে রাখতেই দেখি মা আর ইমন এক সোফায় বসে ওদের সাথে কথা বলছে।
আমি ওর পাশে গিয়ে দাড়ালাম।
— টেবিলে আসো?
খাবার রেডি করাই আছে।
ইমন নিঃশব্দে উঠে এলো।
আমি ওর পিছু পিছু যেতে লাগলে ইরান আমাকে ডাক দেয়।
— এদিকে আয়। আমরা এক্ষুনি চলেই যাবো একটু বোস।
মা উঠে ইমনকে খাবার সার্ভ করতে গেল।
আমি ওদের সাথে কিছুক্ষন কথা বলে ওদের বিদায় করে দিয়ে।দরজা লাগিয়ে এসে দেখি ইমনের খাওয়া শেষ।
— এত তাড়াতাড়ি কি খাইলা? সবতো পড়েই রয়েছে।
ও কোন কথা না বলেই উঠে চলে গেল।
আমিও ওর পিছু পিছু রুমে গেলাম।
— আচ্ছা তোমার কি মুড অফ?
বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছে?
— বই বের করো?
— মানে?
— টেবিলে যাও।
আমি অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম।
ও আমার হাত ধরে চেয়ারে নিয়ে বসালো।
তারপর ও আরেকটা চেয়ার এনে বসে পড়লো।
তারপর হাইয়ার ম্যাথ বের করে আমাকে ম্যাট্রিক্স এর ম্যাথ কষতে বললো।
ওকে বড় অদ্ভুত লাগছে।
ও সামনে থাকায় আমার সবচেয়ে সোজা ম্যাথ এর ইকুয়েশন বার বার ভুল হতে লাগলো।
ইমন আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। ম্যাথ বই বন্ধ করে আমাকে ফিজিক্স বের করতে বললো।
নিউটনের প্রথম সূত্র ব্যাখ্যা করতে বললো আমি ভয়ে সেটাও উলটাপাল্টা লাগিয়ে দিলাম।
একে একে সব বই থেকে প্রশ্ন করা শুরু করলো আমি খেই হারিয়ে সব উল্টাপাল্টা লাগিয়ে দিলাম।
ও প্রচণ্ড রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠে বিছানায় বসে পড়লো।
আমি অসহায়ের মত ওর দিকে তাকালাম।
— আসলে আমার নাহ সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
— স্টুপিড এক্টাও কথা বলবা না। পড়াশোনা না করে খালি ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে আড্ডাবাজিতে মেতে থাকলেই প্লাস পাওয়া যায়না। কোন কিচ্ছু পারেনা এখন আবার সাফাই গাইতে আসছে।
— আমি মোটেও আড্ডাবাজী করিনা। না জেনে উলটা পালটা কিছু বলবা না।
— হুম সেতো আমি দেখতেই পেলাম। কলেজে গিয়ে আড্ডা দাও বেশ ভালো কথা এখন দেখি বাসায় বসেও আড্ডা দেওয়া হয়। ভেরী গুড..
— আশ্চর্য ওরা কি প্রতিদিন আসে নাকি?
— ভালো আমি কি খেলাম না খেলাম তার থেকে তোমার ওদের সাথে আড্ডা দেওয়াই বেশী ইম্পোর্টেন্ট হয়ে গেল।
আমি কান্নাজড়িত চোখে ওর দিকে তাকালাম।
— ইশান এর সাথে আমার কতদিন পর দেখা তুমি বুঝতে পারছো?
— প্লিজ আমি শুনতে চাইনা এত ডিটেইলস। টপিক চেঞ্জ।
না বলা অব্দি টেবিল থেকে উঠবে না।
ও উঠে এসে আমাকে কতগুলা পড়া দিয়ে ড্রয়িংরুম চলে গেল।
খুব কান্না পাচ্ছে। এই সামান্য কারনে ও আমাকে এতগুলা কথা শুনালো। কি এমন করেছি আমি নাহয় ও খাওয়ার সময় আমি ওদের সাথে দুটো কথাই বলেছি। তাতেই এত রাগ?
চলবে…