দুই হৃদয়ে সন্ধি পর্ব-০১

0
178

#দুই_হৃদয়ে_সন্ধি
#সুচনা_পর্ব
#Nova_Rahman

“এই শুনছো মেয়ে, এই মেয়ে শুনছো?”
হটাৎ পিছন থেকে কোনো এক পুরুষ নালী কন্ঠে এই শুনছো মেয়ে কথাটি কর্ণগোচরে পৌছাতেই তড়িৎ গতিতে পিছন ফিরে তাকাল তরু।

সাদা এপ্রোন, গলায় স্টেথোস্কোপ, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা পড়ে হাত দুটো ভাজ করে সটান হয়ে দাড়িয়ে আছে এক সুদর্শন পুরুষ। দেখতে পুরাই ওয়াও!
দুপুর বেলায় মেডিকেলের সামনে দিয়ে গেলে চারিপাশে শুধু ওয়াও আর ওয়াও দেখা যায়। আমি একটা দেখি বান্ধবী টান দিয়ে আরেকটা দেখিয়ে বলে এটা দেখ এটা আরও বেশি ওয়াও! আসলেই ওয়াও!

‘প্রতিদিন তো কত শত ওয়াও কে ইজি বাইক থেকে বান্ধবীদের সাথে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে মেরেছি। এদের মধ্যে কেউ কি আমাকে আজ rag দিতে আসছে। rag দিতে গিয়ে আমাকে তিন তলার ছাদ থেকে ফেলে দেবে কী? আজকেই কি আমার জীবনের শেষ দিন? আজুং ভাজুং ভাবতে ভাবতেই তরুর গলা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে।’

‘এতো শত ভাবনার মাঝেই ছেলেটি তরুর সামনে এসে দাড়ায়। তরু তাল সামলাতে না পেরে দু পা পিছিয়ে যায়। তরুকে পিছাতে দেখে রোদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।’ “কি হলো মেয়ে,পিছিয়ে যাচ্ছো কেনো? ভয় পাচ্ছো আমাকে?”
রোদের এহেন কথায় তরু ফুস করে উঠে। তেজী গলায় আঙ্গুল উচিয়ে রোদের সামনে গিয়ে দাড়ায় তরু। এই যে শুনুন, আমি না মোটেও আপনাকে ভয় পাচ্ছি না। আপনি যেভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন, মনে হলো এই বুঝি আপনি আমার উপরে পড়ে যাবেন। বলা তো যায় না কার মনে কি আছে। আজকালে মন তো মন না, মন তো সব নোং/রা/মি/তে ভরা।
একদমে কথাগুলো বলে জোরে জোরে শ্বাস নেই তরু। ভয়ে এমনিতেই গলা শুকিয়ে মরুভূমি ছিল। এখন তো মনে হচ্ছে গলা যে নয় যেনো চৈত্রের খরা। যতো যাই হোক, ভয় পেয়েছি এ কথা শিকার করা যাবে না। কিছুতেই না না না না!’

রোদ তার বন্ধুর থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে তরুর দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল বোতল কানা। নাও পানি খাও মেয়ে, একটু এনার্জি পাবে। চিৎকার চেচামেচি করার জন্য হলেও তোমার এনার্জি দরকার। রোদের এহেন কথায় তরু মাথায় হাত দিয়ে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে একটা চিৎকার দিল। আকস্মিক এমন চিৎকারে রোদ কেঁপে উঠলো।
ছিহ ছিছি ছি! ডাক্তার সাহেব রোজা রমজানের মাসে এসব কি বলেছেন আপনি। রোদ ভুলেই গিয়েছিল আজকে রোজা। রোদ মাথা চুলকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো কেউ আছে কি না। আশেপাশে কেউ নেই দেখে রোদ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো, না হলে আজকে মানসম্মানের বারোটা বেজে যেতো। রোদ এবার তরুর দিকে একটু ঝুঁকে দুই শব্দের একটি বাক্য উচ্চারণ করলো। সরি মেয়ে! আমি ভুলেই গিয়েছিল আজকে রোজা।

রোদকে নিজের এতো কাছে দেখে তরুর হার্ট যেনো বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। তরু এক হাত দিয়ে বুকের বা পাশটা চেপে ধরে রেখেছে। আরেক হাত দিয়ে বাজারে ব্যাগ। হাতটা ছেড়ে দিলেই বুঝি শরীর থেকে হার্টা বেরিয়ে আসবে। আর বাজারের ব্যাগটা ছেড়ে দিলে শাকসবজি মাটিতে পড়ে শহিদ হয়ে যাবে। আমার খেয়ে, আমার শরীরে থেকে, আজকে আমার সাথেই আমার হার্ট বেঈমানি করছে। তরুর দুঃখের যেনো শেষ নেই। না নেই নেই নেই।
তরুর এমন অবস্থা দেখে রোদ একটু পিছিয়ে যায়। সামান্য দুরত্ব রেখে সামনাসামনি দাড়ায়। রোদ এবার তরুর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। তাকাল দেখলো আর বললো খুব ভ’য়ং’ক’র মেয়ে তুমি, খুব ভ’য়ং’ক’র। তোমার এই ভ’য়ং’ক’র রূপ দেখে এক হার্টের ডাক্তারের হার্ট কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। শোন মেয়ে! তুমি নিজেও জাননা তুমি একজন ভয়ংকর অপরাধী। ভয়ংকর অপরাধীদের শাস্তি কি জানো? মুক্ত পৃথিবীর স্নিগ্ধ বাতাস সূর্যের আলোর তিক্ততা থেকে এক অন্ধকার কুঠরিতে বন্ধী থাকা। তোমাকে আমি এতো শাস্তি দিব না। তোমাকে আমি আমার মনের গহীনে বন্ধী করে রাখবো, তবে তুমি সেখানে শাস্তি হিসাবে এক ভয়ংকর ভালোবাসার সাথে পরিচিত হবে। ব্যাপারটা জোসসস্ না!
‘এই ঠান্ডা পরিবেশও তরুর গা বেয়ে নোনাজল পড়ছে। হাত পা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে বাড়ি যাওয়া উদ্দেশ্যে পিছন ফিরলো। এখানে আর এক মুহূর্তও দাড়ানো যাবে না। রোজা রেখে বাজার করে শরীর যেনো ক্লান্তিতে চেয়ে গেছে। এতো কিছুর পরেও তরু সর্বশক্তি দিয়ে দৌড় লাগায় বাড়ির উদ্দেশ্যে। সময় তার গতিতে চলে। সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। তরু যেনো টাইম ট্রেভেলে আটকা পড়েছে। দৌড় তো দিলো, কিন্তু এক চুল পা পরিমানও নড়তে পারেনি। রোদ তার শক্তপোক্ত হাতে তরুর ছোট্ট হাতটিকে বন্ধী করে রেখেছে। তরুর অবস্থা এখন ছেড়ে দে বাপ কেন্দে বাঁচি। ‘

রোদ এক হেঁচকা টানে তরুকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। তাল সামলাতে না পেরে রোদের বুকে আঁচড়ে পড়ে তরু। শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তরুর। হার্ট চলাচলের গতি অস্বাভাবিক ভাবে বেরে চলেছে। আজরাইলকে নিজের সামনে দেখতে পাচ্ছে, এই বুঝি জানটা বের করে নিয়ে যাবে। তার ছোট্ট দেহটা বুঝি এই রাস্তার পাশে পড়ে থাকবে। নিজের এমন করুন অবস্থা ইমেজিং করে রোদকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দেয় তরু। তরু একটু দূরে গিয়ে হাত উঁচিয়ে রোদকে উদ্দেশ্য করে বলে, আমি আকাশ বাতাস সাক্ষী রেখে ঘোষণা দিচ্ছি ডাক্তার সাহেব আপনি একজন অসভ্য লোক। আমি অভিশাপ দিচ্ছি আপনার কাছে জীবনেও কোনো রোগী আসবে না।
রোদের বিরক্তি যেনো আকাশ ছুলো। এই মেয়েকে বুঝা বড় দায়। শোন মেয়ে, এতো তিড়িং বিড়িং করে কোনো লাভ নেই। আগে আমার কথাটা তো শুনো, তারপর উত্তর দিও দেন চলে যেয়ো।
‘তরুর রাগ এবার উপচেয়ে পড়ছে। সহ্য করা যাচ্ছে না। তরু তাড়া দিয়ে বললো। শুনুন,সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে না পারলে আমার ডেঞ্জার জোন আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখবে। ‘
“সে তোমাকে উল্টো করে দেওয়ালে ঝুলাক বা সিলিংফ্যানে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ”

রোদের এমন ত্যাঁড়া কথায় তরু দাঁতে দাত চেপে ধরে। তরু খুব বুঝতে পারছে এই ছেলে নাচর বান্ধা। তার কথা শোনা না অব্দি এখান থেকে যেতে দিবে না। তরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোদকে তার মূল্যবান কথাকানা পেশ করার জন্য অনুরোধ করে।
রোদ খুশিতে লাফিয়ে উঠে। রোদের এহেন কান্ডে তরু ভরকে যায়। এ কেমন ছেলেরে বাবা, এমন দামড়া বয়সে কেউ টিনেজারদের মতো ব্যাবহার করে।

রোদ একটু দূরে গিয়ে দুই হাত মুক্ত বাতাসে মেলে দিয়ে আবারও তরুকে উদ্দেশ্য করে বললো শুনছো মেয়ে?’
রোদের প্রশ্নের বিপরীতে তরু ততক্ষণাত উত্তর দিল। হ্যাঁ শুনছি, বলুন।
রোদ উত্তরের বিপরীতে উত্তর দিলো।“ আই লাভ ইউ মেয়ে! আই লাভ ইউ!”
‘তিনটি শব্দের কথা বার বার বাতাসে প্রতিধ্বনি হয়ে তরুর কানে স্পর্শ করছে। তরুর মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। কি ভয়ংকর শব্দ তিনটি। সারা শরীরে ঝংকার দিয়ে উঠলো কিন্তু প্রকাশ করলো না। তরুর নিজেকে একটু ধাতস্থ করে উত্তর দিলো। এ্যায়! এসব কি বলছেন? আপনার মাথা ঠিক আছে?’
এ্যায় নয় ম্যাডাম হ্যাঁ! মাথা আমার ঠিকিই আছে। সমস্যা তো আপনার মাথায়। কেমন উদ্ভট সাউন্ড করছেন আপনি।”
তরু আঙুল উচিয়ে রোদকে শাসিয়ে বললো দেখুন ভালো হবে না কিন্তু। আমি সত্যি আপনার কথার মানে বুঝতে পারছি না।
রোদ ভ্রু নাচাতে নাচাতে তরুকে উদ্দেশ্য করে বললো। তুমি সত্যি কিছু বুঝতে পারছ না। নাকি তুমি ইংরেজি পারো না?
‘তরু ফুস করে উঠে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে হ্যাঁ ইংরেজের বংশধর আমি ইংরেজি পারি না। হয়েছে?’

রোদ একটু ভাব নিয়ে তরুর কাছে আসে। আরে দাঁড়াও দাড়াও তুমি ইংরেজি না পারলে সমস্যা নেই। আমি তো পারি আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।

তরু রোদকে বলে হ্যাঁ বুঝান। আমিও বুঝতে চাই।’
রোদ একটু কাছে এসে তরুর কানে ফিসফিস করে বলে। আই লাভ ইউয়ের মানে হচ্ছে আমি তোমাকে ভালোবাসি মেয়ে!
তরুর সারা শরীর দিয়ে যেনো এক প্রকার হিমশীতল ঝড় বয়ে গেলো কিন্তু তা ভাষায় প্রকাশ করলো না।’
তরু কপাট রাগ দেখিয়ে বললো, তো এখন আমি কি করতে পারি?
তো মানে কি? এবার তুমিও আমাকে আই লাভইউউউ টু বলবে। সিম্পল ব্যাপার।
তরুর রাগ এবার সপ্তম আকাশে। ও হ্যালো! আমি আপনাকে চিনিনা জানিনা। আপনি আমাকে মাঝ রাস্তায় দাড় করিয়ে আই লাভ ইউ বলবেন আর আমিও ড্যাং ড্যাং করে আই লাভ ইউ টু বলে দিব। লাইক সিরিয়াসলি!
হ্যাঁ আমি সিরিয়াস! বলো বলো বলো আই লাভ ইউ বলো। তাত্তাড়ি বলো!
রোদের এমন খাপছাড়া উত্তরে তরু চিৎকার দিয়ে বললো। আর ইউ ক্রেজি?
Yes, I’m crazy about you.
তরু এবার সত্যি সত্যি কান্না করে দিলো। কান্না করতে করতে হ্যাঁচকি উঠে গেছে। নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। ভিতরকার আত্না বার বার জানান দিচ্ছে তরু তুই এক সাইকো ডাক্তারে পাল্লায় পড়েছিস। আজকে এই নিরিবিলি রাস্তা থেকে তকে তুলে নিয়ে গিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলেও কেউ জানতে পর্যন্ত পারবে না।
আজকে মেডিকেলের রাস্তাটা বড্ড সুনশান। প্রতিদিনকার মতো মেডিকেল স্টুডেন্ট রাস্তায় গিজগিজ করছে না। আজকে কি হলো! কি হলো? মেডিকেল স্টুডেন্টদের মাথায় ঠাডা পড়লো। মেডিকেল থেকে কেউ বের হচ্ছে না কেনো? মেডিকেল থেকে কেউ বের হলেই তো এই সাইকো ডাক্তারের হাত থেকে তরু বেচে যায়। না হলে তরুর মায়ের একমাত্র মেয়ে তরু আজকে শ্যাষ! শ্যাষ! শ্যাষ।

চলবে_____ইন শা আল্লাহ

ভুল হলে ক্ষমা করবেন।