দুই_হৃদয়ে_সন্ধি পর্ব-১০+১১

0
105

#দুই_হৃদয়ে_সন্ধি
#পর্বঃ১০
#Nova_Rahman

আকস্মিক তরুর এমন চিৎকার চেচামেচি শোনে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেন জাহানারা চৌধুরী। স্যালাইন পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে দৌড়ে আসে তেজের কামরায়। হঠাৎ করে ছেলের শরীরের এমন খারাপ অবস্থা দেখে হাত পা কাঁপতে থাকে জাহানারা চৌধুরীর। পাশ থেকে তেজের ফোনটা নিয়ে কল দেয় স্বামী তাতান চৌধুরীর কাছে।

‘তাতান চৌধুরী সবেমাত্র একটা সার্জারী করে নিজের বরাদ্দকৃত কেবিনে এসে বসলেন। সার্জারী করতে গিয়ে অনেক প্রেসার ক্রিয়েট করতে হয়েছে তাকে। তাই একটু বিশ্রাম নিতে চেয়ারের মধ্যেই গা এলিয়ে দিলেন। টুংটাং আওয়াজ করে মুঠোফোনটা বেজে উঠতেই,পাশ হাতরে হাতে নিলো সেটা। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ভেসে এলো স্ত্রীর উদ্বিগ্ন কন্ঠের আহাজারি। জাহানারা চৌধুরী বিলাপ করতে করতে স্বামীকে খুলে বলল তেজের এমন অবস্থার কথা।’

তেজের কথা শুনে কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো তাতান চৌধুরীর। রাতের কথা মনে হতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে। ইসস! রাতে এইভাবে থাপ্পড় গুলো না দিলেও পারতো।
তাতান চৌধুরী মনে মনে বলে লাগল__সেহেরির সময় আমার ভয়ে সবার সাথে খেতে বসেনি তেজ। সবার খাওয়া দাওয়া শেষে হয়তো তেজ ফ্রিজ থেকে বাসী খাবার খেয়েছে। যার ধরুন আজকে এমন অসুস্থ হয়ে পড়লো তেজ।

নিজের করা কাজের জন্য তাতান চৌধুরী ব্যস লজ্জিত। ছেলে মেয়ে দুইটাই তার কলিজার টুকরা। ছেলের এমন অবস্থার জন্য মনে মনে নিজেকে দায়ী মনে করছেন। তাতান চৌধুরী নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে এবার স্ত্রীকে শান্তনা দিয়ে কান্না বন্ধ করতে বললেন। তাতান চৌধুরী স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলল, জামাকাপড় গুছিয়ে রেডি হয়ে থাকো। আমি অ্যাম্বুলেন্স পাঠাচ্ছি। তেজকে দ্রুত হসপিটালে এডমিট করতে হবে। জাহানারা চৌধুরী স্বামীর কথায় হ্যাঁ তে হ্যাঁ বলে দ্রুত চলে যায় রেডি হতে।

__তরু এতোক্ষণ মজার ছলে কথা গুলো বললেও এখন তার তেজের জন্য টেনশন হচ্ছে। মিনিট দশেকের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স এসে দাড়াল চৌধুরী বাড়ির সামনে। দুইজন নার্স এসে স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তুললো তেজকে। দ্রুত পা ফেলে জাহানারা চৌধুরী আর তরুও এসে উঠলো অ্যাম্বুলেন্সে। সবাই উঠে বসতেই ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলো। তেজের এক পাশে বসে তেজের হাতে পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে জাহানারা চৌধুরী। তরু অন্য একপাশে গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে আছে।

___তেজের শরীরের অবস্থা ক্রমশ খারাপেই হচ্ছে। উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষনেই দেখা মিলছে না। বার বার খিচুনি দিয়ে উঠছে সারা শরীর। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই হসপিটালে এসে পৌছালো তারা। তাড়াতাড়ি করে কেবিনে নেওয়া হলো তেজকে। একজন ডাক্তার ও দুইজন নার্স মিলে তেজের শরীরে স্যালাই লাগাচ্ছে। তেজের এমন অবস্থা দেখে তরু বেরিয়ে আসে কেবিন থেকে। চোখের সামনে তেজকে এমন কাতরাতে দেখতে পারছে না তরু। যতোই হোক ভাই হয় তার। জাহানারা চৌধুরী তেজের পাশে বসে তেজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।___

“হসপিটালের লম্বা করিডরে এক সারিবদ্ধ ভাবে চেয়ার পাতানো আছে। রোগীদের পাশাপাশি রোগীর বাড়ির লোকদের জন্য এই নিদারুণ ব্যবস্তা করে রেখেছে হসপিটাল কতৃপক্ষ। তরু টালমাটাল পা ফেলে সারিবদ্ধ চেয়ার গুলোর মধ্যে একটা চেয়ারে গিয়ে আরাম করে বসলো। দুই হস্তের তালুতে মুখ কানা চেপে ধরে ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে লাগলো তরু। ”
‘তেজের অসুস্থতার কথা শোনা মাত্রই রোদ তার ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস ফেলে রেখে দৌড়ে আসে হসপিটালে।’

_হসপিটালের করিডরে আসতেই, তরুকে এইভাবে কান্না করতে দেখে রোদের বুকে চিনচিন ব্যাথা হতে শুরু করলো। যবে থেকে তরুর সাথে রোদের সাক্ষাৎ হয়েছে। তবে থেকেই রোদ তরুকে হাসতে দেখেছে। হঠাৎ করে রোদ তার চঞ্চলহরিণীকে এইভাবে কান্না করতে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ___

‘তরুর সাথে কথা না বলে, রোদ আগে যায় তেজের সাথে দেখা করতে। রোদকে দেখে জাহানারা চৌধুরী একটা চেয়ার এগিয়ে দেয় রোদের দিকে। শ্বাশুড়িকে সালাম দিয়ে এখনকার মধ্যমনি রোদ তেপায়া চেয়ারটা দখল করে মধ্যিকানে বসে। জাহানারা চৌধুরীও সালামের উত্তর দিয়ে, কিছুক্ষণের জন্য বাথরুমে গেলো প্রকৃতির ডাকে শারা দিতে।’

জাহানারা চৌধুরী চলে যেতেই রোদ চেয়ারটাকে টেনে একদম তেজের সামনা সামনি এসে বসলো। হালকা কাশি দিয়ে তেজকে জিজ্ঞেস করলো__

‘ তা না হওয়া বউয়ের ভাই! মিস্টার শালাবাবু, শরীরের এখন কি অবস্থা?’

__রোদের কথা শোনে তেজ হতভম্ব হয়ে কথা বলতে ভুলে গেছে। কি লাজ লজ্জাহীন ছেলে। তেজ নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে উত্তর দিলো। না হওয়া মিস্টার বোনের জামাই! আমি আপনার শালাবাবু না। আমি আপনার না হওয়া বউয়ের বড় ভাই। না হওয়া আপনার বউয়ের থেকে এক মিনিটের বড় আমি।

তেজ নিজেও লজ্জা বিসর্জন দিয়ে রোদকে এতোগুলো কথা শোনাতে পেরে ফের লজ্জা পাচ্ছে। ছ্যাহ।!

তেজের কথা শোনে রোদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কুঁচকানো ভ্রু আরো কুচকে রোদ এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে তেজকে শুধালো,
শুনুন মিস্টার শালাবাবু, আপনি এক মিনিটের বড় হোন বা দুই মিনিটের। তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি আমার মিস্টার শালাবাবু! আর আমার মিস্টার শালাবাবু হয়েই থাকবেন। ওখেইইই!

রোদের কথায় তেজ হতভম্ব হয়ে রোদকে জিজ্ঞেস করলো__
কেনো? কেনো? কেনো? এমন কেনো হবে। আমি বড় হওয়ার সর্তেও শালাবাবু কেনো হবো।

তেজের কথার বিপরীতে রোদ হতাশ হয়ে উত্তর দিলো __ আরে শালাবাবু এইটুকু কথার মানে বুঝতে পারছেন না।
দেখুন, আপনি যদি আমার শালাবাবু থাকেন। তাহলে আপনার সামনেই আমি আমার বউয়ের সাথে ভালোবাসাবাসি আদান প্রদান করতে পারবো। এই দিক দিয়ে আমার জন্য বড় সুযোগ। প্রচুর লাভ!

আর আপনি যদি বউয়ে বড় ভাইয়ের ক্যারেক্টারে থাকেন। তাহলে আপনার সামনে বউয়ের সাথে ভালোবাসাবাসি দূরের থাক। বউয়ের হাত টুকু পর্যন্ত ধরতে পারবো না। লজ্জা শরমের একটা ব্যাপার স্যাপার আছে না। আমি নিতান্তই বড্ড লাজু স্বভাবের। এই দিক দিয়ে প্রচুর লস। বউকে দিনে একশোবার চুমু খেতে না পারলে, প্রচুর লস হয়ে যাবে আমার।

তাহলে, পরিশেষে কি প্রমাণিত হলো।

“ বউয়ের বড় ভাইয়ের থেকে ছোট ভাই বেশি উপকারি। বড় ভাই লস প্রজেক্ট হলেও শালাবাবু লাভ প্রজেক্ট। ”
তাই আমার শালাবাবু দরকার নট বড় ভাইইই! লসের দিক থেকে লাভের দিকটা আমার বেশি প্রয়োজন। বউকে ভালোবাসতে হবে সারাক্ষণ। কথা ক্লিয়ার।

লজ্জায় তেজের কান গরম হয়ে যাচ্ছে। যতো যাই হোক কোনো ভাই তার বোনের সম্পর্কে এমন কথা শোনার ধৈর্য্য নিয়ে পৃথিবীতে আসেনি। তেজের ধৈর্য্যে এখন অসহনশীল। না পারছে নড়তে না পারছে সহ্য করেতে। তেজ এখন কোনো কথা না বলে চুপচাপ শুয়ে আছে। রোদের না হয় লাজ লজ্জা নেই। তাই বলে কি তেজ তার লজ্জা শরম বিসর্জন দিয়েছে। তেজ পারলে তো এখুনি মাঠির নিচে ডুকে যায়। যদিও এতো বড় সুযোগ তেজের জন্য বরাদ্দ না।

‘তেজকে চুপচাপ দেখে রোদ ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। ’

‘তেজের শরীরে এখনও স্যালাইন চলছে। তেজ এখন মোটামুটি একটু সুস্থ। রোদ ঔষধ পত্র সব চেক করে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।’

রোদ সবকিছু দেখে তেজকে উদ্দেশ্য করে বলল, শালাবাবু সবকিছু ঠিকঠাকেই আছে। স্যালাইন প্রায় শেষের দিকে। আমি আর একটু পরে এসে হাতে ক্যানেলটা খুলে দিয়ে যাবোনে। আপনি বরং রেস্ট করেন। আমি বরং আপনার বোনকে কয়টা চুমু দিয়ে আসি। সেই কখন থেকে করিডোরে বসে আপনার জন্য কান্না করছে। আমার ইয়াম্মি ইয়াম্মি চুমু খেলে আপনার বোন একেবারে ঠান্ডা হয়ে যাবে ।

তো শালাবাবু আমি গেলাম। তেজের গাল টেনে দিয়ে রোদ দৌড়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।

রোদকে এইভাবে যেতে দেখে তেজ হতভম্ব হয়ে পড়ে। তার বোন যে একটা লাজ লজ্জাহীন জামাই পাবে সেটা বুঝতে বাকি রইলো না তেজের।

তেজ হতাশ, খুবিই হতাশ!
তেজ হতাশ কন্ঠে নিজেই নিজেকে শুধালো, তেজ এতোদিন তোর একটা ডে/ঞ্জা/রা/স বোন ছিল। এখন ডে/ঞ্জা/রা/স বোনের সাথে নির্লজ্জ জামাইবাবু জুটছে কপালে। শেষমেশ তুই শ্যাষ শ্যাষ শ্যাষ!

করিডোরে একা বসে এখনও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছে তরু। রোদ এক পা দু’পা করে এগিয়ে এলো তরুর দিকে। হাঁটু ভাজ করে তরুর সামনে এসে বসলো। তরু নিজের সামনে রোদকে হাঁটু ভাজ করে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে পড়ে। তরুকে এমন অবাক হতে দেখে রোদ ঠোঁট এলিয়ে হাসে। নিচ থেকে উঠে এসে তরুর পাশাপাশি বসলো রোদ।

“ রোদ ভ্রু নাচিয়ে তরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, ম্যাডামের কান্না এখনও বন্ধ হয়নি যে। কান্না করতে করতে আটলান্টিক মহাসাগর বানিয়ে ফেলবেন নাকি?”
রোদের কথায় তরু কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেললো। রোদ হেসে পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে এগিয়ে দিলো তরুর দিকে। কান্না করতে করতে তরুর হেঁচকি উঠে গেছে। নাক টেনে টেনে কান্না করছে এখন। রোদের থেকে টিস্যু পেয়ে তরু হাত বাড়িয়ে নিলো সেটা। নাকের সর্দি মুছে পুনরায় রোদকে ফিরত দিলো সেটা।
সর্দি মুছা টিস্যু ফিরত দেওয়ায় রোদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল তরুর দিকে। রোদের চাহনিকে তোয়াক্কা না করে তরু পুনরায় রোদের দিকে টিস্যু বাড়িয়ে দিলো। রোদ কোনো উপায় না পেয়ে টিস্যুটা নিয়ে সযত্নে রেখে দিলো পকেটে।

_অনেক্ক্ষণ যাবত কান্না করায় তরুর চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। রোদ আলতোভাবে দুইহাত দিয়ে আঁজলা করে ধরলো তরুর ছোট মুখ কানা। তরুকে কাছে এনে রোদ বলতে লাগলো___

কান্না করে না সোনা বউ। শালাবাবু এখন সম্পুর্ণ ঠিক আছে। এইযে তুমি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করছো। এতে করে তোমার চোখ মুখ মাত্রাতিরিক্ত লালা হয়ে যাচ্ছে। আর আমার নিজেকে কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে পড়ছে। এখন যদি তুমি কান্না বন্ধ না করো। তাহলে বিয়ে আগে একটা অঘটন ঘটে যাবে। তুমি হলে আমার হৃদয়ে সবচেয়ে সুন্দরতম পুষ্প! আমি চাই না আমার সবচেয়ে প্রিয়তম পুষ্পে কলঙ্ক লাগুক। __

রোদের কথা শোনে তরু হতভম্ব হয়ে কথা বলতে ভুলে গেছে। সারা শরীর বারংবার ঝংকার দিয়ে উঠছে। শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক ভাবে বারছে। তরু মনে মনে বলতে লাগলো__
ইসস! আপনি এতোটা নেশাক্ত কেনো ডাক্তার সাহেব! আপনাকে দেখলে আমার বারবার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে। আপনাকে একটু কানি ছুঁয়ে নিজের গায়ে কলঙ্ক লাগাতে ইচ্ছে করে। কি বেপরোয়া ভাবনা আমার ভাবা যায়। মনের কথা মনেই রেখে দিলো সপ্তদশী কন্যা। প্রেমে পড়া এখন তার জন্য বড্ড অস্বাস্থ্যকর। তাই হয়তো প্রকাশ করলো না।

__নীহারিকা একটা কাজে হসপিটালের তৃতীয় ফ্লোরে এসেছিল। রোদকে কারো সাথে এতো কাছাকাছি বসে থাকতে দেখে দপ করে মাথায় রক্ত চেপে যায় নীহারিকার। দ্রুত পায়ে হেঁটে রোদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নীহারিকা। রোদকে ঐ দিনে অপরিচিত মেয়েটার সাথে বসে থাকতে দেখে নীহারিকার রাগ যেনো কয়েক গুন বেড়ে গেলো। নীহারিকা কোনো কিছু না ভেবেই তরুর চুলের মুঠি ধরে টেনে তুললো চেয়ার থেকে। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে থাপ্পড় মারে তরুর বাম গালে। সজোরে থাপ্পড় পড়ায় তরু তাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায়। পাশেই রাখা চেয়ারের সাথে ধাক্কা লেগে কপালের একাংশ কেটে যায় তরুর।_

তরুর গায়ে এইভাবে হাত তুলতে দেখে, রোদ হিতাহিতজ্ঞান শূন্য হয়ে নীহারিকাকে কিছু করতে যাবে, তার আগেই উদয় এসে রোদকে মাঝ পথে থামিয়ে দিলো। রোদকে নিজের দিকে এমনভাবে তেড়ে আসতে দেখে নীহারিকা ন্যাঁকা কান্না শুরু করে দিলো।

নীহারিকা এবার রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, __

‘রোদ আমাদের ফ্রেন্ডশিপ সেই ছোটবেলা থেকে। আমরা একসাথে বড় হয়েছি। একসাথে কত সুন্দর সুন্দর মূহুর্ত কাটিয়েছি। আর মূল কথা হলো আমি তোর গার্লফ্রেন্ড। আমরা একে অপরকে অনেকদিন থেকে ভালোবাসি। আর তুই কিনা আজকে একটা রাস্তার মেয়ের জন্য আমার গায়ে হাত তুলতে আসছিলি। কেনো রে? এই রাস্তার মেয়ের মধ্যে তুই কি দেখলি যা আমার মধ্যে নেই। তোর জন্য আমি আমার সব কিছু উজাড় করে দিতে রাজি আছি। তারপরেও তুই এই মেয়ের দিকে তাকাবি না। প্লিজ রোদ।’

_আমি তোর গার্লফ্রেন্ড। আমরা একে অপরকে অনেকদিন থেকে ভালোবাসি কথা গুলো যেনো তরুর কানে বার বার বাজছে। ইস! কি অসহ্যকর কথাবার্তা। তরু যেনো সহ্য করতে পারছে না।

তরু এবার নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে উঠে দাড়াল। এক পা দু পা করে এগিয়ে গেলো নীহারিকার দিকে। কিচ্ছুক্ষণ স্থীর হয়ে দাড়িয়ে থেকে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে একটা ঘুষি মেরে দিলো নীহারিকার নাকে। নীহারিকা ছিটকে গিয়ে পড়লো কয়েক হাত দূরে। নাক দিয়ে গলগল করে রক্তের স্রোত বেরিয়ে যাচ্ছে।

তরু হাঁটু ভাজ করে একদম নীহারিকা সামনে গিয়ে বসলো। তরু আঙুল উচিয়ে নীহারিকাকে শাসিয়ে বলল,__
নেক্সট টাইম আমার সাথে লাগতে আসবি না শেওড়াগাছের শাঁকচুন্নি। তুই আামকে একটা থাপ্পড় মারলে আমি তোকে চারটা থাপ্পড় মারবো। তুই চারটা দিলে আমি আটটা। বরাবরেই আমি একটু উদার মনের মানুষ। আমি কাউকে কম কিছু দিতে পারিনা। সেটা মাইর হোক বা ভিক্ষা। সো সাবধান, একটু সাবধান।

একদমে কথাগুলো বলেই উঠে দাঁড়ালো তরু। নিজেকে এখন একটু হালকা লাগছে। আরেকটু হালকা লাগানোর জন্য রোদের কাছে গিয়ে, রোদের গলায় দু’হাত পেচিয়ে রোদকে উদ্দেশ্য করে তিনটি শব্দ উচ্চারণ করলো___
ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব। আমরন ভালোবেসে যাবো। দুই হৃদয়ে সন্ধিতে কেউ বাধা দিতে আসলে তাকে চিরতরে নিরুদ্দেশ করে দিবো। তারপরেও দুই হৃদয়ে সন্ধিতে কেউ বাধা দিতে পারলে দিয়ে দেখাক।

‘তরুর এক কথায় রোদের হৃদয় যেনো থমকে গেলো। ইস! মরণ মরণ সুখ হচ্ছে হৃদয়ে। রোদ বুকে হাত দিয়ে পা বাড়ালো সামনের দিকে।’

রোদ আর তরু চলে যেতেই হুঙ্কার দিয়ে উঠে দাড়াল নীহারিকা। এলোমেলো ভাবে পড়ে থাকা নিজের চুলগুলো দু’হাত দিয়ে মুষ্টি করে ধরলো নীহারিকা। তরুকে উদ্দেশ্য করে নীহারিকা হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো__
তোমাকে ছাড়বো না মেয়ে, ছাড়বো না। তুমি এই নীহারিকা সওদাগরের গায়ে হাত তুললে। তোমার ঐ হাত আমি ভেঙে দিবো। তুমি এই নীহারিকার ভালোবাসা রোদের দিকে চোখ দিয়েছো। তোমার এই চোখ আমি তুলে নিবো। তুমি তোমার ঝলসানো রূপে রোদকে গায়েল করেছ। আমি তোমার ঐ ঝলসানো রূপ চিরতরে ঝলসে দিবো। শেষ করে দিবো তোমায়। কেঁড়ে নিবো রোদকে।

চলবে__ইনশাআল্লাহ

#দুই_হৃদয়ে_সন্ধি
#পর্ব_১১
#Nova_Rahman

তরু গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে তেজের কেবিনের সামনে এসে দাড়াল। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো তরু। তরুকে দেখে তেজ দ্রুত উল্টো দিক ফিরে শুয়ে পড়লো। তেজের কাছে এখন আজেরা প্যাঁচাল পারার সময় নেই। তেজের শরীরটা এখন একটু ভালো। এই ভালোর মধ্যে তরুর সাথে কথা বলে আর একটু খারাপ হতে চাচ্ছে না।

তেজকে অন্য দিকে ফিরতে দেখে তরু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে তেজের পিটে কুট্টুস করে একটা চিমটি মেরে দিলো তরু। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো তেজ। নাক মুখ কুঁচকে তড়িঘড়ি করে আবার সামনে ফিরে তাকাল। ইস! ভ’য়ং’ক’র এট্যাক।
তেজ হতাশ! খুবিই হতাশ। তেজ হতাশ কন্ঠে নিজেই নিজেকে বলতে লাগলো। এই ইহজন্মে তরুর হাত থেকে তোর রক্ষা নেই তেজ। মরলেও যে প্রেত্নী হয়ে ঘাড়ে ঝুলবে না, তার সঠিক নিশ্চয়তা তেজ দিতে পারছে না।

তেজ এবার বিরক্ত। মহা বিরক্ত হয়ে তরুকে কঠিন কন্ঠে শুধালো __

তরু বোন আমার তুই যদি এখানে চুপচাপ বসে থাকতে পারিস। তাহলে বসে থাক। কিন্ত ভুল করেও তোর মুখ খুলবি না। তোর মুখ দিয়ে একটা অ শব্দও উচ্চারণ করবি না। তোর মুখ দিয়ে যখনই কোনো কথা বের হয় তখনই আমার কানের নিচে একটা বোমা বিস্ফোরণ হয়। বেচারা স্বরবর্ণ গুলোও মনে হয় লজ্জা পায় তোর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হতে। ছ্যাহ্!

“মিনিমাম লজ্জা তাকা দরকার তোর।”

__আর ভুল করেও ভুলবি না। আজকে তুই হসপিটালে আছিস তরু। এখানে অনেক নিরীহ মানুষ অসুস্থ হয়ে ভর্তি আছে। আজকে তোর আজেবাজে কথার জন্য হসপিটালে কোনো সাং/ঘা/তি/ক বি/স্ফো/র/ণ হয়। তাহলে তার সম্পুর্ণ দায়বার তোর নিজের। কথাটা মনে থাকে যেনো।
একদমে কথাগুলো বলে শান্ত হলো তেজ।

‘তেজের এমন উদ্ভট কথায় তরুর বিরক্তি যেনো আকাশ স্পর্শ করেছে। তরু চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্তিতে চ উচ্চারণ করলো। পাশেই রাখা তেপায়া চেয়ারটা টেনে আরাম করে বসলো সেটাই। আর একটু সামনে গিয়ে তেজ শুয়ে থাকা সিটের এক পাশে মাথা এলিয়ে দিলো তরু। ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করার পর নীহারিকার সাথে একদফা মারামারি। সব মিলিয়ে তরুর শরীর এখন খুব ক্লান্ত। তাই তেজের কোনো কথার প্রতিত্তোর না দিয়ে চুপচাপ মাথা নেতিয়ে বসে থাকে তরু।’

তেজের ভাবনার মাঝেই কেবিনে প্রবেশ করলো রোদ। রোদ কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে তেজকে উদ্দেশ্য করে বলল,___
তা না হওয়া বউয়ের ভাই মিস্টার শালাবাবু। সেই কখন থেকে দেখছি একা একা হাসের মতো প্যাঁক প্যাঁক করছেন। ব্যাপারটা কী? শুনি একটু।

রোদের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে তেজ আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে বলল __

এক টেপরেকর্ডার মুখ বন্ধ হতে না হতেই আরেক নির্লজ্জ টেপরেকর্ডার এসে হাজির। ইসস! এই জীবদ্দশায় তোর আর শান্তিতে বাঁচা হলো না তেজ। তোর জীবনটায় দুঃখ আর বেদনায় ভরপুর।
তেজের এখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে। কোনো সদয়াবান ব্যক্তির দুঃখ বিলাস করার উপায় জানা তাকলে আমাকে বলতে পারেন। দরকার হলে বাপের অর্ধেক সম্পত্তির ভাগ লিখে দিবো। তারপরেও আমি দুঃখ বিলাস করবো।

‘তেজ তার মনের কথা মনেই রেখে দিলো। তা আর বহিঃপ্রকাশ করলো না।’

তেজকে এমন চুপচাপ দেখে রোদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। রোদকে এমন করে তাকাতে দেখে তেজ ভ্যবলাকান্তের মতো একটা হাসি দিলো।

তেজকে হাসতে দেখে রোদ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
তা,না হওয়ার বউয়ের ভাই মিস্টার শালাবাবু। এতোক্ষণ কি বিড়বিড় করছিলেন? আমাকেও বলেন। আমিও একটু শুনি।
তেজ প্রতিত্তোরে হেসে বলল___
আপনার আগমনের অপেক্ষা করছিলাম জামাইবাবু। প্রার্থনা করছিলাম আপনি কখন আসবেন। কখন আপনার মহা মূল্যবান পা দুটি এগিয়ে দিবেন আমার দিকে। আর আমি আপনার পায়ে পড়ে সালাম করবো।

__তেজের কথা শোনে রোদের কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে যায়। রোদ তার কুঁচকানো ভ্রু নিয়েই তেজকে প্রশ্ন করলো,তা হঠাৎ করে আমার প্রতি এতো সম্মাননা দাহির করার কারণ কি শালাবাবু?

“রোদের করা প্রশ্নে তেজ হম্বিতম্বি করে উত্তর দিলো। আরেহ! বিগ ব্রো। আপনি আমার একটা মাত্র জামাইবাবু। আপনি কি সুন্দর আমার সেবা যত্ন করে ভালো করলেন। সেই হিসাবে আপনার পায়ে ধরে সালাম করে সম্মাননা প্রধান করা আমি একমাত্র শালাবাবুর কর্তব্য। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। এটাকে উপহার হিসাবে নিবেন। প্লিজ পা দুটো বাড়িয়ে দিন। আমি সালাম করে ঋণ মুক্ত হয়।”

তেজের হাতে লাগানো ক্যানেলটা খুলতে খুলতে রোদ উত্তর দিলো __
এতো সুন্দর করে সম্মাননা দাহির না করে। প্রিয় বোনটাকেও তো আমার কাছে দাহির করতে পারেন শালাবাবু। তখন পা না। পুরো আমিটাকেই বাড়িয়ে দিবো আপনার বোনের ইয়াম্মি ইয়াম্মি ভালোবাসা নেওয়ার জন্য। এসব পায়ে ধরে সম্মাননা আমার পুষাবে না। আমার সেবা প্রধানের পরিবর্তে কিছু দিতে চাইলে নিজের বোনকে দিবেন। এটাই একমাত্র জিনিস, যাকে টেস্ট করতে আমার কোনোদিন অরুচি ধরবে না। প্লিজ।__

“রোদের এমন লাজ লজ্জাহীন কথায় তেজ হতভম্ব হয়ে কথা বলতে ভুলে গেছে। তেজ অনুভব করলো তার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। তেজ দ্রুত দু হাত দিয়ে কান চেপে ধরলো। পরক্ষণেই তেজের মনে হতে লাগলো তার শরম লাগছে। তেজ শরম ক্ষমাতে দ্রুত কান ছেড়ে দু হাত দিয়ে নাক চেপে ধরেছে। তেজের ভাষ্য মতে মানুষের নাকেই বেশি লজ্জা থাকে। তাই লজ্জা পেলে প্রত্যেক মানুষের উচিৎ নাক ডেকে ফেলা। তাহলেই আর লজ্জা লাগবে না।”

‘রোদ এবার তেজকে রেখে তরুর দিকে তাকাল। তরু চোখ বন্ধ করে তেজের সিটের এক কোনে মাথা এলিয়ে শুয়ে আছে। রোদ আস্তেধীরে দুই হাত দিয়ে তরুর মুখ কানা আঁজলা করে ধরলো। কারো শক্তপোক্ত হাতে স্পর্শ চোয়ালে অনুভব হতেই, পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল তরু। সামনে তাকা ব্যক্তিটিকে বোধগম্য হতেই তরু ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। তরুকে হাসতে দেখে রোদও হাসলো।’
_তরু এবার আস্তেধীরে উঠে বসলো। দু হাত মেলে ঘুম কাটানোর চেষ্টা করলো। রোদ একটা তুলাতে ঔষধ লাগিয়ে তরুর মাথার ক্ষত স্থান টা পরিষ্কার করতে লাগলো। নীহারিকা শাঁ/ক/চু/ন্নি তরুকে থাপ্পড় দিয়ে ফেলে দেওয়ার সময় তরু ছিটকে গিয়ে একটা চেয়ারের সাথে ধাক্কা খেয়েছিল। যা ধরুন মাথার এক পাশে কেটে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে শুকিয়ে গিয়েছে।

তরুর মাথার ক্ষত স্থান দেখে তেজ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো__
তরু রে, তোর মাথায় ক্ষত হলো কি করে? কার সাথে মাথা দিয়ে টুসাটুসি করেছিস। তাত্তাড়ি বল। সিং টিং গজালে আর বিয়ে দিতে পারবো না। তখন বড় এক অনর্থক হয়ে যাবে।

তেজের কথার বিপরীতে তরু বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো _

চিন্তা করিস না। কারো সাথে টুসাটুসি করিনি। সিং ফিং গজানোর কোনো ভয় নেই। তুই যখন অসুস্থ ছিলি তখন হসপিটালের দেয়ালে মাথা ঠোকে ঠোকে চিক্কুর দিয়ে কান্না করেছি। সাবানার মতো আল্লাহর দরবারে দুইহাত তুলে আহাজারি করেছি। তুই আমার একমাত্র ভাই বলে কথা। আজরাইলের দুয়ারে চলে যাচ্ছিলি। যতো যায় হোক তোকে তো আর আমি আজরাইলের দুয়ারে যেতে দিতে পারি না। তাই তোকে বাচাতে আমার এমন আপ্রাণ চেষ্টা।
তুই তো আবার প্রমান ছাড়া কিছু বিশ্বাস করিস না। তাই মাথার ক্ষতটাই আমার প্রমান। ভালোবাসা প্রকাশ করলে এইভাবে দেয়ালে মাথা ঠোকে ঠোকে করবি। তাহলেই ভালোবাসার সুন্দর বহিঃপ্রকাশ হবে।

একদমে কথাগুলো বলে থামলো তরু। কথাগুলো তরু বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,__
তরুর কথা বলার ধরন দেখে রোদ হেসে কুটিকুটি অবস্থা। রোদকে হাসতে দেখে তরুর অনুভূতিরা সব থমকে গেলো।

কর্কশ শব্দে মুঠো ফোনটা বেজে উঠতেই, রোদ হাসি থামিয়ে হাতে নিলো সেটা। ফোনের স্কিনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠছে নীহারিকার নামটা। নীহারিকার কল দেখে তরুর অনুভূতি বেচারা বিলীন হয়ে গেছে। রোদ কিছু একটা ভেবে তরুর কাছে আজকের মতো বিদায় নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো কেবিন থেকে। রোদ চলে যেতেই তরুর শুভ্র মুখশ্রীতে রাতের আঁধার নেমে এলো। যেনো অমাবস্যার কালো রং।
তরু কিছু বলল না। চুপচাপ বসে আছে। কিছু হারানোর শোক অনুভব হচ্ছে মনে। আদোও হারিয়েছে নাকি হারাবে ঠিক বোধগম্য হলো না তরুর কাছে।

__হসপিটাল থেকে বাসায় আনা হয়েছে তেজকে। ঘন্টা খানিক আগেই তরু ফোন করে জানালো মেহুকে। তেজকে এক নজর দেখার জন্য মনটা কেমন লাফাচ্ছে মেহুর। কিন্তু মায়ের অনুমতি ছাড়া কেমনে যাবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না মেহু। কিছু একটা ভেবে মেহু নিজের রুম থেকে বেরিয়ে রেনু বিবির রুমের সামনে এসে দাড়াল। মনে সাহস নিয়ে কাঠের দরজায় বার কয়েক ঠোকা দিয়ে বলল,
ছোট মা ভিতরে আসবো? রেনু বিবি সবেমাত্র পানের কিলি কানা মুখে দিয়ে চিবোতে লাগলেন। হঠাৎ মেহুর ডাকে বিরক্ত হয়ে তাকালেন দরজার পানে। মুখ থেকে পানে এক দলা থুতু ফেলে দিয়ে মেহুকে বলল__
“আয় ভিতরে আয় নবাবজাদী।”
মেহু আস্তেধীরে সময় নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো। মেহু নতজানু হয়ে দাড়িয়ে রইলো খাটের এক পাশে। রেনু বিবির আদেশের অপেক্ষায় আছে মেহু।

রেনু বিবি ফের একদলা থুতু ফেলে বলল___
তা কিসের জন্য এতো তলব করে আমার কক্ষে আসা নবাবজাদী?

“মেহু এবার আমতা আমতা করে বলল__”
ছোটমা,আমি একটু তরুদের বাসায় যাবো। স্কুলের কয়টা পড়া বুঝার জন্য। কালকে আমার বায়োলজি পরিক্ষা। এই বিষয়ের কয়টা টপিক সমস্যা আছে। ঐ সমস্যা টুকু সমাধান করেই চলে আসবো।__

মেহুর কথার প্রতিত্তোরে রেনু বিবি পান খাওয়া দাত বের করে হেসে বলল,
হ্যাঁ যাও নবাবজাদী, তোমার বাপ তো তোমাকে বিলাত পড়িয়ে ব্যারিস্টার বানাবে। বিয়েসাদী তো দিবেই না। বসে বসে শুধু অন্নধ্বংস করবে। ঐ চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে, ঐ বাড়ির ছেলের সাথে যে লটরপটর করো তা কি আমি জানি না ভেবেছো। তবে শুনে রাখো নবাবজাদী।, যদি ঐ চৌধুরী বাড়ির ছেলের সাথে কোনো আকাম কুকাম করে পেট বাধিয়েছো তখন বুঝবে আমি কি জিনিস।

__রেনু বিবির কথা শুনে মেহুর চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। এমন বিশ্রী কথা মেহু প্রতিদিনেই শুনে। মেহুর যেনো এসব কথা এখন সহ্য হয়ে পড়েছে। এখন আর এসব গায়ে লাগে না। সত মায়ের কথা গায়ে মাকলে কি আর চলে। সত মায়ের কথা যে গায়ে মেখে অভিমান করে, তার মতো বোকা হয়তো পৃথীবিতে দু’টি নেই। মেহু হাসলো আর বলল, বাবাটাও তো সত। তারপরে যতটুকু ভালোবাসে ততটুকেই এনাফ।__

মেহু বেরিয়ে যেতেই রেনু বিবি হাত উঁচিয়ে ফের মেহুকে ডাক দিলো। এই মেহু শুনে যা। রেনু বিবির ডাক শুনে মেহু তড়িঘড়ি করে দৌড়ে যায় সেখানে।

হ্যাঁ ছোট মা ডাকছো?

রেনু বিবি কোমরে হাত দিয়ে চেচিয়ে বলে উঠলো__
কোমরের ব্যথাটা খুব বেড়েছে মেহু। একদম বিছানা থেকে নড়তেও পাড়ছি না। রান্না ঘরে থালাবাটি রাখা আছে এইগুলো ধুয়েমুছে রেখে যা। আমি আজকে কিছু করতে পারবো না। বাড়ির সব কাজ শেষ করে যেখানে খুশি সেখানে চলে যা।

মেহু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল___
বাড়ির সব কাজ তো আমিই করি ছোট মা। সেখানে এতো ভং দরার কি হলো।

মেহুর বলা কথা মেহুর চারপাশেই সীমাবদ্ধ ছিল। ছোট মায়ের কানে গেলে মেহুর আজকে রক্ষে থাকতো না।
মেহু আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায় রান্না ঘরে। একে একে সব থালাবাটি ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে মেহু । মেহু এবার সব কাজ শেষ করে ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে বের হচ্ছিল রান্নাঘর থেকে। হঠাৎ করে মেহুর শরীরের সাথে ধাক্কা লেগে টেবিল থেকে একটা কাচের গ্লাস মাটিতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।। গ্লাস পড়ার শব্দে রেনু বিবির অন্তর আত্না যেনো কেঁপে উঠেছে। হায় হায় করতে করতে ধেয়ে আসছেন রান্নাঘরের দিকে।

__অতিরিক্ত ভয়ে মেহুর মরণদশা অবস্থা। গরম কুন্তীর ছ্যাঁকা খাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে। মেহু ভয়ে তড়িঘড়ি করে ভাঙগা কাঁচের টুকরো গুলো খালি হাতেই তুলতে থাকে। তাড়াতাড়ি কাঁচের টুকরো গুলো তুলে গায়েব করতে পারলেই মেহু বেঁচে যায়। ইস! বাপ মা মরা মেয়েটার চোখে মুখে কি ভয়। এই বুঝি কোনো রাক্ষসপুরীর রাক্ষসী এসে থাকে টুপ করে গিলে ফেলবে। এই রাক্ষসীর হাত থেকে বাঁচতে মেহু তখন কার আঁচলের নিচে গিয়ে লুকাবে। মেহুর তো মা নেই। কে বাঁচাবে মেহুকে।__

ছোট ছোট কাচের টুকরো গুলো মেহুর নরম হাতে যেনো কোনো বাধা ছাড়াই ঢুকে পড়লো। কাঁচের একেকটা টুকরো যেনো রক্তের স্রোত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মেহুর শরীর থেকে।

রেনু বিবি রান্নাঘরে এসে তার সাধের গ্লাসকানা ভাঙ্গা দেখে হুংকার দিয়ে উঠলো। তেড়ে গিয়ে মেহুর চুলের মুঠি ধরে বসা থেকে টেনে তুললো। রেনু বিবি শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে মেহুর মাথাটাকে দেয়ালের সাথে কয়েকবার ঠোকে দিলো। অনবরত মেহুর নাকে মুখে কিল ঘুষি মেরে যাচ্ছে রেনু বিবি। এতো মারার পরেও তার সাধ যেনো মিটছে না। হাত-পা নিসপিস করছে। আর একটু মারতে পারলে বোধহয় শান্তি লাগতো। আশেপাশে খুঁজে একটা ভাঙ্গা লাঠি নিয়ে মনের খাস মিটিয়ে পিটিয়ে যাচ্ছে মেহুকে। মারতে মারতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে কাঠের লাঠিটা ফেলে দেয় কয়েক পাক দূরে। এতো মার সহ্য করতে না পেরে বার কয়েক জ্ঞান হারায় মেহু। মারতে মারতে এতোক্ষণে যেনো রেনুবিবির খাস মিটলো।

__মিটমিট করে চোখ মেলে তাকাল মেহু। সন্ধা হয়ে গেছে। এখনও রান্নাঘরে মেজেতে পড়ে আছে মেহু। কেউ নেই রক্তাক্ত মেহুকে একটু বুকে জড়িয়ে ধরবার। কেউ একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে না ব্যথা করছে মেহু। আর ব্যথা করবে না। এইতো আমি এসে গেছি। মেহু পাশ হাতড়ে দেখলো, না কেউ নেই পাশে। সব কিছু শূন্যের হাহাকার। কল্পনাতে কি আর মায়ে সুখ মিলে__
কি অসহায় লাগছে মেহুর নিজেকে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কান্না করতে পারছে না। কান্নারা দলাপাকিয়ে সব গলায় আঁটকে আছে। কান্নারাও যেনো আজ অভিমান করেছে।

__মা বেঁচে তাকলে হয়তো মেহুর এতো কষ্ট সহ্য করা লাগতো না। মেহু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যথাতুর শরীরটা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো নিজের কক্ষে। মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয় সব শুকিয়ে গেছে। সারা শরীরে রক্তে মাখামাখি। ইস! সারা অঙ্গে কি যন্ত্রনা। এতোশত যন্ত্রণা সহ্য করে মেহু আজও বেচে আছে। ভাবা যায়।__

চলবে___ইনশাআল্লাহ।