নিরব সে পর্ব-০৩

0
1470

২য় পর্বের পর থেকেঃ-
”নিরব সে”
#সাদিয়া_সৃষ্টি
৩য় পর্ব

ওয়াফিফ তারপর কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ওর হাত তখনও জিনিয়ার কোমরে ছিল। জিনিয়া ভয়ে ভয়ে তখনও একই কথা বারবার বলে যাচ্ছিল। কিন্তু সে খেয়াল করল সে এখন আর হাওয়ায় ভাসছে না। তার মানে ভুতটা তাকে নিচে নামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ ভাবার পর দেখল, এখানে যদি সত্যিই ভুত থেকে থাকে, তাহলে তার সাথে রোজ এই ঘটনা ঘটবে? তার হয়তো বিয়ের মায়ের কাছ থেকে রান্নার পাশাপাশি ভুত তাড়ানোর উপায় শিখে আসা উচিত ছিল। কিন্তু কে জানবে যে শহরেও ভুত থাকে? নিজের ভাবনায় হারিয়ে যাওয়া জিনিয়া নিজের কোমরে থাকা হাতের উপর হাত রাখল। এটা এখন তার কাছে ভুতের হাতের চেয়ে মানুষের হাত বলে বেশি মনে হচ্ছে। এটা যদি মানুষেরই হাত হয়ে থাকে তাহলে এতক্ষণ একটা মানুষকে ভুত ভাবছিল?

এসব ভাবনা মাথায় আসতেই সে নিজের প্রতি রেগে গেল। কার না কার সামনে সে এতক্ষণ পাগলামি করল। পিছনে ফিরতেই ওয়াফিফকে চাঁদের আলোয় দেখতে পেল। এর পাশাপাশি সামনের রাস্তার সোডিয়ামের লাইট টা ও আছে। যেটা খুবই কম আলো দিচ্ছে। আশেপাশে বিল্ডিং আছে, তবে সেখানে থেকে বেশ কিছু দুরেই। সেখান থেকেও আলোর ছটা এসে ছিটকে পড়ছে ওয়াফিফের ঘরে। সে ওয়াফিফকে দেখে চমকে সেখান থেকে ছিটকে সরে গেল। ওয়াফিফ এবার সামনে থেকে জিনিয়ার অবাক হওয়া চেহারা সাথে ভীতু চেহারা দেখে বেশ আনন্দ পেল। যেন তার এতক্ষনের করা কষ্টের ফল পেয়েছে সে। জিনিয়া কিছ বলতে যাবে তার আগেই ওয়াফিফ বলে উঠল,

–লাইক সিরিয়াসলি জিনিয়া, ভুত তোমার পুত? আই মিন, ভুত তোমার ছেলে? তাহলে নিজের ছেলেকে দেখে এতো ভয় পাচ্ছিলে কেন? বাই দ্য ওয়ে, সামনের গাছটা দেখছ না, সেখানে সত্যিই তোমার ওই ছেলে থাকতে পারে, আমি শুনেছিলাম, অনেকে নাকি দেখেছে। তুমি জানতে চাও ওখানে কে থাকে?

ওয়াফিফ মজা করে বলল। সে ভেবেছিল জিনিয়া তার মজা করা ধরে ফেলবে। কিন্তু হল তার উল্টো। জিনিয়ার মুখ থেকে অবাক হওয়ার ছাপ মুছে গিয়ে আবার ভয় আর জানার কৌতূহল দেখা দিল। জিনিয়া মাথা উপর নিচ নেড়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল,

–হুম, কে থাকে?

ওয়াফিফ জিনিয়ার এই অবস্থা দেখে মনে মনে আবার হাসল। সে তাই তার অভিনয় চালিয়ে গেল। সে জিনিয়র এক হাত ধরে টানতে টানতে ওকে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে সেখানে বসিয়ে দিল। আর বলল,

–অনেক সময় আগের কথা।

এইটুকু বলতে না বলতেই বাইরে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে করতে চলে গেল। এতে জিনিয়া আবার ঘাবড়ে গেল। সে এতোটা ভয় পেত না যদি আলো জ্বলত। কিন্তু ঘরে তখন ড্রিম লাইট জ্বলছিল। তাই গা ছমছমে এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ওয়াফিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন সে খুব সিরিয়াস একটা কথা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে আবার বলে উঠল,

–সেই সময় একটা লোক ছিল। এই সামনের তালগাছ টা র নিচে তার পিঠার দোকান ছিল। সেই লোকটা পিঠা বিক্রি করত, নানা ধরণের পিঠা, কিন্তু সে শুধু রাতের বেলা দোকান খুলে বসত, মাঝে মাঝে গান গাইত আর সারা রাত কার সাথে কথা বলত। একদিন এক ঝড়ে তার পিঠার দোকান উড়ে যায়। এখানকার লোকদের থেকে জানা যায় সেই ঝড়ে ওই দোকানের সাথে ওই অশরীরীও উড়ে গিয়েছিল। লোকটা যখন ফিরে আসলো, তখন কয়েকদিন কাউকে ডাকত খালি, গান গাইত,
”আয় ফিরে আয়
আয় ফিরে আয়”

–এইটা কোন গান?

–আমি কি জানব? লোকটা গাইত। তুমি চাইলে উনাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।

–কি ভাবে?

–তারপর একদিন সেই লোকটা আরেকজনের বাড়ি থেকে পিঠা চুরি করে। কিন্তু সেই পিঠা নাকি একটা সাপ তুলে নিয়ে যায় আর তার বাড়ি রেখে আসে। লোকটা সাপের পিছনে ছুটতে ছুটে তার বাড়ি যায়। আর সাপটার সাথে অনেক কথা বলে। মিনতি করে যাতে পিঠা ফিরিয়ে দেয়। তারপর সেই সাপটা পিঠা ফিরিয়েও দেয়।

–ফিরিয়েও দেয়? কথাও বলে?

–আরে চুপ করে তারপরের ঘটনা শুনো তো।

–বলুন।

–তারপর সেই লোকটা সাপের সাথে মারামারি করে?

–কিইই?

–হ্যাঁ তো, তারপর সাপটা হেরে গেলে তার পুরষ্কার হিসেবে সাপের বিষ প্যাকেটে করে নিয়ে সেই তালগাছটার নিচে যায়। আর সেই বিষ পিঠায় মিশিয়ে সেটা খেয়ে আত্মহত্যা করে।

–মরার ইচ্ছা থাকলে সাপের ছোবলেই মরত, এতো কষ্ট করল কেন?

–এখন সেই পিঠা কাকু এই গাছে থাকে আর মাঝে মাঝে এখানে কারো না কারো সাথে গল্প করতে আসে। সে কেন কিভাবে মরেছিল, আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে তার সাথে তুমি যোগাযোগ করতে পারো।

–আপনাদের বাড়ি যে ভুতের বাড়ি সেটা আগে বলবেন না? এরপরের বার আর এই ভুল করব না।

–কি ভুল?

–বিয়ের আগে পাত্রের কাছে জিজ্ঞেস করে নেব সেখানে ভুত থাকে কি না?

–বাই এনি চান্স, তুমি আমার বিয়ে করবে? ডোন্ট ডু, তুমি চলে গেলে আমার মা আবার কার না আক্র সাথে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য আমার মাথা খাওয়া শুরু করবে।

–তারমানে আপনি আমাকে ছেড়ে দিবেন?

–না মানে, তুমিই তো বললে…

–যান, আপনার সাথে কথা বলব না।

–ওকে।

বলেই ওয়াফিফ নিজের ঘরের লাইট জ্বালিয়ে প্রথমে নিজের আলমারি থেকে একটা টিশার্ট আর ট্রাউজার বের করল। তারপর ওয়াশরুমে চলে গেল। এতে করে জিনিয়া বোকা বনে গেল।

–আপনি যাও মানে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা ভাবলেন?

কিছুক্ষণ পর ওয়াফিফ বের হয়ে জিনিয়াকে বলল,

–তুমিও ড্রেস চেঞ্জ করে আসো। ওয়াশরুম এটা আর তোমার জামাকাপড় আলমারিতেই আছে।

জিনিয়াও অনেক ক্লান্ত ছিল তাই দেরি না করে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল আর ভুতের চিন্তা তখনকার মতো ভুলে গেল।

বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখল ওয়াফিফ বিছানার এক কোণে শুয়ে আছে। সে একটু কেশে বলে উঠল,

–আপনি কি ঘুমিয়ে পড়েছেন?

ওয়াফিফ তখন সোজা হয়ে শুয়ে ছিল। এক হাত কপালের উপর দিয়ে। চোখ ঢেকে। সে সেভাবেই বলে উঠল,

–না।

–আমিও কি এখানেই শুব?

–হ্যাঁ। আজ অনেক ক্লান্ত তুমি তাই বেশি কথা না বলে রেস্ট নেও। এখন তুমি একা না। তোমার মধ্যে আরেকটা প্রাণ ও আছে। তার খেয়াল তোমাকে রাখতে হবে। ভুলে যেও না। আর তোমার সাথে আমার কিছু গুরুত্ব পূর্ণ কথা ছিল। কাল একবার মনে করিয়ে দিও। আজ আর বলছি না।

বলেই ওয়াফিফ অপরপাশে কাৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। জিনিয়াও কোন কথা বলল না। সেও ঘুমিয়ে পড়ল।


সকালের সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল ওয়াফিফের। সে আশেপাশে আড়ামোড়া মারতে গিয়ে খেয়াল করল আজ তার পাশে আরেকজন আছে। একটু খেয়াল করতেই ঘুমন্ত জিনিয়াকে দেখল সে। সকালে দ্রুত ঘুম থেকে ওঠা ওয়াফিফের অভ্যাস তবে, ঘুম থেকে উঠে জিনিয়াকে দেখা তার কাছে নতুন। সে বেশি নড়াচড়া না করে উঠে পড়ল। উঠতে গিয়ে খেয়াল করল জিনিয়া তার হাতের একটা আঙুল ধরে আছে শুধু। একেবারে বাচ্চারা যেমন বড়দের শুধু একটা আঙুল ধরে রাখে তেমনভাবে। ওয়াফিফ হাসল। কয়েকমাস পর যে কি না বাচ্চার মা হবে সে নিজেই এখনো বাচ্চা। ভাবতেই মনে মনে আবার হাসল। সে নিজের হাত থেকে জিনিয়ার হাত ছাড়াল। তারপর দেরি না করে জিনিয়াকে ডাকতে শুরু করল ওর কাঁধে হাত দিয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে।

–জিনিয়া, এই জিনিয়া ওঠো।

জিনিয়াও উঠে পড়ল। তার ঘুম খুব হালকা। একটু ডাকাতেই উঠে পড়ল সে। ওয়াফিফকে দেখে প্রথমে চমকালেও পরে নিজের দিকে তাকিয়ে আর আশেপাশে তাকিয়ে সব মনে করল, আর নিজের শাড়ি ঠিক করতে করতে ঘুমন্ত কণ্ঠেই বলে উঠল,

–এতো সকালে ডাকলেন কেন? কিছু হয়েছে?

–হ্যাঁ অনেক কিছু হয়েছে। আগে তুমি গিয়ে ফ্রেস হয়ে এসো। আর শাড়িটাও বদলে নেও। পারলে একেবারে গোসল করে এসো।

–ঠিক আছে।

বলে জিনিয়া বাথরুমে ঢুকে পড়ল অন্য আরেকটা শাড়ি নিয়ে। একেবারে গোসল সেরে বের হতেই ওয়াফিফকে জিজ্ঞেস করল,

–কি হয়েছে?

–চা বানাতে পারো?

–হুম।

–তাহলে এখনই ১ ২ ৩ … ৫ হ্যাঁ, ৫ কাপ চা বানিয়ে বাবা মা ২ ভাই, ভাবিকে দিয়ে আসো। বাকি আত্মীয় স্বজনদের কথাআ তো এখন ভাবা লাগবে না। আর হ্যাঁ, পারলে আমার জন্য করা করে কফি বানিয়ে এনো, কোন চিনি ছাড়া, বাবা আর মায়ের চায়েও চিনি কম দিও।

বলেই ওয়াফিফ আর দেরি না করে নিজেও হাত মুখ ধুতে চলে গেল জামা কাপড় নিয়ে। জিনিয়াও ওয়াফিফের কথা মেনে চা বানিয়ে সবাইকে দিয়ে এলো। ওয়াফিফ ফ্রেস হয়ে বের হয়ে এসে দেখল জিনিয়া তখন কফি কাপ হাতে ঘরে ঢুকছে। সে জিনিয়ার হাত থেকে কাপ নিয়ে বলল,

–ধন্যবাদ।

–আপনি আমাকে এটা করতে কেন বললেন?

–চায়ের কাপ দেওয়ার সময় মায়ের মুখের হাসি দেখেছিলে?

–হ্যাঁ।

–এটার জন্যই। এখন তুমি যদি না চাও যে বাঙ্গা সিরিয়ালের মতো তোমার আর তোমার শাশুড়ির মধ্যে ঝগড়া হোক, তাহলে এখন থেকে মায়ের পিছনে কাঁঠালের আথার মতো লেগে থাকবা আর মায়ের সব কথা মেনে কাজ করবা, তবে নিজের দিকে খেয়াল রেখে। কিছু না পারলে সরাসরি বিনয়ের সাথে মাকে জাজানাবে। তাহলে আম খুশিও হবে আর রাগও করবে না। এটাই অন্তত তোমার শাশুড়ি পটানোর নিনজা ট্রিক। ওকে।

–ওকে।

–এই তো, লক্ষ্মী বউ আমার।

বলেই ওয়াফিফ জিনিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বারান্দায় চলে গেল। জিনিয়া ও লজ্জা পেল নিজের অজান্তেই। তবে ওয়াফিফ ওকে শাশুড়ি পটানোর নিনজা ট্রিক্স শিখিয়ে গেল তাহলে?

চলবে।

[রিচেক করি নি, ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আর ধরিয়ে দিবেন।

কিছু কথাঃ
যখন আমি একটা গল্প লিখলাম তখন কমেন্টে জানানো হল আমি মেয়েদের সাধু বানাচ্ছি বেশি। এবার তাই এই গল্প টা আমি অন্য প্লটে লিখার চেষ্টা করলাম। যেখানে গল্পের মূল চরিত্রও ভুল করেছে একটা। এখন আমাকে বলা হচ্ছে, ”আমি নোংরা মানসিকতার লেখিকা” । তাহলে যারা এমন কথা বলে তারাই বলুক আমি কি লিখব? পাঠক শুধু গল্পের ১ম পর্ব পড়েই আমাকে জাজ করল। যারা এমন কাজ করে, তাদের বলব, অন্তত এমন মন্তব্য করার আগে সম্পূর্ণ গল্প নিজ দায়িত্বে পড়ে তারপর আরন সহ জানাবেন আমি কেমন? তখন আপনার কথা যুক্তিযুক্ত হলে আমি মাথা পেতে নিব। কিন্তু আপনি শুধু ১ম পর্ব পড়ে আমার সম্পর্কে কিছু বলবেন এতায় আপনি শুধু ”হাহা ” রিয়েক্ট পাবেন আমার পক্ষ থেকে। আপনাদের আমি নিজেই বলি ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে। কিন্তু আপনি সরাসরি একজন লেখক বা লেখিকাকে আঘাত করতে পারেন না।

এর পর থেকে এমন কাজ করার আগে একাধিকবার ভাববেন। কারণ আমরা একটা গল্পের্র একটা লাইন লিখতেও ১০ বার ভাবি। তাই ভুল ধরিয়ে দিবেন ভালো কথা, সরাসরি আঘাত করে কোন কথা বলার অধিকার আপনার নেই।
ভেবে দেখবেন। আপনাদের জন্যই আমার এখন ভাবনা আরও দৃঢ় হয়েছে। আগে আমি সমাজের কিছু মানুষ নিয়ে লিখতে গেলে ভাবতাম আমি বেশি লিখে ফেলছি কি না। এখন তো মনে হয় আমি কমই লিখেছি।

যারা এমন কাজ করে কথাগুলো শুধু তাদের জন্যই। ভুল কিছু বলে থাকলে দুঃখিত। কিন্তু লেখককে নোংরা মানসিকতা বলার আগে পুরো লেখক সম্পর্কে ১০ জনের রায় নিবেন তারপর বলতে আসবেন। আপনাদের এমন আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জন্যই অনেক লেখক লেখালেখি ছেড়ে দেন। মাটি চাপা পড়ে আরেকটি প্রতিভা।

ধন্যবাদ]