পিচ্চি বউ পর্বঃ ০৮

0
1996

পিচ্চি বউ
পর্বঃ ০৮

লেখাঃ রাইসার আব্বু।

মা বাবাকে নিয়ে হসপিটালে নিয়ে গেল। এখন আমার কোন চিন্তা নেই কথাকে সাথে নিয়েই ঘুমাই!
সালার ডাক্তার নাকি বলে আমি পাগল হয়ে গেছি! সালার পড়ালেখা করে পাগল হইছে আমাকে পাগল বলে কত্তোবড় সাহস। আরেকবার যখন পাগল বলছে তখন, গলা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি। আমাকে জোর করে এক রুমে আকঁটে রেখেছে। রুমে শুধু আমি আর কথা। নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম ” আমি এখন কোথায়?

নার্স বললো ” আপনি এখন পাবনায় আছেন, আপনার বউ কথার সাথে! কখাটা বলে একটা কিসের যেন ইনজেকশন দিয়ে দিলো।

.

ঘুম থেকে উঠে, দেখি কথা আমার দিকে চেয়ে হাসছে।

.
বাবা – মা আসছে। বাবাকে বললাম, ” বাবা আমার এখানে থাকতে ভালো লাগে না! আমাকে তোমাদের সাথে নিয়ে চলো। সাথী তোমাদের বউমা কথাকেও নিয়ে চলো।

ও বাবা কাঁদছো কেন? আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে না? জানো বাবা এখানে কেউ আমার সাথে কথা বলে না। শুধু কথা ছাড়া। বাবা আমাকে নিয়ে চলো না। আমি থাকবো না। কথাগুলো বলে কাঁদতে লাগলাম।

.
বাবা মাকে নিয়ে চলে গেল। তারপর নার্স এসে ইনজেকশন দিয়ে গেল! তারপর আর কিছু মনে নেই। সবসময় কথার সাথেই তথা বলতাম।

.

এদিকে আজ মা- বাবা আমাকে নিতে আসছে। এখন কথা আমার সাথে কথা বলে না। আমি জানি কথা মারা গেছে। মা- বাবা বাসায় নিয়ে বললো ” রাজ বাবা তুমি পাঁচ বছর পাগল হয়ে পাবনা মানসিক হসপিটালে ছিলে! এ দুবছরে অনেক পর্রিবতন হয়ে গেছে! আমরা আজ নিঃস্ব। ব্যবসাতে ক্ষতি হয়েছে, ব্যাংকের লোকেদের ঋণ পরিশোধ করতে বাড়িটাও বিক্রি করর দিছি! এখন এই বাসাটাতে ভাড়া আছি।

.

বাবার কথাগুলো শুনে নিজের অজান্তেই চোখের কোণে পানি চলে আসলো, আমার বাবা এ বয়সে অফিসে কাজ করে।

.

মনে মনে ভাবলাম, আমার কোন না কোন জব করতে হবে! যেই ভাবা সেই কাজ, কয়েক জায়গাই আবেদন করলাম সাথে একটা প্রাইভেট প্রতিষ্টানে শিক্ষকতা করার জন্যও আবেদন করলাম। সপ্তাহখানেক পর, নোটিশ আসলো, সে প্রতিষ্টানে আমাকে জয়েন করতে বলেছে।

.
দিনগুলো ভালোই কাটছিল, কিন্তু প্রতিরাতেই কথার স্মৃতি আমাকে ঘুমাতে দেয় না। কথার সেই দুষ্টমি গুলো আজো আমাকে কাঁদায়। প্রতিরাতে কথার ছবি বুকে নিয়ে ঘুমায়! খুব কষ্ট হয়, মাঝরাতে মোনাজাতে শুধু একটা কথায় বলি, আল্লাহ্ আমার স্ত্রীকে ভালো রেখ!

.

এদিকে স্কুলে একটা বাচ্চাকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেলাম! কি সুন্দর করে হাসে ঠিক কথার মতো! কি মায়াবি চাহনী, মনে হচ্ছে কথার প্রতিচ্ছবি তার মাঝে দেখতে পাচ্ছি।

.

আমি মেয়েটাকে ডাক দিয়ে বললাম” তোমার নাম কী মামনী?

.
আসসালামু আলাইকুম!

.

ওয়ালাইকুম সালাম। উওরটা দিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলাম, এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে হাই, হ্যালো না বলে সালাম দিলো।

.
আপনি কি জানেন না? কারো সাথে কথা বলতে হলে, প্রথমে সালাম দিয়ে কথা শুরু করতে হয়!

.
আমার নাম ” তাসনিয়া কারিমা রাইসা”

নামটা শুনে বুকটা কেমন কেঁপে ওঠলো। “আপনি আমাদের নতুন টিচার”?

.
হ্যাঁ মামনী আমি তোমাদের নতুন টির্চার!

.
এই নাও চকলেট, আমরা আজ থেকে ফ্রেন্ড কেমন!?

.

হুমম ফ্রেন্ড।

.

তুমি আমার চকলেট নিলে, আমাকে পাপ্পি দিবে না? তুমি এতো কিপটে কেনো?তোমার সাথে আড়ি। কান ধরো, কান না ধরে বলবে, রাজকন্যার সাথে আর কোনদিন অপরাধ করবো না! তুমি জানো না, রাইসা নামের অর্থ হলো ” রাণী”। ( রাইসা)

.

আমি না তোমার টির্চার, টির্চারকে কান ধরতে বলা লাগে?

.
টির্চার না ছাই, তুমি এখন আমার বন্ধু, কিছুক্ষণ আগে চকলেট দিয়ে বন্ধ বানিয়েছি। তোমার টির্চারগিরি ক্লাসে দেখাবে। এখন কান ধরো, নইলে ফাইন ধরবো! ( কথাগুলো বলে, মুখে চেপে হেসে দিল)
.
আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছি না, খুব হাসি পাচ্ছে, মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি, রাগি লুক নিয়ে তাঁকিয়ে আছি!

.

কি হলো আমার কথা বুঝোনি? বন্ধু হলে কেন? বন্ধু হয়েছে যেহেতু, কান ধরে বলো আর এমন অপরাধ হবে না। যদি না কান ধরো তাহলে! দাঁত পড়ে যাবে। আর দাঁত পড়ে গেলে বিয়ে হবে না!

.

রাইসার কথা শুনে কান ধরে বললাম ” আমার ভুল হয়ে গেছে, আর এমন ভুল হবে নানা, মেয়েটাকে টান দিয়ে কোলে নিয়ে, গালে মুখে চুমু দিয়ে বললাম” মামনী এখন হয়েছে?

.

হুমমম,বেশ হয়েছে। তুমি সত্যিই অনেক ভালো। হঠাৎ পাশ থেকে দশ বছরের মতো একটা মেয়ে এসে বলল” রাইসা আব্বু এসেছে চলো। দাঁড়িয়ে আছে।

.

ও আপু তুমি আমার ফ্রেন্ড এর সাথে পরিচিত হয়ে নাও,। এই যে স্যার এটা আমার আপু রিচি। রিচি আপু আমার স্যারকে সালাম দাও!

.

আসসালামু আলাইকুম, আমি রিচি। স্যার আজকে আসি। হঠাৎ দেখি, একটা ভদ্রলোক এসে রাইসাকে কোলে নিল! রাইসা বাবাই বাবাই বলে লোকটাকে জড়িয়ে ধরল!

.

লোকটা রাইসা আর রিচিকে নিয়ে গাড়ি করে চলে গেল। মনে মনে ভাবলাম, আজ যদি কথা বেঁচে থাকতো, তাহলে আমাদের সন্তানটা ঠিক এতটুকু বড়ই হতো।

.

নিজের অজান্তেই চোখের পাতাটা ভিজে ওঠল। কথার চাঁদমুখটা ভেসে উঠছে, স্মৃতিপটে।

.

এদিকে বাসায় এসে দেখি, বাবা অসুস্হ!

বাবাকে নিয়ে হসপিটালে গেলাম! ডাক্তারের রুমে গিয়ে সেই লোকটাকে দেখলাম কেমন বিচলিত ভঙ্গিতে বসে আছে।

.

ডাক্তার লোকটিকে বলল,” রফিক সাহেব, যদি ও নেগেটিভ রক্ত না পাওয়া যায় চারঘন্টার ভেতর তাহলে আপনার মেয়েকে বাঁচানো সম্ভব না!

.

এদিকে আমি একজন ডাক্তার কে নিয়ে বাবাকে দেখালাম। ডাক্তার বলল তেমন কিছু না, পেশারটা একটু বেড়েছে।

.

বাবার বেড থেকে বের হয়ে, পাশের বেড়ের দিকে তাকাতেই বুকটা কেমন যেন হু হু করে কেঁদে ওঠল! কি মায়াবি মুখটা, কেমন যেন অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে। মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো। মনে হচ্ছে, আমার নিজের আপন কেউ। কেন এতটা কষ্ট হচ্ছে মেয়েটাকে দেখে, বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যাথা করছে।

.
ডাক্তারের রুমে গিয়ে বললাম, মেয়েটার কি হয়েছে?

.

পাশ থেকে লোকটি বললো” কাল স্কুল থেকে আসার সময় গাড়ি দুর্ঘটনা হয়। প্রচুর ব্লাড যায়, মাথায় অনেক আঘাত পেয়েছে। তাঁর মা, মেয়ের খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মেয়েটার যদি কিছু হয়ে যায় তাঁর মা বাঁচবে না!”

.

যদি এখন রক্ত না পাওয়া যায় আল্লাহ্ যে কি করবেন? কথাটা বলে কেঁদে দিল। এদিকে এক নার্স এসে বলল” স্যার ঢাকার আশে – পাশে প্রায় সব ব্ল্যাডব্যাংকে খবর নিয়েছি, কিন্তু কোথাও রক্ত পাওয়া গেল না! এদিকে পেশেন্ট এর অবস্থাও ভালো না! জানিনা কি হবে?

.

নার্সের কথাটা শুনে, রফিক সাহেব কেঁদে দিলেন। আমার জানি কথাগুলো শুনে খুব কষ্ট হচ্ছে।

.

আমি ডাক্তার সাহেব কে বললাম” ডাক্তার সাহেব আমি রক্ত দিবো, আমার রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ!

.

ডাক্তার তাড়াহুড়া করে আমায় নিয়ে শুইয়ে দিলেন। দুই ব্যাগ রক্ত নিয়ে রাইসাকে দিলো। আমি কিছুক্ষণ শুইয়ে থেকে, বাবার কাছে চলে আসলাম। পরের দিন বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরি! হসপিটাল থেকে আসার সময়, রাইসার বেডের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা মেয়ে রাইসাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মনে হচ্ছে এটাই রাইসার মা, কিন্তু মানুষটাকে খুব পরিচিত লাগছে! এক ধ্যানে তাকিয়ে আছি মেয়েটার দিকে।

.

কিরে রাজ বাসায় যাবি না? এভাবে দাঁড়িয়ে পড়লি যে?

.

বাবার কথা শুনে, ক্ষাণিকটা চমকে, বললাম” চলো বাবা!

.

বাবাকে নিয়ে বাসায় আসার পর, বিছানায় গা টা এলিয়ে দেয়।

.
পরের দিন হঠাৎ কে যেন দরজা নর্ক করছে, আমি দরজাটা খুলতেই আমার মাথাটা ঘুরতে লাগল! পা দুটো কাঁপছে,কথা তুমি বেঁচে আছো? হ্যাঁ বেঁচে আছি তুমি কিভাবে ভেবেছিলে আমি মরে গেছি? যাকে আল্লাহ্ বাঁচায় তাকে কেউ রক্ষা করতে পারে না।

.

কিন্তু আমি যে স্পর্ষ্ট দেখেছি সেটা তুমি। রোড একসিডেন্টে মারা গিয়েছো।

.

তুমি ভুল দেখেছো, তুমি জানো না এ পৃথিবীতে একজন মানুষের ন্যায় আরো সাতজন মানুষ রয়েছে।

আচ্ছা বাদ দাও, এই নাও আমার বিয়ের কার্ড তুমি কিন্তু আসবেই!আঙ্কেল আন্টি সাথে জান্নাত কেও নিয়ে আসবে!

.

“কথা আমি তোমাকে ভালবাসি, বড্ড বেশি ভালবাসি। আমি আমার ভুল বুঝতে পেয়েছি, প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও! তোমাকে ছাড়া সত্যি বাঁচবো না। প্লিজ ছেড়ে যেয়ো না আমায়। প্লিজ আমার বুক থেকে তোমাকে কেউ আর কেড়ে নিতে পারবে না “( কান্না করে দিয়ে, কথাগুলো বললাম। চোখ থেকে টুপ-টাপ করে পানি পড়ছে। নিজের অজান্তে কথার হাতটা ধরে ফেললাম!

.

ঠাস, ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলো, কথা আমার গালে,

চলবে”””””””””

বিঃদ্রঃ ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।