প্রিয় অসুখ তৃতীয় পর্ব

0
335

প্রিয় অসুখ
তৃতীয় পর্ব
মিশু মনি
.
পুরো রিসোর্ট জুরে মাত্র দুজন! রাজা রানী! হা হা হা..

হেসে উঠলো শীতুল। বিশাল বড় রাজপ্রাসাদ আকারের রিসোর্ট। এত বড় রিসোর্টে নাকি মাত্র দুজন লোক। বেশ ভালো। রাজপ্রাসাদকে এখন নিজের প্রাসাদ আর নিজেকে রাজা মনেহচ্ছে। আর কর্মচারী দুজন হচ্ছে ভৃত্য। পাশের টেবিলের মেয়েটা কি তাহলে রানী?

ভাবতেই হো হো করে হেসে উঠলো শীতুল। হাসি থামিয়ে মনেমনে বললো, ‘আমার রানী তো আমার মনে, আমার কল্পনায়। মিস শ্রাবণ্য হচ্ছেন এ বাড়ির অতিথি।’

খাবার খাওয়ার সময় শ্রবণা বারবার পাশের টেবিলে শীতুলের দিকে তাকাচ্ছিলো। শীতুল আপনমনে খাবার খাচ্ছে। একবার মুখ তুলে তাকাচ্ছেও না। ওর এই ভদ্রতা খুব মনে ধরেছে শ্রবণার। অবশ্য দেখতে হবে না মনের মানুষটা কার?

শ্রবণা নিজে থেকেই বললো, ‘তরকারিটা অনেক মজা হয়েছে না?’
শীতুল মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ অনেক মজা হয়েছে।’

তবুও শীতুল মাথা তুলে তাকালো না। শ্রবণা আবারো বললো, ‘এদের রান্নাটা আর পরিবেশন বেশ চমৎকার তাইনা?’
– ‘হ্যাঁ।’

শীতুলের কথা বলার দিকে কোনো আগ্রহ নেই দেখে আর প্রশ্ন করলো না শ্রবণা। চুপচাপ খাবার খেয়ে নিলো। খাওয়ার শেষ দিকে শুরু হলো বৃষ্টি। শ্রবণা তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে ক্যান্টিনের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। লেকের জলে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। চারিদিকেই টলমল করছে লেকের পরিষ্কার জল। সুবিশাল লেকের মাঝখানে অনেকটা আইল্যান্ড টাইপের ছায়াঘেরা জায়গায় এই রিসোর্ট। রিসোর্ট না বলে রাজপ্রাসাদ বললেও ভূল হবে না। সুন্দর রাজপ্রাসাদে কক্ষের কোনো হিসেব নেই। অথচ আজকে পুরোটা জুরে মানুষ মাত্র দুজন! কি অদ্ভুত!

লেকের জলে বৃষ্টির খেলা দেখছিলো শ্রবণা। দেখতে দেখতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছিলো। শীতুল পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো, ‘বৃষ্টি ভালোবাসেন?’
– ‘খুউউউব। আপনি?’
– ‘আমার কালবৈশাখী ভালো লাগে।’

শ্রবণা অবাক হয়ে বললো, ‘কালবৈশাখী! এই প্রথম শুনলাম কারো এটা ভালোলাগে।’
– ‘লাগতেই পারে। প্রত্যেকের ভালোলাগার জায়গা আলাদা। আপনি তো বৃষ্টিবিলাসী। যান, বৃষ্টিতে ভিজুন।’
– ‘আপনি ভিজবেন?’
– ‘আমি তো বৈশাখ বিলাস। আমি কালবৈশাখীতে ভিজবো।’

শ্রবণা অবাক হয়ে বললো, ‘অদ্ভুত একটা মানুষ। এমনসব কথা বলে যে একইসাথে হাসিও পায়, আবার ভালোও লাগে। অথচ কথা বলার সময় সে একটুও হাসে না! কি অদ্ভুত!’

শীতুল বারান্দায় তাকিয়ে দেখলো একটা গাছের শরীর জুরে কামড়াঙার মত এক ধরণের ছোট ছোট ফল ঝুলছে। বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করে একটা ফল ছিঁড়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে কামড়াতে কামড়াতে বললো, ‘উফফ কি টক!’ তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলো।

শ্রবণা পিছুপিছু এসে ক্যান্টিনের দরজায় দাঁড়ালো। লোকটা এই টিপটিপ বৃষ্টিতেই ভিজতে ভিজতে রিসোর্টের দিকে গেলো। কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়ালে কি এমন হতো?

ধীরেধীরে ঝুম বৃষ্টি নেমে এলো। লেকের জলের দিকে একদৃষ্ঠে তাকিয়ে রইলো শ্রবণা। জলতরঙ্গের খেলা চলছে যেন। দেখতে দেখতে মনটা উড়ুউড়ু করে উঠলো। প্রিয় অসুখকে পাবার আনন্দ পুরো শরীরে গ্রাস করলো। ইচ্ছে করছে ধেই ধেই করে নাচতে। এক ছুটে ক্যান্টিন থেকে বেড়িয়ে হাত মেলে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলো।

ঘাসের উপর পা ফেলে হাত নেড়ে, পা নেড়ে নাচার ভঙ্গিতে ভিজছে শ্রবণা। চুল খুলে দিয়ে মাথা দুলিয়ে উল্লাস করছে। এক পা ঘাস থেকে খানিকটা উপরে তুলে নাড়াচ্ছে। পায়ের উপর জলের বিন্দু টুপটুপ করে পড়ছে। শ্রবণার এত আনন্দ হচ্ছে যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। বৃষ্টির জল এত ঠাণ্ডা, গা শিরশির করে উঠছে। শ্রবণা ঘুরে ঘুরে নাচছে। করিডোরে দাঁড়িয়ে ওর ভেজার দৃশ্য দেখছে শীতুল। ভিজতে গিয়ে একটা মেয়ে এত আনন্দ পায় নাকি! মেয়েটার চোখেমুখে আনন্দের রেখা ফুটে উঠেছে। খুশিতে উল্লসিত, সুখে ভাসছে।

শীতুল মনেমনে ভাবলো, যদি আমার শ্যামলতার সাথে দেখা হতো। তাহলে ওর সাথে বৃষ্টিতে ভিজতাম আমি। শ্যামলতার হাত ধরে বুকের কাছে টেনে নিতাম, ও জড়োসড়ো হয়ে যেতো। ভয় ভয় চোখে তাকাতো আমার চোখের দিকে। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আমি অনন্ত তৃষ্ণা মেটাতাম।

এমন সময় ভেজা হাতে কেউ গাল স্পর্শ করলো। শিউরে উঠলো শীতুল। মাথা ঘুরিয়ে দেখলো শ্রবণা দাঁড়িয়ে। ও শ্রবণার দিকে তাকানো মাত্রই শ্রবণা খিলখিল করে হাসতে আরম্ভ করলো। সে হাসির শব্দে এই বৃষ্টির মাঝেও মুখরিত হয়ে উঠলো করিডোর। শীতুল দুবার চোখ পিটপিট করলো। শ্রবণা হাসতে হাসতে কাছে এগিয়ে এলো। তারপর বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে চোখে চোখ রেখে গান গেয়ে উঠলো,

‘তুমি কেন এত ভয় ভয় করো, আসো না আমার কাছে?
তুমি তো জানোনা কত কথা এই অন্তরে জমা আছে…’

কি মিষ্টি কণ্ঠ। শীতুলের বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। একটা শীতল অনুভূতি! মেয়েটার চোখে চোখ আটকে গেছে। চাইলেও দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। শরীর কাঁপছে শীতুলের। এ কেমন অনুভূতি। মনেহচ্ছে চোখ দুটো চুম্বকের মত আকর্ষণ করে আছে। ভেজা হাতে গাল স্পর্শ… শীতুল নিজের গালে হাত দিয়ে সেই জল মুছলো। শ্রবণার দৃষ্টি ভয়ংকরের চেয়ে আরো ভয়ংকর হচ্ছে। শীতুল আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। পিছিয়ে এসে দ্রুত রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।

শীতুলের অস্থির লাগছে ভীষণ। মেয়েটার চোখ দেখে কেবলই মনেহচ্ছিলো এটাই সেই শ্যামলতা। কিন্তু ওর নাম তো শ্রবণা। ও শ্যামলতা নয়। শীতুলের বুকের ভিতর রিখটার মাত্রার ভূমিকম্পন অনুভূত হচ্ছে। তবে এটার নাম ভূমিকম্পন বললে ভুল হবে। এটা হচ্ছে হৃদয়কম্পন। মেয়েটার চোখে কি যেন আছে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলে হাত পা শিরশির করে।

কিন্তু শীতুল যে শ্যামলতাকে ভালোবাসে। শ্যামলতাকে খুঁজে বের করতেই হবে। হঠাৎ ওর মাথায় একটা আইডিয়া এলো। ফেসবুক!

ফেসবুকে শ্যামলতাকে খুঁজে দেখতে হবে। নিশ্চয়ই ওর কোনো আইডি আছে। এখানে ফোনের নেটওয়ার্ক তেমন ভালো নয়। রিসোর্টের ওয়াইফাই অন করে দেখলো কানেকশন পাচ্ছে না। পরে আবার চেষ্টা করতে হবে। এখন মনের অস্থিরতা কমানোর উপায় কি? শ্যামলতার ডায়েরি।

শীতুল আবার ডায়েরি খুলে বসলো। এবার দ্বিতীয় চিঠি-

‘আচ্ছা তোমাকে আমি কি নামে ডাকবো? আমি তোমাকে অসুখ নামে ডাকলে কি তুমি রাগ করবে? রাগ কোরো না লক্ষিটি। তুমি তো আমার সুখের অসুখ। তোমাকে ভেবে আমি কতটা সুখী হই, কিভাবে বোঝাবো বলো? জানো, আমার আজকে খুব আলতা দিতে ইচ্ছে করছে। আলতা মানে কিন্তু নেইলপলিশ নয়। এটা রক্তের মত লাল, পানির মত তরল, সেই আলতা বুঝেছো? আলতা দুইপায়ে ভারি করে লাগিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। আর ইচ্ছে করছে পা ভিজিয়ে পুরো বাড়ি নেচে নেচে বেড়াতে। যাতে করে আমার পায়ের আলতা ধুয়ে পুরো বাড়িতে আলতার দাগ লেগে যায়। হাতের নখেও আলতা লাগাবো। সেই রং ধুয়ে তোমার গালে ছুঁয়ে দিবো। তুমি কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকাবা, আমার ইচ্ছে করবে তোমার চোখে গুতো দিয়ে খিলখিল করে হাসি। কিন্তু ওই ভয়ংকর কাজটা আমি কখনোই করতে পারবো না গো। আমি তারচেয়েও ভয়ংকর কাজটা করবো। কি জানো? আমি তোমার চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবো। তাকিয়েই থাকবো, তাকিয়েই থাকবো। তুমি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে খেই হারিয়ে ফেলবা। বুকের ভেতর স্পন্দন শুরু হবে। হার্টবিট ঢিপঢিপ করবে। নিশ্বাস ভারী হবে, দম আটকে আসতে চাইবে। বুকের ভেতর শূন্য শূন্য লাগবে, একইসাথে সুখ আর আনন্দ ফিল করবে। তারপর… আমার কান্না পাচ্ছে গো। আজ আর লিখবো না। আমাকে একটু কাঁদতে দাও…’

চিঠি থেকে মুখ তুলে ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরলো শীতুল। বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। অন্তরে জ্বালা তৈরি হচ্ছে। এই জ্বালার তেজ ভয়ংকর। না সহ্য করা যায়, না কাউকে বলা যায়। শ্যামলতাকে খুঁজে পেতেই হবে। ওর অপেক্ষার প্রহর ঘুচিয়ে দিতেই হবে।


পুরোটা সন্ধ্যা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটলো। রাতের খাবার খেতে গিয়ে শীতুল দেখলো পুরো ক্যান্টিন ফাঁকা। মহারানী আসেনি নাকি? না এলেই ভালো। একা একা আরাম করে খাওয়া যাবে। মেয়েটা আশেপাশে থাকলে হাত পা কেমন শিরশির করে। অস্থির লাগে। আর দেখা না হলেই ভালো। এমনিতে বিকেলবেলা ভিজতে দেখার পর শীতুল অন্যরকম আগুনে দগ্ধ হচ্ছে। এটাকে আর বাড়তে না দেয়াই ভালো। শ্যামলতা কষ্ট পাবে।

অর্ধেক খাবার খাওয়ার পর শীতুল বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘একজন ম্যাডাম যে ছিলেন? উনি খাবেন না?’
– ‘ম্যাডাম রাতে খাবেন না বলে দিয়েছেন।’
– ‘ওহ আচ্ছা। কেন খাবেন না?’
– ‘তা তো জানিনা। ম্যাডামকে দেখলাম খুব গম্ভীর হয়ে বসে আছেন।’
– ‘ওহ’

‘ওহ’ বলে খাবার মুখে দিলো শীতুল। কিন্তু মনেমনে ভাবছে, না খেয়ে থাকা কি ঠিক হবে? ম্যাডামের বোধহয় মনের অসুখ। থাক সে তার মত। কেউ খেলো কি না খেয়ে থাকলো তাতে কিচ্ছু যায় আসে না।

খাবার শেষ করে রিসোর্টের বামদিকে চলে এলো শীতুল। এখানে দুই নারিকেলের গাছের মাঝখানে একটা নেটের দোলনা আছে। সেটায় শুয়ে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু দোলনার কাছে এসে দেখলো তাতে মহারানী শুয়ে আছেন।

শীতুল আস্তে আস্তে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। ও চলে যাওয়ার সময় শ্রবণা আড়চোখে তাকালো। শীতুল রিসোর্টের সামনে গিয়ে গাছের গোড়ায় বানানো বেঞ্চিতে বসে পড়লো। খুব সুন্দর বাতাস বইছে। বৃষ্টির পর আবহাওয়া অনেক শীতল। আকাশে বেশ নক্ষত্রও আছে দেখছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনতে লাগলো শীতুল।

শ্রবণা দোলনায় শুয়ে দোল খাচ্ছে আর তাকিয়ে আছে শীতুলের দিকে। ছেলেটা অনেক ভদ্র। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে চুপ করে বসে থাকলে মনের কথা জানানো হবে না।

বেয়ারে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ম্যাডাম কোল্ড ড্রিংকস?’
– ‘দুটো গ্লাস আনুন।’

শ্রবণা উঠে গিয়ে শীতুলের পাশে বসলো। শীতুল নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। শ্রবণা পাশে বসেছে সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বেয়ারা কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে এলে শীতুল বললো, ‘আমি খাবো না।’
– ‘স্যার, পেপসি। খেলে ভালো লাগবে।’

শ্রবণার মুখের দিকে তাকিয়ে গ্লাস হাতে নিলো শীতুল। এক ঢোক গিলে বললো, ‘আপনি বারবার আমার কাছে কেন আসছেন? বুঝতে পারছেন না আপনার সাথে ভাব জমানোর ইচ্ছে আমার নেই? তাছাড়া আমি মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে ভালোবাসি।’

হাত থেকে গ্লাস পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো শ্রবণার। এভাবে মুখের উপর কড়া করে কথা শুনিয়ে দিলো! অপমানবোধ হচ্ছে তো। ও লাফ দিয়ে গাছের গোড়া থেকে নেমে নিচে দাঁড়ালো। থমথমে মুখে বললো, ‘আমার কাছে আপনাকে আসতেই হবে। এভাবে অপমান না করলেও পারতেন।’

কথাটা বলে এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না শ্রবণা। শীতুল পুরোপুরি থ! এই কথাটার মানে কি? ওর কাছে আসতেই হবে মানে!

চলবে..