প্রিয় অসুখ পর্ব ১৪

0
368

প্রিয় অসুখ
পর্ব ১৪
মিশু মনি
.
শীতুল স্তব্ধ হয়ে একটা কথাই ভাবছে, ‘শ্রবণা এখানে কি করছে? মায়ের সাথে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে নাকি?’

শ্রবণা শীতুলের কৌতুহলী চোখ দেখে মায়ের দিকে তাকালো। কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। শ্রবণা কিছু বলার আগেই মা বললেন, ‘শীতুল, শ্রবণাকে রাস্তায় পেয়ে ধরে নিয়ে এলাম। মেয়েটার চেহারার কি হাল হয়েছে দেখছিস?’

শীতুল এতক্ষণে শ্রবণার চেহারার দিকে খেয়াল করলো। গত কয়েকদিন আগেও যে মেয়েটাকে দেখলে পরিপূর্ণ সুন্দরী মনে হতো, এখন সে মেয়েটাকে দেখলে মনে হয় রোগা অসুস্থ অসুখী একটা মেয়ে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে একি হাল হয়েছে মেয়েটার! চুলগুলোও বোধহয় আঁচড়ায় না, খাওয়া ঘুম বাদই দিলাম।

মা বললো, ‘এই মেয়ের খুব দুঃখ বুঝলি। কারণ ওর কেউ নেই। তাই আমি ওকে আমার মেয়ে করে আমার কাছে রাখবো। তোর কোনো সমস্যা নেই তো?’

শীতুল সহজ গলায় বললো, ‘না। আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা ওর।’
ভয় পেয়ে গেলো শ্রবণা। ড্যাবড্যাব করে শীতুলের দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর সমস্যা বলতে শীতুল কিসের কথা বোঝাতে চাইছে সেটাই ভাবছে অবাক হয়ে। শীতুল রাগী রাগী গলায় বললো, ‘এই মেয়ে, কি সমস্যা তোমার?’

শ্রবণা আমতা আমতা করে শুকনো মুখে বললো, ‘আমার সমস্যা বলতে?’
শীতুল উত্তরে বললো, ‘সমস্যা যদি নাই থাকে তাহলে শরীরের এই হাল করেছো কেন? মা, ওকে একটু পিটিয়ে সোজা করতে হবে। বোধহয় খাওয়াদাওয়া একেবারেই করে না। জীবনের প্রতি এই মেয়ের ভীষণ হতাশা।’

শ্রবণা বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে খানিক্ষণ তাকিয়ে রইলো। মুখে কোনো কথা ফুটছে না। শীতুল সহজভাবে কথা বললেও মনে মনে কি ভেবে বসে আছে কে জানে। সে যাই হোক, শীতুলের গালে মারের দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। কোনো মেয়ে এরকম শুভ্র টাইপের একটা ছেলেকে এভাবে বেদম প্রহার করিয়ে নিতে পারে এটা দেখে শ্রবণার অবাকই লাগছে। শীতুল শ্রবণার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে সিনএনজি তে গিয়ে উঠলো।

সিএনজি তে বাসায় যাওয়ার সময় শীতুল অনবরত কথা বলে যাচ্ছিলো। এর আগে ওকে এত কথা বলতে দেখেনি শ্রবণা। হতে পারে মাকে অনেকদিন পর পেয়ে কথার ঝুড়ি মেলে বসেছে। শ্রবণার শুনতে ভালোই লাগছে। মুগ্ধ হয়ে শুনছিলো গ্রাম নিয়ে শীতুলের বলা কথা গুলো। শীতুল হঠাৎ শ্রবণাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার কোনো খোঁজ খবর নেই কেন? অনেকদিন ফোনও দাওনি। ছিলে কোথায়?’

শ্রবণা উত্তরে বললো, ‘ঢাকাতেই।’
– ‘চেহারার এই হাল হয়েছে কেন? এই বয়সে থাকবে চনমনে, হাস্যোজ্জ্বল, দূরন্ত।’

শ্রবণা চুপ করে রইলো। ও চাইলেও এমন হতে পারে না। খুব ইচ্ছে করে চনমনে, উচ্ছল একটা মেয়ে হতে। যার জীবনটা হবে অনেক আনন্দময়। কিন্তু সেটা হয় না, সবসময় একা একা লাগে। সত্যিই তো শ্রবণা অনেক একা। বাবা নেই, মা নেই, কোনো বন্ধু বান্ধব নেই। একাকী কি আর জীবনকে আনন্দময় করে তোলা যায়? সবখানেই একাকীত্ব, হতাশা আর মলিনতা ভর করে। কারো সঙ্গ পেতে খুব ইচ্ছে হয়।

শ্রবণা মনে মনে ঠিক এই কথাগুলোই ভাবছিলো। ওকে চমকে দিয়ে শীতুল বললো, ‘দেখো পৃথিবীটা অনেক কঠিন জায়গা। এখানে সবার ই পরিবার থাকবে এমন তো হয় না। পরিবারের বাইরেও অনেক আপনজন তৈরি করে নিতে হয়। তুমি যে সময়ে ভাবছো, অনেক কষ্টে আছো। ঠিক সে সময়েই কেউ তোমার চেয়েও আরো বেশি কষ্টে আছে। কাজেই নিজেকে এত হতাশ কোরো না। বুঝলে?’

শ্রবণা কিছু বলতে পারলো না। শীতুল সিএনজি থামিয়ে কিছু ফল কিনে নিয়ে এলো। শ্রবণার এখন কিছুটা ভালো লাগছে। আর আগের মত মন খারাপ ভাবটা নেই।

শীতুল সিএনজি তে উঠে বললো, ‘আমি যেন কখনোই আর তোমাকে মুখ কালো করে থাকতে না দেখি। আমরা তো আছি রে মেয়ে৷ আমার মা তোমার মায়ের চেয়ে বেশি যত্ন করতে পারবে এটা মিলিয়ে নিও। আমার মাকে মা ভাবতে পারবে না?’

শ্রবণা পুরোপুরি অবাক! মা ছেলে দুজনের মনোভাব একেবারে একই রকম। দুজনই শ্রবণাকে একই দিক থেকে ভাবছে। খুব অন্যরকম একটা প্রশান্তি অনুভব করলো শ্রবণা।

শীতুল জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হলো? চুপ করে আছো কেন? পারবে না?’
– ‘হুম পারবো।’
– ‘আমার মায়ের সাথে সবসময় থাকবে। দেখবে খুব হাসিখুশি থাকতে পারছো।’
– ‘আচ্ছা।’

শ্রবণা মাথা দুলিয়ে বসে রইলো। ঠিক এই মুহুর্তে ওর এত আনন্দ হচ্ছে যা নিজেই বুঝতে পারছে না। আনন্দ জিনিসটা পরিমাপ করা গেলে পরিমাণে এটা সব আনন্দকেই ছাড়িয়ে যেতো। এটা শীতুলের কাছাকাছি থাকার আনন্দ নয়। এ আনন্দ মা কে পেয়ে, শীতুলের মায়ের মত একজন মায়ের সাথে সবসময় থাকতে পারার আনন্দ। ওনার সাথে থাকলে নিঃসন্দেহে সবসময় অনেক ভালো সময় কাটবে শ্রবণার। আহ! বুকের ভেতরটা অনেক হালকা লাগছে। শান্তি লাগছে।

বাসায় পৌঁছে শীতুল ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। মা শ্রবণাকে ধরে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রধান দরজায় দেখা হলো শীতুলের দাদীমার সাথে। শ্রবণা দেখেই সালাম জানালো। উনি হেসে ওদেরকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

বাসার ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক দেখছিলো শ্রবণা। বাড়িটা অনেক আগের বোঝা যাচ্ছে। সবকিছু বেশ গোছানো ও পরিপাটি। বাড়িটাতেও একটা বেশ শান্তি শান্তি ভাব আছে। সবচেয়ে সুখের কথা, বাড়িটা একেবারে নির্জন, শান্ত৷ শহর থেকে দূরে এসে এরকম শান্তিপূর্ণ বাড়িতে ঢুকে মনটা শীতল হয়ে এলো।

মা শ্রবণাকে বাথরুম দেখিয়ে দিলেন। গোসল করতে করতে মনের মেঘগুলো কেটে যাচ্ছে শ্রবণার। গোসল সেরে বেরিয়ে এসে খুব সতেজ অনুভূতি হচ্ছে।

শ্রবণাকে যে ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে, ঘরটায় প্রচুর আলো আসে। বিছানার একদিকে রয়েছে সুবিশাল জানালা। সেদিকে তাকিয়ে চুল মুছছে আর ভাবছে, হঠাৎ করেই সবকিছু কেমন বদলে গেলো। অথচ সকালবেলায় কত মন খারাপ ছিলো, সমস্ত শরীর জুরে হতাশা গ্রাস করেছিলো। সময় খুব দ্রুত পালটে যায়।

দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো। শ্রবণা এগিয়ে এসে দরজা খুলতেই দেখলো শীতুল দাঁড়িয়ে। শ্রবণার ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। হাতে তোয়ালে দেখে শীতুল বুঝতে পেরেছে শ্রবণা চুল মুছছিলো। ও অপ্রস্তুত হয়ে বললো, ‘সরি। আমি তাহলে আসি।’
– ‘আরে ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই। আসুন ভেতরে।’

শীতুল ভেতরে ঢুকে বললো, ‘এই ঘরটা অনেক সুন্দর তাই না? আমি এ কয়েকদিন এ ঘরেই ছিলাম।’
– ‘ওমা! তাহলে আমাকে এখানে পাঠালেন যে? আপনি বরং এখানেই থাকুন আর আমি গেস্ট রুমে যাই।’
– ‘তোমাকে ভালো পরিবেশে থাকতে দেয়াটা আমার কর্তব্য ‘র মধ্যে পড়ে। ডিপ্রেশনের মুহুর্তে এরকম একটা ঘরে থাকলে ডিপ্রেশন জানালা দিয়ে পালাবে।’

শ্রবণা মুচকি হেসে বললো, ‘মানুষ কি করে যে পারে। মুখ দেখেই সব বুঝে ফেলে। আমাকে দেখে কি করে বুঝলেন আমি খুব ডিপ্রেশনে আছি?’
শীতুল উত্তরে বললো, ‘এটা আমি বুঝতে পারি। তোমাকে প্রথমদিন দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম তুমি হতাশায় জর্জরিত। কিন্তু তোমার অদ্ভুত সব আচরণের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারিনি। এখন বুঝি।’

শ্রবণা শীতুলের দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো। কি লজ্জাজনক একটা পরিস্থিতি। কি বলবে ভেবে পেলো না ও। শীতুল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে অনেক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলো। শ্রবণা ওর পিছনে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলো, ‘কি দেখছেন?’
– ‘আকাশ দেখছি, কিন্তু ভাবছি অন্যকিছু।’
– ‘আমাকে কি বেহায়া ভাবছেন? বিশ্বাস করুন আমি একেবারেই আসতে চাইনি। মা আমাকে জোর করে নিয়ে এসেছেন।’
– ‘মা আমাকে বলেছে। এটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।’
– ‘আমার আসলে লজ্জা করছে আপনার সামনে দাঁড়াতে। কিন্তু পরিস্থিতি এমনভাবে আমাদেরকে দেখা করিয়ে দিলো যে কিছুই করার ছিলো না।’
– ‘আমি তোমার ব্যাপারটা বুঝি। যাইহোক, এসব নিয়ে ভেবে সংকোচ কোরো না। স্বাভাবিক হও, ইজি হওয়ার চেষ্টা করো। দেখবে লাইফটা অনেক সুন্দর।’
– ‘হুম। ধন্যবাদ। আমার অনেক সতেজ লাগছে।’
– ‘তুমি চুল আচড়ে নাও, ভাত খেতে চলো।’
– ‘ভেজা চুল আচড়াতে নেই।’

শীতুল শ্রবণার চোখের দিকে এমনভাবে তাকালো যে খেই হারিয়ে ফেললো শ্রবণা। লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিলো। শীতুল চোখ সরাতে পারলো না। ভেজা চুলের স্নিগ্ধতাকে মন ভরে দেখছে আর ভাবছে আনমনে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলেই ফেললো, ‘গোসলের পর স্নিগ্ধ চেহারায় মেয়েদেরকে অনেক নিষ্পাপ লাগে।’

শ্রবণা মুচকি হাসলো। লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলো একেবারে। শীতুল সাথে আরো যোগ করলো, ‘পবিত্র লাগছে তোমাকে। আর অনেক মায়াবতী ও। আমার একটা বড় ভুল হয়ে গেছে, একইসাথে একটা বড় দর্শনও।’

শ্রবণা কৌতুহলী হাসি দিয়ে জানতে চাইলো, ‘ঠিক বুঝলাম না। কি রকম?’

শীতুল মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ‘বড় ভুলটা হচ্ছে এই ভয়ংকর স্নিগ্ধতা দেখাটা আমার অন্যায় হয়েছে। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, এই সময়ে না এলে এই পবিত্র নিষ্পাপ উপলব্ধিটা আমার হতো না।’

শ্রবণা লজ্জায় অন্যদিকে তাকালো। কিছু একটা বলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বলার মত কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। পেটে আসছে তো মুখে আসছে না। শীতুল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললো, ‘যাইহোক, খেতে আসো। আমি গেলাম।’

শীতুল ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। শ্রবণার অবাকই হবার পালা। শীতুলের কাছ থেকে এমন অদ্ভুত আচরণ ও কল্পনাও করেনি। ভেবেছিলো শীতুল হয়তো ওকে দেখলে রেগে যাবে কিংবা ওর সাথে কথাই বলতে চাইবে না। সেখানে এরকম আচরণ তো আকাশ কুসুম কল্পনার মত। অবশেষে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো! তবে কি শীতুল এই কয়েকদিনে শ্রবণাকে নিয়ে ভেবেছে? সেও কি মনে মনে চেয়েছিলো শ্রবণার সাথে আচমকা দেখা হয়ে যাক? উফফ আর ভাবতে পারছে না শ্রবণা। আনন্দে, উত্তেজনায় পাগল হয়ে যাচ্ছে যেন।

বিছানায় শুয়ে অনেক্ষণ চুপ করে রইলো। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। অনেকদিন পর বুক ভরে নিশ্বাস নিলো শ্রবণা।

চলবে..