প্রিয় অসুখ পর্ব ১৮

0
406

প্রিয় অসুখ
পর্ব ১৮
মিশু মনি
.
১৯
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে গেলো শীতুলের। চোখ মেলে দেখলো রুম ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাখিদের নীড়ে ফেরার শব্দে চারিদিক মুখরিত হয়ে আছে। মনে পড়ে গেলো শ্রবণার কথা। তখন শ্রবণা রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শীতুল শুয়ে একটা লম্বা ঘুম দিয়েছিলো। শ্রবণা কোথায় আছে দেখতে হবে তো।

বিছানা থেকে উঠে বাড়ির সবগুলো কক্ষে শ্রবণাকে খুঁজছিলো শীতুল। কোথাও না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। রান্নাঘরে হাসির শব্দ শুনে এসে দেখলো শ্রবণা কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে দিয়ে মায়ের সাথে রান্না করছে। দৃশ্যটা মুহুর্তেই মুগ্ধ করে ফেললো শীতুলকে। পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কোনো মেয়েকে কোমরে আঁচল গুঁজে রান্না করতে দেখা। গালের দুপাশে চুলের চিকন দুটো গোছা তারের মত ঝুলে আছে। কিছু চুল এলোমেলো হয়ে আছে কানের পেছনে। চুলের খোপায় শিউলী মালা শুকিয়ে জবুথবু হয়ে আছে। মেয়েটা রান্না করছে খুব আগ্রহ আর আনন্দ নিয়ে। আহা! এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বোধহয় আর হয় না। মন ভালো করার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট।

শীতুলকে দেখে শ্রবণা ম্লান হাসলো। শীতুলও হাসির বিনিময়ে হাসি ফেরত দিলো। শ্রবণা বললো, ‘হাতমুখ ধুয়ে আসুন।’

শ্রবণার কথা শুনে মা দরজার দিকে তাকালেন। শীতুলকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘কি রে কখন উঠলি ঘুম থেকে? কি লম্বা ঘুম দিয়েছিলি বাবাহ!’
-‘এইতো এইমাত্র উঠলাম। তোমাদেরকে হেসেখেলে রান্না করতে দেখে কি মনে হচ্ছে জানো মা?’
– ‘কি?’

শীতুল কাছে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মনে হচ্ছে ছোট ছোট দুটো বালিকা রান্নাবাটি খেলছে।’
– ‘পাগল ছেলের কথা শুনেছিস শ্রবণা?’
– ‘হ্যাঁ শুনলাম তো। পাগল ছেলে, আপনি দয়া করে হাতমুখ ধুয়ে আসবেন প্লিজ?’
– ‘যাচ্ছি যাচ্ছি।’
শীতুল হাতমুখ ধুতে চলে গেলো। যাওয়ার সময় একবার পিছন ফিরে তাকালো। শ্রবণা হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে আছে শীতুলের দিকে।
নাস্তা করার সময়েও শীতুল খেয়াল করে দেখলো শ্রবণা আজকে অনেক হাসিখুশি। এত আনন্দিত দেখাচ্ছে কেন কে জানে। পাক্কা গৃহিনীর মত কাজে লেগে পড়েছে একেবারে।

রাত্রিবেলা শ্রবণা ওর অনেক আগের একটা ফেসবুক আইডিতে লগ ইন করে আইডি নাম বদলে ফেললো৷ আইডিতে পোস্ট করা সমস্ত ছবি ডিলিট করে দিলো। যতগুলো প্রোফাইল পিক ছিলো সব অনলি মি করে দিয়ে একটা অন্ধকার ছায়ায় একটি মেয়ের ছবি দিয়ে প্রোফাইল পিক আপডেট করে দিলো। তারপর শীতুলের আইডি খুঁজে বের করে একটা টেক্সট পাঠিয়ে লিখলো, ‘আপনার সাথে কথা ছিলো।’

শীতুল অনলাইনেই ছিলো। মেসেজ দেখে রিপ্লাই দিলো, ‘জ্বি বলুন। কে আপনি?’
– ‘মেসেজে এতকিছু বলা সম্ভব না। আপনার বাসার ঠিকানাটা দিন।’
– ‘আমার বাসা! আগে আপনার পরিচয় দিন? আর কি দরকার বলুন?’
– ‘আপনার ঠিকানায় একটা উপহার পাঠাবো। দয়া করে ঠিকানাটা দিন। আমি বেশিক্ষণ ফেসবুক চালাতে পারবো না। তারাতাড়ি দিন।’

শীতুল কোনোকিছু না ভেবে এখন যেখানে আছে সেখানকার ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিলো৷ এরপর অনেক্ষণ অপেক্ষা করলো কিন্তু মেসেজের কোনো রিপ্লাই পেলো না। হতাশ হয়ে অনলাইন থেকে বেরিয়ে এলো শীতুল। ঘুম আসছে না। শ্রবণার সাথে গল্প করার ইচ্ছা নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে এলো ও।

শ্রবণা দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়েছে। শীতুল দরজায় ঠকঠক শব্দ করে জানতে চাইলো, ‘জেগে আছো?’

শ্রবণার উচ্চস্বরে হাসির শব্দ শোনা গেলো। কৌতুহলী হয়ে কান খাড়া করলো শীতুল। দরজা খুলে গেলো এমন সময়। শীতুলকে দেখেও শ্রবণার হাসি থামছিলো না।
শীতুল বললো, ‘কি হয়েছে?’
– ‘আমি ভূল শুনেছিলাম তাই হাসছি।’
– ‘মানে?’
– ‘আপনি বলেছিলেন জেগে আছো? আমি শুনেছি হেগে আছো? হা হা হা..’

শ্রবণার কথা শুনে শীতুলও হেসে উঠলো। হাসি থামতেই শ্রবণা বললো, ‘এত রাতে আমার রুমে?’
– ‘ঘুম আসছিল না। ভাবলাম কিছুক্ষণ গল্প করে আসি।’
– ‘ভালো করেছেন। বসুন, চা খাবেন?’
– ‘এখন আবার কষ্ট করবে?’
– ‘কারো কারো জন্য কষ্ট করতে পারাটা সৌভাগ্যের। খাবেন নাকি সেটা বলুন?’

শীতুল মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বললো। শ্রবণা রান্নাঘরে গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চা বানিয়ে হাজির। এসে দেখলো শীতুল রুম অন্ধকার করে বসে আছে। জানালা দিয়ে বাইরে থেকে দূরের আলো এসে পড়েছে রুমে। সেই আলোতে শীতুলের মুখশ্রী আবছা দেখাচ্ছে। শ্রবণা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘আলো জ্বেলে দি?’
– ‘কিসের আলো?’
– ‘জীবনের আলো তো জ্বালতে পারবো না। আপাতত রুমের আলোটাই জ্বালাই না হয়।’
– ‘জীবনের আলো জ্বালাতেও তো আমি বাঁধা দেই নি।’
– ‘বাঁধা না দিলেও অনুমতি তো দেন নি।’
– ‘সবকিছুর জন্য অনুমতির প্রয়োজন আছে?’
– ‘অনুমতি ছাড়া কিছু কিছু কাজ করাও ঠিক না। চা কেমন হয়েছে?’

শীতুল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো, ‘ভালো হয়েছে।’
– ‘থ্যাংক্স বলবেন না?’
– ‘সন্ধ্যাবেলা থেকে তোমাকে অনেক উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। এত আনন্দের কারণ কি জানতে পারি?’

শ্রবণা হেসে উঠলো। অকারণে অনেক্ষণ ধরে হাসতেই লাগলো। শীতুল শুধু অবাক হয়ে যাচ্ছে ওর হাসি দেখে। মেয়েটা পাগল হয়ে গেলো নাকি?
শ্রবণা বলল, ‘আমি ঠিক করেছি এখন থেকে সবসময় আনন্দে থাকবো।’
-‘অভিনয় করে আনন্দে থাকার উপকারিতা আছে?’
– ‘আছে। অভিনয় করতে করতে আনন্দে থাকাটা একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। হা হা হা।’

শীতুল উঠে এসে শ্রবণার বাহু স্পর্শ করে বললো, ‘কি হয়েছে তোমার?’

শ্রবণা একহাতে চায়ের কাপ ধরে আরেকহাতে শীতুলের হাত মুঠো করে ধরলো। শীতুল আরো কাছে এগিয়ে এসে বললো, ‘এমন অচেনা লাগছে কেন তোমাকে?’
– ‘টুউয়ু, টুউয়ু..’

শীতুল আরো ভড়কে গেলো। শ্রবণা কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো, ‘ভয় পাবেন না। রেড সিগনাল বাজছে। অন্ধকারে কাছে আসতে নেই। বিপদ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।’
– ‘দুষ্টু মেয়ে।’

শীতুল শ্রবণার হাত ছেড়ে দিলো। শ্রবণা শব্দ করে হাসতেই লাগলো, হাসতেই লাগলো। শীতুল একহাতে শ্রবণাকে হেচকা টানে বুকের উপর টেনে নিয়ে বললো, ‘হয়েছে টা কি তোমার বলোতো? খাবার টেবিলেও হা হা করে হাসছিলে।’

শ্রবণাকে হেচকা টানে বুকে টান দিতেই শ্রবণার কাপ থেকে ছলকে কিছুটা গরম চা শীতুলের বুকের উপর পড়েছিলো। শ্রবণা শীতুলের কথার উত্তর না দিয়ে বললো, ‘বুকটা পুড়ে যাচ্ছে।’
– ‘সেজন্য হাসছো?’
– ‘আমার না, আপনার বুকটা পুড়ে যাচ্ছে। গরম চা পড়েছে টের পাননি?’
– ‘পড়ুক। তোমার কি হয়েছে সেটা বলো?’

শ্রবণা হাসতে হাসতে বললো, ‘আমার কিছু হয়নি। আর বেশিক্ষণ এভাবে কাছাকাছি থাকলে আপনার কিছু হয়ে যাবে। সবচেয়ে ভালো হয়, রুমের লাইটটা জ্বালিয়ে দি।’

শ্রবণা শীতুলের কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো। রুমের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে শীতুলের থেকে খানিকটা দূরে বিছানার এক কোণে বসলো। শীতুল বসলো চেয়ারের উপর। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো, ‘আমার অন্ধকারে গল্প করতে ভালো লাগে।’
শ্রবণা দুম করে প্রশ্ন করে বসলো, ‘মেয়েদের সাথে?’

শীতুল ভ্রু কুঁচকে শ্রবণার দিকে তাকালো। মনমরা বিষন্ন মেয়েটা আজ কেমন উৎফুল্ল হয়ে গেছে। উচ্ছলতায় ফেটে পড়ছে একেবারে। চোখেমুখে আনন্দের জোয়ার। কি সুখে তার এত উন্নতি হয়েছে কে জানে!

শ্রবণা চায়ের কাপটা রেখে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। জানালা থেকে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো, ‘আজ কি পূর্ণিমা?’
– ‘জানিনা।’
– ‘বাইরে কুয়াশা পড়েছে না?’
– ‘হুম।’
– ‘বাইরে হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করছে। মফস্বলের রাস্তায় কুয়াশাভেজা রাতে হাঁটতে অনেক মজা জানেন?’

শীতুল এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। শ্রবণাকে এত উচ্ছ্বসিত দেখানোর রহস্যটা নিয়েই ভাবছে ও। চেনা মেয়েটাও হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে। শ্রবণা কিছুক্ষণ জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে শীতুলের কাছে এগিয়ে আসলো। ওড়না দিয়ে শীতুলের বুক থেকে চা মুছে দিতে দিতে বললো, ‘এই দাগ যাবে না।’
– ‘যাবে।’
– ‘আমার বুকের ভেতর যে দাগ হয়ে গেছে সেটা?’

শীতুল চমকালো। শ্রবণার চোখের দিকে তাকাতে গিয়েও তাকাতে পারলো না। শ্রবণা ম্লান হেসে বললো, ‘অনেক রাত হয়েছে। রুমে যান এখন। আপনার ডায়েরিটা আপনার বালিশের পাশেই রেখে এসেছি। খুলেও দেখিনি।’
– ‘কেন?’
– ‘ক্ষতটায় নুনের ছিটা দিয়ে জ্বালাটা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সেটাতে মলমের কথা বলে মরিচ লাগাতে আসবেন না যেন।’

শীতুল উত্তর দিলো না। সত্যি বলতে কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না। শ্রবণার ব্যাপারটা ভাবলে ওর নিজেরও খারাপ লাগে অনেক। শীতুল ‘সরি’ বলতে যাবে এমন সময় শ্রবণা হো হো করে হেসে উঠলো। হাসি থামিয়ে বললো, ‘আরে মজা করছিলাম। আমি মোটেও মন খারাপ করিনি। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে জানেন তো? মনে হচ্ছে আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়ে।’
– ‘কেন মনে হচ্ছে?’
– ‘সেটা বলা যাবে না। ভাবছি, আপনার সেই অপরিচিতাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবো।’

শীতুল কিছু বললো না। চায়ের কাপের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থেকে আনমনা হয়ে কি যেন ভাবছিলো। কিছুক্ষণপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘রুমে যাচ্ছি। ঘুমিয়ে পড়ো তুমি।’

শ্রবণাকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। দরজার কাছে গিয়ে আরেকবার ফিরে তাকালো শীতুল। শ্রবণা হাসার চেষ্টা করলো। হাসির বিনিময়ে এবার হাসি এলো না শীতুলের। ও ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেলো। শ্রবণা চেয়ারে বসে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। একটা অন্যরকম আনন্দের স্বাদ পাচ্ছে ও। প্রিয় মানুষটার প্রিয়জন হতে পারার আনন্দে ওর পুরো শরীর শিহরিত হচ্ছে। আনন্দে আজ সারারাত হয়তো ঘুম আসবে না।

২০
মাঝখানে দুটো দিন কেটে গেলো। শ্রবণার সাথে হাসি আনন্দে ভালোই সময় কাটছিলো শীতুলের।

দুদিন পর হঠাৎ একটা পার্সেল এলো শীতুলের নামে। শীতুল বেশ অবাক হলো। এই বাড়িতে শীতুলের থাকার কথা কারো জানার প্রশ্নই আসে না। এখানে পার্সেল আসবে কোথ থেকে? পার্সেলের উপরে একটা ছোট্ট বাচ্চার হাতের সাইন। ভ্রু কুঁচকে প্যাকেট টা খুলতে লাগলো শীতুল। পরক্ষণেই মনে পড়লো দুদিন আগে একটা মেয়ে ফেসবুকে ঠিকানা নিয়েছিলো। শীতুলের চোখেমুখে কৌতুহল। কাউকে ঠিকানা দিয়েছিলো সেটা তো মনেই ছিলো না।
প্যাকেট খুলতেই একটা কাঁচের কাপল পুতুল ঝিকমিক করে উঠলো। মুগ্ধ হয়ে সাথে থাকা চিঠিটা খুললো শীতুল। চিঠিতে চোখ পড়ামাত্রই হৃদপিন্ড লাফিয়ে উঠলো। কিছুক্ষণের জন্য দম বন্ধ হয়ে গেলো যেন। শীতুলের হাত পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে। শিউরে উঠেছে পুরো শরীর।বসমস্ত ইন্দ্রিয় জুরে একটা অচেনা অনুভূতির খেলা শুরু হয়ে গেলো। সেই চিরচেনা হাতের লেখা। শ্যামলতার চিঠি!
জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখেই চিঠিটা পড়তে শুরু করলো শীতুল।

চলবে..