প্রিয় অসুখ পর্ব ৫

0
305

প্রিয় অসুখ
পর্ব ৫
মিশু মনি
.
শীতুল রিসোর্ট ছেড়ে চলে এসেছে। শ্রবণার সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো ওর ভেতরে দহন শুরু করে দিয়েছিলো। তাছাড়া রাতে হঠাৎ শ্রবণার মন খারাপ হয়ে যাওয়া, বারবার ওর কাছে আসা সবমিলিয়ে মন কেমন করতে আরম্ভ করছিলো। তাই চেয়েছিলো আর কখনো শ্রবণা’র সাথে দেখা না করতে। রিসোর্ট ছেড়ে বের হওয়ার পর মায়ের নাম্বার থেকে কল এলে ও রিসিভ করে বললো,
– ‘আম্মু, আমি ঘুরতে এসেছি। দুটো দিন আমাকে আমার মত থাকতে দিবে প্লিজ? ফোন বন্ধ করে রাখবো।’
– ‘কেন বাবা কোনো সমস্যা?’
– ‘আমার মেন্টাল স্ট্রেস লাগছে। প্লিজ আমি দুটো দিন আমার নিজেকে সময় দিই?’

মায়ের সাথে কথা বলে ফোন বন্ধ করে রাখলো শীতুল। মনের অবস্থা ভীষণ খারাপ। শ্রবণার কণ্ঠ, চেহারা এখনো চোখে ভাসছে। যেভাবেই হোক শ্রবণার স্মৃতি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। একা থাকলে শ্যামলতাকে নিয়ে ভেবে ব্যস্ত থাকলে শ্রবণা’র স্মৃতি ধীরেধীরে মুছে যাবে।

শীতুল কাছাকাছি আরেকটা রিসোর্টে গিয়ে উঠলো। এখানে দুটো দিন আরাম করে থাকা যাবে। এখানে কোনো মেয়ের সাথে সামান্য কথাটুকুও বলবে না, এরকমই সিদ্ধান্ত নিলো ও। মোবাইল ফোন পুরোপুরি বন্ধ করে রাখলো।

এদিকে শ্রবণা’র মনের ভিতর উথাল পাথাল ঝড় বইছে। শীতুলের হঠাৎ চলে যাওয়াটাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ও। নিশ্চয়ই ওর আচরণে বিরক্ত হয়ে চলে গেছে শীতুল। এখন কিভাবে যে যোগাযোগ করা যাবে!

ভাবতেই ম্যানেজারের কথা মাথায় এলো। রিসোর্ট বুকিং দেয়ার সময় নাম, ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দিতে হয়। ম্যানেজারের কাছে নিশ্চয় শীতুলের নাম্বার আছে।
ছুটে ম্যানেজারের কাছে এলো শীতুল। শীতুলের নাম্বার চাইতেই উনি অবাক হয়ে তাকালেন। শ্রবণা বললো, ‘উনি আমার উপর রেগে আছেন। সরি বলতে হবে। প্লিজ ভাইয়া, নাম্বারটা দিন আর মামা কে এ ব্যাপারে কিছু বলবেন না প্লিজ?’

ম্যানেজার আশ্বস্ত করে শীতুলের ফোন নাম্বার দিলো শ্রবণাকে। রিসিপশনে বসেই অনেকবার কল দিলো কিন্তু নাম্বার বন্ধ। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো শ্রবণা’র। সবচেয়ে বড় কথা শীতুলকে হারালে শ্রবণা থাকবে কি নিয়ে? একদিকে ডায়েরি হারিয়ে নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ লাগে। প্রিয় অসুখকে পেয়েও হারিয়ে ফেললে এরচেয়ে খারাপ বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।

শ্রবণাকে বিষণ্ণ মুখে বসে থাকতে দেখে ম্যানেজার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কথা হলোনা?’
– ‘ভাইয়া ওনার নাম্বার বন্ধ। এখন কিভাবে যোগাযোগ করবো আমি?’
– ‘উনি ফেসবুকে আমাদেরকে নক করেছিলেন। চাইলে আমি আইডিটা খুঁজে দিতে পারি।’

শ্রবণার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। উঠে এসে বললো, ‘একটু কষ্ট করে দিতেন যদি। আমার অনেক উপকার হবে।’

শ্রবণা শীতুলের ফেসবুক আইডি নিয়ে সেখানে টেক্সট পাঠিয়ে রাখলো। তারপর গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো শীতুলের জন্য।

ধীরেধীরে সময় বয়ে যেতে লাগলো। শীতুলের কোনো সাড়া নেই। শ্রবণার বুকের ভেতর কেবলই যন্ত্রণা হতে লাগলো । শীতুল যেখানেই থাকুক ফোন নাম্বার কিংবা ফেসবুক আইডিতে অন্তত পাওয়া যাবে। উপায় না দেখে শীতুলের টাইমলাইনে ট্যাগ করা আয়াশ নামে একজনকে নক করলো শ্রবণা। আয়াশের সাথে শীতুলের অনেকগুলো ছবি আছে। আয়াশ নিশ্চয়ই বলতে পারবে শীতুল কোথায় থাকে আর যোগাযোগের উপায় কি?

আয়াশকেও টেক্সট পাঠিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণতে লাগলো শ্রবণা। অবশেষে আয়াশের রিপ্লাই এলো, ‘কে আপনি?’

শ্রবণা কথা বলতে বলতে শীতুলকে ভালোলাগার বিষয়টি বুঝিয়ে বললো আয়াশকে। আয়াশ শীতুলের একমাত্র ভালো বন্ধু। শীতুল গতরাতেই আয়াশকে ফোন দিয়ে শ্যামলতার কথা বলেছে। আয়াশ শ্রবণা’র কথা শুনে বললো, ‘আপনার কথা শুনে মনেহচ্ছে আপনি শীতুলকে অনেক পছন্দ করেন। কিন্তু শীতুল তো একজনকে ভালোবাসে।’

শ্রবণা’র হৃদয়ে ধাক্কা লাগলো এসে। শীতুল অন্য কাউকে ভালোবাসেই বলে ওর সাথে ভাব জমাতে চায় নি। এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক টাকেও অসহ্য লাগছে শ্রবণার। কারণ শীতুল তো আর সবার মত নয়। ও শ্রবণার সেই অসুখ যাকে নিয়ে দীর্ঘ কতগুলো বছর শ্রবণা স্বপ্ন দেখে আসছে। এখন কি হবে!

সারারাত কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেললো শ্রবণা। শীতুলের সাথে আর যোগাযোগের চেষ্টা না করাই ভালো। শ্রবণা ওকে দূর থেকেই ওকে ভালোবেসে যাবে। ভালোবেসে ফেলেছেই যখন, চাইলেই তো মানুষটাকে ভুলতে পারবে না। সে স্বপ্নের মানুষ, নাহয় স্বপ্নেই থাকুক।


শীতুল তিন দিন রিসোর্টে কাটালো। এই তিনদিন শ্যামলতার ডায়েরিতে ডুবে ছিলো ও। ডায়েরির প্রত্যেকটা চিঠি, প্রত্যেকটা লাইন আত্মস্থ করে ফেলেছে। শ্যামলতা এখন শীতুলের সবকিছু জুরে বিরাজ করছে। যেভাবেই হোক, তাকে খুঁজে পেতেই হবে। সবখানে শীতুলের চোখ শ্যামলতাকে খুঁজছিলো।
দেখতে দেখতে একটা সপ্তাহ কেটে গেলো। শীতুল এই কয়েকদিন রাঙামাটি, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে চট্টগ্রামে এক বন্ধুর বাসায় এসেছিলো।

ঘোরাঘুরি শেষ করে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে ঢাকায় ফিরছিলো শীতুল। ট্রেন ছাড়লে নিজের সিটে গিয়ে বসলো। জানালার পাশের সিট টা ফাঁকা। শীতুল সেখানে বসে জানালা দিয়ে বাইরে মাথা বের করে দিলো। শিরশির করে হাওয়া এসে কানে লাগছে। শীতুলের মন খুব করে চাইছিলো শ্যামলতার দেখা পেতে। এই কয়েকদিন বিভিন্ন জায়গায় শ্যামলতাকে খুঁজেছে শীতুল। ট্রেন জার্নিতে কত মানুষের সাথে দেখা হয়। যদি শ্যামলতার সাথে দেখা হয়ে যেতো!

– ‘এক্সকিউজ মি, ওটা আমার সিট।’

চমকে ফিরে তাকালো শীতুল। একি! শ্রবণা!

শ্রবণা একপলক দেখেই কেঁপে উঠলো। মনেমনে বললো, ‘হোয়াট এ কোয়িন্সিডেন্ট! আমি শীতুলের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাইনি। শেষে বাধ্য হয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবো না এমন পণ করেছিলাম। অথচ ভাগ্য আজকে আবার আমাদেরকে একসাথে নিয়ে এলো। প্রকৃতি যে কি চাইছে!’

শীতুল পুরোপুরি স্তব্ধ। শ্রবণা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বললো, ‘আমার সিট।’
শীতুল সিট ছেড়ে উঠে এলো। শ্রবণা ব্যাগ রেখে নিজের আসনে গিয়ে বসলো। জানালায় হাতের উপর মাথা রেখে বাইরে তাকালো। বেশ বুঝতে পারলো ওর চোখ ভিজে উঠছে।

শীতুল এখন অপ্রস্তুত বোধ করছে। যে মেয়েটার সামনে আর পড়তে চায় না বলেই তাড়াতাড়ি রিসোর্ট ছেড়ে চলে আসলো। অথচ তার সাথেই আবার দেখা। তাও আবার এমন পরিস্থিতিতে যখন চাইলেও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কেন যে এমন হয়!

শ্রবণা কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। ইয়ারফোন কানে গুঁজে দিয়ে গান শুনতে শুনতে বাইরে তাকিয়ে রইলো। বাতাসে এলোমেলোভাবে চুল উড়ছে। শীতুল শ্রবণাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নিজেও ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। গত এক সপ্তাহ ফোন পুরোপুরি বন্ধ ছিলো। এর মধ্যে দোকানের ফোন থেকে দুইবার মাকে কল দিয়ে কথা বলেছিলো শীতুল। নিজের ফোন খোলার প্রয়োজন মনে করেনি। ফোন খুলে সর্বপ্রথম মাকে কল দিলো।

শীতুল ফোনে কি কথা বললো শ্রবণা শুনতে পেলো না। ওর কানে ইয়ারফোন। শীতুল মায়ের সাথে কথা বলা শেষ করে দেখলো মিসড কল এলার্টের এসএমএস। একটা নাম্বার থেকে অনেকবার ফোন করা হয়েছিলো। এতবার ফোন করার মত কে আছে ওর? অবাক হয়ে সেই নাম্বারে কল দিলো শীতুল।

শ্রবণা’র ফোন বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে শীতুলের দিকে তাকালো শ্রবণা। শীতুল শ্রবণা’র চোখ দেখে ওর ফোনের দিকে তাকালো। দেখলো ফোনটা বেজে চলেছে। কল কেটে যাওয়ায় শীতুল আবারো কল দিলো সেই নাম্বারে। শ্রবণা অবাক হয়ে শীতুলের দিকে তাকিয়েই আছে। এবার আর কিছু বোঝার বাকি নেই। শ্রবণা এত বার ফোন করেছিলো!

শীতুল বললো, ‘আপনি! কিন্তু কেন?’
শ্রবণা মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকালো। শীতুল স্তব্ধ।

ফোন পকেটে রেখে শীতুল জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাকে ফোন করার কারণ?’
– ‘এতদিন পর!’
– ‘ফোন বন্ধ ছিলো। কেন ফোন দিয়েছিলেন?’
– ‘সরি বলার জন্য।’
– ‘সরি! কেন?’
– ‘আমি ভেবেছিলাম আমার আচরণে বিরক্ত হয়ে আপনি চলে গেছেন। তাই।’

শীতুল আর কথা বাড়ালো না। চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিলো। শ্রবণা ইয়ারফোন কানে গুঁজে দিয়ে আবারো বাইরে তাকালো। নিজেকে নিয়ে অপ্রস্তুত বোধ করছে শ্রবণা। এদিকে শীতুলেরও একই অবস্থা। একটা মেয়ের সামনে এভাবে অপ্রস্তুত হতে হবে সেটা কখনো ভাবেনি ও।

চলবে..

(অনেক তাড়াহুড়ো করে লেখা। ভুল ত্রুটি মার্জনীয়।ধন্যবাদ ?)