প্রিয় অসুখ পর্ব ৭

0
320

প্রিয় অসুখ
পর্ব ৭
মিশু মনি
.

শ্রবণা গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেছে। কিন্তু চোখেমুখে অতৃপ্তির ছায়া। শীতুলের বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে এখন। এত সুন্দর একটা মেয়ে কেন এরকম সবসময় হতাশায় ভোগে? সুন্দর মেয়েদের সবসময় হাসিখুশি আর ফুরফুরে থাকা উচিত। তাহলে দেখতে আরো সুন্দর লাগবে। শ্রবণার চেহারাটা আদরমাখা। ছোট্ট লম্বা নাক, চিকন মেদহীন চিবুক। ওকে একবার বলতে হবে যেন সবসময় হাসিখুশি থাকে। হাসলে গালে টোল পড়ে কিনা খেয়াল করা হয়নি। না পড়ারই কথা। টোল পড়বে নাদুসনুদুস গালে, মেদহীন গালে টোল পড়ে কিনা শীতুলের জানা নেই।

শ্রবণার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো শীতুল৷ ইয়ারফোনে গান বেজে চলেছে,
‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি তোমায়..
দেখতে আমি পাইনি।
বাহির পানে চোখ মেলেছি, বাহির পানে..
আমার হৃদয় পানে চাইনি…’

গানটা শুনতে শুনতে আরেকবার শ্রবণার দিকে তাকালো শীতুল। তারপর মনে মনে বললো, ‘কত মেয়ে দেখি, কত মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। অথচ কোন দূরত্বের এক অজানা অচেনা মেয়ে আমার হৃদয় হরণ করে নিলো। না জানি নাম, না জানি পরিচয়। কিভাবে তাকে খুঁজে পাবো আল্লাহ ই জানেন। এবার বোধহয় বিজ্ঞাপনে নামতে হবে।’

শীতুল অজান্তেই হেসে উঠলো। ট্রেন সুন্দর গতিতেই চলছিলো। হঠাৎ একদিকে বাঁকা হয়ে কেঁপে উঠলো পুরো কক্ষ। শ্রবণা চমকে ঘুম থেকে উঠে শীতুলের দিকে তাকালো। শীতুলও কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। বেশিরভাগ যাত্রীরাই ঘুমে অচেতন ছিলো বলে প্রত্যেকেই চোখ কচলে তাকাচ্ছেন। ট্রেন কেঁপে কেঁপে চলছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই, শুধু চোখে কৌতুহল।

এমন সময় ট্রেনের গতি কমে এলো। অনেক বড় হুইসেল দিয়ে থেমে গেলো হঠাৎ। শ্রবণা ভয় ভয় চোখে শীতুলের দিকে তাকালো। শীতুল শ্রবণাকে অভয় দিয়ে বললো, ‘ডোন্ট ওরি, কিচ্ছু হয়নি।’
– ‘তাহলে ট্রেন থামলো কেন?’
– ‘মাঝেমাঝে এরকম থেমে যায়। ভয়ের কিছু নেই। একটু পরেই আবার ছাড়বে।’

শ্রবণা আশ্বস্ত হয়ে মাথা নিচু করলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেই শীতুল বললো, ‘আপনাকে বারণ করেছিলাম এত বড় শ্বাস না ফেলার জন্য।’

শ্রবণা হাসার চেষ্টা করে বললো, ‘সরি। আর হবেনা।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেনের কক্ষে গুঞ্জন শুরু হলো। নিশ্চয় কিছু একটা হয়েছে। শীতুল শ্রবণাকে ইশারায় শান্ত থাকতে বলে সিট ছেড়ে উঠে এলো। উঠে এসে যা শুনলো তাতে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো ওর। ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে গেছে! একটি রোড সিগনাল পার হতে গিয়ে রাস্তায় উঠে গিয়েছিলো ট্রেন। গত সাতাশ বছরের জীবনে শীতুল এরকম ঘটনা কখনো শোনেনি। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করে উঠলো। অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়ায় আল্লাহ তায়ালাকে ধন্যবাদ জানালো শীতুল।

সিটে ফিরে এসে শ্রবণাকে খুলে বললো ব্যাপারটা। শুনে শ্রবণার নিজেরও শরীর কাটা দিয়ে উঠলো। বাস এক্সিডেন্ট হয়, লঞ্চ এক্সিডেন্ট হয় এরকম অনেক শুনেছে ও। কিন্তু ট্রেনের লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম শুনলো। বুক কেঁপে গেলো ওর।

শীতুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ট্রেন থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। শ্রবণা কৌতুহলী চোখে তাকাচ্ছে কিন্তু কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। শীতুল কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে সিটে রেখে বললো, ‘এটা একটু দেখে রাখবেন প্লিজ? আমি দেখে আসছি একবার।’

শ্রবণা মাথা ঝাঁকালো। শীতুল নেমে গিয়ে দেখে এলো। বড়সড় দূর্ঘটনা ঘটতে পারতো। কতক্ষণে ট্রেন ছাড়বে বোঝা যাচ্ছে না। তবে যখনই ছাড়ুক, আর ভরসা পাচ্ছে না শীতুল। এখনই নেমে আসতে হবে, বাকিটা পরে দেখা যাবে।

ট্রেনে উঠে ব্যাগ কাঁধে নিতে নিতে শীতুল শ্রবণাকে বললো, ‘বড়সড় এক্সিডেন্ট থেকে বেঁচে গিয়েছি।’

হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বললো, ‘রেললাইন এটা অথচ ট্রেন গেছে এই জায়গা দিয়ে। ভাবা যায়? আমার তো দেখেই হাত পা শিরশির করছে।’

শ্রবণা মুখ কাচুমাচু করে তাকিয়েই রইলো। শীতুল পানির বোতল ব্যাগে তুলতে গিয়ে আবার সিটে রেখে বললো, ‘এটা রাখুন আপনার কাছে।’
– ‘আপনি? কোথায় যাচ্ছেন?’
– ‘আমি বাস ধরে ঢাকায় চলে যাবো।’
– ‘তাহলে আমিও যাবো। আমাকে ফেলে যাবেন না প্লিজ।’

শীতুল ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘আপনাকে! সমস্যা নেই, ট্রেন দ্রুত ছাড়বে। টেনশন করবেন না..’
– ‘এখন ট্রেনে বসে থাকতেও আমার ভয় হচ্ছে। কিন্তু নেমে গিয়ে কি করবো বুঝতে পারছি না। আপনার সাথে না নিলেও চলবে, অন্তত একটা বাসে তুলে দিন আমাকে।’

শীতুল কি বলবে বুঝতে না পেরে বললো, ‘হুম আসুন।’

শ্রবণা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শীতুলের সাথে নেমে এলো। রাস্তার কোন জায়গা দিয়ে ট্রেন গেছে সেটা দেখিয়ে দিলো শীতুল। রাত হলেও লোকজনের ভীড় জমে গেছে। যাত্রীরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় হাঁটাহাঁটি করছে দেখে শ্রবণার আরো মন কেমন করতে শুরু করলো। এত গুলো মানুষ এখন কি করবে সেটা ভেবেই অস্থির লাগছে। হয়তো তারাতাড়ি ট্রেন ছাড়ার ব্যবস্থা করা হবে তবুও অশান্তি লাগছে। সব যাত্রীর মনের অবস্থা হয়তো এরকম। তার উপর এখন মাঝরাত। এরকম বিপদে এর আগে কখনো পড়েনি শ্রবণা।


রাত ১ টা
দুজনে হাইওয়ের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে। শীতুলের ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। এমনিতেই গত কয়েকদিন থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভেবেছিলো সকালে বাসায় পৌঁছে একটা ফ্রেশ ঘুম দেবে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো বাসই থামানো যাচ্ছে না।

শ্রবণা বললো, ‘আমার না খুব মজা লাগছে।’
– ‘মজা লাগছে? মজা করতে মজা লাগছে?’
– ‘না সত্যি মজা লাগছে। এরকম সিচুয়েশনে আগে কখনো পড়া হয়নি তো। ব্যাপারটা সিনেম্যাটিক হয়ে গেলো না? একটা ছেলে, একটা মেয়ে। হাও ইন্টারেস্টিং!’

শীতুল ঠোঁট বাঁকা করে হেসে বললো, ‘মেয়েরা এরকমই হয়। একটু বাদে হয়তো বলবেন আমি আপনাকে লাইন মারার চেষ্টা করছি।’
– ‘নাহ এটা বলবো না। এটা হলে অবশ্য ভালোই হতো। আমি তো সেটাই চাই। কিন্তু আমি জানি সেটা কখনো হবে না।’

শীতুল অবাক হয়ে বললো, ‘সেটাই চান মানে!’
– ‘না মানে একটা মেয়ে তো চাইবেই একটা ছেলে তাকে পটানোর চেষ্টা করুক।’
– ‘হায়রে। মহিলা মানুষ দের মাথায় কি যে ঘোরে…’
– ‘দেখুন আমাকে মহিলা বলবেন না, আমি মেয়ে। যুবতী মেয়ে।’
– ‘হুহ তা তো বুঝতেই পারছি। মহিলা হলে ভয়ে কাঁপতেন। আনন্দ হচ্ছে কোন আক্কেলে বুঝতে পারছি না।’
– ‘এডভেঞ্চার এডভেঞ্চার লাগছে আনন্দ হবে না? আনন্দ হতে আবার আক্কেলের কি দরকার?’
– ‘আক্কেল জিনিসটা.. থাক এসব নিয়ে কথা বলতে চাইনা।’
– ‘আমি জানি কি বলতে চান। মেয়েদের আক্কেল কম থাকে এটাই তো?’

শীতুল ঠোঁট বাঁকা করে বললো, ‘অদ্ভুত মেয়ে আপনি। একটা এসি বাস আসছে দেখি পাওয়া যায় কি না।’

এবারের বাসটাকে থামানো গেলো। সিটও পাওয়া গেলো, একটা সামনে আরেকটা পিছনের দিকে। ভাড়া ঠিক করে উঠে পড়লো দুজনে। শ্রবণাকে সামনের দিকে সিটে বসিয়ে রেখে পিছনের সিটে বসলো শীতুল। ‘ফি আমানিল্লাহ’ বলে যাত্রা শুরু করলো। এ যাত্রা যেন শুভ হয়।

শীতুল সমস্ত উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তাকে বিদায় দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো। শ্রবণা একবার পিছন ফিরে শীতুলকে খোঁজার চেষ্টা করছিলো কিন্তু বাসের লাইট নিভিয়ে দিয়েছে। শীতুল যেখানেই বসুক, একই বাসে আছে তো। এই ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিলো শ্রবণা। বাসের শীতল পরিবেশে দ্রুত ঘুম নেমে এলো চোখে।

ঘুম ভাংলো শীতুলের ডাকে। শ্রবণা চোখ পিটপিট করে বললো, ‘আবার কি হয়েছে?’

শীতুল হেসে বললো, ‘ফুড ভিলেজ। ফ্রেশ হবেন না? কিছু খেয়ে নিন আসুন।’

শ্রবণা মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে পড়লো৷ রেস্টুরেন্টে একসাথে বসে নাস্তা করা পর্যন্ত দুজনের মধ্যে তেমন কোনো কথা হচ্ছিলো না। শুধু ‘হ্যা’, ‘না’ আর জরুরি দু একটা প্রশ্ন। শ্রবণা আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চাইছে না। বললেই আবার অদ্ভুত প্রজাতি বলে বিরক্তি প্রকাশ করবে। এমনিতেই লোকটাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।

নাস্তা করার পর শীতুল শ্রবণাকে বাসে উঠতে বলে দোকানের দিকে এগোলো। শ্রবণা ঠায় দাঁড়িয়েই রইলো সেখানে। শীতুল কি করছে অজান্তেই সেটা খেয়াল করছে ও।

শীতুল দোকান থেকে একটা পানীয়ের বোতল কিনে ঢকঢক করে গিলে কুলি করে ফেলে দিলো। দূর থেকে দেখে মুচকি হাসলো শ্রবণা। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে এসে বাসে উঠলো। শীতুল বাসে উঠে শ্রবণার হাতে দুটো চকোলেট দিয়ে বললো, ‘আবার ঘুমান। আশাকরি ঘুম থেকে উঠে দেখবেন ঢাকায় পৌঁছে গেছি।’

শ্রবণা ধন্যবাদ জানানোর আগেই শীতুল নিজের আসনে চলে এলো। মাথা ঘুরিয়ে পিছনে শীতুলকে একঝলক দেখে নিলো শ্রবণা। ছেলেটাকে প্রথম দেখেই প্রিয় অসুখ মনে হয়েছিলো। এখনও মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রিয় অসুখ অন্য কাউকে ভালোবাসবে এরকম কথা তো কখনো ছিলো না। কাউকে এভাবে ভালোবাসার পরও তাকে না পাওয়ার কথা ভাবতে পারে না শ্রবণা। শীতুলকে জানানোর আগেই সে হারিয়ে গেলো। আজকের পর আর হয়তো কখনো দেখাও হবেনা। অন্য কোনো ছেলে হলে এতক্ষণে আগ্রহ করে ভাব জমাতো, রোমান্টিক মুডে কথা বলতো, পটানোর চেষ্টা করতো। শীতুল মোটেও সেরকম নয়। বরং শ্রবণাকে নিয়ে আরো বিরক্ত মনে হচ্ছে।

বাস ছেড়ে দিলে শ্রবণা আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলো। শীতুলকে নিয়ে আর একটুও ভাবতে চায় না ও। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করাও বৃথা। তারচেয়ে বরং সময়ের উপর ছেড়ে দেয়া যাক। কিছু কিছু ব্যাপার সময়ের উপর ছেড়ে দেয়াই ভালো। সময় হয়তো শীতুলকে পাইয়ে দেবে কিংবা আস্তে আস্তে ভুলিয়ে দেবে। সময় সেই কাজটাই করবে যেটা শ্রবণার জন্য ভালো হবে। মনকে এভাবে সান্ত্বনা দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো শ্রবণা।

চলবে..