প্রিয় অসুখ পর্ব ৯

0
330

প্রিয় অসুখ
পর্ব ৯
মিশু মনি
.
নাস্তা করার পর শীতুল শ্রবণাকে ডেকে নিজের ঘরে নিয়ে এলো। শীতুলের ঘরের পরিবেশ দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলো না শ্রবণা। সবখানে এক ধরণের শিল্পের ছোঁয়া। দেয়ালে টাঙানো শীতুলের ছবি দেখে অবাক হয়ে শ্রবণা বললো, ‘এটা আপনার! ও মাই গড! আপনি বিতর্ক করতেন?’

শীতুল বললো, ‘হুম। ন্যাশনাল প্রাইজ পেয়েছিলাম। এটা সেই ছবিটাই।’
– ‘দেখে বোঝাই যায় না।’
– ‘দেখে অনেক কিছুই বোঝা যায় না। ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কভার।’
– ‘হুম এটা সত্য। আপনার রুমটা কিন্তু অনেক সুন্দর।’

শ্রবণা শীতুলের বইয়ের তাকের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে রইলো। সবগুলো বইয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো৷ মুচকি হেসে বললো, ‘পাঠক হিসেবেও অনেক ভালো মনে হচ্ছে।’
– ‘ভালো পাঠক না হলে কি ভালো বিতার্কিক হওয়া যায়?’
– ‘তাও ঠিক। আমি বরং আন্টির সাথে গল্প করি। আপনি ঘুমাবেন বলেছিলেন।’
– ‘আপনার ঘুম পায় নি?’
– ‘না। আপনি ঘুমান, আমি আন্টির সাথে কথা বলি। কখন উঠবেন তা তো জানিনা, আমি কিন্তু নয়টা বাজলেই চলে যাবো।’

শীতুল বিছানার উপর উঠে বসতে বসতে বললো, ‘যাবে তো অবশ্যই। প্রথমবারের মত এসেছো, দুপুরে খেয়ে যেও।’
– ‘প্রথমবারের মত? তারমানে পরে আরো আসাও হতে পারে?’
– ‘হোয়াই নট? আমার ঘরে আপনার মত একজন বন্ধুর পদস্পর্শ মাঝেমাঝে দরকার।’
– ‘তাই নাকি? তাহলে তো আসতেই হয়। আপনি সম্ভবত তুমি আর আপনি নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছেন। বন্ধুত্ব হলোই যখন, তখন আপনিটা বাদ দিলেই পারেন।’

শীতুল হাসলো। বিছানার পাশে রাখা গিটার নিয়ে টুংটাং করে কোলের উপর রেখে সেটাতে হাত বুলাতে লাগলো। শ্রবণা কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইলো, ‘গিটার ভালোবাসেন?’
– ‘হ্যাঁ। অনেকদিন ধরা হয় নি।’
– ‘আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি? আপনি একা একা রাঙামাটি কেন গিয়েছিলেন? ছেলেরা সাধারণত ফ্রেন্ড সার্কেল নিয়ে ঘুরতে যায়।’
– ‘আমার একাকীত্ব ভালো লাগে। আপনারও লাগে সেটা বুঝতে পেরেছি।’

শ্রবণা কিছু না বলে হাসলো৷ শীতুলের ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। শীতুল বিছানায় অর্ধশোয়া অবস্থায় বসে বললো, ‘ম্যাডাম কি কাজ করা হয়?’
– ‘পড়াশোনা এখনো শেষ হয় নি। আপনি?’
– ‘আমি তো বাউন্ডুলে। শেষ করে বসে আছি৷ জবের চেষ্টা করবো করবো করে করা হচ্ছে না। আপনি কি তাহলে এখনই বাসায় যেতে চাচ্ছেন? আপনি না, তুমি।’

শ্রবণা ভেবে বললো, ‘হ্যাঁ। অন্য আরেকদিন আসবো।’
– ‘তাহলে আপনাকে রিক্সায় তুলে দিয়ে এসে ঘুমাবো। এখন মায়ের সাথে বসে একটু গল্প করি।’

শীতুলের মায়ের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে শ্রবণার মনে হচ্ছিলো বহু বছর পর কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে পারছে। অনেকদিন ধরে শ্রবণার কোনো বন্ধু নেই। এরকম একজনের সাথে আড্ডা দিতে পেরে সত্যিই মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠছিলো। গল্প করতে করতে কখন যে সাড়ে দশটা বেজে গেছে শ্রবণা টেরও পায় নি। শেষে আন্টির জেদের কাছে বাধ্য হয়ে দুপুরের খাবার খেয়েই বের হতে হলো শ্রবণাকে। বিদায় নেয়ার সময় শ্রবণা আন্টির হাত ধরে বললো, ‘এ শহরে আমার এমন কেউ নেই যার সাথে মন খুলে দুটো কথা বলতে পারবো। আপনার সাথে কথা বলে কি যে আনন্দ হচ্ছে। আমি কিন্তু মাঝেমাঝে আসবো।’

আন্টি হেসে বললেন, ‘তাহলে ঠিক আছে। না আসলে আমি জোর করে আনতে বলতাম। গল্প করার জন্য তুমিও খারাপ সাথী নও।’

বলেই হেসে উঠলেন। হাসাহাসির পর্ব শেষ হলে শ্রবণাকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো শীতুল। শ্রবণা কি বলবে ভেবেই পাচ্ছিলো না। রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর পর বলেই ফেললো, ‘আমার ফোনে আপনার নাম্বারটা থেকে গেছে। ওটা কি ডিলিট করে দিবো?’

শীতুল কিছু না ভেবেই বললো, ‘ডিলিট করার মত এতটা খারাপ সম্পর্ক আমাদের নয় নিশ্চয়ই?’

শ্রবণা হেসে বললো, ‘সেভ করে রাখার মত ভালো সম্পর্কও নয় নিশ্চয়?’

শীতুল হেসে উত্তর দিলো, ‘এই সম্পর্ককে খারাপ বলার দায়ে তোমার জেল হওয়া উচিত। মাঝেমাঝে আমি ফোন দিবো যাও৷ এবার ভালোমতো বাসায় পৌঁছে আমাকে উদ্ধার করো।’

শেষ কথাটা শুনে শ্রবণার বুকের মাঝে এমন চিনচিন করে উঠলো যে রীতিমতো চোখে পানি এসে গেলো। প্রিয় অসুখ! অসুখটা থেকে থেকে ব্যথা দেয়, যন্ত্রণা দেয়, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।

শীতুল জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হলো?’

শ্রবণা চমকে উঠে অন্যদিকে তাকালো। রিক্সায় ওঠার সময় শ্রবণার বুকের ভেতর দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছিলো যেন। মানুষটা আপন না হলেও সবচেয়ে আপন৷ চলে যাওয়া মানে রেখে যাওয়া, ফেলে যাওয়া। কালই হয়তো অন্য কারো হয়ে যাবে। অবশ্য থেকে গেলেও সে অন্য কারো হবেই। শ্রবণার ভাগ্যে যা থাকবে তার চেয়ে বেশি কিছু তো আর সম্ভব না। এতটুকু হয়েছে এটাই বা কম কিসে৷ মনমরা হয়ে রিক্সায় উঠলো শ্রবণা। রিক্সা অনেকদূর চলে যাওয়ার পর শীতুলের কেন যেন মনে হলো কিছু একটা চলে যাচ্ছে। যেন কত আপন! শ্রবণার মলিন মুখটা বারবার চোখে ভেসে উঠতে লাগলো। কিন্তু যাওয়ার সময় শ্রবণার এত মন খারাপ কেন হলো সেটাই বুঝতে পারলো না শীতুল।

১১
দুদিন পর
শ্রবণা প্রতিমুহুর্তে অপেক্ষা করেছে শীতুলের ফোনের জন্য। কিন্তু কোনো কল আসে নি। নিজে থেকে কল দিয়ে ছোট হতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। দেখাই যাক না সময় কি চায়। শীতুল হয়তো ভুলেই গেছে শ্রবণার কথা। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে বসে থাকা ছাড়া শ্রবণার যেন আর কোনো কাজই নেই। কেউ বোধহয় মন খারাপ করে বসে থাকার জন্য চুক্তি করেছে৷

এদিকে শীতুল এই দুইদিনে পোস্টার ছাপিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় দেয়ালে দেয়ালে লাগিয়ে দিয়েছে। পোস্টারে বড় বড় অক্ষরে লিখেছে,

‘শ্যামলতার ডায়েরি’
একটা ডায়েরি খুঁজে পেয়েছি। ডায়েরির মালিকের নাম শ্যামলতা।

নিচে নিজের ফোন নাম্বার লিখে দিয়েছে শীতুল। কিন্তু দুদিন পরেও কোনো সন্ধান পেলো না। যেকোনো মুহুর্তে কল আসবে সেই আশায় বেচারা বসেই রইলো। কিন্তু হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পরক্ষণে শীতুলের মনে হলো শ্যামলতার ডায়েরি কুড়িয়ে পেয়েছিলো রাঙামাটিতে। ঢাকা শহরে পোস্টার ছাপিয়ে খোঁজ পাওয়ার কোনো মানেই হয় না৷ নিশ্চয় মেয়েটা পাহাড়ের কোনো অলিগলিতে ছোট্ট একটা ঘরে থাকে৷ তার কাছে এই পোস্টারের বিজ্ঞাপন কোনোভাবেই পৌঁছাবে না৷ এখন একমাত্র উপায় ফেসবুক। ফেসবুকে একটা চিঠি, চিঠির উত্তর সমেত পোস্ট করতে হবে। তাহলে হয়তো খুব সহজেই শ্যামলতার সন্ধান পাওয়া যাবে।

ভাবামাত্র চিঠি লিখতে বসে গেলো শীতুল।

শ্যামলতা,
আমাকে পাগল করে দেবার অধিকার কি আমিই দিয়েছিলাম? পাগল করে উন্মাদের মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো সেই আশা করেছিলে? তবে তোমার আশাই পূর্ণ হলো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পোস্টার লাগিয়েছি শহরের সমস্ত দেয়ালে দেয়ালে। আমি তোমাকে কোথায় খুঁজিনি বলো তো? গত এক সপ্তাহ পাগলের মত কত জায়গায় খুঁজেছি। যাকে পেয়েছি তাকেই জিজ্ঞেস করেছি, ‘আপনি কি শ্যামলতা? আপনার কি কোনো ডায়েরি হারিয়ে গিয়েছে?’ তোমার একটা ডায়েরি কেনই বা আমিই কুড়িয়ে পেলাম। সেখানে লেখা তোমার প্রত্যেকটা চিঠি আমার রক্তে আন্দোলন তুলে দিয়েছে৷ এই প্রবল স্রোতের গতিবেগ কেউ আটকাতে পারবে না পাগলী। প্লিজ আমাকে শান্ত করো। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি তোমার ভাবনায়৷ কারণ তুমি কল্পনায় যাকে ভালোবেসেছিলে সেই মানুষটা আমি নিজেই।

আমি তোকে খুব পুরনো ধাচে ভালোবাসি রে পাগলী৷ তোর কোনো ছবি আমার কাছে রাখবো না। আমি এই যান্ত্রিক শহরের মানুষদের মত নই। আমি অনেক পুরনো প্রেমিক। সারাদিন তুমি অপেক্ষা করবে, ফোন নিয়ে বসে থাকবে। আমি কল দিলেই দ্রুত রিসিভ করে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলবে, ‘কি নিষ্ঠুর! এতক্ষণে মনে পড়লো?’ সেই গলা থাকবে শত অভিমান মেশানো। আমি ভালোবাসার আবির মেখে সেই অভিমান ভাঙাবো। আর কি চাও? আমাকে চিনতে তোমার কি আরো কষ্ট হচ্ছে? প্লিজ শ্যামলতা, এই পোস্ট দেখে থাকলে সাড়া দাও। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

তোমার অসুখ

শ্যামলতার প্রথম চিঠিটার নিচে এই অংশ জুড়িয়ে দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করে দিলো শীতুল। দ্রুত শেয়ার হতে লাগলো। বন্ধুদের কমেন্ট দেখে শীতুলের মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। সবাই হাসাহাসি করছে ওকে নিয়ে। এই যুগে এরকম পুতুপুতু প্রেম নাকি দেখা যায় না। কেউ আবার অল দ্যা বেস্ট বলছে, কেউ হাহা রিয়েক্ট দিচ্ছে। শীতুল নিরবে সবকিছু সহ্য করে গেলো। শ্যামলতাকে খোঁজার জন্য যত ধরণের চেষ্টা করা যায় কোনোটাই বাদ রাখতে চায় না ও।

রাত্রিবেলা শুয়ে শুয়ে পোস্টের কমেন্ট আর শেয়ার গুলোর কমেন্ট দেখছিলো শীতুল। এমন সময় আয়াশের নাম্বার থেকে কল।

শীতুল রিসিভ করে যথারীতি বন্ধুর মত কথা বলতে লাগলো। আয়াশ বললো, ‘দোস্ত তুই এভাবে পাগলামি করা বাদ দিয়ে ওই মেয়েটার সাথে প্রেম কর না।’
– ‘কোন মেয়েটা?’
– ‘আরে আমাকে নক করেছিলো একটা মেয়ে। সম্ভবত শ্রবণা নাম।’
– ‘আয়াশ, তুই জানিস আমি কেমন। আমি অনেক পসিটিভ মাইন্ডের আর কিরকম পারসোনালিটির সেটা তোর জানা আছে। সেই আমি কারো প্রেমে পড়েছি মানে পড়েছি। সিরিয়াসলি পড়েছি। তাকে খুঁজতেই থাকবো।’

আয়াশ একটু ভেবে বললো, ‘তাহলে খুঁজতে থাক। শ্রবণার প্রতি তোর কোনো ফিলিংস নাই তো?’
– ‘নাহ নাই। কেন?’
– ‘আমার না মেয়েটার ছবি দেখে ভাল্লাগছে।’
– ‘ক্রাশ খাইছিস?’
– ‘হ্যাঁ দোস্ত। কিন্তু ফেসবুকে ওকে পাচ্ছি না৷ সম্ভবত আমাকে ব্লক মারছে নয়তো আইডি ডিএকটিভ। তোর কাছে তো নাম্বার আছে৷ তুই একটু ব্যবস্থা করে দিবি?’

শীতুল হেসে বললো, ‘কংগ্রেটস মামা। আমি ওর সাথে কথা বলে নাম্বার দিচ্ছি।’
– ‘আগে ব্যবস্থা কর, পরে কংগ্রেটস জানাস।’
– ‘ওকে। কিন্তু তুই একটা হেল্প কর৷ বড় বড় পেজগুলোতে চিঠিটা ভাইরাল করা যায় কিনা দেখবি একটু?’
– ‘দোস্ত, তুই একেবারে মরেছিস দেখছি। সামান্য একটা চিঠি পড়েই এই অবস্থা!’
– ‘ও চিঠিটা আমাকেই লিখেছে রে। আমি একবার পড়েই বুঝে গেছি আমি এতদিন যাকে খুঁজেছি, মনেপ্রাণে চেয়েছি, এটা সেই শ্যামলতাই।’

আয়াশ আর কথা বাড়ালো না৷ শীতুল আয়াশের সাথে কথা শেষ করে শ্রবণার নাম্বারে কল দিলো।

রাত তখন প্রায় একটা। এত রাতে শীতুলের নাম্বার থেকে ফোন পেয়ে অবাক হলো শ্রবণা৷ কিন্তু প্রকাশ করলো না। রিসিভ করে বললো, ‘কি অবস্থা? এতদিন পর?’

শীতুল কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলো। পরক্ষণেই স্বাভাবিক গলায় বললো, ‘আরে ব্যস্ত ছিলাম। যাই হোক তোমার কি খবর?’
– ‘এইতো চলে যাচ্ছে মোটামুটি।’
– ‘হুম। তুমি কি অনলাইনে একটিভ না?’
– ‘কেন?’
– ‘আমার ফ্রেন্ড আয়াশ বললো তুমি নাকি ওকে ব্লক দিয়েছো?’

শ্রবণা বললো, ‘অকারণে ব্লক দিবো কেন? আসলে আমার কে বা কারা শত্রু হয়েছে। আইডিটা ডিজেবল করে দিয়েছে। অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না।’
– ‘সে কি! আমাকে মেইল আর পাসওয়ার্ড দাও তো। চেষ্টা করে দেখি।’
– ‘এই কয়েকদিনে অনেকবার সাবমিট করা হয়েছে। তাই এখন আর না করাই ভালো। কিছুদিন পর আবার করবো না হয়।’

শীতুল একটা নিশ্বাস নিয়ে বললো, ‘হুউউউম। ঠিকাছে। তো চলো কাল একবার দেখা করি?’

শ্রবণা চমকে উঠলো কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলো না। চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।

চলবে..