প্রেমালিঙ্গণ পর্ব-০১

0
530

#প্রেমালিঙ্গণ
#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা
#সূচনা_পর্ব

সকালের মিষ্টি রোদ এসে চোখ মুখে উপচে পড়ছে তন্দ্রার। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে আসে মুহুর্তেই। কম্বলের নিচে থেকে পরপর কিছু একটা নড়েচড়ে উঠছে। নিমিষেই চোখ থেকে ঘুমের রেশ কে’টে যায় তার। চোখ বন্ধ রেখেই চিৎকার দিয়ে ওঠে সে। তাড়াতাড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে দৌঁড়ে দরজার কাছে এসে চেচাতে শুরু করে….

–বড় মা। ও বড় মা। তোমার গুনধর ছেলের গুনধর বিড়াল কেন আমার ঘরে এসেছে?

তন্দ্রার ডাকে রান্না ঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসেন সাহেরা মাহমুদ। তিনি হেসে দেন তন্দ্রাকে দেখে। ঘুমু ঘুমু চোখে কপালের সামনে ছোট চুলগুলো এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে তার। এ আর নতুন কিছু না, প্রতিদিন সকালেই অ্যালভিন তার কম্বলের নিচে গাপটি মে’রে শুয়ে থাকে।

–ও তো তোকে খুব পছন্দ করে তাইতো তোর কাছে বারবার যায়।
–কিন্তু ওকে আমার একটুও ভালো লাগে না। কিভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে, আমার ভয় করে।
–আমার অ্যালভিনকে, তোর যখন এতই অপছন্দ তাহলে দরজা লক করে ঘুমোবি।

পেছন ফিরে তাকাতেই স্বাক্ষরকে দেখতে পায় তন্দ্রা। পড়নে তার থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর ধূসর রঙা টি-শার্ট। চুল গুলো হালকা ভেজা হয়তো গোসল করেই বের হয়েছে। দূর থেকেই জোরে অ্যালভিনকে ডাকে সে।

–অ্যালভিন কাম হেয়ার!

ওমনি বিড়ালটা ঢুলতে ঢুলতে স্বাক্ষরের পেছন পেছন তার ঘরে চলে যায়। সাদা লম্বা সিল্কি পশম গুলোও তার চলার সাথে দুলে উঠছে। তন্দ্রা ফ্যালফ্যাল করে তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। ফোস করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। এই বিড়ালটাকে তার ছোট মামা দেড় বছর আগে বিদেশ থেকে এনেছিলেন তাকে দেবেন বলে। অ্যালভিনকে দেখা মাত্রই তন্দ্রা ভয়ে তার মা তাহেরা মাহমুদ এর পেছনে গিয়ে লুকায়। সবাই সেদিন তার অবস্থা দেখে খুব হেসেছিল। বিড়ালটাকে দেখে তুলি খুব খুশি হয়েছিল। এতোদিন সেই সবার ছোট ছিল, এখন তার থেকে ছোট কেউ চলে এসেছে। তুলি তো সেদিন বিড়ালটাকে একটা কিউট নামও দিয়ে দেয় “মালাই আইসক্রিম” কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই তন্দ্রা তার ঘরে চলে আসে। বিছানাটা সুন্দর ভাবে গুছিয়ে ভার্সিটিতে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নেয়। একটু পর তুলি হাতে করে হেয়ার ব্যান্ড নিয়ে আসে চুল বাধার জন্য। তন্দ্রা তাকে দুটো বেনী করে দেয় চুলে। দু’বোন একসাথে খাবার টেবিলে আসে। তাহেরা আর সাহেরা টেবিলে নাস্তা রেডি করে রাখছেন৷ এরই মাঝে ঘর থেকে তন্দ্রার বাবা ইউসুফ মাহমুদ তাহেরাকে ডাক দেন।

–তাহেরা আমার টাই খুঁজে পাচ্ছি না।
–আপা তুই একটু এখানটা দেখ আমি আসছি।

বলেই তিনি চলে যান স্বামীর টাই খুঁজে দেওয়ার জন্য। স্বাক্ষর আর ইলিয়াস মাহমুদ একসাথে খাবার টেবিলে বসে যায়। কিছুক্ষণ পরেই একদম রেডি হয়ে ইউসুফ আসেন। সবাই একত্রে বসে নাস্তা করে নেন। স্বাক্ষর প্রতিদিন তন্দ্রা আর তুলিকে পৌঁছে দিয়ে হসপিটালে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। খাবার খেয়েই নিজের ব্যাগ নিয়ে বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে স্বাক্ষর। এদিকে তন্দ্রা এখনো আস্তে আস্তে করে খেয়েই যাচ্ছে। প্রতিদিন এমনটাই হয় তার নাস্তা খাওয়া শেষ হয় সবার দেরিতে। এই নিয়ে মাঝে মাঝে মায়ের কাছে বেশ বকাও খাওয়া হয়ে যায় তার। তন্দ্রা আর তুলি তাদের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সকালের সময়টা খুব বোরিং কাটে সাহেরা এবং তাহেরার। দুপুরের পর অবশ্য তন্দ্রা আর তুলি এসে পুরো বাসাটাকে মাতিয়ে রাখে। যমজ হওয়ায় দুবোনকে একই বাড়িতে বিয়ে দিয়েছিলেন মিজান তালুকদার। যাতে করে দুজন কখনো আলাদা না হয়।

স্বাক্ষর গাড়ি ড্রাইভ করছে পাশের সিটে তন্দ্রা বসে আছে। দৃষ্টি তার বাইরের দিকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাস্তার পাশের বড় গাছ গুলোর দিকে৷ গাড়ি নিজ গতিতে যতটা এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই গতিতে গাছগুলোও পিছিয়ে যাচ্ছে। তুলি পেছনে বসে আমতা আমতা করে স্বাক্ষরকে ডাক দেয়।

–ভাইয়া!
–হুম বল! শুনছি।
–আমার খাতা শেষ হয়ে গিয়েছে। কালকে আব্বুকে বলতে ভুলে গেছি।
–আচ্ছা সামনের দোকান থেকে কিনে দেব।

গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই কথা বলছিল স্বাক্ষর। তন্দ্রা এখনো সেই বাইরের দিকেই তাকিয়ে আসে। তার কোন হেলদোল নেই।

–এভাবে তাকিয়ে থাকলে গাছগুলোও লজ্জা পাবে।

স্বাক্ষরের কথায় জোরে হেসে দেয় তুলি। তন্দ্রা চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকায়। তবুও সে দিব্যি হাসছেই। সে জানে স্বাক্ষরের সামনে তন্দ্রা তাকে কিছু বলবে না। এরই মাঝে তুলির স্কুলের সামনে চলে আসে স্বাক্ষর। গাড়ি সাইডে দাঁড় করিয়ে তুলিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এসে পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দেয়। তন্দ্রা তার ফোনে তখন ওদের ফ্রেন্ড সার্কেলের গ্রুপে চ্যাট করছিল। হুট করে গাড়ি আবার থেমে যায়। ফোনে মগ্ন তন্দ্রা টেরই পায় না। স্বাক্ষর তার হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়।

–গিলে ফেল ফোনটাকে। আজই ছোট আব্বুকে বলবো আর যেন তোর হাতে ফোন না দেয়। দিন দিন অধঃপতনের দিকে যাচ্ছিস।
–গেলে গেলাম তুমি যাবে নাকি ভাইয়া?
–ঠাট্টা করছিস আমার সাথে?
–এতো বড় কলিজা কার শুনি!
–যা। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ ছুটির পর রিকশা নিয়ে সোজা বাসায় চলে যাবি। আমি কিন্তু খোঁজ রাখবো।
–তুমি কি আমার পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছো নাকি ভাইয়া?

চোখ ছোট ছোট করে প্রশ্নটা করে তন্দ্রা। তার প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে যায় স্বাক্ষর।

–বেশি কথা আমি পছন্দ করি না।

এরপর আর বেশি কথা না বলে তন্দ্রা গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। গেইটের বাইরেই তার বান্ধুবী ইলোরা দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখা মাত্রই হাত নাড়িয়ে ইশারায় কাছে ডাকে। তন্দ্রাও সেখানে এগিয়ে যায়। দু’জনে একসাথে ভার্সিটির ভেতরে প্রবেশ করে। স্বাক্ষর তার গাড়ি নিয়ে হসপিটালে দিকে চলে যায়। আজ বিকেলে একজন পেসেন্টের সার্জারী আছে। সার্জারীটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের চেম্বারে এসে প্রথমে কিছুর রোগীকে দেখে সে। অন্যদিকে তন্দ্রা ক্লাসে বসে আছে। এখন ইকোনমিকস ক্লাস চলছে। ইলোরা মনোযোগ সহকারে নাজিম উদ্দীন স্যারের পড়া বুঝতে চেষ্টা করছে। হুট করেই তন্দ্রার হাতের কাছে একটা কাগজ ছিটকে আসে। কাগজটা হাতে নিয়ে সে এদিক সেদিক তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে, কে দিলো কাগজটা! অপর সাড়ির চার বেঞ্চ পেছনে মুহিত বসে। সে ইশারায় বুঝানোর চেষ্টা করছে কাগজটা তার জন্য নয়, ইলোরার জন্য। তন্দ্রাও ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় বুঝায় কাগজটা যদি এই মুহুর্তে স্যারের কাছে সে দিয়ে দেয়। মুহিত হাত জোর করে আর কানে ধরে। তন্দ্রা মুহিতের কান্ড দেখে হেসে দেয়।

ভার্সিটি ছুটির পর তন্দ্রা আর ইলোরা একই রিকশায় ওঠে। দুজনের বাসা একই রাস্তা দিয়েই আসতে হয়। ইলোরা বাসা সামনে হওয়ায় সে আগেই নেমে যায়। তুলির স্কুল দেড়টার দিকেই ছুটি হয়ে যায়। তন্দ্রা একাই বাড়ি ফিরে আসে। কলিং বেল চাপতেই তুলি দরজা খুলে দেয়। তাকে দেখে বেশ খুশি খুশি মনে হচ্ছে তন্দ্রার কাছে। বিষয়টা ঘেটে দেখা দরকার তার। তন্দ্রা ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। আগে কিছু খেয়ে তারপর যা জিজ্ঞেস করার করবে। খাওয়া দাওয়া করে তন্দ্রা তুলির হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে।

–কিরে পিচ্চি এতো খুশি কেন?

তুলি ভনিতা ছাড়াই চকলেট খেতে খেতে বলে দেয়।

–আমরা সবাই নানু বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছি। রুবি আপুর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
–ওহ এই ব্যাপার। আমি ভাবছি কি না কি। ওয়েট কি বললি?
–যা শুনেছ তাই বলেছি।
–রুবি আপুর বিয়ে? কবে? কার সাথে?
–উফ! আমি এত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না। তুমি মা’কে গিয়ে জিজ্ঞেস করো।

কথাটা বলেই তুলি দৌঁড়ে পালায়। তন্দ্রা তো খুব খুশি হয়ে যায়, গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাবে বলে। বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া ওদের খুব একটা গ্রামে যাওয়া হয় না। বিয়ে উপলক্ষে কিছুদিন তো থাকতে পারবে, সেই ভেবেই খুশিতে তার নাচতে ইচ্ছে করছে।

চলবে?……