বন্য প্রণয় পর্ব-২২+২৩

0
125

#বন্য_প্রণয়
#পর্ব_২২
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত।)

নির্দিষ্ট স্থানে বসে মনোযোগ সহকারে পড়ছে অনিমা। আয়ান সামনে বসে খুব সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তাকে। ইদানীং আয়ানের কেমন অদ্ভুত অনুভব হয়। হুটহাট অনিমার কথা ভাবতে ভালো লাগে তার। মেয়েটার বকবক, হঠাৎ করে কাছে আসা,নির্লজ্জতা সবকিছুই মিস করে ভীষণভাবে। নিজের মনকে শান্ত করার বহু চেষ্টা করছে সে। অনিমা নেহাৎ পিচ্চি মেয়ে। সবে এসএসসি দিবে। এই মেয়েকে নিয়ে এরকম অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া ঠিক নয়। তার কেথায় অনিমার বাবার অগাধ সম্পত্তির প্রভাব-প্রতিপত্তি আর কোথায় মধ্যবিত্ত আয়ান!
” আয়ান স্যার একটু দেখুন তো পড়াটা। ”
অনিমার ডাকে ভাবনার সুতা ছিড়ে বাস্তবে ফিরল আয়ান। নড়েচড়ে উঠলো সে।
” কই দেখি।”
” জি স্যার। ”
বই এগিয়ে দিলো অনিমা। আয়ান যথাসাধ্য সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলো পড়া। অনিমার ভীষণ ইচ্ছে করে আয়ান স্যারকে একবার জড়িয়ে ধরতে। এতদিন পর্যন্ত সমবয়সী ছেলেদের প্রতি একটা আলাদা ঝোঁক থাকলেও গত দুই মাসে নিজের থেকে প্রায় নয় বছর বয়সী স্যারের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে কিশোরী মন। সামনেই পরীক্ষা! হাতেগোনা একমাস সময় আছে। তাই যথাসম্ভব নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে এসমস্ত অবাধ্য ইচ্ছেকে মাটি চাপা দিয়ে রাখছে অনিমা। তাছাড়া আয়ান স্যারের যে কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই তার কি গ্যারান্টি আছে?
” আচ্ছা অনিমা সামনেই আমার ছোটো বোনের বিয়ে। তুমি চাইলে আমি তোমার বাবাকে বলবো তোমাকে যেতে দেওয়ার জন্য। মানে দাওয়াত করলাম। যদিও তোমার তো তেমন বাধ্যবাধকতা নেই বাসা থেকে। ”
পড়ানো শেষে অপ্রয়োজনীয় আলাপ জুড়ে বসলো আয়ান। কী নিয়ে কথা বলবে ভাবতে ভাবতে তৃষার বিয়ের কথা মনে পড়লো আয়ানের। অনিমা ক্ষণকাল চুপ থেকে ভেবে নিলো কিছু একটা। তারপর বললো,
” হ্যাঁ আমি যাবো। আপনি বাবাকে বলবেন। ”
” ঠিক আছে। বিয়ের যেহেতু দশ দিন বাকি,আমি তিন কিংবা চারদিন আগে আঙ্কেলকে বলবো।”
” ঠিক আছে আয়ান স্যার। ”
আয়ান জবাবে মুচকি হেসে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। অনিমা তো সেখানেই থমকে গেছে। লোকটার মুচকি হাসিতে কী ছিলো? মায়া নাকি জাদু!

বই পড়ছিল তাহমি। বিকেলের এই সময়টাতে তাহমি বই পরে কাটায়। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফ্যান্টাসি গল্পের প্রতি আলাদা এক আকর্ষণ কাজ করে তার। বহুদিন ধরে তাই ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা বইটা পড়ার জন্য হাসফাস করছিল। তবে কিছুতেই কেনা হচ্ছিল না। এইতো গতকাল সহন রাতে বইটা কুরিয়ার থেকে নিয়ে এলো। অনলাইন বুকশপ থেকে অর্ডার করেছিল তাহমিকে না জানিয়ে। হুট করে বইটা হাতে পেয়ে যে কী ভীষণ খুশি হয়েছিল মেয়েটা, সেই খুশিটুকুর সাক্ষী হবে বলেই সারপ্রাইজ দিয়েছে সহন। ড্রাকুলা নামটাই একটা আস্ত ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো জিনিস। তাহমিও বইয়ের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এমন সময় কল এলো সহনের। বিরক্ত লাগলো তাহমির। আপাতত বইয়ের দিক থেকে মনোযোগ সরাতে চাচ্ছে না সে। কিন্তু সহনও যে নাছোড়বান্দা! ননস্টপ কল করে যাচ্ছে সে। অগত্যা বাধ্য হয়ে কল রিসিভ করলো তাহমি।
” কখন থেকে কল করছি? কানে কি কম শুনিস ইদানীং? ”
” এতো কল দিচ্ছিস কেন তাই বল। ”
” ওরে ব্যস্ততা! ”
” সহন ঢঙ করিস না। ”
” খবিশের মতো করিস না। ”
” উফ!”
” কী হলো? আদর লাগবে? ডু ইউ ওয়ান্ট? ”
” আই ওয়ান্ট তোর কল্লা। বদের হাড্ডি একটা। বই পড়ছি আমি। ”
তাহমির ঝাঁঝাল কথায় ফিক করে হেসে দিলো সহন। তবে নিঃশব্দে! মহারাণী শুনলে দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে ফেলবে।
” আচ্ছা পড় তাহলে। কিন্তু শোন…”
” হু বল।”
” রাতে শাড়ি পরবি? বেবি পিংক কালারের শাড়িতে তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। ”
সহনের ভালোবাসাময় আবদারে তাহমির মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে উঠলো। মুচকি হেসে বললো,
” বেলীফুলের গাঝড়া এনো, খোঁপায় দিবো।”
” বেশ আনবো। রাখছি। পড়ো এখন।”
ফোন কেটে দিলো সহন। তাহমির ঠোঁটের কোণে সুখময় হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। ইশ মানুষটা কত্ত ভালোবেসে ফেলেছে তাকে!

আজ শুক্রবার,বেলা তিনটে বেজেছে। সম্পর্কের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সেরকমভাবে ঘুরতে যাওয়া হয়নি অনিক ও তৃষার। শাড়ি পরে কখনো প্রিয়তমর সামনেও আসা হয়নি। তাই আজকে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান হতেই শাড়ি পরে যাওয়ার সিন্ধান্ত নিয়েছে তৃষা। সাদা-কালো মিশেলের একটা সিল্কের শাড়ি পরেছে তৃষা সাথে কালো হিজাব। ঠোঁটে লাইট লিপস্টিক, চোখে কাজল এতটুকু সাজগোছ যথেষ্ট। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে আইলাইনারের লাস্ট ফিনিশিং দেখে নিলো সে। এরমধ্যেই মেসেজ এলো অনিকের।
” শাড়ি পরে আসবে আজ?”
তৃষার মাথায় হঠাৎ দুষ্ট বুদ্ধি এলো। ঠোঁট কামড়ে হেসে মেসেজের রিপ্লাই দিল, ” চেয়েছিলাম।”
” তাহলে? ”
” মা বললো শাড়িতে ভালো লাগে না। ”
” ওওও। ”
” হু।”
” বেশ এসো তাড়াতাড়ি। আমি আছি তোমাদের বাড়ির সামনের মাঠে। ”
” তবুও বলতে পারলেন না,শাড়ি পরে আসো!”
অনিক তৃষার মেসেজ দেখে হাসলো। মেয়েটা তাহলে তার না বলা কথা বুঝে ফেলতে সক্ষম হলো।
” হাহা! এসো তাড়াতাড়ি। ”
” আসছি,দাঁড়ান একটু।”

ফোনের কনভারসেশন থামিয়ে হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে মা’কে বলে বাসা থেকে বেরুলো তৃষা। বাসা থেকে ঠিক পাঁচ মিনিট হাঁটলে ছোটো একটা মাঠ পড়ে। ওখানেও ক’দিন পর দালানকোঠা উঠবে। দূর থেকে তৃষাকে দেখেই কেমন শীতলতা বয়ে গেলো হৃদয়ে। আনমনে তাকিয়ে সামনে এগোতে লাগলো অনিক।
” মুখে মাস্ক পরে নিতে। ”
” মাস্ক পরলে নিঃশ্বাস নিতে অস্বস্তি লাগে আমার। ”
তৃষার হাত আলগোছে নিজের হাতে নিয়ে নিলো অনিক। অনিক যখন তৃষার হাত এভাবে ধরে রাখে তৃষার তখন মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত হাতে হাত রেখেছে সে।
” আমার কেমন জেলাস ফিল হচ্ছে তৃষা। অন্য কেউ তোমার সৌন্দর্য দেখবে বলে।”
অনিকের বাচ্চামিতে তৃষা অধর এলিয়ে দিলো।
” তাহলে এরপর থেকে বোরকা পরবো বরং। ”
” সত্যি? ইশ এতদিন এই লক্ষ্মী মেয়েটা কোথায় ছিলো! ”
” ওই যে সামনের বাড়িটা দেখছেন ওখান থেকে সোজা গিয়ে বামদিকের জলপাই রঙের বিল্ডিংয়ের মধ্যে একটা রুমে ছিলাম আমি। ”
দু’জনেই হাসতে হাসতে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। আজ ঠিকানা বিহীন গন্তব্যে ছুটবে গাড়ি। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই ওদের।

” মামা একটা বেলীফুলের গাজরা দিন আর সাথে দু’টো গোলাপ।”
ফুলের দোকানীকে বললো সহন। দোকানী হেসে সেগুলো এগিয়ে দিলো সহনের দিকে।
” এই লন মামা। ষাট টাকা দেন।”
” সত্তর টাকা হয়েছে না?”
” দশ টেহা লাগবো না আমার। ”
লোকটার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলো সহন। খুশি হয়ে একশো টাকার একটা নোট জোর করে হাতে গুঁজে দিয়ে বাড়ির দিকে এগোলো। সামনের গলি পেরোলেই সহনের বাসা। গলির মোড়ে ঢুকতেই মায়ের নম্বর থেকে কল এলো। থমকে দাঁড়াল সহন। মা তো দরকার ছাড়া এখন কল দিবে না! দ্রুত কল রিসিভ করলো সহন।
” সহন সহন তুই তাড়াতাড়ি আ্যম্বুলেন্স নিয়ে বাসায় আয়। তাহমির অবস্থা ভালো না! আগুন আগুন লেগেছিল রান্নাঘরে…. ”
সহন আরকিছুই শুনতে পারলো না। ফোন পকেটে রেখে ছুটলো বাড়ির দিকে। হাত থেকে পড়ে গেলো ফুলগুলো!

হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগে রাখা হয়েছে তাহমিকে। করিডরে বসে আছে ফরিদা খান, তাহমির বাবা ও সহনের বাবা। আয়ান,সহন পায়চারি করছে অবিরত। তাহমির মা খবরটা সহ্য করতে না পেরে সেন্সলেস হয়ে গেছেন। বাসায় উনাকে দেখছে তৃষা। সহন বারবার গিয়ে দরজার বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে তাহমিকে কিন্তু পারেনি। ডাক্তার এখনো কিছু জানাননি বলে চিন্তিত সকলে। কাঁধ, চেহারার একপাশ পুড়ে গেছে, ভেতরে হয়তো আরও ক্ষতি হয়েছে বলে অনুমান করছে সহন। বাকিটা ডাক্তার জানাবে বলে অপেক্ষা করে আছে সবাই।
চলবে,

#বন্য_প্রণয়
#পর্ব_২৩
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত।)

দু’দিন কেটে গেছে। তাহমির অবস্থা একটু ভালো এখন। চেহারার একপাশ যতটা পুড়েছে চিকিৎসার মাধ্যমে দাগ নিরাময় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। তবে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ চলবে। কিন্তু কাঁধের অবস্থা খারাপ। জরজেটের পোশাক পুড়ে শরীরের সাথে লেগে বিশ্রী অবস্থা হয়ে গেছিল। তাহমির শাশুড়ী চেহারায় তাৎক্ষণিক পানি ঢালার কারণে একটু হলেও উপকার হয়েছে। আরো চারদিন বার্ন ইউনিটে থাকতে হবে তাহমিকে। তারপর বাসায় যেতে পারবে। যদিও চাইলে এখনও নিতে পারে, সেক্ষেত্রে ইনফেকশনের ভয় আছে। এজন্য সহন হসপিটালেই রাখবে তাহমিকে। দু’দিন ধরে তেমন খাওয়াদাওয়া হয়নি সহনের। তাই দুপুরে আয়ান একপ্রকার জোরাজোরি করে সহনকে খেতে পাঠিয়েছে। গতকাল অনিক এসে দেখে গিয়েছে তাহমিকে। আকস্মিক ঘটনায় সবাই এলোমেলো হয়ে গেছে। তৃষার বিয়েটাও কয়েকদিন পিছিয়ে দিতে চাচ্ছে অনিক। তবে সে বিষয় এখুনি কোনো সিন্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাহমি এরমধ্যে গতকাল একবার কথা বলেছিল সহনের সাথে। সহনের দু-চোখ ছলছল করছিল।
” কী হয়েছে? তোর চোখ অমন লাল হয়ে গেছে কেন?”
তাহমি দূর্বল কন্ঠে শুধালো। সহন তাহমির ডানহাতের একটা আঙুল ছুঁয়ে আছে। হাতে স্যালাইন লাগানো।
” কিছু না। তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ ওঠ। আমার একা একা ভালো লাগে না। ”
” অশান্তি ভাল্লাগে তোর? আমার ত্যাড়ামি, ঝগড়া মিস করছিস?”
মৃদু হেসে বললো মেয়েটা। সহন নিজের সামলাতে পারছে না। আঙুলেই চুমু খেলো আলতো করে।
” আমি তোর সবটাই মিস করছি রে। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি চল।”
” যাবো ইনশাআল্লাহ। ”

” সহন! ভাতের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে বসে না থেকে খেয়ে ফেল তাড়াতাড়ি। ”
মায়ের কথায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে সহন। মাথা নেড়ে “হু” বলে খেতে শুরু করে। শরীরে খাবারেরও দরকার আছে। খেয়েদেয়ে আবার হসপিটালে যাবে। এখনো চারটা দিন তাহমি এ বাড়িতে থাকবে না! ফরিদা খানের নিজেকে কেনো জানি অপরাধী মনে হয়। সেদিন যদি উনি চা করতে যেতে না বলতেন তাহলে হয়তো এরকম ঘটনা ঘটতো না বলেই ভাবেন উনি। আদতে এমন কিছু নয়। যা হওয়ার সেটা এমনি হয়। তকদিরের লেখা এড়ানো সম্ভব নয়।

প্রায় সপ্তাহ চলে গেছে। এতগুলো দিন আয়ান স্যার আসেননি পড়াতে। আর না তো একটা মেসেজ পর্যন্ত করেছে সে। এ নিয়ে অনিমার মনে চাপা অভিমান জমা হয়েছে বেশ। তবে লেখাপড়া থেমে নেই তার। দিনরাত প্রাণপাত করে লেখাপড়া করে যাচ্ছে অনিমা। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ভালো রেজাল্ট করা চাই ওর। বিকেলের রোদ গায়ে মেখে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে অনিমা। মনটাকে কিছুতেই বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাখতে পারছে না। বারবার ইচ্ছে করছে আয়ান স্যারকে একবার কল দিয়ে জানবে,কেনো সে আসছে না! নিজের সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত আর না পেরে আয়ানকে একটা মেসেজ পাঠাল অনিমা। মানুষটার কি ওর কথা একবারও মনে পড়ে না? সবটাই কি একপাক্ষিক ছিল তবে?
” আপনারা যা বলবেন তাই হবে মা। তবে আমি চাচ্ছিলাম তাহমি আপু আরেকটু সুস্থ হলে সবকিছু হতো বরং। ”
ড্রইং রুমে সোফায় বসে আছে অনিক। আমেনা ইসলামের কথার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত কথাটি বললো। তৃষা গিয়েছে তাহমির কাছে। গতকালই তাহমিকে বাসায় নিয়ে এসেছিল সহন। তাই সকাল সকাল আয়ান ও তৃষা বোনের কাছে চলে গেছে। অনিক হবু শাশুড়ীর সাথে কথা বলতেই কেবল এসেছে আজ।
” তাহমির রেস্ট দরকার, ও রেস্ট নিবে সময় নেই। কাজকর্ম ওকে কেউ করতেও দিবে না। আগের থেকে তো এখন সুস্থ। বিয়েটায় বাঁধা আসুক আমি চাইছি না। আত্মীয়স্বজনদেরও বলা হয়েছে তো,বুঝতেই পারছো!”
” ঠিক আছে। আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। আমি দিনার সাথে আলোচনা করে নিবো। আপনারা বললেই বিয়ের তোরজোর শুরু করবে ওরা। ”
” ঠিক আছে বাবা। ”

বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে তাহমি। চোখমুখ এই ক’দিনে কেমন মলিন হয়ে গেছে। চেহারায় আছে ক্ষতের দাগ,হাসিতে প্রাণ নেই যেনো। সহন পাশে বসে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছে। চেয়ারে বসে আছে আয়ান ও তৃষা। অনিক তৃষাকে না জানিয়েই গিয়েছিল তাদের বাড়িতে।
” আপাই খেয়ে নাও তুমি। ”
” আয়ান তোরা কিছু খাসনি,আমার বাড়ি এসে তোরা না খেয়ে থাকলে কি ভালো লাগে বল?”
” তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হও আপাই। তৃষার বিয়েতে অনেককিছু খাবো আমরা। আর তোমার বাড়ি তো আছেই বলো?”
সহন জোর করে আরেক চামিচ স্যুপ তাহমির মুখে দিয়ে হেসে বললো, ” একদম ঠিক। আমার একমাত্র শালিকার বিয়েতে প্রচুর খেতে হবে। বিয়ে বাড়িতে না খেলে পাপ হয় বুঝলে?”
গ্লাসে চুমুক দিয়ে এক ঢোক পানি খেয়ে আর খেলো না তাহমি। খাবারের প্রতি ভীষণ অনীহা জন্মেছে তার।
” দুলাভাই থামেন তো। সবাই মিলে শুধু আমার বিয়ে বিয়ে করেন। লজ্জা লাগে না বুঝি?”
” এহহ! ঢঙ দেখে মরে যাই। নিজে থেকে বর খুঁজে আনলো তার আবার লজ্জা! সরর নির্লজ্জ মেয়ে। ”
আয়ান তৃষার কপালে গাট্টা মেরে দিলো একটা। তৃষা গাল ফোলাল তাতে। তাহমি ওদের ভাইবোনের খুনসুটিতে না হেসে পারছে না। তৃষা তাহমির দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
” আপাই দেখো, ভাইয়া কেমন করে বলছে আমাকে।”
” সত্যি তো আয়ান! তুই কেনো এভাবে বললি? দেখিস তুই যেনো নিজের পছন্দ করে আবার বিয়ে করিস না। তাহলে কিন্তু আমরা কথা শোনাতে ছাড়বোনা হুহ্। ”
সহন বসা থেকে উঠে আয়ানের কাঁধে হাত রেখে হেসে বলে,” দুই বোন একজোট হয়ে আমার শালাবাবুকে কথা শোনানো হচ্ছে? আমার শালাবাবু নিরামিষ মানুষ। ওসব পছন্দ করে টরে বিয়ে সে করবে না। তাই না? ”
সবাই একসাথে হেসে উঠলো। আয়ান চুপ করে রইলো শুধু। হঠাৎ করে অনিমার কথা মনে পড়ে গেলো। কতদিন হলো দেখা হয় না, কথাও হয় না। মেয়েটা কি তাকে একটুও মিস করে? আচ্ছা একটা মেসেজ পাঠালে কেমন হতো? নিজের বোনের এরকম বিপদ হয়েছে সেটা তো অনিমাকে বললেও পারতো সে। বাসায় গিয়ে মেসেঞ্জারে কল দিয়ে সবকিছু বলবে বলে ঠিক করলো আয়ান।

রাতের নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে গোটা শহর। তাহমি ঘুমিয়ে গেছে। সহনের চোখে ঘুম নেই। সে বসে বসে প্রিয়তমার ঘুমন্ত মুখশ্রী দেখতে ব্যস্ত। এতদিন না দেখে থাকার সাধ আজ পূর্ণ করে নিচ্ছে। কড়া ঔষধ চলে তাই তাহমির ঘুম বেশ গাঢ় হয়। সহনও সেই সুযোগে মনপ্রাণ ভরে দেখে নিচ্ছে শান্ত তাহমিকে। জেগে থাকলে তো আর এরকম শান্ত হয়ে থাকে না। অবশ্য তাহমির চঞ্চলতাই তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
রাত আড়াইটার সময় অনিমাকে অনলাইনে এক্টিভ দেখে অবাক হলো আয়ান। ইনবক্সে ঢুকেই দেখল গতকাল বিকেলে সে তাকে মেসেজ দিয়ে রেখেছে।
“আয়ান স্যার! ”
চিন্তাভাবনা বদলে গেলো আয়ানের। লিখতে চেয়েছিল, এতরাতে অনলাইনে কী? কিন্তু এখন সেসব আর লিখবে না। ভেবেচিন্তে রিপ্লাই টাইপ করলো,
” হুম বলো।”
অনিমা মেসেজ আসতেই তৎক্ষণাৎ সিন করলো এবং রিপ্লাই টাইপ করতে লাগলো। আয়ান অপেক্ষা করছে কী লিখে পাঠাবে তার জন্য। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মেসেজ এলো।
” আমার পড়ালেখার কোনো চিন্তা নেই আপনার? কতদিন পড়াতে আসেননি! ”
” তোমার বাবাকে জানিয়েছিলাম,আমার বোন অসুস্থ। ”
” ওহ! বাবা আমাকে কিছু বলেনি সেসব। ”
” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে?”
” উমম… না আসলে জিজ্ঞেস করিনি। তবে নিজ থেকে তো বললেন না। ”
” কাল থেকে যাবো পড়াতে। এখন ঘুমাও। অনেক রাত হয়েছে। ”
আগামীকাল আয়ান স্যারের সাথে দেখা হবে ভাবতেই আনন্দে লাফ মেরে শোয়া থেকে উঠে বসলো অনিমা। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা বজায় রেখে লিখলো, ” ঠিক আছে আয়ান স্যার। শুভ রাত্রি। ”
” হু শুভ রাত্রি। ”

অনিমা সাথে সাথে অফলাইনে গেলো দেখে আয়ানের ভালো লাগলো। মেয়েটা ওর কথা শুনেছে বলে। অনিমার মুখে আয়ান স্যার ডাকটা বেশ ভালো লাগে। যদিও প্রথম প্রথম কেমন লাগত তবে সময়ের সাথে ভালোলাগা জন্মেছে এখন।

চলবে,