বৃষ্টি_এবং_মায়াবতী (২য় পর্ব)

0
1111

বৃষ্টি_এবং_মায়াবতী
(২য় পর্ব)
——————
নীলুকে নিয়ে আসিফ ওর মামার বাসায় পৌঁছালো সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে।
দরজা খুললেন নীলুর বড় মামী মাঞ্জুমান আরা বেগম। বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। নীলুকে দেখার পরও ভদ্রমহিলার মুখ কেমন ভাবলেশহীন। আসিফের কেমন অদ্ভুত লাগলো।

তাকে বসার ঘরে বসিয়ে রেখে নীলুকে নিয়ে তিনি
ভেতরের ঘরে চলে গেলেন যেন কিছুই হয়নি। আসিফ চাইছিলো তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে চলে আসতে কিন্তু আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এদের বসার ঘরটা বেশ সুন্দর ছিমছাম করে সাজানো ।
বসে থাকতে থাকতে আসিফ যখন প্রায় নিশ্চিত হলো সবাই তার কথা ভুলে গেছে তখনই একটা ট্রে হাতে নীলু ঘরে ঢুকলো।
ট্রেতে কেক, সমুচা আর চা সাজানো।
এরই মধ্যে সে আগের কাপড় পাল্টে নতুন কামিজ পরে নিয়েছে। তাকে এখন আগের মতো অতটা ভীত মনে হচ্ছে না। আসিফের মনে হলো মেয়েটা অতিরিক্ত বেশি সুন্দর।

আসিফকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জায় নীলুর ফর্সা গালে গোলাপি আভা পড়লো। সামনের টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখতে রাখতে নীলু একটু হাসলো,

— এটা আমার মামাতো বোনের জামা। ওর বিয়ে হয়েছে গত বছর। স্বামীর সাথে জাপান চলে গেছে কিছুদিন আগে ।

মাঞ্জুমান আরা এসে আসিফের মুখোমুখি সোফায় বসলেন। ভদ্রমহিলার মুখ ভর্তি পান। হাত দিয়ে নীলুকে ঘরের ভেতরে চলে যেতে ইশারা করলেন।আসিফের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—- অনেকক্ষন বসায় রাখলাম। তা তোমার নাম কী?
— আসিফ নওশাদ ।
— কর কী ?
— ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে MBBS করে ইন্টার্নি করছি ।
— বাড়ি ?
—- বাড়ি টাংগাইল। আকুরটাকুর পাড়া।
— বাড়িতে কে কে আছেন তোমার ?
— মা আছেন। তিনি স্কুলের শিক্ষিকা।
—- বাবা?
— বাবা ব্যবসায়ী ছিলেন।… মারা গেছেন বছর কয়েক আগে।

মাঞ্জুমান আরা নির্বিকারভাবে পান চিবুতে চিবুতে বললেন,
— নীলুর কাছে আমি সবই শুনছি । তোমারে ভদ্র ঘরের ছেলে বলেই মনে হইছে আমার । শোন বাবা, আজ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিছে জান বোধহয় । এদের বাড়ি মুক্তাগাছা। এই মেয়ে পড়ে মুক্তাগাছা মহিলা কলেজে। এই বছর সেই পরীক্ষায় সে ফেল করছে। গত বছর পরীক্ষা দিছিলো সেবারও ফেল করছিলো। বাপের মাইরের ভয়ে আজ সকালে বাড়ি থেকে পালাইছে। সে রাস্তা ঘাট কিছুই চিনে না, তার উপর বৃষ্টি বাদলার দিন…. বিরাট বিপদ হইতে পারত..। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে তেমন কিছু হয় নাই।
তবে নীলুরে আমি তেমন দোষ দিতে পারতেছি না।
এদের বংশ ভালো, টাকা পয়সা, জমিজমা আছে।থানার উপরেই বাড়ি। এলাকার সবাই এক নামে চিনে। কিন্তু নীলুর বাপ একটা আস্ত খবিশ। বিরাট বদ রাগী, খিটখিটা মেজাজ । ছেলে সন্তানের শখ ছিল, হইছে পর পর চারটা মেয়ে। এর পিঠাপিঠি আরও একটা বোন আছে, সবচেয়ে ছোটটা পড়ে ক্লাস সিক্সে ।
এই মেয়ে যদি আজ ঘরে ফিরে ওর বাপ গলায় পারা দিয়া মাইরাও ফেলতে পারে, অবিশ্বাস্য না।

আসিফের খুব অবাক লাগছে। ভদ্রমহিলার মাথায় ছিট টিট নেই তো..! কী সহজ স্বাভাবিকভাবে ভেতরের সব খবরাখবর বলে দিচ্ছেন..।

মাঞ্জুমান আরা একটু থামলেন।

… কিন্তু আমার কিছুই করার নাই। আমি নীলুরে এখানে রাখতে পারব না। তুমিও চলে যাও, এইসব ভ্যাঁজালে জড়ায়ো না। ওর মামা নাই দুই বছর হলো। আমি ছেলে, মেয়ে নিয়া একা থাকি। গ্রাম এলাকায় রাত পার হলে লোকে নানান সন্দেহ করবে। নীলুরে এখন বাড়ি পাঠায় দিব । যা বোঝার ওরাই বুঝুক।

মহিলা কেমন স্বার্থপরের মতো কথাবার্তা বলছেন। আসিফের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কত আশা নিয়ে মেয়েটা এ বাড়িতে এসেছিল।
কোন উপায় কী নেই ওকে বাঁচানোর..?

আসিফের মন খারাপ মাঞ্জুমান আরা লক্ষ্য করলেন। একটু চুপ থেকে গলার স্বর নীচু করে বললেন,
— তবে.. একটা উপায় আছে। কিন্তু সেখানে তোমারও সাহায্য লাগবে।
— কী উপায়?
— তোমারে দেখে হঠাৎ মাথায় আসলো। আমার মনে হইতেছে, নীলুরে তোমার খুব পছন্দ হইছে। আসলে এরা সবগুলা বোনই দেখতে পরীর মতো সুন্দর । মিথ্যা বলব না মেয়েগুলার স্বভাবও ভালো… মায়ের মতো । আমার একটাই ননদ, মন একেবারে পানির মতো পরিষ্কার।

—- উপায় কী সেটা আগে বলেন।

— উপায় হলো, তুমি রাজি থাকলে… বাড়ি পৌঁছানোর পর আমি ওর বাপরে ফোন দিয়া বলব, কলেজে লোক পাঠায়া আমিই নীলুরে এখানে আনছিলাম। খুব জরুরি একটা প্রয়োজনে।

— কী প্রয়োজন ?

— প্রয়োজনটা হলো, নীলুর বিবাহের ব্যাপার । ছেলের আজ নীলুরে দেখে খুবই পছন্দ হইছে। ছেলের নাম হলো আসিফ নওশাদ । পেশায় ডাক্তার। বাড়ি টাংগাইল। ওর বাপ তোমারে যদি ফোন দিয়া জিজ্ঞাস করে ঘটনা স্বীকার করবা ।

আসিফ স্থির চোখে তাকিয়ে আছে।
ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে পানের পিক ফেললেন,

আমার ধারণা হঠাৎ ডাক্তার জামাই পাওয়ার আনন্দে আপাতত মেয়ের পরীক্ষায় ফেল আর পালায়া যাওয়ার ঘটনা ধামাচাপা পড়বে ।

এখন বলো তোমার কী মত?
বিয়ে যে সত্যি সত্যি করতে হবে তা না। আপাতত বিপদ উদ্ধার হোক। পরেরটা পরে। এছাড়া আমার মাথায় আর কোন বুদ্ধি আসতেছে না।

আসিফ চুপ করে আছে। মেয়েটাকে তার অসম্ভব ভালো লেগেছে সন্দেহ নেই। কিন্তু…

— নীলুর মা মাঝেমধ্যেই ফোন দিয়া মেয়ের জন্য একটা ভালো পাত্রের সন্ধান চায়। তুমি চাইলে ওদের সাথে মুক্তাগাছাও যাইতে পার। চেনা, পরিচয় হোক। ওর বাপ তোমারে দেখলে খুশীই হবে।
আমার বোনের বিয়ে দিসি টাংগাইল শহরে। দরকার পড়লে তোমার খোঁজও আমি নিতে পারব।

আসিফের ইচ্ছে হচ্ছে সত্যিই নীলুকে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে। মেয়েটার বাড়িতে কী ঘটে না ঘটে সেটা দেখারও ইচ্ছা তার। কাল দিনে হাসপাতালে ডিউটি নেই। মুক্তাগাছা হাতের কাছেই। সে কী রাজী হয়ে যাবে?

আসিফকে চুপ থাকতে দেখে, ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়ালেন।
—- আমার ছোট ছেলে শরীফরে দিয়া নীলুরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। সে সামনে এস, এস, সি পরীক্ষা দিবে। ঝড়, বৃষ্টির রাত…এটাই চিন্তার কথা। আমি নিজে নিয়া যাইতাম। কিন্তু শরীরটা খারাপ…গতকাল বাথরুমে…

মাঞ্জুমান আরা কথা শেষ করার আগেই আসিফ বললো

— চিন্তা করবেন না। আমি ওদের সাথে যাচ্ছি, পৌঁছে দিয়েই ফিরে আসব।

৩.
তারা মুক্তাগাছা পৌঁছালো রাত আটটার পর পর। রাস্তা ফাঁকা ছিল। গাড়ি এক টানে চলে এসেছে মুক্তাগাছা বাজার । মাঞ্জুমান আরা বার বার শিখিয়ে দিয়েছেন বাইরের কেউ জিজ্ঞেস করলে পরিচয় দিবা তুমি আমার ভাগিনা।
পুরো পথ নীলু কারো সাথে একটা কথাও বলেনি। কেমন জড়োসরো হয়ে ছিল।
বাড়িতে ঢুকে তারা দেখল বাড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশ। নীলুকে ফিরে পাবার আনন্দে ঘরে পোলাও, মাংস রান্না হচ্ছে। তারচেয়েও বড় কথা, আজ রাতে নীলুর বাবা ইদ্রিস মোল্লা সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরবেন না বলে একটু আগে খবর পাঠিয়েছেন ।
নীলুর মনে হলো তার ভাগ্য খুবই ভালো। শুধু শুধু কোন মিথ্যা বলতে হলো না তাদের । সাদা শার্ট পরা আসিফ নামের লোকটার প্রতিও সে ভীষণ কৃতজ্ঞতা অনুভব করছে ।

রাতটা আসিফ থেকে গেলো নীলুদের ওখানে । নীলুদের বড় ঘরের সামনে আলাদা আরেকটা ছোট ঘর আছে। যেটা বাইরের মেহমানদের জন্য তৈরি করা হয়েছে । তার থাকার ব্যবস্থা হলো সেখানে।

আসিফের ঘুম ভাঙলো ভোরে। সে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিলো। সকাল সকাল তাকে ময়মনসিংহ ফিরতে হবে। গতকাল নীলুদের এখানকার সবাই শরীফের সাথে দেখে তাকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছিল । খাতিরযত্নও করেছে ।

হঠাৎ পায়ের শব্দ পেয়ে সে ঘুরে তাকালো। নীলু ঘরে ঢুকছে তার সাথে দশ, বারো বছরের একটা মেয়ে। চেহারা নীলুর সাথে মিল আছে। নিশ্চয় ওর ছোট বোন-টোন হবে । নীলুর হাতে নাস্তার প্লেট, বাচ্চা মেয়েটির হাতে জগ- গ্লাস । মেয়েটি পানির জগ নামিয়ে রেখে চলে গেল। কিন্তু নীলু দাঁড়িয়ে আছে। আসিফের মনে হলো নীলু কিছু একটা বলতে এসেছে ।
সে নীলুর দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললো,
— কেমন আছ নীলু? তোমার মামীর সাথে ফোনে কথা হলো। আমি একটু পরেই চলে যাচ্ছি জান হয়তো ।

নীলু মাথা নাড়লো।
তারপর একটু চুপ থেকে বললো,
,’আমার একটা কথা ছিল।’
আসিফ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
নীলু একটু ইতোস্তত করে বললো,
— মামীর কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না। আসলে একবার স্ট্রোক করেছিলেন, উনার মাথার ঠিক নাই। আমাকে বাঁচাতে কাল হয়তো আপনাকে উল্টো পাল্টা নানান কথা বলেছেন। আর আমিও ঝোঁকের মাথায় বাড়ি থেকে পালায়া ঠিক কাজ করি নাই।

আসিফ হেসে ফেললো। নীলু একটু থেমে বললো,

— আপনি আমার জন্য যা যা করেছেন তার জন্য আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। আর হয়তো কোনদিন আমাদের দেখা হবে না তবে…
— তবে কী?
—তবে আপনার কথা আমার মনে থাকবে।

আসিফের চোখে কৌতুক খেলা করছে। সে হঠাৎ হো হো করে হেসে ফেললো।

— কেন তোমার মনে হলো আমি কেবলমাত্র তোমার মামীর কথাতেই এখানে এসেছি আমার নিজের কোন স্বার্থ নেই?

নীলুর কেমন লজ্জা লাগছে । লোকটা হঠাৎ আজ তাকে তুমি তুমি করে কেন বলছে কে জানে!

আসিফ নীলুর অস্বস্তি বুঝতে পারলো।
— শোন নীলু আমি আজ চলে যাব ঠিকই কিন্তু সবার সাথে যোগাযোগ রাখব । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখানে ফিরব । তোমার বাবার সাথে কথাও বলব। এবার তো উনার সাথে দেখা হলো না। সেবার সাথে করে মা’কেও নিয়ে আসব।

নীলুর কাছে অচেনা অজানা এই লোকটাকে হঠাৎ এখন কেন যেন খুব আপন আপন মনে হচ্ছে। কে বলবে মাত্র গতকালই তাদের প্রথম দেখা হয়েছে..!

নীলু জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল। জানালায় চোখ পড়তে থেমে গেল। কেউ একজন আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা শুনছে।
সে জানালার দিকে এগিয়ে গেল।
— কে ? কে ঐখানে?
জানালায় ধূর্ত একটা মুখ দেখা গেল।
তার বড় চাচার ছেলে জামাল ভাই দাঁড়িয়ে আছে ।
নীলু থমথমে গলায় বললো,
— জামাল ভাই ঐখানে কী করেন?

—- নীলু, ঘরে এইডা কে? কার সাথে কথা কও?
— কেন, আপনে জানেন না। মেহমান আসছে বাড়িতে। শরীফ সাথে করে নিয়া আসছে গতকাল।

জামাল দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললো,

— ওওও, তা তোমারে নাকি কাইল পাওয়া যাইতেছিল না । সবাই খোঁজাখুঁজি করছে এমন শুনলাম, কই গেছিলা?

— কোথাও না। ঘরেই আছিলাম।

— চম্পার কইতেছিল তুমি নাকি পরীক্ষায় ফেল কইরা পলাইছ… ভুল শুনছিলাম তাইলে ?

জামাল ভাই কেমন কুৎসিত ভঙ্গিতে হাসছেন। নীলু চোখ ফিরিয়ে নিল। সে হঠাৎ ভীষণ বিষন্নবোধ করছে । কিছু না বলে সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

নাস্তা শেষ করেই শরিফকে নিয়ে আসিফ ময়মনসিংহ রওনা দিল ।
নীলু ইচ্ছে করেই সেসময় তাদের সামনে গেলো না। তার মনে হলো এ জীবনে আসিফ নামের লোকটার সাথে তার আর কোনদিন দেখা হবে না হয়তো ।

চলবে—
** মাঞ্জুমান আরা চরিত্রটি অনেকের কাছে একটু অন্য রকম লাগতে পারে। তার আচরণ এই গল্পের শেষ পর্ব পড়লে মিলাতে পারবেন।

©মাহবুবা আরিফ সুমি