ভাগ্য ৭ পর্ব

0
844

#ভাগ্য ৭ পর্ব

রান্না শেষে হাসিবের জন্য অপেক্ষা করছি, বাসায় আসলে একসঙ্গে রাতের খাবার খাবো।
খেলা শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ আগে, এখনো হাসিব বাসায় ফিরছে না বলে টেনশন হচ্ছে।
পরক্ষণেই মনে পড়লো, ফোন করে তো জানতে পারি, কেন সে বাসায় আসতে দেরি করছে।
ফোন করা মাত্রই হাসিব কল রিসিভ করে বলল, এইতো আমি দরজার সামনে, দরজা খুলেন।

আপনি এতো দেরি করলেন কেন, জানেন আমার কত টেনশন হচ্ছিল,ভাবলাম কোনকিছু হয়েছে কি না।
আমার দিকে চেয়ে হাসিব হাসছে।
হাসেন আরো বেশী করে, এইদিকে চিন্তায় আমি মরে যাচ্ছি।

হাসবো না কি করব বলেন, আমার হাতে শপিং ব্যাগ দেখে বুঝতে পারছেন না আমি কেন দেরি করে ফিরছি, না কি সেই দিকে চোখ যায়নি,
বড়দিনের শপিং করলাম।
আপনি শপিং করতে যাবেন একটি বার ফোন করে জানিয়ে দিলে কি এমন হতো, আর বড়দিনের শপিং কেন করতে হবে, আমরা কি খ্রিস্টান।

খ্রিস্টান না তাই বলে কি বড়দিনের জন্য শপিং করতে পারিনা, ফ্ল্যাটের মালিক যে আমাদেরকে বড়দিনের পার্টিতে ইনভাইট করল,সেখানে তো যেতে হবে, তাই আমার জন্য আর আপনার জন্য কিছু শপিং করলাম।

পার্টিতে যাবো আমি কি বলছেন, আমি যাবো না।
আমার না শুনে, অভিমানের কন্ঠে হাসিব বলল,

আপনি বললেই হলো যাবেন না, আমি যা বলছি তাই হবে আপনাকে আমার সাথে পার্টিতে যেতে হবে।
আজ খেলা দেখতে যেতে বললাম গেলাম না, কিন্তু পার্টিতে না সেটা আমি মানবো না।

হাসিব শপিং ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গেল।
আমার জন্য আকাশী রঙের শাড়ী আর কসমেটিক নিয়ে আসছে, আকাশী রঙের শাড়ী আমার খুব পছন্দের, হাসিব কি করে জানল, ওহ মনে পড়ছে সেদিন হাসিব আমার কাছে জানতে চেয়েছিল আমার কোন কালার ফেভারিট, সেই ধারণা থেকেই হয়তো বুঝতে পারছে আকাশী রঙের শাড়ীও৷ আমার পছন্দের।
মেয়েদের কসমেটিক হাসিব ভালোই কিনতে পারে, তার তো বোন নেই তাহলে মেয়েদের কসমেটিক কিভাবে ভালভাবে কিনতে পারে, গার্ল ফ্রেন্ড থাকতে পারে তাকে মনে হয় এগুলো কিনে দিতো, গার্ল ফ্রেন্ড আছে কি না কখনো জিজ্ঞাস করে দেখিনি।
আজ খুব জানতে ইচ্ছা করছে, ডিনার করতে বসে, জানতে চাইলাম তার গার্ল ফ্রেন্ড আছে কি না।

আমার গার্ল ফ্রেন্ড নেই, আমি এগুলো লাইক করি না, আগে স্টাডি কমপ্লিট করব তার পর বিয়ে।
স্কুল লাইফে একজনকে পছন্দ করতাম, পরে জানতে পারি সে অনেকজনের সাথে রিলেশন করে, জানতে পেয়ে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করেছি কাউকে ভালোবাসবো না।
যদি ভালোবাসি বিয়ে করে স্ত্রীকে ভালোবাসবো।

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম, আমার বাবা গুরুতর অসুস্থ, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মা আর বোন খুব কান্না করছে। এমন স্বপ্ন দেখে সজাগ হয়ে গেলাম,আমারো খুব কষ্ট লাগছে বাবার জন্য।
এক বছর ধরে তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই, অবশ্য হাসিবকে বললে ফোনে আমাকে বাবা মার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতো, আমিই ইচ্ছা করে কথা বলতে চাইনি।
মাকে যখন বলেছিলাম ইংল্যান্ড আসব না, মা আমাকে যে কথা গুলো বলেছিল, মায়ের মুখ থেকে ওইরকম কথা শুনে অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম।
এখন স্বপ্নটা দেখার পর খুব ইচ্ছা করছে মা বাবার খবর জানতে।
সকাল হবার অপেক্ষা করতে থাকলাম, হাসিব ঘুম থেকে উঠলেই বলব, বাংলাদেশে ফোন করে দিতে।

কয়েকবার রিং বাজতেই ছোট বোন মিলি ফোন রিসিভ করল। জানতে চাইল কে আমি, পরিচয় দিতেই বলতে শুরু করল,
আপু তুই এটা কি করলি, আদিব ভাইয়া না হয় তোর উপর অত্যাচার করেছে তাই বলে তুই অন্যজনের সঙ্গে পালিয়ে যাবি, মনে হয় ভালোই আছিস না হলে এতদিন পরে আমাদের কথা মনে হলো।
মিলির কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম, আমি পালিয়েছি অন্যজনের সঙ্গে, তাদেরকে এই কথা কে বলছে, মিলির কাছে জানতে চাইলাম।

গত মাসে আদিব ভাইয়া বাংলাদেশে আসছিল সে বলছে, আদিব ভাইয়া তোমাকে ডিভোর্স দিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বিয়ে করে বউ নিয়ে আবার ইংল্যান্ড চলে গেছে।

আদিব আমার নামে এতবড় মিথ্যা অপবাদ দিতে পারল, আর পারবেনা কেন, তার মত অমানুষের দ্বারা সবকিছুই সম্ভব।
মিলির কাছ থেকে ফোন দিয়ে মা আমাকে অনেক কথা বলল, যখন বললাম আমি প্রেগন্যান্ট, আদিবের সন্তান আমার গর্ভে, শুনে মা তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে, বলে কার না কার বাচ্চা পেটে নিয়েছিস এখন বলছিস আদিবের, তোর এই কথা আদিব মেনে নিবে না কি, সে তোকে ডিভোর্স দিয়ে বিয়ে করে ফেলছে।
যার বাচ্চা পেটে নিয়েছিস তাকেই বল বিয়ে করতে , না কি সে এখন তোকে বিয়ে করে না।
আমি ফোন কেটে দিলাম, ফোনের স্পিকার বাড়ানো ছিল, মায়ের বলা সব কথা হাসিব শুনছে।
লজ্জায় ঘৃনায় আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে, হাসিবের সামনে থেকে চলে গিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে দিলাম।

হাসিব বারবার দরজায় ধাক্কাচ্ছে, আমাকে বলছে দরজা খুলে বাহিরে বের হতে।
আমি বের হচ্ছিনা, যখন বলল, তার ক্ষিদে লাগছে খাবার দিতে তখন বের না হয়ে পারলাম না।

ইসরাত আপনি একটুও চিন্তা করবেন না, যে যাই বলুক, আমি আছি আপনার পাশে, এই অবস্থায় আপনি যদি বেশী চিন্তা করেন, তাহলে বাচ্চার উপর খারাপ প্রভাব পরবে।

মরে যাক এই বাচ্চা, আমি চাইনা এই বাচ্চা পৃথিবীটাতে আসুক কি পরিচয় দেবো এই সমাজে কে এই বাচ্চার বাবা।
সবাই জানবে আমি জারজ বাচ্চা জন্ম দিয়েছি, তখন তো আমাকেই আত্মহত্যা করতে হবে। নিজের মা বোন যখন আমাকে বিশ্বাস করল না, অন্য মানুষ তো আমাকে খারাপ বলবেই। আমি আগেই বলেছিলাম বাচ্চা নষ্ট করে ফেলি, শুধু আপনার জন্য পারলাম না, আপনিই বলুন বাংলাদেশে গেলে সবাই যখন জানতে চাইবে এই বাচ্চার বাবা কে, তখন আমি কি বলব।

এই বাচ্চার বাবা আমি, আমি সবাইকে বলল, তাহলে তো কেউ আর কোন কথা বলবে না

আপনি আমাকে বিয়ে না করে কিভাবে বাচ্চার বাবা হবেন, মুখের কথা বললেই তো কেউ বিশ্বাস করবেনা। আর আপনি কি পারবেন বাংলাদেশে যেয়ে আমার আর আমার মেয়ের সমস্ত দায়িত্ব নিতে।
আপনার ফ্যামিলি যখন জানতে পারবেন, আপনি আমাকে আমার মেয়েকে সাহায্য করছেন৷
তখন কিছুতেই এটা আপনার ফ্যামিলি মেনে নিবে না।

অবশ্যই আমি আপনার আর আপনার সন্তানের সমস্ত দায়িত্ব নেবো, এবং আমার ফ্যামিলি সবকিছু মেনে নিবে, কারণ আমি আপনাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েই বাংলাদেশে ফিরব। আমার মা বাবা ভাই ভাবী সবাই জানবে আপনি আমার স্ত্রী আর আপনার সন্তানের বাবা আমি।

সেটা কিছুতেই সম্ভব না আমার মত মেয়ে আপনার স্ত্রী হবার যোগ্য না, আপনি আমার জন্য যা করছেন আমার জীবন দিয়েও তার প্রতিদান দিতে পারব না।
হাসিব বলল, সম্ভব কি সম্ভব না সেটা না হয় পরে দেখা যাবে, এখন সব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে মুছে ব্রেকফাস্ট করে নেন।
হাসিব ভার্সিটি চলে গেল, আমি হাসিবের বলা কথা গুলো নিয়ে ভাবতে থাকলাম।
সত্যি কি হাসিব আমাকে বিয়ে করতে চায়, না কি সান্ত্বনা দেবার জন্যে বলছে।
তার মত স্মার্ট হ্যান্ডসাম ছেলে কেন আমার মত কালো বিবাহিতা এক সন্তানের মাকে বিয়ে করতে যাবে।
হাসিব ইংল্যান্ড থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে গেলে অনেক ভালো মেয়ে বিয়ে করতে পারবে।

নয় মাসে চলছে, এখন ঠিকমত রান্নাবান্না করতে পারিনা, পায়ে পানি জমে যাচ্ছে।
হাসিব আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল বাচ্চা হওয়ার তারিখ জানার জন্য, ডাক্তার বলল এক সপ্তাহ বা দশদিনের মধ্যেই বেবি হবার টাইম।
এখন রান্না হাসিব নিজেই করে আমাকে খাবার বেড়ে দেয়, কোন কাজ করতে দেয়না।
যখন ভার্সিটি বা চাকরির ডিউটিতে যায় বারবার বলে যায়, কোন ধরনের সমস্যা হলে সাথে সাথে কল করতে, মোবাইল যেন হাতের কাছে রাখি সবসময়।

রাত বারোটা পেটে যেন কেমন মুচড় দিয়ে ব্যথা শুরু হলো, ভাবলাম ব্যথা হয়তো কমে যাবে, তাই হাসিবকে ফোন করলাম না, কিন্তু ব্যথা আরো বেশী হতে থাকল।
হাসিবকে ফোন করলাম, দশ মিনিটের মধ্যে হাসিব চলে আসল এম্বুলেন্স নিয়ে।
হাসপাতালে নিয়ে যাবার আধা ঘণ্টা পরেই নরমাল ডেলিভারি হলো।
বাচ্চাকে প্রথমেই হাসিব কোলে নিয়ে কপালে চুমু খাইলো, পরে আমার কাছে দিল।
হাসিব অনেক খুশী হয়েছে মেয়েকে কোলে নিয়ে, আমিও খুশী হলাম আমার মেয়েকে আমার বুকে জড়িয়ে ধরে।

চলবে,,,

সাদমান হাসিব সাদ