ভালোবাসব যে তোকে? পার্ট ৭

0
3410

#ভালোবাসব_যে_তোকে?
পার্ট ৭
লেখিকাঃসারা মেহেক

??

সকালে ঘুম থেকে উঠে মৌ নিজেকে আয়ানের বুকে শোয়া অবস্থায় আবিষ্কার করলো।তার যতদূর মনে আছে সে সামনের দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পরেছিলো।এখানে আসলো কিভাবে??ঘুমের মধ্য আবার হাঁটা ধরলো নাকি সে??আচ্ছা ঘুমিয়েছে তো ঘুমিয়েছে তাও আবার আয়ানের বুকে!!!!
আয়ান যাতে না টের পায় তাই মৌ তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলো।
আসলে মৌ অজান্তেই আয়ানের বুকে ঘুমিয়ে পরে।আয়ানও ঘুমের মধ্য ছিলো বলে কিছুই টের পায়নি।

মৌ ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়ে দাদি,অহনা আর আম্মুর সাথে গল্প করছে আর নাস্তা বানানোতে হেল্প করছে।
আর আয়ান বেশ কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠে শাওয়ার নিতে গেলো।

মৌ কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে রুমে এসে খাটের উপর বসে আছে। ওয়াশরুমের দরজা খুলার আওয়াজে মৌ আয়নার দিকে তাকায়। কারন আয়না দিয়ে ঐ জায়গাটা দেখা যায়।

হঠাৎই ধাম করে কিছু একটা পরলো। আই মিন মানুষ পরলো। মানে আয়ান আরকি।মৌ তো এ দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা। তার হাসতে হাসতে অবস্থা শেষ।কোনোমতেই যে সে হাসি থামাতে পারছে না সে। এখন হাসির জন্য রীতিমত তার পেট ব্যাথা করছে। তার এই একটা বদঅভ্যাস আছে।কেউ এভাবে পরে গেলে সে আগে মনমতো হেসে নেয়।তারপর সাহায্য করে।এর জন্য অবশ্য সে প্রচুর বকা শুনেছে।তাও সে শুধরায় না। (আমি নিজেও কিছুটা এমন করি??।ইভেন আমি নিজে পরে গেলেও আমার চরম হাসি পায় ??) এদিকে আয়ান যে পরে আছে একই অবস্থায় তাতে মৌ এর যেনো খেয়াল নেই। সে তো এখন হাসির জগতে বিরাজ করছে।

আয়ান আর সহ্য করতে না পেরে দিলো এক ধমক।তা শুনে মৌ চুপ হয়ে গেলো।আর জোরে জোরে শ্বাস নিলো।কারন হাসির জন্য সে ভালোভাবে শ্বাসই নিতে পারছিলো না।

“এই মেয়ে।সেই কখন থেকে হেসেই যাচ্ছিস তুই। এতো হাসার কি হলো শুনি??এখানে কি কোনো সার্কাস চলছে??আমি যে সেই কখন থেকে এভাবে পরে আছি।আমাকে উঠানো বাদ দিয়ে উনি হেসেই চলছে।
আয় আমাকে উঠা।পায়ে প্রচুর ব্যাথা করছে।”

মৌ এবার মুখ টিপে টিপে হাসছে।এভাবেই সে গিয়ে আয়ানকে বসা থেকে দাঁড়া করালো।এতেই তার অবস্থা কাহিল।কারন আয়ান এর মতো বডিওয়ালা ছেলেকে উঠানো মৌ এর মতো মেয়েদের জন্য কষ্টসাধ্য বটে। সে বহুত কষ্টে আয়ানকে খাটে বসালো।

“উফ রে কি ভারী এ ছেলে।আমার তো দাঁড়া করাতেই অবস্থা করুন। ”

আয়ান হালকা আওয়াজে বললো,”নিজের পর এ ভার কিভাবে সহ্য করবি তাহলে?”

“কিছু বললা তুমি??”

“কি না তো কিছুই বলি নি।”

“ভালো কথা।এবার শুয়ে পরো দেখি।পায়ে কেমন ব্যাথা?? ”

“ওই মাথা খারাপ তোর?? এভাবে টাওয়াল পরে আমি শুবো!!!”

“ওহ তো ঠিক আছে। আমি চেন্জ করে দিচ্ছি।”
( আয়ানকে ভয় দেখানোর জন্য এমন বললো।)

“এই তুই কি পাগল হয়ে গিয়েছিস নাকি!!!!তুই আমাকে চেন্জ করাতে যাবি কেনো?আমি একাই করতে পারি।”

“ওওওওও।আমি ভাবলাম আমার হেল্প লাগবে মনে হয়।আমি তাহলে শার্ট আর প্যান্ট এনে দিচ্ছি।”

“শার্ট প্যান্ট আনিস না। পায়ে ব্যাথা করছে বেশ।অফিসে যেতে পারবো না।একটা গেন্জি আর ট্রাউজার আন।”

“আচ্ছা।”

মৌ রুমের দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে দাঁড়ীয়ে আছে।আয়ান অনেক কষ্টে ড্রেস পরে নিলো। একা একা এভাবে ড্রেস পরায় পায়ের ব্যাথাটা যেনো আরো বেশি বেড়ে গেলো তার।

“হয়েছে?আসবো?”

“হুম আয়।”
এরপর মৌ দরজা খুলে রুমের ভিতর গিয়ে দেখে যে আয়ান পা টা ধরে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে।

“পায়ে কি খুব ব্যাথা পেয়েছো?”

“হুম খুব ব্যাথা করছে।দাঁড়ীয়ে থাকতে পারছি না।”

“আচ্ছা আমি ব্যাথার ওষুধ আনছি। ওষুধ খেলে আর গরম পানির ছ্যাক নিলে ঠিক হয়ে যাবে।”

এরপর মৌ গিয়ে আগে সবাইকে আয়ানের পরে যাওয়ার খবর দিলো।সবাই আয়ানকে দেখতে রুমে গেলো। আর এদিকে মৌ সব কিছু রেডি করে নিয়ে রুমে গেলো।

এভাবে দেখতে দেখতে ৩দিন কেটে গেলো।এখন আয়ান পুরোপরি সুস্থ।এই ৩দিন মৌ আয়ানের অনেক খেয়াল রেখেছে।আয়ানের কিছু প্রয়োজন হলে সাথে সাথে সে এনে দিতো।৩ বেলা খাবার খাইয়ে দিয়েছে আয়ানকে। মৌ এর এমন দেখভাল করা দেখে আয়ানের মনে মৌ এর জন্য একটা সফট কর্নার তৈরী হয়ে গিয়েছে।
এ কদিনে আয়ানের একটিবারের জন্যও মনার কথা মনে আসে নি। আসবেই বা কিভাবে মনা একবারও ফোন দেয়নি আয়ানকে।

৪ দিনের দিন আয়ান অফিসে গেলো।আর মৌ ও কলেজে গেলো। এ কয়দিন সে কলেজেও যায়নি।
কলেজ থেকে আসার পর মৌ এর আর ভালো লাগছেনা। এ কয়দিন আয়ানের খেয়াল রাখতে রাখতে কোনদিক যে সময় কেটে যেতো তা নিজেও জানতো না।
মৌ একা একা বসে আছে দেখে দাদি আর অহনা আসলো।
দাদিঃ কি ব্যাপার মৌ?একা বসে আছিস কেনো?

অহনাঃতোমার নাতি কে মিস করছে মনে হয়।

মৌঃঠিক ধরেছিস।

অহনাঃ আরে বাহ। এই প্রথম মনে হয় তোর ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ ঠিক হলো।

মৌ কিছু না বলে চুপচাপ বসে আছে।

দাদিঃআচ্ছা মৌ তোকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাস করি।

মৌঃহুম করো।

দাদিঃতুই কি আয়ানকে ভালোবাসিস??

মৌ ঃ হয়তো। এরা আমি নিজেও জানি না।কিন্তু আমি খুব পছন্দ করি আয়ানকে।সে যখন মনার কথা বলে তখন আমার খুব খারাপ লাগে।যদিও এ কয়দিনে একবারও মনার নাম শুনেনি আমি তা মুখে।

দাদিঃতুই আয়ানকে ভালোবাসিস এটা সত্যি।আর আমার মনে হয় আয়ানও তোকে ভালোবাসে।

মৌ ঃকি যে বলো না দাদি।আমাকে ভালোবাসতে যাবে কোন দুঃখে? সে তো মনাকে ভালোবাসে।

দাদিঃতুই ওর স্ত্রী সেই জন্য ভালোবাসতে যাবে।দেখ বিয়ের সম্পর্ক একটা পবিত্র সম্পর্ক। একটা মানুষের সাথে থাকলেই এমনিই তার প্রতি ভালোবাসা জন্মে যায়।আর আয়ান এতোদিন তোর কেয়ারিং দেখেছে।তোকে ভালো না বাসলেও ওর মনে তোর জন্য একটা জায়গা হয়ে গিয়েছে।আর এটা থেকেই ধীরে ধীরে ভালোবাসা জন্মাবে ওর মনে।দেখে নিস।

মৌ ঃএমনিই যেনো হয় দাদি।

দাদিঃ দোয়া করি এমনিই হবে।

আজকে শুক্রবার,
আয়ান সারাদিন ই বাসায় বসে আছে আজকে।আর মৌ এর মনে হয় দুনিয়ার যত কাজ আজকে মনে পরেছে। কই একটু বেচারা আয়ানকে সময় দিবে তা না।আয়ানের খুব মন চাইছে মৌ এর সঙ্গ পেতে। কিন্তু সে মুখ ফুটে বলতেও পারছে না।

আয়ান রুমের সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ছিলো।আর মৌ কাজ সেরে শাওয়ার নিতে গেলো।
শাওয়ার নিয়ে বের হওয়ার পর আয়ান মৌ এর দিকে তাকিয়ে আছে।মৌ ভেজা চুল থেকে টাওয়াল খুলে আলতো হাতে চুল মুছছে। এ অবস্থায় মৌ কে দেখতে খুব বেশি সুন্দর লাগছে আয়ানের।মনে হচ্ছে কোনো এক পরি সে। তার ঘোর লাগা কাজ করছে মৌ কে দেখে।তার ইচ্ছা করছে মৌ কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সে তার ইচ্ছাটাকে যথাসম্ভব দূরে সরিয়ে দিলো।

মৌ বারান্দায় টাওয়াল ছাড়িয়ে দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।আর আয়ান মৌ এর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো।

আজকে মৌ আর অহনা প্লান করেছে বিকালে শাড়ী পরবে।যেই ভাব সেই কাজ। দুপুরে খেয়ে এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে মৌ আলমারি থেকে শাড়ী বের করলো।একটা পার্পেল কালারের শাড়ী পরবে আজ সে। যে যার রুমে সাজবে বলে ডিসাইড করলো তারা।

আয়ান তার দাদির সাথে নিচে বসে গল্প করছে।হঠাৎ করে তার মনে আসলো একটা জরুরী কল করতে হবে তাকে। তাই সে ফোন আনতে রুমে গেলো।
আর এদিকে মৌ শুধু দরজা হালকা লাগিয়ে রেখেছিলো।দরজা যে ভালোভাবে লাগিয়ে দিবে, এক্সাইটমেন্ট এর জন্য তাও বেমালুম ভুলে গিয়েছে সে।

আয়ান হঠাৎ করেই রুমে প্রবেশ করলো।সে দেখলো মৌ এর গায়ে শাড়ী নেই।সে শাড়ীর কুঁচি করছিলো।আয়ানকে এভাবে রুমে ঢুকতে দেখে মৌ কিছুটা ভরকে গেলো।এ অবস্থায় পরে আয়ান আর মৌ দুজনে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পরলো।
এ দেখে আয়ান তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে রুমের বাইরে চলে গেলো।মৌ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
এদিকে অহনা তো রেডি হয়ে মৌ এর রুমের বাইরে দাঁড়ীয়ে আছে।সে মৌ কে তাড়াতাড়ি রেডি হওয়ার জন্য তাগিদ দিচ্ছে।

৫মিনিট পর মৌ রেডি হয়ে বের হয়ে এলো।মৌ কে দেখে তো অহনা পুরাই অবাক। আজকে মৌ কে দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

“আরে দোস্ত, তোকে আজকে সেই লেভেলের সুন্দর লাগছে।ভাইয়া দেখে শিওর হার্ট অ্যাটাক করবে।”

“আরে রাখ তোর পাম।চল ছাদে গিয়ে ছবি তুলি।”

“হুম চল।”

এদিকে আয়ান রুম থেকে ডাইরেক্ট ছাদে এসে দাঁড়ীয়ে আছে।সে দেখলো মৌ আর অহনা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে আসছে।মৌ কে দেখে তো আয়ানের হার্টবিট বেড়ে গেলো।অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। মনে হয় কোনো অপ্সরী সে।
মৌ কে তার কাছে এতো সুন্দর মনে হয় এই প্রথম লাগছে।

মৌ আর অহনা ছাদে দাঁড়ীয়ে ছবি তুলছে আর আয়ান এক মনে তা দেখে চলছে। এই পড়ন্ত বিকালের সূর্যের কিরণ মৌ এর মুখে এসে পরছে।যা তাকে আরো মায়াবীনী করে তুলছে।
আয়ান আজকে মৌ এর চেহারার সব খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। সে আজই প্রথম খেয়াল করলো মৌ মুচকি হাসলে তার ডান গালে ছোটো একটা টোল পরে। এই টোল পরার জন্য তাকে খুব বেশি কিউট লাগছে।আর তার ঘন কালো ভ্রু যুগলের যেনো কোনো জবাব নেই।ভ্রু প্লাক করা নেই বলেই হয়তো এতো সুন্দর লাগছে।
আয়ান মৌ এর চোখ দুটো অনেকক্ষন ধরে দেখছে।ডাগর ডাগর আঁখি তার মায়াবীনির।কাজল দেওয়ায় যেনো চোখ দুটোর সৌন্দর্য আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

আয়ান চুপিসারে মৌ এর বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলো তার ফোনে।

চলবে….