মায়াবিনী পর্ব : ১৯+২০

0
586

#মায়াবিনী

সুরমা
পর্ব : ১৯+২০

অপূর্ব রাস্তা দাঁড়িয়ে আছে।দৃষ্টি সুপ্তির রুমের দিকে।ব্যালকনির দরজা বন্ধ।রাস্তায় তেমন লোকজন নাই।চারদিন নিস্তব্ধ। আকাশ ভর্তি তারা।জলমল আলো ছড়িয়েছে আপন মনে।আকাশের মনে হয়তো আজ অনেক সুখ বিরাজ করেছে।কিন্তু কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে অপূর্বের।সুপ্তির সাথে একটিবার কথা বলার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠেছে অপূর্ব।অপূর্বের চোখে আজ জল।বুকে ব্যথা।কেন জানি তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।এর কারন কি?জানা নেই অপূর্বের।তবে এর আগে কারো জন্য এমন হয়নি।এর নামেই হয়তো ভালোবাসা।অপূর্বের শরীর খুবই দুর্বল লাগছে।দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না।কিন্তু এখান থেকে যেতেও মন চাচ্ছে না।অপূর্বের খুব ইচ্ছে করছে একবার বাউন্ডারি টপকে সুপ্তির রুমে চলে যেতে।কিন্তু এই শরীরে পারবে কিনা বুঝা যাচ্ছে না।কিন্তু হার মানতেও সে নারাজ।সো যেমন ভাবা তেমন কাজ।অপূর্ব দেয়াল টপকে অনেক কষ্টে চলে যায় সুপ্তির ব্যালকনিতে।রুমের দরজা বন্ধ।অপূর্বের খুব কষ্ট লাগছিল।এই টুকুতে সে হাঁপিয়ে উঠেছে।এর আগে কতোবার এই ব্যালকনিতে এসেছে।কিন্তু এতোটা কষ্ট লাগে নি কখনও।আজ মনে হচ্ছে আর একটুর জন্যে তার প্রাণটা বের হয় নি।অপূর্ব কিছুক্ষণ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে দরজায় আস্তে করে ঠুকা দিয়ে বলে,,,,
-সুপ্তি দরজা খুলো,,!!!সুপ্তি বিছানায় শোয়ে কান্না করছিল।সেও অস্থির হয়ে উঠেছিল অপূর্বের জন্য।এই দুদিনে অপূর্বের কোনো খোঁজ পায় নি।অনেক চেষ্টা করেছিল অপূর্বের সাথে যোগাযোগ করার জন্য।কিন্তু সেটা কিছুতেই হয়ে উঠে নি।অপূর্বকেও আসতে না দেখে সুপ্তি ভেবে নিয়েছিল অপূর্ব হয়তো আর কখনও ফিরে আসবে না।হয়তো অপূর্ব তাকে ভুলে নতুন জীবন শুরু করবে।নিজেকে অনেক কিছু দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সুপ্তি।কয়েকবার মনে মনে চিন্তা করেছে,,,,
‘আমার সাথে অপূর্বের যোগাযোগ হলে ভাইয়াতো অপূর্বকে জানে মেরে ফেলবে।ভালোই করেছে অপূর্ব নিজের থেকে আমার জীবন থেকে চলে গিয়ে।হয়তো অপূর্বকে সে পাবে না।কিন্তু ইচ্ছে হলে দূর থেকে তো একবার দেখতে পারবে।না হোক কথা।তবুও সুপ্তি চায় অপূর্ব ভালো থাকুক।সুখে থাকুক।আবার একেকবার মনে আসে,,এই ছিল অপূর্বের ভালোবাসা?কথা ছিল একে অপরকে কোনোদিন ছাড়বে না।আজ এভাবে ভুলে গেলো?তাহলে কি সে ভুল মানুষকে ভালোবেসেছে?নানান এলোমেলো চিন্তা সুপ্তিকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছে।সুপ্তির যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।মৃত্যুর স্বাদ নেওয়ার সময় হয়েছে সুপ্তির।সুপ্তির এই দুইটা দিন যেন দু’শো বছরের মতো লাগলো।এতো খারাপ সময় তার জীবনে কখনও আসবে ভাবে নি সুপ্তি।সুপ্তি বিছানায় শুয়ে নিঃশব্দে কান্না করছিল।হঠাৎ অপূর্বের কণ্ঠ কানে আসতেই সুপ্তি লাফ দিয়ে উঠে বসে।বুঝতে পারছে না সত্যি অপূর্ব এসেছে নাকি সে কল্পনা করছে বলে এমন শোনাচ্ছে। সুপ্তি স্থির হয়ে বিছানায় বসে।কিন্তু না,আরো দু তিনবার অপূর্বের কণ্ঠ শোনতে পায় সে।সুপ্তি খেয়াল করেছে,কণ্ঠটা ব্যালকনি থেকে আসছে।সুপ্তি আর কিছু চিন্তা না করে দৌঁড়ে গিয়ে ব্যালকনির দরজা খুলে দেখে অপূর্ব দাঁড়িয়ে আছে।অপূর্বকে দেখে সুপ্তি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না।এক লাফে অপূর্বের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করে।এক সাগর অশ্রু তার চোখ দিয়ে বের হচ্ছে।কষ্ট গুলো চোখের পানি হয়ে বের হয়ে আসছে।অপূর্ব সুপ্তিকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।এতোটা শক্ত করেই ধরে যে মনে হচ্ছে এখন সুপ্তিকে ছেড়ে দিলেই কেউ সুপ্তিকে তার জীবন থেকে নিয়ে যাবে।সুপ্তিকে নিজের বুকে নিতে পেরে অপূর্ব পরম শান্তি ফিল করছে।এই কয়দিনের কষ্টের অবসান ঘটতে শুরু করে।সুপ্তি অপূর্বকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করলো।অপূর্ব সুপ্তিকে কাঁদতে বাঁধা দিলো না।অনেক কষ্ট জমা হয়েছে মেয়েটার মনে।কাঁদুক একটু।কাঁদলে মন হালকা হবে।সে ছেলে হয়েও যদি কান্না করতে পারে তাহলে সুপ্তি মেয়ে হয়ে কেন পারবে না?এক সময় সুপ্তির কান্নাটা নিজে থেকেই থেমে গেলো।অপূর্ব হাতের বাঁধনটা একটু ঢিলে করতেই সুপ্তি অপূর্বের বুক থেকে মাথা তুলে অপূর্বের দিকে তাকায়।এই দু’দিনেই অপূর্বকে রোগা দেখাচ্ছে।চোখে মুখে সতেজতার চাপ একদমেই নেই।অপূর্ব সুপ্তির গালে হাত রেখে সুপ্তির কপালে একটা চুমু খায়।তারপর বলে,,,,,
-আমি খুব শীঘ্র তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাবো।তোমার বাবা ভাইয়ের সাথে কথা বলবো।তাদের বুঝাবো।তুমি চিন্তা করো না।অপূর্বের কথা শোনে সুপ্তির বুকে ধুম করে উঠে।হৃদপিণ্ডটা ঝড়ের বেগে দৌঁড়াতে শুরু করে।শুভ্রর কথা গুলো কানে এসে লাগতে থাকে।’আবার যদি তোকে এই ছেলের কথা বলতে শোনি বা তোদের এক সাথে দেখি,তাহলে আমি ওকে জানে মেরে দিবো’।সুপ্তি তার ভাইকে খুব ভালো করেই চিনে।যদি সত্যি আবার অপূর্বকে তার সাথে দেখে তাহলে অপূর্বকে রক্ষা করা মুশকিল। সুপ্তি কিছুতেই চায় না তার জন্য অপূর্বের কোনো ক্ষতি হোক।অপূর্বকে না পাওয়ার কষ্টটা সুপ্তি মেনে নিতে পারলেও,অপূর্বকে মরতে দেখতে সুপ্তি কিছুতেই পারবে না।অপূর্ব নিজে থেকে যে সুপ্তির জীবন থেকে দূরে যাবে না এটা সুপ্তি ভালোই বুঝতে পেরেছে।সুপ্তি অপূর্বকে নিজের থেকে একটু দূরে ঢেলে দিয়ে বলে,,,,
-তুমি আমাকে ভুলে যাও অপূর্ব।আমাদের এই সম্পর্ক আমার পরিবার কোনো দিন মেনে নিবে না।সুপ্তির দূরে সরিয়ে দেওয়াটা যেন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে একটা বিষয় ছিল অপূর্বের কাছে।অপূর্ব অবাক হয়ে সুপ্তির কথা গুলো শোনলো।তারপর বললো,,,,
-তোমার পরিবারের সবাইকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার।তুমি আমার উপর ভরসা রাখো।
-তুমি আমার ভাইয়াকে চিনো না অপূর্ব।ভাইয়া একবার যা সিদ্ধান্ত নেয় তাই করে।অযথা আমার জন্য তোমার জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে।তারচেয়ে ভালো হয় তুমি আমাকে ভুলে যাও।সুপ্তির কথা শোনে অপূর্ব সুপ্তির দিকে একটু এগিয়ে এসে বলে,,,,
-তুমি পারবে আমাকে ভুলে থাকতে?তোমার কষ্ট হবে না?ভুলে যেতে পারবে আমাদের এক সাথে কাটানো স্মৃতি গুলো?অপূর্বের প্রত্যেকটা কথা যেন সুচের মতো সুপ্তির বুকে গিয়ে লাগছিল।সুপ্তির কলিজাটা ক্ষতবিক্ষত বয়ে গেলো মুহূর্তেই।সুপ্তি জানে,এই জীবনে অপূর্বকে ভুলে যাওয়া সম্ভব না।মৃত্যুই একমাত্র দুটি হৃদয় আলাদা করতে পারবে।কিছুতেই কান্নাটা আটকাতে পারছে না সুপ্তি।কিন্তু এই মুহূর্তে কান্না করা যাবে না।কান্না করলেই দুর্বলতা কাজ করবে।সুপ্তি ঢোঁক গিলে অপূর্বের দিকে তাকিয়ে দেখে অপূর্বের চুল এলোমেলো হয়ে আছে।শার্টটাও ঠিক নেই।সুপ্তি একটু এগিয়ে গিয়ে অপূর্বের শার্টের কলার ঠিক করলো।অপূর্বের মাথায় আঙ্গুল চালিয়ে চুল গুলো চিরুনি করে দিলে।তারপর বললো,,,,
-এমন এলোমেলো দেখতে তোমাকে ভালো লাগে না।সব সময় ফর্মাল থাকবা।ফর্মাল থাকলে তোমাকে খুবই ভদ্র আর ইনোসেন্ট লাগে।মা বাবার কথা মতো চলবে।ভালো দেখে একটা মেয়েকে বিয়ে করবে।দেখো,তোমার জীবনটা ফুলের মতো সাজানো গুছানো আর সুন্দর হবে।কথা গুলো বলতে সুপ্তির এতো কষ্ট লাগছিল যে বলার মতো না।তবুও সুপ্তি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলো।নিজের স্বার্থের জন্য কিছুতেই অপূর্বকে বিপদে ফেলতে পারবে না।সে যে অপূর্বকে খুব ভালোবাসে।নিজের থেকেও বেশি।অপূর্ব যদি সুস্থ থাকে,বেঁচে থাকে তাহলে একনজর দেখতে তো পারবে।এতেও ভালোবাসা কম কোথায়।ভালোবাসার মানুষটাকে ভালোভাবে একপলক দেখাতেও এক রকম তৃপ্তি পাওয়া যায়।অপূর্ব সুপ্তির কথায় আর কাণ্ডে অবাকের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে।অপূর্ব ভাবতেই পারছে না সুপ্তি এতোটা শান্ত হয়ে কথা গুলো কি করে বলছে?সে কি জানে না,তাকে ছাড়া অপূর্বকে কল্পনা করা সম্ভব হবে না?সে কি ভুলে গেছে?তার ভালোবাসা ছাড়া বেঁচে থেকেও সে এক রকম মরা।অপূর্ব সুপ্তিকে জড়িয়ে ধরে বলে,,,,,
-আমাকে ছেড়ে থাকতে তোমার কষ্ট হবে না?থাকতে পারবে আমাকে ছাড়া?অপূর্বের কাঁধে মাথা রেখে সুপ্তি যেন কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা নোনা জল বের হয়ে আসলো।সেই জলটা অপূর্বের কাঁধে পড়তে দিলো না সুপ্তি।তার আগেই মুছে ফেললো।সুপ্তি নিজেকে অপূর্বের বুকে বিলিন করে দিলো।এই জায়গায় পৃথিবীর সেরা সুখ বিরাজ করছে।আজকের পর আর এই বুকের সুখ সন্ধান করা হবে না।এখানে আর মাথা রাখা হবে না।আজকেই হয়তো শেষ।কিছুক্ষণ পর সুপ্তি অপূর্বের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বলে,,,,
-কেন থাকতে পারবো না?আগে কেমনে থাকতাম?এখন সেভাবেই থাকবো।যে সময়টা এক সাথে কাটিয়েছি দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাবো।তুমিও ভুলে যাবে।আমাকে ক্ষমা করো।বলে যেই সুপ্তি নিজের রুমের দিকে পা বাড়াবে এমনি অপূর্ব সুপ্তির সামনে হাঁটু ভেঙ্গে বসে সুপ্তির পা দুটি জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়।অপূর্ব বলে,,,,,,
-বিশ্বাস করো,তুমিহীনা এই জীবন বৃথা তোমাকে ছাড়া আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে।আমি বাঁচবো না সুপ্তি।আমি মরে যাবো।আমাকে এতোটা আঘাত করো না।আমাকে একটু সময় দাও।আমি সব ঠিক করে দিবো।তোমার ভাইকে আমি রাজি করাবো।আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।সুপ্তি জানে,,,এখানে থাকলে কিছুতেই নিজেকে অপূর্বের থেকে দূরে সরাতে পারবে না।অপূর্বের কান্না তার সহ্য হয় না।অপূর্বের সুখের জন্যই তো এতো ত্যাগ।এখন যদি একটু কষ্ট পেয়ে সারা জীবন অপূর্ব সুখে থাকে তাহলে এতে সুপ্তির জীবন ধন্য।সুপ্তি অপূর্বের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

চলবে———-

#মায়াবিনী

সুরমা
পর্ব : ২০

রুমে ঢুকে সুপ্তি দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে কান্না করতে থাকে।সুপ্তি জানে না,কি করে সে এতো কঠিন কথা গুলো অপূর্বকে বলেছে।অপূর্ব আজ অনেক কষ্ট পেয়েছে তার কথায়।কষ্ট না পেলেতো অপূর্ব এরকম বাচ্চাদের মতো করে কাঁদতো না।অপূর্বকে কষ্ট দিয়ে সুপ্তি কিছুতেই স্থির হতে পারছে না।সুপ্তি কান্না করতে করতে ফ্লোরে বসে পড়ে।যতটা না কষ্ট অপূর্বকে দিয়েছে তার থেকে বেশি কষ্ট এখন নিজে পাচ্ছে।সে নিজেও তো অপূর্বকে ছাড়া থাকতে পারবে না।সুপ্তি দৌঁড়ে ওয়াশরুমে ডুকে চিল্লিয়ে কান্না করতে থাকে।অপূর্ব অনেকবার দরজা ধাক্কায়।কিন্তু সুপ্তি দরজা খুলে নি।অপূর্বও আজ অনেক কান্না করেছে।সুপ্তির ব্যালকনিতে অপূর্ব অনেক্ষণ অপেক্ষা করে।কিন্তু কোনো লাভ হয় নি।ব্যর্থ হয়ে অপূর্ব নিচে নেমে আসে।অপূর্ব কিছুতেই সুপ্তির এমন আচরণ মেনে নিতে পারছে না।অপূর্ব অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে যায়।এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে দেখে একটা দোকান খোলা।এতো রাতেও দোকানে অনেক লোক।অনেক লোক দোকান থেকে বের হচ্ছে।তাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা নেশাগ্রস্থ।অপূর্ব ভেতরে ঢুকে দেখে এখনো অনেক লোকজন নেশা করছে।লোকে বলে নেশা করলে নাকি কষ্ট ভুলে থাকা যায়।আজ সুপ্তির কাছে যা আঘাত পেলো তা মেনে নেওয়ার মতো না।আজ সেও না হয় একটু নেশা করলো।যদি আজকের রাতের কষ্টটা ভুলে থাকা যায়।অপূর্বও একটা মদের বোতল কিনে খেতে শুরু করে।এর আগে কোনোদিন অপূর্ব নেশা জাতীয় জিনিস টাস করে নি।আজকেই প্রথম।তাই অল্প খেতেই অপূর্বের নেশা হয়ে যায়।অপূর্বের এতোটা নেশা হয় যে,সে কিছুই বলতে পারছে না।সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে।যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে নিজের রুমে বিছানায় শোয়ে আছে।অপূর্ব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১.২২ বাজে।অপূর্ব ফিল করে তার মাথা প্রচণ্ড পরিমাণ ভারী হয়ে আছে।মাথা উপরে তুলেতেই পারছে না।শরীরও কেমন কেমন লাগছে।অপূর্ব মাথা তুলে উঠতে যাবে তখন তার মা বাটি হাতে রুমে ডুকে।অপূর্বের মা এসে অপূর্বকে উঠতে সাহায্য করে।অপূর্বের মা বলে,,,,,
-আমি ভাবতেই পারি নি কোনোদিন আমার ছেলে নেশা করে রাস্তায় পড়ে থাকবে।আর পাড়ার লোকজন ধরাধরি করে এসে বাসায় দিয়ে যাবে।এই দিনটাই আমার দেখার বাকি ছিল।মায়ের কথা শোনে অপূর্বের মনে পড়ে।সে কাল রাতে দোকানটায় মদ খেয়েছিল।কিন্তু তারপর কি হলো কিছুই মনে নেই।হঠাৎ করে অপূর্বের সুপ্তির কথা মনে হতেই আবার এক রাশ কষ্ট বুকে এসে ভিড় করে।অপূর্ব জানে,,তার বাবা চাইলেই সে সুপ্তিকে আপন করে পেতে পারে।সুপ্তির পরিবারের লোকজনদের সাথে কথা বলা উচিত।তার আগে তার বাবার সাথে কথা বলতে হবে।অপূর্ব বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমে ডুকে।ফ্রেশ হয়ে এসে নিজের রুম থেকে বের হতে নিলে তার মা বলে,,,,,
-কোথায় যাচ্ছিস?আমি তোর জন্য সুপ নিয়ে বসে আছি।খেয়ে যা।
-আম্মু আমার এখন একটুকুও খেতে ইচ্ছে করছে না।আমি আব্বু সাথে কথা বলতে চাই।কথাটা শেষ হতেই অপূর্ব নিজের রুম থেকে বের হয়ে যায়।সাথে সাথে তার মাও যায়।অপূর্ব ডয়িং রুমে এসে দেখে তার বাবা খবরের কাগজ পড়ছে।অপূর্ব তার বাবার সামনে এসে হাঁটু বাজ করে বসে দুই হাত জোর করে তার বাবাকে বলে,,,,,
-আব্বু প্লীজ,তুমি সুপ্তির বাবার সাথে কথা বলো।আমি জানি,তুমি সুপ্তির বাবার কাছে আমাদের কথা বললে সুপ্তির বাবা তোমাকে ফিরিয়ে দেবে না।আমি সুপ্তিকে খুব ভালোবাসি।আমি জীবনে তোমার কাছে আর কিছু চাইবো না।তুমি শুধু সুপ্তিকে আমার কাছে এনে দাও।আর কিছু চাই না আমার।প্লীজ বাবা,আমার এই রিকুয়েস্টটা তুমি রাখো।অপূর্বের বাবা গম্ভীর হয়ে অপূর্বের কথা গুলো শুনলেন।তারপর তিনি বললেন,,,,,
-যে মেয়ের ভাই বাড়িতে এসে এতো গুলো লোকের সামনে আমাকে যা ইচ্ছা তাই বলে অপমান করলো আমি তাদের কাছে গিয়ে বলবো আপনার মেয়েকে আমি আমার ছেলের জন্য নিতে চাই?কোনোদিনও না।আমি কোনোদিনও এটা করতে পারবো না।
-আব্বু,,,আমার থেকে তোমার ইগো বড়?অপূর্বের কথা শোনে অপূর্বের বাবা কথা বলেন নি।অপূর্ব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,,,,
-ঠিক আছে।আমার জন্য তোমাকে কিছুই করতে হবে না।আমার টা আমি নিজেই বুঝে নিবো।অপূর্ব নিজের বাসা থেকে বের হয়ে আসে।নিজেই সুপ্তির বাবার সাথে কথা বলবে।তাদের কাছে হাত জোর করে সুপ্তিকে চাইবে।যদি তারা রাজি না হয় তখন অন্য কথা চিন্তা করবে।যেকোনো কিছুর বিনিময়ে সুপ্তিকে চায় অপূর্ব।অপূর্ব বুকে সাহস নিয়ে সুপ্তিদের ফ্ল্যাটে চলে আসে।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজাতে থাকে।একের পর এক কলিং বেল বাজিয়েই যাচ্ছে।কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না। অপূর্বের হঠাৎ কেন জানি অস্থির লাগছে।কিন্তু কেন??
-তুই এখানে?কারো কথা শোনে অপূর্ব পেছনে ফিরে দেখে নিলয় দাঁড়িয়ে আছে।অপূর্ব নিলয়ের কাছে গিয়ে বলে,,,,
-দোস,আমি অনেক বিপদে পড়েছি।তুই আমাকে একটু হেল্প করবি?
-বল তোর কি হেল্প লাগবে?আর এই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?এই ফ্ল্যাটে তো এখন কেউ নেই। আজকে সকালেই ওরা এই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছে।কথাটা শোনে যেন অপূর্বের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।অপূর্ব বলে,,,
-চলে গেছে মানে?কোথায় গেছে??
-কোথায় গেছে তা তো জানি না।কিন্তু সকালে দেখলাম সব জিনিস নামাচ্ছে।তখন জিজ্ঞাসা করলাম।পরে বললো ওরা আর এই ফ্ল্যাটে থাকবে না।নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে।ওখানেই চলে গেছে ওরা। অপূর্বের পা যেন ফ্লোরে আটকে গেছে।পা দুটি নড়তে চাইছে না।দূর্বল হয়ে গেছে সারা শরীর।চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে।অপূর্ব কিছুতেই বুঝতে পারছে না একদিনে ওরা কোথায় চলে যেতে পারে।অপূর্ব ধুম করে ফ্লোরে বসে পড়ে।নিলয় বলে,,,,
-এখানে এভাবে বসলি কেন??উঠ বলছি।আর এভাবে ভেঙ্গে পড়ছিস কেন?চল,নিলয় অপূর্বকে টেনে তুলে বাইরে নিয়ে যায়।অপূর্ব একদম ভেঙ্গে পড়ে।অপূর্ব কল্পনাও করে নি হুট করে ওরা এভাবে অন্য কোথাও চলে যাবে।সুপ্তির সাথে যোগাযোগ করার মতো কোনো লিংক খুঁজে পাচ্ছে না অপূর্ব।বাকিটা বিকাল অপূর্ব সুপ্তির খোঁজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করে।কিন্তু কোনো লাভ হয় নি।সুপ্তির বান্ধবীরাও কেউ সুপ্তির খবর জানে না।

এখন রাত ১০টা।অপূর্ব বাসার বাহিরে বসে আছে।একটা স্টল থেকে ১প্যাকেট সিগারেট কিনে একটার পর একটা খেতে থাকে।অপূর্বকে যেন চিনাই যাচ্ছে না।কয়েক ঘন্টা ব্যবধানে অপূর্বের পৃথিবী পাল্টে গেছে।সে কখনও ভাবে,,, তার ভালোবাসা একদিন এতো ভয়ংকর রূপ নেবে।অপূর্ব আজকে আবার মদ খায়।সাথে কয়েকটা মদের বোতল আর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফিরে।অপূর্ব খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে।সুপ্তির সাথে দেখা করার মতো সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে।সুপ্তি নিজের থেকে না চাইলে আর কখনও দুজনার কথা হবে না।এই কষ্টটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।এতো কষ্ট বুকে নিয়ে অপূর্ব কেমনে থাকবে?তারচেয়ে ভালো,এই বোতলের পানিতে কষ্ট গুলো ভাসিয়ে দেওয়া।অপূর্বের মা অপূর্বের জন্য ডয়িং রুমে বসে ছিল।অপূর্ব রুমে ডুকে কারো সাথে কথা বলে নি।একদম নিজের রুমে চলে যায়।ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।অপূর্বের মা বাইরে থেকে অনেকবার দরজা ধাক্কালেও অপূর্ব কোনো সারা দেয় নি।

চলবে——–