রাগি বউ ৩য় + ৪র্থ + ৫ম পর্ব

0
586

#রাগি_বউ
শামিয়া খানম জিনিয়া
৩য় ৪র্থ_৫ম পর্ব
#রাগি_বউ
সামিয়া খানম জিনিয়া
৩য় পর্ব

তারপর থেকে শুরু হয়ে যায় আমার দ্বীনের পথে চলার নতুন গল্প। কিন্তু একবারেই যে সবকিছু হয়না, তা আর বুঝতে বাকি রইলনা আমার……….
ওই যে বলেছিলাম নেক সুরতে শয়তানের ধোকা, বিষয়টা তেমন ই হলো………
কলেজে গিয়ে প্রতিটা দিন মাহাদি কে মন ভরে দেখতাম………
বারবার ওর সততা দেখে মুগ্ধ হতাম। হয়ত জিনার সংগা টাই ভুলে গিয়েছিলাম। কাউকে নিয়ে ভাবা ও যে অন্তরের জিনা, এই কথাটা শয়তান আমায় ভুলিয়ে দিয়েছিল। শয়তান তো আমায় বোঝাতো আরে ছেলেটা অনেক ধার্মিক, ওকে নিয়ে ভাবলে কিচ্ছুই হবেনা……..
একদিন কলেজে গিয়ে শুনি মাহাদি সবার কাছ থেকে কিছু করে টাকা নিচ্ছে, আর টাকা নেওয়ার কারন এই যে সে পথশিশুদের সাহায্য করবে। কলেজের সবাইকে ডেকে সে বলল,
“আমরা কত টাকা তো কত প্রয়োজনেই না খরচ করে ফেলি। কিন্তু ওই পথশিশুদের কথা কি কোনদিন ও চিন্তা করি? তারা কি ভাবে চলছে? কি অবস্থায় দীন কাটাচ্ছে?তাই ভাবলাম সবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে যদি ওদের কিছু সাহায্য করা যায়……….
মাহাদির এই স্বভাব গুলো নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমি ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম। আল্লাহর কাছে আমি জীবনসঙ্গী হিসেবে ওকেই চাইতাম……….
আর বাবা আমার পরিবর্তন দেখে অনেক খুশি হয়েছিল, বাবা সবসময় চাইত আমি যেন আল্লাহর পথে চলি, নামাজ পড়ি, পর্দা করি,,,,,আর ঠিক দিন দিন আমার মধ্যে তেমন পরিবর্তন আসছিল…….
কলেজে গিয়ে মাহাদির সাথে কথা বলার সু্যোগ খুঁজতাম, কিন্তু সেই সুযোগ যে হতোইনা, ও সবসময় মেয়েদের থেকে ১০০ হাত দূরে থাকতো……
ওর এরূপ আচরন দেখে ভাবতাম হুযুররা বোধ হয় অহংকারীই হয়……
মিম ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তাই মিমকে আমি সব কথা খুলে বলি। মিম আমাকে বললো,
“আরে কলেজ থেকে পিকনিকে নিয়ে যাবে তো। তুই সরাসরি ওকে প্রপোজ করিস। আর তুই ও তো এখন হুযুর, ও অবশ্যই তোকে মেনে নিবে দেখিস…….
পিকনিকে যাওয়ার দিন তারিখ ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু বাবা তো কিছুতেই রাজি হয়নি। মিম অনেক রিকোয়েস্ট করার পর বাবা রাজি হয়……
পিকনিকে রওনা দেওয়ার জন্য আমরা যে বাসে উঠেছিলাম, সেখানে শুধু ম্যাডাম আর মেয়েরাই ছিল। কোন গানের ব্যবস্থা তো ছিলইনা। শুনেছিলাম এসব মাহাদির ই কান্ড। সেই ই নাকি বলেছে গান শুনা হারাম। এসব হবেনা………
অবশ্য মাহাদি তো এসব পছন্দ ই করেনা। কিন্তু প্রিন্সিপ্যাল স্যারের পিড়াপীড়িতে সে আর না করতে পারিনি। পিকনিক টা সত্যিই একেবারে অন্যপ্রকার এর হয়েছিল। এমন পিকনিক তো আমি কখনওই করিনি…….
পিকনিক এ মাহাদি আমার থেকে এতটাই দূরে ছিল আর সাহস হয়ে উঠেনি……..
নাহ! ভেবেছিলাম পিকনিকে গিয়ে নিজের মনের কথা প্রকাশ করে দিব,,,,,,,,,
কিন্তু তা আর হলো কই……..
বাসায় এসে আকাশের চাদের দিকে তাকিয়ে নিজের মনের কথা গুলা বলতে থাকি। জানি সে শুনবেনা তবু ও একা একা বকতেই থাকি………
না পেরে আবার ও মাহাদিকে মেসেজ দিলাম, ওকে বললাম
“মাহাদি আমি তোমাকে ভালোবাসি”।
“এটা আপনি কি বলছেন? আপনি কি জানেন না প্রেম ভালোবাসা হারাম বিয়ের আগে। “আল্লাহ বলেন, তোমরা জিনার ধারের কাছে ও যেওনা। কেননা তা অত্যান্ত নির্লজ্জ এবং খারাপ কাজ। (সূরা বনী ইসরাইল আয়াত_৩”)।
” তাহলে আমায় বিয়ে করবে?”
” না সেটা ও সম্ভব না। আমি তো এখন বেকার। কোন আয় নেই, নিজে তো বাবার পয়সায় চলি । এখন তো সম্ভব ই না……….
” কিন্তু আমি যে তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতেই পারিনা”।
” না এটা আপনি ঠিক করছেন না। এটা তো অন্তরের জিনা। রাসূল সাঃ তো বলেছেন, জিনার কল্পনা করা অন্তরের জিনা।”
তাছাড়া কাউকে খুব বেশি ভাল ভাবা ঠিক না। আল্লাহর কাছে বলুন ‘ হে আল্লাহ! তুমি আমার জন্য যা কল্যাণ মনে করো তাই করো।’ কখনওই কোন নির্দিষ্ট কিছু চাইবেন না। মনে রাখবেন কল্যাণ অকল্যাণ সম্পর্কে পুর্নাংগ ধারনা কেবল আল্লাহর ই আছে।”
” তাছাড়া আমরা কথা তো বলতেই পারি? আমি তো এখব পর্দা করি নামাজ পড়ি, তাহলে আমার সাথে কথা বলতে সমস্যা কোথায়???”
” না আপনি ভুল ভাবছেন। বিয়ের মাধ্যমেই সব সম্পর্ক হালাল হয়। হ্যা আপনি হয়ত পর্দা করেন, নামাজ পড়েন,,,,,,,তার অর্থ তো এই না যে, আপনার সাথে আমার কথা বলতে হবে! ইসলাম তো সব গায়্রে মাহরাম কেই এড়িয়ে চলতে বলেছে।”
মাহাদির কথাগুলা শেষ করেই ও আমাকে ওর কাছে মেসেজ দিতে মানা করে দেয়………
” কিন্তু আমি আল্লাহর পথের কথা ভুলে গিয়ে ওকে প্রতিনিয়ত মেসেজ দিতাম। কিন্তু ও কখনওই রিপ্লে দিতনা……..
রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যায়। কিন্তু ঘুম ই আসেনা। হটাৎ ই ফোনের দিকে তাকিয়ে যা দেখতে পাই তাতে আর মেজাজ ঠিক ই রাখতে পারিনি…….
রাগে রাগে ফোন টা আছাড় দিই ফ্লোরে…….
মা বাবা ছুটে আসে আমার চিৎকার এ। এসে দেখে ফোন ফ্লোরে…….
” এই তামান্না কি হলো ফোন ফ্লোরে কেন? ”
” না মা আসলে পড়ে গেছে হাত থেকে।”
” ভূগোল বোঝাচ্ছিস নাকি আমায়? এই তামান্নার আব্বু মেয়ের কাছে ফোন কেন দিয়েছো…..?????
এই ফোন সর্বনাশ করে ছাড়বে”
রাগে রাগে ফোন দিয়ে দিই বাবার কাছে……..
আসলে মাহাদি আমাকে ব্লক দিয়েছিল…..
আমি ভাবতেই পারিনি ও আমাকে ব্লক দিবে…….
সেখান থেকে হুযুর ছেলেদের আমি পছন্দ করতাম না। ভাবতাম ওরা বোধ হয় অনেক অহংকারী হয়……..
ইন্টার লেভেল শেষ হয়ে যায়। ভার্সিটি তে ভর্তি হওয়ার আর সুযোগ মিললনা……..
অনেক টাকা কিন্তু ছিল বাবার, কিন্তু তবু ও আমায় কোচিং করাইনি……
না পেরে ভর্তি হতে হয় গ্রামের ই কলেজে…..
আর তার মধ্যেই বাবা আমার জন্য পাত্র ও ঠিক করেছে…….
বাবার প্রতি অনেক অভিমান এ আর জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠিনি পাত্র সম্পর্কে……আসলে সে কি করে,,,,,বাসা কোথায়?????
কিছুই শুনিনি মায়ের কাছে ও……..
সব থেকে অপছন্দের পাত্রই আমাকে দেখতে আসে…….
ইচ্ছা করছিল ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিই…..
চলবে………
ইনশাআল্লাহ……
রাগি বউ
৪র্থ পর্ব
ছেলের দিকে একবার তাকিয়েই আমি আশ্চর্য হয়ে যায়। এ যেই সেই মাহাদি। জানিনা বাবা একে আবার কোথ থেকে পেলো……….
ইচ্ছে করছিল গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিই। আবার আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল……..
ওরা চলে গেলে মাফুজ আমায় এসে বলে,
“আপু জানো মাহাদি ভাইয়া আর মাহাদি ভাইয়ার আম্মু তোমাকে খুব পছন্দ করেছে।”
অনেক রাগ হচ্ছিল সেই মুহুর্তে মাফুজের কথা শুনে। আমি বাবাকে গিয়ে বললাম, বাবা এই বিয়ে আমি করতে পারবনা।
বাবা তখন আমায় ঠাস করে একটা চড় দিয়ে বলল,
“ছেলেটা ধার্মিক ভদ্র। ওকে বিয়ে করতে তোর সমস্যা কি? নাকি কাউকে পছন্দ আছে, পছন্দ থাকলে বল আমার সাথে, আর তা না হলে তোর যা খুশি মন চাই তুই তাই কর।”
সত্যি বলতে কাউকে তো আর পছন্দ নেই আমার। খুব রাগ হচ্ছিল মাহাদির ওপরে……..
বাবা কোনদিন আমার গায়ে হাত তুলেনি, আজ ওই ছেলেটার জন্য আমায় মার খেতে হয়েছে…….
হঠাৎ ই মাফুজের চিৎকারে বাবার ঘরের দিকে ছুটে গেলাম……
গিয়ে দেখি বাবা স্ট্রোক করেছে। বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। বাবার অবস্থা খুব সিরিয়াস। কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল।……….
আল্লাহ কে বলছিলাম, হে আল্লাহ আমার বাবা কে তুমি সুস্থ করে দাও। আমি আর বাবার কথার অবাধ্য হবোনা। বাবা যা বলবে তাই শুনবো আমি।………
আল্লাহর রহমতে বাবা সুস্থ হয়ে গেল। পুরাপুরি সুস্থ আর হলো কই?
বাবা প্যারালাইজড হয়ে যায়,কোন কথা বলার শক্তি পর্যন্ত থাকেনা বাবার।
বাবা হাসপাতাল থেকে ফিরে আসলে বাবার পায়ে ধরে ক্ষমা চায় আরর বাবাকে বলি,
“বাবা আমি তোমার পছন্দ করা ছেলের সাথেই বিয়ে করবো। বাবার চোখ দিয়ে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে কান্না আনন্দের ছিল……..
সবকিছুর জন্য নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। যদি আজ বাবা হাটতে চলতে পারতো, তাহলে কতই না আনন্দ করতো…….
অবশেষে মাহাদির সাথে আমার বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে যায়। হুযুর রা অহংকারী হয় এই চিন্তা যে আমার ভুল ছিল তা বিয়ের দিন রাত্রেই ও প্রমান করে দেয়।
মাহাদি আমাকে যে গিফট দিয়েছিল তা ছিল পৃথীবির মধ্যে সব থেকে মহামুল্যবান গিফট। যা কিনা টাকা দিয়ে হিসাব করা যাবেনা।
আমার হাতে একটা কুরআন শরীফ তুলে দিয়ে ও আমাকে বলে,
” রাগি বউ। এই ছাড়া যে আর আমার সামর্থ্য নেই। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে এই গিফট টা তোমার জন্য কিনেছি।”
কুরআন শরীফ দেখে ওর প্রতি সব রাগ আমার মুছে গিয়েছিল।
ওর দেওয়া নাম খুব ভাল লেগেছিল ‘রাগি বউ’। আমার রাগ সম্পর্কে ওর ভালোই ধারনা ছিল। এজন্য বোধ হয় এমন একটা নাম দিয়েছিল আমার।
এলোমেলো স্বপ্ন গুলা মনের মধ্যে উকি দিয়ে যাচ্ছিল। কি ভেবেছিলাম আর কি হয়ে গেল। ভেবেছিলাম বেনারসি শাড়ি পরে কনের আসরে বসে থাকবো, এমন এক ধনী বাড়ির বউ হবো, যারা কিনা আমাকে দিবে গা ভর্তি গহনা। কিন্তু তা আর হল কই এমন গরীব জায়াগায় চলে এসেছি ভাগ্যের জোরে……..
তবে হ্যা বেনারসি পরানো হয়েছিল ঠিক ই কিন্তু তার ওপরে কালো বোরকা ও পাঠিয়ে দিয়েছিল। নিজের চাচাতো, মামাতো ভাইদের পর্যন্ত মুখ দেখাতে দেয়নি এই ছেলেটা। বলেছিল মেয়েরা ঝিনুকের মধ্যে থাকা মুক্তা। আর সেটা তো সব সময় সুরক্ষিত রাখতে হবে। কেনই বা একদিনের জন্য সেই রূপ প্রকাশ করতে হবে। আমার বাবাকে এই সব কথা গুলাই ও বলে দিয়েছিল আগে থেকে, তাই বাবা বিয়ের দিন ঠিক ওর কথা মতোই আমার পর্দার ব্যবস্থা করেছিল।
কথাগুলা ভাবতে ভাবতে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা টের ও পাইনি।
হঠাৎ ই ঘুম ভাঙল পানির ছিটায়। ভোরে উঠে দেখি আমার চোখে মুখে পানি ছিটানো। বুঝলাম এটা ওর ই কান্ড। ”
কি ব্যাপার আপনি আমার চোখে পানি কেন দিলেন?”
” তো কি করবো? ঘুম থেকে উঠছোনা কেন? কখন ধরে তোমায় ডাকছি। দেখো মসজিদ এ কি সুন্দর আজান হচ্ছে? পৃথীবির সব সুর থেকে এটাই যেন সুখময় সুর। মোয়াজ্জিন আজানে কি বলছে শুনছ না? ‘ঘুম থেকে নামাজ উত্তম’।
আর এত কিছু শোনার পর কি ঘুমিয়ে থাকা যায় নাকি????”
মাহাদির কথা শুনে আর ঘুমিয়ে থাকতে পারিনি।
এক অজানা সুখের সন্ধ্যানে ওযু করে এসে প্রভুর দরবারে দাঁড়ায়। জায়নামাজে বসে
অনেক্ষন কেঁদেছিলাম। কিন্তু কেন কেঁদেছিলাম সেটা জানিনা।
যাই হোক সকাল সকাল আমার পিচ্চি ননদ টা ঘরে প্রবেশ করলো আমাদের খেতে যাওয়ার কথা বলতে।
আমরা দুজন রান্নাঘরে গেলাম খেতে। খাওয়ার ঘরে গিয়ে ঘরটা নতুন ভাবে আবিষ্কার করলাম। একটা টেবিল নাই সেখানে।
ও আমাকে ফিসফিসিয়ে বলে রাগি বউ দস্তরখানায় খাওয়া যে সুন্নাত। জেনে শুনে একটা সুন্নাত মিস করার কি কোন মানে হয়।
আমার শাশুড়ি,ননদ আর শশুর খেয়ে উঠে গেলে আমরা খেতে বসলাম।
খাওয়ার সময় দেখি কচুশাক আর মসুর ডাল। যা আমি কোনোদিন ও খাইনি। খাবারের অবস্থা দেখে আমি ঘরে চলে যায়। মাহাদি আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে খাবার ঘরে নিয়ে আসে আর বলে তুমি কি জানোনা আমার আল্লাহ সবাইকে পরিক্ষা করেন। তিনি বলেন,
“এবং আমি তোমাদিগকে পরিক্ষা করবো কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল–ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। (সূরা বাকারাহ ২ঃ১৫৫)।”
তুমি বিশ্বাস করো যদি মাংস কেনার মত সামর্থ্য আমার থাকতো তাহলে আমি কিনতাম। কিন্তু সেই সামর্থ্য যে আমার নাই। ইদানীং ব্যবসা যে খুব একটা ভাল যাচ্ছেনা। আমি টাকা ধার করলে করতে পারতাম। কিন্তু আমার যা আছে আমি তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চাই। আলহামদুলিল্লাহ।
আচ্ছা তোমার কাছে কোনটা দামী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সুখ সাচ্ছন্দ্য! নাকি জান্নাতের ওই বিশাল সুখ সাচ্ছন্দ্য! যেখানে কিনা কারোর কোন আশা অপুর্ন থাকবেনা। যদি এই ক্ষণস্থায়ী পৃথীবির ধণ সম্পদ তোমার কাছে দামী হয়, তাহলে যে জান্নাত পাওয়ার আশা বৃথা। আর আমি কখনওই ওসব বড় বড় চাকরির আশা করবোনা ইনশাআল্লাহ। যাতে কিনা হারাম মেশানো আছে। আমি চাইনা এই অল্প কয়দিনের দুনিয়ার প্রেমে পড়তে। আমি চাইনা এই পৃথীবির লোভ লালসা আমার মনে বাসা বাঁধুক। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের ব্যস্ততা আমাকে আমার প্রভুর স্বরণ থেকে গাফেল রাখুক, এটা আমি কখনওই চাইনা।
চেয়ে দেখো ওই পথশিশুদের দিকে।যারা ঠিক মত খেতে পারেনা। সামান্য নুন ভাত ই যাদের জোটেনা। রাস্তার ধারের কোন এক পাশে তারা শান্তির স্থান খুজে পাই। আমি দেখেছি তাদের একদল যারা আনন্দ করে মসজিদে যায় সালাত আদায় করতে।
তাদের থেকে কি তুমি ভাল নেই। তাহলে শুকরিয়া আদায় করো। মনে রেখ আমাদের নবী অনেক গরীব ছিলেন। তবুও তিনি তাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন। তাহাজ্জুদ পড়তে যেয়ে যার পা ফুলে যেত। দিনের পর দিন যার চুলায় আগুন জ্বলতনা। আরামের কোন বিছানা তার ছিলনা……..!!!!!
মাহাদি কথাগুলা একবাক্যে বলেই চলেছিল। ওর কোথা গূলো শুনে আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম কত ভালো ও। নানান প্রশ্ন নিজের মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ ই ওর একটা থাপ্পড়ে আমার হুশ ফিরল। অবাক হলাম। ও তো এমন করার ছেলে না। খুব সুন্দর করেই তো কথা বলছিল এতক্ষণ এ। তাহলে থাপ্পড় কেন দিল আমায়……………?????

# রাগি_বউ
৫ম_পর্ব
“এই আপনি আমাকে থাপ্পড় কেন দিলেন…….???
আর একি আপনার হাতে রক্ত কেন………???”
” কি আর করবো। মশা বসেছিল তোমার কপালে। তাই তো থাপ্পড় টা দিতে হলো…….!!!”
“ওও। এতক্ষণ এ ঘোর কাটল আমার।”
ও আমাকে গালে উঠিয়ে ভাত খাইয়ে দেয়। রান্না যাই হোক না কেন আমার শাশুড়ি মায়ের রান্না মাশ আল্লাহ খুব ভাল লেগেছিল। এভাবেই ও আমাকে প্রতিটা মুহুর্ত সাহায্য করতো। ওকে যতই দেখতাম ততই মুগ্ধ হয়ে যেতাম আমি।
ও আমাকে এত ভালবাসা দিত। তবু ও আমি আমার ভালবাসা কখনওই ওর সামনে প্রকাশ করতাম না। ওই যে আমায় ব্লক করেছিল সেই অভিমানেই ওর সাথে আমি কখনো ওর সাথে ভাল ব্যবহার করতাম না। ইসলাম তো স্বামীর সাথে ভাল ব্যবহার করতে বলেছে। কিন্তু নিজেকে কালো কাপড়ে আবদ্ধ করলে ও ইসলাম সম্পর্কে পুরা ধারনাই আমার ছিলনা। মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা হত কেন সেদিন আমায় ব্লক করেছিল ও। কিসের একটা জড়তা এসে আমায় বার বার থামিয়ে দিত।
হটাৎ ই ভাবনার জগৎ কে ছুটি দিতে হয়েছিল বাইরের থেকে একটা কান্নার আওয়াজ পেয়ে। আওয়াজ শুনে দুজন-ই বাইরে ছুটে যায়। গিয়ে দেখি ___
একটা জীর্ণ শীর্ণ চেহারার ছেলে সেখানে বসে কাঁদছে। মাহাদি ছেলেটার কাছে গিয়ে বলে,
” কি হলো বাবা তুমি কাঁদছ কেন………???”
” কাকু, কাকু আমার বাবা রিকশাচালক। কিন্তু রিকশা চালাতে গিয়ে বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যায়।বাবা এখন হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তার বলেছে টাকা না হলে চিকিৎসা হবেনা।
সেই মুহুর্তে মাহাদির হাতের দামি ঘড়িটা খুলে মাহাদি ছেলেটাকে দিয়ে বলল,
” এই নাও বাবা! এটা বিক্রি করে তোমার বাবার চিকিৎসা করায়ো।”
ছেলেটা একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে ওখান থেকে চলে যায়…………
আমি তখন ওকে বলি,
” আপনার নিজের ই তো অবস্থা ভাল না। অন্যকে সাহায্য করার কিই বা এত প্রয়োজন ছিল????
তাছাড়া ওটা তো আপনার বেস্ট ফ্রেন্ড আপনাকে দিয়েছিল। যার দাম ছিল ৮০,০০০ টাকা। এত দামি ঘড়ি আপনি ওকে দিয়ে দিলেন!!!”
” হ্যা। ওটা আমার কাছে অনেক দামি ছিল। কিন্তু একটা অসহায় ছেলের মুখের হাসির থেকে তো ওটা দামি ছিলনা। ঘড়িটা যদি আমি এমন অবস্থায় হাতে রাখতাম তাহলে ওই মহান বিচারকের সামনে কি জবাব দিতাম!!!!
এই ধণ সম্পদ তো একদিন ফুরিয়েই যাবে!!!
আমার মহান রব তো বলেইছেন,
“যারা রাতে ও দিনে গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের ধন সম্পদ ব্যয় করে তাদের রবের নিকটে তাদের পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবেনা। (সূরা আল- বাক্বারাহঃ২৭৪)।
মাহাদির কথা শুনে মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানিয়েছিলাম এমন একজন জীবন সঙ্গীনি পেয়ে।
এদিকে বিয়ের তিন দিন পেরিয়ে গেল। আমরা দুইজন বাবার বাড়ি যাবো বলে রেডি হলাম।
মাহাদির দেওয়া একটা শাড়ি পরেই তার উপর বোরকা পরে আমি রেডি হলাম। আর ওকে বললাম,
” আচ্ছা মাহাদি আমি তো এতদিন বাইরে অনেক লোকের সামনে বের হতাম বলেই পর্দা করতাম। কিন্তু আজ তো গাড়ির মধ্যে আছি। তাছাড়া যে ড্রাইভার আছেন ওনি তো অনেক বয়স্ক। তাহলে পর্দা করার কি ই বা দরকার ছিল।”
” না তুমি ভুল ভাবছো। পর্দা তো শুধু বাইরে করতে বলা হয়নি। পর্দা তো ঘরের ভিতরেই করতে হবে যদি সেখানে কোন গায়রে মাহরাম থাকে। আল্লাহ কি বলেছেন সে সম্পর্কে কি তুমি অবগত নও?????
তিনি বলেছেন,
“★ ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।
—-সূরা আন নুর-৩১……..!!!!
বাবার বাড়িতে গিয়ে বাবা মা আমাদের দেখে অনেক খুশি হল। কিন্তু বুঝেছিলাম ভাবি আমাদের দেখে মোটেই খুশি হয়নি।
বুঝছিলাম যে কয়টা দিন ওখানে থাকতে হবে। অনেক ধৈর্য ধরেই থাকতে হবে………!!!
ভাবলাম মায়ের সাথে গিয়ে একটু গল্প করি। তাই মায়ের ঘরের দিকে এগুতে থাকি……..
ঘরে ঘরে যেতে না যেতেই মা আমাকে মাহাদির কথা জিজ্ঞাস করে। ওর কথা বলতেই আমি মা’কে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করি………!!!!
“এই কি হলো কাঁদছিস কেন রে পাগলি মেয়ে?????”
“মা আমাকে ওরা সবাই খুব যত্ন করে। কিন্তু জান মা ওরা অনেক গরিব। বিয়ের প্রথমদিন সকালেই ওরা আমাকে কচুশাক খেতে দিয়েছে!!!
তুমি তো জান মা আমি যে কষ্ট সহ্য করতে পারিনা একদম।
” তাতে কি হয়েছে রে মা! ছেলেটা যে অনেক ভাল। একদিন ঠিক মানিয়ে নিতে পারবি দেখিস! এই জীবন তো শেষ নয়…..!!!”
“ধ্যাত তোমার সাথে একটু মনের কথা বলতে এসেছিলাম। আর তুমি ও বড় বড় লেকচার দিচ্ছ???”
” মা তুই কি জানিস না। আমাদের প্রিয় নবী কন্যা আদরের দুলালী কত কষ্টের মধ্যে দিয়ে জীবন যাপন করেছে। ঠিক মত খাবার ই যাদের প্রতিদিন জুটতনা। কিন্তু ভালবাসার কন কমতি কিন্তু ছিলনা তাদের মধ্যে।”
“মা ফাতেমার কষ্টের কথা শুনে আমার মন টা অনেক নরম হয়ে যায়……….!!!!
পরেরদিন সকালে মাহাদির দেওয়া একটা শাড়ি পরে আমি নিজেকে সাজিয়ে নিলাম। মাহাদি আমাকে দেখে বলে রাগি বউ শাড়িটা তে তোমায় বেশ মানিয়েছে। আসলে জীবনে কোনদিন কোন মেয়ের দিকে তাকায়নি তো এজন্য বোধ হয় জানি না মেয়েরা কেমন সুন্দর হয়………!!!”
আমাদের কথোপকথন এর মধ্যেই আমার ভাই মাফুজ চলে আসে আমাদের ঘরে। আমাদের নিচে খেতে যাওয়ার জন্য ডাকতে আসে ছোট ভাইটি…….
খেতে নিচে গেল আমার ভাবি আমায় বলে,
“এই তামান্না! শাড়িটা কি মাহাদিই দিয়েছে তোকে!”
” হ্যা ভাবি!!!”
” কি ক্ষ্যাত মার্কা শাড়ি ওটা। ওমন শড়ি তো আজকাল ভিক্ষারিরা ও পরেনা।”
” ভাবি আপুর শাড়ি অনেক সুন্দর।। মিথ্যে কেন বলছ????”
” এই মাফুজ! বড় মানুষের কথার মধ্যে কথা কেন বলিস। চুপ কর!”
আমি তখন রাগে গজগজ করে বলতে লাগলাম,
” মা! আমার শাড়ি আর আমার স্বামী কোনটাই যখন ভাবির পছন্দ না। তখন এক টেবিলে বসে খাওয়াটা ও না আমার পক্ষে পসিবল না।আমি ঘরে গেলাম মা।”
“এক পা এগোতে না এগোতেই মাহাদি আমাকে বলল,
” আমার কোন অসুবিধা নাই তামান্না। আমি একসাথে বসে খেতে পারবো। আমার সাথে কেউ একজন খারাপ ব্যবহার করবে আর আমি ও তার সাথে খারাপ ব্যবহার করবো???
বরং শত্রুকে ও ভাল ব্যবহার দ্বারা বন্ধু করে নেওয়াই উত্তম। যে ব্যক্তির প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ নেয়না সেই কি উত্তম নয়……..???”
মাহাদির কথা শুনে আমার বিবেক নাড়া দিয়ে উঠেছিল। তাই নিজের রাগ কে কন্ট্রোল করে এক টেবিলে খেয়ে নিই ঠিকই।
কিন্তু পরক্ষনে ঘরে এসে ওকে বলতে থাকি,
“এমন একটা স্বামী জুটেছে আমার, একটা ভাল শাড়ি ও দিতে পারেনা।”
আমার কথা শুনে মাহাদি একটু কষ্ট পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নিজের কষ্ট কে আড়াল রেখে বলল,
” আমাদের রাসূল সাঃ অনেক দারিদ্র্য ছিলেন। নিজ স্ত্রী দের খাওয়া পরা ঠিক মত দিতেই পারতেন না। কিন্তু তার স্ত্রী রা অল্পতেই তুষ্ট থাকত। আর ভালবাসা তার তো কোন কমতিই ছিলনা।তারা দুনিয়ার কষ্টগুলোলে হাসি মুখে মেনে নিয়েছিল জান্নাতি সুখ পাবার আশায়……!!!!!
আমাদের কথোপকথন এর মধ্যে হঠাৎ ই মাহাদির ফোন বেজে উঠল।
ওর কথার ধরনে বুঝলাম,
“আমার বড় ননদ সাদিয়া ফোন করেছে। যাকে কিনা কোন দিন চোখে দেখিনি।শুধু নাম ই শুনেছি।ওর কাছ থেকে ফোন নিয়ে আমি সাদিয়ার সাথে কথা বলা শুরু করি,
“আসসালামু আলাইকুম”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম।কেমন আছ ভাবি?”
“আলহামদুলিল্লাহ। সাদিয়া তুমি আমাদের বিয়েতে আসোনি কেন????”
” আসলে ভাবি এত ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে সময় কাটায়। যে কারনে যেতে পারিনি। প্লিজ ভাবি রাগ কোরোনা। আমি সময় করে যাবো ইনশাআল্লাহ। ”
কেন জানিনা সেদিন সাদিয়ার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারিনি।জানিনা ও কেমন আছে??
ওর কথায় বড্ড সন্দেহ হয়েছিল আমার।
ও আমাকে পাশ থেকে বলল,
” রাগি বউ! আবার কি হলো???”
“না আসলে ওর কথায় কেমন জানি সন্দেহ হচ্ছে আমার।”
” ও তো এমন ই।”
আমার মনে হচ্ছে বড় কোন ঝড় আমাদের সবার জন্য অপেক্ষা করছে! আল্লাহই জানে কি বড় পরিক্ষা আমাদের জন্য আসতে চলেছে……….
চলবে………
ইনশাআল্লাহ…….