শুধু তোমায় ঘিরে পর্ব-১৬

0
1911

?শুধু তোমায় ঘিরে?

#মেঘা আফরোজ…..?
#পর্ব-১৬…..?

?

শাড়ি পড়ে বসে আছি আমার সামনে বসে আছে আবির কিছুটা দুরে কাজী বসে কি যেনো লিখছেন আর দরজার পাশে আছাদ নামের লোকটি সহ আরো।দুজন দাড়িয়ে আছে।
কি যে ঘটতে চলেছে তা আমি নিজেও জানি না। তাসিন তো এখনো এসে পৌছালো না তাহলে কি তাসিন ব্যর্থ হলো আমাকে খুজে বের করতে? আমি কি আর কখনোই দেখতে পারবো না তাসিনকে? উনাকে ছাড়া এ জীবন আমি কাটাতে পারবো না কোনো ভাবেই না। কিন্তু এখন কি করবো আমি,কি করে বাঁচাবো নিজেকে?
আনমনে কতশত কথা ভেবে চলেছি সব কিছু যেনো পাকিয়ে যাচ্ছে,ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে আবির বললো
..মেঘা কি ভাবছো এত হুম এখন কিছুই ভাবতে হবে না। নাও ধরো এটাতে সই করে দাও। একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে।
..কিসের কাগজ এটা?
..বারে আমাদের বিয়ে হতে চলেছে রেজিস্ট্রি পেপারে সই করতে হবে না। কথা না বাড়িয়ে জলদি কাজটা সেরে ফেলো তো।
আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো এই মুহুর্তে কি করা উচিৎ কিছুই মাথায় আসছে না আমার। আমার এখনো মনে হচ্ছে তাসিন আসবে আমার ভালোবাসা টানে সে আসবে আমাকে নিতে। হঠাৎ করেই মাথায় একটা বুদ্ধি এলো হয়তো এ কাজটা করলে বিয়েটা এখনি হবে না। ভাবনা অনুযায়ী কাজ করলাম আবির আমার পাশেই ছিলো নিজের সবটা ভার ছেড়ে চোখ বন্ধ করে দিয়ে লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। আবির তাড়াহুড়ো করে আমার গালে হাত দিয়ে বার বার ডেকে চলেছে
..মেঘা এই মেঘা কি হলো তোমার চোখ খোলো।
আছাদ বলে উঠলো
..স্যার,মনে হচ্ছে ম্যাম সেন্সলেস হয়ে পড়েছে।
..আছাদ তাড়াতাড়ি পানি আনো ফাস্ট।
আমি চোখ বন্ধ করেই ভাবছি পানি আনো আর যাই করো এত তাড়াতাড়ি আমি চোখ খুলছি না।

. ?

আমি ওভাবে থাকা অবস্থাতে থাকতেই বাইরে কিছুর শব্দ হলো। আবির নিচু স্বরে বললো
..আছাদ কিসের শব্দ হলো বাইরে কি কেউ আছে?
..না স্যার এখানে তো কারো আসার কথা না। আমি দেখছি বাইরে গিয়ে। আছাদ দরজাটা খুলতেই দুজন লোক সামনে এসে দাড়ালো। আছাদ দরজাটা তাড়াতাড়ি আটকাতে নিলে ওই দুজনের মধ্য একজন বলে উঠলো
..দরজা আটকে কোনো লাভ নেই এই এড়িয়া টা পুলিশে ঘিরে নিয়েছে। কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবেন না কেউ।

কথাগুলো আমার কানে আসতেই চোখ মেলে তাকালাম আমি আমার ভেতরে আশার আলো ফুটে উঠলো।

আবির যে চরম অবাক হয়েছে তা মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। আবির ওই লোকদেরকে বললো
..ও হ্যালো ফাজলামো পেয়েছেন আপনারা? পুলিশ ঘিরে নিয়েছে মানেটা কি! ঝামেলা না করে কেটে পড়ুন এখান থেকে।
তখন পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো
..হুম আবির কেটে তো পড়বেই। এবার তুই কি করে বাঁচবি সেটা ভেবে নে।
আমার চোখমুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তাসিনের কন্ঠস্বর শুনে। মুখে হাসি ফুটে উঠলো আমার।
আবির তো তাসিনকে দেখে চরম শকড খেয়েছে
..তাসিন তুই!!
..হ্যা আমি কি ভেবেছিলি আমার মেঘাকে কিডন্যাপ করে ওকে নিজের করে নিবি? ভাবাটা সহজ করাটা খুবই কঠিন। তুই বড্ড ভুল করে ফেলেছিস আবির আমার মেঘাকে তুই কাঁদিয়েছিস আমি তো মেরেই ফেলবো তোকে। বলেই এগিয়ে আসতে নিলে আবির নিজের পকেট থেকে একটি ছুরি বের করে আমার গলায় চেপে ধরে বললো
..তাসিন আর এক পা এগোলে মেঘার গলায় আমি আঘাত করবো।
..আবির মেঘাকে ছেড়ে দে বলছি ওর গায়ে এতটুকু আঘাত যেনো না পড়ে।
..তুই এদেরকে নিয়ে চলে যা তাসিন তাহলে আমি ওর কোনো ক্ষতি করবো না।

. ?

অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তাসিনের দিকে। তাসিন চোখের ইশারায় আমাকে চুপ থাকতে বললো।
হঠাৎ করেই তাসিনের পাশে থাকা একটি লোক আবিরের হাত বরাবর গুলি করলো,আবিরের হাত থেকে ছুরিটা পড়ে যেতেই আমি দ্রুত উঠে গিয়ে তাসিনকে জড়িয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম। তাসিনও আমাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো। আমার মাথায় একটা চুমু খেয়ে বললো
..মেঘাপাখি ভয় নেই আর কেঁদো না প্লিজ।
আয়ান ভাইয়া বাবা খালু এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে আমি তাসিনকে ছেড়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।
বাবার চোখেও পানি চিকচিক করছিলো।
আমি বাবার বুকে মাথা রেখেই দাড়িয়ে রইলাম।

পুলিশ আবিরের সাথে যারা ছিলো ওদেরকে ধরলো আবির পালাতে গিয়েও পারে নি তাসিন ওকে ধরে মারতে লাগলো। মারতে মারতে বললো
..আবির তোকে আমি ভরসা করতাম বন্ধুর স্থান দিয়েছিলাম তোকে আমি আর তুই আমার বুকে আঘাত করলি। আমার জানের দিকে হাত বাড়ালি তুই। তোর হাতটাই আজ আমি গুড়িয়ে ফেলবো। বলেই একটা ইট হাতে তুলে নিলো।
আবির মিনতির স্বরে বললো
..তাসিন ক্ষমা করে দে আমায় আমিও যে মেঘাকে ভালোবাসি তাই তো এমনটা করেছি।
..ভালোবাসা! কিসের ভালোবাসা তুই শুধু নিজের স্বার্থে এ কাজ করেছিস। ওকে ভালোবেসে কিছু করিসনি তুই যা করেছিস আমাকে হারানোর জন্য করেছিস।
..আমার ভুল হয়েছে তাসিন আমাকে ছেড়ে দে কথা দিচ্ছি তোদের মাঝে আমি আর আসবো না।
..বেঁচে থাকলে তো আসবি। বলেই হাতে থাকা ইট দিয়ে আবিরে হাতে আঘাত করতে লাগলো। এই মুহুর্তে তসিনকে আমি নিজেই চিনতে পারছি না। চোখ দিয়ে মনে হচ্ছে আগুন বের হচ্ছে উনার। একের পর এক আঘাত করছে আবিরকে।

পুলিশ ও উনাকে থামাতে পারছে না,আমি গিয়ে তাসিনের হাত ধরে বললাম। তাসিন উনি মরে যাবে থামুন এখন। আয়ান ভাইয়া বাবা মিলে তাসিনকে সরিয়ে আনলো। আবির মাটিতে পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থাতে।
আমি তাসিনের হাত ধরে বললাম
..প্লিজজ আপনি শান্ত হন আমি ঠিক আছি তো দেখুন আবির কোনো ক্ষতি করতে পারে নি আমার।
তাসিন আমার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে আমার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো
..তোমাকে না পেলে আমি মরেই যেতাম মেঘা। তোমাকে বু্ঝাতে পারবো না কি অবস্থা হয়েছিলো আমার।

আবির এবং তার সঙ্গীদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসলো।

.?

আজ আমার আর তাসিনের গায়ে হলুদ। সবুজ পাড়ের হলুদ শাড়িতে সাজিয়েছি নিজেকে সাথে কাঁচা ফুলের গহনা। সন্ধার পর আমাকে হলুদের স্টেজে নিয়ে বসানো হলো, মা আর তিশার মা তিশাকে এনে আমার পাশে বসিয়ে দিলো।তিশা ও আজ আমার মতো করেই সেজেছে তবে তা নিজের ইচ্ছেতে নয় আয়ান ভাইয়ার ইচ্ছেতে। ভাইয়া নাকি বলেছে সেম আমার মতো করে সাজতে এমনকি স্টেজে আমার পাশে বাসতে হবে। তিশা আমার পাশেই বসা মুখটা বেলুনের মতো ফুলিয়ে রেখেছে।
..এই তিশা এভাবে মুখ ফুলিয়ে রেখেছিস কেনো তুই??
..তো কি করবো তুই বল। কোথায় ভাবলাম তোর গায়ে হলুদে সব কিছুর গোছগাছ আমি করবো কিন্তু কি হলো ওই বাদরটার কড়া নির্দেশ আমাকে নাকি তোর পাশেই এমন সং সেজে বসে থাকতে হবে। আর দেখ তোর মা আমার মা মিলে আমাকে বসিয়ে দিলো। কিছু জানতে চাইলে মা বললো…তিশা, মেঘা তোর বেস্ট ফ্রেন্ড তাই ওর পাশে থাকবি তুই।
..আয়ান ভাইয়া তো এখানে নেই দেখবেও না তুই কি করছিস। আর তোর মা তো ঠিকি বলেছে আমার পাশেই থাকবি তুই।
..দেখবে না আবার। আমার কি মনে হচ্ছে জানিস আয়ান এখানে সিসি ক্যামেরা সেট করে রেখেছে। আমি কখন কি করছি সব কিভাবে যেনো জেনে যাচ্ছে। বাকী রইলো তোর পাশে বসার কথা এটাই তো বেশি ভাবাচ্ছে আমাকে।
তিশার কথা শুনে হেসে উঠলাম আমি
..মেঘা হাসবি না একদম। কোন দুঃখে যে তোর ভাইয়ের প্রেমে আমি পড়েছিলাম। ইনোসেন্ট ফেস করে বললো।
..দুঃখে নয় গো তিশামনি সুখে প্রেমে পড়েছিলে। গাল টেনে বললাম।

. ?

সবাই একে একে আমাকে হলুদ লাগাতে লাগলো। আর আমার সাথে তিশাকেও। এতে আমি আর তিশা দুজনেই অবাক!! তিশা আমাকে বললো
..এই মেঘা গায়ে হলুদ তোর, তাহলে তোর সাথে আমাকে এভাবে বসিয়ে হলুদ মাখাচ্ছে কেনো বলতো??
..আমি কি ভাবে বলবো কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

স্টেজের পাশে থেকে কেউ বলছে বাহ এমন বিয়ে দেখা ভাগ্যের ব্যাপার দুজন বেস্ট ফ্রেন্ডের একসাথে বিয়ে হতে চলেছে।
কথাগুলো আমার আর তিশার দুজনেরি কানে আসলো। দুজনেই চোখ বড় বড় করে একে ওপরের দিকে তাকিয়ে মা বলে চিৎকার করে উঠলাম।
আমাদের চিৎকারে সবাই চুপ হয়ে গেলো আমার মা তিশার মা এসে আমাদের পাশে দাড়ালো। মা বললো
..কি হলো তোদের মেঘা কোনো প্রবলেম হয়েছে কি?
আমি কিছু বলার আগেই তিশা বলে উঠলো
..প্রবলেম তো অবশ্যই আন্টি। বিয়ে মেঘার আর আজ গায়ো হলুদ ও ওর তাহলে আমাকে কেনো বসিয়েছেন এখানে আর আমাকে হলুদ দেওয়া হচ্ছে কেনো??
তিশার মা হেসে বললো
..ওও এই কথা। শোন তোকেও হলুদ দেওয়া হচ্ছে তার কারন মেঘার সাথে কাল তোর ও বিয়ে হবে।

আমি তো অবাক হয়ে হা করে বুঝার চেষ্টা করছি তিশার মা ঠিক কি বলেছে, আর তিশা বিষ্মিত কন্ঠে বললো
..মা কি বলছো তুমি!!! আমার বিয়ে! কার সাথে??
কেউ স্টেজের নিচে থেকে আনন্দ মাখা স্বরে বলে উঠলো
..তিশা আমার ছেলের সাথে বিয়ে হবে তোমার।
আমি আর তিশা সেদিকে তাকালাম, তিশা বললো
..আ আন্টি আপনি!!
..আন্টি নয় শাশুড়ি মা হতে চলেছি তোমার।

?

#চলবে. . . ?