শুধু তোমায় ঘিরে পর্ব-১৮

0
1821

?শুধু তোমায় ঘিরে?

#মেঘা আফরোজ…..?
#পর্ব-১৮…..?

?

তমা আপু আর রিশা আপু একটু আগেই আমাকে বাসর ঘরে বসিয়ে রেখে গেছে। পুরোঘর জুরে যেনো ফুলের সমারোহ,আচ্ছা বাসর ঘরে এত ফুল দিতে হয় বুঝি! দেখে মনে হচ্ছে এটা একটা রুম নয় ফুলের গালিচা। চারিপাশে গোলাপ রজনীগন্ধা বেলি ফুলে ভর্তি,তবে অসম্ভব সুন্দর লাগছে পুরো রুমটা। বিছানার ঠিক মাঝখানটায় বসে আছি,ছড়িয়ে রাখা গোলাপের পাপড়ি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি।
আমার ভেতরে কেমন যেনো একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে কেমন যেনো একটা লজ্জাবৃত অনুভূতি।

হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম তাসিন হাসি মুখে রুমে ঢুকে দরজাটা লক করলো। আমার হার্টবিট বেড়ে গিয়েছে এই প্রথম তাসিনের সামনে এতটা নার্ভাস লাগছে আমার। উফফ এমনিতেই এত ভারি শাড়ি গহনাতে হাপিয়ে উঠেছিলাম এখন তো আরো অস্বস্থি লাগছে। আমি আর উনার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না নামিয়ে নিলাম চোখটা।
তাসিন আমার পাশে এসে বসলো আমার ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মুচকি হেসে বললো
..আমার মেঘকন্যা কি আজ আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে হুমম!! এসি চলছে তারপরেও ঘামছো কেনো?
…………..
..এই মেঘাপাখি কথা বলছো না কেনো? আচ্ছা তোমাকে আজ এত সাজতে কে বলেছে বলোতো? জানো তোমাকে বধু বেশে দেখে আমার হার্টবিট থেমে গিয়েছিলো। উফ আমি তো নিজের চোখই সড়াতে পারছিলাম না হা করে দেখছিলাম তোমায়। আর এখন যেভাবে আছো নিজেকে তো কনট্রোল করাই দায় হয়ে পড়েছে গো। বলেই আমার হাতে চুমু খেলেন।
উনি একটু থেমে বললেন
..মেঘাপাখি যাও চেন্জ করে এসো সারাদিন এভাবে থেকে নিশ্চই কষ্ট হচ্ছে তোমার।
আমি কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম,যাক বাবা অবশেষে এই শাড়ি গহনার দোকান নিজের থেকে আলাদা করার সুযোগ হলো।
একটু এগোতেই আমার হাতে টান পড়লো,পেছনে তাকাতেই তাসিন হেসে বললো
..একটু দাড়াও।
তারপর উনি নিজের ফোনটা বের করে এসে আমাকে পেছন থেকে একহাতে জড়িয়ে ধরে আমার কাধে থুতনি রাখলো। আমি উনার এমন স্পর্শে কেঁপে উঠে চোখ বন্ধ করে নিলাম।
..মেঘাপাখি চোখ খোলো সামনে তাকাও।
আমি চোখ খুলে সামনে তাকাতেই উনি নিজের ফোনে ওভাবেই কয়েকটা ছবি তুলে নিলো।
ফোনটা পকেটে রেখে আমাকে দুহাতে জড়িয়ে বললো
..এই ছবি গুলো আমাদের বিয়ে এবং বাসর রাতের অন্যতম স্মৃতি হয়ে থাকবে সারাজীবন। এখন যাও আলমারি তে শাড়ি রাখা আছে ফ্রেস হয়ে চেন্জ করে এসো।
আমার মুখ থেকে কেনো জানিনা আজ কথাই বের হচ্ছে না,উনি আমাকে ছেড়ে দিতেই আলমারি থেকে শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে গেলাম।

. ?

তিশা আর আয়ান ভাইয়াকেও আমাদের পাশের রুমটাই দেওয়া হয়েছে,এমনকি আমাদের রুম আর ওই রুমটাও সেম ভাবে সাজানো হয়েছে। তিশা পুরো রুমটা তে চোখ বুলিয়ে মুচকি হেসে বললো
..বাহ রুমটা তো খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।
তিশা বিছানা থেকে নেমে পুরো রুমটা ঘুড়ে ঘুড়ে দেখতে লাগলো। তারপর বিছানার একপাশে এসে বসে পড়লো মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো
..উফ আর কত ক্ষণ এমন সং সেজে থাকবো। ওই বাদরটা করছে কি হ্যা,তমা আপু তো বলে গেলো উনি না আসা পর্যন্ত এসব খুলতেও পারবো না।
একটু পরেই দরজা ঠেলে রুমে ঢুকলো আয়ান ভাইয়া। তিশা রেগে তাকালো,আয়ান দরজাটা লক করে তিশার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো
..কি ব্যাপার পিচ্চি রেগে আছো কেনো?
তিশা এবার আরো রেগে গেলো
..আপনাকে না বলেছি আমাকে পিচ্চি বলবেন না।
আয়ান ভাইয়া তিশার পাশে গিয়ে ওর গা ঘেষে বসে পড়লো তিশা সরে যেতে নিলে ভাইয়া ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে বললো
..আচ্ছা আর পিচ্চি বলবো না এখন থেকে বউ বলে ডাকবো। এখন বলো তো রেগে কেনো আছো?
..রাগবো না! এখন আসার সময় হলো আপনার তাইনা?
..ইসস বউ আমার খুব মিস করছিলো বুঝি আমাকে!
..মটেও না,সারাদিন এমন সং সেজে আছি আমি আর পারছি না এভাবে থাকতে এমনিতেই শাড়ি পড়ার অভ্যাস নেই আমার। তমা আপু বলে গিয়েছে আপনি না আসা পর্যন্ত যেনো এভাবেই থাকি।
..ওও এই কথা! থাকো না এভাবে খুব সুন্দর লাগছে তোমায়। বাইরে সবার মাঝে তো চুরি করে দেখেছি তোমাকে এখন একটু মন ভরে দেখতে দাও।
তিশা এবার মুখ ফুলিয়ে বললো
..সত্যিই আমি হাপিয়ে উঠেছি,প্লিজজ একটু বুঝুন।
আয়ান ভাইয়া হেসে তিশার গাল টেনে বললো
..ঠিকআছে যাও চেন্জ করে এসো।
তিশা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। তাড়াহুড়া করে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
..আরে তিশা শাড়িটা তো নিয়ে যাও চেন্জ করে পড়বে কি।
তিশা ওয়াশরুম থেকেই বললো।
..দিয়ে যান শাড়িটা।
আয়ান ভাইয়া আলমারি থেকে একটা প্যাকেট বের করে তিশাকে ওটা দিয়ে খাটে এসে বসলো।
কিছুক্ষণ পর তিশা দরজাটা একটু ফাকা করে ইনোসেন্ট ফেস করে বললো
..শুনুন না আমি শাড়িটা পড়তে পারছি না কাউকে একটু ডেকে দেবেন।
আয়ান ভাইয়া তিশার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বললো
..তুমি শাড়ি পড়তে পারো না!!
..উহু
..আচ্ছা বাইরে এসো আমি হেল্প করছি।
..কিহহ!!আপনি কেনো কাউকে ডেকে দিন।
..এই যে ম্যাম রাত এখন ১ টার মত বাজে সারাদিন ঝামেলার মধ্য থেকে কেউ জেগে নেই। আর তাছাড়া আমি পড়ালে প্রবলেম কি? তুমি তো আমার বউ এখন তাইনা।
..নাহ আপনার থেকে আমি পড়বো না।
..ঠিকআছে পড়তে হবে না শাড়ি না পড়েই থাকো।
তিশা চোখ বড়বড় করে তাকালো
..ওভাবে তাকানোর কি আছে আর আমার কাছে কিসের এত লজ্জা শুনি। মনে নেই জঙ্গলে এক রাত আমার বুকে কিভাবে লেপ্টে ছিলে তুমি। বাকা হেসে বললো।
তিশা আর কিছু বললো না ও জানে এখন আরো কিছু বললে আয়ান ভাইয়া ওকে আরো লজ্জায় ফেলবে। তাই কিছু না বলে চুপচাপ শাড়িটা গায়ে পেচিয়ে বেড়িয়ে এসে ভাইয়ার সামনে দাড়ালো।
ভাইয়াও মুচকি হেসে তিশাকে শাড়িটা পড়তে সাহায্য করলো। তারপর শাড়ির আচলটা তিশার মাথায় তুলে দিয়ে ওর কপালে একটা চুমু একে দিয়ে বললো
..ভালোবাসি বউ অনেকটা ভালোবাসি তোমায়।
তিশা মুচকি হেসে বললো
..আমিও অনেক ভালোবাসি তোমাকে।
তিশার মুখে তুমি ডাক শুনে আয়ান ভাইয়া চমকে উঠে তিশার গালে দুহাত রেখে বললো
..আমার বউটা আমাকে তুমি করে বললো!!!আমি ভাবতে পারছি না। দারুন একটা উপহার দিলে তুমি আমাকে। আমারো তো কিছু দিতে হবে তাহলে বলো কি চাও?
..সারাজীবন এভাবে ভালোবেসে পাশে থেকো এটাই চাই আমি।
..তা তোমাকে বলতে হবে না গো পিচ্চ বউ। বলেই তিশাকে বুকে জড়িয়ে নিলো।

.?

আমি ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে তাসিনকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। দরজাটা তো ভেতর থেকে লক করা গেলো কোথায়!! আমি ব্যালকনির দিকে পা বাড়াতেই তাসিন রুমে ঢুকলো,হেসে উঠে বললো
..হলো তাহলে তোমার এত সময় লাগলো কেনো?
..কোথায় এত সময় নিয়েছি।
তাসিন আমার সামনে এসে একটু ঝুকে বললো
..এই তুমি শাড়ি পড়া শিখেছো কেনো বলো তো? আমার কত ইচ্ছে ছিলো বাসর রাতে বউকে নিজের হাতে শাড়ি পড়িয়ে দিবো।
আমি উনার দিকে হা করে তাকালাম বলে কি উনি! আমি সরে এসে দাড়ালাম ওখান থেকে।
তাসিন হঠাৎই আমাকে কোলে তুলে নিলো।
..কক কি করছেন আপনি!!
..কি করছি আমার মেঘকন্যাকে কোলে নিলাম।
উনি আমাকে খাটে বসিয়ে দিলেন তারপর সোজা হয়ে আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
..মেঘাপাখি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাওতো।
আমি উনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আর উনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
..কি দেখছেন ওভাবে??
..আমার মিষ্টি বউকে দেখছি। এত মায়া কেনো গো তোমার মুখে চোখই সাড়াতে পারি না। মেঘা জানো আমি না এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না তোমাকে আমি নিজের করে পেয়েছি। আজ আমি খুব খুব খুব খুশি তোমাকে পেয়ে। আমি তোমাকে সব সময় আগলে রাখবো আমাকে একা ফেলে কখনো কোথাও যাবে না বলো। আমার সপ্ন গুলো”””””শুধু তোমায় ঘিরে”””””সব আমি পূরণ করতে চাই তোমার হাত ধরে।
..উহুম কোথাও যাবো না। আপনার ছায়া হয়ে থাকবো আমি সব সময়।
তাসিন আমার কোমড় জড়িয়ে আমার পেটে মুখ গুজলো আমি কেঁপে উঠে একহাতে উনার চুল আকড়ে ধরলাম। উনি পেটে মুখ গুজেই বললো
..আমাকে এখনো আপনি করে বলবে তুমি?
তাসিনের ঠোঁটেট ছোয়া আমার পেটে স্পর্শ করছিলো আমি বার বার কেঁপে উঠছি। আস্তে করে বললাম
..আপনি করে বলাতেও একটা অন্য রকম সুখ আছে। এখন প্লিজ উঠুন না।
তাসিন আমার কথায় উঠে বসলো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
..তোমার যেভাবে ইচ্ছে ডেকো আমার কোনো প্রবলেম নেই।

.?

আমাদের ভালোবাসা অবশেষে পূর্ণতা পেলো। চারটি হৃদর পেলো তাদের একে ওপরের ভালোবাসার মানুষকে। তিশা আর আমার বন্ধুক্ত যেনো আরো গভীর হয়ে উঠেছে নতুন এ সম্পর্কের মাধ্যমে।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে তাসিনের বুকে পেলাম। চোখ তুলে তাকালাম তাসিনের দিকে উনি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কি নিষ্পাপ দেখতে লাগছে উনাকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উনার কপালে নিজের ঠোঁট ছোয়ালাম। তারপর উঠে ফ্রেস হয়ে নিচে চলে এলাম। খালামনি আমাকে দেখে মুচকি হেসে কাছে এসে বললো
..মেঘা এত তাড়াতাড়ি উঠে এলি যে?
..খালামনি তুমি তো জানো আমি সকালেই উঠি মাঝে মাঝে দেরি হয় শুধু।
খালামনি মুখ গোমড়া করে বললো
..তুই এখনো আমাকে খালামনি বলে ডাকবি?
..আসলে খালামনি ডেকেই তো অভ্যস্ত আমি।
..এখন থেকে অভ্যাস পাল্টা মা বলে ডাকবি আমায় কেমন।
..আচ্ছা ডাকবো তবে একটু সময় লাগবে যে।
খালামনি হেসে আমার কপালে চুমু দিয়ে বললো
..ঠিকআছে।
এর মাঝেই অরিন এসে আমাকে বললো
..মামি মামি তোমাকে ডাকছে।
আমি নিচু হয়ে বসে ওর গালে হাত দিয়ে বললাম
..কে ডাকছে আমাকে?
..আর একটা নতুন মামি।
খালামনি বললো
..তিশা ডাকছে হয়তো যা গিয়ে শুনে আয়।
আমি মাথা নাড়িয়ে তিশার রুমের সামনে এসে দরজা নক করে তিশাকে ডাকলাম। তিশা ভেতর বললো
..মেঘা ভেতরে আয়।
আমি ভেতরে গিয়ে ওকে দেখে হাসতে লাগলাম। ও মুখ ফুলিয়ে বললো
..ওই পেত্নি দাত কেলিয়ে হাসছিস কেনো?
..হাসবো না! তুই শাড়িটা এভাবে পেচিয়ে আছিস কেনো?
..তুই তো জানিস আমি শাড়ি পড়তে পারি না,একটু হেল্প কর না।
আমি ভ্রু কুঁচকে দুষ্টু হেসে তাকিয়ে বললাম
..তাহলে রাতে কিভাবে পড়েছিলি নাকি……
..মেঘা ভালো হবে না কিন্তু। আয়ান উঠার আগে দেনা পড়িয়ে।
..বা বাহ এক রাতেই বাদর থেকে আমার ভাইয়াটা আয়ান হয়ে গেলো!!
..মেঘা শাড়িটা পড়াতে সাহায্য করবি তুই?
..আরে রেগে যাচ্ছিস কেনো,দে পড়িয়ে দিচ্ছি।
ওকে শাড়িটা পড়িয়ে বললাম
..ভাইয়াকে ডেকে তোল এখন আমি গেলাম।
..কোথায় যাবি তাসিন ভাইয়ার কাছে?হেসে বললো।
..না গো তিশাবেবি নিচে যাচ্ছি।
..ওও আমি আরো ভাবলাম!!
..কি ভাবলি??
..নাহ কিছু না চল আমিও যাবো তোর সাথে।
..হুম চল।

?

#চলবে. . . ?