শুধু তোমায় ঘিরে পর্ব-১৯(শেষ পর্ব)

0
2012

?শুধু তোমায় ঘিরে?

#মেঘা আফরোজ…..?
#পর্ব-১৯(শেষ পর্ব)…..?

?

অবশেষে বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো আজ বউ ভাতের অনুষ্ঠান একটু আগেই শেষ হয়েছে। আজও তিশাকে আর আমাকে পুতুলের মতো সেজে বসে থাকতে হয়েছে। রুমে এসে কিছুটা ফ্রেস হয়ে নিলাম,কেমন যেন একটা খুশি খুশি লাগছে বাড়িতে যাবো ভেবে। তাসিনের কিছু কাপর গুছিয়ে নিলাম।
আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল ঠিক করছিলাম তখনি তাসিন রুমে ঢুকলো আর এসেই আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে চুলে মুখ গুজে দিলো।
কিছুটা কেঁপে উঠে বললাম
..যখন তখন এভাবে জড়িয়ে ধরেন কেনো?
..আমার বউকে আমি ধরবো তাতে তোমার কি।
..আমার আবার কি দরজাটা খোলা আছে ছাড়ুন এখন।
..থাক খোলা কেউ আসবে না এদিকে। বলেই ঘাড়ে চুমু খেলো।
..ছাড়ুন না আমাদের বাড়িতে যেতে হবে তো ফ্রেস হয়ে রেডি হয়ে নিন।
আয়ান ভাইয়া রুমে ঢুকছিলো আমাদের এভাবে দেখে ঘুরে দাড়িয়ে বললো
..ওপস সরি সরি ভুল সময়ে চলে এসেছি।
তাসিন সাথে সাথেই আমাকে ছেড়ে দিলো আমি অন্য দিকে ঘুরে দাড়ালাম। ইসস এই তাসিনটাও না,আয়ান ভাইয়ার সামনে কি লজ্জাতেই না পড়তে হলো এখন।

তাসিন আয়ান ভাইয়ার মাথায় চাটি মেরে বললো
..ওই শালা কারো রুমে আসতে হলে নক করতে হয় জানিস না?
..রোম্যান্স করতে হলে দরজাটা লক করতে হয় তুই সেটা জানিস না!
..কি জন্য এসেছিস সেটা বল?
..তোদেরকে ডাকতে এসেছি,তিশা আর আমি রেডি তোদেরকে যেতে বলেছে।
..আচ্ছা যা আসছি আমারা।
আয়ান ভাইয়া বেড়িয়ে যেতে গিয়ে আবার ফিরে এসে তাসিনকে বাকা হেসে বললো
..আবার আটকে পড়িস না যেনো। বলেই ভাইয়া হাসতে হাসতে বেড়িয়ে গেলো।

.?

তাসিন আর আমাকে বাবা বাড়িতে নিয়ে এসেছে,তিশা আর আয়ান ভাইয়াকে তিশাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছে।
৩ দিন বাড়িতে থেকে তাসিনদের বাড়িতে এসেছি আজ তিশারাও এসেছে।
রাতে খাবার পর সবাই ড্রয়িং রুমে বসে আছি। তিশা আমার পাশেই বসে আছে। মামা মানে আয়ান ভাইয়ার বাবা বললো
..আয়ান বিয়ের সব ঝামেলা তো শেষ এখন তো আমাদের ফেরা দরকার।
খালামনি বললো
..ভাইয়া তোমরা তো ঢাকাতেই থাকতে পারো।
..হুম পারি কিন্তু গ্রামের মায়া যে ছাড়তে পারি না।
তিশা আমার হাতটি চেপে ধরে মন খারাপ করে বললো
..মেঘা আমি তোদের ছেড়ে কি করে থাকবো। এত দুরে থাকলে বাবা মাকে কে দেখবে।
..মন খারাপ করিস না আমি মামাকে বলছি।
মামাকে উদ্দেশ্য করে বললাম
..মামা আমার কিছু বলার ছিলো।
..হ্যা বল কি বলবি?
..বলছিলাম কি তিশার তো আর কোনো ভাই বোন নেই ও একাই ও যদি এত দুরে চলে যায় ওর বাবা মা ওকে না দেখে কি ভাবে থাকবে।তাছাড়া ও তো ঢাকাতেই পড়াশুনা করছে।
খালামনি বললো
..মেঘা ঠিকি বলেছে ভাইয়া,তোমরা ঢাকাতেই থাকো।
মামা অনেক ভেবে বললো
..ঠিকআছে আমাদের যে নতুন বাড়িটা এখানে ভাড়া দেওয়া আছে আয়ান আর তিশা আপাততো ওই বাড়িতে থাকবে আর ৬ মাসের মধ্য গ্রামের সব ঠিকঠাক করে আমরাও চলে আসবো।

.?

পরের দিন মামারা গ্রামের বাড়িতে চলে গেলো,আয়ান ভাইয়াও তিশাকে নিয়ে ভাইয়াদের নতুন বাড়িতে চলে গেছে। কেমন যেনো ফাকা ফাকা লাগছে তিশাকে খুব মিস করছি। দুপুরে রুমে শুয়ে আছি তখন তমা আপু অরিনকে নিয়ে রুমে আসলো।
..মেঘা শুয়ে আছিস যে শরীর খারাপ লাগছে?
..না আপু এমনি শুয়ে আছি।উঠে বসে বললাম।
আপু আমার পাশে বসলো আমি অরিনকে কোলে নিয়ে ওর চুলে হাত বুলাচ্ছি। তমা আপু বললো
..তিশাকে মিস করছিস তাইনা?
..হুম আপু।
..মন খারাপ করিস না বেশি দুরে তো না ওরাও আসবে মাঝে মাঝে আর তাসিনকে বলবি তোকেও নিয়ে যেতে। যাই হোক শোন আমরা ২ দিন পরেই কানাডাতে ফিরে যাচ্ছি তুই কিন্তু আমার পাগল ভাইটার খেয়াল রাখবি খুব ভালোবাসে রে ও তোকে।
..আপু তোমরা এত তাড়াতাড়ি ফিরে যাবে!! সামনের মাসে না যাওয়ার কথা ছিলো!
..হুম ছিলো কিন্তু তোর ভাইয়ার জরুরী ফোন এসেছে যেতেই হবে।
..আরো একা হয়ে যাবো তোমরা চলে গেলে,অরিনকে খুব মিস করবো আপু।
তাসিন দরজার সামনে থেকে বলে উঠলো
..তাহলে ছোট্ট আর একটা অরিন আনার ব্যবস্থা করতে হবে তাহলে আর আমার এই অরিনটাকে এত মিস করবে না। অরিনকে কোলে নিয়ে।
তমা আপু হেসে বললো
..তাসিন ভুল বলেনি মেঘা ভেবে দেখিস।
আমি প্রথমে ভালো ভাবে বুঝতে না পারলেও এখন বেশ বুঝতে পারছি উনি কি বলেছেন,আপুর সামনে কিভাবে বললো এ কথা!!
আমি তাসিনের দিকে চোখ বড়বড় করে তাকাতেই উনি আমার দিকে তাকিয়ে দাত কেলিয়ে একটা হাসি দিলো।
তমা আপুর সামনে কিছুই বললাম না। আপু আরো কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেলো। আপু যাওয়ার পর তাসিন দরজাটা লক করে দিয়ে এসে আমার গা ঘেষে বসলো। আমি রাগি চোখে তাকিয়ে বললাম
..আপুর সামনে ওসব কি বলছিলেন হুমম?
তাসিন আমাকে এক হাতে জড়িয়ে কাছে নিয়ে বললো
..কেনো গো মেঘাপাখি খারাপ কি বলেছি আমি তো চাই আমাদের…….
উনাকে থামিয়ে বললাম
..থাক আর বলতে হবে না বুঝেছি আমি।
..কি বুঝেছো বলো??
..বলবো না।
তাসিন আস্তে আস্তে আমার আরো কাছে আসতে লাগলো আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই আমার ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। আমিও আর বাধা দিলাম না উনি নিজের অধিকারেই তো আমার কাছে এসেছে।

আজ আমি তিশার বাসায় এসেছি তাসিন অফিসে যাওয়ার সময় দিয়ে গিয়েছে। বিকেলে ফেরার সময় নিয়ে যাবে। অনেকদিন পর তিশাকে পেয়ে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি। আয়ান ভাইয়াও তখন বাসায় ছিলো না।
বিকেলে তাসিন আর আয়ান ভাইয়া দুজনেই বাসায় আসলো। আরো কিছুক্ষণ থেকে বাড়িতে চলে এলাম।

.?

৪ বছর পর……
..মেঘা কোথায় তুমি।
..উফ এত জোড়ে ডাকছো কেনো আমি শুনতে পাই তো নাকি?
..তোমাকে জোড়ে ডাকতেই আমার ভালো লাগে।
..হয়েছে কি জন্য ডাকছো বলো?
..কি জন্য ডাকছি জানো না! রোজ অফিসে যাবার সময় তোমাকে না দেখে গেলে আমার দিনটাই যে খারাপ যায়। আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
তৃধা দরজায় দাড়িয়ে খিলখিল করে হেসে উঠে বললো
..বাবাই তুমি আম্মুকে আদর করে দিচ্ছো?
তাসিন আমাকে ছেড়ে দিলো,আমি হেসে বললাম
..এবার মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দাও।
তাসিন তৃধাকে কোলে নিয়ে ওর গালে চুমু দিয়ে বললো
..শুধু আম্মুকে নয় এই যে আমার সুইট মামনিটাকে ও আদর করে দিয়েছি।
..বাবাই আম্মু না আমাকে চকলেট খেতে দেয় না।
..চকলেট খাওয়া তো ভালো নয় তাই তো আম্মু খেতে দেয় না তোমাকে।
..তাহলে আর খাবো না।
তাসিন তৃধাকে আমার কোলে দিয়ে বললো
..মেঘাপাখি বিকেলে আয়ান আর তিশা আসবে মনে আছে তো?
..তোমার থেকে বেশি মনে আছে।
..হ্যা মনে তো থাকবেই তিশাকে পেলে তো তুমি আমাকেই ভুলে যাও।
..তিশা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ওর জায়গায় ও আছে তোমার জায়গায় তুমি।
..হুম বুঝলাম আচ্ছা আমি বের হচ্ছি। মামনি আম্মুকে বিরক্ত করবে না কেমন। তৃধার গালে হাত দিয়ে বললো।
..আচ্ছা বাবাই।

বিকেলে আয়ান ভাইয়া তিশা এসেছে,আয়ান ভাইয়ার কোলে গলা জড়িয়ে আছে তিশা আর আয়ান ভাইয়ার ছেলে আরিয়ান। আরিয়ান তৃধার থেকে অল্প কিছুদিনের বড়। তিশা এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
..কেমন আছিস মেঘা?
..খুব ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
..আমি ও ভালো আছি।
তৃধা খালামনির কোলে ছিলো তিশাকে দেখে দৌড়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বললো
..আন্টি তোমাকে অনেক মিস করি আমি।
তিশা ওকে কোলে নিয়ে বললো
..তাই বুঝি! তাহলে আন্টিকে পাপ্পি দিয়ে দাও।
তৃধা তিশার গালে চুমু দিতেই আরিয়ান দৌড়ে এসে বললো
..আমার আম্মুকে পাপ্পি দিয়েছো এখন আমাকেও দিতে হবে।
ওর কথা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম।

.?

তিশারা আজ আমাদের বাড়িতেই আছে। রাতে বিছানা ঠিক করছিলাম তাসিন রুমে আসলো
..মেঘা তৃধা কোথায়?
..কোথায় আবার তিশাকে পেলে ও তো আমাকে ভুলেই যায়।
..আনতে যাও নি? খাটে বসে বললো।
..গিয়েছিলাম তোমার মেয়ে আসবে না আরিয়ানের সাথে খেলছে। আয়ান ভাইয়া বললো ঘুমিয়ে গেলে দিয়ে যাবে।
..মেঘা আমি একটা কথা ভাবছি।
..কি কথা??
..ভাবছি তৃধার তো খেলার সঙ্গী নেই একটা সঙ্গী এনে দিলে কেমন হয় বলো।
আমি তাসিনের দিকে তাকালাম ওর হাসি দেখেই বুঝতে পারলাম কি বলছে। আমি কিছু না বলে সেখান থেকে সরে আসতে নিলে তাসিন আমার হাত ধরে নিজের কাছে নিয়ে নিলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
..মেঘাপাখি তোমাকে যত দেখি তারপরেও মন ভরে না শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে তোমার ওই মায়াভরা মুখটির দিকে।
আমি কিছুটা হেসে বললাম
..এত ভালোবাসো কেনো আমায়?
..আমার মেঘকন্যাকে তো ভালো বাসতেই হবে। তৃধা আসার আগে তোমায় ঘিরেই ছিলো আমার সব কিছু। বিয়ের রাতে কি বলেছিলাম মনে আছে?
বলেছিলাম তোমার হাত ধরেই আমি সব সপ্ন পূরণ করতে চাই। আজ দেখো সত্যি আমার সপ্নগুলো পূরণ হচ্ছে তোমাকে পেয়েছি আমি,তোমার মত ছোট্ট মেঘাকে মানে আমাদের মেয়ে তৃধাকে পেয়েছি। জানো মেঘা তৃধা যখন বাবাই বাবাই বলে ডাকে তখন যে কি ভালো লাগে বলে বুঝাতে পারবো না তোমাকে।
আগে “””শুধু তোমায় ঘিরে”””ছিলো আমার সুখ দুঃখ আনন্দ আর এখন তোমাদের দুজনকে ঘিরেই আমার জীবন।
আমি খুব মন দিয়ে তাসিনের কথা গুলো শুনছিলাম,চোখের কোনে পানি জমে গিয়েছে আমার। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম তাসিনকে।
তাসিনও দুহাতে আগলে নিলো আমায়। বুকে মাথা রেখেই বললাম
..ভালোবাসি তোমাকে তাসিন খুব ভালোবাসি।
..আমিও তোমায় অনেক অনেক ভালোবাসি মেঘাপাখি।

.?

কিছুকিছু ভালোবাসা আছে যা একে ওপরের প্রতি আকৃষ্ট করে ঠিকি কিন্তু সারাজীবন একসাথে চলতে পারে না,,,,,,আবার কিছুকিছু ভালোবাসা আছে যা একে ওপরকে বাচতে শেখায় জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দুজন দুজনের পাশে থাকবে প্রতিটি সপ্ন পূরণ করবে একে ওপরের হাতে হাত রেখে পাশাপাশি থেকে। সব বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে পাশে থাকবে এটাই তো ভালোবাসার অন্যতম অধ্যায়।

.?

?সমাপ্ত?