শেষ ভালোবাসা পর্বঃ০৮

0
3570

শেষ_ভালোবাসা
পর্ব : ৮
লেখা : মেঘপরী
.
কিন্তু মা তুমি কে?
-কি বলছেন কি আপনি আপনার মাথা ঠিক আছে? (চিল্লিয়ে বললাম)
– হ্যা মা আমি ঠিকই বলছি, প্রথমে যখন আমি এই খবরটা শুনি তখন আমারও বিশ্বাস হয়নি, তারপর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি খবরটা সত্যি,
– আপনি কি হাজী সাহেবের বাসার ঠিকানা জানেন?
– হ্যা জানিতো,
– প্লিজ আমাকে একটু ঠিকানাটা বলে দিন ?
– ঠিক আছে। এই নাও…
তারপর আমি উনার দেওয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে বেড় হয়ে যাই.. আমি খুব জোরে দৌড়াতে থাকি আশেপাশের সবাই আমাকে দেখে হয়তো পাগল মনে করছিলো কিন্তু আমার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই..আমার মাথা কাজ করছিলো না..
প্রায় ২০ মিনিট পর আমি ওনার দেওয়া ঠিকানাতে পৌঁছাই তারপর কোনো কিছু না ভেবে দৌড়ে ভিতরে চলে যাই পেছন থেকে দারোয়ান যে আমাকে ডাকছিলো সেটা আমি শুনতেই পাচ্ছিলাম না

আমি সোজা গিয়ে রাজ্যদের বাসার কলিংবেলে চাপতে থাকি, এদিকে দারোয়ান এসে আমাকে বাধা দেয়,
– এইযে মেডাম আপনাকে কখন থেকে ডাকছি আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন না?
– প্লিজ আমাকে বাধা দেবেন না, আমাকে ভেতরে যেতে দিন
– দেখুন আপনার পরিচয় না দিলে আমি আপনাকে ভেতরে যেতে দিতে পারবো না,
– আমার নাম আভা আমি রাজ্যের সাথে দেখা করতে এসেছি,
এমন সময় ভেতর থেকে একজন বয়স্ক লোক দরজা খুলে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে,
– কে এসেছে রে আব্দুল?
– বড় সাহেব দেখুন না এই মেয়েটা বলছে সে নাকি ছোট সাহেবের সাথে দেখা করতে চায়, নাম বলছে আভা,
আভা নামটা শোনার সাথে সাথে লোকটার মুখ কালো হয়ে যায়, তারপর বলে,
– আব্দুল ওকে চলে যেতে বল,
উনার কথা শুনে আমি বুঝতে পারি যে উনিই রাজ্যের বাবা তাই আমি দৌঁড়ে গিয়ে উনার সামনে বসে হাত জোর করে কান্না করতে করতে বলি
– প্লিজ আঙ্কেল আমাকে একবার রাজ্যের সাথে দেখা করতে দিন, ওর সাথে দেখা করেই আমি চলে যাবো,
তখন ভেতর থেকে একজন বয়স্ক মহিলা বের হয়ে এসে বলে
– কে এই মেয়ে? এখানে কি চায়
উনার প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যের বাবা বলে
– রাজ্যের মা এ হলো আভা,
– ওহ, তুমিই তাহলে সেই আভা যার জন্য আমার ছেলেটা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে,
– কি বলছেন আন্টি ছেড়ে গেলো মানে?
– ওও, আমার ছেলেটাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে এখন আবার না বুঝার নাটক করছো,
– সত্যি আন্টি আমি কারো কথায় বুঝতে পারছি না, আর রাজ্যের কিছু হতে পারে না আপনারা সবাই আমাকে মিথ্যে বলছেন,
– কি এতো বড় কথা তোমার কি মনে হয় আমার ছেলের মৃত্যু নিয়ে আমি তোমার সাথে নাটক করছি? এসো আমার সাথে, এখানে বসো আমি এখনই আসছি,

এটা বলে রাজ্যের আম্মু আমাকে নিচে বসিয়ে রেখে উপর তলায় চলে যায়, একটু পরে হাতে একটা ডায়েরি নিয়ে ফিরে এসে আমার হাতে দিয়ে বলে
– এটা পড়ো,
আমি ডায়েরিটা হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকি, আর অবাক হতে থাকি কারন ডায়েরির প্রতিটা পাতাই ছিলো আমাকে নিয়ে লেখা, আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার থেকে সবকিছু ডায়েরিটাতে লেখা আছে, পড়তে পড়তে আমি একটা পাতায় এসে আটকে যাই কারন ঐ পাতাটাতে সেদিন রাতে রাজ্যের সাথে আমার যে কথা গুলো হয়েছি সে সব লেখা আছে,

আর তারপর আরো কিছু লেখা আছে লেখাগুলো এরকম,

” আভা তুমি আমার ভালোবাসাটা বুঝতে পারলে না, আমার সবকিছুকে তোমার নাটক মনে হতো, কিন্তু সত্যি বলছি আমি তোমাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, যে কোনো মূল্যে আমি তোমার ভালোবাসা অর্জন করতে চাই, হোক সেটা আমার জীবনের বিনিময়ে, তাই আমার ভালোবার প্রমান দিতে আমি আমার শেষ নিঃশ্বাসটাও তোমাকে উপহার দিতে পারি, বেঁচে থাকতে তোমার ভালোবাসা পাইনি তো কি হয়েছে মরার পরে তো তোমার ভালোবাসা পাবো,
সবাই না হয় বেঁচে থাকতে ভালোবাসার মানুষের মনে জাগয়া পায় আমি না হয় মরার পরেই পাবো মরার পরে যদি আমি তোমার মনে জাগয়া পাই তাহলে সেটাই হবে আমার ভালোবাসার পরম পাও

আজ থেকেই এই ডায়েরি লেখা শেষ, থাক না আমার ভালোবাসাটা অসম্পূর্ণ তাতে ক্ষতি কি ভালো থেকো আভা,

আমি চলে যাচ্ছি অপূর্ণতায় তুমি না হয় খুঁজে নিও আমার ভালোবাসা আমার শূন্যতায়,””””””””””””””

ডায়েরি টা পড়ার সময় ডায়েরির প্রতিটা পাতা আমার চোখের জলে ভিজে যায়,

ডায়েরি পড়া শেষ হতেই রাজ্যের মা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে উনাদের বাসার বাগানের কাছে নিয়ে যায়, তারপর হাত দিয়ে সামনের দিকে এশারা করে বলে ঐ দেখো ওখানে সুয়ে আছে আমার রাজ্য
আর এর জন্য দায়ী একমাত্র তুমি,
যতটা কষ্ট তুমি ওকে আর আমাদের দিয়েছো তার থেকে বেশি কষ্ট তুমিও পাবে..
আমি ছুটে রাজ্যের কবরের পাশে গিয়ে বসে পরি তারপর ওর কবরটা দেখে কান্না করতে করতে বলতে থাকি,
– রাজ্য আমি কখনোই এটা চাইনি আমিতো শুধু মজা করে বলেছিলাম মনে থেকে বলিনি তুমি না আমাকে এতো ভালোবাসতে তাহলে আমার মনের কথাটা কেনো বুঝতে পারলে না আমিও যে তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসি তুমি শুধু আমার মুখের কথাটাই শুনলে একবারও আমার মনের খবর নিলে না.. রাজ্য প্লিজ ফিরে আসো।আমি আর কখনো এমন কথা বলব না। তুমি ফিরে আসো রাজ্য একটি বার আমার কাছে ফিরে আসো। তোমাকে ছারা আমি বাচতে পারবো না..
এভাবে কান্না করতে করতে কখন যে আমি সেন্সলেস হয়ে পরে যাই তারপর যখন আমার জ্ঞান ফেরে তখন নিজেকে হসপিটালে আবিষ্কার করি তখন আমি কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে ছিলাম না পরে জানতে পারি আমি অজ্ঞান হওয়ার পরে রাজ্যের বাবা মা আমাকে হসপিটালে নিয়ে আসে তারপর লোক দিয়ে আমাদের বাসায় খবর পাঠায়। তারপর থেকে আমি কয়েক মাস কোনো কথা বলিনি নিজের রুম থেকে বেড় হয়নি মাঝে মাঝে পাগলের মতো কান্না করতাম আবার মাঝে মাঝে ওর কথা ভেবে হাসতাম। পড়ালেখা প্রায় ছেরেই দিয়েছিলাম।খাওয়া দাওয়া করতাম না একদমই। আমার বাবা মা আমার দিকে তাকাতে পারতো না।
প্রায়ই ছুটে যেতাম আমার রাজ্যর কবরের কাছে। ওরা সবাই মিলে আমাকে ধরে নিয়ে আসতো। রাজ্যর বাবা মা আমায় ওদের বাসায়ও ঢুকতে দিতো না।আমাকে প্রায় ই অজ্ঞান অবস্থায় ওখান থেকে নিয়ে আসতো আমার ভাইয়া।
আমাকে নিয়ে বাবা মা ভাইয়া সবাই খুব টেনশনে পড়ে যায়,,
আমার অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো।বিভিন্ন ডাক্তার দেখানোর পর ডাক্তারের পরামর্শে আমাকে ৩ মাস মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়েছিলো।
.
তারপর রাজ্যের স্মৃতি থেকে আমাকে বেড় করার জন্য আব্বু ওখান থেকে টান্সফার হয়ে ঢাকায় চলে আসে, তারপর আমি আসতে আসতে স্বাভাবিক হতে থাকি।অনুভব করতাম রাজ্য সব সময় আমার সাথে আছে ও যে আমার চোখের পানি সহ্য করতে পারে না । ওর লেখা ডায়েরিটা বুকে আগলে রাখি সবসময়।

শুধু জায়গাটা পরিবর্তন করতে হয়েছে কিন্তু আমার মন থেকে রাজ্যের জায়গাটা পরিবর্তন করতে পারেনি

রাজ্য ঠিকই বলেছিলো ওর শূন্যতায়ই আমি বুঝতে পারবো যে ও আমাকে কতটা ভালোবাসত
ও যখন ছিলো তখন আমি ওর ভালোবাসাটা বুঝতে পারিনি,
কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম তখন ও আমার পাশে নেই।

আমার ভুলের জন্যই আমি ওকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি।
তারপর আমি আবার এখানকার কলেজে ভর্তি হই। একদিন আনমনে রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম তখন হটাত করেই কারো গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে নিচে পরে যাই। সামান্য হাত পা ছেলে যায় কিন্তু আপনার মা আমাকে নিয়ে হাসপাতালে যায়। হ্যা ওই গাড়িতে আপনার মা ছিলো আর উনি তখন আমাকে দেখে খুব পছন্দ করে তারপর আমার ঠিকানা জোগার করে আমার বাবা মার সাথে কথা বলে আর তারপর এটা বলে আভা প্রচন্ড কান্নায় ভেঙ্গে পরে,,

আভার কান্না দেখে অত্র কি করবে কিভাবে শান্তনা দেবে কিছুই বুঝতে পারছিলো না

আভা বলে উঠে
-আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি,
এটা বলে চেয়ার থেকে উঠতে আভা মাথা ঘুরে পরে যেতে নেয়,
কিন্তু অত্র সাথে সাথে আভাকে ধরে ফেলে…
চলবে…..