সুখের কষ্ট Part -01

0
1128

#সুখের_কষ্ট
#Part_1
#Writer_Tahsina_Islam_Orsha

একটু পরই আমার বিয়ে আর আমার বিয়েতে আমার বর আসবে না। বর ছাড়া বিয়ে হয়তো খুব কমই হয়। বিয়েতে বরযাত্রীর সাথে বর বাড়িতে থেকে ও আসবে না এমন বিয়ে হয়তো আদৌ হয়নি, কিন্তু আমার হচ্ছে। হ্যা আমার বর তার বাড়িতেই কিন্তু সে আসবে না।

আমি সন্ধ্যা ইসলাম। এই বার অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ি।আমি যখন পাচঁ বছরের তখন আমার মা মারা যায়, কিছু না বুঝলে ও খুব কান্না করেছিলাম সেদিন,বুঝতে পেরেছিলাম মা না ফেরার দেশে চলে গেছে, আকাশের তারা বানিয়ে দিয়েছে আল্লাহ মা কে। এর কিছু দিন পরই বাবা আরেকটা বিয়ে করে। সৎ মা আমাকে প্রথম প্রথম আদর করলে ও কয়েকদিন পর থেকেই তার আসল চেহারা দেখানো শুরু করে। আমার নামে আব্বুর কাছে নালিশ দিতেই থাকতো। আমাকে মারধোর ও করতো ।

আব্বুর কাছে ও আমি আস্তে আস্তে অসহ্য হতে লাগলাম। তারপর একদিন হঠাৎ করে মামা আসলো আমাকে নিতে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আব্বু ই মামাকে বলেছে এসে আমাকে উনার কাছ থেকে নিয়ে যেতে। আমার জন্য নাকি খরচ পাঠাবে আব্বু, কিন্তু মামা না করে দিয়েছিলো তার কোন খরচ লাগবে না। সেদিন খুব ভালো করে না বুঝলে ও বুঝতে পেরেছিলাম মামা আমাকে খুব ভালোবাসে।

মামা বাড়িতে থেকেই পড়াশুনা করছিলাম। মামা, সিহা আর সিজাদ ভাইয়া আমাকে খুব ভালোবাসতো। সিজাদ ভাইয়াকে পেয়ে মনে হলো সে আমারই আপন ভাই। মামি আমাকে সহ্য করতে না পারলে ও মামার জন্য কিছু বলতে পারতো না।

এই সবের মাঝেই আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলাম, সিজাদ ভাইয়া বাহিরে থেকে পড়াশুনা করে। আর সিহা এই খানেই কলেজে পরে। সিজাদ ভাইয়া, মামা না থাকলে মামি আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করতো। আমি মামাকে তা বলতে পারতাম না কারন এমনিতেই ওরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে আমি চাইনি আমার জন্য ওদের সুখ নষ্ট হোক।

এর মধ্যে আমি একটা ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। রিহান ও আমাকে খুব ভালোবাসতো।ভেবেছিলাম ওকে ভালোবেসে সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে আমার। ও নিজে ও বলেছিলো আমার আর কোন কষ্ট করতে হবে না। ওকে নিয়ে ছোট্ট একটা সংসারের সপ্ন দেখেছিলাম আমি। হাজারো ইচ্ছে সেখানে ছুটা ছুটি করতো। প্রতিদিন নিয়ম করে ভালোবাসি বলতাম দুজন দুজনকে। ভুল করে একদিন ভালোবাসি না বললে খুব অভিমান হতো আমার। কিন্তু জানি না কি হয়েছে হঠাৎ করে অভিমান করে ও হারিয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেছি যোগাযোগ করার কিন্তু পারিনি। সেই দিন ও খুব কেদেঁছিলাম।

কথায় আছে না কিছু কিছু মানুষের কপালে সুখ নেই।আল্লাহ তাদের কপালে সুখ লিখেনি।

এক সপ্তাহ হলো মামা মারা গিয়েছে আর মামি আমায় ছোট বেলা থেকেই পছন্দ করতো না। এখন মামা নেই তাই আমাকে বিদায় করার জন্য উঠে পরে লেগেছে। আর আজকে তার সেই অপেক্ষাকৃত দিন চলে এসেছে আমি চলে যাচ্ছি এই বাড়ি ছেড়ে। খুব সুন্দর করে সাজানো হচ্ছে আমাকে ভারী ভারী গহনা দিয়ে। ওরা অনেক বড়লোক তাই আমাকে স্বর্ণ দিয়ে মুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর মামিকে মোটা অংকের টাকা দিয়েছে আমাকে বিয়ে দিতে।

নিজের কাছেই নিজেকে পরী মন হচ্ছে। কখনো নিজেকে আয়নায় তেমন ভালো করে দেখা হয়নি তো তাই, আজকে একটু অন্য রকম লাগছে।

আমি শুধু আমার বরের নামটা শুনেছি সায়ন আহমেদ স্বাধীন উনার নাম। উনার নাকি মানসিক সমস্যা আছে এই জন্যই মামিকে এতো টাকা দিয়েছে আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। বলতে পারেন বিয়ের বাহানা দিয়ে মেয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আর মামি আমাকে বিক্রি করে দিচ্ছে। উনার মানসিক সমস্যার জন্যই উনাকে এইখানে নিয়ে আসা হবে না। তাই এই বাড়ি থেকে কয়েকজন কাজীর সাথে ওই বাড়িতে গিয়ে উনাকে কবুল বলিয়ে সই করিয়ে বরযাত্রী সহ ওরা এই বাড়িতে আসবে।

বর আসবে না বলে সবাই হাসাহাসি করছে। তাতে আমার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার মনে হচ্ছে আমি জীবন্ত লাশ। কোন অনুভূতি কাজ করছে না ভিতরে। অনুভুতি হীন মানুষ হয়ে গেছি আমি।কষ্ট ও হচ্ছে না আবার খুশি ও লাগছে না।

হঠাৎ সিহা এসে আমায় জড়িয়ে ধরে কান্না করে যাচ্ছে।

–‘ আপু আমি জানি আম্মু তোর সাথে অন্যায় করছে কিন্তু আমি কিছু পারছিনা তোর জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিস।

–‘ আরেহ পাগলি কি বলছিস এই সব, যেখানে নিজের বাবা আমাকে দেখেনি, ফেলে দিয়েছিলো সেখানে মামি আমার ভার নিয়ে আমাকে এতো দিন সহ্য করে বিয়ে পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছে। এই কাজটা কয়জনে করে বল। আমার কোন অভিযোগ নেই মামির প্রতি।এমনকি কারো প্রতিই কোন আক্ষেপ নেই। আমার যে কপালই মন্দ রে। তুই মামির সব কথা শুনিস আর সিজাদ ভাইয়াকে কিছু বলিস না।

সিহা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সন্ধ্যাকে
–‘ কি বলছিস এই সব কেন বলবো না।

–‘ সিজাদ ভাইয়া এই সব জানতে পারলে অনেক কষ্ট পাবে আর পড়াশুনা ছেড়ে চলে আসবে আমি চাই না আমার জন্য ভাইয়ার পড়াশুনার কোন ক্ষতি হোক। আমার কপালে যা আছে তা তো হবেই।

হঠাৎ মামি রুমে এসে
–‘ ন্যাকা কান্নাকাটি শেষ হলে এই বার চল কাজী চলে এসেছে। বরযাত্রী লেট করবে না বেশি।
–‘ মা তুমি এর পর ও আপুর সাথে এমন করছো?
–‘ সিহা তুই চুপ কর। মামি আমি আসছি।

????

বিশাল এক বাসার বাহিরে এসে গাড়ি থামে। আমাকে কি তাহলে এই বাসার বউ করে নিয়ে এসেছে!! ভাবার সময় নেই সবার সাথে তারাতাড়ি পা চালাতে হবে। বাসার ভিতরে পা দিচ্ছি স্বামী ছাড়া ভিতরে কেমন জানি একটা লাগছে। উনাকে আমি দেখি ও নি। মামির কথা তেই আমি রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। এছাড়া আমার হাতে আর কোন উপায় ছিলো না।

বিশাল ড্রয়িংরুমে বসে আছে সন্ধ্যা । শাশুড়ী (নাফিজা বেগম) আর শশুর (আসিফ আহমেদ) দেবর ( অয়ন) দেবরের বউ (আশা) ওরা সবাই কি জানি কথা বলছে সন্ধ্যার থেকে দূরে দাঁড়িয়ে। কিছু শুনতে পারছে না সন্ধ্যা। শুধু শশুরের এইটুকু শুনতে পেয়েছে সন্ধ্যা

–‘ ও যাতে কখনো এই সব বিষয়ে না জানতে পারে।
কথাটা শুনে সন্ধ্যার কেমন জানি লাগলো
কিন্ত সন্ধ্যা বুঝার চেষ্টা ও করলো না। সন্ধ্যা বিশাল বাড়ি দেখায় ব্যাস্ত।

সন্ধ্যার ননদ তুয়া কাছে এসে বললো
–‘ ভাবি খারাপ লাগছে না তো?

একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললাম
–‘ না।

তুয়া সন্ধ্যার কাছ থেকে চলে যেতেই একটা কম বয়সী মেয়ে ভয়ে ভয়ে এসে সন্ধ্যার কাছে বসে

–‘ ভাবি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই ( ভয়ে ভয়ে) ভাবি আমি এই বাড়িতে কাজ করি, আমার নাম শাপলা।আপনি তো কিছুই জানেন না। আপনাকে কিছু বলতে চাই।

এইটুকু বলতেই আমার জা আশা এসে শাপলাকে আটকে দেয়। বুঝতে পারলাম আমার জা হয়তো বুঝে গেছে শাপলা কি বলবে। শাপলা আশাকে দেখে ভয়ে ঢোক গিলছে।

–‘ ভাবি নতুন বউ অনেক সুন্দর।
–‘ হ্যা এখন তুই যা, কাজ কর। ( চোখ বড় বড় করে)

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে। শুধু বোকার মতো তাকিয়ে আছি ওদের দিকে।

কিন্তু আমার স্বামীকে একবারের জন্য ও দেখতে পেলাম না এখনো। উনি কোথায় আছেন সেটা ও জানি না।
আমার শাশুড়ী কাছে এসে
–‘ মা অসুবিধা হচ্ছে না তো কোন?
আমি স্মিথ হেসে
–‘ না মা।
–‘ আশা ওকে স্বাধীনের রুমে নিয়ে যা। আর খাবার রুমেই দিয়ে আয়।
–” জি মা।

রাত ১২ টা বাজে কিন্তু আমার স্বামীকে আমি এখনো দেখতে পাইনি বসে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। রিহানের কথা মনে পরছে অনেক। এমন একটা রুমে তো ওর জন্যই এই ভাবে বসে থাকার কথা ছিলো। মিথ্যা অভিনয় করে চলে গেলো। খুব কি দরকার ছিলো এই সব করার?

এই সব ভাবতে ভাবতেই দরজায় শব্দ হলো। আমি একটু জড়সড় হয়ে বসলাম। একবার উনার দিকে তাকিয়ে দেখলাম চুল গুলো উসকোখুসকো হয়ে আছে, দাড়ি গুলো বড় বড়। চোখের নিচে কালো দাগ পরেছে। কিন্তু বিশাল দেহী উনি। গায়ের রঙ ফরসা হলে ও ময়লা জমেছে বুঝা যাচ্ছে। এক পলক দেখায় যতটুকু দেখা যায় দেখলাম। আমি নিচু হয়ে বসে আছি ঘোমটা টেনে।

উনি আমার কাছে এসে বসলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। উনি আমার ঘোমটা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

হটাৎ করে আমার গালে এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো।
–‘ ক কি করছেন প্লিজ ছাড়ুন আমার লাগছে।
উনি আমার ঘোমটা টা টেনে ফেলে দেই।

আমার কোন কথায় উনি শুনছে না। কেমন জানি পাগলের মতো করছে। হটাৎ করে মনে হলো উনার তো মানসিক সমস্যা আছে। মনে পড়তেই আমি খাট থেকে লাফ দিয়ে নেমে পরলাম। উনি ঘুরে আবার আমার কাছে আসছে আমি ভয়ে ভয়ে বলছি

–‘ প্লিজ আমার কাছে আসবেন না দূরে যান। এমন করবেন না বলছি প্লিজ।

উনি আমার কাছে এসে দুই হাতে কোমরে ধরে আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। কিন্তু হঠাৎ উনি আমার কোমরে দুই হাতের বড় বড় নখ দিয়ে চাপ দিয়ে ধরে, নখ গুলো কোমরে ছুরির মতো বিধে যায় একবারে, চিৎকার দিতে গিয়ে মুখ চেপে ধরি আমি। রক্ত বের হচ্ছে বুঝতে পারছি।

আমি উনাক ধাক্কা দিয়ে আমার কাছ থেকে সরিয়ে আমি চলে যেতে নিলেই একটান দিয়ে আবার উনি আমাকে কাছে নিয়ে আসে। আমার কাধে কামড় দিয়ে ধরে আমি চিৎকার দিয়ে উঠি। উনি আমার মুখ চেপে ধরে। আমি উনাকে কোন মতেই নিজের থেকে সরাতে পারছি না।

–‘ আমি ব্যাথা পাচ্ছি প্লিজ আমাকে ছাড়ুন।

উনি কাধ ছেড়ে আমার দুই ঠোঁটে কামড় দিয়ে ধরে। তারপর গলায় মুখে, আমি অসহ্য যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছি কিন্তু উনি আমায় ছাড়ছে না। এই বার চিৎকার দিতে হবেই কেউ আমাকে না বাচাঁলে এই লোকটা আমাকে মেরেই ফেলেবে। আমি উনাকে ধাক্কা দিতেই উনি টাল সামলাতে না পেরে পরে যায়।আমি দরজার দিকে দৌড়ে যেতে নিলেই উনি আমার পায়ে ধরে টান মেরে আমাকে ফেলে দেই ফ্লোরে…….
.
.
.
চলবে…..