সুখের কষ্ট Part-05

0
818

#সুখের_কষ্ট
#Part_5
#Writer_Tahsina_Islam_Orsha

সন্ধ্যার গলার আওয়াজ শুনেতেই দুজনেই সন্ধ্যার দিকে ঘুরে তাকায়। সন্ধ্যা অবাক হয়ে যায়
–‘ শাপলা তুমি এই খানে!!!?? আর তোমার সাথে উনি কে??? সারা দিন তুমি ছিলেই বা কোথায় ?

শাপলা সন্ধ্যাকে হঠাৎ দেখে ঘাবড়ে যায়। আর একটু ভয় ও পেয়ে যায়।
–‘ কি হলো শাপলা কথা বলছো না কেনো?কোথায় ছিলে সারা দিন? আর তোমার সাথে উনি কে? এই খানে এমন উঁকি ঝুঁকি মারছে কেনো?

শাপলা আর কিছু না বলে সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেই । ভাবি এখানে কথা বলা যাবে না, ওই দিকে চলুন। সন্ধ্যা আর কোন কথা না বলে শাপলার সাথে বাসা থেকে একটু দূরে যায় যাতে কেউ না দেখতে পারে।

–‘ এই বার বলো শাপলা উনি কে? তোমার সাথে এই খানে কি করছে। তুমিই বা সারাদিন কোথায়………..
–‘ উনি স্বাধীন ভাইয়ার মা। স্বাধীন ভাইয়ার আপন মা।

শাপলার কথা শুনে সন্ধ্যার মাথা ঘুরছে এই সব কি বলছে শাপলা। এটা কি করে সম্ভব!!
–‘ কি বলছো এই সব শাপলা তুমি ??
–‘ হ্যা ভাবি সত্যি বলছি ইনি স্বাধীন ভাইয়ার মা
সানজিদা বেগম। আর আমার নাম শাপলা না আমি সাইফা আহমেদ স্বাধীন ভাইয়ার আপন ছোট বোন, সানজিদা বেগম এর মেয়ে।

শাপলার কথা শুনে সন্ধ্যা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কি হচ্ছে এই সব সন্ধ্যার সাথে। এটা কি ভাবে সম্ভব। সন্ধ্যার মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না।
তাহলে নাফিজা বেগম কি হয় স্বাধীনের?? উনি তো বলেছেন উনি স্বাধীনের মা। কে সত্যি বলছে কে মিথ্যা বলছে কিছুই বুঝতে পারছে না সন্ধ্যা। এমন অদ্ভুত সিচুয়েশনে পরে গেছে সন্ধ্যা।

সন্ধ্যার নিরবতা দেখে সাইফা আবার বলা শুরু করলো
–‘ নাফিজা বেগম ভাইয়ার আসল মা না। উনি আমাদের সৎ মা। আর আসিফ আহমেদ ও আমাদের বাবা না। উনি এই মহিলার স্বামী।আমাদের কিছু হয় না। আমাদের বাবা নিহান আহমেদ মারা গেছে। না মারা গেছে বললে ভুল হবে এই ডাইনি আর ওই লোক গুলো মিলে আমাদের বাবাকে মেরে ফেলেছে। অয়ন আমাদের কিছু হয় না। অয়ন ওই মহিলার আর আসিফ আহমেদ এর ছেলে কিন্তু তুয়া আমাদের সৎ বোন।

–‘ কি বলছো এই সব শাপলা!! মানে সাইফা, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার মাথায় কিছুই ডুকছে না। আমাকে খুলে বলো সব।

সানজিদা বেগম বলে উঠলো আমি বলছি মা শোনো।
–‘ আমি স্বাধীনের আব্বু আমরা স্বাধীন হওয়ার পর কানাডায় ই থাকতাম। স্বাধীনের আব্বু মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসতো উনার বিজনেসের কাজে। কানাডায় আমার বোন আমার আরো রিলেটিভ ও থাকে। স্বাধীনের আব্বু একবার বাংলাদেশে এসে আটকে পরে বিজনেসের কাজে, আর অসুস্থ হয়ে পরে। স্বাধীনের স্কুল খোলা থাকায় ওকে আমার বোনের কাছে রেখে আমি বাংলাদেশে আসি ওর আব্বুর জন্য। নাফিজা আর আসিফ তখন আমাদের কোম্পানি তে জব করতো। স্বাধীনের আব্বু অসুস্থ থাকায় বাসায়ই থাকতো আর নাফিজা বিভিন্ন বাহানা দিয়ে বাসায় আসতো এটা আমার ভালো লাগতো না।
নাফিজার নজর যে স্বাধীনের আব্বুর উপর ছিলো সেটা আমি বুঝতে ও পারিনি। নাফিজা বিভিন্ন ভাবে স্বাধীনের আব্বুকে ইম্প্রেস করতে চাইতো। একদিন আসিফ রাতে বাসায় এসে আমার রুমে গিয়ে আমার সাথে জবরদস্তি শুরু করে। আর তখন নাফিজা স্বাধীনের আব্বুকে নিয়ে আসে। আর বলে আমার সাথে আসিফের সম্পর্ক আছে। সেদিন স্বাধীনের আব্বু আমাকে ভুল বুঝে। আমি অনেক কান্না কাটি করেছিলাম কিন্তু ও আমায় বিশ্বাস করেনি। এরপর থেকে স্বাধীনের আব্বু চেইঞ্জ হতে শুরু করে। আমি মানুষের কাছ থেকে শুনতাম নাফিজা আর স্বাধীনের আব্বুর সম্পর্ক আছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম না।

একদিন আসিফ নাফিজা আমাদের বাসায় আসে। স্বাধীন রুমেই কাজ করছিলো, আমি ওদের জন্য চা নাস্তা বানিয়ে যখন নিয়ে যাচ্ছিলাম তখন শুনলাম নাফিজা আর আসিফ বলছে আমাকে মেরে ফেলার জন্য। আমাকে ফেরে ফেলতে পারলে নাফিজা স্বাধীনের আব্বুকে বিয়ে করতে পারবে। আমার কথাটা শুনে ভিতরে কেপে উঠে। তখন সাইফা আমার পেটে ছিলো। আমি চা নাস্তা দিয়ে চলে আসি তখন। আধা ঘন্টা পরে যখন আমি আমার রুমে যায় তখন গিয়ে দেখি স্বাধীনের আব্বু নাফিজাকে বুকে নিয়ে বলছে ওকে যেই ভাবেই হোক বিয়ে করবে। তখন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পরে আমার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না এই সেই মানুষ যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।

আমি সেইদিন ভালোবাসার মানুষটার ধোকা নিয়ে সাইফা আর নিজেকে বাচাঁনোর জন্য বাসা থেকে পালিয়ে আসি। না হয় নাফিজা আর আসিফ আমাকে আর আর আমার মেয়েকে মেরে ফেলতো। আমি আমাদের কাজের মহিলা রত্মার বাসায় উঠি। ও আমাকে খুব ভালোবাসতো। তারপর স্বাধীনের আব্বু নাফিজাকে বিয়ে করে ফেলে। আর আমার বোনের কাছে খবর পাঠায় আমি এক লোকের সাথে পালিয়ে গেছি পরে কার এক্সিডেন্টে মারা গেছি। স্বাধীনকে আমার বোনে যাতে দেখে রাখে আর স্বাধীনের আব্বু ও ওইখানে যাবে কিছু দিন পর পর। আর আমি এই সব খবর জানতে পারতাম রত্মার কাছ থেকে।

কয়েক বছর পর নাফিজা যখন প্রেগন্যান্ট মানে তুয়া নাফিজার পেটে তখন আসিফ খুব রাগারাগি করে নাফিজার সাথে। যে সম্পত্তির জন্য নিহানকে বিয়ে করেছে এখন তুয়া ওর পেটে কেন? ওদের যে একটা বাচ্চা আছে মানে অয়ন ওর কথা কি নাফিজা ভুলে গেছে। নাফিজা আর আসিফের সব কথা শুনে ফেলে নিহান । ওরা স্বামী স্ত্রী এবং ওদের একটা ছেলে ও আছে সেটা শোনার পর স্বাধীনের আব্বু অনেক বড় একটা ধাক্কা খায়। তারপর ওই দিনই ও ওর উকিলের কাছে গিয়ে স্বাধীনের নামে সব বিষয় সম্পত্তি লিখে দেই।

তারপর নাফিজা আর আসিফ একদিন শুনতে পারে সব সম্পত্তি স্বাধীনের নামে লিখে দিয়েছে। তারা দুজনে মিলে নিহানকে খাবারের সাথে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে। আর স্বাধীনকে খবর দেই তার বাবা মারা গেছে। স্বাধীন ও তখন ছুটে আসে দেশে আর ওরা আমার স্বাধীনকে পাগল বানিয়ে দেই ইঞ্জেকশন দিয়ে। এর পর থেকেই আমার ছেলেটা এমন হয়ে আছে। আর আমি সাইফাকে আমার স্বাধীনকে দেখে রাখার জন্য একটু খোজ খবর রাখার জন্য এই বাড়ির কাজের মেয়ে শাপলা বানিয়ে পাঠায়। রত্না ওকে ওর বোনের মেয়ে বলে এই বাড়িতে নিয়ে আসে। তারপর যখন স্বাধীনের বয়স একুশ হয় ওকে এমন করে সাইন করিয়ে সব সম্পত্তি ওদের করে নিতে চেয়েছিলো কিন্তু তখন উকিল সাহেব বলে যে স্বাধীনের আব্বু স্বাধীনের নামে না স্বাধীনের প্রথম বাচ্চার নামে সব লিখে দিয়ে গেছে। ওর প্রথম যেই সন্তান হবে সে এই সম্পত্তি পাবে। কিন্তু স্বাধীন পাগল বলে ওকে কেউ বিয়ে করতে চাই না। তাই এই কয়েক বছর পর ওরা তোমার মামিকে টাকা দিয়ে তোমাকে বিয়ে করিয়ে নিয়ে এসেছে আমার স্বাধীনের বউ করে। তুমি তো অনাথ, তুমি কিছু করতে পারবে না ওদের, বাচ্চা হলেই তোমাকে আর আমার স্বাধীনকে মেরে ফেলবে বাচ্চাকে রেখে এই সব প্ল্যান করছে ওরা। আর তাই স্বাধীনকে প্রতিদিন ওরা পাগলের ইঞ্জেকশনের সাথে এখন ড্রাগের ইঞ্জেকশন দেই যাতে ও তোমার উপর ঝাপিয়ে পরে। ওরা একটা বাচ্চা চাই যেই ভাবেই হোক তোমার আর স্বাধীনের যেন একটা বাচ্চা হয়।

আমি স্বাধীনকে সব সময় এই খানে এই ভাবে এসে দেখে যেতাম। কিন্তু আজকে সাইফা আমাকে নিয়ে আসতে গিয়েছিলো তোমায় দেখতে। সাইফা আমাকে বললো ওর ভাইয়ার বউ নাকি অনেক সুন্দর আর ভালো। স্বাধীন নাকি টুকটুকে সুন্দর একটা বউ পেয়েছে। তাই আমি আমার বউমাকে দেখতে আসলাম লুকিয়ে।

সানজিদা বেগম আর কিছু বলার আগেই সন্ধ্যা সানজিদা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো। সন্ধ্যা সানজিদা বেগমকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে।
ভিষণ কান্না করছে। একটা মানুষের জীবনে এতো কিছু ঘটে যেতে পারে? স্বাধীন এতটা অসহায় ছিলো এতো দিন!!

সন্ধ্যার শরীর কেমন অবশ হয়ে আসছে একটু শক্তি পাচ্ছে কিছু বলার। নির্বাক হয়ে আছে সন্ধ্যা। এর থেকে বেশি অবাক হয়তো মানুষ আর হতে পারে না।

সানজিদা বেগম সন্ধ্যাকে চোখ মুছে দিয়ে
–‘ জানো মা আমার স্বাধীনের সন্ধ্যা খুব পছন্দ ছিলো। ও আগে সন্ধ্যা হলেই আমাকে বলতো দুজনে হাটতে বের হতে। আর দেখো তোমার নাম ও সন্ধ্যা। আল্লাহ তোমাকে আমার ছেলের জীবনে ওকে এই বন্দী সন্ধ্যা থেকে মুক্ত সন্ধ্যায় নিয়ে যেতে পাঠিয়েছে।

তুমি পারবে না মা আমার ছেলেটাকে আবার আগের মতো সুস্থ করে তুলতে?

–‘ আমি আপনাকে কথা দিলাম মা। আমি স্বাধীনকে একটা স্বাধীন সন্ধ্যা উপহার দিবো। আর কখনো ওর জীবনে বন্দী সন্ধ্যা আসবে না। আর আপনাকে আর সাইফাকে আমি স্বাধীনের জীবনে ফিরিয়ে দিবো আপনাদের মর্যাদা দিয়ে।

সন্ধ্যা সাইফাকে জড়িয়ে ধরে। বোন তুমি আমাকে আগে কেন বলোনি। আজকে জানো তোমাকে না দেখতে পেয়ে অনেক ভয় পেয়ে গেছিলাম। আর নাফিজা বেগম আমাকে অন্য কাহিনি শুনিয়েছে যে স্বাধীন কার এক্সিডেন্টে এমন হয়ে গেছে

–‘ সব মিথ্যা ভাবি আমি জানতাম ওরা তোমাকে এমন কিছু শুনাবে। ওই বাড়িতে যে আমার ভাইয়া বড্ড একা। ভাবি তুমি এখন বাসায় যাও নয়তো সবাই বুঝে ফেলবে। আর আমি কাল সকালে আসবো, এসে সবাইকে একটা কিছু বুঝিয়ে ফেলবো। তুমি তারাতাড়ি বাসায় যাও ওরা হয়তো ভাইয়াকে এখন আবার ইঞ্জেকশন দিয়ে দিয়েছে।

সন্ধ্যার ইঞ্জেকশনের কথা মনে পরতেই সানজিদা আর সাইফাকে বিদায় দিয়ে তারাতাড়ি বাসায় চলে আসে সন্ধ্যা।

সন্ধ্যা হাটছে আর ভাবছে একটা মানুষের জিবনে এতো কিছু কিভাবে ঘটতে পারে?!! এই বাড়িতে সব গুলো মানুষ পর আর খারাপ। এই খানে কি ভাবে থাকবে ও স্বাধীনকে নিয়ে আর ওকে কি ভাবে ভালো করবে।

এই সব ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা রুমে এসে দেখে স্বাধীন রুমে নেই। স্বাধীনকে না দেখতে পেয়ে সন্ধ্যা ভয় পেয়ে যায়। ওরা আবার স্বাধীনের সাথে কিছু করলো না তো? স্বাধীনকে খুজঁতে সন্ধ্যা পিছনে ফিরতেই……….
.
.
.
চলবে……..

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।