সে_কি_জানে Part-10

0
991

#সে_কি_জানে?
#Writter : Ishanur Tasmia [ Mira ]
#Part : { 10 }

—” আপনি আমাকে এখানে এনেছেন কেন??”

—” তোমাকে বেচে দিতে!! ”

—” মানে?? ”

—” মানে বুঝো না?? পাচার করব তোমাকে।। ”

—” দেখুন রেয়ান,,, আমি একদম মজা করার মুডে নেই।।আপনি আমাকে এক ঘন্টা যাবত বসিয়ে রেখেছেন এখানে।। কেন সেটা বলছেন না।।আবার আমার প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছেন না।।আপনি কি চাচ্ছেন বলুন তো।। ”

কথাটা বেশ বিরক্তি নিয়েই বললাম আমি।।১ঘন্টা ধরে আমাকে একটা নদীর তীরে বসিয়ে রেখেছেন তিনি।।কি যেন বলবেন আমাকে।।অথচ চুপ করে বসে আছেন।।আবার আমার প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছেন না।।

রেয়ান খুব অস্বস্তি নিয়েই আমাকে বলল……

—” তুমি কি যেন প্রশ্ন করেছিলে?? ”

তার কথা শুনে তার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালাম আমি।। পরক্ষনে নিজেকে শান্ত রেখে বললাম…….

—” আপনি আমাদের আশেপাশের লোকদের কি বলেছেন?? আমি আপনার কি হয়?? ”

—” আমি তো শুধু ওদেরকে বলিনি।।মিডিয়ার লোকদেরও বলেছি।।তুমি নিউজটা দেখো নি?? ”

—” না!! ”

—” ও ভালো হয়েছে তাহলে।। বাসায় যেয়ে দেখে নিও হ্যাঁ।। ”

—” বাসায় গিয়ে দেখবো,,,কিন্তু তার আগে আপনি আমাকে বলুন,,,, আপনি সবাইকে কি বলেছেন?? ”

—” না বললে হয় না?? ”

—” না!!”

—” আসলে আমি না ওদেরকে বলেছি……”

—” হুম কি বলেছেন?? ”

—” আমি ওদেরকে বলেছি তুমি আমার বউ আর আমি তোমার বর।।মানে আমাদের বিয়ে হয়েছে।। ”

কথাটা শুনে আপনা-আপনিই আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।।ততক্ষনাত আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম।।চিল্লিয়ে বললাম…..

—” কি বলছেন এগুলা আপনি হ্যাঁ?? আমি আর আপনি স্বামী-স্ত্রী??মাথা ঠিকাছে আপনার।।আরে সবাইকে স্বামী-স্ত্রীই বলতে হলো?? অন্যকিছু বলতে পারলেন না।। ”

—” অন্যকিছু আবার কি বলতাম?? ”

—” কেন?? ভাই-বোন বলতে পারলেন না?? ”

—” লাইক সিরিয়াসলি?? আমি তোমাকে ভাই-বোন বলে সবার কাছে পরিচয় দিবো?? জীবনেও না।। তাছাড়া কোন ভাই বোনকে কোলে করে গাড়িতে বসায়?? ”

—” সেটা আপনার জানা উচিত।।আপনি কেন আমাকে কোলে করে গাড়িতে বসিয়েছিলেন?? সব আপনার দোষ?? ”

—” ও রেইলি?? শুনো দোষ আমার না তোমার।।কি হতো যদি তুমি আমার কথা মতো গাড়িতে আসতে।।কথা না শুনার পরিণাম ছিল ওটা।।বুঝলে?? ”

উনার কথা শুনে শরীর রাগে রিরি করছে আমার।।মানুষটা আসলেই বাজে!! ঝাঁঝাঁলো কণ্ঠে তাকে বললাম……

—” আপনি অনেক বাজে রেয়ান।। ”

—” আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলতো মরুভূমি!! তুমি কি আর কোনো কথা জানো না?? আমার সাথে তোমার যখন থেকে দেখা হয়েছে তখন থেকে এ পর্যন্ত তুমি এ-ই “বাজে” ওয়ার্ড-টা কতবার ইউস করেছো বলতো?? ”

—” আমার যতবার ইচ্ছে করবে আমি ততবার আপনাকে বলব।। আপনি কে হন আমাকে বলার?? ”

—” তোমার হবু বর।। ”

তার কথা শুনে রাগটা যেন আরও বেড়ে গেল।।আর এক মুহুর্তও থাকবো না আমি তার সাথে।।রেয়ান পেয়েছি কি আমাকে!!উনি যা বলবেন তা-ই হবে।। কক্ষনও না!! রেয়ানের দিকে একবার রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমি সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম।।এদিকে আমার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন রেয়ান।।কোমড়ে ২হাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে রেখেছেন তিনি।।আর তার তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে আমার যাওয়া দেখছেন।।প্রায় ২মিনিট ওভাবে থেকে উনি হুট করে আমার কাছে এসে আমাকে কোলে তুলে নিলেন।।এতে আমি কিছুটা চমকে যাই।।বারবার আশপাশে তাকাচ্ছি।।আবারও যদি কেউ আমাদের এভাবে দেখে ফেলে।।কিন্তু না,,, কেউ নেই এখানে।।ভেবেই প্রশান্তির এক নিশ্বাস ফেললাম আমি।।পরক্ষনে রেয়ান থেকে নিজেকে ছাঁড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।।
.
.
.
.
.
ড্রইং রুমে বসে আছি আমি।।আমার পাশেই মা আর রিহান বসে আছে।।আর আমাদের ঠিক সামনে বসে আছেন রেয়ান।। রেয়ান খুব শান্ত মেজাজে মার সাথে কথা বলছেন।। নিউজের ব্যাপারে!! রেয়ান নানাভাবে চেষ্টা করছেন মাকে ইম্প্রেস করার।।কিন্তু মা তো মা-ই।।একবার কাউকে খারাপ লাগলে।। তার সাথে আর ভাব জমে না মার।।তাই রেয়ান যতই চেষ্টা করুক না কেন,,,,মা গলে যাওয়ার পাত্রী নন!! এদিকে রিহান তো রিতিমতো রেয়ান বলতে পাগল।। যখন থেকে রেয়ান বাসায় এসেছেন তখন থেকে তার বাবা বাবা ডাকা শুরু।।

হঠাৎ রেয়ান কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে আমাকে বলেন….

—” মিরা আজকে তুমি আমার বাবার সাথে দেখা করতে যাবে।। রেডি হয়ে নাও।। ”

—” মানে?? কেন?? ”

—” বাবা ও-ই নিউজ হওয়ার পর থেকেই তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল।।বিভিন্ন কারণে পারে নি।।আজকে সময় আছে তাই তোমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে বলেছে।। ”

কথাটা শুনে মা রেগে গেলেন।।তবুও নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন……

—” তুমি কোথাও নিয়ে যাবে না আমার মেয়েকে।। আর তোমার বাবা যদি আমার মেয়ের সাথে দেখা করতে চায় তাহলে তাকে আসতে বলো।। আমার মেয়ে কেন যাবে।। ”

—” শাশুমা,, আমি চাইলে ওকে এমনেও নিয়ে যেতে পারবো।।এতে আমার কারো পারমিশন লাগবে না।। আমি শুধু আপনাকে জানানোর জন্য ওকে এখানে নিয়ে এসেছি।।নাহলে সকালে যেখানে গিয়েছিলাম সেখান থেকেই ওকে বাবার কাছে নিয়ে যেতাম।।আর এতে আপনি কিছু করতেও পারতেন না।। ”

কথাটা শুনে মা যেন আরও রেগে গেলেন।। কিন্তু কিছু বললেন না।। বুঝতে পারছি এখন কিছু বললে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।।তাই কিছু না বলে রেডি হতে চলে গেলাম।।সাথে রিহানও আছে।।
.
.
.
গাড়িতে বসে আছি আমি,, রেয়ান আর রিহান।।আমি আর রেয়ান সামনের সীটে।। আর রিহান পেছনের সীটে।।বেশ খুশি খুশি লাগছে রিহানকে।। বারবার রেয়ানকে জিজ্ঞেস করছে ” আমরা কোথায় যাবো বাবা?? আর কতক্ষন লাগবে যেতে?? ” ইত্যাদি ইত্যাদি।। কিন্তু আমি বেশ বিরক্তি হচ্ছি এসবে।।বিরক্তি নিয়েই বললাম……

—” না গেলে কি হতো না?? ”

—” অবশ্যই না ”

বলেই আবার ২জনেই চুপ।।রাস্তায় তেমন কথা হয় নি আমাদের।। বলতে গেলে আমি কিচ্ছু বললেও রেয়ান জবাব দেন নি।।

প্রায় আধা ঘন্টা পর আমরা পৌঁছে যাই গন্তব্যে।।বিশাল বড় গেট দিয়ে ডুকছে গাড়ি।।খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি চারপাশটা।।কি সুন্দর বাড়ি রেয়ানের।।এমন বাড়ি তো শুধু স্বপ্নেই দেখেছি আমি!!

রেয়ানের এক হাতে আমার হাত আর অন্য হাতে রিহানের হাত।।খুব শক্ত করে আমাদের হাত ধরে রেখেছে সে।।কিন্তু কেন?? হাত ছাঁড়াতে চাইছি বারংবার।।কিন্তু ফলাফল শূণ্য।।রেয়ান যেন হাত ছাঁড়বেই না।।তাই আমিও আর চেষ্টা করলাম না।। বাড়ির চারপাশটা দেখছি আমি।।বাড়ির বাইরে যেমন সুন্দর,, তার চেয়ে দ্বীগুণ সুন্দর বাড়ির ভেতরটা।। জায়গায় জায়গায় শুধু বডি গার্ডস আর সার্ভেন্টস।।৫০০-৬০০ তো হবেই!!

কিছুক্ষনের মধ্যেই রেয়ানের বাবা আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হন।।ভদ্রতার খাতিরে সালাম দিলাম উনাকে।।প্রতিউত্তর সেও দিলেন।।তারপর খুব মিষ্টি সরে বললেন…..

—” কেমন আছো মিরা?? ”

—” জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো।।আপনি?? ”

—” আমিও আছি এক রকম।।আচ্ছা রেয়ান তুমি আর রিহান যাও তো একটু আমি মিরার সাথে একা কথা বলব।।তুমি বরং রিহানকে বাড়িটা ঘুরেঘুরে দেখাও।। ওর ভালো লাগবে।। ”

রেয়ান ” জ্বী ” বলে সেখান থেকে চলে গেলেন।।কেন যেন খুব অস্বস্তি লাগছে আমার।।অস্বস্তি নিয়েই রেয়ানের বাবাকে বললাম……

—” আপনি মনে হয় আমাদের চিনেন।। ”

—” হুম।।রেয়ান অনেক বলেছে তোমার ব্যাপারে।। ”

—” ও ”

বলেই একটু হাসার চেষ্টা করলাম।।পরক্ষনে মাথা নিচু করে বসে রইলাম।।এমন অবস্থায় কি বলা উচিত জানি না।।তাছাড়া রেয়ানও কেমন।।আমাকে এখানে একা রেখে উনার যাওয়া কি ঠিক হলো?? মোটেও না!!

আমাকে চুপ থাকতে দেখে রেয়ানের বাবা আবার বললেন…..

—” রেয়ান তোমাকে বিয়ে করতে চায়।।সেটা তুমি জানো নিশ্চয়ই?? এখন তুমি কি চাও?? ”

উনার কথার কি উত্তর দিবো বুঝতে পারছি না।। আগের মতোই চুপ করে আছি।।আমার চুপ করা দেখে উনি মনে হয় কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছেন।।নিজের মতোইল করে আবার বলা শুরু করেন……

—” আমার ছেলে কেমন তা তো এত দিনে জেনে গেছো নিশ্চয়ই।।ও যেটা চায় সেটা ওর চায়ই-চায়।।সেটার জন্য তার যা করা লাগবে সে করতে রাজি।।এ-ই যেমন দেখো না,,,এত বড় বিজনেস আমার।।ও সেটা বাদ দিয়ে কি করছে,,,একটা সামান্য পুলিশের চাকরি!! আমার টাকা-পয়সার ওর কোনো লোভ নেই।।ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।।ওর কোনো কাজে আমি কখনও কোনো বাঁধা দেইনি।।এখনও দিবো না।। ও তোমাকে চায়।।ঠিক চায় না ওর তোমাকে প্রয়োজন।।বিয়ে করতে চায় তোমাকে।।জানি তুমি করতে চাও না।।আর ওকে হয়তো ভালোও বাসো না।।কিন্তু ও ভালোবাসে তোমাকে।।অনেক ভালোবাসে।।তবে এ-র জন্য কখনও নিজেকে পাল্টাবে না ও।। ও যেমন তেমনই ভালোবাসতে চায় তোমাকে।।তাই হয়তো তুমি ওর খারাপ রুপই বেশি দেখেছো।।কিন্তু বিশ্বাস করো,,,ওর মন অনেক ভালো।।ধীরে ধীরে তুমিও বুঝতে পারবে সেটা।। যাই হোক,,শেষে এতটুকুই বলব,,,আমার ছেলে খারাপ না।। তবে ও ওর ভালো দিকটা সহজে কাউকে দেখায় না।।অন্যদের খুঁজে নিতে হয় সেটা।।আশা করি তুমিও পারবে।।আর যদি পারো তাহলে আমার ছেলেটাকে একটু বুঝার চেষ্টা করো।।সত্যি যদি কখনও ওকে ভালোবেসে ফেলো,,তাহলে ফিরিয়ে দিও না ওকে।।খুব কষ্ট পাবে আমার ছেলেটা।। ”

বলেই তিনি চলে গেলেন সেখান থেকে।। আর আমি,,,এখনও মাথা নিচু করে বসে আছি।।মাথাটা কেন যেন ঘুড়ছে আমার।।

.
.
.

বাসায় এসেছি প্রায় ২০ মিনিট হতে চলল।।এখনও গাড়িতে বসে আছি আমি আর রেয়ান।।পিছনের সীটেই ঘুমিয়ে পড়েছে রিহান।।

বারবার খালি রেয়ানের দিকে চোখ যাচ্ছে আমার।।কিছু বলার ছিল তাকে।।খুব শান্ত কণ্ঠেই বললাম…….

—” আপনি যা করছেন তাতে তো আমার এটাই মনে হচ্ছে আপনি আমাকে জোড় করছেন বিয়ের জন্য।।”

কথাটা শুনে রেয়ান হাসলেন।।তারপর হালকা কণ্ঠে বললেন….

—” তোমার সেটা মনে হয়??ভালো!! ”

বলেই একটু থেমে গেলেন তিনি,,,তারপর আবার বললেন…..

—” সত্যি বলছি জোড় করব না তোমায়।।তুমি যখন চাবে তখনই বিয়ে করব।। আমি শুধু চেয়েছি আমার সম্পর্কে তুমি জানো।।আমার বাবার সাথে পরিচিত হও,, এটাই!! ”

—” ও ”

আমার ” ও ” বলার পরপরই রেয়ান আমার হাতে একটা চিঠি ধড়িয়ে দিলেন।।তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন……

—” তোমার যত প্রশ্ন আছে তুমি এ-ই চিঠি পেয়ে যাবে।।চিঠি পড়ার পর হয়তো রাগ করবে আমার উপর।।কিন্তু বিশ্বাস করো,, আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি।।ভুল করে হয়ে গেছে।।সত্যি বলছি!!পারলে মাফ করে দিও আমায়।।”

বলেই অন্যদিকে তাকালেন রেয়ান।।হয়তো চোখের পানি লুকাতে।।কিন্তু সে কি জানে,,আমি তার চোখের পানি দেখে ফেলেছি।।সাথে কিছু হারানোর ভয়ও!!

.
.
.
.
#চলবে??