হে সখা মম হৃদয়ে রহো পর্ব-৩৬ এবং শেষ পর্ব

0
207

#হে_সখা_মম_হৃদয়ে_রহো
#মুগ্ধতা_রাহমান_মেধা
#পর্ব ৩৬ (শেষ পর্ব)

দিন যায় রাত আসে।রাতের শেষে আবার দিন আসে।সময়ের পরিক্রমায় এভাবেই দিন পেরিয়ে সপ্তাহ হয়,সপ্তাহ গড়িয়ে মাস হয়।জীবনে হাসি-কান্না,দুঃখ-কষ্ট আসে-যায়, ব্যস্ততা আসে-যায়।কিন্তু ভালোবাসার কমতি হয় না।বরং বৃদ্ধি পায়।সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা ফিকে হয়ে যায় কথাটা ডাহা মিথ্যা।সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসার গাঢ়ত্ব বৃদ্ধি পায়।শুধু মানুষ দু’জন ভালোবাসতে পারলেই হলো।একে অপরকে চাওয়ার মাঝেই ভালোবাসা নিহিত।সংকল্প প্রতিজ্ঞা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে যাচ্ছে তারা একে অপরকে কতটা ভালোবাসে।প্রতিনিয়ত একে অপরকে উপলব্ধি করাচ্ছে কতটা চায় একজন আরেকজনকে।এই চাওয়াটাই যেনো দু’জনের বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করে তুলছে।ভালোবাসার গাঢ়ত্ব বৃদ্ধি করছে।প্রতিনিয়ত প্রমান করে যাচ্ছে ভালোবাসা সুন্দর,বড্ড সুন্দর।

অন্যদিকে,ফ্রাঞ্চিস প্রমাণ করে দিয়েছে কিছু কিছু অপ্রাপ্তির ভালোবাসাও ভীষণ সুন্দর।বিদেশীরা নাকি ভালোবাসতে জানে না।তারা শুধু শারীরিক চাহিদাতে মত্ত।কিন্তু এক সুদর্শন শেতাঙ্গ পুরুষ তা ভুল প্রমাণ করেছে।বাঙ্গালি নারীরা নাকি পিছিয়ে?কিন্তু এক বাঙ্গালি নারীকে ভালোবেসেই দেশ ছেড়েছে এক শেতাঙ্গ সুদর্শন পুরুষ।শুধুমাত্র ঐ বাঙ্গালিনীর ভালোবাসাতেই মজেছে সে।আজ সেই সুদর্শন পুরুষ ঐ বাঙ্গালিনীর অবশেষকে ঘিরেই বেঁচে আছে।সর্বশেষ স্মৃতিতেই নিজের চরম সুখ খুঁজতে মত্ত এই সুদর্শন পুরুষ।

শোনা যায়,রাইমা মা*রা যাওয়ার পরপরই ফ্রাঞ্চিস আর তার পুরো পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।ফ্রাঞ্চিসের এই আফসোস সারাজীবন থেকে যাবে যে এতো দেরী করে এই সিদ্ধান্ত না নিলে সে তার প্রেয়সীকে পেতে পারতো।এই আফসোস তাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।এই একটা কারনেই তো সে তার প্রেয়সীকে পায় নি।প্রেয়সীকে না পাওয়ার কারণটাকেই সে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে,পৃথিবী থেকে অস্তিত্ব মুছে দিয়েছে।অথচ ভাগ্যের পরিহাসে,কারণের সাথে সাথে তার প্রেয়সীর অস্তিত্বও আজ বিলীন।

পরিশেষে,কিছু ভালোবাসা এমনি হয়, জ্বলন্ত শিখার মতো, যা প্রকৃতি মেনে নিতে পারে না,মেনে নেয় না।অপূর্ণ ভালোবাসা সুন্দর, বিষন্ন সুন্দর।

——————-

ইদানীং প্রতিজ্ঞার শরীর তেমন ভালো যাচ্ছে না।রাতে ঘুম হয় না।চোখ ডেবে গেছে।কিছু খেতে পারছে না।কষ্ট করে খেলেও বমি করে উগড়ে দিচ্ছে সব।ক্ষণে ক্ষণে মাথা ঘোরায়।আঁশটে গন্ধ পায়।প্রতিজ্ঞা কাউকে কিছু বলে না।এড়িয়ে যায় নিজের অসুস্থতা।একবার কিছু একটা মাথায় এসেছিলো।পরক্ষণেই ভাবে এতো তাড়াতাড়ি সম্ভাবনা নেই।হয়তো স্ট্রিট ফুড খাওয়ায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হচ্ছে।

সংকল্প কোম্পানির কাজে দেশের বাহিরে আছে আজ এক সপ্তাহ।সাইদুল সাহেব অসুস্থ থাকায় এবার তিনি যাননি।সংকল্পকে পাঠিয়েছেন।এক সপ্তাহের জন্যই গিয়েছিলো।আজ ফেরার কথা।পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হবে।

আহমেদ মেনশনে সবাই একসাথেই খাবার খায়।সকালের খাবার খাওয়ার সময় সবার সামনেই প্রতিজ্ঞা বেসিনে ছুটে।যা খেয়েছিলো সব উগড়ে দেয়।শাশুড়িরা ছুটে তার পিছনে।মুখে, মাথায় পানি ছিটাতে থাকে।এর মধ্যেই জ্ঞান হারায় প্রতিজ্ঞা।শাশুড়িরা পাশে থাকায় মেঝেতে পড়ে না।তারা ধরে নেয়।

জ্ঞান ফেরার পর প্রতিজ্ঞা নিজেকে নিজের ঘরে আবিষ্কার করে।তার সামনে ডাক্তার বসে আছেন।পাশে দুই শাশুড়ী বসে আছেন।দুই শ্বশুরমশাই পায়চারি করছেন।সকলের চেহারায় আতংক স্পষ্ট।উদ্বিগ্ন হয়ে আছে সবাই।বিচ্ছু রাহিব-সাহিবকেও আজ উদ্বিগ্ন দেখা গেলো।শাশুড়ীদের সাহায্য নিয়ে উঠে বসে প্রতিজ্ঞা।

শাহআলম সাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“ডাক্তার, চুপ করে আছো কেনো?কি হয়েছে?”

মধ্যবয়স্ক ডাক্তার নাকের ডগার চশমাটা ঠেলে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“সমস্যা তো মারাত্মক।তার প্রতিকার একটাই।”

সমস্যা মারাত্মক শুনে সবার আতংক, ভয় যেনো মুহুর্তের মাঝেই কয়েকগুণ বেড়ে যায়।শাহআলম সাহেব ধমকে উঠেন।রুষ্টভাবাপন্ন হয়ে বললেন,
“হেয়ালি করবে না ডাক্তার।পরিষ্কার করে বলো।টেনশন দেওয়া তোমার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

ডাক্তার স্মিত হাসলেন।তিনি এবাড়ির পারিবারিক ডাক্তার। অনেক বছরের সম্পর্ক তাদের।প্রত্যেকের স্বভাব সম্পর্কে অবগত সে।তিনি বললেন,
“মিষ্টি খাওয়ান,তাহলে হেয়ালি করা ছেড়ে দিবো।”

ডাক্তারের কথায় শাশুড়ীরা যা বুঝার বুঝে গেলেন।তারা এটাই ধারণা করেছিলেন।আতংক দূর হয়ে চেহারায় জায়গা করে নিলো অনেকগুলা খুশী। তবে বুঝলেন না শাহআলম সাহেব।তিনি গর্জে উঠলেন,
“আমার মেয়েটা অসুস্থ আর তুমি মিষ্টি খেতে চাও?তোমার হেয়ালিপনা বন্ধ করো।”

“দাদা হবেন আপনি অথচ আমি মিষ্টি খেতে চাইতে পারি না?এটা অন্যায়।”

ডাক্তারের কথা উপস্থিত সকলে বিস্মিত হলেন।শাহআলম সাহেব বললেন,
“মানে?”
“মানে প্রতিজ্ঞা দু’মাসের প্রেগন্যান্ট।আপনি দাদাভাই হতে চলেছেন।”

ডাক্তারের কথা শুনে প্রতিজ্ঞা লজ্জায় মাথা নত করে ফেলে।শাহআলম সাহেব আচমকা এসে জড়িয়ে ধরেন ডাক্তারকে।খুশীতে আত্মহারা হয়ে বলেন,

“আহা ডাক্তার জীবনের প্রথম তুমি একটা ভালো খবর দিয়েছো।তোমাকে পুরো মিষ্টির দোকানটাই কিনে দিবো।চলো চলো।”

বলে ডাক্তার এবং ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন শাহআলম সাহেব।উদ্দেশ্য মিষ্টি বিলাবেন।

রাহিব-সাহিব তো খুশীতে আত্মহারা।তাদের একজন পার্টনার আসছে।দুই ভাই কোলাকুলি করে বলে,

“ভাই আমাদের টিমে সদস্য সংখ্যা বাড়তে বেশি দেরী নেই।”

তাদের কথায় হেসে উঠে সকলে।

শাশুড়ী দু’জন প্রতিজ্ঞাকে আদর করে চলে গেলেন।যাওয়ার আগে প্রতিজ্ঞা সবাইকে নিষেধ করেছে সংকল্পকে এই খবর যাতে কেউ না দেয়।

——-
সংকল্প ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে যায়।ক্লান্ত চেহারায় বাড়ি ফিরে সবাইকে ড্রয়িংরুমে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে চমকায় সে।খেয়াল করলো প্রতিজ্ঞা নেই এখানে।বাড়ির পরিবেশ থমথমে।মনের মধ্যে খারাপ চিন্তারা ঝেঁকে বসছে।খারাপ কিছু হয়েছে?প্রতিজ্ঞা?ও ঠিক আছে?”

ধীর পায়ে হেটে এসে ভরাট কন্ঠে শোধায়,
“কি হয়েছে?তোমরা এই সময়ে এখানে কেনো?থমথমে আছো কেনো সবাই?”

কেউ কিছু বললো না।সংকল্প অধৈর্য্য হয়ে গেলো।
“চুপ করে আছো কেনো?বলবে তো আমায় কি হয়েছে?প্রতিজ্ঞা কোথায়?মা প্রতিজ্ঞা নেই কেনো এখানে?”

জাহানারা বেগম কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন,
“ঘরে ঘুমাচ্ছে।ও অসুস্থ।”

প্রতিজ্ঞা অসুস্থ শুনতেই সংকল্প আঁতকে উঠে।বুকে কেমন চিনচিনে ব্যাথা অনুভূত হয়।কষ্টে ছেয়ে যাচ্ছে ভেতরটা।অনেক কষ্টে গলার বাহিরে শব্দ বের করে,
“কি হয়েছে ওর?”

জাহানারা বেগম কিছু বলার আগেই শাহআলম সাহেব এগিয়ে আসেন সংকল্পের দিকে।গম্ভীর স্বরে বলেন,
“তোমার জন্য মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”

সংকল্প হতভম্ব হয়ে গেলো।হতবিহ্বল স্বরে শোধালো,
“আমার জন্য?কি করেছি আমি?”
“তুমি জানো তুমি কি করেছো।”
“আমি সত্যিই কিছু করি নি।”
“তুমিই ওর অসুস্থতার জন্য দায়ী।”
“আমি?কি করেছি?কি হয়েছে ওর?”
“সেটা তুমি নিজেই জেনে নাও।”

বলে চলে গেলেন শাহআলম সাহেব।সংকল্প মায়ের দিকে দৃষ্টি ঘোরাতেই জাহানারা বেগম দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।একে একে সবাই নিজনিজ ঘরে চলে গেলেন।রেখে গেলেন হতবিহ্বল হয়ে থাকা সংকল্পকে।

সংকল্প ধীর পায়ে ঘরে আসে।তার মন বড্ড খারাপ।যতটা আনন্দ নিয়ে দেশে ফিরেছিলো,তার থেকেও বেশি বিষাদ ছড়িয়ে গেছে বুকে।ঘরে আসতেই দেখলো প্রতিজ্ঞা সজাগ।বসে আছে বিছানায়। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে প্রতিজ্ঞাকে।চোখ দেখে মনে হচ্ছে এখনই কেঁদেকেটে বন্যায় ভাসিয়ে দিবে।বারবার একটাই কথা বলে চলেছে,

“কিছু হবে না তোমার।সব ঠিক হয়ে যাবে।আমি ঠিক করে দিবো।তুমি সবসময় আমার সাথেই থাকবে।”

একসপ্তাহ পর প্রাণপুরুষের স্পর্শ পায়,ঘ্রাণ নেয় প্রতিজ্ঞা।আবেশে আবেশিত হয়ে যায়।মুহুর্তটা অনুভব করে সে।অনেকক্ষণ পর নিজেকে ছাড়ায় প্রতিজ্ঞা।সংকল্পকে উদ্দেশ্য করে মন খারাপ করে বলে,

“আমি স্যরি সংকল্প।আমি কখনো মা হতে পারবো না।আপনাকে সন্তানসুখ দিতে পারবো না।আপনি চাইলে অন্য জায়গায় বিয়ে করে নিতে পারেন।আমি আপত্তি করবো না ”

প্রথম কথাগুলোয় সংকল্পের তেমন ভাবান্তর না ঘটলেও শেষের কথাগুলো তার মধ্যে রাগের সঞ্চার করলো।চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।কপালের রগগুলো দপদপ করে ফুলতে শুরু করলো।তবে প্রতিক্রিয়া করলো না।নিজেকে বুঝালো মেয়েটা আবেগের বসে বলেছে।প্রতিজ্ঞা তার প্রাণপুরুষের হঠাৎ রেগে যাওয়া পরক্ষণেই রাগ হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া সবটাই অবলোকন করলো।অপেক্ষা করছে সংকল্পের প্রতিক্রিয়ার।
সংকল্প প্রতিজ্ঞাতে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।শান্তস্বরে বললো,
“এটাই তোমার অসুস্থতা?”

প্রতিজ্ঞা মাথা উপর নিচ করলো। সংকল্প আবার বললো,
“শুধু আমার সাথে তুমি সারাজীবন পার করতে পারবে না?শুধু আমি আর তুৃমি?”
“পারবো।” দৃঢ় কন্ঠে জবাব প্রতিজ্ঞার।

সংকল্প তখন প্রতিজ্ঞার কপালে আলতো পরশ এঁকে দেয়।হাতদুটো নিজের মুঠো বন্দি করে।আদুরে স্বরে বলে,

“তেমনি আমিও সারাজীবন তোমার সাথে নির্দ্বিধায় জীবন পার করতে পারবো।আমার তৃতীয় কারো প্রয়োজন নেই।আমার শুধু তোমাকে প্রয়োজন।
তুমি আমার কাছে অসম্ভবভাবে পাওয়া একটা রত্ন।আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন,এই শুকরিয়াই শেষ করতে পারবো না কোনোদিন।আমি তোমাতেই পরিপূর্ণ।আমার আর কাউকে লাগবে না।যা হয় ভালোর জন্যই হয়।মন খারাপ করো না।”

সংকল্পের কথায় প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো প্রতিজ্ঞার চেহারায়।প্রশান্তির শিহরণ বয়ে গেলো শরীর দিয়ে।আবারো প্রমাণ হয়ে গেলো তার প্রাণপুরুষ তাকে বড্ড বেশি ভালোবাসে।সে জড়িয়ে ধরলো সংকল্পকে।তবে সাথে সাথেই ছেড়ে দিলো।উঠে গিয়ে সংকল্পের গলা জড়িয়ে তার কোলে বসলো।সংকল্পও তার প্রেয়সীকে আগলে নিলো।প্রতিজ্ঞা সংকল্পের কপালে আলতো পরশ এঁকে দিয়ে সংকল্পের একটা হাত নিজের পেটের উপর রেখে বললো,
“মিস্টার সংকল্প!”
“ইয়েস,মিসেস সংকল্প।”
“গেট রেডি টু বি অ্যা ফাদার,গেট রেডি টু এনজয় ফাদারহুড ফর লাইফটাইম,গেট রেডি টু ফিল দ্য বিউটি অব প্রেগ্ন্যান্সি।”
“মানে?”

সংকল্প বড় বড় চোখে হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে প্রতিজ্ঞার দিকে।বোঝা যাচ্ছে সে সমীকরণ মেলাতে পারছে না।প্রতিজ্ঞার ঠোঁটে হাসি।সে আবার দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
“মানে ইয়্যু আর গোয়িং টু বি ফাদার।আপনি বাবা হতে চলেছেন।”

সংকল্প যেনো অবাক হতেও ভুলে গেলো।
“তাহলে এতোক্ষণ কি চলছিলো?”
“কিডিং!”

বিষয়টা বুঝতে সময় লাগলো সংকল্পের।প্রতিজ্ঞা খিলখিলিয়ে হাসছে।অজস্র ঠোঁটের ছোঁয়া দিলো প্রতিজ্ঞার মুখশ্রীতে।জড়িয়ে ধরলো প্রতিজ্ঞাকে।প্রতিজ্ঞাও সংকল্পের পিঠে হাত রাখলো।অনেকক্ষণবাদে প্রতিজ্ঞা নিজ কাঁধে গরম জলের উপস্থিতি টের পেলো।বুঝলো সংকল্প ফোপাঁচ্ছে।
“আপনি কাঁদছেন কেনো?খুশি হন নি?”
“কিছু মুহূর্তের জন্য তোমাকে হারানোর চিন্তারা মাথায় ঝেঁকে বসেছিলো।আমি বাবা হবো,আমাকে কেউ বাবা ডাকবে আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না।কিভাবে আনন্দ প্রকাশ করবো বুঝতে পারছি না।সারা বাড়িতে ছোট একটা মানুষ ঘুরে বেড়াবে,মাতিয়ে রাখবে বাড়িটা।আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছি না বউ।”
“আমাদের ভালোবাসার পূর্ণতা আসছে সংকল্প।এটা সত্যি!”

———————
রাত তিনটে!
নয় মাসের উঁচু পেটটা নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে আমের আচার খাচ্ছে প্রতিজ্ঞা।শুধু আমের আচার না,তার সামনে হরেক রকমের আচার রাখা আছে।একটু একটু করে সবগুলো থেকেই খাচ্ছে সে।একটু আগেই আইসক্রিম খেয়েছে।প্রতিজ্ঞার সামনেই এক হাতে ভর দিয়ে বউকে দেখে যাচ্ছে সংকল্প।এটা তার প্রতিদিনকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।গত কয়েকমাস যাবৎ অফিসের থেকে বাসায় বেশি সময় থাকে।অফিসে যায় না বললেই চলে।বউয়ের খেয়াল রাখা প্রধান দায়িত্ব।গত কয়েকমাস সে নির্ঘূম রাত পার করেছে।একটু পরপর প্রতিজ্ঞা এটা ওটা খাওয়ার বায়না ধরে,এগুলো এনে দেওয়া, প্রতিজ্ঞার অস্বস্তি হলে বুকের মাঝে নিয়ে সারারাত পার করে দেওয়া,তাকে খাবার খাইয়ে দেওয়া,গোসল করানো,হাটতে সাহায্য করা সব সংকল্পের দায়িত্ব।

সংকল্পকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে দেখে প্রতিজ্ঞা আচারের বাটি টা সংকল্পের দিকে এগিয়ে দিলো।

“নিন খান।তবুও লো*ভ দিবেন না।পরে আপনার মেয়েরা ছিহ ছিহ করবে, তাদের বাবা তাদের খাবারে লো*ভ দেয়।”

সংকল্প ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।সে তার মেয়েদের খাবারে লো*ভ দিচ্ছে!বলে কি এই মেয়ে!

“আমি আমার মেয়েদের খাবারে লো*ভ দিচ্ছি?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ”

মুখে আচার পুড়ে বলে প্রতিজ্ঞা।সংকল্প ভ্রু কুঁচকায়।
“খাবার গুলো বুঝি আমার মেয়েরা খায়?এই যে মধ্যরাতে ফুচকা,চটপটি,ঝালমুড়ি,আইসক্রিম, আচার, চিপস খাওয়ার ক্রেভিংস হয়,এগুলা কি আমার মেয়েরা খায়?”

সংকল্পের প্রশ্নের বিপরীতে প্রতিজ্ঞা চোখ পিটপিট করে তাকায় সংকল্পের দিকে।ঠোঁট উল্টায়,

“আমার কি দোষ রাতে আমার বেশি বেশি ক্ষিধে পায়।মনে হয় সব খেয়ে ফেলি।মাঝে মাঝে তো ইচ্ছা করে আপনাকেও খেয়ে ফেলি।আপনাকে এতো ইয়াম্মি ইয়াম্মি লাগে।নেহাতই আমার মেয়েরা বাবাকে বেশি ভালোবাসে,তাই খেতে পারি না।”

প্রতিজ্ঞার কথায় সংকল্পের মুখটা সেন্টি ইমুজির মতো হয়ে যায়।প্রতিজ্ঞা আবার বলতে শুরু করে,
“আর আমি এতো খাই বলেই তো আপনার মেয়েরা হেলদি।ডাক্তার বলেছে শুনেন নি?”
“এতোটাই হেলদি যে আমার বউয়ের নড়তে কষ্ট হয়,হাটতে কষ্ট হয়।”
“আহা!আপনি আছেন না।আপনি তো সাহায্য করেন।”
“হয়েছে,এখন আর খেতে হবে না।অনেক খেয়েছো।ঘুমাও তো।আমার মেয়েদের রাত জাগতে কষ্ট হয়।ঘুমাও।”

প্রতিজ্ঞার হাত থেকে আচারের বাটি নিয়ে টিস্যু দিয়ে হাত, মুখ মুছে দিতে দিতে বলে সংকল্প।প্রতিজ্ঞা গাল ফুলায়।

“কি হয়েছে ঘুৃমাচ্ছো না কেনো?”
“আপনার মেয়েরা আপনাকে না জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারে না।আপনি জানেন না?”

সংকল্প অধর প্রসারিত করে।পাশে এসে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে প্রতিজ্ঞার মাথারা নিজের বুকে রেখে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
“আমার মেয়েরা বলেছে বুঝি?”
“হ্যাঁ বলেছে তো।”
“আর কেউ বলে নি?”
“সবাই বলেছে।”

প্রতিজ্ঞার কথার বিপরীতে সংকল্প ঠোঁটে কার্ণিশে হাসির ঝলক দেখা দেয়।আর কোনো কথা হয় না।সংকল্প টের পায় তার বউ বাচ্চাদের মতো ঘুমাচ্ছে।সে হেলান দিয়ে বউকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকে।একটাসময় পর তার চোখ লেগে যায়।

আল্ট্রাসোনোগ্রাফির মাধ্যমে জানা গেছে প্রতিজ্ঞার মেয়ে হবে।শুধু একজন নয়,দুইজন আসবে পৃথিবীতে।তারা জমজ।ডাক্তার জানিয়েছেন বাচ্চারা সুস্থ আছে।তারা সুস্থ স্বাস্থ্যের অধিকারী।কিন্তু এতে প্রতিজ্ঞার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।ছয়-সাত মাস থেকে তার হাঁটাচলায় কষ্ট হয়,নড়তে কষ্ট হয়।সবকিছুতে সংকল্পের সাহায্য লাগে।তবে তাতে একটুও বিরক্তবোধ করে না সংকল্প।তার মতে,এটা গর্ভকালীন সময়ের সৌন্দর্য।মায়েরা বাচ্চা গর্ভে ধারণ করে,আর বাবারা মায়েদের সাহায্য করে।নির্ঘুম রাত্রীযাপন করে সবকিছুতে মায়েদের সাহায্য করে।এটাই বিউটি অব প্রেগন্যান্সি।

সংকল্পের ঘুম ছুটে যায় প্রতিজ্ঞার আর্তনাদে।সে আহাজারি করছে।সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার।সংকল্প আঁতকে উঠলো।নিজেকে ধাতস্থ করতে পারছে না।ভয় হচ্ছে প্রচন্ড।
প্রতিজ্ঞাকে আগলে নিলো।

“প্রতিজ্ঞা কি হয়েছে?বেশি ব্যাথা করছে?প্রতিজ্ঞা?”

প্রতিজ্ঞা কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই।সে সংকল্পকে খামচে ধরে আছে।সংকল্প সব দেখে বুঝলো ওয়াটার ব্রেক করেছে।

হাসপাতালের করিডোরে পায়চারি করছেন শাহআলম সাহেব।অন্যরা থমথমে মুখে বসে আছেন।সংকল্প প্রতিজ্ঞার সাথে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে।প্রতিজ্ঞার শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ।যেকোনো সময় খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে।

কিছুক্ষণ আগের কথা,

প্রতিজ্ঞাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।সংকল্প নতমস্তকে বসে ছিলো।অতিরিক্ত চিন্তায় মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে গেছে।কিছু ভাবতে পারছে না।এসির মধ্যে থেকেও শরীর ঘেমে চিপচিপে হয়ে গেছে।তখনই ডাক্তার এসে জানান,
“পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিকেল।হয় মা বাঁচবে নাহয় বাচ্চারা বাঁচবে।আমরা যেকোনো একজনকে বাঁচাতে পারবো।”

ম*রার উপর খারার ঘা যাকে বলে।আতংকের মধ্যে আরো বিশাল ভয় চেপে ধরেছে।বজ্রপাতের মতো আঘাত হানলো ডাক্তারের শব্দগুলো।কেমন বিচ্ছিরি শোনালো।মানুষ হারানোর ভয় ঝেঁকে বসেছে।সংকল্পের অবস্থা করুণ।

ডাক্তার আবার বললেন,
“কি করবো আমরা?”
“প্রতিজ্ঞাকে বাঁচান।আমার বাচ্চা লাগবে না।শুধু প্রতিজ্ঞা থাকলেই হবে।আমি ওর সাথেই সারাজীবন অনায়াসে পার করে দিতে পারবো।প্লিজ প্রতিজ্ঞাকে বাঁচান।”

ডাক্তারের সামনে মনের সব আকুতি ঢেলে দিলো সংকল্প।তার চোখে জল।ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।আর কিছু না বলে চলে যেতে নিলে সংকল্প করুণ কন্ঠে বলে,

“ডক্টর,আমি ভেতরে যেতে পারি?প্লিজ?”
“আপনাকে দেখে নার্ভাস লাগছে। না যাওয়াই ভালো।কি থেকে কি হয়ে যাবে।আপনি নিজেকে শক্ত করুন।”
“প্লিজ ডক্টর!”

সংকল্পের আকুতি ফেরাতে পারলেন না ডাক্তার।তার ভেতরেও তো ভালোবাসা নামক শব্দটা কাজ করে।তিনি রাজি হয়ে গেলেন।তখন থেকেই সংকল্প ভেতরে আছে।

অপারেশন থিয়েটারের দরজার উপর লাগানো ভয়ানক রক্তিম রঙের আলোটা নিভে গেলো।সবাই উঠে দাঁড়ালেন।ভেতরে ভয়,কাকে হারিয়েছেন তারা!কে আছে!বাচ্চারা কি পৃথিবীর আলো দেখতে পেলো না?নাকি প্রতিজ্ঞা পৃথিবী ত্যাগ করলো!নানানরকম ভয়ানক প্রশ্ন ভেতরটা ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে সবার।কি হতে চলেছে!কি হবে একটু পরে!

ভয়ানক ভাবনার মধ্যেই সংকল্প বেরিয়ে এলো।চোখে জল।তার হাতে তোয়ালে দিয়ে ঘিরে রাখা একটা বাচ্চা।সংকল্পের পেছন পেছন একজন নার্স বেরিয়ে এলো।তার কোলেও একটা বাচ্চা।নার্স এগিয়ে এসে জাহানারা বেগমের কাছে বাচ্চাটাকে দিয়ে দেয়।
হাসিমুখো বলে,
“দু’টো নাতনি পেয়েছেন,ডাবল মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু।”

বলে আবার ভেতরে চলে যায় সে।কিন্তু নার্সের কথায় কেউ খুশি হতে পারেন নি।সবার মনে বিষাদ ছেয়ে যায়।কাউকে চিরতরে হারানোর বিষাদ।পরিবারে দু’টো মানুষ আসলেও তারা কেউই খুশি হতে পারছেন না।

শাহআলম সাহেব খুব কষ্ট করে সংকল্পের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।নিজের ডান হাত রাখে সংকল্পের কাঁধে।তিনি ছেলের মনের অবস্থা বুঝার চেষ্টা করছেন।কিভাবে জিজ্ঞাসা করবেন প্রতিজ্ঞার কথা!তবুও তো একটাবার জিজ্ঞাসা করতেই হয়।বাবার স্পর্শ পেয়ে সংকল্প তাকায় বাবার দিকে।হাসি দিয়ে বলে,
“বাবা দেখো, আমিও বাবা হয়ে গেছি।আমার সন্তান।আমাকেও কেউ বাবা ডাকবে।”

ছেলের খুশির বিপরীতে অধর প্রসারিত করলেন শাহআলম সাহেব।প্রলম্বিত শ্বাস নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“প্রতিজ্ঞা কেমন আছে?”

মেয়ের দিকে চোখ আবদ্ধ রেখেই সংকল্প বললো,
“এখনই কেবিনে ট্রান্সফার করা হবে।কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরবে।”

কথাটা যেনো মরুভূমির বুকে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো সুখ দিলো।শান্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সবাই।মুহুর্তের মাঝেই আনন্দরা ঘিরে ধরলো সবাইকে।খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে চারিদিকে।এ যেনো সুখ,বড্ড সুখ,অকথ্য সুখ।কতবছর পর বাড়িতে নতুন অতিথি এলো।সবাই ব্যস্ত হয়ে গেলো তাদের নিয়ে।

প্রতিজ্ঞাকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে অনেকক্ষণ।বাচ্চারা তাদের নানু-দাদুর কাছে।ওদের জন্য আলাদা কেবিন নেওয়া হয়েছে।প্রতিজ্ঞার পাশে শুধু সংকল্প আছে।প্রতিজ্ঞার ডান হাতটা নিজ পুরুষালি হাতের মুঠোয় নিয়ে তাতে গাল ঠেকিয়ে আছে সংকল্প।দৃষ্টি প্রতিজ্ঞার ঘুমন্ত মুখশ্রীতে নিবদ্ধ।সংকল্প দেখলো প্রতিজ্ঞার চোখের পাতা নড়ছে।হাতের আঙ্গুলগুলো নড়ছে।জ্ঞান ফিরেছে প্রতিজ্ঞার।চোখ খুলে আশপাশে তাকায় প্রতিজ্ঞা।সংকল্প ব্যতীত আর কাউকে দেখতে পায় না সে।অপারেশন থিয়েটারে তার আবছা জ্ঞান থাকায় কিছু কথা অস্ফটসুরে তার কানে যায়।এখন বাচ্চাদের না দেখতে পেয়ে মনে ভয় ঢুকে পড়ে।বাচ্চারা কোথায়!সে উঠে বসতে চায়লে সংকল্প তাকে বাঁধা দেয়।বসতে দেয় না।তার চোখের কার্ণিশ বেয়ে অশ্রু নামক জল বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।ঢোক গিলে কষ্ট করে শোধায়,

“সংকল্প,আমার মেয়েরা কোথায়?
ওরা কি নেই?”

সংকল্প ঝুঁকে প্রতিজ্ঞার কপালে গাঢ় পরশ দিলো।বললো,
“পাশের কেবিনে আছে।সুস্থ আছে।”

প্রশান্তির নি:শ্বাস ফেলে প্রতিজ্ঞা।মুহুর্তের জন্য মরণ বিসাদ ছুঁয়ে দিয়েছিলো তাকে।

সংকল্প ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বললো,
“জানো ওরা একদম ফুটন্ত পদ্মফুলের মতো।এতো মিষ্টি মাশাআল্লাহ।এতো ছোট ছোট হয়েছে ওরা।আঙ্গুল গুলো ঠিক এতোটুকু।পাগুলোও এই একটুখানি।হাতটা না আমার এই আঙ্গুলের চেয়েও ছোট।আমি যখন ওদের কোলে নিলাম,এমন মনে হচ্ছিলো যেনো পরা ফাঁক দিয়ে পড়ে যাবে।আমার হাতগুলো কাঁপছিলো।”

প্রতিজ্ঞা খেয়াল করলো সংকল্পের চোখে জল।বাবা হওয়ার অনুভূতিটাই অন্যরকম।একদম ছোট বাচ্চাদের মতো করে কথা বলছে সংকল্প।প্রতিজ্ঞা কিঞ্চিত হাসলো।

“আমি দেখবো ওদের।আমার কাছে নিয়ে আসুন।”
“খুশিতে ভুলেই গেছিলাম তোমাকে দেখানোর কথা।”

হাসি দিয়ে কথাটা বলে পাশের কেবিনে চলে যায় সংকল্প।ফিরে আসে বাচ্চাদের নিয়ে।একজন তাসলিমা বেগমের কোলে আরেকজন জাহানারা বেগমের কোলে।নাতনীদের নিয়ে এখনই খেলা শুরু করে দিয়েছেন তারা।প্রতিজ্ঞার কাছে এসে বাচ্চাদের দেখায় তারা।প্রতিজ্ঞা কোলে নিতে চায়লে তার দু’পাশে দু’জনকে শুইয়ে দেওয়া হয়।তাসলিমা বেগম জাহানারা বেগমকে কিছু একটা ইশারা করলে তারা বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।কেবিনে শুধু সংকল্প,প্রতিজ্ঞা আর তাদের বাচ্চারা।
সংকল্প মেয়েদের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির স্বরে বলে,

“মেয়েরা,মিট মাই বিউটিফুল ওয়াইফ।সম্পর্কে সে তোমাদের মা হয়।এতোদিন আমার বউকে বড্ড জ্বালিয়েছ।এখন একদম জ্বালাবে না।ভালো হয়ে থাকবে বুঝলে!”

বাবার কথা ওরা বুঝলো কিনা কে জানে।দু’জনেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।প্রাণপুরুষের পা গলামো মনভরে দেখলো প্রতিজ্ঞা।মেয়েদের দু’হাতে আগলে নিয়ে বললো,
“আমার আয়েন্দ্রি,আমার আভিতা।

সংকল্প সরু চোখে তাকালো।
” উমমমম!বলেছি না প্রীতিশা,প্রাচী।”

প্রতিজ্ঞা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।পেটে চাপ দিয়ে বললো,
“আমার কথা-ই সই।আমার মেয়ে।”
সংকল্প গাল ফুলালো,
“আমার মেয়ে,আমার যাই বলি তাই হবে।”

—————–

পাঁচ বছর পর,

প্রতিজ্ঞা হাতে খাবার নিয়ে হাঁটছে। হাঁটছে বললে ভুল হবে খুঁজছে।নিজের মেয়েদের।রাহিব-সাহিবের সাথে থাকতে থাকতে এই দু’জনও বিচ্ছুদের শিরোমণি হয়েছে।সারাদিন রাহিব-সাহিবের সাথে থাকে।রাত হলে বাবা-মার কথা মনে পড়ে তাদের।তাদের নামগুলো তাদের মতোন ভীষণ মিষ্টি।একজন আয়েন্দ্রি আহমেদ প্রীতিশা,আরেকজন আভিতা আহমেদ প্রাচী।প্রীতিশা প্রাচীর থেকে গুণে গুণে পনেরো সেকেন্ডের বড়।

রাহিব-সাহিব এখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র।লেখাপড়ার চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে বর্গমূল হারে তাদের ডোজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।এখন তো আবার নতুন দু’জন সদস্য যোগ হয়েছেন।তারা চাচ্চুদের নেওটা।যা বলে তাই করে।ছুটির দিনে সারাদিন চাচ্চুদের সাথে থাকে।

প্রতিজ্ঞা সারাবাড়ি খুঁজেও তাদের পেলো না।বুঝলো কোথায় আছে তারা।বাগানে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দু’বোনের আস্তানা।রাহিব-সাহিব না থাকলে ওখানেই পাওয়া যায় দু’বোনকে।ড্রয়িংরুমে প্রতিজ্ঞার দেখা হলো সংকল্কের সাথে।সে কোথাও গিয়েছিলো,মাত্রই ফিরলো।প্রতিজ্ঞাকে ছুঁটতে দেখে কারণ জানতে চাইলো।
“ছুটছো কেনো এভাবে?”
“জানেন না বুঝি কেনো ছুটছি?”

কোমড়ে হাত দিয়ে বলে প্রতিজ্ঞা।সংকল্প স্মিত হাসলো,
“তা তো জানিই।কোথায় এখন দু’জন?”
“বাড়িতে তো পেলাম না।বাগানের আছে হয়তো।চলুন দেখে বসি।”
“চলো।”

দু’জন বাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।প্রতিজ্ঞা গিজগিজ করতে করতে বললো,

“এদের জ্বালায় আমি আর বাঁচি না।সারাটাদিন টই টই করে।এক জায়গায় রেখে গেলে পাঁচ মিনিটের মাথায় এসে আর তাদের টিকিটাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
আর সঙ্গে জুটেছে রাহিব-সাহিব।যেমন চাচ্চুরা তেমন তাদের ভাইজিরা।পুরাই খাপে খাপ, ময়নার বাপ।”

প্রতিজ্ঞার কথা শুনে সংকল্প শব্দ করে হেসে উঠলো।পা থেমে গেলো প্রতিজ্ঞা।মুখ খিঁচিয়ে বললো,
“আপনি হাসছেন?হাসি পাচ্ছে আপনার?”
“হাসি কন্ট্রোল করতে পারছি না।”

আবারো হেসে ফেললো সংকল্প।প্রতিজ্ঞার রাগ তর তর করে বেড়ে গেলো।হাটতে শুরু করলো আবার।
“হাসেন হাসেন।বেশি করে হাসতে থাকেন।এই বাবা, মেয়েদের জ্বালায় আমার বেহাল দশা।
খাবার খাওয়ানোর জন্য রুমে বসিয়েছি,খাবার নিয়ে এসে দেখি একজনও নেই।পুরো বাড়ি ফাঁকা।আর এখানে তিনি হাসছেন।”

বলতে বলতে থেমে গেলো প্রতিজ্ঞা।সংকল্পকে ইশারা করে দেখালো,
“ঐ যে আপনার রাজকুমারীরা।”

ঐ তো প্রীতিশা আর প্রাচী।একজন ফুল কুড়াচ্ছে।আরেকজন পানির পাইপ দিয়ে গাছে পানি দিচ্ছে।ছোট ছোট অপরিপক্ক হাতে পানি দেওয়ায় নিজেও ভিজে গেছে।এই বিচ্ছু দু’জনের একটা ভালো দিক আবিষ্কার করেছে প্রতিজ্ঞা।সেটা হলো দু’জনই ফুলপ্রেমী।ফুল তাদের খুবই পছন্দের।

সংকল্প প্রতিজ্ঞা এগিয়ে গেলো তাদের দিকে।প্রচাী মা-বাবাকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো।সংকল্পও হেসে মেয়েকে আগলে নিলো।প্রাচীর এক হাতে কৃষ্ণচূড়া আরেক হাতে হলুদ গোলাপ।কৃষ্ণচূড়া ফুলটা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“পাপাই এতা তোমাল।”

প্রতিজ্ঞা চোখ পাকিয়ে বললো,
“বাবাকে ফুল দেওয়া।আর আমার কোথায়?এই কাদের জন্য আমি এতো কষ্ট করি সারাদিন।নয় মাস পেটে ধরলাম আমি আর বেরিয়েছে বাবার মতো।বাবাকে পেলে আর আমার কথা মনে থাকে না।হায় আল্লাহ!”

মায়ের কাঁদো কাঁদো স্বর শুনে প্রাচী বাবার দিকে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।তারপর হলুদ গোলাপটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিলো।
“এতা তোমাল মাম্মাম।”

প্রতিজ্ঞা চেহারায় হাসি ফুলালো।মেয়ের গালে জোরে চুমু খেয়ে বললো,
“আমার সোনা মাম্মাম”

বলে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলো আরেকজন চোখ গরম করে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বুকে হাত গুঁজে আধভেজা শরীরে ঠোঁট উল্টিয়ে রেখেছে।প্রতিজ্ঞা সংকল্প একে অপরের দিকে তাকালো।বুঝলো প্রীতিশা রাগ করেছে।প্রাচী সংকল্পের কোলে উঠে প্রীতিশার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

“তোমলা আভিকে আদল কললে কেনো?পাপাই নামাও ওকে,নামাও।আমি কিন্টু কান্না কলে দিবো।নামাও পাপাই।”

মেয়ের রাগী কন্ঠে প্রতিজ্ঞা মেয়েকে টুক করে কোলে নিয়ে নিলো।
“ওলে আমার প্রীতিশা,সোনাবাচ্চা।মাম্মামের কোলে এসো।বোন পাপার কোলে,তুমি মাম্মামের কোলে।”

মেয়ের রাগ সম্পূর্ণ না কমলেও কিছুটা কমেছে।সে প্রাচীর দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে রইলো।সংকল্প বুঝলো মেয়ের রাগ এভাবে কমবে না।সে প্রাচীকে আদুরে স্বরে বললো,

“পাপাই তুমি তো ভালো মেয়ে।তুমি এখন মাম্মামের কোলে যাও।পাপাই প্রীতিকে কোলে নেই?নাহয় তো প্রীতি রাগ করবে তোমার সাথে।আর কথা বলবে না।তুমি কি চাও বোন তোমার সাথে কথা না থাকুক?”

প্রাচী বুঝলো।মাথা নাড়ালো।অর্থাৎ সে চায় না প্রীতিশা রাগ করুক।সে বাধ্য মেয়ের মতো মায়ের কোলে চলে গেলো।সংকল্প প্রীতিশাকে কোলে নিলো।এবার প্রীতিশা খুশিতে আত্মহারা।বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো।প্রাচীর দিকে তাকিয়ে বললো,
“পাপাই আমাল।”

প্রাচী হিহি করে হেসে বললো,
“পাপাই আমাদেল।”

এরমধ্যে প্রতিজ্ঞা গাল ফুলালো।
“আমি কার?”

দুই বোন একসাথে হেসে উঠলো।বললো,
“তোমাকে আমলা চিনি না।”

মেয়েদের কথায় উচ্চস্বরে হেসে ফেললো সংকল্প।প্রতিজ্ঞা রাগী চোখে তাকিয়ে বললো,
“বাপের লেজ কোথাকার!”

——–

ঘড়ির ঘন্টার কাঁটাটা বারোটার দখলে।একটু আগেই প্রীতিশা,প্রাচী ঘুমালো।পরক্ষণেই প্রতিজ্ঞা বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে।দমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে তাকে।টের পেলো তার খোঁপা করা চুলগুলোকে কেউ খুলে দিলো। দু’টো বলিষ্ঠ হাত তার শাড়ীর আঁচল গলিয়ে পেছন থেকে বন্দী করে ফেললো তাকে।মুখ ডুবালো তার খোলা চুলে।অভিমানী স্বরে বললো,
“মেয়েরা এসে তো তোমার হৃদয়ের ভাগ নিয়ে নিলো বউ।”

প্রতিজ্ঞা মুচকি হাসলো।বললো,
“জেলাস?”
“অনেক বউ অনেক।”

প্রতিজ্ঞা চমৎকার হাসলো।পেছন ঘুরে দাঁড়ালো।গলা জড়িয়ে ধরলো সংকল্পের।
“আমার হৃদয়ে আপনি ছিলেন,আছেন আর থাকবেনও।আধিপত্য বলুন আর রাজত্ব বলুন দুটোই আপনার।”

সংকল্প নাকে নাক ঘষে বললো,

“জানি তো। তবুও বারবার তোমার মুখ থেকে শুনতে ভাল্লাগে।শান্তি শান্তি অনুভব হয়।এমন মনে হয় যেনো এক দমকা হাওয়ার বদলে এক দমকা শান্তি এসে ভর করে আমাতে।এত্তোগুলা ভালোবাসি বউ।
সংসারের এতো কাজ,আমাদের মেয়েদের খেয়াল রাখা,আমার খেয়াল রাখা, আমার পরিবারের লোকদের খেয়াল রাখার জন্য ধন্যবাদ।এতো ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে হৃদয় দেওয়ার জন্য অনেকগুলা ভালোবাসা তোমাকে বউ।”

প্রতিজ্ঞা স্মিত হাসলো।বললো,
“আপনার উপর আমার সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ,প্রাণপুরুষ।আমার ভালোবাসা গ্রহণ করার জন্যেও আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।”ভালোবাসি” শব্দটাও কেনো যে আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হয়।আপনাকে “ভালোবাসা”-র থেকেও বেশি ভালোবাসি আমি।”

প্রতিজ্ঞা গুনগুনিয়ে উঠলো,
“নাথ, তুমি এসো ধীরে
সুখ-দুখ-হাসি নয়ননীরে লহো
আমার জীবন ঘিরে
সংসারে সব কাজে ধ্যানে জ্ঞানে হৃদয়ে রহো
হে সখা, মম হৃদয়ে রহো”

#সমাপ্ত