হে_সখা_মম_হৃদয়ে_রহো পর্ব-০৭

0
169

#হে_সখা_মম_হৃদয়ে_রহো
#মুগ্ধতা_রাহমান_মেধা
#পর্ব ০৭

প্রতিজ্ঞার জ্ঞান ফিরে ভোরবেলায়।যখন ঝড়ের বিরাট তান্ডব শেষে প্রকৃতি শান্ত হয়।বৃষ্টিভেজা স্নিগ্ধ ভোর।কিন্তু কিছু মানুষের জীবন অগোছালো হয়ে আছে।ভাগ্য সহায় হয় নি।প্রতিজ্ঞার জ্ঞান ফেরার পরে নিজেকে নিজের বিছানায় আবিষ্কার করে।পাশে মা-বাবা,ভাই-ভাবীকে দেখে প্রথমে অনেকটা অবাক হয়।মাথাটা কেমন জানি করছে।একটু সময় পাড় হতেই গতকাল রাতের সবকিছু মনে পরে যায় তার।রাগে-কষ্টে ভিতরটা পু*ড়ে যাচ্ছে।সে জোরে চিৎকার করে উঠলে সবার ঘুম ছুটে যায়।কখন যে চোখ লেগে গেছে বুঝতে পারে নি কেউই।
প্রতিজ্ঞার মা-বাবা তাকে আগলে নিলেন।প্রতিজ্ঞা কাঁদছে। বাবা তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
“মা কেঁদো না।নিজেকে সামলাও।সব ঠিক হয়ে যাবে।তোমার এই কষ্ট আমরা মেনে নিতে পারছি না।তুমি তো জানো মা তুমি আমাদের বাড়ির প্রাণভোমরা।এখন তোমার কিছু হয়ে গেলে আমরা কি নিয়ে বাঁচবো বলো?”

প্রতিজ্ঞা বাবাকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কাঁদতে কাদঁতে বললো,
“বাবা,এমনটা কেনো হলো?আমার কি অপরাধ ছিলো?আমার মধ্যে কিসের কমতি ছিলো?বলো না বাবা?ঐ মেয়েটা আমার থেকে বেশি সুন্দর? বেশি ভালোবাসে সংকল্পকে?কেনো এমন হলো আমার সাথে বাবা?কিসের কমতি ছিলো আমার?”

প্রতিজ্ঞার বাবার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।কিছু বলতে পারলেন না মেয়েকে।
প্রতিজ্ঞার মা কঠিন ধাঁচের মানুষ।কিন্তু মেয়ের অবস্থা দেখে, সব কিছু শুনে তার চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পরেছে।তিনি মেয়েকে বললেন,
“তুমি আমাদের আগে কেনো বলো নি?আমরা সংকল্পের সাথে কথা বলতাম।তবে যা হয়েছে ভুলে যাও।নতুনভাবে বাঁচার চেষ্টা করো।যা হয় ভালোর জন্যই হয়।”

প্রতিজ্ঞা চুপ করে রইলো।তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে।মানসপটে শুধু রাইমার বধূসাজের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে।
রাইমার চেহারা ভেসে উঠতেই তার চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করলো।বাবা-মা কে ছেড়ে নেমে গেলো বিছানা থেকে।এক চিৎকার দিয়ে ড্রেসিংটেবিলের যা যা ছিলো সব ফেলে দিলো।মুখে বলতে লাগলো,
“ঐ মেয়েটাকে আমি মে রে ফেলবো।সংকল্প আমি ছাড়া আর কারোর হতে পারে না।নাহয় আমি সংকল্পকেই মেরে ফেলবো।হয় আমার নাহয় আর কারোর না।”

টেবিলের উপরের জিনিসগুলো ফেলতে নিলেই তানিম এসে ধরে ফেলে।প্রতিজ্ঞা বলতে থাকে,
“ভাই ছাড় আমাকে,ছাড়।সব শেষ করে দিবো আমি।লন্ডভন্ড করে দিবো।মাটিতে মিশিয়ে দিবো সব।ছাড় আমাকে।”

তানিম প্রতিজ্ঞার দুই বাহুতে জোরে চেপে ধরে ধমকে উঠে।বলতে থাকে,
“পা*গল হয়ে গেছিস তুই?জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে তোর?একটা ছেলের জন্য এমন করছিস কেনো?ওর থেকে আরো ভালো ভালো ছেলে আমি তোকে এনে দিবো।তোর পায়ে ছুড়ে মা*রবো।তুই কাঁদবি না,একদম না।”

প্রতিজ্ঞা হু হু করে কেঁদে উঠলো।ভাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।তানিম আগলে নিলো বোনকে।প্রতিজ্ঞা হিঁচকি তুলে বলতে লাগলো,
“ভাই,ভাই আমি ওনাকে সেই কলেজ থেকে ভালোবাসি।কখনো কোনো ছেলের দিকে ফিরেও তাকাইনি।লেখাপড়া ছাড়া অন্যদিকে মনোযোগ দেই নি।কিন্তু,কিন্তু ওনাকে দেখার পর আমি ভালোবাসা কি বুঝেছি।আজ এতো বছর যাবৎ একপাক্ষিক ভালোবেসে তাকে অন্যের হতে কিভাবে দেখবো?কিভাবে সহ্য করবো?”

“ভাই,আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে ভাই।দমবন্ধ হয়ে আসছে।আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে ভাই।আমি ওনাকে ছাড়া বাচবোনা ভাই।আমি ম রে যাবো ভাই।ওনাকে এনে দে,আমার কাছে এনে দে।”

বলতে বলতে মেঝেতে বসে পড়লো প্রতিজ্ঞা।কান্নারা থামছে না।শপথ নিয়েছে যেনো সব জল শেষ করবে,সব জল চোখের বাহিরে বেরিয়ে আসবে।তানিম এবং আনোয়ার সাহেব প্রতিজ্ঞাকে ধরে বিছানায় বসালেন।মা বুঝতে পারছেন না কিভাবে এই পরিস্থিতিতে মেয়েকে সামলাবেন।
কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আমার মেয়েটাকে সামলাও।এমন করলে তো ও পা*গল হয়ে যাবে।মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাবে।ম*রে যাবে আমার মেয়েটা।”
আনেয়ার সাহেব স্ত্রীকে ধমকে উঠলেন।বললেন,
“চুপ করো।কিসব অলক্ষুণে কথা বলছো!কিছু হবে না আমার মেয়ের।আমি হতে দিবো না।”

এর মাঝেই প্রতিজ্ঞা আবার জ্ঞান হারায়।আনোয়ার সাহেব তানিমকে বললেন,
“তাড়াতাড়ি ডক্টরকে আবার আসতে বলো।”

সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারে নি আহমেদ বাড়ির কেউ।সংকল্প সারারাত ছাঁদে কাটিয়েছে।তার মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই,কোনো সুখ নেই,দুঃখ নেই,কষ্ট নেই যেনো যন্ত্রমানব।শুধু আফসোস হচ্ছে। বড্ড বেশিই আফসোস হচ্ছে। কেনো সে আগে মেয়েটার অনুভূতির কথা বুঝতে পারে নি?কেনো মেয়েটা আগে তার অনুভূতি প্রকাশ করে নি?বাবা কিছু না জেনেই বন্ধুর মেয়ের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে চারটা জীবন নষ্ট করে ফেললেন।রাইমা তো কালকে বললোই তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।আর কথা হয় নি রাইমার সাথে,ইচ্ছে হয় নি।কি করবে এখন সে?

প্রতিজ্ঞা ঘুমোচ্ছে। ডাক্তার ঘুমের ইনজেকশন পুষ করেছেন।আরোও বলেছেন,
“প্রতিজ্ঞা অনেক বড় শক্ পেয়েছে।যা তার মন- মস্তিষ্ক মেনে নিতে পারছে না।সে যা চায় তাকে তা দেওয়া হোক।নাহয় যেকোনো সময় যে স্ট্রোক করে ফেলতে পারে।নাহয় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে।এমন চলতে থাকলে দু’টোর একটা হবেই,পসিবিলিটি ফিফটি ফিফটি।”

ডাক্তারের কথা শুনে সবার ভয় আরো বেড়ে যায়। আনোয়ার সাহেব ডাক্তারকে সব খুলে বলেন।ডাক্তার বলেন,
“কয়েকদিন তার আচার-আচরণ লক্ষ্য করুন।অস্বাভাবিক লাগলে সাইকোলজিস্টের সাথে যোগাযোগ করবেন।উনারা এসব বিষয় ভালোভাবে হ্যান্ডেল করেন।”

বলে চলে যায় ডাক্তার সাহেব।সবাইকে রেখে যায় চিন্তায়।

সংকল্প ড্রয়িংরুমে বসে আছে।রাইমাও এসেছে মাত্র।জাহানারা বেগম ডাইনিং টেবিলে মনমরা হয়ে বসে আছেন।রান্নাঘর আজ কাজের লোক এবং মাধুরী বেগম সামলাচ্ছেন।প্রতিজ্ঞা মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসতেন মাধুরী বেগম।তাকে যে কেউই পছন্দ করবে। পছন্দ করার মতোই একটা মেয়ে সে।গতকাল রাতে তার ঐ বিধ্বস্ত রূপ কারোরই কাম্য ছিলো না।ভাবনার মাঝেই সাবিহা হন্তদন্ত হয়ে আসলো।মা কে বলে গেলো,
“মা আমি প্রতিজ্ঞার বাসায় যাচ্ছি।কখন আসবো জানি না।”

জাহানারা বেগম চোখ তুলে চাইলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
শাহআলম সাহেবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।তিনি গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“তুমি ঐ গু ন্ডা মেয়ের বাড়িতে যাবে না।আর কখন আসবে তা জানো না মানে?সন্ধ্যায় কমিউনিটি সেন্টারে রিসিপশন পার্টি।সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে।”

রিসিপশন পার্টি কথাটা শুনে যেনো সবাই কয়েকধাপ বেশিই অবাক হলো।সংকল্প বিস্ফোরিত নয়নে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।সাবিহা কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগে সংকল্প কঠিন কন্ঠে বললো,
“আমার বিয়ে,আমার রিসিপশন আপনি আমাকে জানান নি?আমার মতামতের গুরুত্ব নেই আপনার কাছে?আপনি কি শুরু করেছেন?কালকে এতোকিছু হয়ে যাওয়ার পরেও আপনি কিভাবে আজ রিসিপশন পার্টির আয়োজন করতে পারলেন?আমরা কি আপনার হাতের খেলনা?”

শাহআলম সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“এতোদিন নিজের ইচ্ছায় সব করেছো।আমি বাঁধা দেই নি।বিদেশে পড়তে চেয়েছো,পাঠিয়েছি।পারিবারিক ব্যবসা ছেড়ে লেকচারার হয়েছো,তাও মেনে নিয়েছি।একবার আমার কথা শুনো।আমার কথা শুনতে বাধ্য তোমরা।আমার কথাই শেষ কথা।”

সাবিহা রাগ দেখিয়ে বললো,
“আমি উপস্থিত থাকতে পারবো না।আপনার ছেলের বিয়ে যেমন আপনি একা দিয়েছেন,আমাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করেন নি,তেমনি রিসিপশনটাও একা সামলান।আমাদের দরকার নেই।”

শাহআলম সাহেব গর্জে উঠলেন।বললেন,
“আমার মুখে মুখে তর্ক করার সাহস কে দিয়েছে তোমায়?ঐ গু ন্ডী মেয়েটার থেকে শিখেছো?”

সাবিহার রাগ যেনো বেড়ে গেলো।জোরে বললো,
“একদম গু ন্ডী বলবেন না।ঐ মেয়েটা মৃত্যুর মুখে পরে আছে।ডাক্তার বলেছে যেকোনো সময় স্ট্রোক করতে পারে।মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে। আর আপনি কিসব বলছেন তাকে নিয়ে!

জাহানারা বেগম এবার মুখ খুললেন।প্রতিজ্ঞার কথা শুনে আঁতকে উঠলেন।বললেন,
” কি হয়েছে প্রতিজ্ঞার?”
” ভাবী ফোন দিয়ে জানালো সারারাত অজ্ঞান ছিলো।সকালে জ্ঞান ফিরেছিলো কিন্তু উত্তেজিত হয়ে ভাঙচুর করে,চিৎকার,চেঁচামেচি করে আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে।আমি যাই মা।”

সংকল্ক সাবিহার সাথে যেতে চাইলে সাবিহা কড়া কন্ঠে নিষেধ করে।বলে,
“একদম না।তোকে এতো দরদ দেখাতে হবে না।নিজের বউকে দরদ দেখা।”

“সাবিহা!এভাবে কথা বলছিস কেনো?”

“তো কিভাবে কথা বলবো ভাই?একটা মেয়ে তোকে তিনবছর যাবৎ ভালোবাসে,পা গ লের মতো ভালোবাসে সেই মেয়েটাকে ছেড়ে তুই বাবার কথায় আরেকজনকে বিয়ে করে নিলি?
যেই মেয়েটার সারাজীবনের স্বপ্ন ছিলো মেডিকেলে পড়বে।কত কত নির্ঘুম রাত পার করে,কত সাধনা,পরিশ্রম করে এমএমসিতে চান্স পেয়েও ভর্তি না হয়ে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।শুধু মাত্র তোর জন্য।”

সংকল্প আঁতকে উঠল।প্রশ্নার্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো,
“আমার জন্য?”

“হ্যাঁ,তোর জন্য! তোকে নজরে রাখার জন্য।ওর ভয় ছিলো ও ময়মনসিংহ চলে গেলে তুই অন্যকারো হয়ে যাবি।তোকে সবসময় চোখে চোখে রাখার জন্য, তোর সংস্পর্শে থাকার জন্য ও তোর ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে।
সিনিয়র,জুনিয়ররা তোকে প্রপোজ করলে ভুয়া কল করে তাদের ভয় দেখাতো এই মেয়েটাই।আরো কত কি!
তার প্রতিদানে কি পেলো?একরাশ দুঃখ ছাড়া কিচ্ছু না।”

সংকল্প কিছু বলার জন্য শব্দ খুঁজে পেলো না।সব শুনে সে অনেক,অনেক অবাক হয়েছে।শুধু কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“আমি এসবের কিছুই জানতাম না।তোরা জানাস নি আমায়।”

সাবিহা তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলো।বললো,
“সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলো রে।নববর্ষের দিনও বলেছিলো নেক্সট মান্থে তোর বার্থডে তে তোকে প্রপোজ করে সারপ্রাইজ দিবে।অথচ দেখ ভাগ্য ওকে কত বড় সারপ্রাইজ দিলো।”

চলে গেলো সাবিহা।
সংকল্প ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ পরে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“দেখলেন তো কত্তগুলো জীবন নিয়ে খেলেছেন আপনি।বারবার বলেছিলাম একটু সময় দিন,দেন নি।নিজের মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে আরেকজনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন। আর কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন আমাকে যে কিনা আপনাকে অসম্মান করতে পারে নি।”

বলে চলে যায় সংকল্প।শাহআলম সাহেব চুপ করে রইলেন।প্রতিজ্ঞা মেয়েটাকে তার কখনোই অপছন্দ ছিলো না।বরং সাবিহার মতোই পছন্দ করতো।কিন্তু ছোট বেলার বন্ধুর কথা রাখতে গিয়ে এমন কিছু হবে তিনি ভাবতে পারেন নি।অপরাধবোধেরা তাকেও ঘিরে ধরলো।

পুরোটা সময় রাইমা ছিলো নিরব দর্শকের মতো।তার মা-বাবা কত্তগুলো জীবন নষ্ট করে দিলো তারা ভাবতেও পারবে না।ইশশ!মা-বাবার কথা না ভেবে ঐদিন যদি সবার সামনেই সিন্ ক্রিয়েট করতো তাহলে হয়তো এমন কিছু হতো না।ঐ মেয়েটার মতো নিজেও তো ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েছে।ঐ মেয়েটা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে নি,গোপনে ভালোবেসেছে আর সে প্রকাশ্যে।গোপন ভালোবাসায় কষ্টটা অনেক বেশি হয়।মেয়েটার কষ্ট সহ্য করার মতো না।সে চলে গেলো নিজের রুমে।এতো কিছু দেখে তার বুক আবার ব্যাথা করতে শুরু করেছে।রাতের বেলায় এতোগুলো ঔষধ খেতে হলো।এখন আবার খেতে হবে।এতো এতো সমস্যার নিস্তার কোথায়!

#চলবে….