৩.২০মিনিট ৭তম এবং শেষ পর্ব

0
974

#৩.২০মিনিট
#রাবেয়া_সুলতানা

#৭তথা শেষ পর্ব

___মাসুদ আমি কি ঠিক বলছি?
মাসুদ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুজালো।
মারিয়ার মাথায় হিংসা ছিলো ঠিকি কিন্তু খুনের প্ল্যান তো ছিলো আরেক জনের।
সবার মুখ থেকে কোনো কথা আসছে না।সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে ছোট্টো এই ড্রইরুমে।
জেবা র্নিবিকার কয়ে তাকিয়ে আছে জিসানের দিকে।তার ভাবতেই অবাক লাগছে একটা মেয়ে হিংসার কারনে এতো দূর যেতে পারে।অবশ্য হিংসানা শুধু, এতে মিশে ছিলো জঘন্য এক ভালোবাসা। যাকে এক তড়পা ভালোবাসায় বলে।
সবা কিছুর মাঝেও জেবা স্তব্ধ, স্থির। সব খারাপের মাঝেও যেনো জিসান তারই আছে। আবার এতো ভালোবাসা! সত্যিই জেবা, কপাল করে এইরকম স্বামী পাওয়া যায়।নিজের অজান্তে মনের ছোট্টো এক কোণে আনন্দের রেখা ফুটলো জেবার।

জিসান উঠে গিয়ে নিজের রুম থেকে সেই ওড়নাটা আনলো যেটা দিয়ে জোভানের পা বাঁধা হয়েছিলো,,,
মারিয়ার দিকে দেখিয়ে ওড়নাটা কার মারিয়া?মারিয়া হাঁটুতে কাঁপন শুরু হলো।

জিসান ধমকি দিয়ে, কথা বলছিস না কেনো?

মারিয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বললো আমার।

অপরাধী যতই অপরাধ করে বাঁচার চেষ্টা করুক না কেনো অপরাধী ঠিকি একটা প্রমান রেখে যায়। যেমন সেটা তুই করলি।

এইবার আসল কথায় আসা যাক।জেবার মায়ের দিকে তাকিয়ে,আপনি কি ওর আপন মা?

কথাটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না কেউ।জেবার মা হকচকিয়ে জিসানের দিকে তাকালো ভ্রু কুঁচকে।
গম্ভীর গলায় বললো, কি বলতে চাইছো তুমি?

“বলতে চাইছি আপনি ওর নিজের মা নাকি,,,,,,
কথা জিসান কে শেষ করতে না দিয়ে জেবার মা আচমকা দাঁড়িয়ে, জাস্ট শেটাপ।কি বলতে চাইছো তুমি?ও আমার মেয়ে।
জেবা জিসানের দিকে করুনার চোখে তাকিয়ে, জিসান এই সব কি বলছো? উনি আমার মা। তুমি আমার মাকে নিয়ে এইসব বাজে মন্তব্য করতে পারো না।

জিসান হাত উঠিয়ে জেবাকে থামিয়ে দিলো।গম্ভীর মুখে জেবার বাবার দিকে তাকিয়ে, আপনি আমায় কখনো সহ্য করতেন না সেটা ঠিক।কিন্তু আপনি এতোটা পাষবিক হিংস্রতা নিয়ে থাকেন না।যেটা আমার উপর আপনার প্রয়োগ হবে।বাবা আপনি আমাকে ভালোবাসতেন না ঠিক কিন্তু নিজের মেয়েকে তো বাসতেন।তাহলে প্লিজ আপনি সত্যিটা বলুন।জেবা হয়তো আমাকে এখন ভুল বুজতেছে।কিন্তু আপনার কথার উপর র্নিরভর করে এখন সব কিছু।
আপনি শুধু বলেন জেবার কি উনি আপন মা?

জেবার বাবা ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে না বুজালো।

জেবা তার বাবার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
দৌড়ে উঠে তার বাবার পায়ের কাছে বসে, বাবা আমার মাকে তুমি এইসব কি বলছো? উনি আমার নিজের মা নয়? জেবার বাবা নিজের ঠোঁট গুলো দাঁতের সাথে চেপে ধরে জেবার মাথায় বুলাতে বুলাতে ভেজা গলায় ফেঁসফেঁস করে বললো নারে মা।ও তোর আপন মা নয়।তোর যখন এক বছর বয়স তখন তোর মা মারা যায় এক্সিডেন্টে। তারপর তোকে আমি একা হাতে সামলাতে পারতাম না। বাহিরের কাজকর্ম করতে পারতাম না। কারন তোকে কার কাছে রেখে যাবো সেই কারনে।তারপর তোর মায়ের বান্ধবী কে আমার কাছে বিয়ে দেওয়া হয়।জেবার বাবা আর কিছু বলতে পারলো না।ভিতর থেকে কোনো কথা বাহির হচ্ছেনা।

জেবা তার মায়ের কাছে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে, তার মাকে জড়িয়ে ধরে,মা তুমি আমার মাই থাকবা।আমি মানি না এইসব। তুমিই আমার মা তুমিই আমার সব।জেবার মা পাথরের মুক্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।জেবার কান্না যেনো নড়াতে পারছেনা।মুখে ফুটিয়ে উঠেছে রাগ আর প্রতিশোধের নেশা।জেবা ঝাঁকিয়ে মা মা করে কাঁদতে লাগলো। কিন্তু জেবার মা জেবার দিকে একবার ফিরেও তাকালো না।

জিসান উঠে গিয়ে,জেবার দুই কাঁধে হাত দিয়ে নিজের কাছে টেনে এনে জিসানের মায়ের পাশে বসিয়ে, উনি তোমাকে টেনে নিবে না জেবা।কারণ উনার চোখ দেখে তুমি বুজো না? উনার চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে।উনার মনে তোমার জন্য এক বিন্দু ভালোবাসা নেই।এতো দিন শুধু লোক দেখানো ভালোবেসে গেছে তোমাকে।তোমাকে আর তোমার বাবাকে ঠোকানোই উনার কাজ।

জিসানের মা জেবার কাঁধে হাতের হালকা স্পর্শ রেখে তোমার এক মা তোমার আপন না হতে পারে তাতে কি? আমি তো তোমার আপন মা হয়ে থাকতে চাই।

জেবা নিস্তব্ধ হয়ে স্থির হয়ে আছে।চোখে ভাষা যেনো অনেক কথা বলতে চাইছে জিসান কে।কিন্তু গলাটা যেনো আটকে আছে। কোনো কথা যেনো বেরুচ্ছেনা।সাথে সাথে যেনো কানে শনশন বাতাস বয়ে যাচ্ছে।কিছুই শুনা যাচ্ছেনা।জিসান যেনো তাকে কিছু বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু কি বলে যাচ্ছে তার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছেনা।হঠাৎই জিসান তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পা দুটো জড়িয়ে তার কোলে মাথা রাখলো, জেবার হাত টাকে নিজের ঠোঁট আর গালের সাথে চেপে ধরে, আজ তোমায় স্তব্ধ স্থির হলে চলবে না জেবা।আজ তোমার সব সত্যি জানতে হবে। তোমায় ধৈর্য্য ধরে নিজেকে সামলিয়ে সব শুনতে হবে।
জেবা নিজেকে সত্যি সত্যিই সামলালো।জিসানের মাথা উঠিয়ে, জিসান আমাকে নিয়ে ভেবো না।আসলে কোনো দিন এতো বড় ধাক্কা খায়নি তো তাই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।তুমি বলো। যে করনে সবাইকে ডাকলে সেই কাজ শুরু করো।

জিসান উঠে দাঁড়িয়ে, বলতে লাগলো, সেই দিন জোভান ফোন দিয়ে বলেছিলো সে এসে সবাইকে সারপ্রাইজ দিতে চায়।আমি জেনো কাউকে না বলি সে আসছে।আমিও তার কথা মতে কাউকে কিছু বললাম না।দুপুরের আগে জোভান ফোন দিয়েছে, কই তুই আমি কিন্তু এখনো এলাকায় আসিনি।তুই তোর গাড়ীটা নিয়ে চলে আয়।
তারপর ভেবেছিলাম মোটরবাইক টা নিয়ে যাবো, কিন্তু পরে ভাবলাম গাড়ীটা নিয়ে যাই।

জেবাকে রেখে কাউ কে কিছু না বলে আমি চলেও গেলাম।এর মাঝেই আমাকে জেবার মা ফোন দিয়েছিলো।
আমি উনাকে হাসি মুখে বললাম মা আমি এলাকার বাহিরে আসছি।তিনি আমায় জিজ্ঞেস করলেন এলাকায় আসতে আমার কতটুকু সময় লাগবে।আমি বললাম আধঘন্টা হতে পারে।তিনি কিছু না বলেই ফোন রেখে দিলেন ।আমার কৌতুহল ছিলো না।কারন তিনি জিজ্ঞেস করতেই পারেন তার মেয়ে আমার ঘরে আসছে এইটা স্বাভাবিক। কিন্তু উনাকে জোভানের কথা কিছুই বললাম না।
জোভানের সাথে আমার দেখা হলো।জোভান আমাকে বুকে জড়িয়ে যে হাসিটা দিয়ে ছিলো আমি আজও ভুলতে পারছিনা।আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে।বুক ফেঁটে যায়।কথাটা বলেই জিসান সামনে থাকা টেবিলে ঘুসি দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো।চোখ গুলোকে মুছে আবার বলতে লাগলো,আমার বিপদের স্বীকার হতে হয়েছে আমার ভাইকে।

জিসান কিছু বলার আগেই জিসানের বাবা বললো,তাহলে খুনের সময় তুই কোথায় ছিলি? এইযে বললি তুই জোভান কে আনতে গেছিস।

“হুম,,, আমি জোভানকে গাড়ীতে বসিয়ে রাস্তার অন্য পাশে চোখটা আটকে গেছে হাসনাহেনা ফুল দেখে।একটা ছেলে কয়েকটি হাসনাহেনা ফুল সহ ডাল নিয়ে যাচ্ছে।জোভান কে বসিয়ে ছেলেটার কাছে গেলাম।ওকে বললাম আমাকে আরো কিছু ফুল জোগাড় করে দিতে আমি ওকে টাকা দিবো।ছেলেটা খুশি হয়ে বললো আপনাকে তাহলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে আমি রাজিও হয়ে গেলাম।কারন জেবার হাসনাহেনা ফুল খুব পছন্দ করে।জোভানকে বলতেই জোভান বললো সে কিছুতেই অপেক্ষা করতে চায়না।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে তোমাদের কাছে আসতে চায়।এক প্রকার জোর করেই আমার কাছ থেকে গাড়ীর চাবিটা নিয়ে বললো,আমি নিজেই যেতে পারবো।তুই ফুল নিয়ে চলে আয়।আমি জোভান কে বিদায় দিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসলাম।ছেলেটার আসলো এক ঘন্টা পর।ছেলেটার কাছ থেকে ফুল গুলো নিয়ে গাড়ীর জন্য দাঁড়িয়ে আছি।ঠিক তখনি মাসুদ আমায় ফোন দেয়।কথাটা শেষ করে জিসান গলাটা ভারী হয়ে আসছে।স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেবার মায়ের দিকে তাকিয়ে।

তখন মাসুদ বলতে লাগলো,হ্যাঁ জিসান আমার বন্ধু।সেই কলেজ থেকেই।জিসান হোস্টেলে থাকতো আমার সাথেই।কিন্তু ভাগ্য আমাকে আপনাদের এইখানে বদলি করে নিয়ে এসেছে।জোভানের খুনের মাস তিনেক আগে আমি এইখানে এসেছি।জিসান আমাকে আপনাদের বাসায় প্রায় আসতে বলতো কিন্তু আমার সময় হতো না।যখন জোভানের লাশ পেয়ে থানায় ফোন দেওয়া হয়েছিলো।তখন সাথে সাথেই আমি সেইখানে পৌঁছে গেলাম।কানাঘুঁষায় শুনতে পেলাম আপনাদের বাড়ির ছিলে জিসানের গাড়ী এইটা।আমি যখন লাশের কাছাকাছি গেলাম সব কিছু খুতিয়ে খুতিয়ে দেখতে লাগলাম।তখন আমি বুজতে পেরেছি জিসানের মতো দেখতে হলেও ও জিসান না।ওই যে খালাম্মার মতো ঘাড়ের দাগটা আমি ফেলাম না।আমি শিওর হয়ে গিয়ে ছিলাম ও জিসান না।তখন আমি জিসানকে ফোন দিই।জিসান যখন খুনের কথা শুনলো সে আমাকে বললো জিসান খুন হলে আমি যা যা করতাম সেই একি নিয়ম গুলো চালিয়ে যেতে।কাউকে যেনো আমি বুজতে না দিই।জিসান আমায় বললো তুই এসে আমার ফোন নিয়ে যা।এবং আমাদের বাড়িতে গিয়ে খবর দিবি আমারই খুন হয়েছে।যতদিন না আমরা খুনের রহস্য বের করতে পারছি ততদিন নাটক চালিয়ে যেতে হবে।মাসুদ দম নিয়ে আবার বলতে লাগলো,মারিয়ার প্ল্যান ঠিক মতোই ছিলো যদি সেদিন দুইটা ভুল না করতো।
নিজের ওড়নাটা সেখানে ফেলে আসা।আর দ্বিতীয় জিসানের কিনা শাড়ীটা।যেটা পরে আমি পেয়ে জিসানকে দিয়েছিলাম।

জেবার মা স্থির হয়ে বসে পড়লো সোফায়।
সবকিছু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।জেবার মায়ের শীতল ঘাম কপাল বেয়ে বেয়ে পড়ছে।আর তিনি শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুছে যাচ্ছে।এতে যানো কোনো লাভ হচ্ছেনা।উল্টো সবার চোখ যেনো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

জিসান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসলো,হাসিটা যে কতটা ভয়ংকর জেবার মা বুজে গেছে।
জিসান বললো,বাকীটা আপনি বলেন।কেনো আমার উপর আপনার এতো রাগ এতো অভিমান?
জেবার মা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে, রাগ আমার তোমার উপর নয়।রাগ আমার এই লোকটার উপর। সারা জীবন আমার মেয়ে আমার মেয়ে করে গেছে।নিজের মেয়ের জন্য আমাকে মা হতে দেয়নি।ওর মেয়ের ভালোবাসা কমে যাবে তাই।
ঝাঁঝালো গলায় আবার বললো,এই মেয়েকে আমি আমার মতো করে গড়তে চেয়েছি।চেয়েছিলাম নিজের যেহেতু সন্তান নেই তাকে আমার ভাইয়ের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে নিজের ঘরেই রাখবো।কিন্তু যেইদিন থেকে তোমার সাথে ওর রিলেশন হয়েছিলো সেদিন থেকেই ও কেমম হয়ে গেলো।কারো কথা শুনতো না। এবং কি আমার কথাও না।তবে হ্যাঁ আমার ভাইয়ের ছেলে স্বাভাবিক আট দশ জন মানুষের মতো নয়।জন্মগত কিছু সমস্যা ছিলো।কিন্তু কি হতো ওর এই সব মেনে নিলে? ছেলেটা ওকে প্রচন্ড ভালোবাসতো।যেদিন জেবা বাসায় বলেছিলো তোমাদের ভালোবাসার কথা সেইদিন আমিও ওদের বাড়িতে ফোন করে বলেছিলাম।ছেলেটা সহ্য করতে পারেনি।আত্মহত্যা করে ছিলো সে।

“জেবার বাবা কথাটা শুনে অবাক হয়ে,তুমি তো এতো কিছু আমাকে বলোনি।তোমার ভাইয়ের ছেলেতো আত্মহত্যা করেছিলো অন্য কারনে।তুমি কেনো আমার মেয়ের উপর শুধু শুধু দোষ দিচ্ছো?

” ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো,ভুল বলেছিলাম।মিথ্যা বলেছি তোমাদের বাপ মেয়েকে।
জেবা যেনো তার এই মাকে চিনতে পারছেনা।ছোটো বেলা থেকে সে যাকে দেখে এসেছে আজ তার বিন্দু মাত্র ভালোবাসা দেখা যাচ্ছেনা তার মায়ের ভিতর। সে চিনেনা তার এই মাকে।তাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে শুনছে তার মায়ের কথা গুলো।

জেবার মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে লাগলো,যে দিন মারিয়া আমাদের বাসায় প্রথম গিয়েছিলো আমিই সেইদিনই বুজে ফেলেছিলাম মারিয়া এই বিয়েটা হোক সে চায় না।তাই আমি ওকে কথা দিলাম যেই করে হোক আমরা দুজনে মিলেই বিয়েটা আটকাবো।কিন্তু আমরা পারলাম না।জিসান জেবার বাবাকে ঠিক রাজি করিয়ে নিয়ে বিয়ে করে ফেললো।তাই বারো ঘন্টার মাথায় আমরা জিসানাকে মারলাম।সেইদিন মারিয়া তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ওড়নাটা ফেলে এসেছিলো।এবং শাড়ীটাও।
জেবার মা হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে, তড়িৎ গলায় বললো আমি কোনো অন্যায় করিনি।আমি প্রতিশোধ নিয়েছি।আমি এদের বুজাতে চেয়েছি নিজের আপন জনের মৃত্যুতে কতটা অসহায় লাগে নিজেকে।আমি তোকে অনেক হিংসে করি অনেক।তুই কখনোই আমার মেয়ে ছিলিনা। তুই ছিলি তোর বাবার মেয়ে।

কতটা জঘন্যতম হৃদয়ের হলে এই কাজ করতে পারে মানুষ। এই মেয়েটা কি তোমায় ভালোবাসতো না? বাসতো তো তাইনা?হায় আল্লা কাকে আমি এতোদিন বিশ্বাস করেছিলাম।এইটা ঠিক আমি আমার মেয়েকে অনেক ভালোবাসি।কিন্তু এটাও ঠিক এই মেয়েটার মায়ের জায়গায় তুমি ছিলে।তুমি নিজে মা হওনি ঠিক কিন্তু তুমি কি তার মা ডাকে মাতৃত্বের স্বাদ পাওনি? পেয়েছো।তুমি মা হওনি এইটা তো আমার দোষ না।হ্যাঁ আমি চেয়েছি তুমি মা হও তবে আমার মেয়েটা একটু বড় হলে।আমার এখনো ভাবতেও অবাক লাগছে আমি নিজেই আমার মেয়েটার ভালো করতে গিয়ে খারাপটা বেশি করে বসলাম।
কথাটা বলতেই জেবার বাবা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
জেবার মা কিছু বলতে যাবে সেই সুযোগ তাকে না দিয়ে তিনি আঙুল উঠিয়ে, চুপ,,একদম চুপ।মিস্টার মাসুদ আপনি বসে আছেন কেনো? আপনার লোকদের খবর দিন। নিয়ে যান ওকে আমার চোখের সামনে থেকে।যার মন বলতে কিছু নেই তাকে আমি এক মূহুর্তের জন্য দেখতে চাইনা।আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, বাবা জিসান তোমার কাছেও আমার অনুরোধ এই মহিলার যথাযথ শাস্তির ব্যাবস্থা তুমি করবে।
মারিয়ার বাবা এগিয়ে গিয়ে মেয়ের পাশে বসে, কেনো করলি এইসব?
মারিয়া তার বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, বাবা আমি কি করে বুজবো জিসান ভাইয়ার জায়গায় জোভান ভাইয়া চলে আসবে?আন্টির ভাড়া করা লোক তো ঠিক মতই কাজ করেছে, শুধু ভুলটা হয়েছে মানুষটা পাল্টে।কথাটা শুনেই মারিয়ার বাবা তার গালে কষিয়ে থাপ্পড় দিয়ে,তোর লজ্জা লাগেনা এইসব কথা বলতে? কোথায় তুই নিজের অপরাধ স্বীকার করবি তা না করে তুই উল্টো কথা বলছিস।

মারিয়া বাম গালে হাত দিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললো,ভুল কি করেছি আমি?হুম কি করেছি?ভালোবাসা ভুল নয়। জিসান ভাইয়াকে আমি অনেক বুজিয়েছি কিন্তু আমার কথা শুনলো না।সেই দিন আমি শান্তি পেয়েছিলাম নিজের চোখের সামনে মানুষটাকে খুন হতে দেখে।আরে ওড়না তো বেঁধে ছিলাম পা গুলো যে ভাবে মরন যন্ত্রণায় লাপাচ্ছিলো চটপট করছিলো তাই।কিন্তু কি করে বুজবো সামান্য ওড়নার জন্য এতো দূর হয়ে যাবে।খুব শান্ত গলায় বাকী কথা গুলো বললো জেবা।

মারিয়ার মা মেয়ের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে চোখের পানি গুলো গাল বেয়ে বেয়ে পড়ছে।মারিয়ার বাবা মারিয়ার মাকে এসে জড়িয়ে ধরে,কেনো কাঁদছো তুমি? কার জন্য।একটা খুনির জন্য?যার মাঝে মানুষত্ব বোধ বলে কিছুই নেই।আজ আমি নিসর্গ নিঃশ আমি হতাশ। আমি অপরাজিত এক বাবা।
আমি সব সময় ন্যায়ের পথে কথা বলেছি আজ আমার মেয়ে বলে পিছিয়ে আসবোনা।
জিসান,তোর যা ভালো মনে হয় তুই তাই কর।
কথাটা বলেই মারিয়ার বাবা নিজের রুমে চলে গেলেন।
কেউ আর কিছু জানতে চাইলো না।কিভাবে খুন করেছে? কিভাবে জোভানকে রক্তাক্ত করেছে এইসবের কিছুই না।মাসুদ অফিসে ফোন দিলো কিছু কথা বলে নিলেন।কিছুক্ষণ ৮/১০জন পুলিশ এসে যাওয়ার সময় মারিয়া আর জেবার মাকে সাথে করে নিয়ে গেলেন।

দুই দিন কেটে গেলো কেউ কারো সাথে কথা বলছেনা।বাড়িটা শুন্যতায় ঘিরে আছে।জেবাও জিসানের সাথে তেমন কথা বলছে না মায়ের জন্য তার কষ্ট হচ্ছে।তেমনি জিসানেরও জোভানের জন্য।লজ্জায় ঘৃনায় নিজেকে আর কারো সামনে জাহির করতে চায়না।সে মনে মনে ঠিক করে নিলো সে এই বাড়িতে আর থাকবে না। একলা বাবার কাছেই বাকীটা জীবন কাটিয়ে দিবে।কোন মুখে থাকবে সে বাড়িতে? তার মা কিনা এই বাড়ির ছেলেকে খুন করেছে।জিসান ও সেইদিন থেকে জেবার সাথে তেমন কথা বলেনা।জিসান হয়তো মেনে নিতে পারছেনা তাকে।জিসান যে তাকে ভালোবাসে জেবা ভালো করেই জানে।কিন্তু তবু্ও জিসানের সাথে নিজেকে জড়াতে ইচ্ছে করছে না জেবার।জিসানের সামনে দাঁড়াতেই জেবা পারছেনা।সেই জাগায় তাহলে সংসার তো দূরের কথা এক রুমে থাকাটাও জেবার কাছে ভালো দেখায় না।
সারাটা রাত দুজন দুপাশে ফিরেই কাটিয়ে দিলো।ভোরের সামান্য আলো ফুটতেই জেবা জিসানকে রুমে রেখে বেরিয়ে গেলো।হয়তো এইভাবে আসা তার উচিৎ হয়নি।কিন্তু সবার সামনে দাঁড়িয়ে জেবা কি বলবে? তার মায়ের খুনের কারনে সে এই বাড়িতে থাকতে চায়না? না সে এইটা কোনো ভবেই পারবে না।
জেবা হাঁটতে থাকলো স্টেশনের দিকে।সূর্যের আলোটা যেনো প্রখর হয়ে উঠেছে।তৃষ্ণায় গলাটা যেনো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।স্টেশনে এসে দেখে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।জেবার তৃষ্ণায় ক্লান্তিতে শরীর খারাপ লাগছে।এইদিক সেদিক তাকালো পানি পাওয়া যায় কিনা।তার কাছে তেমন টাকাও নেই পানি কিনে খাবে।বাসা থেকে বেরিয়া আসার সময় নিজের পার্সটা আনতেও ভুলে গেছে।পাশে থাকা ব্যঞ্চে ধীরে বসে শাড়ীর আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে খেয়াল করলো কেউ হাত বাড়িয়ে পানির বোতল ধরে আছে।জেবা কোন দিকে খেয়াল না করেই তড়িৎ ভাবে পানির বোতলটা নিয়ে ঢকঢক করে পানিয়ে খেয়ে পেললো। বোতলের বেশখানিকটা খেয়ে পাশে ফিয়ে তাকিয়ে বেশম খেয়ে,তুমি?
“হুম আমি।
জেবা নিস্তব্ধ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
” কোথায় যাচ্ছো আমাকে নিবেনা?
জেবা কিছু বলছে না চুপ করেই আছে।
চলো একসাথে যাবো।
জেবা এইবার শান্ত গলায় বললো, কেনো এসেছো তুমি?
“আজব ব্যাপার, আমার বউ যেখানে থাকবে আমি তো সেখানেই থাকবো তাইনা?কি তাইতো?
জেবা মাথা উঠিয়ে করুন চোখে তাকিয়ে, তাহলে এই কয়েটা দিন তোমার মনে হয়নি তোমার কথা ছাড়া আমি কতোটা কষ্টে ছিলাম? মনে হয়েনি তোমার স্পর্শ ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্ব নেই।মনে হয়নি তোমার ভালোবাসা ছাড়া আমি কতোটা নিঃশ?

” হুম আমি জানি আমার পাগলিটা ভাসুরের জন্য কতোটা পাগল।তাইতো ভাসুরের প্রেমে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে।

জেবা রাগী চোখে তাকাতেই, জিসান হা হা হা করে হেসে তারপর বললো,আসলে আমি চেয়েছি তুমি তোমার মায়ের সব কথা ভুলে নিজে থেকেই সব কিছু মেনে নিবে।আমি হয়তো তোমাকে কিছু বললে তোমার নিজেকে অসহায় মনে হতো।তাই তোমাকে সময় দিচ্ছিলাম নিজেকে নিজের মতো করে শক্ত করো।তারপর না হয় ভাসুরের সাথে ছুটিয়ে প্রেম করো। কথাটা বলেই জিসান আবার আসলো।জেবা যেনো এই হাসিতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।পৃথিবীর সব মানুষ হাসলে কি এইরকম জেবার মন ভালো হয়ে যেতো? হয়তো না।জিসান হাসছে বলেই তার ভালো লাগছে। সে তার এই হাসি দেখেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে।হাজার বিপদেও নিজেকে সামলিয়ে নিতে পারবে। হয়তক এর নামই ভালোবাসা, জেবার আজ খুন ইচ্ছে করছে জিসানের সেই চিরচেনা সেই কথাটা শুনার।

জিসান যেনো জেবার মনে কথা বুজতে পেরেই,
উপকন্ঠে বলে উঠলো,

ভাবাবাসার কমতি কিসের,
আমার চোখের মাঝে।
ইচ্ছে করে সারাটাক্ষন আগলিয়ে রাখি তোরে।
ইচ্ছে করে ওই তেপান্তরে
পাড়ি দিতে তোকে নিয়ে।
তাইতো আমি ভালোবাসি তোরে,
জনম জনম ধরে।

সমাপ্ত