৩.২০ মিনিট পর্ব-০৬

0
802

#৩.২০ মিনিট
#রাবেয়া_সুলতানা
#৬
___মারিয়া আজ খুব সকাল সকাল ঘুম উঠে ফ্রেশ হয়ে ড্রইংরুমে তড়িঘড়ি করে এসে জোভানের রুমের দিকে তাকালো।দরজা বন্ধ দেখে জেবার রুমের সামনে এসে দরজা নক করতে যাবে তখন দেখে দরজা খোলাই আছে।মনে মনে ভাবছে ভাইয়া ভিতরে থাকলে দরজা বন্ধই থাকতো, না ভাইয়া এই রুমে ঘুমায়নি।
তার মানে নিশ্চিত ভাইয়াকে জেবা মেনে নেয়নি।কথা গুলো ভাবতেই স্থির নিশ্বাস ভারি মারিয়া।

‘কিরে তুই এইখানে কি করছিস জেবার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে? কথাটা শুনেই চমকে উঠে পিছনে ফিরে দেখে জিসানের বাবা।

“আসলে জ্যাঠু ভাবীকে ডাকতে আসলাম।(কথাটা ঘুরিয়ে)জ্যাঠু তুমি চা খাবে? আমি চা করে নিয়ে আসছি?

কথাটা বলেই মারিয়া রান্না ঘরে চলে গেলো।
জিসানের মা এসে মারিয়াকে রান্না ঘরে দেখে,
আজকে সূর্য কোন দিকে উঠেছে?যে মেয়েকে রান্না ঘরের কাছেও দেখা যায়না আজ সেই কিনা চা বানাচ্ছে।কার জন্য চা?

” বড় মা জ্যাঠু চা খাবে বলেছে তাই নিয়ে যাচ্ছি।ভাবলাম তোমার শরীরটা আজকাল ভালো যাচ্ছে না।বউ তো একটা ঘরে নিয়ে এসেছো কোনো কাজই করেনা।এখন যদি করে আরকি।তাই আমিই চা টা করে নিচ্ছি।

জোভান রান্নাঘরে দরজায় দাঁড়িয়ে তাহলে আমাকেও এক কাপ দিস।

মারিয়া অনিচ্ছায়কৃত মুখে হাসি ফুটিয়ে, হ্যাঁ বুজিয়ে মাথা নাড়লো।

“মারিয়া তুই রেডি তো?

মারিয়া চমকে উঠে,কিসের জন্য?

“কলেজে যাবিনা? আজ আমি তোকে দিয়ে আসবো চল।

” না আজ আমার ক্লাস নেই।

জোভান চা খেয়ে জেবার রুমে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে,
জেবার দিকে তাকিয়ে দেখে জেবা এখনো ঘুমাচ্ছে।জেবার পাশে বসে নজর পড়লো জেবার পেটে।শাড়ীটা সরে গেছে।জিসান পেটের উপর হাত দিতেই জেবা চোখ খোলে জিসানকে দেখেই হাতটা সরিয়ে পাশে ফিরে, জিসানের হাতটাকে জড়িয়ে, কখন উঠেছো তুমি?

“কিছুক্ষণ।
” তোমাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে।
“জিসান মুচকি হেসে, কিভাবে বুজলে? তুমিতো আমাকে ভালো করে না দেখেই চোখ বন্ধ করে ফেললে।
” চোখে যদি না দেখে তোমায় তাতে দোষ নেই।
কিন্তু মনের চোখ দিয়ে যদি না দেখা হয় তাহলে সেটাই অন্যায়।

জিসান একগাল হাসি মুখে তাকিয়ে দেখছে জেবাকে।অপূর্ব লাগছে তাকে।
আসমানের পরী উঁকি দিচ্ছে মোর ঘরে,
ইচ্ছে করে লুকিয়ে রাখি আমার এই অন্তরে।
হাত টা দেনা বাড়িয়ে।
দেখনা,
সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে,
নিয়ে যাবো তোকে তেপান্তরে।
ভালোবাসার ঘর বাঁধিয়াছি আমি তোর সাথে।

জেবা আধো আধো চোখ খুলে,সব কথাতে কবিতা খুঁজতে হয়?

“আচ্ছা ঠিক আছে আর খুঁজবো না।এইবার উঠো তো।

জেবা উঠে আড়মোড়া ভেঙে, তুমি যাও আমি আসছি।

” না আমি তোমাকে নিয়েই যাবো।চলো।

মারিয়ার মনে উসখুস করছে।কেনো জোভান ভাইয়া আমার প্রতিটি কথায় বাগড়া দিয়ে বসে।
ভাইয়া কি আমায় কোনো কারনে সন্দেহ করে? আচ্ছা ভাইয়া এই শাড়ী পেলো কোথায়?সব প্রশ্ন যেনো মনের ভেতর খোঁচা দিয়ে উঠে।ভালো লাগছে না মারিয়ার।সব কিছুতেই যেনো গড়বড় লাগছে।ক্লাস তো আমার ছিলো,কিন্তু ভাইয়ার সাথে যাবো না বলেই বললাম ক্লাস নেই।এখন বাড়িতেও ভালো লাগছেনা।

দুপুরের আগ মূহুর্তে জেবার বাবা আর মা এসেছে।কাল এতো করে জিসানের মা বলতেও তারা আসেনি।
আজ এসেছে মেয়েকে দেখতে।

“কি বেয়াই সাহেব আপনার এখন আসার সময় হলো?

” জেবার বাবা মুখে বাঁকা হাসির রেখা ফুটিয়ে, জোভান ফোন করছে বার বার না এসেও উপায় নেই।আর মেয়েকে তো দেখতেই হবে তাই না?

“একদম ভালোকাজ করেছেন।
সবাই কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে দুপুরের খাওয়া শেষ করতেই মিস্টার মাসুদ এসেছে।

মাসুদ এসে ড্রইংরুমে বসলেন।কিছুক্ষণ কথা বলে সবাইকে ডাকা হলো।মাসুদ কে দেখলেই মারিয়ার ভয়ে হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে আসে।কোনোভাবে নিজেকে সামলিয়ে সবার সাথে বসেছে সে।
জোভান মাসুদের থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে লাশের কিছু ছবি সবার সামনে তুলে ধরেছে সে।
সবাই ছবি গুলো মনোযোগ দিয়ে দেখবে।
জিসানের মা ছবি গুলো দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে জোভানের দিকে তাকালো।

আজ জেবাকে সবাই স্বাভাবিক দেখে,
” ভাবী অন্যদিন তো তুমি ভাইয়ার ছবি দেখলেই কাঁদতে কাঁদতে শেষ হয়ে যেতে।আর আজ জোভান ভাইয়ার সাথে বিয়ে হওয়াতে তুমি জিসান ভাইয়াকে ভুলে গেলে? তোমার চোখে মুখে জিসান ভাইয়াকে হারানোর কোনো আফসুস নেই?

“কি করে থাকবে মারিয়া? তার জিসান তো তার সামনেই বসে আছে।
কথাটা শুনে সবাই অবাক হয়ে জিসানের দিকে তাকালো।

“জোভান, জিসান এইখানে বসে আছে মানে?

মারিয়ার বাবা কথাটা বলতেই,মাসুদ একগাল হাসি নিয়ে,আপনাদের সামনে যিনি বসে আছেন তিনি জোভান নয়,জিসান।আর যার লাশ আপনারা পেয়েছেন তিনিই ছিলেন জোভান।আসলে এতোদিন আমরা এই নাটক গুলো করেছি শুধু খুনিকে ধরার জন্য।

সবার মাথা যেনো আউলা হয়ে গেলো।সবাই কি বলবে কিছুই বুজতে পারছেনা।জোভান দেশে আসলো কবে আবার জিসানের জায়গায় জোভান গেলো কিভাবে।কিছুই বুজতেছেনা কেউ।জিসানের বাবা এক ছেলেকে কাছে পেয়েছে ঠিকি।কিন্তু আরেকটা ছেলেকে তো ঠিকি হারিয়েছে।জিসানের বাবা স্তব্ধ হয়ে জিসানের দিকেই তাকিয়ে আছে।
জিসানের মায়ের কান্নার শব্দ বেড়ে গেছে দেখে জিসান পাশে এসে বসে তোমাকে কথা দিয়েছি না আমি, যারা তোমার জোভান কে তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে তাদের আমি কাউকে ছাড়বোনা।

জিসানের বাবা আরেকটু আশ্চর্যজনক চোখে তাকিয়ে, তুমি আগে থেকে জানতে এইসব?

” যেদিন জিসান জোভান সেজে এই বাড়িতে এসেছিলো আমি সেইদিনি বুজেছি।পৃথিবীর সবার চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়।কিন্তু মায়ের চোখ, সেটা তো ফাঁকি দেওয়া যায় না।
সেইদিন জিসান এসে যখন আমাকে সালাম করে জড়িয়ে ধরলো তখন ওর ঘাড়ে আমার চোখ যায়।সেই দাগটা স্পষ্ট ভাবে বুজা যাচ্ছে যেটা তুমি ওকে ছোটো বেলা দুষ্টুমি করার জন্য মারতে গিয়ে দিয়ে ছিলে।
আমি যখন চিৎকার করে তোমাদের বলতে যাবো তখন জিসান আমায় চোখ দিয়ে ইশারা করলো তোমাদের না বলতে।এক ছেলেকে আমি কাছে পেয়েছি ঠিকি কিন্তু আমার সহজ সরল ছেলেটাকে খুন হতে হয়েছে।

সবাই হতভম্ব হয়ে আছে। মারিয়া সব শুনে ঘামের চিকন স্রোত বেয়ে যাচ্ছে কানের কাছে দিয়ে।এইখান থেকে যদি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কোনো উপায় থাকতো তাহলে এখনি হয়ে যেতো।চোখ যেনো উপরে দিকে উঠাতে পারছেনা সে। নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে আছে।

জোভানের বাবা গম্ভীর গলায় বললো,জিসান, তুমি আমাদের সব খুলে বল।আমি শুনতে চাই।

জিসান বললো,বাবা, শুরুটা হয়েছিলো আমার আর জেবার রিলেশনের পর।জেবার ভালোবাসায় আমি এতোটা অন্ধ ছিলাম কে কি বলেছে বা করেছে তা আমার জানার বিষয় ছিলো না।নিজের পরিবারের মানুষ গুলোও কিন্তু আমার কাছে কম আপন ছিলো না।নিজের দুই বোনের পাশাপাশি মারিয়াকেও আমার বোনদের এক অংশ ভাবতাম।কিন্তু মারিয়া? (মারিয়াকে উদ্দেশ্য করে) তুই ভাবতি আমি তোর ভাই?

মারিয়া তখনো চুপ করে ছিলো,তার মনে ভিতর যেনো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উতালপাতাল করছে।হাঁটু গুলো যেনো ঘুটঘুট করে কাঁপছে।কি করবে কিছুই তার মাথায় আসছে না।
জিসান আবার বলতে শুরু করলো,বাবা তোমাদের মনে আছে? যেদিন আমি জেবার কথা ফাস্ট বাসায় বললাম সেইদিনের কথা? মারিয়া তখন আমায় কি বলেছিলো? সেটা মনে আছে? তবে আমার মনে আছে।বলেছিলো,ভাইয়া একটা বাহিরের মেয়ে বিয়ে না করে ঘরের মেয়ে বিয়ে করলেই তো হয়।
মা কিন্তু সেদিন বলেছিলো, আমার ছেলে যাকে পছন্দ করেছে তাকেই সেই বিয়ে করবে।কিন্তু মারিয়া সেখান থেকে উঠে চলে গিয়েছিলো।
পরের দিন রাতে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলাম, পিছন থেকে মারিয়া এসে আমায় জড়িয়ে ধরে।আমি পিছনে ফিরতেই মারিয়াকে দেখে আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ও কেনো আমায় এই ভাবে জড়িয়ে ধরলো।মারিয়া বললো সে আমায় তার বুজ হওয়ার পর থেকেই ভালোবাসে। তারপর তাকে রুমে নিয়ে এসে অনেক ভাবে বুজালাম।মারিয়াও মেনে গিয়েছিলো।জিসান আরও কিছু বলার আগেই মারিয়া চিৎকার করে বললো, না আমি মানি নি।তুমি আমাকে ঠকিয়েছো,
আমার ছোট্টো মনের ভালোবাসাকে ঠকিয়েছো।কি নেই আমার মাঝে।ওই জেবার মাঝে যা আছে আমার মাঝেই তা আছে।তাহলে কেনো আমাকে তুমি ভালোবাসতে পারলেনা?(চেঁচিয়ে কথা গুলো বলছে মারিয়া)
পরিবেশ টা নিস্তব্ধতায় ঘিরে আছে।মারিয়ার কথা শুনে তার মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উঠে গিয়ে মেয়ের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে,এই ছিলো তোর মনে মনে? তুই জিসানকে চাস সেটা আমাকে বলতে পারতি।আমি প্রয়োজনে জিসানকে ভিক্ষা ছেয়ে নিতাম তোর বড় মার কাছ থেকে।

“কাকী আমার কথা কিন্তু এখনো শেষ হয়নি।প্লিজ তুমি বসো।আমাকে কথা শেষ করতে দাও।
জিসান আবারো মারিয়ার দিকে তাকিয়ে, আমি তোকে সেদিন বলেছিলাম,জেবাকে প্রথম দেখাতেই আমার ভালোলেগেছে।যে ভালো লাগাতে মানুষের ভালোবাসা তৈরি হয়। কিন্তু তোকে আমি সারাজীবন ছোটো বোনের মতো আদর স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছি তাকে কি ভাবে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশাবো? জেবাকে যে ভাবে নিজের কাছে টেনে নিতে পারি তোকে কিভাবে টানবো? তোকে যখন আমি জড়িয়ে ধরতে যাবো তখন তো আমার মনে হবে আমি আমার বোনের সাথে কি করছি এইসব। কথাটা শুনে সবাই নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
জিসান কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে লাগলো, আজ আমার বলতে লজ্জা নেই।সেই লজ্জা তুই আমার কেড়ে নিয়েছিস।যে মা বাবা সামনে কখনো আমার মাথা উঠিয়ে কথা বলতে হয়নি আজ সেই মা বাবার সামনে এইসব বলতে হচ্ছে।
সবার কাছে আমি হাত জোড় করে ক্ষমা ছেয়ে নিচ্ছি।এইছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না।আমাকে যে বলতেই হতো।হয়তো আজ নয়তো কাল।

‘থমথমে অবস্থায় মাসুদ বললো,জিসান আমার যেতে হবে।তুই আমাকে ডেকেছিস তাই আমি এসেছি।যা করার প্লিজ তাড়াতাড়ি কর।

মাসুদ তুই একটু বস, এতোদিন তো অনেক করেছিস আমার জন্য। আজ না হয় আরেকটু করলি।

জিসানের বাবা কোনো বনিতা না করে মাসুদের দিকে তাকিয়ে বললো,আমার ছেলেকে কে খুন করেছে মিস্টার মাসুদ?

মাসুদের উত্তর টা জিসান বলে দিলো,মারিয়া,তবে সে একা নয় বাবা।তার সাথে এমন একজন আছে যা আমরা কেউ কখনো কল্পনায় আনতে পারবো না।কিন্তু হ্যাঁ মারিয়ার পক্ষে একা এইসব কিছুই পসিবল ছিলোনা। যদি তিনি না মারিয়াকে উসকাতেন।এই খুনে সবছেয়ে বড় অবদান তো তারই।

চলবে,,,,