অনুবদ্ধ প্রণয় পর্ব-১৯

0
693

#অনুবদ্ধ প্রণয় 💛
#ইবনাত_আয়াত
পর্ব: ১৯

ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসতেই কেউ একজন মুখ চেঁপে ধরল। ছুটাছুটি করতে লাগলাম। এদিক টা নির্জন তাই ব্যাপার টা কারো কানে যায় নি। অগান্তক টার হাত নরম। বুঝলাম এটা কোন মেয়ে। ছেলের হাত এতটাও নরম হতে পারে না।
বেশিক্ষণ ভাবার সুযোগ হয়নি। তার আগেই ঢলে পড়লাম।

…………………

চোখ খুলতেই নিজেকে কোন এক অজানা রুমের বিছানায় আবিষ্কার করলাম। নিজেকে খুব দূর্বল অনুভব করলাম। উঠে বসার প্রয়াস করতেই নিজেকে খুব দূর্বল অনুভব করলাম। আবারো দেহের সব ভার বিছানায় ছেড়ে দিলাম। হঠাৎ রুমে কে যেন প্রবেশ করল। আবছা আলোয় অবন্তীর মুখ টা অবলোকন করতেই চমকে গেলাম। উঠে বসলাম। সে এখানে কেন নিয়ে এসেছে আমার?

– ‘জ্ঞান ফিরেছে মহাশয়া?’

দাঁতে দাঁত চেঁপে বললাম, ‘হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আমায় এখানে কেন নয়ে এসেছো? এভাবে নিয়ে আসার মানে টা কী?’

সে এসে আচমকা গলা টিপে ধরল আমার। যদিও সে মেয়ে, তবুও তার সাথে পেরে উঠছি না। কারণ আমি এই মুহুর্তে খুবই উইক ফিল করছি। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তাহমিদ কে হয় তোমার? তাহমিদের সঙ্গে কাল কী করছিলে পার্কে?’

তার মানে.. আমার অনুমানই সত্যি? কেউ একজন আমাদের সত্যিই পিছু করছিল তাও আবার অবন্তী? সে আবারো চেঁচিয়ে বলল, ‘বলো সে কে হয় তোমার?’

তাকে ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম আমায় ছাড়তে। সে ছাড়তেই কাঁশতে শুরু করলাম। স্বাভাবিক হতেই বললাম, ‘তুমি বেঁচে আছো? কীভাবে?’

সে অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি আমায় চেনো? কীভাবে চেনো?’

‘চিনি কোন এক ভাবে। আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও। তুমি তো অ্যাক্সিডেন্টে মা’রা গিয়েছিলে তাই না? তবে কী করে বেঁচে গেলে? আর গেলে তো ভালো, কিন্তু তাহমিদের কাছে কেন ফিরে গেলে না?’

তার চোখে অশ্রু আবিষ্কার করলাম। সে চেয়ারে বসে পড়ল। মাথা নিচু করে হাত মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমি থমকে গেলাম। সে কাঁদছে কেন? প্রশ্ন করলাম, ‘কী ব্যাপার? তুমি কাঁদছ কেন অবন্তী? কী হয়েছে? বলো তুমি কী করে বেঁচে গেলে, আর তাহমিদের কাছে ফিরে গেলে না কেন?’

সে চোখ মুছে বলল, ‘সে অনেক কাহিনী। প্রথম একবার ভুল করেছি তার ভালোবাসা টা না বুঝে। দ্বিতীয়বার ভুল করেছি তাকে ছেড়ে গিয়ে।’

‘মানে?’

‘তুমি কে হও ওর? আর পার্কে ওর সঙ্গে এমন বিহেভ করছিলে কেন?’

চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ বাদে প্রশ্ন করলাম, ‘তোমার সঙ্গে ওই মেয়েটা কে?’

‘মানে? তুমি ওকে.. দেখেছ?’

‘হ্যাঁ তা দেখেছি। কে ও?’

সে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আমার মেয়ে।’

চমকে উঠলাম, ‘মানে? তোমার আর তাহমিদের?’
সে উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

‘আগে তুমি বলো তুমি কে হও ওর? ওর সঙ্গে তোমার এত সখ্যতা কিসের? ওকে ফাঁসিয়েছ তাই না? আমার অনুপস্থিতিতে আমার তাহমিদকে ফাঁসিয়েছ? নেক্সট টাইম ওর থেকে দূরে থাকবে আমি বলে দিচ্ছি!!’

‘কেন? কেন দূরে থাকব? কে হও তুমি ওর? যদি সত্যিই ওকে ভালোবাসতে তাহলে ফিরে যেতে তার কাছে। কিন্তু তুমি তো যাও নি। কেন যাও নি? আর তুমিই যদি ওই অ্যাক্সিডেন্টে মা’রা না যাও তাহলে ওটা কে ছিল?’

সে আবারো চুপসে গেল। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘তোমাকে আমি যেটা বলছি সেটা করবে। ফার্দার যদি তোমাকে আমি আবারো তাহমিদের সাথে দেখি তাহলে খু’ন করে ফেলব তোমাকে।’

হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। এসব কী হচ্ছে আমার সাথে? সে আমাকে টেনে নিয়ে গেল। ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিল। এবার আরো চমকালাম। আমায় কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছে শুধু এটুকু বলার জন্য? হাঁটতে লাগলাম আনমনে। তবে.. সে বেঁচে গেছে৷ কীভাবে? আর তাহমিদের কাছেই বা ফিরে যায় নি কেন? আর ওই মেয়েটা? সে কী তাহমিদ আর অবন্তীর মেয়ে? নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। হঠাৎ মাঝ রাস্তায় এসে মাথা ঘুরে উঠল। মাটিতে ঢলে পড়তেই সব কিছু আঁধার হয়ে এলো। নেত্রপল্লব বন্ধ হয়ে এলো।
__________
পিটপিট করে চোখ খুলতেই নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করলাম। উঠে বসতে গেলেই তাহমিদের মুখশ্রী নজরে এলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। উঠে বসার সময় বিছানায় নড়ে উঠার আওয়াজ হতেই সে সজাগ হলো। দ্রুত আমার কাছে এসে বলল,

‘ইয়ানাত তুমি ঠিক আছো? কী হয়েছিল তোমার? তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করোনি কেন? আর রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলে কেন?’

মাথা নেড়ে বলল, ‘শান্ত হোন তাহমিদ আমি ঠিক আছি। আপনি বসুন।’

‘না তুমি না বলা অবদি শান্ত হতে পারছি না।’

চুপ মে’রে রইলাম। কী বলব তাকে? যে অবন্তী বেঁচে আছে? আর তার সম্পূর্ণ খেয়াল আমার থেকে ঘুরে অবন্তীর দিকে চলে যাবে? কিছুটা ভয় কাজ করল।

‘আসলে.. আপনার আসতে দেরি হচ্ছিল দেখে চলে আসছিলাম। মাঝ রাস্তায় মাথা ঘুরে উঠল, তাই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।’

সে সন্দেহের চোখে তাকাল। বলল, ‘আমার আসতে মোটেও দেরি হয়নি। আমি প্রায় দশ মিনিট আগেই উপস্থিত হয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে পাই নি আর তুমি বলছ আমার দেরি হয়েছে?’

‘না মানে.. আমি.. ক্লাস দু একটা করেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তাই…’

‘হ্যাঁ সব ঠিক আছে কিন্তু তোমার গলায় এসব কিসের দাগ?’

আপনা-আপনি হাত গলায় চলে গেল। অবন্তী যখন গলা টিপে ধরেছিল তখন এই দাগ বসে গেছে। কী বলব তাকে?

‘জানি না কীভাবে.. হলো।’

‘দেখো ইয়ানাত! মিথ্যা বলা আমি মোটেও পছন্দ করি না। মিথ্যা বলো না আমার সাথে।’

‘আমি মিথ্যা বলছি না তাহমিদ। বিশ্বাস করুন।’

কিন্তু সে সন্দিহান দৃষ্টিতেই চেয়ে রয়। কিন্তু কিছু একটা ভেবে চুপ করে যায়। আমি অবন্তীর ব্যাপার টা ভুলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বার বার সেই প্রশ্ন গুলো মাথায় আসছে।

_____
ওই ঘটনার প্রায় দু’দিন কেঁটেছে। এই দু’দিন ভার্সিটি যাইনি। তাহমিদ যেতে দেন নি। এক প্রকার মন খা’রাপ করে ঘরে বসে ছিলাম। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলাতে ব্যস্ত আমি। কীভাবে? সে যদি বেঁচে যায়, তবে কার অ্যাক্সিডেন্টে শোক ছাঁয়া নেমে এসেছিল তাহমিদের মাথায়?

— হৃদস্পর্শিনী’র মন খা’রাপ?

আচমকা তাহমিদের গলা পেয়ে চমকে উঠলাম। হুটহাট ডাকলে যে কেউই চমকে যায়। হেসে বললাম,

— না তো! এমনি বসে ছিলাম।

— উহু! বেশ ক’দিন ধরেই দেখছি তোমার মন খা’রাপ। কী হয়েছে? ওদিন না ঘুরিয়ে নিয়ে এলাম। তবু মন ভালো হয়নি? আচ্ছা হয়েছে টা কী বলো তো? আগের মতো ঝগড়া করো না, কথা বলো না। শুধুই এখানে বসে বসে কী যেন ভাবনায় ডুবে থাকো। কী হলো বলো তো?

— কিছুই না তাহমিদ। এমনি, আসলে ক’দিন ধরে কেন যেন ভালো লাগছে না।

— সে কী হয়? তুমি এভাবে চুপ করে এক কোণে বসে থাকো, আমি অফিস থেকে আসি, কোথায় আমার সাথে একটু কথা বলবে, আমায় একটু হাসাবে, তা-না মন খা’রাপ মনে এখানে বসে আছো? ব্যাপার টা কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগছে না।

চুপ করে রইলাম। সে আমার পাশে এসে বলল, ‘ঘুরতে যাবে?’

‘আবার?’

‘যদি এতে মন ভালো হয়?’

‘হাহা। আচ্ছা। হতেই পারে। চলুন।’
__________
আজও তাহমিদ আমায় সেই পার্কে নিয়ে এলেন। যদিও আমার মাথায় অন্য চিন্তা ভাবনা ঘুরঘুর করছে। অবন্তীর ব্যাপার টা। সে-কি সত্যিই বেঁচে আছে? এসব কী বলছি? সে বেঁচে না থাকলে আমায় কী ভূতে কিডন্যাপ করল না-কি?
তবে.. রহস্য কী এসবের? কী হচ্ছে আমার সঙ্গে?

— এই যে দেখো। আবারো ভাবুরাণী ভাবনায় মত্ত হয়েছেন। বলি-কি ঘুরতে এসেও তোমার ভাবা লাগে? আচ্ছা কী ভাবো এত বলো তো, আমায়ও একটু শেয়ার করতে পারো।

হেসে ফেললাম, ‘আরে কিছুই না। আপনি ভুল দেখছেন। আমি তো প্রকৃতি টা উপভোগ করছি। ভাবছি কোথায়?’

গোধূলি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলল। তাহমিদকে বলল, ‘চলুন এবার বাসায় চলুন। আর কতক্ষণ থাকবেন? টাইম যে হয়ে এলো।’

‘হম চলো।’

বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কিন্তু কে জানতো বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য?
[চলবে.. ইন শা আল্লাহ]