অলীকডোরে চন্দ্রকথা পর্ব-২২+২৩+২৪

0
476

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব-২২)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

শুধু তোমার কল্পনায়
ডুবে থাকা, আমায় ভালোলাগায়,
ভালোলাগার স্বপ্ন বোনায়।

কখনো হারাবে না তুমি
চোখে চোখ রেখে কথা দাও।
থাকবে কাছে ছায়ার মত,
ছেড়ে যাবেনা কোথাও।

পড়ন্ত বিকেলের হাওয়া গায়ে মাখিয়ে বেঞ্চে বসা এক যুবক। গলায় মধু প্রেম মিশিয়ে গিটারে সুর তুলেছে। চোখ বন্ধ তার, চারদিকের খেয়াল নেই। যেন গভীর ভাবে কাউকে অনুভব করছে। মানসপটে ভাসছে তার অলীকডোরের প্রেয়সী চন্দ্রকথা। প্রতিটা লাইন ওকেই নিবেদন করছে। অথচ প্রেয়সী যে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে, সেই খেয়ালটি নেই। ছেলেটা বন্ধ চোখে যাকে অনুভব করছে, পাশে দাঁড়িয়ে প্রেয়সী মুগ্ধ চোখে তাকে অনুভব করছে। ছেলে মত্তমনে খাইছে….

হতে পারে তোমার একটু চাওয়ায়,
এনে দেবো শুকতারা কুড়িয়ে।
স্বপ্ন আঁকবো চন্দ্র দিয়ে,
পূর্ণিমাতে তোমায় বুকে জড়িয়ে।

এরপরেই স্বরে প্রগাঢ় প্রেম নিয়ে গাইল..

ভালোবাসি বলে দাও আমায়
বলে দাও হ্যাঁ সব কবুল……

মেয়েটার হৃদচঞ্চল হলো। সে বেশ বুঝতে পেরেছে মানুষটা তাকে ভেবেই গান গাইছে। চোখ মুগ্ধতা। অন্যরকম ঘোরে চলে গেছে যেন। অপলক চেয়ে রইল। তারপর গানের কথার উত্তরই দিল যে। বেঞ্চের পিছু দাঁড়িয়ে ঝুকে প্রেমিকের কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো স্বরে বলল, “হ্যাঁ সব কবুল।”

আকস্মিক কর্ণকুহুরে কথাটা পৌঁছতেই থমকাল গায়ক। গান থেমে গেল। তড়িৎ ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল। প্রেয়সীর লাজুক হাসি দেখে চমকে তাকাল। ওর চোখে রাজ্যের বিস্ময়। চমকে বলল,
“কী বললে!”

মুখ সম্মোহনের সাথে বলল, “কিছু কথা একবারই বলতে হয়।”

সৈকত ভ্রু নাড়িয়ে বলল, ” সেই একবারে তুমি কনফেস করছো!”

মুন উত্তর দিল না। ঘুরে এসে সামনে দাঁড়াল। উৎফুল্ল গলায় বলল, “আপনি যে গান ও করেন, বলেন নি কেন!”
“বললে কী করতে?”
“প্রতিদিন আপনার গান শুনতাম। ”

সৈকত অবিশ্বাস নিয়ে বলল, “আমার এই বেসুরো গান ভালো লাগছে তোমার?”

মুন প্রতিবাদ করে উঠল, “বেসুরো বলছেন কেন? কী চমৎকার গানের গলা আপনার! সুরটা একদম পারফেক্ট। ভীষণ ভীষণ মিষ্টি।”

মুন খুব চঞ্চল হয়ে উঠল। সৈকত চুপটি করে ওর চঞ্চলতা দেখছে। মুন অনুরোধের সুরে বলল,
“আমার শুনতে ভালো লাগছিল। আবার কন্টিনিউ করুন না!”

সৈকত স্মিত হাসল। মেনে নিল প্রেয়সীর কথা। গিটারে হাত দিয়ে বলল, ” আমার গানের ডিমান্ড আছে। যার জন্য গাইব, তাকে কাছে থাকতে হবে। দূর টুর থাকলে সুর উঠে না।”

ডাহা মিথ্যা কথা! মুন আসার আগে তো ঠিকই গাইছিল। ও আসার পরেই বাহানা শুরু। সব কাছে আনার ধান্দা, জানে তো মুন। সে ছোটো ছোটো চোখ করে তাকাল প্রেমিকের পানে।

সৈকতের পরীক্ষা শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন হয়েছে। নাহিদ অন্তর পরিবারের টানে ঢাকা ছেড়েছে, রুবাব ফিরেছে শেখ বাড়িতে। একমাত্র সৈকত রয়ে গেছে নিজের পূর্বস্থানে। বাড়ি থেকে হাজারখানেক ফোন এলেও প্রেয়সীকে ফেলে ঢাকা ছাড়বার ইচ্ছেটি হয়নি। ঢাকার ব্যাচেলর বাসায় পরিপূর্ণ বিশ্রামে দিন কাটছে তার। নিত্যরুটিন জুড়ে আছে মুন। কখনো কলে, কখনো ম্যাসেজে আলাপ চলছে। সকালবেলা ভার্সিটি যাবার পথে, ফিরতি পথে, সুযোগ পেলে বিকেলে একসাথে দেখা করছে, ঘুরছে, খুব প্রেম আদান প্রদান হচ্ছে। সময়ের পালাবদলে সম্পর্কটা আরও উন্নত হয়েছে। মুন এখন সৈকতের ভেতর বাহির সবটা পড়তে জানে।

মুন ওর পাশে গিয়ে বসল না। আগের মতোই সামনে দাঁড়িয়ে রইল। সৈকতের অন্তর্ভেদী নজর ওর দিকে নিবদ্ধ। চোখে চোখ পড়েছে। গভীর চাহনি মুনের সরল মন বেঁকে গেল। সে সম্মোহন হয়ে গেল। সৈকত ওভাবে তাকিয়ে ফিরতি গান ধরল,

তুমি শুধু আমারই হবে,
যদি করো মিষ্টি এই ভুল।

এরপরে মুনের দিকে হাত বাড়িয়ে গাইল,
হাতে হাত রাখতে পারো,
সন্ধি আঙুলে আঙুল।

মুনের চোখে ঘোর। সৈকতের চোখে চোখ রেখেই হাত রাখল। সৈকত আঙুলে আঙুল সন্ধি করাল। বন্ধনের জোরে কাছ টানল। পাশে আসল মুন। কাছটায় বসল। সৈকত হাসছে। গান থামিয়ে বলল,
“ভুল তো করে ফেললে চন্দ্রকথা!”

মুনের বাস্তবজ্ঞান হলো। হাতবন্ধনে চাইল। পরপরেই সৈকতের পানে। সৈকতের মুখ প্রাণবন্ত। মুন ওর কাধে মাথা রেখে বলল,
“ভুল যখন করেই ফেলেছি, তখন আপনিময় জীবন গড়ে মাশুল দিব চিরকাল। ”

চমৎকার কথায় সৈকত চমৎকার হাসল। এক হাতে গিটার অন্যহাতে প্রেয়সীকে আঁকড়ে ধরল। তারপর গান ধরল আবার। সুন্দর গাঢ় প্রেমের গান। সেই গানে অনুভব করল,দুজন দুজনাকে।

এক পর্যায়ে গান থামিয়ে সৈকত ডাকল,
“চন্দ্রকথা?”

বাদামওয়ালা পাশ কাটছিল। মুন তার থেকে বাদাম নিল। খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে জবাব দিল,
“হু!”
” রিটেন রেজাল্ট, ভাইবা, চাকরি হতে হতে এক দেড়বছর লেগে যাবে। এতদিন এভাবেই চলবে? ”

মুন প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চাইল। গম্ভীরমুখে বলল, “ভাইয়া তো এমনই শর্ত দিয়েছে। অপেক্ষা ছাড়া কী করার আছে?”

সৈকত তৎক্ষনাৎ জবাব দিল না। খানিক চুপ থেকে বলল,
” চলো বিয়ে করে ফেলি!”

তড়িৎ চমকে তাকাল মুন। সৈকতের চোয়ালে কৌতুকের লেশমাত্র নেই। এমনিতেই প্রতিদিন নিয়ম করে বিয়ের কথা বলে সৈকত। কিন্তু তখন ওর মুখে একটা কৌতুকভাব থাকে। কেবলই হাসিঠাট্টা। এহেন গম্ভীরতা থাকে না কখনো। আজ এত সিরিয়াস হবার কারণ বুঝল না মুন। সে প্রশ্ন করল,
” হঠাৎ বিয়ের কথা এলো কেন মাথায়?”

সৈকতের গম্ভীরতায় ভাটা পড়ল না,
” দুই একদিনের মাঝে বাড়ি চলে যাব। আবার কবে ফিরব তার ঠিক নেই। তোমাকে এখানে রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না। বিয়ে করে তুমি ও আমার সাথে চলো।”

মুন গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল সৈকতের কথা। ওর ভয় হচ্ছিল, কোথাও সৈকতের বাসা থেকে বিয়ের প্রেশার আসছে না কি। সুরমার সাথে কথা বলে বুঝেছিল, তিনি ছেলের বিয়ে নিয়ে সিরিয়াস। ছেলের মত পেয়ে যেই খুশি হয়েছেন। আবার না পাত্রী টাত্রী ঠিক করে ফেলেছেন, এই ভেবে ভেতরে ভেতরে আতঙ্কে ছিল। কিন্তু সৈকতের ভাব শুনে ওর ভয় নিমিষেই গায়েব হলো। ভয়ডর পালিয়ে চেহারায় হাসির প্রলেপ ছড়ালো। ভীষণ হাসি পেল ওর। সৈকত তবে ওর বিরহে গম্ভীরমুখে বিয়ের প্রস্তাব রেখেছে! ওকে ছাড়া থাকতে পারবে না। মুন ওকে খেয়াল করল, সৈকত মুখে গম্ভীরতার সাথে খারাপ লাগাও আছে। ওকে বিষন্ন দেখাচ্ছে। তা দেখে মুন প্রসন্ন হাসল। ওর কেমন যেন শান্তি লাগছে। চাপা হাসল সে। তারপর বলল,

” কদিন আগে আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বাণী তুলে বিয়ে ভেঙে এখন নিজেই বিয়ে করতে চাইছেন?”

“বিয়ে করার জন্যই বিয়ে ভেঙেছিলাম।”

মুন সকৌতুকে বলল, “বাবাকে বলেছিলেন, মুনের জন্য সুপাত্রের অভাব হলে আমরা খুঁজে দিব। তারপর পাত্র খুঁজতে গিয়ে আপনি নিজেকেই খুঁজে নিলেন! বাবা জানলে কী যে ভাববে!” মুখ চেপে হাসল মুন।

সৈকত কাধ থেকে গিটার নামিয়ে বলল, ” আমার কথা বাদ দাও। আংকেল যদি জানে তার মেয়ে তাদের অগোচরে ভার্সিটি বাঙ্ক করে ভাইয়ের বন্ধুর সাথে পার্কে বসে প্রেম করছে, তখন আংকেল তার সহজ সরল মেয়েকে কী ভাববে?”

মুনের এতক্ষণে যেন বাস্তবজ্ঞান হলো। সত্যিই তো, বাবা জানলে কী হবে? মুনের মুখে ভয় দেখা গেল। সেই ভয়ের লেশ বাড়িয়ে তখন ফোন এলো মনির শেখের। মুন ভয়ে নীল। ওর ধারণা বাবা বোধহয় জেনে গেছেন। চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। ভয়ে ফোন ধরল না। মনির শেখ ফোনে না পেয়ে ম্যাসেজ দিলেন,
” মুন কোথায় তুই? আমি তোর ভার্সিটির গেইটে অপেক্ষা করছি। আয়, আজ বাবা মেয়ে একসাথে বাড়ি ফিরব।”

মুন দিশেহারা। সে ভার্সিটি থেকে বেরিয়েছে সেই কবে। মা ফোন দেয়ার পর বলেছে, গ্রুপ স্টাডি আছে, ফিরতে দেরি হবে। বাবা যদি এখন গিয়ে খুঁজে না পায়, তবে তো ধরা পড়ে যাবে। ফোন হাতে নিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছে মুন।

সৈকত মজা পাচ্ছে বেশ। মুনের ভয় দেখে বলল,
“এইজন্যই বলছি, বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাও। তারপর যা বোঝাপড়া আমাদের জামাই শ্বশুরের হবে।”

মুন রেগে গেল আকস্মিক, “সব দোষ আপনার। ”
“আমি কী করেছি!” অবাক হয়ে বলল সৈকত।

মুন রেগে বলল,
“কিভাবে কিভাবে কথা বলে আমাকে প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছেন। না হলে আমি আপনার সাথে এখন এসে বসে থাকি!”

ওর কথা শব্দ সৈকত শব্দ করে হেসে ফেলল। বিস্ময় নিয়ে বলল, ” ও রিয়েলি, তুমি আমার প্রেমে পড়েছো! কিভাবে কিভাবে কথা বলেছি, বাই দ্যা ওয়ে?”

মুন রেগে তাকাল। কটমট করে বলল, ” এখন আমি বাবাকে কী বলব?”

সৈকত হাসতে হাসতে বলল, ” বলবে,একটা ছেলে আমাকে কিভাবে কিভাবে কথা বলে প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে, জোর করে রিলেশনে নিয়েছে, পার্কে ডেকেছে, জোর করে গান শুনিয়েছে, ঘাড় ধরে কাধে মাথা রাখিয়েছে। জোর করে আমাকে অনুরোধ করিয়েছে, আমি যেন তাকে গান শুনাতে বলি, গানের প্রশংসা করি। আমি এখন ওই ছেলের সাথে প্রেম করছি। এতে আমার দোষ নেই বাবা, ওই ছেলে আমাকে জোর করেছে।”

সুকৌশলে সৈকত যেন মুনকে অনেক কিছুই মনে করিয়ে দিল। ওর শ্লেষাত্মক কথায় মুনের রাগ বাড়ল তরতর করে, “মজা লাগছে আপনার? আমি যদি আজ বাবার কাছে ধরা খাই কী হবে জানেন!”

বাবার চিন্তায়, ভয়ে মুখের স্বর কেঁপে উঠল। বাবাকে ভয় পায় ও। খুব গরম মানুষ তিনি। মুনের কেঁদে দেবার ভাব। সে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। অভিমানী চাহনি নিয়ে যাবার পথ ধরল। এক কদম বাড়ানোর আগেই সৈকত হাত ধরে ফেলল। হেসেই বলল,
” এত অল্পতে হাইপার হলে হবে?”

মুন অগ্নিচোখে তাকাল। সৈকর এবারও হাসল। ওকে টেনে পাশে বসিয়ে দিল। মুনের হাতে থাকা ফোনটা নিয়ে কী যেন করল। মিনিট দুয়েক বাদে ফোন ফেরত দিল।
“এবার নিশ্চিন্তে যেতে পারো।”

মুন ফোন হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চেয়ে কিছু বলতে নিল। তার আগেই ম্যাসেজ টোন বেজে উঠল,
“আচ্ছা, সমস্যা নেই। সাবধানে যা।”

কৌতুহল নিয়ে আগের ম্যাসেজে চোখ বুলাল। ওর নাম্বার থেকে টেক্সট দেয়া হয়েছে, ” তুমি আসবে আগে বলবে না বাবা! আমি তো একটু আগেই বেরুলাম। এখন গাড়িতে আছি। জ্যামে আটকা পড়েছি।”

ম্যাসেজটা তো ও দেয়নি। তবে কে দিল? সৈকত?
বুদ্ধি করে সৈকত একটা ম্যাসেজের মাধ্যমে বাবার ভয়টা দূর করে দিল। বাবার ম্যাসেজ দেখে মুনের মনের ভয় কাটল। কিঞ্চিৎ প্রসন্ন হলো সে। আড়চোখে সৈকতের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হয়ে গেল। সৈকত ওর দিকে চেয়ে হাসল। গাল টেনে বলল,
“এত রাগ না দেখিয়ে আমাকে একটাবার বললেই হতো। সামান্য ব্যাপারে এত রাগ করা লাগে? পাগলি।”

কী সুন্দর প্রশ্রয়, আদুরে ভাব! মুন গলে গেল। কৃতজ্ঞতা হাসি টানল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “যাই তাহলে?”

সৈকত মজা করে বলল, ” এবার আমি সত্যিই বাধ্য করছি, থাকো। ”

মুন হতাশ চোখে চাইল। তারপর হাঁটা ধরল। কিছুদূর যাবার পর কারো হাতবন্ধনের আটকাল হাত। নরম সুর এলো কানে,
” চলো, একসাথে যাই। ”

সুন্দর প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে মুন ফিরল শেখ বাড়িতে। কিন্তু সেই ভাব উবে গেল মন খারাপের জোয়ারে………

চলবে……

#অলীকডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব-২৩)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

রূপালী চাঁদের আলোয় মাখা রজনী। শেখ বাড়িত খাবার ঘরটায় চলছে গম্ভীর আলাপ। ছেলের বন্ধুকে নিয়ে খেতে বসেছেন মনির শেখ। টেবিলে কেবল মাত্র তিন পুরুষ। রুবাব, সৈকত,,এবং মনির শেখ। তারিনা রান্নাঘর থেকে খাবার আনা নেয়ার কাজ করছেন। মুন খাবার ঘরের পাশে বসার ঘরে টিভি দেখার বাহানা দিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে সৈকতের কথা। বাবার সাথে সৈকতের আলাপনে অনেক অজানা তথ্য জানা হচ্ছে তার। মুন খেয়াল করল, সৈকতের প্রতি মনির শেখের বেশ আগ্রহ। সস্নেহে প্রশ্ন করছেন, মন দিয়ে গল্প শুনছেন, আবার পরামর্শ ও দিচ্ছেন। ব্যাপারটা মুনের ভালো লাগল।

জীবনের গতি নিয়ে আলাপ চলছে দুজনার। রুবাব নিশ্চুপ বসে খাচ্ছে। বন্ধু আর বাবার আলাপে বিশেষ একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না ওর । মনির শেখ ছেলের দিকে অসন্তোষ চাহনি দিলেন। তার ছেলেটা এমন নয় কেন? এই বুদ্ধিদীপ্ত সৈকতের সাথে কথা বলতে আরাম পান তিনি। চমৎকৃত হন। এই যে এখন তিনি প্রশ্ন করলেন,
” রিটেনের রেজাল্টের তো অনেক সময় বাকি! এই সময়টায় কী করবে?”

সৈকত নম্র স্বরে বলল, ” এখানেই একটি চাকরি করার চিন্তা করছি।”

মনির শেখ আগ বাড়িয়েই বললেন,
“সিভি বানিয়েছো? আমার জানাশোনা লোক আছে। সিভি ড্রপ করলে, চাকরি হয়ে যাবে। তুমি চাইলে ট্রাই করতে পারো।”

প্রবল আত্মসম্মানবোধের সৈকত তড়িৎ তা নাখোচ করল। শান্ত স্বরে জানাল, ” তার বোধহয় দরকার হবে না। আমি অলরেডি কয়েকটা কোম্পানিতে সিভি ড্রপ করে ফেলেছি।”

মনির শেখ অবাক হলেন। রিটেন শেষ হয়েছে যে মাস ও পেরোয়নি! এরমাঝে চাকরির ব্যাপার ও ভেবে ফেলেছে! রুবাব, নাহিদ, অন্তর যখন ছুটি কাটাতে বাড়ির পথ ধরেছে, সেখানে সৈকত হন্য হয়ে চাকরি খুঁজছে! ছেলেটা জীবন নিয়ে খুব সিরিয়াস। নিজের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরও দুঃখিত হলেন না মনির শেখ। বরং প্রশ্রয়ের সুরে বললেন,
” রিটেনের সময় তো খুব পরিশ্রম গেল। এখনই চাকরি হয়ে গেলে, আবার খুব প্রেশার যাবে। কটাদিন বিশ্রাম করো । তারপর না হয় চাকরিতে বাজারে নামলে।”

সৈকত সুন্দর করে হাসল। তারপর নমনীয় সুরে বলল, ” চাকরি বললেই তো হয়ে যায় না আংকেল। কখন হয় বা আদৌ হয় কি না তার ঠিক নেই। তাই আগে থেকেই চেষ্টা করছি। এখনো বিশ্রামেই আছি। শুয়ে বসে দিন কাটছে। চাকরির চেষ্টাতো পরিশ্রম হচ্ছে না। বিশ্রামটা ইন্টারভিউ ডাক পড়ার আগ অবধি হয়ে যাবে। আসোলে আঙ্কেল, আমার অবসর পছন্দ না। আগে তো পড়া ছিল, এখন তাও নেই। এই কদিনেই নিজেকে খুব বেকার লাগছে, শূন্যতা ভীষণ বিরক্ত করছে। তাই চাকরির তাড়া আছে এক আধটু। ” সময় নিয়ে বুঝিয়ে বলল সৈকত।

ওর ভাবনায় মুগ্ধ হলেন মনির শেখ। ছেলের দিকে তাকালেন এক পলক। যেন বুঝালেন, বন্ধুর থেকে শিখো কিছু। বাবার চাহনি দেখে চাপা শ্বাস ফেলল রুবাব। চাপা শ্বাস ফেলল পাশের ঘরে আড়িপাতা মুন ও। বিস্ময় ভাব ওর মুখের। পরীক্ষা শেষ হবার পরও যখন সৈকত যাচ্ছে না, তখন মুন ভেবেছে ওর জন্যই যাচ্ছে না। ভেবে কতই না খুশি হয়েছে সে। এখন জানল, সৈকতের এখানে থাকার কারণ সে নয়, চাকরি। অসন্তোষ হলো মুন। তা রাগে রূপ নিল, সৈকতের কথায়, এ কদিনে বিরক্ত হয়ে গেছি। সৈকতের পরীক্ষা শেষ হবার পর, দিনের অনেকাংশ একসাথে কাটায়। সেটা সৈকত উপভোগ করেনি? বেকার আছে বলেই তো ওরা একসাথে সময় কাটাচ্ছে, এটা ভালো লাগছে না? বিরক্ত লাগছে! তপ্ত শ্বাস ফেলল মুন।

রুবাবের খাওয়া শেষ। সৈকত আর মনির শেখের খাওয়া চলছে তখনো। খাওয়ার মাঝে গুরুগম্ভীর আলোচনা করছে বলে খাওয়া এগুচ্ছে না। খাওয়া শেষ হতেই উঠে দাঁড়াল রুবাব। বেসিনে হাত ধুয়ে টাওয়ালে হাত মুছতে মুছতে সৈকতকে বলল,
” খেয়ে উপরে চলে আয়। ”

সৈকত বলল, ” উপরে যাব না, খেয়েই বেরিয়ে পড়ব। একটু দাঁড়া। ”

রুবাব ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ও কিছু বলার আগে মনির শেখ সাধলেন, ” নাহিদ অন্তর ও নেই। কী করবে গিয়ে? আজ এখানে থেকে যাও!”

সৈকত নম্র স্বরে বলল, “স্যরি, আংকেল। আজ থাকা সম্ভব না। কাল বাড়ি ফিরব। ভোরের বাস ধরতে হবে। এখন না গেলেই নয়।”

‘কাল বাড়ি ফিরব’ কথাটা মুনের কানে বাজল কয়েকবার। অতিব সাধারণ কথাটা ভীষণ কঠিন ঠেকল ওর কাছে। সৈকত কাল বাড়ি চলে যাচ্ছে, আবার কবে ফিরবে তার ঠিক নেই। কতদিন দেখা হবে না, ভেবেই মন খারাপ হলো মুনের। ইদানীং মুনের ভীষণ মুড সুইং হচ্ছে। এই ক্ষণেও হলো। মন খারাপ ভাবটা হুট করেই গায়েব হয়ে গেল, তার পরিবর্তে উদয় হলো উবে যাওয়া রাগ। স্মরণ হলো, কাল সারাবিকেল কাটিয়েছে একসাথে, অথচ সৈকত একটাবারও বলল না ওকে। মুন কদিন ধরেই বলে এসেছে, সৈকত যেন যাবার এক দু’দিন আগে জানায় ওকে। হুট করে না যায়। তবুও জানাল না। এখন আড়ি না পাতলে বোধহয় জানতেই পারতো না। না জানানোর অপরাধে মুনের রাগ বাড়ল তরতর করে। থম ধরে বসে রইল।

তারিনা কিচেন থেকে ডেকে উঠলেন, “মুন খেতে আয়? ”

এতক্ষণের জমাট বাধা রাগটা মায়ের উপরই ঝাড়ল মুন। রুম থেকে বেরিয়ে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“খাবো না। কেউ ডাকবে না আমায়।”

আকস্মিক মুনের চিৎকার যেন বজ্রপাতের মতো আঘা ত করল পুরো বাড়িতে। বাড়ি কেঁপে উঠল যেন। সৈকত কথা বলছিল, মুনের কথা শুনে থেমে গেল। তড়িৎ ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল, দেখল মুন চোখ মুখ লাল করে প্রচন্ড রাগ নিয়ে উঠে যাচ্ছে উপরে। মুন যে আশপাশে আছে, সেটা খেয়ালে ছিল না সৈকতের। সৈকত বুদ্ধিমান ছেলে। মুনের রাগের কারণ ধরতে সময় লাগল না ওর। ঠোঁট চেপে বিড়বিড় করল,
“শিট! ম্যাসেজ করে দেয়া উচিত ছিল।”

মুনের হঠাৎ এহেন আচরণের কারণ বাবা মা কেউ বুঝল না। তারিনা অবাক হয়ে বললেন, “এই মেয়ের কী হলো!”

মনির শেখ সৈকতের সামনে অপমানিতবোধ করলেন কিছুটা। নরম গলায় বললেন,
“তুমি কিছু মনে করো না। মেয়েটার আজ মন মেজাজ ভালো নেই বোধহয়। ”

সৈকত চাপা শ্বাস ফেলল। বলতে ইচ্ছে করল, “আপনার মেয়ের মেজাজ পড়তে জানা আমাকেই মেজাজের সংজ্ঞা শেখাচ্ছেন! ”

বলল না। নিশ্চুপ হয়ে রইল। রুবাব সন্দিহান চোখে ওর পানেই চেয়ে আছে। মুন এত উগ্র কখনো ছিল না। ওর শান্তশিষ্ট বোন হঠাৎ এত রাগ করল কেন? সৈকত কী করেছে ওর সাথে? সেই চাহনি দেখে সৈকত ওর ভাব বুঝে ফেলল।

মুন যাবার পর সৈকতের কথার তাল হারিয়েছে। খাওয়া নাড়ছে শুধু, মুখে নিচ্ছে না। কাল চলে যাবে, যাবার আগে মেয়েটা এমন রাগ করে বসে আছে। খারাপ লাগছে ওর। মেয়েটাকে যাবার কথা জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল। এরপর খাবার ইচ্ছে মরে গেল। অথচ মনির শেখের সামনে থেকে উঠতেও পারছে না। বহুকষ্টে গিলল কেবল।

রুবাব আর উপরে যায়নি। বসার ঘরে বসে টিভি দেখছে। সৈকতকে বিদায় দিয়েই উপরে যাবে। সৈকত এসে ধপ করে পাশে বসে পড়ল। ওদের বন্ধুদের মাঝে রাখঢাক নেই। সেঁজুতির সাথে রুবাবের ঝগড়া হলে বন্ধুরা মিলে সমাধান করে। সবাই জানে সবটা। আজ ও রুবাবের ইচ্ছে হলো বন্ধুকে জিজ্ঞেস করতে। কিছু ওর সাথে বোন জড়িয়ে আছে বলে জিজ্ঞেস করতে পারছে না। বন্ধুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করা যায় কিন্তু বোনের যায় না। রুবাব জিজ্ঞেস করতে পারল না। সৈকত নিজ থেকেই বলল,
” কাল যাওয়ার কথা ছিল না। একটু আগে সিফাত ফোন দিয়ে জানাল, বাবা সিড়িতে পড়ে গেছে। খুব চোট পেয়েছে। সিফাত একা সামলাতে পারছে না। ইমার্জেন্সিতে যেতে তো হবেই, বল!”

রুবাব মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর না চাইতেও আগ্রহী হয়ে প্রশ্ন করল, ” সমস্যা হয়েছে কোথায়?”

অর্থ্যাৎ, এখানে মুনের রেগে যাবার কারণ কী! ঘুরিয়ে জানতে চাইছে রুবাব। সৈকত অন্যদিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“জানানো হয়নি। এতেই রাগ।”

রুবাবের চোয়ালে বিস্ময় দেখা গেল। এত সামান্য বিষয়ে মুন এমন ভয়ংকর রণমুর্তি ধারন করতে পারে! মুন তো রাগী স্বভাবের নয়। কোমলমতি বোন তার। হঠাৎ এমন অগ্নিস্বভাব হলো কিভাবে! প্রেমে পড়ে যাবার পর কি স্বভাব বদলে যায়!
রুবাব বন্ধুর দিকে তাকাল। সৈকতকে ভীষণ চিন্তিত আর বিমর্ষ দেখাচ্ছে। বাবাকে নিয়ে চিন্তিত ছেলেটা, অপরদিকে মুনটাও কী করছে না! রুবাবের মায়া হলো। বলল,
” তুই যা, এদিকটা আমি ম্যানেজ করে নিব।”

সৈকত দরজার দিকে তাকিয়ে জড় স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এখন আর বেরুবে না?”

মুনের ব্যাপারে কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে দুজনেরই। কেউ নাম নিচ্ছে, কারো দিকে তাকাচ্ছে। রুবাব ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। সৈকত দরজার দিকে। রুবাব বলল,
“আমি কখনো ওর এমন রাগই দেখিনি। বলতে পারছি না।”

সৈকত চাপা শ্বাস ফেলে বলল, “যত রাগ সব আমার উপরই।”

সৈকত অনবরত কল দিয়ে গেল। রিসিভ হলো না। যাবার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে ও যেতে পারল না। অশান্তি লাগছে। মেয়েটা ওর উপর রাগ করেই রাতে খায়নি, এই ব্যাপারটা ভালো লাগছে না ওর। কথা না বলা অবধি শান্তি আসবে না। সৈকত যাবে বলে ও গেল না। অপেক্ষা করল অনেকক্ষণ। কিন্তু কাজ হলো না। অগত্যা ফিরতে হলো ওকে।

বাসায় ফিরে কল করল। এবার দেখল নাম্বার ব্লক। ওর দুইটা নাম্বারই ব্লক করে রেখেছে। সৈকত চিন্তায় পড়ল। একদিকে বাবা অন্যদিকে প্রেয়সীর রাগ, দুটোর পাল্লা বইছে একসাথে। প্রেয়সীর অধ্যায়টা সরিয়ে বাড়িতে কথা বলল। মায়ের সাথে, ভাইয়ের সাথে। তাদের আশ্বস্ত করল, চিন্তা না করতে, কাল সে ফিরবে। বাবার চিকিৎসা ব্যবস্থা করবে সে। আপাতত ডাক্তার ডাকা হয়েছে। দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন। এখন ঘুমাচ্ছে বাবা। সৈকত কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো।

তবুও রাতে ঘুম হলো না সৈকতের। ওদের রাত জেগে কথা বলার অভ্যাস। রাতের খাবারের পরে কলে গিয়ে দুটো তিনটায় ফোন ছাড়ে। এ কথা সে কথা কথা হয় চন্দ্রকথার সাথে! আজ কথা বলার সঙ্গী নেই। একটা শূন্যতা ঘিরে ধরেছে ওকে। সেই শূন্যতা পূর্ণতায় রূপ নিল রাত দুটো নাগাদ।

বাসায় নাহিদের একটা সিম কার্ড ছিল। সিমের ব্যাপারটা মাথায় আসতেই সৈকত ঝটপট সেই সিম দিয়ে মুনকে ম্যাসেজ করল,
” চন্দ্রকথা, আমাকে কথা বলার সুযোগ তো দিবে? যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন হুট করে। খেতে বসার আগেই ফোন এসেছে। তোমাকে জানানোর সুযোগ পাইনি। না জেনে ভুল বুঝছো আমায়। ”

সৈকতের ধারণা ছিল, মুন বোধহয় এই বার্তা গ্রাহ্য করবে না। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে মিনিট খানেক বাদেই মুনের নাম্বার থেকেই ফোন এলো। ধরতেই উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“কী হয়েছে আংকেলের? ঠিক আছেন উনি? আমাকে বলেন নি কেন?”

ওর স্বরে বিন্দুমাত্র রাগ নেই। আছে কেবল চিন্তা। সৈকত অবাক হলো, এই না রেগে ছিল! অসুস্থতার কথা শুনতেই সব রাগ উধাও! হুট করেই রেগে যাবে, আবার হুট করেই ঠান্ডা হয়ে যাবে। সৈকত কিঞ্চিৎ হাসল। সৈকত মুনকে বাবার অবস্থার কথা জানাল। সবটা শুনে মুন অতিব দুঃখের সাথে বলল,
“স্যরি!”

রাগটা এবার ভালোবাসায় রূপ নিল। মুন আদর্শ প্রেমিকার মতো প্রেমিকের দুঃখের সময়ে সান্ত্বনা দিল। পাশে রইল। সবশেষে বলল,
“কটায় বেরুবেন!”
“ছ’টার বাস।”
“আমি আসি স্টেশনে?”
“কেন?”
“আপনাকে একটু দেখব।”

বাবার চিন্তা ঠেলে সৈকতের মাঝে প্রসন্নতা দেখা দিল। কোমল স্বরে বলল,
“ভোরে এত দূর থেকে তোমার আসার দরকার নেই। আমাকে যখন দেখতে ইচ্ছে করছে, আমি গিয়ে দেখা দিয়ে আসব না হয়।”

সেই কথাই রইল। ভোর পাঁচটায় একবারে রওনা দিল সৈকত। প্রেমিকের অপেক্ষায় ঘুম নামেনি মুনের চোখে। বারান্দাতেই ছিল সারারাত। ভোরের আবছা আলোয় সৈকতের অবয়ব চোখে পড়তেই ছুটে এলো নিচ তলায়। অতিব সাবধানে বেরিয়ে এলো। সৈকত যখন মুনকে কল দেবার জন্য নাম্বার ডায়াল করছিল, ঠিক তখনই মৃদু শব্দ তুলে গেইট থেকে বেরিয়ে এলো মুন। সৈকত অবাক হয়ে বলল,
“আমার অপেক্ষায় সারারাত এখানেই ছিলে না কি!”

সৈকতের কথার উত্তর না দিয়ে বলল মুন মলিন স্বরে বলল,
“চলে যাচ্ছেন!”

মুনের মলিন স্বর শুনে সৈকত চাপা শ্বাস ফেলল। কোমল সুরে বলল,
“মন খারাপ করো না। তাড়াতাড়ি ফিরব। ”

“কদিন থাকবেন?” মন খারাপ নিয়ে প্রশ্ন করল মুন। সৈকত বলল,
“মাসখানেক।”

মুন হকচকিয়ে বলল, “একমাস! একমাস আমি আপনাদের দেখা হবে না!”

মুনের মুখে মেঘ নামল যেন। সৈকত নরম গলায় বলল,
“দেখা হবে না কেন? ভিডিও কল দেখা হবে প্রতিদিন। যোগাযোগ তো হবেই।”

সৈকতের সান্ত্বনায় গলল না মুনের মন। মুখে হাসি ফুটল না। উলটো চোখে জল জমল। কাতর চোখে চাইল। সৈকত দূরত্ব কমিয়ে কাছে এলো। মুখ হাত দিয়ে আলতো সুরে বলল,
” যখন আমার কথা মনে পড়বে কল দিবে। আমার সময় সবসময় তোমার জন্য বরাদ্দ।”

মুনের চোখে জমাট বাঁধা জল এবার গড়াল গালে। সৈকত কাতর চোখে চাইল। মেয়েটা এমন করলে সে বাড়ি গিয়ে শান্তি পাবে? অনন্যচিত্তে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
” কাঁদছো কেন পাগলি? আমি তোমারই আছি, তোমার সাথেই। শুধু একটু দূরে যাচ্ছি। যখন তখন পাবে আমাকে। তুমি এমন করলে আমি কিভাবে যাব বলো? ”

প্রেমের প্রথম দিকে অনুভূতি থাকে জোয়ারের পানির সমান। এই জোয়ারে দূরত্ব নামক ভাটা খুব অসহনীয়। মুনের কাছেও প্রেমিকের দূরে যাওয়াটা ভীষণ অসহ্য ব্যাপার। একটা মাস মানুষটাকে চোখের সামনে দেখবে না, ওদের একসাথে খুনসুটি হবে না ভাবতেই বুক ফেটে যাচ্ছে। তারউপর সৈকতের কোমল প্রশ্রয় যেন সেই কষ্টকে লাই দিচ্ছে। চোখের পানি বাঁধা মানছে না।

প্রেমিকার ওমন পাগলামো দেখে একদিকে যেমন খারাপ লাগছে, অন্যদিকে কেমন যেন একটা আনন্দ লাগছে সৈকতের। যেই মেয়েটার জন্য ও দিনের পর দিন ব্যাকুল ছিল, সেই মেয়েটা আজ ওর দূরে যাবার কথায় ব্যাকুল হচ্ছে। এই মেয়েটা ওর। প্রতিবার বাড়ি যেত হারানোর ভয় নিয়ে, এবার যাবে একটা প্রসন্ন অনুভূতি নিয়ে। নিশ্চয়তা নিয়ে যে, মেয়েটা ওর। সৈকত একটুখানি হাসল। ফিরতি চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
” হয়েছে, এবার কান্না থামাও। বাবা একটু সুস্থ হলেই আমি ফিরব। এরমাঝে যদি ইন্টারভিউর ডাক পড়ে তবে হুটহাট ও এসে পড়ব। তোমাকে বেশিদিন বিরহে রাখব না। অল্প কটাদিনের ব্যাপার, চোখের পলকে কেটে যাবে। আর মন খারাপ করো না। একটু হাসিমুখে বিদায় দাও, চন্দ্রকথা। ”

মুনের কান্না থামল এই ক্ষণ। নাক টেনে বলল, “সাবধানে যাবেন। পৌঁছে ফোন দিবেন।”

সৈকত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা, আসি এবার?”

মুন মাথা নাড়াল। নিচের দিকে চেয়ে। সৈকত আশপাশে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আলতো করে মুনের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“নিজের খেয়াল রেখো, আমার চন্দ্রকথা। ”

________________

রাত জেগে সেঁজুতির সাথে প্রেমালাপে মত্ত ছিল রুবাবে। সারারাত জেগে কথা বলে ভোরের দিকে ঘুমানো ওদের পুরনো অভ্যাস। প্রতিদিন বিছানায় বসে কথা বললেও আজ রুবাব বিছানায় গা এলায় নি। ওর ধারণা বিছানায় গা এলিয়ে দিলে ও ঘুমিয়ে পড়বে। আজ ভোর বেলায় ও না ঘুমানোর পরিকল্পনা ওর। রুবাব মনস্থির করেছে সৈকতকে ছাড়তে স্টেশন যাবে। ঘুমালে যাওয়া মিস হয়ে যাবে। পরিকল্পনামাফিক জেগেই আছে। ওর চোখে ঘুম ভর করেছে। ঘুম তাড়াতেই উঠে হাঁটাহাঁটি করছে। কিছুক্ষণ পরই বের হবে। জানালার কাছে এসে সেঁজুতির সাথে কথা বলার ফাঁকে নিচে তাকাতেই থমকে গেল রুবাব। অনাকাঙ্ক্ষিত একটা দৃশ্য চোখে পড়ল। মুন গেইট পেরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে চুপিচুপি। এত ভোরে কোথায় যাচ্ছে! রুবাব অবাক হয়ে চাইল। গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখল। খানিক বাদেই গেইটের ওপাশে পুরুষ অবয়ব দেখা গেল। অবয়বটা চিনতে এক মুহুর্ত ও লাগল না রুবাবের। সে স্থির চোখে দেখল এক পলক। এরপর চোখ ফেরাল। বোনের প্রেম দেখা সাঁজে না ওর।

খানিক বাদে অবচেতন হয়ে ফিরতি গেল চোখ সেদিকে। তখন মুন কাঁদছে। সৈকত ওর চোখের পানি মুছে দিচ্ছে। দূর থেকেই রুবাব স্পষ্ট বুঝল, মুন মন খারাপ করে কেঁদে যাচ্ছে, সৈকত তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। থামানোর চেষ্টা করছে। এর মাঝে সৈকত মুনকে চুমু ও খেল। তড়িৎ অন্যদিকে ঘুরে গেল রুবাব। অস্বস্তিতে গাঢ় অন্ধকার ওর মুখ।

রুমে ফিরল ও। ফোনের অপাশে সেঁজুতি হ্যালো হ্যালো বলে গেল। রুবাব উত্তর দিচ্ছে না। ওর খেয়াল অন্যদিকে। রুবাব খুব করে বুঝতে পেরেছে তার বোনটা গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে সৈকতের সাথে। অনুভূতির প্রবণতা সৈকত থেকেও মুনের বেশি। এতটা জড়িয়ে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে! যদি পরে বিয়েটা না হয়! সে কিভাবে ফিরাবে বোনকে? তার একমাত্র আদরের বোনটা কত কষ্ট পাবে! একটা আতঙ্ক খেলে গেল রুবাবের মনে।

চলবে……..

#অলীকিডোরে চন্দ্রকথা। (পর্ব-২৪)
#আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা।

“ভাইয়া, মা কিন্তু সিরিয়াস। অলরেডি পাত্রী দেখে পছন্দ ও করে ফেলেছে। বি কেয়ারফুল!”

বাড়ি ফেরার পর বাবাকে নিয়ে হাসপাতাল বাড়ির চক্কর কাটতে কাটতে ক্লান্ত প্রায় সৈকত সবে একটুখানি বিশ্রামের আশায় বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে, ওমনি ছোটোভাই সিফাত এসে চমকপ্রদ তথ্য জানাল। ভাইয়ের কথায় চমকে গেল সৈকত। চোখ মেলে অবিশ্বাস্য চোখে চাইল। প্রশ্নবিদ্ধ করে বলল,
” মানে টা কি! আমার জন্য কিসের পাত্রী?”

“তোমার বিয়ের।”

অক্লান্ত মাথাটায় আকস্মিক উত্তপ্ততা দেখা গেল, “আমাকে জিজ্ঞেস না করে কিসের কথা আগাচ্ছে!”

ভাইয়ের রাগের উপর রাগ দেখিয়ে সিফাত বলল, ” তুই-ই তো মাকে অনুমতি দিয়েছিস পাত্রী দেখতে। কী ভেবে দিয়েছিস সেটাই মাথায় আসছে না আমার। মুন ভাবিদের বাড়ি থেকে ফেরার পরেই মা তোড়জোড় করে নেমে গিয়েছেন। আমি বারবার বলেছি, তোর সাথে কথা বলতে। তোর মতামত নিতে। বরাবরই মা বলেছেন, তুই -ই না কি মাকে বিয়ের কথা বলেছিস।”

সৈকতের মাথা ধপধপ করছে। সে কখন বলল, মাকে পাত্রী দেখতে? বিয়ে পাত্রী মানেই তো মুন। ওর কথা তো মাকে বলাও হয়নি। সেখানে বিয়ের কথা কখন বলল! সৈকত গভীর ভাবনায় পড়ল। সিফাতের কথা মাথায় এনে পরীক্ষার সময় মায়ের ঢাকা সফর স্মরণে আনল। মায়ের সাথে কী কথা হয়েছিল, মুনদের বাসায় কী হয়েছিল ভাবতেই গিয়েই মনে পড়ল সেই প্রথম পরীক্ষার দিন দুপুরবেলার কথা। মুন আর মা কথা বলতেছিল। সে গিয়ে বসল। তারপর মা স্বাস্থ্যের চিন্তা করে বিয়ের কথা তুললেন। সৈকত মুনকে রাগানোর জন্যই মজার স্থলে বলেছিল, দেখো।

সেই কথাকে কেন্দ্র করে মা নেমে পড়েছেন! সৈকত হকচকিয়ে বলল, “আরে, ওটা তো আমি মজা করে বলেছিলাম। ”

সিফাত রুষ্ট হয়ে বলল, ” মুন ভাবি থাকতে এমন মজা করছিস কেন? এবার সাজা ভুক্তো।”

সৈকত চোখ লাল করে গম্ভীরমুখে বলল, ” চাকরি না পাওয়ার আগে তো মায়ের বিয়ের চিন্তা করার কথা না। তবে হঠাৎ এত তোড়জোড় কেন!”

“হঠাৎ না। তোকে নিয়ে মায়ের চিন্তা সারাকালেরই। ঢাকা গিয়ে একা থাকিস। কী খাস না খাস, খেয়াল রাখার কেউ নেই। এসব নিয়ে প্রতিদিন মা মন খারাপ করে। আর বলে বিসিএস শেষ হলেই বিয়ে করিয়ে দিবেন। তোর না ও শুনবেন না। এখন তো তুই আরও হ্যাঁ বলে দিয়েছিস। মাকে আর পায় কে?”

সৈকতের মুখ গম্ভীর থেকে গম্ভীর হলো, “বাবা একটু সুস্থ হলেই আমি মুনের কথা জানাব মাকে। ”

“মায়ের হাবভাবে বুঝলাম, পাত্রী পছন্দ হলে এখনই বিয়ে পড়িয়ে বউ ঘরে তুলবেন! একটাদিন অপেক্ষা ও করতে রাজি নন মা।”

এই ক্ষণে সৈকতের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। এখনই বিয়ে! কিভাবে? রুবাবের সাথে তো সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, বিসিএস হওয়ার আগ অবধি বিয়ের প্রস্তাব যাবে না শেখ বাড়িতে। শুধু রুবাব না, সেদিন মনির সাহেবের সাথে বসার ঘরে অনেক্ষণ কথা হলো। তার হাবভাবে বুঝা গেল, আগামী ছ’মাস এক বছরে তিনি মেয়ের বিয়ে দিবেন না। তাছাড়া, এখনই বিয়ে করবে বললে তো হবে না। বিয়ের পর মুনের জন্য সুন্দর একটা লাইফের ব্যবস্থা করতে হবে। শেখ বাড়ির আদরের দুলালী। যেভাবে সেভাবে তো আর রাখা যাবে না। অন্তত সৈকত চাইছে না, অভাবের কারণে মুন একদিন সৈকতের ভালোবাসাটাকে ভুল মনে করুক।
সৈকত মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মুনের জন্য সুন্দর একটা সংসার, জীবনের ব্যবস্থা করতে পারলে তবেই সে মুনকে নিয়ে আসবে। এখনো সৈকত বেকার। ওর হাতে চাকরি নেই। একটা দায়িত্ব কাধে নেবার জন্য আয় দরকার, সেই আয় নেই। এখনই বেকারত্বের সংসারে মুনকে কিভাবে জড়াবে? মুন কি ভালো থাকবে? নাহ, ভালো থাকবে না। তার চন্দ্রকথা কষ্ট পাবে। তাছাড়া সে এখন কোন মুখে বন্ধুর কাছে তার বোনের হাত চাইবে? এখন তো কিছুই নেই ওর।
নাহ, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বিয়ের চিন্তা মাথায় আনা যাবে না। সবকিছু সুন্দর, সুসময়ে হতে হবে। তার চন্দ্রকথাকে ভালো রাখার দায়িত্ব তার। সেই দায়িত্বটা পরিপূর্ণ হবে না এখন, হবে চাকরি পাবার পর।

সৈকতের গভীর ভাবনার মাঝে ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ‘চন্দ্রকথা’ নামটা ভাসছে। সৈকত স্থির চোখে চেয়ে আছে সেদিকে। সৈকতের চোখে মুনের ছবিটা ভাসছে। বাড়িতে ওর বিয়ের কথা চলছে শুনলে কী ভীষণ কষ্ট পাবে মেয়েটা! অল্পতেই কেঁদে ভাসানো মেয়েটা এই কঠিন কথা শুরু কেঁদে জ্ঞান হারাবে। নাহ, ওকে জানতে দেয়া যাবে না। সৈকত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রথমবার ধরল না। নিজেকে স্বাভাবিক করল। দ্বিতীয়বার বাজতেই কেটে দিল। পরপরই নিজে কলব্যাক করল। সাথে সাথে মেয়েটার চিন্তিত স্বর কানে এল,
“ফোন ধরছিলেন না যে? সব ঠিক আছে?”

সৈকত কৃত্রিম হাসল। স্বাভাবিক স্বর টেনে বলল, ” বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম তো, ফোন হাতে নেয়া হয়নি। সবে ফিরেছি। ”

“আংকেলের অবস্থা কেমন এখন?”
“আগের চেয়ে ভালোই। ট্রিটমেন্ট চলতেছে। আশা করা যায়, দ্রুতই সেরে উঠবে।”

” আর আংকেলের ছেলের?” মুনের স্বর নরম হলো। প্রেয়সীর কথায় বাস্তবিকভাবেই হাসি ফুটল সৈকতের মুখে। কিঞ্চিৎ হেসে বলতে গেল
“আংকেলের ছ….

বলবার সময় তার থেকে কিছুটা দূরে বসা ছোটোভাইয়ের দিকে নজর গেল। যদি ও সিফাতের খেয়াল এদিকে নেই। সে ফোনে ব্যস্ত। তবু্ও সৈকতের অস্বস্তি হলো। সে উঠে দাঁড়াল। হেঁটে পা বাড়াল বারান্দার দিকে। বারান্দায় পা রেখেই বলল,
” আংকেলের ছেলে বউশূন্যতায় ভুগছে। অবস্থা বিশেষ একটা সুবিধার না।”

মুন কপট রাগ দেখাল, ” আপনার মাথায় বিয়ে, বউ ছাড়া আর কিছু আসে না?”

চাপা শ্বাস ফেলে সৈকত বলল, ” আপাতত আসছে না।”

কথার ভাব ধরে ফেলার আগেই সৈকত আবার বলল,
“কেমন আছে আমার চন্দ্রকথা?”

কোমল আদুরে স্বর সৈকতের। সেই স্বরে মুনের মন ছুঁয়ে গেল। লাই পেয়ে আহ্লাদী হলো যেন সে। বলল,
“আপনি কবে ফিরবেন?”

এর মানে হলো, আপনাকে ছাড়া ভালো নেই আমি। সৈকত হাসল আবার। এই স্বর, এই মানুষই ওর সারাদিনের ক্লান্তি, চিন্তা দূর হবার কারণ। প্রসন্ন মনে প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করল,
” ফিরলে আমার কী লাভ হবে?”

তৎক্ষনাৎ জবাব দিল না মুন। খানিকটা সময় নিয়ে বলল, ” আমার খুব মন খারাপ লাগে। তাড়াতাড়ি চলে আসুন না! ”

সৈকতের হাসি বাড়ল, ” তখন বিয়েটা করে নিলে এখন মন খারাপ করার সুযোগ পেতে না চন্দ্রকথা। আমার সাথেই থাকতে। হয়তো এখন আমরা…..

মুন সৈকতের কথার তীরের নিশানা ধরে ফেলল। পুরো কথা বলতে না দিয়ে কাতর গলায় বলল,
“আমার কেন যেন খুব ভয় লাগছে। বুক কাঁপছে শুধু শুধু। আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। ”

এই ক্ষণে বুক কাঁপল সৈকতের ও। মুন কি কিছু টের পেয়ে গেল! আসার কালে মুনের কান্নামাখা মুখটা চোখে ভাসল। ওমন চেহারা দ্বিতীয়বার দেখার ইচ্ছে হচ্ছে না ওর। মেয়েটা খুব কষ্ট পাবে। নাহ, মায়ের সাথে কথা বলতে হবে শীঘ্রই। সৈকত দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভয় দিল,
” আমার কথা একটু বেশিই চিন্তা করছো তো, তাই উল্টোপাল্টা খেয়াল আসছে। কিছু হবে না, চন্দ্রকথা। আমি সবসময় থাকব তোমার সাথে, তুমি আমি আমরা হয়ে।”

সৈকত কথাটা মুনকে বলল না কি নিজেকে বলল বুঝা গেল না। মুনের স্বর থেকে ভয় নামল। এবার সে প্রগাঢ় স্বরে আবদার করল,
” একটু দেখব। ভিডিওকলে আসবেন?”

কী সুন্দর কথা! সৈকতের মন প্রাণ জুড়াল। তবুও সে সায় দিতে পারল না। তার চেহারার এখন বিধ্বস্ত অবস্থা। এখন দেখলেই বুঝে যাবে কিছু একটা হয়েছে। সৈকত মিথ্যা বলল,
“ঘরে বিদ্যুৎ নেই। আমার ঘরে আলোর ছিটেফোঁটা ও নেই। আমাকে তোমাকে কিভাবে দেখাই বলো তো!”

_____________________

ছাদের রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক সুকন্যা। দৃষ্টি আকাশ পানে নিবদ্ধ। উদাস নয়নে একমনে কী যেন দেখে যাচ্ছে। চারদিকের খেয়াল নেই। চোয়ালে বড্ড বিষন্নতা তার। বাড়ির গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় সেই মেয়েটিকে চোখে পড়ল রুবাবের। ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। এই মেয়ের হলো কী! বাড়ির উঠোনে দেখা মিলল কর্তীর। মনের প্রশ্ন উগড়ে দিল তার কাছেই,
” মুনের কী হয়েছে? এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন?”

প্রশ্ন শুনে রাগে গমগম করে উঠলেন তারিনা,
“কদিন ধরেই কী খেয়ালে মেতেছে কে জানে! কেমন মনমরা হয়ে থাকে। কী হয়েছে আমাকে কী আর বলে? হাজারবার জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলে না। আমি কে, আমাকে কেন বলবে।”

মায়ের রাগ দেখে রুবাব স্বর নরম করল, “তুমি ওকে বকবেনা একদম। আমি ওর সাথে কথা বলব। ”

“জিজ্ঞেস করে দেখ, যদি বলে কিছু।”

রুবাব বাড়ির ভেতরে না গিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়াল। তারিনা পিছু ডাকলেন ছেলেকে।
“শুন!”
“হ্যাঁ, মা! পিছু ফিরল রুবাব।”

তারিনা করুণ গলায় বললেন, ” মলিন মুখে বসে ছিল বলে দুটো কথা বলেছি, ওমনি রেগে দুপুরে খায়নি। খাইয়ে দিস।”

রুবাব মায়ের উপর বিরক্ত হলো। গম্ভীরমুখে বলল, “মা তোমাকে কতবার বলেছি, মুনকে বকবেনা। ও দোষ করলে আমাকে বলবে, আমি বুঝাব। সামান্য কথায় বকে এখন না খেয়ে আছে মেয়ে। সন্ধ্যা হচ্ছে। সারাদিনের উপোস। তুমি যে কী করো না, মা!”

বিরক্তির শ্বাস ফেলে হাঁটা ধরল রুবাব। তারিনা ক্ষোভ নিয়ে বললেন, “বাপ ভাই মিলে আদরে বাঁদর বানিয়েছিস। এইজন্যই তো এত আহ্লাদ। কদিন বাদে বিয়ে দিলে এত আহ্লাদ বইবে কে?”

রুবাব থামল না। যেতে যেতে বলল, “যে আমার বোনের আহ্লাদ বইতে পারবে, তার হাতেই বোনের হাত দিব। ”

দ্রুত পায়ে ছাদে উঠে গেল রুবাব। মুন তখনো অবিচল। তবে কিছুটা ভিন্নতা আছে। আগে মাথা ছিল আকাশের দিকে, এখন তা হাতে ধরা ফোনের দিকে। কারো নাম্বার ডায়াল করছে। রিং হচ্ছে, বেজে কেটে যাচ্ছে। তুলছে না কেউ। ফিরতি কল দিচ্ছে মুন। একেকটা কল বেজে কেটে যাবার সাথে সাথে মন খারাপের পারত বাড়ছে। সারাবেলা দেখা মা মুনের মন খারাপের কারণ ধরতে না পারলেও রুবাব ধরে ফেলল। রুবাব জেনেও না জানার ভান করল। ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, ছাদের দরজা দেয়া হয়নি কেন?”

ভাইয়ের শব্দ শুনে সংযত হয়ে দাঁড়াল মুন। রুবাব নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে ছাদে পা রাখল। মুনকে দেখে বলল,
“এই ভরসন্ধ্যায় এখানে কী করিস?”

মুন নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, “এমনি হাঁটতে এসেছিলাম। তুমি কখন ফিরলে!”

“হলো কিছুক্ষণ। মা বলল, দুপুরে ভাত খাস নি। কেন খাস নি?”

“ইচ্ছে করছিল না।”

রুবাব বোনের কাছে গেল। নরম গলায় বলল,
‘মুন? কী হয়েছে তোর? ভাইয়াকে বল। মা বকেছে?”

মুন কৃত্রিম হাসল। বলতে পারল না, তোমার বন্ধু আমার ফোন তুলছে না ভাইয়া। কাল থেকে কথা হয়নি। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না ভাইয়া। একটু কথা বলিয়ে দাও!”

মুখে বলল, “এমনি মুড সুইং হচ্ছে।”

রুবাব চাপা শ্বাস ফেলল। কোমল হেসে বলল, ” কোন সমস্যা হলে ভাইয়াকে বলবি, ঠিক আছে? ভাইয়া সবসময় তোর সাথে আছি।”

মুন হেসে মাথা নাড়াল। রুবাব বোনের হাসি দেখে হাঁফ ছেড়ে বলল, ” আমিও দুপুরে খাইনি, চল একসাথে খাই।”

“খেতে ইচ্ছে করছে না।”
” না হয় চল বাইরে। ঘুরে ফিরে কিছু খেয়ে আসব।”

বোনকে বুঝিয়ে তৈরি হতে পাঠাল রুবাব। মুন ছাদ ছাড়তেই সৈকতের নাম্বারে কল দিল । ফোন বেজে কেটে গেল। বেশ কয়েকবার ডায়াল করল। ফলাফল শূন্য। শেষমেশ ডায়াল করল সিফাতের নাম্বারে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় প্রথমবারই রিসিভ হলো। সিফাতের সাথে কুশল বিনিময় করে সৈকতকে চাইল। সিফাত জানাল, দু’দিন যাবত বাবাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ির উপর আছে। বাবার পাশেই বসা সারাদিন। ফোন তুলবার ফুরসত নেই।

সিফাত সৈকতের কাছে গিয়ে ফোন ধরিয়ে দিল। সৈকত বাবা মায়ের পাশে বসা। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলল,
“কীরে এত জুরুরি তলব? সব ঠিকঠাক আছে তো?”

রুবাব উঁচু গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি ঢাকা ফির। তোর কারণে বাসায় টেকা যাচ্ছে না।”

সরাসরি কেউ কিছু বলল না। দুজনেরই জড়তা। অথচ দুজনেই বুঝল কথার কেন্দ্রবিন্দু এক নারীতেই ঠেকেছে। সৈকত কিঞ্চিৎ হাসল।
“অবস্থা কি বেশি খারাপ?”

রুবাব উত্তর দিল না। সৈকত বুঝে নিল। বাবা মায়ের দৃষ্টি ওর পানেই। উঠে যেতে পারল না সে। সৈকত বলল,
“বের টের হ। ”

রুবাব কপট রাগ নিয়ে বলল, ” সেই চিন্তা তোর করতে হবে না। তুই তোর কাজ কর। ফোন কোথায় তোর? কল দিতে দিতে ম ই রা গেলেও খবর থাকে না তোর?”

সৈকত শান্ত স্বরে বলল,
” রাগিস না দোস্ত। আমি ইচ্ছে করে করিনি এমন। ব্যস্ততায় ফোন সাইলেন্ট করে কোথায় রাখছি খেয়াল নেই। আমি ফ্রি হয়ে ফোন দিব।”

রাতের খাবার খেয়ে একটুখানি আরাম সময় পেয়ে ফোন হাতে নিল সৈকত। স্ক্রিন অন করতেই চক্ষুচড়ক ওর। মুনের নাম্বার থেকে প্রায় পঞ্চাশটা কল। নাম্বার, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে অগণিত ম্যাসেজ। মেয়েটা নিশ্চয়ই রেগেমেগে একাকার। আজ তবে ভালোই ক্লাস নেয়া হবে তার। রাগের সম্মুখীন হবার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হয়ে কল দিল সৈকত। একদম সাথে সাথে রিসিভ হলো। ফোনটা হাতে নিয়েই বসে ছিল না কি! কানে তুলে সৈকত নরম গলায় বলল,
“স্যরি!”

ওমনি খট করে কল কেটে গেল। সৈকত ফিরতি ফোন দিল। রিং হতেই কেটে দিল। যেন রাগটা কলের উপর মেটাচ্ছে। সৈকত হেসে ফেলল। সেও অনবরত কল দিতে লাগল। অপাশ থেকে মুন কেটে গেল। চৌদ্দতম কলটা কাটল না। রিং বেজে গেল। বেজে কেটে গেল। রাগ কমেছে। সৈকত হেসে ফিরতি ডায়াল করল। এবার রিসিভ হলো। অপাশ থেকে কোন স্বর এলো না। একবারে নিরব। ফোন কানে দিয়ে বসে আছে মেয়েটা। সৈকত গভীর স্বরে ডাকল,
“চন্দ্রকথা?”

ব্যাস এই ডাকটাতেই বধ হলো চন্দ্রকথা। কথা না বলার, রাগ দেখানোর পণ ভেঙে গেল। মনটাও নেতিয়ে গেল। চোখ বেয়ে গড়াল জল। কথার জবাবে এলো ফোঁপানোর শব্দ। সৈকত অডিও কল কেটে ভিডিও কল দিল। মুন রিসিভ করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। সৈকত তাকিয়ে রইল ওর দিকে। আজ সকালে বাবা বিয়ের কথা তুলেছে। মা ছিল না সেখানে। সৈকত নিশ্চুপ ছিল। বাবাকে কিছু বলতে পারেনি। এলাকার কোন মেয়ে ঠিক করে রেখেছেন তারা। বাবা সুস্থ হলেই বিয়ে সারিয়ে নিবেন। এমনটাই বাবার বক্তব্য।
তখন থেকে হারানোর ভয়টা ঘিরে ধরেছে ওকে।

সৈকত অপলক তাকিয়ে রইল প্রেয়সীর পানে। এই মেয়েটাকে হারাবে ও? অসম্ভব। একদিন ফোন দেয়নি বলে কেঁদে চোখ ফোলানো এই মেয়েটাকে ছেড়ে দিবে? যাকে পাওয়ার জন্য এত কাঠখড় পুড়িয়েছি, নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে বিসিএস দিয়েছে তাকে ছেড়ে দিবে? অসম্ভব। মেয়েটা ওর প্রাণে বাস করে। ওকে ছাড়লে বোধহয় সৈকত বাঁচবেই না। মুন আড়চোখে তাকাল ওর দিকে। সৈকতকে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ রাঙিয়ে বলল,
” একদম তাকাবেন না আমার দিকে। ”

সৈকত ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “আচ্ছা, আর তাকাব না।”
মুন রাগ রাগ মুখে বলল, “পুরো একদিন কোন খবর নেই। এখন এসেছে তাকাতে। চোখ ফেরান। ”

সৈকত শব্দ করে হেসে ফেলল। বলল, ” বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম । ফোন হাতের নেয়ার সময় ও হয়নি।”

মুন নাক ফুলাল, “একটা ম্যাসেজ করে দিলেই তো হয়। আমার চিন্তা হয়না?”
সৈকত হেসে আত্মসমর্পণ করল, “আচ্ছা, নেক্সট টাইম খেয়াল রাখব। এবার মুখটা ঠিক করো।”

মুনের মুখ ঠিক হলো না। বরং আরও আঁধার হলো। ভীত স্বরে বলল, “আমি আপনাকে নিয়ে খুব খারাপ খারাপ স্বপ্ন দেখতেছি। আমার ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে যেন, আপনি হারিয়ে যাচ্ছেন। প্লিজ চলে আসুন না আমার কাছে! আংকেলের চিকিৎসা ও না হয় ঢাকা থেকে করাবেন। আমার ভয় লাগছে।”

আবার কেঁদে ফেলল মেয়েটা। ওর চোখে স্পষ্ট হারানোর ভয়। সৈকতের বুক কাঁপল। ওর পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতি ভেবে সেই কাঁপন বাড়ল। কাঁপা স্বরেই আশ্বাস দিল,
” হারাব কেন পাগলি? আমি তোমার কাছেই থাকব চিরকাল। একটু অপেক্ষা করো। শীঘ্রই ফিরব। কিচ্ছু হবে না। চিন্তা করো না। ”

দুজনের কথার মাঝে সুরমার ডাক এলো। কথাটাও ঠিকঠাক হলো না। সৈকত কপালে ভাঁজ ফেলে মায়ের ডাকে সাড়া দিল। মায়ের ঘরে যেতেই সুরমা খুশিখুশি মুখে একটা ছবি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“দেখতো মেয়েটা কেমন?”

সৈকত মায়ের কথার ইঙ্গিত বুঝে গেল। মেয়েটাকে দেখল না। আগ্রহ ও প্রকাশ করল না। গম্ভীরমুখে বলল,
“মা, আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি, বিসিএস হওয়ার আগে এসব বিয়ে শাদীর নাম নিবে না। তবে এখন মেয়ে দেখার কথা কেন আসতেছে?”

” তুই ই না কইলি মেয়ে দেখতে। আমরা মেয়ে দেখছি। ঠিকঠাক কইর‍্যা আইছি। তুই কাল গিয়ে দেখে আসবি। কথা সব ঠিকঠাক ওহন বেঁকে বসলে তো হবে না।” সুরমা ক্ষিপ্ত হলেন। সৈকত কপাল চাপড়াল, কেন সে মায়ের সামনে ওমন মজা করতে গেল। তারপর গম্ভীরমুখে বলল,
“মানা করে দাও। বিয়ে এখন আমি করছি না।”

সুরমা রেগে গেলেন, ” তুই বিয়ে করে তোর বাপ ও করবে। ফাজলামো পাইছিস, একবার বলবি, মেয়ে দেখ, যখন মেয়ে দেখলাম, তহন কইরা দিবি। এগুলা চলব না। বিয়া তরে করতেই হইব। এইবার বিয়া না কইরা শহর ফেরত যাইতে দিমু না তোরে। ”

সৈকতের মুখ লাল হলো। রাগে ফেঁটে পড়ল সে। কিন্তু মায়ের সামনে প্রকাশ করল না। কেবল গম্ভীরমুখে বলল,
“আমার পছন্দ আছে।”

সুরমা হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন। কিছুই বলতে পারলেন না। খানিক বাদে অসন্তোষ গলায় বললেন,
“পছন্দ থাকলে ঠিকানা দে, প্রস্তাব নিয়া যাই। বিয়া তোরে করতোই হইব অহন। হয় তোর পছন্দ, নয় আমগো পছন্দ। ”

সৈকত পড়ল বিপদে । এখন মুনের ঠিকানা কিভাবে দিবে? দিলেই মা প্রস্তাব নিয়ে যাবেন। এতকালের পরিশ্রম সব ভেস্তে যাবে। যদি রুবাব আর মনির শেখ যদি বেঁকে বসেন! সৈকত কথা কাঁটাতে বলল,
“মেয়ে ঢাকার, প্রস্তাব নিয়ে কিভাবে যাবে?”

ঢাকার শুনেই তেঁতে গেলেন সুরমা। তিনি শহুরে মেয়ে মেনে নিবেন না। না মানে না।

চলবে….