অশান্ত বসন্ত পর্ব-৪+৫+৬

0
520

#অশান্ত বসন্ত
(চতুর্থ পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী
(#প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)

**********************
রান্নাঘরের কাজগুলো সেরে ঘরে ঢুকে খাটের কিনারায় বসলো করুনা। খুব গরম পরেছে আজ। আঁচল দিয়ে নিজের কপাল আর ঘাড়ের ঘামটা মুছলো।

শিখাটা খোলা জানলার দিকে আনমনে তাকিয়ে আছে। লালা পরে পরে জামার বুকের কাছটা ভিজে গেছে। কিছু লালা মাটিতেও পরে আছে। করুনা বকতে গিয়েও বকেনা। সস্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

শিখা ঘাড় ঘুরিয়ে মাকে দেখে জড়িয়ে ধরে মাকে। বহ্নির থেকে আট বছরের বড়ো শিখা। তবু ওর জগৎ জুড়ে শুধু মা আর বোনু। বাইরের জগতের সাথে পরিচয় নেই মেয়েটার।

চারদিকে তাকিয়ে বহ্নিকে ঘরে দেখতে না পেয়ে অস্থির লাগে করুনার। শিখাকে জিজ্ঞেস করলে ইশারায় শিখা জানিয়ে দেয় বহ্নি বাইরে গেছে।

মেয়েটা কিছুদিন ধরে ঘুমোচ্ছেনা রাতে।
করুনা নিজের হাতের সোনা বাঁধানো নোয়াটার দিকে তাকালো।একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো।

নোয়াটা অর্নবই কিনে দিয়েছিলো গড়িয়াহাটের সেনকোতে নিয়ে গিয়ে। বাড়ি ফিরবার পর অর্নবের মা কপালে চুমু খেয়ে পরিয়ে দিয়েছিলো নোয়াটা।

অর্নবের মা ক্যান্সারের পেশেন্ট ছিলো। ওদের বিয়ের একমাস কুড়িদিনের দিনের মাথায় মারা যান উনি। অতো যন্ত্রনার মধ্যেও করুনাকে সংসারের খুঁটিনাটি বোঝাতেন।

করুনার মাঝে মাঝে মনে হয় উনি বেঁচে থাকলে অর্নব হয়তো নতুন সংসার পাততে পারতো না। ছোটোবেলায় একবার মাকে হারিয়েছিলো আবার বিয়ের পর আর এক মাকে হারালো।

করুনা নিজের চোখ মুছে নিলো। এই নোয়াটাই এখন তার একমাত্র সম্বল। এটাই বেচে দিতে হবে। তাছাড়া মানুষটাই আর যখন তার নিজের নেই,তখন আদিখ্যেতা করে সধবার স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে ঘুরে বেরিয়ে কি হবে!

কিন্তু ভাবলেও নিজের হাতে খুলে ফেলতে পারলোনা।শত হলেও হিন্দু ঘরের বৌ,কোথায় যেন একটা সংস্কারে বাঁধছে, যদি কোনো অমঙ্গল ঘটে!আর সাথে থাকুক না থাকুক তার জীবনের প্রথম আর শেষ পুরুষ তো অর্নবই।

করুনা ভাবলো বিকেলে গিয়ে নোয়াটা বেচে দেবে। তবে বেচার আগে একটা শাখা-পলার দোকানে গিয়ে একটা প্লেন নোয়া কিনে নেবে। এই মুহূর্তে টাকাটা খুব প্রয়োজন।

বহ্নি যে কলেজ ভর্তির ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তায় আছে, মা হয়ে সেটা কি সে বুঝতে পারেনি নাকি! বহ্নির শুকনো মুখটাই যে সব বলে দেয়।কিন্তু মেয়েটা মুখে কিছু না দিয়ে এই রোদের ভিতর কোথায় যে গেলো!

সকালে উঠেই রান্নাঘরে ঢোকা করুনার বহুদিনের অভ্যাস। অর্নব খেতে ভালোবাসতো তাই বাজারটাও বরাবর গুছিয়েই করতো। কয়েকপদ না হলে মুখে রচতোনা। আগের দিন রাতেই সব্জি গুলো কেটে রেখে দিতো করুনা।

আজকাল রান্নাঘরের কাজ তেমন একটা থাকেনা।তবুও সকালেই নিয়ম করে রান্নাঘরে ঢোকে। কল পাড় থেকে বালতি করে জল এনে পুরো রান্নাঘর ধোওয়ায়।রাতের সব বাসন গুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বেসিনেই মেজে নেয়।

আগে এতো কাজ করতে হোতোনা করুনাকে, ঠিকেঝি ছিলো।
অর্নব পছন্দ করতোনা করুনা বাসন মাজে। বলতো, ‘তোমার নরম হাত শক্ত হয়ে যাবে’। ঠিকেঝি না আসলে নিজেই বাসন ধুতে বসতো। কতো কতো স্মৃতি অর্নবকে ঘিরে।

তবে শিখার জন্মের পর থেকেই কেমন যেন বদলে যেতে থাকে অর্নব। শিখাকে তো একেবারেই পছন্দ করতোনা।লালা পরতো বলে ঘেন্না পেতো।বলতো,’এক সাথে খেতে না দিতে’।

শিখা যদিও নিজেই ভয় পেতো বাবাকে। বাবা ধারে কাছে থাকলে মায়ের আঁচলটা আঁকড়ে ধরে থাকতো।বাচ্চারাও বোঝে অবহেলার ভাষা।

তবে করুনা দ্বিতীয় বার প্রেগন্যান্ট হওয়া নিয়ে অর্নবের দারুন উৎসাহ ছিলো। বলতো,’দেখে নিও এবার আমাদের ছেলে হবে, আর অবশ্যই সুস্থ ছেলে হবে। লালা ঝরানো ছেলে নয়’।

অর্নবের কথার ধরনে কান্না পেতো করুনার। কোনো বাবা তার নিজের মেয়েকে এতো ঘেন্না পেতে পারে!

অবশেষে অর্নবের স্বপ্নকে মিথ্যা প্রমান করে বহ্নি আসলো। অর্নব যদিও বহ্নিকে বেশ পছন্দ করতো।বলতো,’আমার জীবন্ত ডল পুতুল’।আদর করে ডলি নামে ডাকতো। আর সেই ডলিকে ছেড়ে যেতেও বাঁধলোনা অর্নবের। একবার খোঁজ পর্যন্ত করেনা মেয়েদের।

করুনার কোথাও যাওয়ার নেই নাহলে অর্নবদের বাড়িতে পরে থাকতোনা। যদিও অর্নব ওদেরকে বাড়ি ছাড়তে বলেনি, বরং নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে ভাড়া বাড়িতে গিয়ে থাকে।

আজকাল করুনার ডাল,ভাত আর একটা সব্জি বানালেই কাজ শেষ । কোন কোনদিন ডিমের কারি বানায়। তবে শিখা গলা ভাত ছাড়া কিছুই খেতে পারেনা।করুনা ডিম বানালে কুসুমটা মিশিয়ে দেয় শিখার ভাতে। শিখার জন্য প্রেসারে আলুসিদ্ধ দিয়ে আলাদা ভাত বসিয়ে বেশ কয়েকটা সিটি দিয়ে নেয়।

এই মেয়েটাকে নিয়ে বড্ড চিন্তা হয় করুনার। এ মেয়ের ভবিষ্যৎ যে কি তা ভগবানই জানেন। এখন বহ্নিটাই তার একমাত্র ভরসা। মন বলে,’বহ্নি ঠিক নিজের পায়ে দাঁড়াবে আর শিখার অপারেশনটা করিয়ে দেবে’।

অর্নব বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে আর গ্যাস ওভেনে রান্না করেনা করুনা। লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেই রেশনের কেরোসিন তেল তোলে,আর তা দিয়ে পুরনো জনতা স্টোভটা জ্বালিয়ে কাজ সেরে নেয়। ওই যত রকম ভাবে খরচ কমানো যায় আর কি!

শিখার চোখ দুটো চঞ্চল হয়ে উঠেছে, ব্যাপারটা খেয়াল করতেই দরজার দিকে তাকায় করুনা। ওই তো বহ্নি ঘরে ঢুকছে। ফর্সা মুখটা তেতে লাল হয়ে গেছে। গায়ের জামাটাও ঘামে ভিজে লেপটে গেছে গায়ে। ঘরে ঢুকে মাকে বললো,’স্নান করে আসছি’, করুনা বললো,’আগে জিরিয়ে নে।রোদ থেকে এলি, এখনি স্নান করলে শরীর খারাপ হবে’।

মায়ের কথায় বহ্নি মেঝেতে টান টান হয়ে শুয়ে পরলো।করুনা অস্থির হয়ে গেলো,’মেঝেতে কেন শুলি?’,এবার বহ্নি বললো,’কাল কলেজে ভর্তি হওয়ার লাস্ট ডেট। টাকা জোগাড় করতে গিয়েছিলাম টিউশন বাড়িগুলোয়।
ওরা কেউ এডভান্স দিতে রাজি হলোনা,
আমার আর কলেজে পড়া হবেনা মা’।

করুনা মেঝেতে বসে বহ্নির মাথাটা সস্নেহে কোলে তুলে নিলো। তারপর কপালে চুমু খেয়ে বললো,’তা কি হয় সোনা,পড়াটা যে কন্টিনিউ করতেই হবে তোকে,টাকার চিন্তা করতে হবেনা।আমি ঠিক ব্যবস্থা করে দেবো’,কাঁদতে কাঁদতে বহ্নি মায়ের কোলে মুখ গুজলো।

এদিকে সারা ফেসবুক তন্ন তন্ন করে খুঁজে ও ওই মেয়েটিকে বের করতে পারলোনা পল্লব।
অবশ্য এইভাবে নাম না জেনে কাউকে খোঁজা যায় না সেটা পল্লব নিজেও জানে।কিন্তু মন যে মানতে চায়না।

পল্লব ঠিক করেছে আবার কাঁথি যাবে। যদি কোনো খবর জোগাড় করতে পারে মেয়েটার। কাল সকালেই হাওড়া থেকে বাস ধরবে কাঁথির। চাকরি চলে গেলে আবার জোগাড় হয়ে যাবে। কিন্তু মেয়েটাকে খুঁজে না পেলে জীবনটাই বৃথা।
‘হয়তো তোমারই জন্য
হয়েছি প্রেমে যে বন্য,
জানি তুমি অনন্য,
আশার হাত বাড়াই’, তোলপাড় করছে গানের লাইনগুলো পল্লবের মনকে ।
(চলবে)

#অশান্ত বসন্ত
(পঞ্চম পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী
(#প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
****************
চেহারাই হোক আর কাজকর্মই হোক,সবেতেই অর্নব চৌধুরী এ’প্লাস।
আর অর্নবের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ আর অনুরাগের কারনে অর্নব বসের ডানহাত।

‘অর্নব ছাড়া বস আর অফিস দুটোই অচল’,মজা করে এমনটাই বলে কলিগরা।প্রচুর ছুটি জমে থাকলেও অর্নব ছুটি নেয়না।সময়ের আগেই অফিসে আসে আর সময়ের পরেই বাড়ি যায়।

অর্নব কখনো নিজের শারীরিক অসুস্থতা বা পারিবারিক সমস্যার প্যাটরা খুলে বসেনা, অফিসের বস বা কলিগদের সামনে।

অর্নব মনে করে শরীর থাকলে টুকটাক অসুস্থতাও থাকবে।ওষুধের দোকান গুলো কেন আছে?
তেমন বুঝলে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ওষুধ কিনে খেলেই হলো।এসব ছুটকোছাটকা শরীর খারাপ গুলো নিয়ে, ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে লোককে জানাবার কি দরকার সেটাই অর্নব বুঝে পায়না।

আর পরিবারটাও ওর একান্তই নিজের,তাই সেক্ষেত্রে সমস্যা আসলে তো আর বাইরের লোক সমাধানের রাস্তা দেখাতে আসবে না,নিজেকেই বুঝে মিটিয়ে নিতে হবে।তাই শুধু শুধু এসব জানিয়ে লোককে বিব্রত করবার কোনো অর্থই খুঁজে পায়না অর্নব।

সবার সাথেই সুন্দর সম্পর্ক অর্নবের।ওর বন্ধুসুলভ ব্যবহার আর মুখে লেগে থাকা হাসিটার কারনে অফিসের মতো জায়গাতেও কাঠি করবার মতো কেউ নেই।

অর্নবকে দেখলে কেউ বলবেনা ওর জীবনে কোনো সমস্যা আছে!
অবশ্য সমস্যাবিহীন মানুষ বোধহয় হয়না!প্রত্যেকের জীবনেই আলাদা রকম সমস্যা থাকে। সে অর্থে সুখী কেউই নয়।সবাই সুখী সাজার চেষ্টা করে।

অবশ্য অর্নবের অসুখী হওয়ার কথা ছিলোনা।করুনার মতো জীবন সঙ্গী তার, যে চাওয়ার আগেই সমস্ত প্রয়োজনের জিনিস হাতের কাছে হাজির করে।অর্নবের অসুখী হওয়ার একটাই কারন,’শিখা’।

মেয়েটা যতো বড়ো হচ্ছিলো,হাঁটতে চলতে পারছিলো,ততই যেন অসহ্য লাগছিলো অর্নবের।খালি পায়ে মেঝেতে হাঁটাও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলো।লালা পরে চটচটে মেঝে,ভুল করে পা ফেলে দিলে ঘিন ঘিন করে উঠতো গা।

যদিও করুনা নির্বিকার।ওই মেয়েকেই আদর করছে,স্নান করাচ্ছে,খাওয়াচ্ছে,গান গেয়ে ঘুম পারাচ্ছে।এসবের ফাঁকে রান্নাবান্না,বারবার করে ঘর মোছা কোনো কিছুতেই ওর ক্লান্তি নেই।করুনার নিরলস চেষ্টায় রুমাল ব্যবহার শিখেছে মেয়েটা।তবুও মাঝে মাঝে এখানে ওখানে লালা ঝরে পরতো।

অর্নবের সুন্দর নিখুঁত জীবনে শিখা যেন একটা অভিশাপ। শিখাকে নিজেদের জীবনে মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার মাঝে ভিতরে ভিতরে হাঁফিয়ে উঠছিলো অর্নব।সে কারনেই অফিসেই বেশিটা সময় কাটিয়ে ফিরতো।

রাতে আলাদা ঘরেই শুতো অর্নব।করুনা শিখাকে ঘুম পারিয়ে,সব কাজ সেরে একবার অর্নবের ঘরে আসতো।করুনা আসা অবধি অর্নব জেগেই থাকতো।করুনাকে উন্মুক্ত করে ওর ভিজে গাটা নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে নিতো।

অনেক সময় করুনা ছাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতো। শিখা পাশের ঘরে একা শুয়ে,জেগে উঠলে ভয় পেয়ে যাবে,এমনটাই আশঙ্কা থাকতো ওর।কিন্তু অর্নব ক্লান্ত না হলে করুনার ছাড় মিলতোনা।

এমনি ভাবেই আবারো প্রেগন্যান্ট হয়ে পরলো করুনা।ওই সময়টা অর্নব আবার আগের মতোই কেয়ারিং হাজব্যন্ড হয়ে গিয়েছিল ।খুব চেয়েছিলো একটা ছেলে হোক ওদের।কিন্তু মেয়ে হলো।

যদিও মেয়ে হুবাহু বাবার মতো ধবধবে ফর্সা,মুখের আদলটাও একেবারে বাবার মতোই।অর্নব মেয়ের চেহারা দেখে ছেলে না হওয়ার আফসোস ভুললো।

মেয়েটা ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছিলো,স্কুলে ভর্তির পরে অর্নব বাড়ি ফিরে নিজেই পড়াতে বসতো মেয়েকে।
মেয়েটাও ছিলো মেধাবী। অর্নব মেয়ের মধ্যে নিজেকে দেখতে পারতো।

অর্নব মা বাবার একমাত্র সন্তান ছিলো।সে কারনেই মাসির বাড়ি ছিলো ভীষণ পছন্দের।মাসির মেয়ে তিয়াশার থেকে রাখি পরা,ভাইফোঁটা নেওয়া,ওর যাবতীয় আবদার পূরণ করা সবেতেই ছিলো অর্নবের দারুন আগ্রহ।

ওখানেই করুনাকে দেখেছিলো অর্নব।
সুন্দরী বলা চলেনা,কিন্তু চেহারাটা ভারি মিষ্টি।
গানের গলাটাও দারুন।
মাসির বাড়ির ছাদে ঘরোয়া রবীন্দ্র জয়ন্তী পালনের দিন, মেয়েটা তানপুরা বাজিয়ে একের পর এক গান গেয়ে চলেছিলো চোখ বুজে।
অর্নবের প্রেমে পরা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলোনা।

তারপর থেকে মাসির বাড়ি যাওয়াটা আরো বেড়ে গিয়েছিলো অর্নবের। তিয়াশাও চাইতো করুনা ওর বৌদি হোক।তাই তিয়াশার মধ্যস্থতায় ওদের প্রেমটা এগিয়েছিলো দ্রুত।
করুনা মেয়েটা যেন সবার চাইতে আলাদা।ওকে দেখলেই মনটা শান্তিতে জুড়িয়ে যেতো অর্নবের।

অর্নব যতোটা উচ্ছল,করুনা ততোটাই শান্ত।
আসলে বিপরীত মেরু সব সময়ই নিজেদেরকে আকর্ষণ করে।

তবে অর্নব সুযোগ করে মাসির বাড়িতে আসলেও, করুনা সব সময় দেখা করতে আসতে পারতোনা।ওর দাদা বৌদিরা আগলে রাখতো করুনাকে।

অতএব বাধ্য হয়েই অর্নব করুনাদের বাড়ির উল্টো দিকের চায়ের দোকানে বসে চা-সিগারেট খেতো আর হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো করুনাদের বাড়ির দিকে।করুনার দুই বৌদি ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলো।দাদাদের দিয়ে থ্রেট দিয়েছিল।কিন্তু অর্নবের তাতে কিছুই যেতো আসতোনা।

করুনাকে না পেলে চিরকুমার হয়ে থাকবে,সেটাও আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছিলো করুনাকে।
তারপর গ্র‍্যাজুয়েশন এর পর প্রচন্ড চেষ্টায় চাকরিটা জুটিয়ে নেওয়ার পর নিজেই গিয়ে দাঁড়িয়েছিল করুনার বাবার সামনে।
কিন্তু করুনার বৌদিদের কল্যানে বাবা বা দাদারা কিছুতেই বিয়ে দিতে রাজি হননি অর্নবের সাথে।

অর্নবকে অবাক করে দিয়ে সেদিনই অর্নবের সাথে ঘর ছেড়েছিলো করুনা।
অর্নব করুনাকে কালীঘাটে নিয়ে গিয়ে সিঁদুর পরিয়ে সোজা নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো।

অর্নবের বাবা প্রথমে বাড়িতে ঢুকতে দিতে চাননি ওদের।অর্নবের মা বুঝিয়ে শুনিয়ে ওর বাবাকে মেনে নিতে বাধ্য করেছিলো ওদের বিয়েটা।

করুনাকে পেয়ে অর্নব যেন সব পেয়ে গেছির দেশে পৌঁছে গিয়েছিলো।ওর আর জীবন থেকে নতুন করে কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার ছিলোনা।
অফিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফোন করে খবর নিতো করুনার।বাড়ি ফেরার সময় ওর পছন্দের গুলাব জামুন আনতেও ভুলতোনা।এসব দেখে অর্নবের মা ভীষণ খুশি ছিলেন।

কিন্তু বিপর্যয় আসতে দেরি হয়না।হঠাৎই ধরা পরে অর্নবের মায়ের লিভার ক্যান্সার।তাও শেষ স্টেজে গিয়ে।অনেক চেষ্টা করেও মাকে বাঁচাতে পারেনি অর্নব।

মায়ের মৃত্যুর পর অর্নবের বাবা একেবারেই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন।খেতে পর্যন্ত চাইতেন না।করুনা জোর করেই ওর বাবাকে খাওয়াতো।
এরপর একদিন রাতে অর্নবের বাবার হঠাৎ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়।ঘুমের মধ্যেই সব শেষ। অর্নব অভিভাবকহীন হয়ে আরো আঁকড়ে ধরে করুনাকে।

এর দুবছরের মধ্যে শিখা আসে ওদের জীবনে,অর্নবের কথায় অভিশাপ হয়ে।(চলবে)

#অশান্ত বসন্ত
(ষষ্ঠ পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী।
(#প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
*******************
বড্ড ক্লান্ত লাগছে অর্নবের।অথচ চোখ দুটো থেকে যেন উধাও হয়ে গেছে ঘুম।
মাঝেমাঝে ভাবে যদি ব্রেনটা অসার হয়ে পরতো,তাহলে সারাক্ষণ মনের সাথে চলতে থাকা এই লড়াইটা ওকে লড়তে হতোনা।

গতকাল থেকেই খুসখুসে কাশি,গলা ব্যথা,মাথাটাও কেমন ভার ভার।সেই কারণেই দুদিন ধরে অফিসেও যাচ্ছেনা।
সারাটা দিন সে একলাই থাকছে।
আর একলা থাকার সুবাদে পুরনো ক্ষত গুলো থেকে রক্ত ক্ষরণ হওয়া শুরু হয়েছে।

আসলে ভুল ভেঙে গিয়ে ঠিকটা বুঝে যাওয়ার পর,এই হঠাৎ বুঝে যাওয়া ঠিকটার জন্য নিজেকে নিজের বিদ্রুপ করা ছাড়া আর কিছুই করবার থাকেনা।
বুকের ভিতর উঁকি মারলে এখন শুধুই জমে থাকা শ্যাওলা।

ভালোবাসার বিয়ে হলেও একটা সময় পর ভালোবাসতেই ভুলে গিয়েছিলো অর্নব।তবু
করুনার নরম শরীরটা তার ঘুমের আগে লাগতোই।যদিও করুনার দিক থেকে তেমন সাড়া মিলতোনা।চুপ করে ন্যাতার মতো পরে থাকতো।

অর্নবের সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে মেয়েটার জন্য।
কতো স্বপ্ন ছিলো ওকে ঘিরে।আজ জানেও না ওকে ছেড়ে তার আদরের ডলি কেমন আছে!জানেনা ওদের কেমন করে দিন চলছে!

প্রথম দিকে মানি অর্ডার করেছিলো কয়েকবার,কিন্তু ফেরত এসেছে টাকা।
করুনা জিদ করে তার টাকা ছুঁয়েও দেখেনি।

এমন যে হবে কে জানতো!মেয়েটা অফিসে নতুন জয়েন করবার পর,বস অর্নবকে ডেকে দায়িত্ব দিয়েছিলো কাজ শেখাবার।
নাম অদ্রিজা মজুমদার,বয়েস সম্ভবত শিখারই বয়েসী বা ওর চাইতে একটু বড়ো।

প্রথম দিন থেকেই মেয়েটির চোখে অর্নবকে ঘিরে মুদ্ধতা চোখ এড়ায়নি অর্নবের।অর্নব চোখ সরিয়ে নিলেও বুঝতে পারতো এক জোড়া চোখ তাকেই অনুসরণ করছে।

অর্নব এক সময় ব্যস্ততার অজুহাতে অন্য কাউকে কাজ শেখাবার দায়িত্ব দিতে বললেও বস রাজি হননি।অগত্যা মেয়েটি ছুটির আগে ও পরে কাজ শেখার অজুহাতে অর্নবের মাথা চিবোতে শুরু করেছিলো।

একদিন কাজ শিখতে গিয়ে রাত হয়ে যাওয়াতে অদ্রিজা অর্নবকে নিজের বাড়ি অবধি এগিয়ে দিতে বলে।অর্নব রাজিও হয়ে যায়।কারন অতো রাতে একটা মেয়েকে একা রাস্তায় ছেড়ে দিতে তার নিজেরও বিবেকে আটকাচ্ছিলো।

বাড়ি অবধি এসে অদ্রিজা জোর করেই অর্নবকে বাড়িতে ঢোকায়।তারপর অর্নবকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে নিজে ঘরের ভিতরে যায়।
অর্নব ভেবেছিলো, হয়তো অদ্রিজা ওর বাড়ির লোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চায়।

অতএব চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে ড্রয়িং রুমটা।বেশ সুন্দর ছিমছাম সাজানো।
চারদিকে রুচির ছাপ স্পষ্ট।
অর্নব উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়ালের অয়েল পেন্টিং গুলোতে মনোনিবেশ করে।

হঠাৎ একটা মিষ্টি পারফিউম অর্নবের নাকে আসে।চোখ ঘোরাতেই সামনে অদ্রিজা।
স্লিভলেস পিঙ্ক কালারের ক্রপ টপ আর ব্ল্যাক হট প্যান্টে অদ্রিজা রীতিমতো আকর্ষণীয়া।

‘আমি আসছি’,বলে বেরিয়ে যেতে চাইলে ও অদ্রিজা কফির মাগ হাতে ধরালো অর্নবের।
অর্নব বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে গরম কফিতেই চুমুক দিতে থাকে।কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলোনা।

অদ্রিজার সারা শরীর তখন কাম জ্বরে উত্তপ্ত।নিঃশ্বাস পরছিলো দ্রুত। দুচোখে অপেক্ষা, কপালে স্বেদ বিন্দু।হঠাৎই অর্নবের হাতের আধ খাওয়া কফির মাগটা টেনে ছুড়ে ফেলে দিলো মেঝেতে।তারপর জোর করে অর্নবের মাথাটা টেনে নিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরলো।

ঘটনার আকষ্মিকতায় স্তম্ভিত অর্নব।অদ্রিজা এলোপাথাড়ি চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকলো অর্নবকে।সত্যি বলতে কি,অদ্রিজাকে ঠেলে সরাবার শক্তি পর্যন্ত পাচ্ছিলোনা অর্নব।ভেতরে ভেতরে সে দুর্বল হয়ে পরছিলো অদ্রিজার প্রতি।

তবুও একবার শেষ চেষ্টা করলো অর্নব,এক ধাক্কায় অদ্রিজাকে সরিয়ে নিজেকে সামলাতে। কিন্তু অদ্রিজা দ্রুত নিজের অবশিষ্ট লজ্জা আবরণ ছুড়ে ফেলে দিলো।

কিভাবে পাতাল প্রবেশ করে পুরুষ সেটা জানবার তার প্রবল আকাঙ্খা!
শান্ত নদীতে অশান্ত সব ঢেউ তুলে নিমেষে অর্নবকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো অদ্রিজা।

করুনার কাছ থেকে যে ভালোবাসার উন্মাদনা চাইতো,সেটাই যেন অদ্রিজার রুপে ফিরে পেলো অর্নব।
সাময়িক ভাবে একটা অপরাধ বোধের অস্বস্তি কাজ করলেও সেটা কাটিয়ে ফেলতে দেরি হয়নি অর্নবের।

তাই তো প্রতিদিনই অফিস থেকে বাড়ি ফিরবার আগে উপভোগ করে নিতো জীবন।
যদিও লুকোচুরি খেলাটা বেশিদিন চলেনি।

করুনা জেনে যাওয়ায় এক রকম খুশিই হয়েছিলো অর্নব।সবাইকে ছেড়ে ভালো থাকার উদ্দেশ্যে অদ্রিজার সাথে রেজেস্ট্রি ম্যারেজ সেরে নিয়ে নতুন ভাবে সংসার পেতেছিলো।

অর্নবের এক উকিল বন্ধু অর্নবকে বলেছিলো,করুনার সাথে রেজেস্ট্রি ম্যারেজ না হলেও করুনা চাইলেই আইনের পথ ধরতে পারবে।কেননা রেশন কার্ড,ভোটার কার্ড সব জায়াগাতেই করুনার স্বামী আর শিখা, বহ্নির বাবার জায়গায় অর্নবের নামই জ্বলজ্বল করছে।

ব্যাপারটা নিয়ে বেশ চিন্তায় পরেছিলো অর্নব।
যদিও করুনা আইনের পথে হাঁটেনি।
এককথায় ওর দিকে আর ফিরেও তাকায়নি।
তাকাবেই বা কেন,যার হাত ধরে নিজের ঘরের সবাইকে ছেড়ে চলে এসেছিলো,সে যদি অন্যের সাথে ব্যক্তিগত সময় কাটায় সেখানে ভালোবাসার জায়গায় চরম নিস্পৃহতাই কাজ করে।

ভালোবাসার উল্টো পিঠে থাকে ঘৃনা,হয়তো সব জেনে যাওয়ার পর থেকে করুনা ঘৃণাই করে অর্নবকে।

তবে কিছুদিনের মধ্যেই অর্নব বুঝতে পেরেছিলো মস্ত বড়ো ভুল করে ফেলেছে। অদ্রিজা মোটেও সংসারী মেয়ে নয়।একটু যেন বেশিই স্বাধীনচেতা।

তাছাড়া যত দিন যাচ্ছিলো,কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব চলে এসেছিলো অদ্রিজার মধ্যে। ভালো মুখে কোনো কথার উত্তর পর্যন্ত দিতোনা।অর্নবের ছোঁয়া ও পছন্দ করতোনা।

সারাক্ষণই একটা বিরক্ত ভাব অদ্রিজার মধ্যে।বয়েসের ফারাক টা যে ধীরে ধীরে দুজনের কমিউনিকেশনে বাঁধা সৃষ্টি করছিলো,সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছিলো অর্নব।

এই ভাবেই হয়তো কাটিয়ে যেতে হবে বাকি জীবনটা। নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দেয় অর্নব।

রান্নাঘরে গিয়ে পিছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরলো পল্লব।’কি হলো রে?হঠাৎ রান্নাঘরে?কিছু খাবি নাকি?খিদে পেয়েছে?’,মায়ের কথায় হেসে ফেললো পল্লব।বললো,’খিদে পাওয়ার কি উপায় আছে মা?খিদে পাওয়ার আগেই তো পেট ভরিয়ে দাও তুমি’,আসলে ভাবছি কাল কাঁথি যাবো, ফুলমানির বাড়িতে,তুমি যাবে মা?।

সীমা অবাক হয়ে বললো,’তা হঠাৎ ফুলের বাড়ি যেতে চাইছিস কেন?এই যে সেদিন বললি,তোর দম ফেলবার ফুরসত নেই,এতো কাজের প্রেসার!’,।

পল্লব মাকে ছেড়ে এবার চেয়ারটা টেনে বসলো।বললো,’আচ্ছা মা তুমি আমাকে কতোটা ভালোবাসো গো?’,হেসে ফেলে সীমা বলে,’আসল কথাতে আয়।কি হয়েছে পরিস্কার করে বল’।

‘ভালোবেসে ফেলেছি মা,ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি। বিয়ে করতে চাই ওকে।আমার ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতে পারবে না মা?’,পল্লবের কথাতে হকচকিয়ে যায় সীমা।

বললো,’সেসব তো পরের কথা।আগে বল, ‘মেয়েটি কে?কাঁথিতে থাকে সেটা তো বুঝেছি।টাইটেল কি?কেমন বংশ?জানিস তো তোর বাবাকে।সব ঠিক না থাকলে বিয়ে দেবেনা’।

পল্লব বলে,’কিচ্ছু জানিনা মা।শুধু জানি বিয়ে করলে একমাত্র ওকেই বিয়ে করবো’,পল্লব উঠে মায়ের কাঁধে হাত দিয়ে মাকে নিজের দিকে ফেরিয়ে বললো,’বিশ্বাস করো মা,ওর নাম পর্যন্ত জানিনা।কথা বলতে চেয়েছিলাম।কিন্তু আমায় দেখে ভয়ে দৌড়োতে শুরু করেছিলো।তাই আর কথা বলা হয়নি’।

সীমা বললো,’সেকিরে তোকে ভয় পেলো কেন?’,পল্লব বললো,’সে কি করে জানবো কেন ভয় পেলো!তবে সত্যিই কিছু জানিনা মেয়েটার সম্পর্কে। শুধু জানি,আই লাভ হার,বাঁচবো না ওকে হারালে।তুমি বাবাকে পরে বুঝিয়ে যা হোক ভাবে ম্যানেজ কোরো’।

সীমা বললো,’তাহলে পিউকে নিয়ে যাস,ও বেচারির কিছু করার নেই এখন।সারাদিন ঘরে থেকে,বিরহের গান গেয়ে আমার কানের পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছে’,একসাথে হেসে উঠলো মা -ছেলে।

পিউয়ের মোটেও ইচ্ছে করছে না কাঁথি যেতে।কিন্তু মা দাদাভাই এর সাথে পাঠিয়েই ছাড়বে ওকে।দুম দাম পা ফেলে ঘরে এসে ব্যাগ গোছাতে বসলো পিউ।কতো ভালো ভালো জায়গা আছে ঘোরবার।না সেসব জায়গায় নয়।কোথায় যাবে,নাকি কাঁথিতে।মুখটা বেঁকিয়ে ভেঙচি কাটলো দাদার উদ্দেশ্যে।

(চলবে)