#আজও_তোমারই_অপেক্ষায়
#আফসানা_মিমি
৩.
আজ আঠারোই অক্টোবর, হিমার আঠারোতম জন্মদিন এবং আশা এবং হিমেলের পঁচিশ তম বিবাহবার্ষিকী। কথা ছিল হিমারা চারদিন পরই ঢাকায় চলে যাবে কিন্তু বাধ সাধেন হিমার বড়ো মামা আফজাল হোসেন। তিনি এই বছর হিমার জন্মদিন ও আাশা হিমেলের বিবাহবার্ষিকী আনন্দ নগরে পালন করবেন বলে ভেবেছিলেন। ভাবনা অনুযায়ী আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গদের দাওয়াতও করেছেন।
পূর্নিমার রাতে টিমটিম লাইটের সাথে আকাশে তারকারাজিও টিমটিম করে জ্বলছে। চাঁদের আলোয় পরিবেশ আরো মুখরিত করে তুলেছে। হোসনেআরা সেই সন্ধ্যা থেকে তেল হাতে মেয়ের পিছু দৌড়াচ্ছেন। মেয়ের মাথার চুল নিয়ে তিনার বড্ড চিন্তা। সেইদিনই তো আঁচড়ানোর সময় হাত ভর্তি চুল ছিড়ে এসেছে। এরপর থেকেই মেয়ের মাথার চুলের জন্য নানান গাছের শিকড়ের ঔষধী থেকে শুরু করে সব রকমের তেল মেয়ের মাথায় সুযোগ পেলেই ঢেলে দিচ্ছেন। মায়ের পাগলামোতে মারিয়া অসন্তুষ্ট। আজ এতো ইম্পর্ট্যান্ট দিনে সে তেল মাথায় দিয়ে ঘুরবে! অসম্ভব।
“ উফ মা! আজ তুমি আমাকে পেত্নী বানাতে চাইছো? তেল দিয়ে আজ আমার মান সম্মান নষ্ট করতে দিব না। তোমার অত্যাচারে এবার কিন্তু আমি হিমা আপুর সাথে ঢাকায় চলে যাবো।”
স্বামীর মৃত্যুর পর মারিয়াকে নিয়ে বড়ো ভাইয়ের কাছে এসে উঠেছেন। আদরে সোহাগে মা মেয়েকে কোন দিক থেকে কমতি রাখেনি। মারিয়ার পিছু দৌঁড়ে কিছুটা হাঁপিয়ে যান হোসনেআরা। তিনি বুঝতে পারলেন আজ মেয়েকে বাগে আনা যাবে না তাই হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন, “ তোর মাথার ঐ ছনের বাসায় কিছুটা পানি ছিটিয়ে দে গাঁধি। তেল তো দিবিই না মানুষের সামনে আমার ইজ্জত নষ্ট করিস না।”
মায়ের কথায় পাত্তা না দিয়ে মারিয়া নাচতে নাচতে বাহিরে বের হয়ে যায়। এখন সে হিমাকে খুঁজবে। হিমার কাছে গোলাপি রঙের একটা পারফিউম দেখেছে। সারা শরীরে মেখে বান্ধবীদের সাথে ঘুরে বেড়াবে। তবে তার নিজের সাদা জামার জন্য চিন্তা হচ্ছে। গোলাপি রংটা জামায় পড়লে যদি রং পরিবর্তন হয়ে যায়! তাহলে তো তার মা আবার বকবে। সে যাই হোক এত সুন্দর সুগন্ধী দেওয়ার জন্য সে এমন হাজারটা সাদা জামা কু’র’বা’নী করতে রাজি আছে।
লাল টকটকে রঙের গাউন পরিধান করে বিছানার উপর হাত পা তুলে হিমা বসে আছে। তার আজ বড্ড মন খারাপ হচ্ছে। প্রতি বছর তার জন্মদিনে প্রিয় বান্ধবী উপস্থিত থাকে। এবার আনন্দ নগরে পালন করায় আসতে পারেনি। দেয়ালের ঘড়ির দিকে নজর ঘুরিয়ে হিমা উঠে দাঁড়ায়। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে সাদা পাথরের কানের দুল নিয়ে পরে নেয়। গলার মালা পরিধানের সময় বিপাকে পরে যায় সে। জামার চেইনের সাথে চুল আটকে যা তা অবস্থা হয়ে গেছে। বেচারি টানাটানি করেও ছাড়াতে পারছে না। দুই একবার মারিয়ার নাম ধরে হাঁক ছাড়ে। কিছুক্ষণ পর একটি হাত এসে হিমার জামার চেইনের সাথে আটকে থাকা চেইন ছাড়িয়ে দেয়। হিমা অনুভব করে মানুষটির হাত থরথর করে কাঁপছে। হিমা মারিয়া ভেবে ঠাট্টা স্বরূপ বলে, “ কিরে মারু, তুই কি কোন পরপুরুষের কোলে পড়ে গিয়েছিলি! এতো কাঁপছিস কেন?”
“ পরপুরুষের গায়ে পড়লেই কাঁপুনি হয় না রে হিমালয়! কিছু কিছু সময় অনাকাঙ্খিত মানুষের ছোঁয়া পেলে কাঁপুনি চলে আসে।”
মীরের কথার আওয়াজ পেয়ে হিমা তড়িৎ গতিতে ফিরে তাকায়। মীরের মুখে দুষ্ট হাসি। কোষ্ঠকাঠিন্য রগীর মতো হাসি খুব কষ্টে চেপে রেখেছে। হিমার রাগ আরো বেড়ে যায়। গত সপ্তাহের কথা স্বরণে আসতেই চেহারায় অমাবস্যার গাঢ় আঁধার নেমে আসে। বিগত এক সপ্তাহ সে মীরের সাথে কথা বলা তো দূর! সামনেও পড়েনি।
এদিকে হিমাকে জ্বালাতে না পেরে মীর শান্তি পাচ্ছিল না। বিগত এক সপ্তাহ যাবত হিমার সাথে কথা বলার জন্য যা যা করার তাই করেছে। আশার হাতে পায়ে থেকে ধরতে শুরু করে রাদিফের বাবা আফজাল হোসেনের সান্নিধ্যও হয়েছে কিন্তু কেউ তার সাহায্য করেনি। কেননা মীর এবং হিমার সাপ নেউলের সম্পর্কের কথা সবাই অবগত। কেউ মীরের কথা কানেই নেয়নি। আজ হিমার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার ডাক কানে আসে। বাড়ির সবাই ব্যস্ত আশাপাশে মারিয়াও ছিল না। দরজা খোলা ছিল বিধায় না চাওয়া সত্ত্বেও মীর ঘরে প্রবেশ করে। হিমার পিঠ তখন দরজার দিকেই ছিল। পিঠের এক চতুর্থাংশ চুল সরে গিয়ে উন্মুক্ত ঘাড় দেখা যাচ্ছিল। মীর এই দৃশ্য দেখার সাথে সাথে জমে যায়। হিমার প্রতি আলাদা অনুভূতি জন্ম নেয় তার মাঝে। মীর ধীরগতির হিমার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায় অনুভব করে হৃদপিণ্ডের অচেনা আওয়াজ অনুভব করে। মীরের ঠোঁটে তৎক্ষনাৎ অন্যরকম হাসি ফুটে ওঠে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে হিমার চুল ছাড়িয়ে দেয়।
মীরের মুখে এখনো হাসি। যেন গুপ্ত কোন ধন খুঁজে পেয়েছে। আজ হিমাকে খুব অমায়িক লাগছে। রূপের রাজ্যের সকল রূপ হিমার কাছেও ফিকে। এতদিন মীর এই হিমাকে খেয়াল করেনি। আজ তার কি হলো! হিমাকে অন্যরূপে কেন দেখছে সে? এই এক সপ্তাহে কি সে হিমাকে নিয়ে বেশিই ভেবেছে? নাকি সময়ের সাপেক্ষে হিমাই বড়ো হয়ে গিয়েছে! কোনো প্রশ্নের উত্তরই মীরের জানা নেই। সে এখনো মন ভরে হিমাকে দেখছে।
“ তুমি আবার আমার সামনে এসেছো, মীর ভাই?”
“ তুই কি অনেক রাগ করেছিস, হিমালয়?”
“ রাগ করার মতো কি কিছু করোনি, মীর ভাই? তোমার পশমহীনা বুকের কথা বলেছি বলে এতো শাস্তি দিলে? হাত পা ভা’ঙা’র নাটক করে মনে কষ্ট দিলে, সেদিন তো তোমার ব্যবহারে আমার হৃদয়েও দাগ পরে গিয়েছিল আর আজ! আজ এত বড়ো একটা কাজ করতে পারলে?”
মীরের খুব হাসি পাচ্ছে। কে বলবে হিমাকে দেখে সে আঠারো বছরে পা দিয়েছে! কথাবার্তায় বাচ্চাসুলভ আচরণ। হিমা কি সত্যিই কষ্ট পেয়েছে! মীর পূর্বের ন্যায় হেসে শুধায়, “ আজ তো সাহায্য করেছি মাত্র, কষ্ট পেয়েছিস? এখন কি করব, যেই কাজের জন্য কষ্ট পেয়েছিস তা কি আগের মতো করে দিব? তো ঘুরে দাঁড়া, করে দেই।”
মীরের কথার মর্মার্থ বুঝতে এবার হিমা এক সেনেন্ডও দেরী করেনি। তাৎক্ষণিক হাতের কাছে যা ছিল তা দিয়েই সে মীরকে মা’র’তে শুরু করে, “ ভেবেছিলাম তুমি এক সপ্তাহে ভদ্র হয়ে গেছো, কিন্তু না! তুমি তো আগের মতোই ঠোঁট কা’টা লোকই রয়ে গিয়েছো। আমার ঘর থেকে বের হও বলছি।”
মীর হাসতে হাসতে বের হতে নেয়। হিমা অন্যপ্রান্তে ঘুরে দাঁড়ালে পুনরায় শুধায়, “ তোকে আজ অপরূপ লাগছে, হিমালয়। মনে হচ্ছে হিমালয় পর্বতের এক খণ্ড বরফ তোর গায়ে কেউ ছুঁয়ে দিয়েছে।”
হিমা খানিকটা লজ্জা পায়। কিছু বলার পূর্বেই মীরের চলে যাওয়া দেখতে পায়। সে চিল্লিয়ে বলছে, “ জন্মদিনে তোর জন্য সুন্দর একটা গিফট বাহিরে অপেক্ষা করছে হিমালয়। লজ্জায় লাল না হয়ে জলদি তৈরী হয়ে বাহিরে আয়।”
__________
কালো রঙের কাতান শাড়ির সাথে ম্যাচিং রয়ের পাঞ্জাবী পরেছে একজোড়া দম্পতি। মুখে তাদের অমায়িক হাসি। একসাথে দুই যুগের চেয়েও বেশি সময় পার করেছেন তারা। তাদের ভালোবাসার পূর্ণতা পেয়েছে। হিমাকে পেয়ে তারা পূর্ণ হয়েছে। অনেক বড়ো আয়োজন না হলেও
মানুষের জন্য পা ফেলা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
মারিয়া হিমাকে নিয়ে বাহিরে বের হয়ে আসে। আসার পূর্বে গোলাপি পারফিউম দিতে ভুলেনি। তার শরীর থেকে বের হওয়া সুঘ্রাণে ইচ্ছে হচ্ছে আকাশে উড়তে। সকলে সামনে ভদ্র মারিয়া কিছু করবে না। হিমাকে দেখে রাদিফের কেনা নতুন স্মার্টফোন তার দিকে ধরে। ক্লিক করল কয়েকটা ছবি ও ভিডিও ক্লিপ নিয়ে নেয়। এগুলো সে যত্ন করে রেখে দিবে। যখন হিমারা চলে যাবে তখন সবাইকে দেখাবে। অবশ্য এখানে উপস্থিত থাকা সকলের ছবি সে তুলেছে। ভদ্র ছেলে অল্প সল্প কাজও করেছে। মীরের দিকে যতোবারই ক্যামেরা ধরেছে ততবারই একটা না একটা অঘটন ঘটেছে। কখনো সে মীরের সিগারেট খাওয়া ছবি তুলেছে বা কখনো সে সঙ্গীদের চ’ড় থা’প্প’ড়ে’র ছবি তুলেছে। রাদিফ জানে, মীর যদি এই ছবিগুলো একবার দেখতে পায় তো ফোন নিয়ে নিবে আর ফেরত দিবে না।
কেক কাঁ’টা’র আগ মুহূর্তে হিমা প্রিয় বান্ধবীকে দেখে চমকে যায়। আশা ও হিমেলও কম চমকায়নি। হিমা খুশিতে প্রিয় বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, “ তুই কীভাবে? আমি ভাবতেও পারছি না তুই আসবি।”
রিপ্তী হিমাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই জবাব দেয়,“ আমি তো আসতেই পারতাম না, যদি মীর ভাই আব্বুকে না মানাতো। জানিস, তোর মীর ভাইটা যা সুদর্শন! আমি তো এক দেখাতেই ফিদা।”
রিপ্তীর চোখের ঝিলিক ও মুখের হাসি কোনটাই হিমার সহ্য হলো না। সে রিপ্তীকে ছেড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “ ঐ লোকটা একটা গু’ন্ডা। তোর মতো সুন্দরীর সাথে মানাবে না।”
কথাটা বলেই হিমা মারিয়াকে ডাকার বাহানায় চলে যায়। এদিকে রিপ্তী একা একাই বিড়বিড় করে বলে,“ গু’ন্ডা’রা’ও এতো সুদর্শন হয়! আমি তো দেখার পর পাগল হয়ে গিয়েছি।”
কেক কাঁ’টা’র মুহুর্তে হিমা আশেপাশে মীরকে খুঁজছিল। কিন্তু মীর কোথাও নেই। হিমার যে তার সাথে কঠিন বুঝাপড়া আছে। হিমাকে মেয়ে খুঁজতে বলে শেষে কিনা তার বান্ধবীর চোখেই প্রেমের চশমা লাগিয়েছে? মারিয়াকে এক ফাঁকে জিজ্ঞেসও করেছিল কিন্তু লাভ হয়নি। তার মতো মারিয়াও দেখেনি। খাওয়া দাওয়ার পর্ব চলছে। হিমাকে তার বড়ো মামা একজোড়া মোটা রূপার নুপুর উপহার দিয়েছেন এবং আদেশ করেছেন, যেন এই নুপুরজোড়া পা থেকে না খোলে। হিমা নুপূর পায়ে ঝনঝন শব্দে বারান্দায় আনমনে হাঁটছিল।
“ নুপুর পায়ে আলতা পরলে আরো সুন্দর দেখাতো কন্যা। রিনিঝিনি আওয়াজের তালে মনটা কন্যাকে বেশি টানবে কাছে। ইচ্ছে করবে, জনমভরে কন্যাকে দেখি!”
মীরের কাব্য কথায় হিমার চলনগতি থেমে যায়। সে পিছনে ফিরে মীরকে দেখতে পায়। বারান্দার পিলারে এক পা উঠিয়ে আরামে সিগারেটের ধোঁয়া আকাশে উড়াচ্ছে। সে জামাটা হালকা উঁচু করে মীরের কাছে এসে বলে, “ আলতা দিলে পা লাল হয়ে যাবে না! তখন তুমি কি এসে ঘষে মেজে পরিষ্কার করে দিবে?”
হিমার জবাবে মীর হাসবে কি কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। সিগারেটের বাকী অংশ ফেলে দিয়ে সিরিয়াস মুডে বসে। চিন্তিত হয়ে উত্তর দেয়, “ আমি কীভাবে পরিষ্কার করব রে হিমালয়! তোর ঘরে না যাওয়া জন্য তো নিষিদ্ধ বোর্ড লাগিয়ে রেখেছিস। তা পাড় করে গেলে তো তুই আমাকে নষ্ট পুরুষ ডাকবি।”
“ তোমার জন্য আজ থেকে সাত খু’ন মাফ। রিপ্তীকে নিয়ে এসেছো তাই।”
মীর হিমার দিকে আগাতে আগাতে শুধায়, “ সত্যিই কি তোর মনে জায়গা দখল করে নিয়েছি?”
হিমা ভয় পেয়ে যায়, পিছনে যেতে যেতে প্রত্ত্যুত্তর দেয়, “ আমি কি তাই বলেছি!”
মীর থেমে যায়। কি যেন ভেবে হাঁটা ধরে। যেতে যেতে ব্যাঙ্গ স্বরে একটা গানের সুর তুলে,
“ তুই জ্বালাইয়া গেলি মনের আগুন, নিভাইয়া যাবি না……
চলবে ইনশাআল্লাহ………..