#আজও_তেমারই_অপেক্ষায়
#আফসানা_মিমি
২.
পড়ন্ত দুপুরে বইয়ের ভেতরে ডুবে ছিল রাদিফ। বাহিরের চিৎকার চেচামেচি শুনে বই হাতেই বের হয়ে আসে সে। দূর থেকে মূর্তির মতো মামাতো বোন হিমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসে। কাছে এসে হিমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে,“ কিরে! দিন দুপুরে ভুত দেখলি নাকি?”
হেসে কথা বলে পাশ ফিরে তাকাতেই থমকে যায় রাদিফ। সাদা কাপড়ে কপালে এবং হাতে বেন্ডেজ করা মীর চেয়ার বসে ব্যাথায় কুঁকড়াচ্ছে। হিমা তাকে দেখেই হ্যাং হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মীরকে সকালেই ভাল দেখেছিল রাদিফ। এই সময়ের মধ্যে অঘটন কীভাবে ঘটালো বিষয়টি রাদিফকে ভাবাচ্ছে। সে নিশ্চিত হওয়ার জন্য মীরের কাছে গিয়ে হাতে থাকা বই দিয়ে পিঠে আস্তে করে আঘাত করে। ভীতু অসুস্থ রোগীর সামনে ইনজেকশন আনলে যেমন চিৎকার চেচামেচিতে ডাক্তারের কান ঝালাপালা করে দেয়, তার চেয়েও দ্বিগুণ আওয়াজে চিৎকার করে উঠে, “ আমার হাত! মে’রে ফেলল রে মে’রে ফেলল। মনে হচ্ছে এই বাড়ির সবাই আমার শত্রু।”
“ কিন্তু রাদিফ ভাই তো আপনার পিঠে মেরেছে। পিঠের আঘাত কি বুলেটের গতিতে এসে আপনার হাতের মধ্যে ঠেকেছে, মীর ভাই!
ভরা সভার মাঝে অবাঞ্চনীয় কথা একজনই বলতে পারে, আর সে হলো হিমা। রাদিফ হিমার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে অপরাধীর ন্যায় মীরের পিঠ বুলিয়ে ক্ষমা চায়, “ সরি রে, আমি ভেবেছি মজা করছিস। তা এসব কীভাবে হলো!”
মীর যেন এই সুসময়ের অপেক্ষা করছিল। আড়চোখে সে হিমাকেও দেখে নেয়। একরাশ দুঃখভরা কণ্ঠে প্রত্ত্যুত্তরে বলে,“ এ বাড়ির কেউ আমার ভাল চায় না রে! একজন তো কথায় কথায় খোঁটা দেয়, আরেকজন আমার পশমহীনা বুক নিয়েও উপহাস করে। কোথায় যাব বল!”
হিমা এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার হুঙ্কার ছুড়ে দেয়, “ তোমার হাত পঁচে যাক মীর ভাই সাথে ঠোঁটও এবং সেখানে পোকা ধরুক যেন আর কথা বলতে না পারো।”
হিমার রাগান্বিত কথার মর্মার্থ কেউ বুঝলো না একমাত্র মীর ছাড়া। মীর আড়চোখে হিমার চলে যাওয়া দেখে আবারও আর্তনাদ করে উঠে।
———-
আনন্দ নগরে আসলে আশার কৈশোরে দিনের কথা মনে পড়ে যায়। ঝিলে বিলে কতোই শাপলা ও কচুরিপানার ফুল কুড়িয়ে নিসে আসতো সে! পাড়ার এমন কোন ফল ফুলের বাগান নেই যেখানে আশার পা পড়েনি। গ্রামের নাম ডাক পরিবারের মেয়ে বলে কখনো ছাড় পেতো আবার কখনো এই নাম যশই তাকে বিচারের দরবারে উপস্থিত করতো।
বিকালের স্নিগ্ধ বিকেলে মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছেন আশা। সাথে রাদিফ, মারিয়াও রয়েছে। কৈশোরের মজার মজার ঘটনা মেয়েকে বলছেন। রাদিফ বরাবরের মতোই চুপচাপ ফুপির কথা শুনছেন। হিমা মারিয়া ছটফটে ভাব। এদিক সেদিক দেখছে। হিমা রাদিফের মতো শান্ত, ভদ্র ছেলে আর কোথাও দেখেনি। যখানে মীর একদম রাদিফের বিপরীত। মাঝেমধ্যে হিমার ভাবনায় আসে, মীর ভাইয়া কেন গ্রামে জন্মায়নি? গ্রামে থাকলে তো তার মায়ের মতো সেও বাঁদরামি করতে পারতো! রাদিফ ভাইয়া শহরে থাকলে পড়াশোনা করে অনেক বড়ো চাকরি করতে পারতো!
“ হিমা, ফুচকা খাবি?”
হিমা ভাবনায় বিভোর হলে সহজেই ফিরে আসতে পারে না। এটাও তার একটি বদ অভ্যাস। ভাবনার জগতে নিজস্ব ব্যক্তিদের কতটা হেনস্তা করে তা যদি কেউ অবলোকন করতে পারতো তাহলে হিমাকে বলতো, “ তুই আর ভাবিস না হিমা! আমি তোর ভাবনায় আসতে চাই না।”
মারিয়ার ডাকে হুঁশ ফিরে। সে ভাব নিয়ে বলে, “ জন্মিদের আগ পর্যন্ত তোর সকল খাবারের বিল আমি পরিশোধ করব মারু! এই রাদিফ ভাইয়া, তুমিও কিন্তু আমাদের সাথে থাকবে।”
প্রত্ত্যুত্তরে রাদিফ মাথা সায় দিয়ে আশার বলা গল্পে মনোযোগ দেয়৷ রাদিফ হিমার বড়ো মামার ছেলে আর মারিয়া হিমার ছোট খালার মেয়ে। হিমার মায়েরা এক ভাই দুই বোন। পিঠেপিঠি বোন হওয়ায় আশা ছিল বড্ড আদরের। তাইতো দুই যুগ পূর্বে নিজের পছন্দের পাত্রের সাথেই বিবাহ করে পুরান ঢাকায় পাড়ি দিয়েছিল সে। বিয়ের ছয় বছর পর হিমার জন্ম হয়। এই বছরই হিমা আঠারো বছরে পা দিবে এবং সেটা আগামী সপ্তাহেই। মজার বিষয় হচ্ছে, আশা এবং আতিকের বিবাহ বার্ষিকি একইদিনে। প্রতি বছর একসাথে জন্মদিন ও বিবাহবার্ষিকী পালন করা হয়। এবার আনন্দ নগরে জন্মদিন পালন করার ইচ্ছে।
বিকালের ভ্যাপসা গরমের মাঝে একটুকরো বাতাস মনে প্রাণে দোলা দেয়। নদীর পাড়ে আসলে তো কথাই নেই। আনন্দ নগরের পরিচিত স্থান ওয়াদ্দার দিঘি। বিশাল বড়ো পুকুরের দুই প্রান্তে দুই প্রান্তে চারটা দিঘি রয়েছে। তারমধ্যে একটি দিঘির সিঁড়ি ভেঙে অকেজো হয়ে আছে। হিমারা দল বেঁধে সেখানেই এসেছে। দিঘির শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দুহাত মেলে ধরে। প্রকৃতির সতেজ নিশ্বাসে রন্ধ্রে মিশিয়ে নেয়। প্রকৃতিও আজ হিমার তালে দুলছে অবিরাম। মায়ের এন্ড্রয়েড ফোন রাদিফের হাতে ধরিয়ে নানু বাড়ির বিশেষ মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করে নেয়।
“ রাদিফ ভাইয়া, মায়ের সাথে ছবি তুলবো দাঁড়াও একটু।”
আশা দিঘির উপরেই দাঁড়িয়ে ছিল। হিমাকে দ্রুত উঠে আসতে দেখে সাবধানের সহিত বলে, “ আস্তে আয়, পড়ে যাবি তো!”
মাঝে মাঝে মায়ের কথা সন্তানের উপর দোয়া বা বদ দোয়া হিসাবে আরোপিত হয়। হিমা নিজের বেলায় এইকথা বিশ্বাস করে। আশার কথার সাথে সাথেই হিমা পিচ্ছিল সিঁড়িতে পড়ে যেতে নিলে রাদিফ শক্ত হাতে হিমার হাত ধরে ফেলে। তাকে সোজা করে দাড় করিয়ে ধমকের গলায় বলে, “ এখানে কী দৌড় প্রতিযোগিতা হচ্ছে? এত তাড়াহুড়ো কীসের? আস্তে ধীরে চলাচল করতে শিখ। সবসময় তোকে বাঁচাতে কোন বডিগার্ড দাঁড়িয়ে থাকবে না।”
রাদিফ উচ্চস্বরে কথা বলছে। ব্যাপারটা হিমা, মারিয়া কেউ বিশ্বাস করছে না। রাদিফও উচ্চাওয়াজে কথা বলে থতমত খেয়ে যায়। সে আশার দিকে তাকিয়ে বলে, “ ফুচকা ওয়ালা চলে যাবে, চলো সবাই।”
রাদিফ চলে যেতেই পিছনে হাসির আওয়াজ শুনতে পায়। পরপর তার কানে হিমার বলা কথা ভেসে আসে, “ ফুচকা ওয়ালা চলে গেলে কী হবে শুনি? রাদিফ ভাই বলে আমাদের বডিগার্ড আছে না! সেই ফুচকা, ঝালমুড়ির ব্যাবস্থা করে দিবে।”
ফুচকার দোকানের সামনে উপচে পড়া ভীড়। আমরা মেয়েরা সাধারণত ফুচকাপ্রেমী। তেঁতুলের টকের সাথে শুঁকনো মরিচের গুঁড়ো দিয়ে ঝাল ঝাল ফুচকা না বানালে ফুচকা ওয়ালা মামার সাথেই আড়ি কাটি। টসটসে রসালো তেঁতুলের টকে ফুচকা ডুবিয়ে খেতে ভালবাসি। হিমারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। রাদিফ ফুচকার অর্ডার দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল। হিমার চঞ্চল চোখ রাদিফকে অনুসরণ করে, আশা ও মারিয়ার চোখের আড়ালে রাদিফের পিছু নেয়।
“ কি রে ব্যাটা, আসতে এতক্ষণ লাগে? কোন মাইয়ার ফুসফুস আইসক্রিম বানাতে গিয়েছিলি, শুনি?”
দিনে আলো ছড়িয়ে দেওয়া সূর্য্যিমামা আস্তে আস্তে নিজস্ব আলো কমিয়ে সন্ধ্যাকে অন্ধকার ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। হিমা রাদিফকে অনুসরণ করে ওয়াদ্দা দিঘির শেষ প্রান্তে চলে আসে। নিস্তব্ধ জায়গায় ভয়ে তার শরীর হিম হয়ে আসছে। কয়েকজন ছেলেপেলের আওয়াজ কানে ভেসে আসতেই হিমার চঞ্চল মন আরো চঞ্চল হয়ে উঠে।
হিমার দৃষ্টিতে তখনই মীর ধরা দেয়। সে লক্ষ করে, দুপুরের ব্যান্ডেজ করা সেই হাতের আঙুলে জ্বলন্ত সিগারেট জ্বলছে। মাথার বেন্ডেজও উধাও। মীর আারাম চিত্তে সিগারেটেরের ধোঁয়া আকাশে উড়াচ্ছে। রাদিফের উত্তরের পূর্বে হিমার চিৎকার ভেসে আসে,
“ তুমি এতো বড়ো মাপের মিথ্যাবাদী কি করে হতে পারলে, মীর ভাই?”
মীর সবেমাত্র সিগারেট ঠোঁটে ছুঁয়ে ধোঁয়া নিশ্বাসের সাথে ভিতরে নিচ্ছিল, হিমার হঠাৎ আগমনে মীর ভীষনভাবে বিষম খেয়ে ধোঁয়া নাক মুখ দিয়ে বের হতে আরম্ভ করে। মীর কোনভাবে নিজেকে সামলে বুকে হাত রেখে বলে, “ তোর নামে মা’ম’লা করা উচিতরে হিমালয়। ভরসন্ধ্যায় অবলা ছেলেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য। তা তোর কোন ভারা ভাতে ছাই ফেলেছি রে! যে তুই এতো জোরে চিৎকার করছিস?”
“ তোমাকে চল্লিশ হাজতে ভরা উচিত এবং ৩০২ ধারা মোতাবেক ফাঁ’সি’তে ঝুলানো উচিত। তোমার হাত,পা ক’লি’জা সব ঠিক আছে কিন্তু দুনিয়ার মানুষের সামনে কপাল ফাটা কবি ও হাত ভাঙা ফকির সেজেছো?”
“ মুখ সামলে কথা বল হিমালয়! এটা তোর ইন্জিনিয়ার বাপের বাড়ি নয়, মানুষ কি বলবে?”
রাগে হিমার মস্তিষ্ক টগবগ করে ফুটছে। সে মীরের একদম কাছাকাছি এসে তার হাত ঝাকিয়ে বলতে শুরু করে, “ তুমি এমনটা করতে পারো না মীর ভাই! তুমি জানো, আমি কতোটা চিন্তায় ছিলাম! অনুশোচনায় আমার হৃদয় কতোটা পুড়েছে তুমি জানো? আমার সব কষ্ট এবার ফেরত দাও।”
রাদিফ নির্বিকে সবকিছু দেখছে। আজ যদি তার হাতে একরা স্মার্টফোন থাকতো তবে, সম্মুখে চলতে থাকা সিনেমা রেকর্ডিং করে রাখতো। এই প্রথম নিজের বাটন ফোনের উপর বিরক্ত হচ্ছে সে। সে মনে মনে ভেবেই নিয়েছে আজ রাতেই স্মার্টফোন কিনবে। হিমারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের একটা সিনেমার শটও মিস করবে না সে।
এদিকে মীর হিমার হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। আশপাশটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রত্ত্যুত্তরে বলে, “ তোর কোথায় কষ্ট হয়েছে রে হিমালয়, আমাকে একটু দেখাবি?”
মীরের ঠোঁট কা’টা কথায় হিমা এবার কেঁদে ফেলে। রাদিফের উদ্দেশ্যে বলে, “ রাদিফ ভাইয়া, আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চলো। আমি মাকে তোমার কথা কিছুই বলবো না। শুধু বলবো তোমাকে যেন এই খারাপ লোকটার থেকে দূরে রাখে, নয়তো তুমিও নষ্ট হয়ে যাবে।”
রাদিফ হা করে হিমার কান্না দেখছে। তার মতো অতি ভদ্র ছেলের বর্তমানে কি করা উচিত বুঝতেই পারছে না সে। মীর হিমার কথায় উচ্চস্বরে হাসে। হিমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলে, “ দুরন্ত হিমালয় কবে বাড়ন্ত হিমালয় হলো রে? আমার কাছে পাত্তা না পেয়ে এখন রাদিফকে ডাকছিস? ছিহ! এই তোর টেস্ট?”
হিমা ছলছল চোখে একবার রাদিফ তো একবার মীরকে দেখছে। সে মীরকে যদি পারতো, কচু গাছের সাথে ঝুলিয়ে পি’টা’তো। চোখের পানি মুছে মীরের উদ্দেশ্যে বলে, “ তোমার চোখে যেমন আমি অপছন্দনীয়; আজ থেকে তুমি আমার অপছন্দের তালিকায় থাকবে, মীর ভাই।”
মীর হাসে, হিমার কাছে এসে নিচু স্বরে বলে, “ চোখ খোল হিমালয়! আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল তো, আমার চোখে তোর জন্য কী আছে?”
হিমা চোখ খোলে তাকায়। টইটম্বুর চোখ মীরের চোখে মিলিত হতেই বলে, “ আমি আমার সর্বনাশ দেখতে পাচ্ছি, মীর ভাই!”
চলবে ইনশাআল্লাহ………..