#আবার এলো যে সন্ধ্যা
#পর্ব-৯
গাড়িতে বসেই শোভাকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসতে দেখলো রিফাত। পড়নে নীল আর সাদা কম্বিনেশনের সালোয়ার কামিজ। চুলগুলো সমতল ভাবে আচড়ানো মাথায় অর্ধেক ঘোমটা টানা। সেই প্রথম দিনের মতো ভীরুতা নেই চেহারায়। তার জায়গায় আছে বিরক্তি।
রিফাতের মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি ফুটে উঠলো। যাক, মেয়েটাকে শেষ পর্যন্ত বাগে আনা গেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার মেয়েটাকে কাবু করার অস্ত্র পেয়ে গেছে ও। এখন চাইলেই যে কোন সময় ঘায়েল করা যাবে। দুষ্টু একটা হাসি ছড়িয়ে পড়লো রিফাতের মুখচোখে। শোভা কাছাকাছি আসতেই চেহারায় গাম্ভীর্যের আড়াল নিয়ে এলো। পাশের দরজা খুলে ডাকলো-“ভেতরে এসো।”
শোভা প্রতিবাদ না করে রিফাতের পাশের সিটে বসলো। ডোর লক করে গাড়ির সবগুলো কাঁচ তুলে দিলো।
“ক্লাস কবে থেকে শুরু?”
“আগামী শনিবার থেকে।”
“হলে ঢুকতে হয় কয়টার মধ্যে?”
শোভার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“মানে রাতে কয়টার মধ্যে হলে ঢুকতে হবে এটাই জানতে চাচ্ছি।”
“রাত দশটার মধ্যে।”
“তাহলে অনেক সময় হাতে পাচ্ছি। সামনেই স্মৃতিসৌধ আছে, বংশী নদী আছে। সন্ধ্যার সময়টা ওখানে ভালো লাগবে। তোমার কোন আপত্তি নেই তো ওখানে যেতে?”
রিফাতের কথা শুনে শোভা তাকালো। কথাটা ভীষণ হাস্যকর শোনালো ওর কাছে। ব্লাকমেল করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আবার জানতে চাইছে আপত্তি আছে কিনা। কৌতুক করছে নাকি? শোভা আচমকা দাঁত বের করে হাসলো-“একদমই আপত্তি নেই। আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন আমি সেখানেই যাব। চাইলে জাহান্নামেও নিতে পারেন।”
রিফাত বুঝলো শোভার রাগের মাত্রা বেশি। শোভাকে আরেকটু জ্বালাতেই সে বললো-“রিয়েলি! এমন মেয়েই তো খুজছিলাম মনে মনে যার সাথে জাহান্নামে যাওয়া যাবে। যে সাথে থাকলে জাহান্নামকেও জান্নাত মনে হবে। অবশেষে আমার ইচ্ছে পূরণ হলো। তাহলে চলো দু’জন মিলে জাহান্নামেই যাই।”
শোভা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। তার লজ্জা লাগছে। গালদুটো না চাইতেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এই বজ্জাত ছেলেটাকে কথায় হারানো যাবে না কিছুতেই। আংটি কি পরিয়েছে ভদ্রতার মুখোশ খুলে ফেলেছে। যা মনে আসছে তাই বলছে। রিফাত শোভাকে একবার দেখে নিয়ে মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলো।
গাড়ি থেকে নেমে মুগ্ধ হলো শোভা। নদী থেকে খানিকটা দূরে রিসোর্ট মতন বানিয়েছে। সুন্দর ডেকোরেশনে বসার ব্যবস্থা করা। খুব বড় জায়গা না হলেও দেখতে ভালো লাগছে। সবচেয়ে ভালোলাগার ব্যাপার হলো নদীর মুখোমুখি বসার বেদী। সূর্যোদয় সূর্যাস্ত দেখার সুব্যবস্থা। ছোট ছোট নৌকায় মাছ ধরার দৃশ্য দেখতে চমৎকার লাগছে। শোভার তাদের গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ে গেলো। ওদের দাদার বাড়িটা দিনাজপুরের ভেরমে। সেই বাড়ির কাছ দিয়ে বয়ে গেছে দীর্ঘ এক নদী। নদীর কোল ঘেঁষে বিশাল বড় একটা বটগাছ। বিকেলের সময়টা সেই বটগাছের ছায়ায় লোকের কোলাহল। শোভা গ্রামে গেলেই ওই বটগাছের নিচে যেয়ে বসে বসে নদী দেখতো। নদী থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাসে মন প্রান জুড়িয়ে যেত। কি যে ভালো লাগতো শোভার ওই খোলামেলা পরিবেশ।
মনের গহীন থেকে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে তার। গত তিনটে বছর কোথাও যাওয়া হয়নি তাদের। প্রথম একটা বছর তো কেঁদেই নষ্ট হয়েছে। আত্মীয় স্বজনের তীক্ত কথার বাণ, সেই দিনাজপুরের পরিচিত পরিবেশ ফেলে এই ব্যস্ত নগরীতে থিতু হওয়া। মনটাকে স্থির করে পড়ালেখায় ফেরাতে ঘোড়ার মতো সোজা হেঁটেছে। কোন দিকে চোখ তুলে তাকায়নি, কান খুলে শোনেনি। ভেবেছিলো ভালো কোথাও ভর্তি হয়ে বাবার মন জয় করবে। আবার আগের মতো স্বাধীন জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু তার আগেই বাবা তার পাখনা কেটে দিয়ে চিরদিনের মতো বন্ধ খাঁচায় বন্দী করে দিলেন। শোভা উদাস নয়নে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো।
রিফাত খেয়াল করছিলো শোভাকে। এই জায়গায় এসে ওকে বেশ খুশি দেখাচ্ছিল। তারপর আচমকা মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেলো। মেয়েটাকে বোঝা মুশকিল। অনেকটা বর্ষাকালের আকাশের মতো। কখন রোদ উঠবে আর কখন বৃষ্টি নামবে বোঝা মুশকিল। রিফাত মনোযোগ আকর্ষনে কাশি দিলো। শোভা চমকে তাকালো ওর দিকে। খানিকটা লজ্জা পেল মনেহয়।
“পছন্দ হয়েছে জায়গাটা?”
“হু। খুব সুন্দর, অনেক পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেলো তাই একটু নস্টালজিক হয়ে গেছিলাম।”
রিফাত কৌতূহল বোধ করলল-“মানে? ঠিক বুঝলাম না। কেমন স্মৃতি?”
“আমাদের দাদাবাড়ীতে এরকম নদী ছিলো একটা। নদীর কোল ঘেঁষে বিশাল বটগাছের নিচে বসে থেকে নদী দেখতাম।”
“তো? আর যাওয়া হয় না?”
শোভা জবাব দেয় না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে রিফাত বুঝলো জবাব আসবে না।
“একটা কথা বলি?”
শোভা ওর দিকে মন দিলো-“আপনি বলার আগে আমি কিছু বলতে চাই। মানে কিছু প্রশ্ন ছিলো আমার।”
“করো।”
“আপনি জেনেশুনে আমাকে বিয়ে করতে রাজী হলেন কেন?”
“উত্তরটা এখনো ধোঁয়াশা আমার কাছে। হয়তো তোমাকে খানিকটা পছন্দ করে ফেলেছি সেজন্য। তাছাড়া বাবা বলেছে সেটাও একটা কারন। বাবার কথা আমি খুব যে শুনি তেমন না তবে সেদিন তোমাকে দেখে তার বিয়ের সিদ্ধান্তটা মেনে নিলাম।”
এতোটা পরিস্কার উত্তর আশা করেনি শোভা। ও খানিকটা অবাক হলো।
“আর আপনার বাবা কি জানে আমার অতীত?”
রিফাত হোঁচট খায়। এই দিকটা সে ভাবেনি। তার মাথাতেই আসেনি ভাবনাটা। ভাবাটা কি উচিত ছিলো? কিছু সময় ভাবনায় তলিয়ে থাকলো রিফাত তারপর উত্তর দিলো-“বাবার ব্যাপার আমি জানি না শোভা। আমার মনেহয় এটা আমার শশুরবাবার ডিপার্টমেন্ট। উনি নিশ্চয়ই তার পুরনো বন্ধুর কাছে এমন ব্যাপার লুকিয়ে রাখবেন না। উনাদের বিষয়ে আমাদের এতো ভাবনার দরকার নেই।”
এরমধ্যে মগ ভর্তি চা এলো। সাথে গরম গরম পুরি আর সিঙ্গারা। শোভার হাতে চায়ের কাপ তুলে নিয়ে নিজেও নিলো রিফাত।
“এদের চা টা মারাত্মক। নদীর পাড়ে বসে এইরকম স্বাদের চা খেতে খেতে ঠান্ডা হাওয়া শরীর ছুয়ে দেয়। এরচেয়ে উপভোগ্য কিছু আর আছে বলে মনহয় না।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই শোভার মনে হলো রিফাত খুব ভুল কিছু বলেনি। এই রকম পরিবেশে চা টা একদম পারফেক্ট বেহেশতি সুখ দিচ্ছে।
“আমার একটা সম্পর্ক ছিলো ইউনিভার্সিটির শুরুর দিকে। এক বছর টিকেছিল। তারপর কোন অজানা কারনেই মেয়েটা আমাকে ছেড়ে গেল। মানে বিচ্ছেদের কারন বলেনি সে। আচমকাই আমাকে এভোয়েড করা শুরু করলো। আমিও আর জানতে চাইনি সে কেন এমন করছে। তবে অপমানটা বহু রাত ঘুমাতে দেয়নি আমাকে।”
“আমাকে এসব বলছেন কেন? আমি তো কিছু জানতে চাইনি।”
শোভা বিস্ময় নিয়ে বলে। রিফাত হাসলো-“তুমি প্রথমদিন আমার সাথে বেশ ভালো করে কথা বললে। অথচ এরপর কেমন যেন এড়িয়ে চললে। তোমার ব্যবহার আমাকে অতীতে নিয়ে গেছিল। আমার প্রথম প্রেমিকার অপমানটা পুনরায় নতুন করে বুকে অনুভব করলাম। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল জানো? নিজেকে ভীষণ অপাংতেয় লাগছিল। মেনে নিতে পারছিলাম না। সেই জন্যই তোমাকে বিরক্ত করেছি কয়েকদিন।”
“আচ্ছা। তাহলে বিয়েটাও কি অপমানের প্রতিশোধ হিসেবে করছেন?”
“ঠিক তা না। আমার মনেহয় আমি তোমার প্রতি খানিকটা দূর্বল। তোমার মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার আছে। থাকে না অনেকের মধ্যে? একবার কথা বললেও মনে গেঁথে যায়। মানুষ পছন্দ করে। ওইরকম কিছু।”
শোভা নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো। এই ছেলের দ্বারাই এমন খোলা মেলা কথা বলা সম্ভব। না চাইতেই বারবার বোল্ড হচ্ছে শোভা।
“একটা কথা বলবো?”
হয়তো পরিবেশের কারনেই শোভা খানিকটা মোলায়েম হলো। হেসে বললো-“একটা না দুটো বলুন।”
“তাকাবে আমার দিকে?”
শোভা চোখ মেলে তাকায়, খানিকটা শরমের আভা চোখে মুখে থাকলেও রিফাতকে দেখলো পূর্ণ দৃষ্টিতে। সূর্য অস্ত যাবে আর কিছুক্ষনের মধ্যে। রিফাতের উজ্জ্বল শ্যামা চেহারায় সূর্যের লালচে আভা এসে পড়েছে। দেখতে দেখতে চোখে ধাঁধা লাগে শোভার। রিফাত শোভার বাম হাতটার দিকে ইশারা করলো। হাতের অনামিকায় পরে থাকা এনগেজমেন্ট রিং চিকমিক করছে। সেদিকে নির্দেশ করে বললো-“এই যে তোমার অনামিকায় আমাদের দু’জনার বন্ধনের চিন্হ। আর কিছুদিন পরে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো আর আইনসিদ্ধ বাঁধনে বাঁধা পড়লো। সেই সুবাদে পুরনো সব স্মৃতি ভুলে আমরা কি নতুন করে সবকিছু শুরু করতে পারি? আমরা যেভাবে একে অপরকে চিনেছি সেসব ভুলে যাও। একদম অপরিচিতের মতো শুরু থেকে শুরু করতে চাই সবকিছু। তুমি কি রাজি আছো?”
শোভার মনের দ্বিধা দেয়াল। এই পৃথিবীতে বিশ্বাসই একমাত্র যেটার উপর আর বিশ্বাস নেই শোভার। বিশ্বাস একটা পাতলা সুতোর মতো জিনিস যেটার উপর ভিত্তি করে দু’জনার সম্পর্কের ভিত দাঁড়িয়ে থাকে। একবার বিশ্বাস ভাঙলে তা একজনার মনকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে পারে, আজীবনের মতো পঙ্গু বানিয়ে দিতে পারে। শোভার মনের ভেতরটা বিশ্বাসের ঢেউ অমনভাবে দুলিয়ে দিচ্ছে। রিফাত তাকে আস্বস্ত করতে চায়-
“আমাকে একবার বিশ্বাস করে তোমার হাত ধরার অনুমতি দেওয়া যায়?”
অনেক ভেবে ভেবে শোভা মাথা দুলালো। রিফাত খুশি হয়ে আলতো করে শোভার বাম হাতটা ধরলো। ডুবন্ত সূর্যের দিকে ইশারা করলো-“পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার আগমুহূর্তটা আমাদের জন্য স্মরণীয় হোক। ডুবন্ত সূর্যের কুসুম রঙের মতো রঙিন হোক আমাদের প্রতিটা দিন।প্রতিটা সন্ধ্যা কেবল আমাদের দু’জনার হোক।”
চলবে—
©Farhana_Yesmin