Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-৫২ এবং শেষ পর্ব

আমার হয়ে থেকো পর্ব-৫২ এবং শেষ পর্ব

0
890

#শেষ_পর্বের(প্রথম অংশ)
#আমার_হয়ে_থেকো
#Tasnim_Riya_khan

হাসপাতালের সেই ধোঁয়াশাময়, রক্তাক্ত আর শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়টার পর কেটে গেছে দীর্ঘ চৌদ্দটি দিন। হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ হয়ে নিজেদের চেনা নীড়ে ফিরে এসেছে আরভান আর আয়াত। পুরো বাড়িটায় এখন এক অদ্ভুত নীরব প্রশান্তি। ভাবতেই অবাক লাগে, একই হাসপাতালের দুই ভিন্ন কেবিনে শুয়ে স্বামী আর স্ত্রী দুজনেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ফিরে এসেছে। নিয়তির কী অদ্ভুত রসিকতা! যদিও আরভানের পাথুরে শরীরের জন্য এই ক্ষত কিংবা তীব্র ব্যথা নতুন কিছু নয়; এর চেয়ে বহু গুণ তীব্র, মারাত্মক মরণঘাতী আঘাত সে সহ্য করেছে অবলীলায়।

মাঝে মাঝে সে নিজেই নিজের অতীত আর বর্তমান মিলিয়ে গভীর এক ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যায়। তার মনে বড় প্রশ্ন জাগে—যার হৃদয়ে একসময় মায়া-দয়ার বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব ছিল না, সেই পাষাণ আর কঠোর আরভান চৌধুরী আজ এতটা নরম আর স্পর্শকাতর কীভাবে হয়ে গেল? এই অসাধ্য সাধনটা কীভাবে সম্ভব হলো? হাজারো মেয়ের ভিড়ে শুধু এই একটা মেয়ে, এই ‘আয়াত’ই কেন তার সমস্ত অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে একচ্ছত্র রাজত্ব তৈরি করে নিল? এর কোনো যৌক্তিক উত্তর আরভানের জানা নেই, আর সে তা জানতেও চায় না। সে শুধু চায় তার বুকের ভেতর পরম আশ্রয়ে থাকা এই দুটি ছোট্ট রাজকন্যা আর তার চোখের মণি রানীকে নিয়ে পুরোটা জীবন পার করে দিতে।

​ভিলাতে ফেরার পর থেকে আইরা আর আনায়ার সমস্ত দেখভাল দায়িত্ব এখন শাহজাদি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আয়াতের শরীর এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, সামান্য একটু এদিক-ওদিক লড়াচড় করলেই বা একটু জোরে শ্বাস নিলেই তীব্র ব্যথার একটা সূক্ষ্ম রেখা তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যায়। । আর তাই আরভান এখন পুরোদস্তুর এক দায়িত্বশীল, আদুরে স্বামী।

​ আয়াতকে নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া, সময়মতো ওষুধ দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোটখাটো কাজে আরভান ছায়ার মতো ওর পাশে থাকে।
​প্রথম প্রথম আরভানের এই অতি-যত্ন আয়াত মেনে নিলেও, বিপত্তি বাঁধল অন্য জায়গায়। আরভান যখন নিজে ওকে গোসল করিয়ে দিতে আর গায়ের জামাকাপড় বদলে দিতে গেল, আয়াত লজ্জায় একদম লাল হয়ে উঠল। সে আরভানের হাতটা আলতো করে চেপে ধরে আমতা আমতা করে বলল
” আরভান, প্লিজ… আপনি যান এখান থেকে। এসব শাহজাদী এসে করবে। আপনার সামনে আমি জামাকাপড় চেঞ্জ করতে পারব না।”

​আরভান আয়াতের এই কাণ্ড দেখে নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা, দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটিয়ে তুলল। তার চোখ দুটোতে এক গভীর তৃষ্ণা খেলা করে গেল। সে কিছুটা বিরক্ত ও রসিকতা ভরা কণ্ঠে বলল,

“হোয়াট ডু ইউ মিন বাই শাহজাদি করবে, মিসেস? এতগুলো দিন সব দেখলাম আমি। এখন আমার সামনে এত লজ্জা, অথচ ওই মেয়ের সামনে আপনি বিবস্ত্র হতে পারবেন? দুই বাচ্চার মা হয়ে গেছেন, অথচ আপনার ভেতরের ওই লজ্জাবতী লতার স্বভাবটা এখনো গেল না! এখন এই সমস্ত ফালতু লজ্জা বিদায় করুন তো মিসেস । আগে পুরোপুরি সুস্থ হন, তারপর না হয় আমি আবার আপনার এই লজ্জা ভাঙিয়ে দিব।”

​আরভানের মুখে এমন চরম স্পষ্ট আর বেহায়া মার্কা কথা শুনে আয়াত আর একটা বাক্যও মুখ থেকে বের করতে পারল না। সে নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা আরভানের চওড়া বুকের আড়ালে লুকিয়ে চুপচাপ সব সহ্য করে নিল। সে মনে মনে খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছে—আরভান ইদানিং একটু বেশিই নির্লজ্জ আর বেফাঁস কথা বলতে শুরু করেছে, যা আয়াতের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, অনুভূতির কাঁপন সৃষ্টি করে।

​ এই সব সুন্দর মুহূর্তের আড়ালে আরভান কিন্তু নিজের অন্য রূপটা ভুলে যায়নি। সে নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে যায়, নিজের মা এলিনা চৌধুরীর সাথে দেখা করতে।

মায়ের সামনে গিয়ে আরভান যখন দাঁড়ায়, তার মনে তখন কোনো ক্ষোভ বা অভিমান থাকে না। আরভান আজ সব সত্য জানে। এলিনা চৌধুরীর জীবনের সেই গোপন, কুৎসিত পাপের কথা সে অনেক আগেই উন্মোচন করেছে।।

কিন্তু সে তার মাকে মুখে কিছু বলে আর লজ্জিত করতে চায় না। কখনো সে মায়ের মুখে সেই সত্যটা জানতেও চায় না।

​যেদিন এলিনা চৌধুরী চৌধুরী আয়াতের বাবা-মা আর আরশাদ চৌধুরীর সম্পর্কের ব্যাপারে কথা বলছিলেন, সেদিন তিনি অনেকগুলো মিথ্যা বলেছিলেন। এলিনা বলেছিলেন যে আয়াতের বাবা-মায়ের মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষীকে তিনি শুধু দেশ থেকে পালাতে বলেছিলেন। কিন্তু আসল ও নারকীয় সত্য তো এটা ছিল না! এলিনা চৌধুরী নিজের পিশাচ স্বামীর ভালোবাসার মোহে এবং তার আভিজাত্য বাঁচানোর তাগিদে এতটাই অন্ধ ছিলেন যে, নিজের স্বামীর অন্যায়কে আড়াল করতে তিনি নিজেই সেই একমাত্র সাক্ষীকে খুঁজে বের করে খাবারে তীব্র বিষ মিশিয়ে ঠান্ডা মাথায় হত্যার করিয়েছিলেন।এই অস্ট্রেলিয়াতেই তিনি সেই নির্মম নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এলিনা চৌধুরী যতই নিখুঁতভাবে নিজের সেই চালটা চালুন না কেন, প্রকৃতির নিয়মে কিছু সত্য চিরকাল আড়ালে-আবডালে ঢাকা থাকে না।
​আরভান মাঝে মাঝে একা একা ভেবে বিষণ্ণ হাসে-আয়াত যদি কোনোদিন জানতে পারে যে এলিনা চৌধুরী শুধু একজন অপরাধী নন, বরং তার নিজের বাবা-মায়ের খুনের প্রমাণ লোপাটকারী আসল খুনির একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তবে কী হবে? তবে এলিনার ওপর আয়াতের যেটুকু শ্রদ্ধা বা মায়া অবশিষ্ট আছে, তা এক নিমেষে শেষ হয়ে যাবে। জন্ম নেবে এক প্রচণ্ড, তীব্র ও কালান্তক ঘৃণা। তার শৈশবে বাবা-মাকে হারানোর যে এক খণ্ড নিখাদ ক্ষত আজীবন তার বুকে রয়ে গেছে, তা এক নিমেষে আগ্নেয়গিরি হয়ে ফেটে পড়বে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো-এই সত্যটা জানার পরেও আরভানের মনে নিজের মায়ের প্রতি এখন আর কোনো ক্ষোভ বা রাগ নেই। তার বাবা, তার মা এবংএমনকি স্বয়ং সে—আরভান চৌধুরীও একজন ঠান্ডা মাথার খুনি! কী এক অদ্ভুত খুনি পরিবার! অথচ দুনিয়ার মানুষের চোখে তারা কত মার্জিত, কত অভিজাত আর কত সুখী! এই নিখুঁত আড়ালের সত্যটা কারো কোনোদিন জানা হলো না, আর হয়তো কোনোদিন জানাও যাবে না।
​কিছুদিন এভাবেই কাটল। যত্নের আতিশয্যে আয়াত এখন অনেকটাই সুস্থ। তার পিঠের ব্যান্ডেজগুলো খুলে ফেলা হয়েছে, এখন সে নিজে নিজেই হালকা হাঁটাচলা করতে পারে।
​আজকের বিকেলটা বড্ড মনোরম। রুমের বড় জানালার পর্দাগুলো সরানো। ঘরের ভেতর হালকা রোদের আলো এসে পড়েছে। আরভান বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, আর তার বুকের ঠিক দুই পাশে শুয়ে আছে তাদের দুই কলিজার টুকরো। আরভান নিজের সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে নিজের দুই মেয়ের সাথে এক অদ্ভুত, কাল্পনিক কথোপকথনে ব্যস্ত। মেয়ে দুটোও যেন তাদের বাবার গায়ের চেনা ওম আর ভালোবাসা পেয়ে চরম উচ্ছ্বসিত।
​সাধারণত মেয়েদের তাদের বাবার প্রতি একটা আলাদা, অদৃশ্য ও প্রগাঢ় টান থাকে। যদিও আরভানের ক্ষেত্রে তার নিজের জীবনের সমীকরণটা ছিল ঠিক উল্টো। সে ছেলে হয়েও তার বাবার প্রতিই সবচেয়ে বেশি টান অনুভব করত শৈশবে, যার শেষ পরিণতি হয়েছিল এক নারকীয় অন্ধকার। কিন্তু আরভান তার মেয়েদের জীবনে সেই অন্ধকারের ছায়াও পড়তে দেবে না। সে হবে এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ এক আশ্রয়।

​আরভান আনাইরার পিঙ্ক কালারের ছোট্ট গালে নিজের তর্জনী দিয়ে আলতো করে টোকা দিয়ে বলল, “কী রআম্মাজান? আজ এত হাসা হচ্ছে কেন, হুম? ”

​আনাইরা তার বাবার কথা শুনে নিজের ছোট্ট দুটো হাত-পা বাতাসে ছুড়ে দিয়ে এক অদ্ভুত মিষ্টি আওয়াজ করে উঠল, “আউ… উউউ… আউ!”

​আরভান খুশিতে এক গাল হেসে ফেলল। সে নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে আনায়া নরম তুলতুলে পেটে আর বুকে নিজের নাক ঘষে দিয়ে পরম আদরে ভরিয়ে দিল। আরভানের দাড়ি কাটার পর গজানো হালকা খসখসে দাড়ি লেগে আনায়া আরও বেশি খিলখিল করে হেসে উঠল।

​ পাশে থাকা আইরা যেন কিছুটা হিংসে করেই তার বাবার শার্টের হাতাটা নিজের পুচকে হাত দিয়ে খামচে ধরার চেষ্টা করল। আরভান ওমনি আইরার দিকে ফিরে তাকে নিজের বলিষ্ঠ এক হাতের ওপর তুলে নিল। আইরার সাদা ব্যান্ডেজ খুলে ফেলা হয়েছে তবে দাগ এখনো রয়ে গেছে ছোট্ট হাতটার দিকে তাকিয়ে আরভানের চোখের কোণটা সামান্য ভিজে উঠল। সে আইরার সেই ছোট্ট হাতের ওপর নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে দিয়ে গভীর আবেগে বলল, “আমার আর একটা রাজকন্যা বুঝি রাগ করেছে? এই যে বাবা তোমার কাছেও চলে এসেছে সোনা মা। এই দুনিয়ার কোনো কালো ছায়া আর আমার আম্মার গায়ে লাগতে দেব না, খোদার কসম!”

​আইরা তার বাবার বুকের ওম পেয়ে এক পরম শান্তিতে তার কচি মুখটা আরভানের গলার ভাঁজে গুঁজে দিয়ে মৃদু শব্দ করল, “উউ… আউ…”


​আরভান পরম সুখে চোখ দুটো বুজে নিয়ে দুই মেয়েকে একসাথে নিজের দুই বাহুর মাঝে পিষে ধরে তাদের গালে, কপালে আর ছোট্ট পায়ে একের পর এক গভীর ভালোবাসার চুম্বনে ভরিয়ে দিল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আয়াত এক দৃষ্টিতে তার জীবনের এই শ্রেষ্ঠ সুন্দর, অনিন্দ্য সুন্দর মুহূর্তটি দেখছিল। তার চোখ ফেটে সুখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। যে আরভানকে সে একসময় এক নিষ্ঠুর ভেবেছিল, সে আজ নিজের সন্তানদের সামনে কতটা নিস্পাপ, কতটা পবিত্র এক বাবা।

আয়াত দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে এই স্বর্গীয় দৃশ্যটা দেখল। যেখানে একসময়ের কঠোর, আবেগহীন আরভান চৌধুরী আজ তার দুই রাজকন্যাকে বুকে জড়িয়ে পরম মায়ায় হেসে উঠছে। এই দৃশ্য যেন আয়াতের বুকের ভেতরের সমস্ত পুরনো ক্ষত এক নিমেষে জুড়িয়ে দিল। তার চোখ দুটো এক ভালোলাগায় ভিজে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আচমকা আরভানের পিঠের ওপর হামলে পড়ল।
​আরভানের পেটের ক্ষত আর অপারেশনের ব্যথাটা এখনো পুরোপুরি সেরে যায়নি, বাহুর ওপরও কিছুটা অবশ ভাব আর অস্বস্তি রয়ে গেছে। কিন্তু আয়াতের এই আচমকা হামলায় চামড়ার নিচে একটা সূক্ষ্ম যন্ত্রণার মোচড় দিলেও আরভান মুখ ফুটে একটা টু শব্দও করল না বরং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চওড়া ও প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। আয়াত আরভানের পেছন থেকে তার গলাটা দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর কোনো রকম দ্বিধা না রেখে আরভানের গালে একের পর এক গভীর ভালোবাসার চুমু এঁকে দিতে লাগল। যেন বহুদিনের জমানো সব আকুলতা সে আজ এক নিমেষেই উগরে দিতে চায়।
​আরভান আয়াতের এই বাঁধভাঙা ভালোবাসা উপভোগ করতে করতে চোখের কোণ দিয়ে ওকে দেখল। তারপর খানিকটা মাদকতা আর দুষ্টুমি মিশিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কী ব্যাপার, মিসেস চৌধুরী? আজ যে দেখছি পুরো মুডে আছেন! সূর্য তো এখনো ডোবেনি, অথচ আমার লাজুক লতা বউটা হঠাৎ এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠল কেন, জানতে পারি কি?”

আয়াত আরভানের গলার ভাঁজে নিজের মুখটা আরও একটু চেপে ধরল। আরভানের শরীরের সেই চিরচেনা পুরুষালি সুবাস তার মস্তিস্কের শিরায় শিরায় এক তীব্র নেশার সৃষ্টি করছিল। সে এক গভীর আবেগে চোখ দুটো বুজে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার আপনাকে এখন আস্ত কামড়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে, আরভান…”

​আরভানের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও কিছুটা চওড়া হলো। সে নিজের কণ্ঠস্বর খানিকটা নিচু আর গভীর করে ফিসফিসিয়ে বলল, “ইচ্ছে যখন করছে, তখন আর দেরি কেন? খেয়েই ফেলো! আমি তো তোমারই খাবার। এত জ্বালনোর পরও আপাতত দিনের বেলাটা না হয় ছাড় দিলাম; রাতের বেলা হিসাবটা কিন্তু উল্টো হবে। তখন কিন্তু তুমি আমার একচ্ছত্র খাবার হবে, মিসেস!”

​আয়াত প্রথমে আরভানের কথার গভীরতা বুঝতে না পারলেও, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যখন অর্থটা ওর মাথায় ঢুকল, ও মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ মাথায় আসতেই লজ্জায় আর ক্ষোভে আয়াতের পুরো মুখ লাল হয়ে গেল। এই লোকটা বাচ্চাদের সামনেও নিজের নির্লজ্জ স্বভাবটা ঢাকতে পারে না!

আয়াত আর কোনো কথা না ভেবে নিজের রাগ আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে আরভানের সেই ফর্সা, সুদর্শন গালে নিজের দাঁত দিয়ে সজোরে এক কামড় বসিয়ে দিল!

​আরভান আচমকা এই আক্রমণের জন্য একদম প্রস্তুত ছিল না। সে ব্যথায় অস্থির হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আহ্! আয়াত, ছাড়ো! এক নাম্বারের জাহান্নামী একটা বউ! কোনো সুস্থ ভদ্র মহিলা নিজের স্বামীকে এভাবে কামড় মারে? বুনো মহিলা একটা!”

​আয়াত দাঁত ছেড়ে দিয়ে আরভানের পিঠ থেকে নেমে পাশে দাঁড়াল। তারপর ঠোঁট উল্টে, কোমরে হাত দিয়ে বেশ দেমাক নিয়ে বলল, “কার সাথে থাকতে থাকতে আমার এই স্বভাব হয়েছে, তা আয়নাতে নিজের মুখটা দেখলেই বুঝতে পারবেন যেমন বর, তার তেমন বউ। আপনি দিনে-দুপুরে এসব নির্লজ্জের মতো কথা বলবেন, আর আমি বুঝি চুপ করে থাকব? এবার বুঝুন মজা।”

​আরভান নিজের কামড় খাওয়া গালে হাত বুলিয়ে আয়াতের এই রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে আবার হাহা করে হেসে উঠল। তারপর এক ঝটকায় আয়াতকে টেনে নিজের বুকের মাঝে আছড়ে ফেলল। দুই মেয়ের মাঝখানে আয়াতকে জড়িয়ে ধরে সে পরম মায়ায় বলল, “খুব তো মুখ চলছে, মিসেস। এই বাঘকে খাঁচায় বন্দি করার সাহস যখন দেখিয়েছ, তখন এর পুরো মাশুল দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত থেকো…”

​আয়াত আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। সে আরভানের চওড়া বুক থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই আরভান তাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো।কিছুখন ধস্তদস্তি করে আয়াত শান্ত মাথা রেখে এক পরম শান্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
আরভান মুচকি হেসে আয়াতের কপালে চুমু একে দিলো।

******

বিকেলের দিকে ভিলার পেছনের ছাদবাগানটা এক মায়াবী আলোয় ছেয়ে গেছে। চারদিকে হালকা ঠান্ডা বাতাস আর টবে ফুটে থাকা বেলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ।
শাহজাদি বাগানের রেলিং ধরে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পরনে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি, চুলে আলগা খোঁপা। গত কয়েকদিনের ধকল আর মানসিক ঝড়ঝাপটা যেন তার চোখেমুখে এক শান্ত গভীরতা এনে দিয়েছে। ঠিক তখনই ফারহান ধীর পায়ে ছাদে এসে দাঁড়াল। শাহজাদির এই শান্ত, বিষণ্ণ রূপটা ফারহানের বুকের ভেতর এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়।
​ফারহান শাহজাদির ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল, তবে কোনো কথা বলল না। শাহজাদি চেনা সুবাস পেয়ে আলতো করে পাশ ফিরে ফারহানের দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল।
​”আপনি এখানে? অফিস থেকে কখন এলেন?”

ফারহান শাহজাদির চোখের দিকে তাকিয়ে এক গভীর ও মায়াবী সুরে বলল, “এই তো একটু আগে। নিচে এসে যখন তোমাকে দেখলাম না, মনটা কেমন যেন ছটফট করছিল। তাই সোজা ছাদে চলে এলাম। আজকাল তোমাকে চোখের আড়াল করলেই মনে হয় কী যেন একটা হারিয়ে গেছে।”

​শাহজাদি লজ্জা পেয়ে চোখ দুটো নিচু করে নিল। বেলি ফুলের পাপড়িগুলো হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, “মিথ্যে বানিয়ে কথা বলায় আপনি বেশ পারদর্শী, ফারহান সাহেব!”

​​ফারহান এক কদম এগিয়ে এসে শাহজাদির দুটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের চাউনি আজ বড্ড ধারালো আর গভীর আবেগে ভরা। “একেবারে মিথ্যে নয় শাহজাদি। নিয়তির কোন নোংরা খেলায় আমাদের বিয়ে হয়েছিল আমি জানি না, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি বুক ঠুকে বলতে পারি-আমি তোমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছি। তুমি কি পারবে এই ফারহানকে তোমার জীবনের অংশ করে নিতে?”

​শাহজাদি ফারহানের চোখের সেই সততা আর গভীর ভালোবাসা দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার চোখ দুটো মায়াবী জলে টলমল করে উঠল। সে ফারহানের বুকের ওপর নিজের মাথাটা আলতো করে রেখে ফিসফিস করে বলল, “আমি তো অনেক আগেই হেরে গেছি আপনার এই ভালোবাসার কাছে, ফারহান। জীবনের সব অপবাদ আর অন্ধকার ভুলে আমি শুধু আপনার এই বুকে সারাজীবন আশ্রয় চাই।”

“তাহলে রুমে চলো।”

“আপনি আসলেই বড্ড অসভ্য”

ফারহান হা হা করে হেসে উঠলো শাহজাদি লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখলো।​ফারহান পরম তৃপ্তিতে শাহজাদিকে টেনে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। গোধূলির শেষ আলোটুকু তখন এই নতুন যুগলের ওপর এক ঐশ্বরিক আশীর্বাদের মতো ঝরে পড়ছিল।

চলবে..

#শেষ_পর্ব
#আমার_হয়ে_থেকো
#Tasnim_Riya_khan
_

(পাঁচ বছর পর)

​আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের কালো গাউনটা শেষবারের মতো টেনে ঠিক করল আয়াত। অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিম কোর্টের একজন সার্টিফাইড আইনজীবী হিসেবে আজ তার জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেস। অথচ এই মস্ত বড় অর্জনের দিনেও আয়াতের বুকের ভেতরটা তীব্র এক অজানা আশঙ্কায় দুরুদুরু কাঁপছে, হাতের তালু দুটো হিম হয়ে আসছে ঠান্ডায়।

ঠিক তখনই পেছনের দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল আরভান চৌধুরী। তার পরনে চিরচেনা ব্ল্যাক স্যুট,দুটো বুদাম খোলা। বুকের ভাজ গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এক হাত পকেটে গুঁজে সে ধীর পায়ে এসে আয়াতের ঠিক পেছনে দাঁড়াল। আয়নার প্রতিফলনে সে গভীর মনোযোগ দিয়ে তার স্ত্রীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। আয়াত তখন আতঙ্কে আক্ষরিক অর্থেই হাঁসফাঁস করছে। আরভান এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে পেছন থেকে নিজের বলিষ্ঠ দু-বাহু দিয়ে আয়াতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার চওড়া বুকে আয়াতের পিঠটা মিশে যেতেই আয়াত যেন এতক্ষণে একটুখানি আশ্বাসের নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেল।

​আরভান আয়াতের কাঁধের ওপর নিজের থুতনি রেখে আয়নার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “কী হয়েছে আমার আইনজীবী বউটার? এত কাঁপছ কেন, আয়াত?”

​আয়াত আরভানের হাতের ওপর নিজের কাঁপাকাঁপা হাতটা রেখে আকুল কণ্ঠে বলল, “আরভান… আমার ভীষণ ভয় করছে। বুকটা কেমন যেন ফেটে যাচ্ছে। আমি পারব তো আরভান? এটা আমার জীবনের প্রথম কেস, তার ওপর আপনার প্রিয় মানুষটার জীবন-মরণ জড়িয়ে আছে এর সাথে। আমি যদি কোনো ভুল করে ফেলি?”

​আরভান আয়াতের কথার মাঝেই নিজের ঠোঁট দুটো তার গলার ভাঁজে আর নরম গালে চেপে ধরল। এক দীর্ঘ ও প্রগাঢ় চুম্বনের পরশ এঁকে দিয়ে অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর অথচ এক অলৌকিক আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল, “তুমি পারবে আয়াত, তুমিই সব পারবে। এই আরভান চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ঝড়টাকে যে মেয়েটা এক লহমায় নিজের মায়ায় আটকে শান্ত করে দিতে পেরেছে, তার কাছে এই আদালত আর আইনি লড়াই স্রেফ একটা খেলা মাত্র। নিজেকে দুর্বল ভেবো না, জাস্ট গো অ্যান্ড উইন ইট।”

​আরভানের এই প্রগাঢ় স্পর্শ আর পাথরের মতো শক্ত বাণী মুহূর্তের মধ্যে আয়াতের সমস্ত ভয়কে কর্পূরের মতো উড়িয়ে দিল। আরভান তার হাত ধরে পরম মায়ায় টেনে নিয়ে গিয়ে বাড়ির সামনে রাখা গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসাল। তারপর তীব্র গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে দিল কোর্টের উদ্দেশ্যে।

*****

​আদালতের চারদিকের সুউচ্চ প্রাচীর যেন এক গুমোট, রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। চারপাশের চত্বরে মানুষের গিজগিজে ভিড়, আইনজীবীদের ফাইল নাড়াচাড়ার খসখস শব্দ আর অনবরত চলতে থাকা গুঞ্জন। তবে এই চেনা কোলাহলের ভেতরেও একটা তীব্র মানসিক অস্থিরতা এবং থমথমে নীরবতা বিরাজ করছিল। আজ মেলবোর্নের উচ্চ আদালতে এক ঐতিহাসিক মামলার আপিল শুনানি।

​বিজ্ঞ বিচারক গম্ভীর মুখে তার উঁচু আসনে এসে বসলেন।আর ঠিক তখনই কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ালেন এলিনা চৌধুরী। বিগত দীর্ঘ পাঁচটা বছর জেলের চারদেয়ালের অন্ধকারে কাটাতে কাটাতে এই নারীর শরীরের লাবণ্য যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেছে। আয়াত এক কোণে দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে এই নারীটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিনের কথা, যেদিন এলিনা চৌধুরীকে দেখে সে অবাক হয়ে ভেবেছিল-আরভানের মতো এত বড় ছেলে তার..!!!আজ সময়ের নির্মম পরিহাস আর পরিস্থিতির করাল গ্রাসে ওনার বয়স যেন এক ধাক্কায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ওনার চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে কালচে ক্লান্তির ছাপ। নিম্ন আদালত ওনাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল, আজ উচ্চ আদালতে তারই চূড়ান্ত আপিল শুনানি।

​আদালতের দর্শক সারির প্রথম সারিতে বসে আছে আরভান চৌধুরী। তার অবয়ব বরাবরের মতোই পাথুরে, গম্ভীর এবং রহস্যময়। তার ঠিক পাশেই বসে আছে তার ছায়াসঙ্গী ফারহান। তবে আজকের এই এজলাসে আরভানের দুই কন্যাসন্তানকে আনা হয়নি। আইরা আর আনায়াকে এখনো জানানো হয়নি যে তাদের দাদিমা জেলের অন্ধকারে আছেন, তারা শুধু জানে দাদিমা দূরে কোথাও একটা জরুরি কাজে আছেন। বাচ্চাদের মনকে এই কলুষিত অন্ধকার থেকে দূরে রাখতেই আরভান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
​বিপক্ষের কড়া কৌঁসুলি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে একের পর এক নথিপত্র পেশ করতে লাগলেন। তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও চড়া গলায় যুক্তি দেখাতে লাগলেন যে এলিনা চৌধুরী একজন ঠান্ডা মাথার খুনি, যিনি নিজের স্বামীকে মেলবোর্নের ভিলাতে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছেন। বিপক্ষের আইনজীবী যখন এলিনা চৌধুরীকে এক জঘন্য অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে চিৎকার করছিলেন, তখন আদালতের অপর প্রান্তে ডিফেন্স লইয়ারের ডেস্কে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শান্ত, ধীর অথচ এক অপরিসীম আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলো স্বয়ং আয়াত। অভিজ্ঞতায় আয়াত আজ মেলবোর্নের অন্যতম সেরা এবং প্রতিভাবান আইনজীবী। বিপক্ষের আইনজীবীর প্রতিটা বানোয়াট যুক্তি সে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শুনল, মুখে কোনো প্রতিবাদের রেখা ফুটিয়ে তুলল না। বিপক্ষ দল যখন তাদের বক্তব্য শেষ করে হাঁপাতে লাগল, তখন আয়াতের ঠোঁটের কোণে এক সূক্ষ্ম, তাচ্ছিল্যের মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে, টাকার লোভে কিছু মানুষ কীভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে একজন মৃত পিশাচকে নির্দোষ বানাতে চায়।

​আয়াত ধীর পায়ে বিচারকের এজলাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে থাকা একটি সুমোটা ফাইল এবং কিছু অডিও-ভিডিও এভিডেন্স জাজের সামনে পেশ করে অত্যন্ত মার্জিত ও গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করল,
​”ইউর অনার, বিপক্ষ দল মিস্টার আরশাদ চৌধুরীকে একজন নিরীহ ব্যবসায়ী এবং ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করার যে ব্যর্থ চেষ্টা করছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মিস্টার আরশাদ চৌধুরী কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম সিন্ডিকেটের একজন আন্ডারগ্রাউন্ড গডফাদার। শুধু এই অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, ইউর অনার, আমার কাছে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে যে বাংলাদেশেসহ তিনি আরো তিনটি দেশে নিজের এই ব্যবসায় চালিয়েছেন। নিজের স্বার্থ আর সম্পত্তির লোভে তিনি কয়েকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এমনকি নিজের শ্বশুরকেও সম্পত্তির লোভ এবং ব্যবসায়িক পথের কাঁটা সরানোর জন্য বিষ খাইয়ে হত্যা করেছিলেন তিনি। এই ফাইলে ওনার দীর্ঘ ৩০ বছরের সমস্ত অবৈধ ব্যবসা, মানব পাচার এবং খুনের নিখুঁত খতিয়ান রয়েছে।”

আয়াতের এই অকাট্য যুক্তি আর নথিপত্র দেখে বিপক্ষের আইনজীবী মুহূর্তের মধ্যে ঘামতে শুরু করলেন। তারা হয়তো ভাবতেও পারেননি যে একজন মৃত মানুষের অতীতের এত বড় অন্ধকার ইতিহাস এভাবে আদালতের সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে! আসলে আরশাদ চৌধুরী তো আর বেঁচে নেই, ওনার পাপের সাম্রাজ্য পাহারা দেওয়ার মতো কেউ অবশিষ্ট নেই। তার মিত্ররা নিজেদের স্বার্থে এই উকিল হায়ার করেছে। তাই বিপক্ষ দল তো স্রেফ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই কেসটা লড়তে এসেছিল, কিন্তু সত্যের তীব্র আলোর সামনে তাদের সমস্ত মিথ্যা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

আয়াত জাজের দিকে তাকিয়ে নিজের কণ্ঠস্বর আরও একটু দৃঢ় করে বলল, “ইউর অনার, ঘটনার রাতে মিস্টার আরশাদ চৌধুরী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিজের স্ত্রী এলিনা চৌধুরী এবং ছেলের স্ত্রী ও তার এক মাসের নিষ্পাপ নাতনিদের নির্মমভাবে হত্যা করতে গিয়েছিলেন। এলিনা চৌধুরী একজন মা এবং দাদি হিসেবে, স্রেফ আত্মরক্ষার খাতিরে এবং নিজের সন্তানদের জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ওই চরম মুহূর্তে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত, খুনি এবং সমাজবিরোধী পিশাচের হাত থেকে নিজের পরিবারকে বাঁচানো কোনো অপরাধ হতে পারে না। তাই মহামান্য আদালতের কাছে আমার বিনীত প্রার্থনা, এলিনা চৌধুরীকে সমস্ত অভিযোগ থেকে সসম্মানে খালাস দেওয়া হোক।”

​কিছুক্ষণ গভীর পর্যালোচনার পর বিজ্ঞ বিচারক তার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন। আদালতের হাতুড়ি টেবিলে আঘাত করার সাথে সাথেই জাজ বললেন—সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ও আত্মরক্ষার যৌক্তিকতা বিবেচনা করে আদালত এলিনা চৌধুরীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা থেকে সম্পূর্ণ খালাস ঘোষণা করছে।

রায় ঘোষণার সাথে সাথেই এলিনা চৌধুরীর চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ডিফেন্স ডেস্কে দাঁড়িয়ে থাকা আয়াতের দিকে তাকালেন। ওনার চোখ দুটো তখন এক অসীম কৃতজ্ঞতা, অপরাধবোধ আর মায়ায় ভেজা।
​আয়াত ধীর পায়ে কাঠগড়ার কাছে এগিয়ে গেল। এলিনা চৌধুরীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “যে নাতিদের বাঁচানোর জন্য আপনি নিজের হাতে নিজের স্বামীকে শেষ করতেও দ্বিধা করেননি, সেই নাতিরা আজ দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তাদের দাদিমার পথ চেয়ে বসে আছে, মা। চলুন, এবার বাড়ি ফিরবেন।”

এলিনা চৌধুরী আর একটি বাক্যও মুখ থেকে বের করতে পারলেন না। ওনার ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি সজোরে আয়াতকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আয়াতও নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না, সেও শাশুড়ি মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলল। আরভান তা দুচোখ ভরে দেখলো।দীর্ঘ পাঁচ বছরের এক রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়ের অবসান ঘটল আজ এই আদালতের চারদেয়ালের মাঝে।একটি নারীর জীবন যেন এক অদ্ভুত নদীর মতো, যা সময়ের সাথে সাথে চারটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে রূপান্তর ঘটে। প্রথমত, জন্মের পর সে এক অবুজ, চনমনে ‘মেয়ে’; দ্বিতীয়ত, বিয়ের পর সে এক দায়িত্বশীল ও মায়াময়ী ‘স্ত্রী’; তৃতীয়ত, সন্তান জন্মের পর সে এক ত্যাগী ও স্নেহময়ী ‘মা’; আর চতুর্থ রূপটি কী? চতুর্থ রূপটি হলো এক পরম নির্ভরতার আশ্রয়—’দাদি’ বা ‘নানী’। আজ এলিনা চৌধুরী নিজের জীবনের সেই চতুর্থ এবং সবচেয়ে মধুর রূপটির মুখোমুখি হতে চলেছেন।

​গাড়ি এসে যখন ভিলার সামনে থামল, আরভান পরম যত্নে মায়ের হাত ধরে তাকে গাড়ি থেকে নামাল। এলিনা চৌধুরী যখন কাঁপাকাঁপা পায়ে ভিলার সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন, ঠিক তখনই ভেতর থেকে দুটো পাঁচ বছর বয়সী ফুটফুটে কন্যাসন্তান প্রজাপতির মতো ডানা মেলে ছুটে এল।তাদের পিছু শাহজদি তার কোলে দুই বছরের ছেলে সন্তান- ইভান।ড্যবড্যব করে তাকিয়ে আছে।

​আইরা আর আনায়া। দুজনের গায়েই হুবহু একই ডিজাইনের লাল রঙের ফ্রক পরা, মাথায় ছোট্ট দুটি ঝুঁটি করা। তাদের নিষ্পাপ ঠোঁটের কোণে মুক্তো ঝরানো চিলতে হাসি।

​তবে প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়াল লক্ষ্য করল আরভান। শৈশবে যে আইরা সবচেয়ে বেশি চনমনে, ছটফটে আর চঞ্চল ছিল হাতের বুলেটের সেই সেই মারাত্মক আঘাত লাগার পর থেকে সে কেমন যেন অদ্ভুতভাবে শান্ত, গম্ভীর আর পরিণত হয়ে গেছে। ঠিক যেন এক ছোট্ট আয়াত! আর ওদিকে, শৈশবে যে আনায়া একদম শান্ত, মিষ্টি পুতুলের মতো সারাক্ষণ ঘুমিয়ে থাকত-সে এখন হয়েছে এক আস্ত বদমাইশ আর চঞ্চলতার খনি।সারাক্ষণ ঘর জুড়ে টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর দুষ্টুমি করাই তার প্রধান কাজ। ঠিক যেন আরভানের ভেতরের সেই একরোখা জেদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি! এই দুই বিপরীত চরিত্রের দুই রাজকন্যাই এখন আরভান আর আয়াতের পুরো জীবনের একমাত্র আলো, তাদের বেঁচে থাকার নিঃশ্বাস।

“দাদিমণিইইই!”

​আইরা আর আনায়া একসাথে এসে এলিনা চৌধুরীর দুই পা জড়িয়ে ধরল। এলিনা চৌধুরী যেন নিজের জীবনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে হাঁটু গেড়ে বসে দুই নাতনিকে একসাথে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরলেন। ওনার চোখের জল তখন বাচ্চাদের লাল ফ্রকের ওপর মুক্তোর মতো ঝরে পড়ছে। বাচ্চারা দাদিকে পেয়েই যেন এক রূপকথার গল্পের খনি খুঁজে পেয়েছে। তারা দাদিমণির গলা জড়িয়ে ধরে আধো-আধো গলায় নিজেদের হাজারো বায়না আর দুষ্টুমির গল্প বলতে শুরু করল।

​আরভান একটু দূরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে এই দৃশ্যটা দেখছিল। তার ঠোঁটের কোণে আজ কোনো হাসি নেই, আজ সেখানে খেলা করছে এক পরম তৃপ্ত, সুখী পরিবারের কর্তার এক খাঁটি মায়াবী হাসি। তার সুপ্রতিষ্ঠিত, সাজানো ঘর আজ আলোয় আলোময়।

হঠাৎ করেই আরভানের বুকের ভেতরের কোনো এক কোণ থেকে এক তীব্র সুপ্ত ইচ্ছা বা স্মৃতির টান জেগে উঠল। অতীতের সমস্ত রক্তগঙ্গা, জঘন্য অপরাধ আর মেলবোর্নের এই অন্ধকার অধ্যায়কে পেছনে ফেলে সে আর একবার নিজের শিকড়ে ফিরতে চায়। সে ধীর পায়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফারহানের দিকে এগিয়ে গেল।

​ফারহানের কাঁধে একটা শক্ত হাত রেখে, অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে আরভান বলল, “ফারহান, বাংলাদেশে যাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা কর। খুব শীঘ্রই আমরা দেশে ফিরছি।”

​ফারহান আরভানের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

*****

বাংলাদেশের মাটি। আরভান এই মাটির মাটিতে প্রথমবার পা রেখেছিল, সেদিনটা ছিল অন্যরকম। ঝড়ের মতো এক আকস্মিকতায় সে এই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, আর ঠিক তখনই তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল লাল বেনারসি শাড়িতে মোড়ানো এক অপরূপা নারী। লাল শাড়িতে অন্য কারও ঘরণী হওয়ার জন্য বাধ্য করা হয়েছিলো কারন তার স্বামী আর ফিরবে না বলে। আর আজকে সেই একই বাড়ির আঙিনায় সে তার স্বামী আরভানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুই বাচ্চার মা হয়ে। কথাটা ভাবলেই আরভানের বুকের ভেতর এক তীব্র আনন্দের শিহরণ বয়ে যায়।

​তার মনে পড়ে গেল দাদুর বলা সেই পুরনো কথাগুলো “আরভান, তুমি একদম তোমার বাবার মতো হয়েছো, নিজের শিকড়কে ভুলে গেছ…”

​না, এই শিকড় তো তার কখনোই ছিল না। তবুও এই পরিবারেই তার জন্ম, এই রক্তই তার ধমনীতে বইছে। যদিও এই রক্ত নিয়ে সে কোনো গৌরব করার নেই কারন এই খুনি আর পাপিষ্ঠ রক্ত নিয়ে সে কোনোদিন অহংকার করতে রাজি নয়।যদিও রক্ত কখনো ভালো বা মন্দের বিচার করে না। তার দুই চাচা চরম খারাপ আর লোভী হলেও, ছোট চাচাটি একদম মাটির মানুষ।
​আজ দ্বিতীয়বারের মতো এলিনা চৌধুরী নিজের শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলেন। প্রথমবার যখন এসেছিলেন, তখন ওনার শশুরের নিষ্ঠুর আদেশে আরশাদ চৌধুরীসহ ওনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে, ত্যাজ্যপুত্র করে দেওয়া হয়েছিল। আর এবার? এবার পুরো পরিবার ওনাকে পরম আদরে, আপন করে বরণ করে নিল।
​এলিনা চৌধুরী লিভিং রুমের সোফায় বসে চারপাশের এই গমগমে পরিবেশ দেখছিলেন। ওনার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল”ইস! আয়াতের মা যদি আজ বেঁচে থাকত, তবে কি খুব ক্ষতি হতো? ”
​দাদুর আজ খুশির সীমানা নেই। বহুদিনের অসুস্থ, শয্যাশায়ী মানুষটা নিজের এমন ভরা, সম্পূর্ণ সুখী পরিবারকে চোখের সামনে দেখে মুহূর্তের মধ্যেই যেন সুস্থ হয়ে উঠলেন। বাড়ির ছোট-বড় সকলে মিলে বাচ্চাদের নিয়ে যে হইচই জুড়ে দিয়েছে, তা দেখে দাদুর চোখের কোণে আনন্দের অশ্রু ছলছল করে উঠল। জীবনের শেষ বয়সে এসে তো মানুষ ঠিক এতটাই চায়—একটা সুখে মোড়ানো, ভালোবাসায় ঘেরা সুন্দর সংসার।

​শাহজাদি প্রথমে নিজের মায়ের সাথে কোনো কথা বলেনি। অতীতের সেই দগদগে ক্ষতগুলো তাকে ওনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখছিল। নাজমা ও অনেকবার নিজের মেয়ের সাথে কথা বলতে এসেছিলেন। মেয়ের এই চরম প্রত্যাখ্যান আজ ওনার বুকে তীরের মতো বিঁধেছে। উনি নিজের ভুলটা আজ খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছেন। তবে বড্ড দেরিতে! সবকিছু হারিয়ে, নিঃস্ব হয়ে আজ উনি নিজের অপরাধের গভীরতা উপলব্ধি করছেন।ফারহান অনেকবার শাহজাদিকে আড়ালে নিয়ে বুঝিয়েছিল, মাতৃত্বের অবমাননা না করার অনুরোধ করল, তখন শাহজাদি ধীর পায়ে এসে মা বাবার সাথে কথা বলল। ​শাহরিয়ারকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। মেলবোর্ন পুলিশও হন্যে হয়ে খুঁজে বের করতে পারেনি। সে কি আদৌ বেঁচে আছে নাকি সমুদ্রের নোনা জলে তলিয়ে গেছে, তা আজ আর কেউ জানে না। একজন অভাগী মায়ের তীব্র অপেক্ষা আজ চাতক পাখির মতো শুধু ঘরের দরজার পানে তাকিয়ে থাকে-যদি কোনোদিন তার ছেলেটা ফিরে আসে।
​আর আমজাদ চৌধুরী? সেই পঙ্গু, হাত-পা কাটা জীবন্ত লাশটা আজ একটা অন্ধকার ঘরের কোণায় পড়ে আছে। তাকে একদম অবহেলা করা হয়নি। তাকে তিনবেলা নিয়ম করে খাবার খাওয়ানল। আরিয়ানের সাহায্যে একটু বাথরুমে নিয়ে গোসল করানো-এটাই এখন ওনার দিনলিপি।

আরিয়ান এখন আর সেই ছোট্ট, অবুঝ বাচ্চাটি নেই। সে এখন একজন বলিষ্ঠ, সুদর্শন যুবক। তবুও নিজের তিন পুচকে বোনপো, ভাইঝিকে কাছে পেয়ে সে যেন আবার নিজের শৈশবের সেই চঞ্চল বাচ্চাটি হয়ে গেছে।শাহরিয়ারকে হারিয়ে ছেলে বলে ডাকার মতো কাউকে খুঁজে পান না, তিনি শুধু আরিয়ানের দিকে বোবা চোখে তাকিয়ে থাকেন, কোনো কথা মুখ থেকে বের হয় না।আরভান একদিন ধীর পায়ে আমজাদ চৌধুরীর সেই অন্ধকার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছিল। তাকে দেখা মাত্রই আমজাদ চৌধুরীর অবশ শরীরে এক তীব্র ভয়ের কাঁপন সৃষ্টি হলো,

​মুখটা আতঙ্কে অন্ধকার হয়ে গেল। আরভান নিজের দু-হাত পকেটে গুঁজে, ওনার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার সেই হিমশীতল, গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “এখান আর কেউ আপনার ক্ষতি করবে না। এত ভয় পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কী অদ্ভুত মানুষ আপনারা! অন্যকে খুন করতে, অন্যের মৃত্যু দেখতে আপনাদের একটুও হাত কাঁপে না; অথচ নিজের মৃত্যুর সামনে এসে এত ভয় কিসের আপনাদের? কিসের এত আতঙ্ক?”

​​আমজাদ চৌধুরী আরভানের এই ধারালো প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি শুধু অপরাধীর মতো নিজের চোখ দুটো নিচের দিকে নামিয়ে নিথর হয়ে রইলেন।


​ সন্ধ্যার শান্ত বাতাস বইছে ব্যালকনিতে। আরভান আইরাকে নিজের কোলে নিয়ে ব্যান্দায় শান্ত হয়ে বসে ছিল। আনায়া তখন আরিয়ান আর ইভান, শাহজাদির সাথে খেলাধুলা করতে ব্যস্ত।

​ঠিক তখনই পেছন থেকে আয়াত ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আরভানের গলাটা দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তার কানের লতিতে এক আলতো চুমু এঁকে দিতেই কোলে থাকা পুচকে আনায়া নিজের গোল গোল চোখ দুটো বড় বড় করে মায়ের দিকে তাকাল। সে আধো-আধো স্বরে অত্যন্ত পাকা বুড়ির মতো বলে উঠল, “মাম্মা! তুমি আবার বাবাকে চুমু দিচ্ছো? আমি বলেছি না, আমার পাপাকে শুধু আমিই চুমু দেব!”

​আয়াত নিজের মেয়ের এমন পাকা কথা শুনে ঠোঁট উল্টে মুখ বেঁকিয়ে বলল, “আমার স্বামী, আমি চুমু খাব! তোমার তাতে কী শুনি, মিস আইরা চৌধুরী?”

​আয়াত মুখ ভেংচি কেটে নিজেই আরভানের কোলের একপাশে, আনায়ার গা ঘেঁষে জায়গা করে বসে পড়ল। আরভান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মা আর মেয়ের প্রতিদিনের জ্বালায় তার জীবনটা যেন ওষ্ঠাগত! প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ এমন সব কাণ্ড ঘটে তার সাথে।
​সেদিন তো আরভান ঘরে এসে দেখে মা আর মেয়ে একে অপরের চুল ধরে টানাটানি করছে! কারণ জিজ্ঞেস করায় আয়াত বলেছিল- আনায়া নাকি মায়ের চিরুনি নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে! আরভান তখন কপালে হাত দিয়ে ভেবেছিল-এরা দুজন আসলে মা-মেয়ে নাকি একে অপরের সৎ বোন, কোনটা?

​আনায়া বাবার শার্টের কলারটা খপ করে ধরে বলল, “পাপা! তুমি মাম্মাকে কিছু বলবে না? মাম্মা আবারও আমার সাথে এসব করছে! আমি তো কোল থেকে পড়ে যাব!”

​আরভান গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “আয়াত, সরো।তুমি কোল থেকে উঠে দাঁড়াও।”

​আয়াত আরভানের দিকে একটু ক্ষুব্ধ ও অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “মানে? এখন আপনার কাছে আপনার মেয়েই সব? আমি বুঝি এখন আপনার কেউ না, তাই না?”

​আরভান মনে মনে হাসলেও মুখে বলল, সে আয়াতকে আরও একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল, “আমি কখন বললাম যে তুমি আমার কেউ নও, আয়াত?”

​”তাহলে আমি কেন আপনার কোলে উঠব?” আয়াত যেন এক জেদি বাচ্চার মতো প্রশ্ন করল।

​”আচ্ছা বাবা, উঠছে না কেউ। তোমরা দুজনেই এই কোলে বসে থাকো, আমিই বরং উঠে চলে যাচ্ছি!”

​আয়াত আরভানের এই কথায় একটা মিষ্টি মুখভঙ্গি করল। তবে নিজের মেয়েকে কীভাবে পটাতে হয়, তা সে খুব ভালো করেই জানে। আয়াত চট করে আনায়ার কপালে একটা গভীর চুমু দিল। মায়ের এই আকস্মিক আদরে আইরা মুহূর্তের মধ্যে গদগদ হয়ে গেল। সে নিজের দুটো পুচকে হাত দিয়ে মায়ের গাল দুটো চেপে ধরে মাকে চুমুতে ভরিয়ে দিল। আরভান মা-মেয়ের এই ভালোবাসার কাণ্ড দেখে নিজের হাসি আর চেপে রাখতে পারল না। সে প্রাণখুলে হেসে ফেলল।
​সে হাসতে হাসতেই বলল, “তোমাদের যা করার, দয়া করে আমার কোল থেকে নেমে করো।”

​আয়াত আরভানের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি মেয়েকে বলল, “আম্মুজান, আজ নিচে কিন্তু তোমার জন্য একটা মস্ত বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে…”

​আনায়া লাফিয়ে উঠে বলল, “কী সারপ্রাইজ, মাম্মা?”
​”সারপ্রাইজ যদি মুখেই বলে দেব, তবে তো আর সেটা সারপ্রাইজ থাকে না, আম্মু।”

​”সত্যিই আছে তো?”আনয়া সন্দেহের চোখে তাকাল।

​”হুম, একদম সত্যি।”

​আনয়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাবার গালে একটা জোরসে চুমু দিয়ে সোজা কোল থেকে নেমে ঘরের দিকে ছুটে গেল। যাওয়ার আগে আবার পেছন ফিরে বলল, “মাম্মা, মজা করছ না তো?”

​”একদম না, সোনা।”

​ঠিক সেই মুহূর্তেই আরিয়ান ওখান দিয়ে যাচ্ছিল আনায়াকে ডেকে নিতে এসেছিলো।পথেই সে আনয়াকে পেয়ে এক্কেবারে কোলে তুলে নিয়ে হাসতে হাসতে লিভিং রুমের দিকে হাঁটা দিল।​সবকোলাহল আবার দূরে চলে গেল। পুরো ব্যালকনি জুড়ে এখন এক অদ্ভুত, মায়াবী নীরবতা।

আয়াত আরভানের কোল ঘেঁষে আরও একটু শক্ত হয়ে বসে ওনার চওড়া কাঁধে নিজের মাথাটা রাখল।সে মৃদু হেসে বলল, “দেখছেন আপনার বড় মেয়ের কাণ্ড? একদম আপনার মতোই সন্দেহের বাতিকগ্রস্ত হয়েছে।”

আরভানের শক্ত দু-বাহু মুহূর্তের মধ্যে আয়াতের কোমরটা নিজের বেড়াজালে বন্দি করে নিল।​এক জোড়া ভ্রু কুঁচকে আয়াতের দিকে তাকাল। কিন্তু আয়াত সেদিকে কোনো খেয়ালই করল না। সে তখন আরভানের বুকের চেনা উষ্ণতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছে।

আরভান আয়াতের কোমরে নিজের শক্ত হাতটা জড়িয়ে ধরে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ইদানিং তুমি বড্ড বেশি বেহায়া হয়ে উঠছ, মিসেস। এর পেছনের আসল কারণটা কী, জানতে পারি কি?”

​আয়াত আরভানের চোখের গভীরতার দিকে তাকিয়ে, নিজের দু-হাত দিয়ে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরল। এক অদ্ভুত, প্রগাঢ় আবেগে ওনার ঠোঁটের একদম কাছাকাছি নিজের ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আর একটা বাচ্চা চাই, আরভান…”

​​আরভান আয়াতের এই আকস্মিক ও চরম ডিমান্ড শুনে নিজের এক জোড়া ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“তোমাদের এই তিনটে মা-মেয়েকে সামলাতে সামলাতেই তো আমার মনে হয় এবার সোজা ওপরে চলে যেতে.. ”

​আয়াত মুহূর্তের মধ্যে নিজের নরম হাত দিয়ে আরভানের ঠোঁট দুটো চেপে ধরল। তার চোখে এক পলকেই এক তীব্র ভয়ের ছায়া নেমে এল। সে আকুল কণ্ঠে বলল, “প্লিজ আরভান! নিজের মুখে কখনো এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করবেন না, যা শুনলে আমার এই দুর্বল হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আমি আপনাকে ছাড়া এই পৃথিবীর কথা কল্পনাও করতে পারি না।”

​আরভান আয়াতের হাতটা নিজের ঠোঁটের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে তার হাতের তালুতে একটা চুমু খেল। তারপর বলল, “তুমি বড্ড বোকা আয়াত। না হলে এই আরভান চৌধুরীর মতো এক অন্ধকার মানুষকে কেউ কখনো এভাবে ভালোবাসে?”

​আয়াত আরভানের বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে এক গভীর আবেগে বলল, “আমি যদি বোকা হয়ে থাকি, তবে এমন বোকা আমি আমার সারাটা জীবন ধরে হতে চাই, আরভান। যতটা বোকা হলে আপনাকে আমার সারাজীবনের অর্ধাঙ্গ হিসেবে, আমার সমস্ত সুখ হিসেবে পাওয়া যায়।”

​”আয়াত…” আরভান অত্যন্ত নিচু ও গভীর স্বরে ওর নামটা ধরে ডাকল।

​”উহুম! “আয়াত আরভানের বুক থেকে মাথাটা সামান্য তুলে ওনার চোখের দিকে তাকাল।
“বলুন ‘আমার আয়াত’। আপনার মুখে ওই শব্দটা শুনতে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।”

​আরভান মুচকি হেসে বলল, “মাই আয়াত… তোমার মনে আছে আমাদের সেই প্রথম সাক্ষাতের কথা?”
​আয়াত আরভানের কোল থেকে ধীর পায়ে নেমে ব্যালকনির গ্রিলটা ধরে বাইরের শান্ত, মায়াবী অন্ধকার আকাশটার দিকে তাকাল। এক শীতল হাওয়া এসে তার চুলগুলোকে উড়িয়ে দিল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,”

মনে থাকবে না? সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা আমি কোনোদিন ভুলব কী করে, আরভান! যখন আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে ওই নরক গুলজার পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য মনে মনে দোয়া পড়ছিলাম, ঠিক তখনই হুট করে দাদু একটা নাম উচ্চারণ করলেন—’আরভান’। আমি চমকে গিয়েছিলাম লাল ঘোমটার আড়াল থেকে সেই দীর্ঘদেহী, গম্ভীর পুরুষটাকে দেখে। থমকেও গিয়েছিলাম। প্রথম দেখাতেই নিজের সেই অদ্ভুত স্বামীকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম, অথচ সে আমার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করল। শাহরিয়ার ভাইয়া যখন মাঝরাতে এক তীব্র বিপদ হয়ে এলো , সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতে শুরু করাম যেন বেচে যাই আপনি আসলেন কিন্তু আপনি সেখানেও আমাকে অপমান করলেন। অপমান করে আবার রাতের আঁধারে শাহরিয়ার ভাইয়াকে শ্বাসরোধ করলেন। পুকুরে ইচ্ছে করে লাফ দিয়ে আমার পরীক্ষা নিলেন, জোর করে ওই মিথ্যা ডিভোর্স পেপারে সই করালেন… আর তীব্র জ্বর আনিয়ে সারারাত আপনার সেবা করিয়ে, সকালে সবার সামনে আমার চরিত্র নিয়ে কুৎসিত অপবাদ দিলেন! আবার যার সাথে অপবাদ দিলেন, তার ছোঁয়া আপনার স্ত্রীর গায়ে লাগার অপরাধে- কাঁচ দিয়ে তার হাত কেটে রক্তাক্ত করলেন। ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে আমাকে এই বাংলাদেশ থেকে উড়িয়ে নিয়ে গেলেন মেলবোর্নের সেই অচিন দেশে.. তারপর ধীরে ধীরে মনস্তাত্ত্বিক জাল বুনে কীভাবে যেন আমাকে নিজের জন্য আস্ত একটা পাগল বানিয়ে নিলেন! আপনি বড্ড অদ্ভুত আরভান… আপনার সবকিছুই অদ্ভুত, রহস্যময় আর ভয়ঙ্কর! তবে সেই ভয়ঙ্করের মাঝেই আমি আজীবন আসক্ত।”

​আয়াত এক লহমায় আরভানের দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন এক আদিম, খাঁটি ভালোবাসার আলো জ্বলজ্বল করছে। সে বলল, “আমি আপনার এই অন্ধকার সত্তার ওপর আসক্ত আরভান… আর এই আসক্তি আপনার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।”
​আরভান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আয়াতকে পেছন থেকে নিজের শক্ত বুকে জড়িয়ে ধরল। ওর ঠোঁটে এক দীর্ঘ, পবিত্র ও গভীর ভালোবাসার চুমু এঁকে দিয়ে বলল, “মিসেস আরভান… সারাটা জীবন, প্রতিটা জন্ম ধরে শুধু আমার হয়ে থেকো।”

​আয়াত মুচকি হেসে আরভানের বুকের উষ্ণতায় নিজেকে সঁপে দিল। সে আরভানের গালে নিজের নরম ঠোঁট দুটো আলতো ছুয়িয়ে বলল, “শুধু এই সারাজীবন নয় আরভান… পরকালেও আমি আল্লাহর কাছে শুধু আপনাকেই চেয়ে নেব। আমি আজীবন শুধু আপনার হয়েই থাকব, আরভান চৌধুরী।”

​আয়াত দুষ্টুমি ভরা চোখে মুচকি হেসে আরভানের গালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াল। তারপর ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চলুন না… আমরা আর একটা বাচ্চার জন্য প্ল্যানিং শুরু করি…”

​আরভান আয়াতের এমন নির্লজ্জ ও মিষ্টি আবদার শুনে নিজের এক জোড়া ভ্রু কুঁচকে ভন্ড বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “বেশি পাকা কথা বললে একদম চড় মেরে গাল লাল করে দেবো বলে দিলাম। কোন বাচ্চা আসবে না।”

“কেন”

“ওই বার তোমাকে ওভাবে দেখে আমার পরাণ যায় যায় অবস্থা আর সেই মুহুত্ব জীবনেও আসতে দিতে রাজি না।”

“আমি..”

“চুপ..সারাক্ষণ শুধু দুষ্টুমি আর ফাজলামি… বড্ড বেহায়া আর একরোখা বউ হয়েছ তুমি!”

​আরভানের মুখে এমন ধমকমিশ্রিত রসিকতা শুনে আয়াত খিলখিল করে হেসে ওনার বুকের ওপর ভেঙে পড়ল। আরভান নিজেও আর নিজের ভেতরের সেই গম্ভীর রূপটা ধরে রাখতে পারল না। সেও প্রাণখুলে হেসে ফেলল। তার জীবনের সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত অতীত আজ এই একটা মেয়ের মায়াবী হাসির কাছে এসে চিরতরে বদলে গেছে।

​আরভান আয়াতকে নিজের বুকের মাঝে আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে এক পরম তৃপ্তির সুরে ফিসফিসিয়ে বলল, “এই পুরোটা জীবন, এই পুরোটা অস্তিত্ব জুড়ে তুমি শুধু আমার,​এই পৃথিবীর সমস্ত আড়াল আর অন্ধকারের মাঝে পুরোটা জীবন তুমি শুধু আমার, শুধুমাত্র আমার আয়াত.আর এভাবে আমার হয়ে থেকো। ভালোবাসি তোমাকে। আমার আয়াতকে আমার সন্তানের জননীকে।ভালোবাসি।”

—–সমাপ্তি—-