আমি তোমার গল্প হবো পর্ব-২৩

0
781

#আমি_তোমার_গল্প_হবো🍁
লেখিকা- মাহিয়া তাহসীন মেরিন
পর্ব:::২৩

🌻পরদিন🌻

অধরা আর আশ্বিন সকাল সকালই সেই ঠিকানা অনুসারে চলে এসেছে নানাভাইয়ের খোঁজে।

অসম্ভব সুন্দর একটা গ্রাম, চারদিক গাছপালায় ঘেরা। অধরা আশ্বিনের দিকে একবার তাকিয়ে,

— ” আশ্বিন, আপনি শিওর এখানে নানাভাই থাকতে পারে? ”

— আশ্বিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে, ” আমি জানি না, অধরা।
আশা করি নানাভাইকে খুঁজে পাবো। ”

অধরা মাথা নেড়ে হ্যা বোঝায়। তারপর আশ্বিনের হাত ধরে হাঁটতে থাকে।
গ্রামটা ছোট থাকায় সেখানে ঘরবাড়ি কম, তাই অধরা আর আশ্বিন প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানাভাইয়ের খোঁজ নিতে থাকে।

কিন্তু কেউই আহমেদ নামের কাউকে এই গ্রামে দেখেননি।
অবশেষে আশ্বিন হতাশ হয়ে একটা ছোট দোকানের সামনে বসে পড়ে। অধরা আশ্বিনের পাশে বসে,

— ” আশ্বিন, এভাবে ভেঙে পড়বেন না। আমরা নানাভাইকে খুব শীঘ্রই পেয়ে যাবো, ধৈর্য ধরুন। ”

আশ্বিন কিছু না বলে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকে। অধরা আশ্বিনের মন খারাপ বুঝতে পেরে আশ্বিনের হাত ধরে তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর আশ্বিন স্বাভাবিক হয়ে বসে অধরার দিকে তাকিয়ে,

— ” অনেকটা সময় হয়ে গিয়েছে আমরা এখানে এসেছি।
তুমি তো সকালে কিছু না খেয়েই আমার সাথে চলে এসেছো।
এখানে হয়তো আর ভালো কোন দোকান নেই, এই দোকানে যা পাওয়া যাই তাই খেতে হবে। চলো। ”

কথাটা বলে আশ্বিন উঠে দাঁড়িয়ে অধরার হাত ধরে দোকানের ভেতর এসে বসে। দোকানটা ছোট হলেও ভেতরে খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো। নিত্যদিনের সাধারণ খাবারগুলোই এখানে পাওয়া যায়।

আশ্বিন অধরাকে নিয়ে একটা বেঞ্চে এসে বসে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে বসে থাকার পর একজন বৃদ্ধ লোক তাদের সামনে এসে,

— ” আমি দুঃখিত বাবা। একটু ব্যস্ত ছিলাম তাই দেরি হয়ে গেলো।
বলুন আপনারা কি খেতে চান? ”

আশ্বিন এতোক্ষণ চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে বসে ছিলো। হঠাত কথাটা কানে আসতেই ধীরে ধীরে চোখ খুলে পাশে ফিরে তাকাতেই অবাক হয়ে যায় সে।
অধরা স্বাভাবিক ভাবেই বসে আছে আর আশ্বিনের কিছু বলার অপেক্ষা করছে।

এদিকে আশ্বিন অবাক হয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কাপা কণ্ঠে,

— ” ন…ন…নানাভাই ! ”

বৃদ্ধ লোকটা এতোক্ষণ স্বাভাবিক ভাবে থাকলেও আশ্বিনের কথা শুনে চমকে উঠে। নিজের মোটা ফ্রেমের চশমা দিয়ে ভালোভাবে কিছুক্ষণ আশ্বিনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেন তিনি।

— ” আ..আশ্বিন? আমার ছোট আশ্বিনটা কি তুমি? ”

নানাভাইয়ের কথা শুনে আশ্বিনের চোখ থেকে অজান্তেই পানি পড়ে যায়। সে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে হ্যা বোঝায়। নানাভাই আশ্বিনের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে আশ্বিনকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
এদিকে অধরা নিরব হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অবশেষে তাহলে নানাভাইকে খুঁজে পেয়েছে তারা। ভাবতেই একটা মুচকি হাসি দেয় অধরা।

🌻🌻

অধরা আর নানাভাই রুমের একটা বেঞ্চে বসে আছে আর আশ্বিন জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

বৃষ্টির জন্য গ্রামের পরিবেশটা আরো বেশি সতেজ লাগছে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যেনো এই ছোট্ট গ্রামের, এই ছোট্ট কুটিরেই ফুটে উঠেছে।
আশ্বিন কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তারপর ধীরে ধীরে নানাভাইয়ের সামনে এসে,

— ” তুমি এতোগুলো বছর ধরে এখানে লুকিয়ে ছিলে নানাভাই? ”

— ” হ্যা, বাবা। অনেক কষ্টে নিজেকে এই ছোট্ট কুটিরে আত্মগোপন করে রেখেছি। নয়তো কে জানে কি হতো…। ”

— আশ্বিন নানাভাইয়ের পাশে বসে, ” আমাকে সব ঘটনা খুলে বলো নানাভাই।
যদিও আমি অনুরিমার বলা একটা কাহিনী জানি। তবুও তার সততা যাচাই করতে তোমার কাছে শুনতে চাই। ”

অধরা এতোক্ষণ চুপচাপ তাদের পাশে বসে তাদের কথাগুলো শুনছে। নানাভাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,

— ” আকাশকে তারা মেরে ফেলেছে আশ্বিন। আমার চোখের সামনেই মেরে ফেলেছে। আমি কিছুই করতে পারিনি, বাবা।

তারা আমাকেও মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। কারণ আমি বলেছিলাম তাদের পুলিশে দিবো।
তারা আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে আশ্বিন। ”

— অধরা অবাক হয়ে, ” তারা মানে? কে কে ছিলো নানাভাই? ”

— আশ্বিন রাগী কণ্ঠে, ” আর কে হবে? শাহিন আর অনুরিমা। ”

আশ্বিনের কথা শুনে নানাভাই চোখ মুছে চোখে চশমা লাগিয়ে,

— ” অনুরিমাকে দোষ দিচ্ছো কেনো আশ্বিন?
জানি তারও দোষ আছে। কিন্তু অনুরিমার আকাশকে মেরে ফেলায় হাত নেই। ”

— অধরা আশ্বিনের দিকে তাকিয়ে, ” শুধুমাত্র একটা বিজনেসের লিড হওয়ার জন্য কিভাবে একজনকে মেরে ফেললো তারা? ”

— নানাভাই অধরার দিকে তাকিয়ে, ” বিষয়টা শুধু বিজনেস রিলেটেড ছিলো না, মা। এখানে অনেক বড় একটা কারণ আছে।

শাহিন শুধু মাত্র আমাদের বিজনেস প্রতিপক্ষ না, আমার বড় মেয়ে অবণীর স্বামী ছিলো। ”

নানাভাইয়ের কথা শুনে অধরা আর আশ্বিন অবাক হয়ে যায়। তারা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে নানাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

— ” অনুরিমা আমার একমাত্র মেয়ে না, আশ্বিন। আমার বড় মেয়ের নাম অবণী। তোমরা হয়তো জানো না, সাহিলের মা আমার বড় মেয়ে।

আমার মেয়েটা খুব শান্তশিষ্ট ছিলো। ছোট থেকেই একটুতেই বেশি ইমোশনাল হয়ে যেতো। বিজনেস প্রোগ্রামে একবার শাহিনের সাথে তার পরিচয়। সেই থেকেই মেয়েটার মনে শাহিনের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ পায়। আর, আমার অজান্তেই তারা পালিয়ে বিয়ে করে ফেলে।

বিষয়টা আমি কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনি। আমার মেয়ে শেষ পর্যন্ত কিনা আমার প্রতিপক্ষের সাথে বিয়ে করলো। তাও যদি শাহিন মানুষ হিসেবেও যদি ভালো হতো তাহলেও আমি মেনে নিতাম। কিন্তু….।

অবণীর সাথে আমরা সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। আমার ভয় ছিলো যদি অনুও অবণীর মতো ভুল করে তাই বাধ্য হয়ে আকাশের সাথে তার জোর পূর্বক বিয়ে দিয়ে দেই।
অনু কখনো এই বিয়েটা মেনে নিতে পারেনি। অল্প বয়সী মনের বিরুদ্ধে এই বিয়ে সে কখনোই আপন ভেবে দেখেনি। আকাশ আশ্বিন কাউকেই না।
বারবার নিজেকে ব্যস্ত রাখতে আর তোমাদের থেকে দূরে থাকতে পালিয়ে বেরিয়েছে।

সেদিকে, আমার অবণী ভালো ছিলো না। আকাশের যেভাবে অনুকে সবটা দিয়ে আগলে রাখতো, শাহিন কখনোই অবণীকে আগলে রাখেনি।
শাহিন একটু একটু করে আকাশের এতো উন্নতি দেখে ভেবেই নিয়েছিলো আকাশের এভাবে বিজনেসে টপ হওয়ায় আমার হাত আছে। ভেবেছে আমি ইচ্ছে করে শাহিনকে দেখিয়ে দিতে এসব করেছি।

একটা সামান্য বিষয় নিয়ে আমার অবণীর উপর সে সন্দেহ আর রাগ দেখাতো। আর এক পর্যায়ে যখন গায়ে হাত তুলতে শুরু করে তখন অবণী অনেক ভেঙে পড়ে আর কিছুদিন পর সে আত্মহত্যা করে। ”

নানাভাই কথাগুলো বলে চোখের পানি ছেড়ে দেয়। অধরা এসে নানাভাইয়ের কাধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়।

— ” অবণীর এভাবে চলে যাওয়ায় শাহিন সর্বপ্রথম আকাশকেই দোষী মনে করে। তাই তার মনে প্রতিশোধ জেগে ওঠে।
নানাভাবে আকাশের বিজনেসে সমস্যা সৃষ্টি করে।

ছোট সাহিলকে দেখিয়ে অনুরিমাকে ব্লেকমেইল করে তার সাথে বিয়ে করতে। যেনো বিজনেস রাজ্যে আকাশের সম্মানহানী হয়।
সেদিন অনু এসেছিলো আমার সাহায্য নিতে কিন্তু আমার হাতও তখন বন্ধ ছিলো। অনু যতই বলুক আকাশকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি কিন্তু আমি জানি আমার মেয়েটা তোদের খুব ভালোবাসতো আশ্বিন, হয়তো কখনো প্রকাশ করেনি।

সেদিন বিয়েতে আকাশ হঠাত করেই চলে আসে। অনু সাহিলের বিষয়টা আকাশকে বলেনি তবুও কোন একভাবে আকাশ জেনে যায় আর ছুটে চলে আসে।
আকাশের কাছে কিছু মেডিক্যাল রিপোর্ট ছিলো যেখানে প্রমাণ হয় শাহিলের মানসিক সমস্যা আছে আর এই অবস্থায় সাহিলকে তার পাশে রাখা সম্ভব না।

আকাশ বলেছিলো রিপোর্টটা কোর্টে দিয়ে সাহিলকেও তাদের কাছে নিয়ে নিবে। কথাটা শুনে অনুরিমা খুব খুশি হয়েছিল। আর তখনই শাহিন রেগে গিয়ে….। ”

নানাভাইয়ের কথা শুনে দুজন স্তব্ধ হয়ে যায়। অধরা ঘোরের মধ্যে,

— ” মামুনী কেনো আমাদের আসল সত্যটা বলেনি? অবণী আন্টির কথা কেনো বলেনি। ”

— ” অনু সেদিন থেকেই ঘৃণা করে অবণীকে। অবণীর জন্যই এতোসব হয়েছে মনে করে। তাই হয়তো….। ”

— আশ্বিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে, ” তুমি তাদের কাছ থেকে পালিয়ে আসলে কিভাবে? ”

— নানাভাই একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে, ” সেদিন যখন….”

—চলবে❤