আষাঢ়ি পূর্ণিমা পর্ব-১৫+১৬

0
442

#আষাঢ়ি_পূর্ণিমা
#পর্ব_১৫
#খাদিজা_আক্তার

রাত্রির ভয় হচ্ছে। মনের মধ্যে কেমন যেন খচখচ করছে। আদী উলটো পালটা কিছু করব কিনা তা নিয়ে মস্তিষ্কে ঝড় বইছে। কিন্তু একবার যখন রাজি হয়েছে, তখন মৃত্যু এলেও রাত্রির কিছু বলার থাকবে না। তাই নিজেকে প্রাণপণে সংযত রেখে রাত্রি চোখ নামিয়ে বসে আছে।

—এবার কাজল পরিয়ে দিই?

আদী জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু রাত্রি জবাব দেওয়ার পরিবর্তে একবার চেয়ে দেখে আবারও একই ভঙ্গিতে বসে রইল।

কাজল আর আয়না এগিয়ে দিয়ে আদী বিষাদের হাসি হাসল। বলল,

—তুমি পরে নাও। আমার অভ্যেস নেই।

রাত্রি বাধ্য মেয়ের মতো কাজল পরে নিলো। এটি করতে গিয়ে তার চোখে জল এসেছে যা আদী টের পায়নি৷ এ জল কাজল দিয়ে সৃষ্টি নয় বরং অন্য এক আদীকে দেখতে পেয়ে রাত্রির বুকের কষ্ট কালো হয়ে ওঠছে আর তা চোখের অঞ্চলে দেখা দিচ্ছে।

একে একে আদী রাত্রির পায়ে নূপুর আর কানে দুল পরিয়ে দিলো। দুল পরানো শেষে আদী অতি যত্নে রাত্রি মুখ দু’হাতে সামনে এনে কপালের মাঠে গাঢ় প্রেম এঁকে দিলো। রাত্রি হতভম্ব হলো, কিন্তু আরও বেশি অবাক হলো যখন আদী তার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে কেঁদে ওঠল। বলল,

—রাত্রি, আমাকে একটু ভালোবাসবে? আমার মতো খারাপ ছেলেকে না কেউ ভালোবাসে না। তুমি… তুমি আমাকে…

আদী কাঁদছে; ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এর আগে রাত্রি কখনো আদীকে এমন করে কাঁদতে দেখেনি। আদী কাঁদত। তবে সামান্য জল এলেই হাতের উলটো পিঠে মুছে ঠিক হয়ে যেত, কিন্তু আজ এমন বুকফাটা কান্নায় কেন ভেঙে পড়েছে আদী? এমন চিন্তায় ব্যস্ত রাত্রি। সে কী করব আর বলব তা চিন্তা করতে করতেই আদী উঠে অন্য রুমে চলে গেল। রাত্রি নির্জীব হয়ে বসে রইল।

*

আকাশে একফালি চাঁদ। আকাশ আজ জ্যোৎস্নায় স্নান করছে অবিরত। মস্ত আকাশের স্নিগ্ধতা পৌছে গেছে বসার ঘরে। যে ঘরে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে সোফায় পড়ে আছে রাত্রি। হঠাৎ রাত্রির ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সামান্য দ্বিধান্বিত হলো। কিন্তু হঠাৎ ডান পায়ের পাতায় কীসের যেন নাড়াচাড়া অনুভব করল। ভয় পেয়ে আচমকা সোজা হয়ে বসল। সম্মুখে আদীকে দেখতে দেখতে পেয়ে ঘুম জড়ানো গলায় বলল,

—আদী… তুমি…

আদী মেঝেতে বসে রাত্রির পায়ের নূপুর নিয়ে খেলছে যেন এ খেলায় সে দারুণ ভাবে মত্ত হয়ে আছে। চোখজোড়া তার রাত্রির পায়ে আবদ্ধ। সমস্ত মুখে ছেয়ে আছে অপরিসীম ক্লান্তি। তবে মুখে কোথাও রাগ ছায়াটিও নেই।

—অবশেষে তোমার কণ্ঠ শুনতে পেলাম। আজ সারাদিনে আমার সাথে একটি কথাও বলোনি। আপত্তি নেই। যাকে ঘৃণা করো, তার সাথে কথা বলতে তো সমস্যা হতেই পারে, তাই না?

এ বলে আদী তাকাল রাত্রির দিকে। চোখে চোখ পড়তেই রাত্রি তৎক্ষনাৎ নিজের চোখ সরিয়ে নিলো। মুহূর্তেই তার মুখে যেন অভিমানের সাতরং খেলা করে গেল। রাত্রির এমন মুখ দেখে আদী অন্য হাসি হেসে বলল,

চোখে ঘুম নেই আমার
বোধহয় তোমার ছবি অঙ্কিত আছে বলে।
দুই চোখ বুজে দিলে তাই ঘুম নয়,
শয়নেস্বপনে তুমি আসো ক্ষণে ক্ষণে।

শ্রেয়সী, তুমি কি তবে আমার চোখের ঘুম কেঁড়ে নিলে?
বুকের ভেতরে জ্বালা ঢেলে দিলে?
কেন করলে এমন শ্রেয়সী?
তুমি কি জানো না ঘুমহীন মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে না?
এমন সুপরিকল্পিত হ””ত্যা কেন করতে চাইছ শ্রেয়সী?

আমি তোমাকে প্রেম নিবেদন করেছিলাম,
শুনিয়েছিলাম বুক পকেটে জমা একগুচ্ছ প্রেমের প্রলাপ,
কিন্তু তুমি হেসে উড়িয়ে দিলে।
আমায় খুব যত্ন করে আঘাত দিলে।
কেন করলে এমন শ্রেয়সী?

শ্রেয়সী, তুমি কি আমার চোখের ঘুম হবে?
তুমি ঘুম হলে আমি যে বেঁচে যেতাম।
নির্ঘুম রাত্রি যে আর করতে পারি না পার।
শ্রেয়সী, হবে কি আমার এক রাত্তির ঘুম?

এসব শুনে রাত্রি অবাক হলো, কিন্তু নিজের পায়ে আদীর টুকরো টুকরো স্পর্শে রাত্রির ভীষণ রাগ হচ্ছে। তাই সে ছুটে পালাতে চাইল। কিন্তু অন্য রুমে প্রবেশ করার আগেই আদীর বাহুডোরে বন্দী হলো। রাত্রি সামান্য চিৎকার করে জানান দিলো তার হাতে সে ব্যথা পেয়েছে। কারণ আদীর বুকে আছড়ে পড়ার মূহুর্তে কাচের চুড়িতে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ব্যথায় কাতর কণ্ঠে নিসৃত হলো যে চিৎকার তা যেন আদী শুনতে পেল না। রাগত স্বরে বলল,

—আমাকে কী ভাবো তুমি?

—কিছুই ভাবি না।

কান্নায় ধরে আসছে রাত্রির গলা তবুও সে রাগ ফুটিয়ে আদীকে জবাব দিলো। এসব নিরপেক্ষতার প্রভাব বিস্তার করে রাত্রি যে জবাব দিলো, তাতে আদীর মনে হিংস্রতা জ্বলে ওঠল,

—তুমি আমাকে নরপিশাচ ভাবো রাত্রি। এমন চিন্তা কেমন করে করলে তুমি? তোমাকে একদিনের জন্য গার্লফ্রেন্ড হিসাবে চাওয়া, ভালোবাসতে চাওয়ার মানে কি আমি তোমায় ভক্ষণ করতাম?

—আমাকে… আমাকে যেতে দাও। আমার হাত জ্বলছে।

—জুলুক তোমার হাত।

আদী চিৎকার করে ওঠল। নিস্তব্ধ রাতে ফাঁকা বাড়িতে আদীর কণ্ঠ ভীষণ ভয়ংকর শোনালো। রাত্রি ভয়ে কাঁপছে, কিন্তু কী করবে এখন সে?

—তোমারে কইছে আমার লাইগা একদিনের প্রেমিকা হইতে। আরে তোমারে নিয়া যদি আমার অন্য চিন্তা থাকত। তাইলে দেড় বছর আগেই আমি উলটা পালটা কিছু করতে পারতাম। তোমাগো বাড়িতে সেই দিন কেউ আছিল না। সন্ধ্যার পরে আমি তোমার ঘরে ঢুকছিলাম। তুমি ঘুমায় ছিলা। আমার অন্য ফন্দি থাকলে একলা ঘরে তোমার গায়ে কাঁথা টাইনা আমি চইলা যাইতাম না। আমি তোমারে একলা এত দূরে একটা বাড়িত আনছি বইলা তুমি আমারে এইটুকু বিশ্বাস করতে পারলা না?

—আমি… আমি তোমাকে অবিশ্বাস…

—কথা কইয়ো না তুমি। তোমার উস্টা মার্কা কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। আমারে যদি অবিশ্বাস না করতা তাইলে তোমার বান্ধবীরে দিয়া বিষ আনাইছ ক্যা? কোন কারণে আজকা তুমি তোমার লগে বিষ লইয়া আইছ?

রাত্রি চুপ করে আছে। হ্যাঁ, রাত্রি এখানে আসার আগে বিষের ব্যবস্থা করে এসেছে। ভেবেছে আদী যদি মস্তিষ্ক বিকিয়ে কোনো কাজ করে। তবে আব্বা আম্মার সামনে না দাঁড়িয়ে বিষ গলাধঃকরণ করবে। কিন্তু এটি যে আদী টের পেয়ে যাবে তা রাত্রি ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি।

—আমারে ঘৃণা করো— এটা আমু মাইনা নিতাম। কিন্তু এমন চিন্তা কেমনে করলা তুমি? বুশরা তো তোমারে সব কইছে। তাও তুমি এমন চিন্তা করতে পারলে?

রাত্রি শুরু থেকেই আদীর টিশার্ট দু’হাতে খামচে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু এখন একের পর এক আদীর বলা কথাগুলো শুনে রাত্রির হাতের মুঠো থেকে টিশার্ট আলগা হয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণ আদীর বুকের ভেতরকার যে ছন্দপাত রাত্রি ডান হাতে অনুভব করছিল, তা ক্রমশ দূরত্বে চলে যাচ্ছে বলে রাত্রির অজানা কষ্ট হচ্ছে। রাত্রির ইচ্ছে করছে আদীকে চিৎকার করে বলতে,

—আমি তোমাকে নরপিশাচ ভাবিনি আদী। তোমার মন বড়ো বেশি ভালো। কিন্তু নেশা করলে তুমি যা বলো তা আমি সহ্য করতে পারি না। ওই নোংরা কথাগুলো বাস্তবে যদি তোমারই অজান্তে আমার সাথে ঘটে যায়। তাহলে আমার যে মরণ ছাড়া গতি হবে না। আমি তোমাকে দোষ দিতে পারি না অথচ এসব সৃষ্টিকারী তুমি নিশ্চয়ই নির্দোষী হবে না।

—কথা কও না ক্যা? আমি তোমার লগে কী এমন করছি যে তুমি আজকা আমার মনডা এমন কইরা ভাইঙা দিলা? আমার খোয়াব ছিল তোমারে খয়েরি রঙের শাড়িতে দেখমু। তাই কত খোঁজাখুঁজি কইরা নিজে তোমার লাইগা শাড়ি কিনা আনছি। তোমারে নিজ হাতে সাজাইয়া চাইছিলাম তোমার কোলে মাথা দিয়া ঘুমাইতে। তোমার লগে রাত জাইগা চাঁদ দেখতাম। আমার এসব চাওয়ারে তুমি এমন নোংরা কলঙ্ক দিয়া দিলা? আমরা পুরুষ জাত কি এতই খারাপ রাত্রি?
(চলবে)

#আষাঢ়ি_পূর্ণিমা
#পর্ব_১৬
#খাদিজা_আক্তার

শেষ প্রশ্নটি বেশ জোর দিয়েই করল আদী আর এমন প্রশ্ন শুনে রাত্রির মাথায় হুট করেই ইব্রাহিমের নামটি চলে এলো। এমন বাজে পরিস্থিতিতেও তার মন নিজের অজান্তেই হেসে ওঠল। বলল,

—সব পুরুষ এক না হলেও কি অভিন্ন? ইব্রাহিমকে দেখলে যেমন ঘৃণা আসে, তেমন তোমাকে দেখলেও আসে যখন তুমি নেশা করে আমার সাথে জঘন্য কথাগুলো বলো। কিন্তু এসব বললেও নিজেকে কেমন লাগে কারণ আমি তো কোনো পুরুষের সন্তানও।

—এই রাত্রি, কথা কও না ক্যান?

রাত্রি নত দৃষ্টিতে নানান চিন্তায় বিভোর ছিল, কিন্তু এখন আদীর প্রশ্ন শুনে নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে জানতে চাইল,

—কী বলব?

আদীর দুই হাতের বাঁধনে বন্দী রাত্রি। সে বান্ধন আরও শক্ত করে করুণ গলায় আদী বলল,

—কেন বিষ নিয়ে এলে? মাত্র চব্বিশ ঘণ্টাও আমায় বিশ্বাস করতে পারোনি?

প্রশ্ন শুনে রাত্রি নিজের কান্না সংবরণ করে শক্ত গলায় বলল,

—দু’দিন বাদে যে মেয়ের বিয়ে হতে চলেছে, সে এখন অন্য পুরুষের মুখোমুখি এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন তাদেরই বিয়ে হবে। মানুষের অন্যায় আবদার মানতে যে মেয়ে ২৪ ঘণ্টা তার সংস্পর্শে থাকবে, সে মেয়েকে তুমি এ কথা জিজ্ঞেস করছ?

রাত্রির মুখে এমন কথা শুনে আদী নির্জীব হয়ে গেল। হাতের বাঁধন ক্রমশ আলগা হয়ে গেল। আদী দূরত্ব বাড়িয়ে পিছনে যেতে লাগল চোখ নামিয়ে। আদীর চেহারায় এখন এমন প্রতিক্রিয়া ভাসছে যা দেখে রাত্রির মনে হচ্ছে হয়তো আদী এখন কেঁদেই দিবে। কিন্তু না। আদী নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে আর তার চলে যাওয়া দেখে রাত্রি ছুটে এসে ডান টেনে ধরে জিজ্ঞাসা করল,

—আমার কথার জবাব না দিয়ে তুমি পালাচ্ছ কোথায়?

আদী উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছে। রাত্রি বলল,

—হ্যাঁ, বিষ এনেছি। কিন্তু তোমাকে নরপিশাচ ভেবে আনিনি। আমি জানি মানুষের নেশা করলে হুঁশ থাকে না, তোমারও থাকেনি। তুমি যা পেরেছ সে রাতে আমাকে তাই বলেছ। এমন সব কথা বলেছ যা একজন স্বামী তার স্ত্রীকে বলতে পারে। আমাদের মাঝে তো তেমন সম্পর্ক ছিল না। তাহলে কেন বললে আমায়? তুমি জানো? তোমার প্রতিটি কথা আমার হৃদয়ে বিষ হয়ে ঢুকেছে। যখনই এসব আমার মনে পড়ত আমি পাগলের মতো কান্না করতাম তবুও তোমায় কিচ্ছু বলতাম না কারণ আমি জানি এসব তুমি ইচ্ছে করে বলোনি। এসব কথা শোনার পর তুমি কীভাবে আশা করো তোমাকে আমি নিরাপদ মনে করব?

—তু… তুমি আমার কাছের অনিরাপদ?

এ প্রশ্ন করে অবিশ্বাসের চোখে তাকাল আদী আর নিজের হাত একটু একটু করে রাত্রির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিলো। রাত্রি আহত হলো আদীর প্রশ্ন শুনে আর আহত হৃদয় নিয়েই কিছু বলতে চাইল। কিন্তু বিধাতা সে সুযোগ রাত্রিকে দিলো না। আদীর ফোন বেজে উঠতেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করল,

—হ্যালো।

আদী ফোনে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু রাত্রির চোখে চোখ রেখে কেমন যেন থমকে আছে।

—কখন হয়েছে এসব? জহিরকে কি পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে?

আদী প্রশ্ন করল, কিন্তু উত্তর কী এলো রাত্রি শুনতে পেল না। আদী বলে চলেছে,

—আরে ওই মেয়ে তো আমার বাসার সামনেই থাকে… খালি বিয়ে ভেঙে যায়… তুই কি শিওর যে ওই মেয়ে জহিরের জন্য সুই””সাইড করেছে?… ওকে। আমি এখনই আসব, কিন্তু আধঘণ্টা সময় লাগবে।

শেষ বাক্য আদী বলল একদম গাঢ় গলায় তাও রাত্রির পানে তাকিয়ে। যেন তার গলার স্বর বলে দিচ্ছে, আমাকে আধঘণ্টা দে আমি রাত্রিকে সময় দিতে চাই।

আরও দুই মিনিট কথা বলে আদী ফোন রেখে দিলো। এরপর রাত্রিকে বলল,

—ভালোই হয়েছে এখন আমাকে চলে যেতে হবে কারণ যে আমার কাছে নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। তার সাথে অন্তত ২৪ ঘণ্টা প্রেমিকের মতো আচরণ করা যায় না।

এ বলে আদী একদম রাত্রি কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। বুকের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া বেদনা নিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,

—তোমার সাথে আমার যা সম্পর্ক ছিল রাত্রি। আজ তা নিজের অজান্তেই শেষ হয়ে গেল। আমার জীবনে মেয়ে এসেছে যেমন, চলেও গেছে কোনোরূপ ছায়া না ফেলে। কিন্তু তুমি চলে যাচ্ছ আমার সমস্ত মনকে ছাই করে দিয়ে। আমি তোমাকে কখনো প্রেমিকার নজরে দেখিনি, কিন্তু আমার সবসময়ই একটি চাওয়া ছিল যেন তোমার মতো একটি মেয়ে আমার প্রেমিকা হয়; বউ হয়। কিন্তু আজকে থেকে এ চাওয়াকে আমি নিজ হাতে খু””ন করলাম। তোমার সাথে দেড় কি দুই বছরে আমি অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। তাই আমার মনে হয়েছিল তুমি হয়তো কষ্ট পেয়ে সুই””সাইড করতে পারো কারণ আমি জানি তুমি ইব্রাহিমকে পছন্দ করো না। কিন্তু এ বিষয়েও তুমি নির্জীব রইলে। অবশ্য এখন বললেও আমার কিছু যায় আসে না। যেখানে সম্পর্ক নেই, সেখানে নির্লজ্জের মতো আমি তোমার ওপর অধিকার ফলাতে চাই না। তবে কি জানো? মাঝেমধ্যে বুকের ভেতরে তোমার নামে যে ছন্দপাত হয় তা হয়তো আমি কোনোদিনও থামাতে পারব না।

*

রাত শেষ প্রায়। আলো ফুটছে আকাশে। কিন্তু মনের আলো কাল রাতেই নিভে গেছে। আদী কখনো ভাবতে পারেনি রাত্রি তাকে নিয়ে এমন চিন্তা করতে পারে। তবে আদীর আচরণ যে আহামরি ভালো ছিল তা সে নিজেই স্বীকার করতে অপারগ। তবে একটি বিষয় কাল সকাল থেকেই অনুভব করছে আদী। গৌর বর্ণের ওই মেয়ে তাকে অন্যভাবে টানে। খয়েরি রঙের শাড়ি আর কাজল চোখের দৃষ্টি বুকে জ্বালা ধরিয়ে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু এসব চিন্তা এখন করে তো কোনো লাভ নেই।

কালকে রাত দশটা নাগাদ আদী রাত্রিকে তার সেই বান্ধবীর বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল, যার কথা বাসায় বলে রাত্রি এসেছিল আদীর কাছে। বান্ধবীর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পরও রাত্রি কোনো কথা বলেনি। পুরো সময় জুড়ে মেয়েটি কেমন তব্দা লেগেছিল। কিন্তু পৌঁছে দিয়ে আদী শেষবারের মতো বলেছিল,

—আমি তো নিকৃষ্টতম মানুষ। তাই তোমার জীবনের মূল্যবান ঘণ্টা আর ব্যয় করলাম না। ভালো থেকো। আজকের পর আর কখনো তোমার সামনে এসে দাঁড়াব না। স্বর্ণালি আমাকে বদলে দিয়ে গিয়েছে অনেকটাই, বাকিটুকু আজ তুমি বদলে দিলে।

এ কথা শেষে আদী বিষাদের হাসি হেসেছিল। তার হাসি রাত্রি দেখেছিল মনোযোগ দিয়ে, কিন্তু জবাব দেওয়ার মতো আগ্রহ তার ছিল না। ফলে শেষ বিদায়েও রাত্রি ছিল একদমই চুপচাপ।

—আদী?

পুলিশ স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছিল আদী। এ মাত্র সাজ্জাদ এসে পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল। আদী ভাবনায় বিভোর ছিল বলে সামান্য নড়েচড়ে ওঠল। তবে কিছু না বলে কেবল সাজ্জাদের দিকে এগিয়ে গেল,

—আমি স্বর্ণালির কেস নিয়ে ঢাকা ছিলাম। এ মাত্র এলাম। জহিরকে শুনলাম অ্যারেস্ট করেছে। কিন্তু তুই সারা রাত ধরে এখানে কেন?

সাজ্জাদের প্রশ্ন আদী বুঝতে পারল তবুও অবুঝের মতো জিজ্ঞাসা করল,

—তাহলে কই থাকব?

—কই থাকবি মানে? তোর না রাত্রির সাথে থাকার কথা?

—ছিল, কিন্তু জহিরের বিপদ তাই…

—কী হয়েছে দোস্ত?

প্রশ্ন করেই সাজ্জাদ আদীর কাঁধে হাত রাখল। আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করে আদীর খবর নিতে চাইল। কিন্তু আদী রাত্রিকে নিয়ে কিছু বলতে চায় না। তাই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল,

—আরে আমার আবার কী হবে?

—হয়েছে বলেই তো জিজ্ঞাসা করছি। জহির তো পেয়ারের দোস্ত না যে তুই রাত্রিকে ফেলে চলে আসবি। I know man. আমি জানি তুই রাত্রিকে কতটুকু…

আদী বাঁধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল,

—ছাড় এসব। ওই মেয়ের লা””শ পেলি?

সাজ্জাদ ঠোঁট টিপে মাথা নেড়ে বলল,

—হ্যাঁ, ঢাকা মেডিক্যালে পাওয়া গেছে। স্বর্ণালির মতোই ওর অবস্থা।
(চলবে)