এক খণ্ড কালো মেঘ পর্ব-৫০+৫১

0
429

#এক_খণ্ড_কালো_মেঘ
#পর্ব_৫০
#নিশাত_জাহান_নিশি

হুট করে কেন যেন রাফায়াতের গলা শুকিয়ে এলো! চোখের কোণে অবাধ্য জলেরা চিকচিক করে উঠল। আচমকাই সে আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠল। অয়ন্তীর ভীতিকর মুখের দিকে তাকাতেই তার কষ্টের মাত্রাটা যেন অতিরিক্ত বেড়ে গেল!

রাফায়াতের চোখেমুখে এহেন অপ্রতুল বিষাদের ছাপ দেখে অয়ন্তীর ভয়ের মাত্রাটা যেন দ্বিগুন, তিনগুন, চারগুন বেড়ে গেল। চক্ষুভরা টইটম্বুর জল নিয়ে অয়ন্তী এক দৃষ্টিতে রাফায়াতের দিকে তাকালো। চোখের পলক পড়ার পূর্বেই সে তার ডান হাতটি দ্বারা রাফায়াতের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি যুক্ত গালে মলিন হাত ছুঁয়ালো। অবিন্যস্তভাবে গালটিতে দু-একবার চাপড় মেরে ভরাট গলায় শুধালো,,

“বলুন না? কোথায় যাবেন আপনি?”

তাৎক্ষণিক অয়ন্তীর মায়ায় ভরা অতুল বেদনাহত মুখশ্রী থেকে রাফায়াত তার সংকুচিত মুখখানি সরিয়ে নিলো। কেন যেন ফুঁপিয়ে কান্না আসছিল তার! এক প্রকার চিৎকার করে-ই কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। তবে এই মুহূর্তে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এতে অয়ন্তীর ভয়ের মাত্রাটা আরও পেয়ে বসবে। তাই পরিস্থিতি বিগড়ে না দিয়ে বরং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তোলাটাই শ্রেয়। অকাতরে গড়িয়ে পড়তে থাকা চোখের অশ্রুবিন্দু গুলোকে লুকিয়ে দু’হাতের উল্টো পিঠ দ্বারা মুছে নিলো রাফায়াত। জোরপূর্বক হেসে ব্যাকুল অয়ন্তীর দিকে তাকালো। দু’হাতে অয়ন্তীর গাল দুটো চেপে ধরে কপালে কপাল ঠেকাল। মিহি হেসে বলল,,

“কোথায় যাব আমি হ্যাঁ? তোমাকে ছেড়ে? এই দু জাহানে আমার মা-বাবার পর তুমি ছাড়া আর কেই বা আছে? আমি তো জাস্ট কথার কথা বলছিলাম অয়ন্তী। মানুষ তো আর আজীবন বেঁচে থাকার জন্য পৃথিবীতে আসেনা। মৃ’ত্যু অনিবার্য। হয়ত কেউ আগে ম’রে, নয়ত কেউ পরে। একদিন না একদিন ম’র’তে তো হয়-ই৷ তাই বলছিলাম, যদি কখনও এমন দিন আসে যে আমি আর এই পৃথিবীতে নেই তুমি কখনো আ’ত্ন’হ’ত্যার মত নি’কৃ’ষ্টতম পথটি বেছে নিবেনা। জানোই তো, ‘আ’ত্ন’হ’ত্যা মহাপাপ। ইহকালের সুখ শান্তি থেকে তুমি যেমন বঞ্চিত হবে তেমনি পরকালের সুখ শান্তি থেকেও। সব পাপের ক্ষমা হলেও এই পাপের কিন্তু ক্ষমা হবেনা অয়ন্তী। আর আমি কখনও চাইব না আমার অয়ন্তী জা’হা’ন্নামে নিক্ষিপ্ত হোক। আমি চাইব আমার অয়ন্তী যেন সবর করে। আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা রাখে। ইহকালে যেমন আমরা একসাথে ছিলাম, আছি হয়ত ভবিষ্যতে ও থাকব। ঠিক তেমনি যেন পরকালেও আমরা একসাথে একে অপরের পরিপূরক হয়ে থাকতে পারি।”

অয়ন্তীর ভয় যেন কিছুতেই কাটছিলনা। কান্নার ঢেউ বেগতিক বাড়তেই লাগল। উদ্বিগ্নমনা হয়ে সে অধীর গলায় রাফায়াতকে বলল,,

“এসব কথা এখন কেন আসছে রাদিফ? কেন আপনি হঠাৎ আমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন? প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে আমার রাদিফ। এসব কেন বলছেন বলুন তো?”

“আই ডোন্ট নো অয়ন্তী। আমি কেন এখন এসব বলছি! তবে যা বলছি মন থেকে বলছি। আমি থাকি বা না থাকি তুমি কখনো আমার কথার বিরুদ্ধে যাবেনা। যদি যাও তবে আমি ম’রেও শান্তি পাবনা অয়ন্তী! ভেবে নিব আমাদের ভালোবাসা মিথ্যে ছিল। তুমি কখনো আমাকে মন থেকে ভালোবাসো নি!”

“ধ্যাত। আপনার সাথে আর কথাই বলব না আমি। সবসময় অকারণে আমাকে কাঁদান, কষ্ট দেন। গর্দবের মত আবোল তাবোল বকেন। আপনি খুব খা’রা’প রাদিফ। খুব খা’রা’প।”

রাফায়াতকে ছেড়ে অয়ন্তী কাঁদতে কাঁদতে বসা থেকে উঠার পূর্বেই রাফায়াত অয়ন্তীর ডান হাতটি পেছন থেকে টেনে ধরল। দুঃখ ভুলে সে আচমকা ব্যগ্র হাসল! অতিশয় ডানপিটে গলায় বলল,,

“ইশশশ! কাল কি-না আমাদের ফার্স্ট নাইট আর আজ কি-না উনি আমার সাথে কথা-ই বলবে না বলছে। খা’রা’পির তো এখনো কিছুই দেখোনি জানেমান। কাল রাতে দেখবে! হাড়ে হাড়ে টের পাবে তোমার রাদিফ কতটা খারাপ!”

লজ্জায় গাঁ কাটা দিয়ে উঠল অয়ন্তীর।রাফায়াতের এহেন ঠোঁট কাটা কথাগুলো অয়ন্তীকে মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত লজ্জার মধ্যে ফেলে দেয়। জবান বন্ধ হয়ে আসে তখন তার। শিরদাঁড়া বেয়ে উষ্ণ ঘাম ঝড়তে থাকে। বুকের ধুকপুকুনি বন্ধ করতে হলেও তখন পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তার। লোকটা যেন সবসময় প্রস্তুত হয়ে থাকে তাকে লজ্জা দেওয়ার জন্য। সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নুইয়ে নিলো অয়ন্তী। চোখের জল মুছে হযবরল গলায় বলল,,

“ধ্যাত। বিয়ে-ই করবনা আপনাকে!”

“ওহ্ আচ্ছা। তাই?”

“হ্যাঁ তাই।”

“আরেকবার বলো?”

“দেখি হাতটা ছাড়ুন। শাড়ি পাল্টাতে হবে।”

“বলে যাও এরপর ছাড়ছি।”

“কী বলব?”

“ঐ যে বিয়ে করবেনা আমায়।”

“সত্যিই তো করব না!”

নিমিষের মধ্যেই অয়ন্তীর হাওয়া ফুস হয়ে গেল! অয়ন্তীকে ঘুরিয়ে নিয়ে রাফায়াত সরাসরি তার কোলে বসিয়ে দিলো। রাগে অতি রঞ্জিত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সে হঠাৎের মধ্যেই অয়ন্তীর গলায় গভীর এক কা’ম’ড় বসিয়ে দিলো! টনটনে ব্য’থা’য় অয়ন্তী আহ্ করে উঠতেই রাফায়াত গরম চোখে অয়ন্তীর দিকে তাকালো। চোয়াল শক্ত করে বলল,,

“আর বলবা কখনো আমাকে বিয়া করবা না? এই নিয়ে অনেকবার কথাটা বলেছ। মাথা গরম হয়ে যায় আমার এই কথাটা শুনলে। বুঝতে পারো না তুমি?”

ব্য’থা’যুক্ত জায়গাটিতে হাত রেখে অয়ন্তী ন্যাকা কান্না করে বলল,,

“কু’ত্তা। দেখেশুনে জংলী কু’কুর’কে বিয়ে করছি আমি!”

“হ্যাঁ আমি কু’ত্তা’ই! আর একবার বলো বিয়ে করবা না?”

“পাগল নাকি? কে যেচে গিয়ে কু’কু’রের কা’ম”ড় খেতে যাবে?”

“দেট’স গ্রেট মাই সুইটহার্ট।”

বলেই রাফায়াত গলা থেকে অয়ন্তীর হাতটা সরিয়ে ব্য’থা’যুক্ত জায়গাটিতে দীর্ঘ এক চু’মু এঁকে দিলো। ভালোবাসায় সি’ক্ত হয়ে অয়ন্তীকে তার প্রশ্বস্ত বুকের মাঝে চেপে ধরল। অল্প সময় মৌণ থেকে অতি প্রেমমাখানো গলায় বলল,,

“কাল থেকে আমাদের জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হবে পরাণ। আ’ম সো এক্সাইটেড। আমাদের এতগুলো বছরের ভালোবাসা কাল পূর্ণতা পাবে। সবকিছু কেমন যেন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে।”

“এ্যাহ্। আমার কোন এক্সাইটমেন্ট নেই! কাল থেকেই আমার জীবনটা ন’র’ক হয়ে উঠবে! আপনার ট’র্চা’র সহ্য করতে হবে।”

“ইট’স লাভ ট’র্চা’র বেইবি। নট অনলি ট’র্চা’র!”

কদাচিৎ হেসে রাফায়াত অয়ন্তীর সমস্ত শরীরে শু’ড়’শু’ড়ি দিতে লাগল! খিলখিল করে হাসতে হাসতে অয়ন্তী মেঝেতে প্রায় লুটিয়ে পড়ছিল। আহাজারি করে বলছিল রাদিফ ছাড়ুন। নাছোড়বান্দা রাফায়াত কেবল মুগ্ধ হয়ে অয়ন্তীর হাসিমাখা মুখখানি দেখছিল। সমস্ত মুখমণ্ডল যেন অবিলম্বেই টগবগে লাল বর্ণ ধারণ করছিল অয়ন্তীর। দেখতে বড্ড নাদুসনুদুস দেখাচ্ছিল। চোখ দুটিতেও স্বচ্ছ পানিরা টলমল করছিল। হাসলে কত সুন্দরী, মায়াবী, অমায়িক দেখায় অয়ন্তীকে। মেয়েটা কেন এভাবে সবসময় হাসেনা? সামান্য দুঃখেই কেন এত কষ্ট পায়, এত বেশী কান্না করে? একটু আগেও তো কেমন যেন ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদছিল সে। বিশ্রী দেখাচ্ছিল তখন৷ আর এখন? কতটা সুশ্রী দেখাচ্ছে তাকে! চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মত সুশ্রী। সবশেষে রাফায়াত পেরেছে কান্না ভুলিয়ে অয়ন্তীর মুখে হাসি ফুটাতে। উদ্দেশ্য যেন সফল হলো তার!

_____________________________

পরের দিন সুষ্ঠুসম্মতভাবেই অয়ন্তী এবং রাফায়াতের বিয়েটা সম্পন্ন হলো! অনামিকার মৃ’ত্যু’তে পরিবারের বর্তমান বি’ক্ষি’প্ত অবস্থা দেখে অয়ন্তীর মন সায় দিচ্ছিলনা পার্লারে গিয়ে জাঁকজমকভাবে সেজেগুজে আসতে! তবে ইতি অয়ন্তীকে পার্লারের মত করেই সুনিপুণভাবে বাড়িতে যতটা সম্ভব সাজিয়ে দিয়েছিল! সাজ দেখে বুঝাই যাচ্ছিল না এটা সাধারণ কোনো সাজ। অয়ন্তীর বিয়েতে এসে ইতি তার সমস্ত অতীত ভুলে গিয়েছিল! রাফায়াত এবং অয়ন্তীর সাথে অতি স্বাভাবিকভাবেই মিশেছিল। এমনকি ফারহানও অয়ন্তী এবং রাফায়াতের বিয়েটা মন থেকে মনে নিয়েছিল। অয়ন্তী তার ভাগ্যে ছিলনা বলে বিষয়টা খুব সহজেই মেনে নিলো! এসবের মাঝেও অয়ন্তী এবং রাফায়াত কখনই চায়নি তাদের বিয়েটা এমন সাদামাটাভাবে হোক! তবে সমসাময়িক পরিস্থিতির চাপে পড়ে এমন রসকষহীনভাবেই তাদের বিয়েটা করতে হলো।

কনের সাজেই অয়ন্তীকে বাসর ঘরে বসানো হলো। রাফায়াতের ভাবি, আলিজা এবং রাফায়াতের নিকটস্থ আত্মীয়স্বজনরা অয়ন্তীর সাথে নানা ধরনের ঠাট্টা মশকরা করতে লাগল৷ প্রথম প্রথম লজ্জায় অয়ন্তী কুঁকিয়ে উঠলেও পরক্ষণে আবার তাদের সাথে হাসি ঠাট্টায় মেতে যেত। বাবা-মায়ের কথা তেমন মনে পড়ছেনা তার! কারণ, সে যখন ইচ্ছা তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে পারবে৷ প্রয়োজনে সারাক্ষণ তার বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে থাকতেও পারবে। মুখোমুখি তাদের বাসা৷ তাই খারাপ লাগার কোনো অবকাশ-ই নেই।

চঞ্চল অনেক চেয়েও রাফায়াত এবং অয়ন্তীর বিয়েতে আসতে পারেনি! মোদ্দা কথা চঞ্চল চায়নি রাফায়াতের বিয়েতে এসে নতুন করে কোনো ঝামেলা বা অশান্তি করতে! মির্জা ফখরুল হকের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি আছে রাফায়াতের বিয়েতে চঞ্চলের এটেন্ড করাটা! যা রাফায়াত খুব ভালো ভাবেই জানে। তাই সে চঞ্চলকে তেমন জোর করেনি তার বিয়েতে আসার জন্য। তবে ভিডিও কলে চঞ্চল প্রথম থেকে শেষ অবধি রাফায়াতের বিয়ে দেখেছে। কিছুক্ষণ হায় হুতাশ করেছে তো কিছুক্ষণ রাফায়াতকে পঁচিয়েছে!

রাত তখন এগারোটার কাছাকাছি প্রায়। রাফায়াত তার মায়ের মুখোমুখি চুপটি করে বসে আছে। চোখে ভাসা ভাসা জল মিসেস শায়লা বেগমের! মনে তীব্র ভয় নিয়ে তিনি রাফায়াতের হাতটি টেনে ধরলেন। ভরাট গলায় শুধালেন,,

“একটা প্রশ্ন করি বাবা?”

মৃদু হেসে রাফায়াত তার মায়ের হাতটিতে চুমু খেল। নরম স্বরে বলল,,

“করো মা।”

“অয়ন্তীকে পেয়ে আমাকে ভুলে যাবি না তো বাবা?”

“এসব তুমি কী বলছ মা? তোমাকে ভুলে যাব কেন?”

“ভয় হয় বাবা। অয়ন্তীকে তুই এত ভালোবাসিস! মাঝে মাঝে মনে হয় আমার থেকেও হয়ত বেশী ভালোবাসিস!”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাফায়াত। তার মায়ের দিকে সরল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। শান্ত এবং স্বাভাবিক স্বরে বলল,,

“তোমার পরে যদি কাউকে ভালোবাসতে হয় সেটা অয়ন্তী মা। যদি অনেস্টলি বলি, তবে বলব তোমাদের দুজনকেই আমি সমানভাবে ভালোবাসি মা। কাউকেই কম বেশী না। তোমরা দুজনই হলে আমার জীবনে অপরিহার্য। তুমি ছাড়া যেমন আমার জগৎ অন্ধকার, তেমনি অয়ন্তীকে ছাড়াও মা। দিনশেষে তোমরা দুজনই আমার স্বস্তির জায়গা। যাদের চোখের দিকে তাকালে সব কষ্ট ভুলে যায়। তুমি যেমন মৃ’ত্যু’স’ম যন্ত্রণা সহ্য করে আমাকে জন্ম দিয়ে পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছ মা, তেমনি অয়ন্তীও আমার জীবনে এসে আমার অন্ধকার জীবনটাকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে। তাই তোমরা দুজনই আমার কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া এসব উদ্ভট প্রশ্ন তোমার মাথায় আসল কীভাবে মা?”

ছেলের কথায় খুশি হয়ে মিসেস শায়লা বেগম চোখ থেকে আনন্দ অশ্রু ছেড়ে দিলেন। আদুরে হয়ে তিনি ছেলের কপালে চু’মু খেয়ে দিলেন। আবেগঘন গলায় বললেন,,

“যা বাপ। ঘরে যা। অয়ন্তী তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”

রাফায়াতও ভীষণ আবেগ আপ্লুত হয়ে মিসেস শায়লা বেগমের কপালে চু’মু খেয়ে বলল,,

“ঘুমিয়ে পড়ো মা। অনেক রাত হয়েছে।”

“ঠিক আছে বাপ। তুই যা।”

মিসেস শায়লা বেগমের থেকে বিদায় নিয়ে রাফায়াত তার বাসর ঘরের দিকে রওনা হলো। অমনি চতূ্র্দিক থেকে তার ভাবি মহল তাকে ঘিরে ধরল! দাবী তাদের একটাই। এক্ষণি তাদের হাতে পাঁচ হাজার টাকা ধরিয়ে না দিলে আজ আর তার বাসর ঘরে ঢুকা হবেনা! অনেক তর্ক বিতর্ক করেও রাফায়াত তাদের হাত থেকে মুক্তি পেল না! বাঞ্চাল আরিফ এবং তার বড়ো ভাইয়ের কথামত পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা খসাতেই হলো! টাকা পেয়ে রাফায়াতের ভাবিরা অবশেষে রাফায়াতকে ছাড়ল। সবশেষে রাফায়াত বাসর ঘরে ঢুকার অনুমতি পেল।

রুমে ঢুকেই রাফায়াত প্রথমে রুমের দরজাটি ভালোভাবে ভেতর থেকে লক করে দিলো। অমনি তাজা ফুলের সুমিষ্ট সুবাসে ব্যাকুল হয়ে উঠল রাফায়াতের হৃদয় ও মন। সারা ঘরময় আজ বাহারী ফুলে সেজেছে। সেই ফুলগুলোর রানী হয়ে যেন অয়ন্তী তার বিছানায় রাজ করছে! সেদিকে এক্ষুণি নজর দিলো না রাফায়াত। বড়ো ঘোমটা টেনে বসে থাকা অয়ন্তীর দিকে না তাকিয়েই সে পুরো রুমে সর্তক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল! দেয়ালের প্রতিটি আনাচ কানাচ থেকে শুরু করে এমনকি রুমে থাকা প্রতিটি আসবাবপত্র ও ঘেটে দেখল। খাটের তলা অবধিও সে উবুড় হয়ে দেখল! ঘোমটার তলা থেকে অয়ন্তী অস্পষ্টভাবে সব দেখছিল। ব্যাপারটায় সে ভীষণ বিরক্তবোধ করল! এতটা সময় ধরে ঘোমটার তলায় থাকা যায় না-কি? ঝট করে মাথা থেকে ঘোমটাটি খুলে অয়ন্তী অস্থির রাফায়াতের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। বিক্ষুব্ধ হয়ে ঝাঁজালো গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,,

“এই? চোখ দুটো গেল না-কি আপনার? আমি এখানে। খাটের তলায় আপনি কী খুঁজছেন হুম?”

“আরে চেক করছি!”

“কী চেক করছেন?”

“আরিফ কোনো কলকাঠি নাড়ল কি-না!”

“মানে?”

“ফোনে শুনছিলাম আরিফ চঞ্চলের সাথে বলছিল আমাদের বাসর ঘরে না-কি সিসি ক্যামেরা লাগাবে! তাই একটু চেক করছিলাম।”

“এ্যাহ্! কী বলছেন এসব?”

“তবে এখন মনে হচ্ছে আমাকে বোকা বানানো হয়েছে। কই কোথাও তো কিছু দেখছিনা।”

বলেই রাফায়াত হাত দুটো ঝেড়ে উদগ্রীব চিত্তে বসে থাকা অয়ন্তীর দিকে তাকালো। অমনি বাঁকা হেসে সে এগিয়ে এলো অয়ন্তীর দিকে। হুট করেই অয়ন্তীর মুখোমুখি বসে সে বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা গোপালের পাপড়িগুলোকে মুঠোবন্দি করে নিলো। পাপড়িগুলো অয়ন্তীর সমস্ত মুখে ছিটিয়ে দিয়ে মারাত্মক সুন্দুরী রূপে বসে থাকা অয়ন্তীর দিকে নেশালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কেমন যেন রসালো গলায় বলল,,

“কী বেবি? তৈরী তো?”

বিরক্তবোধ করল অয়ন্তী। ভ্যাপসা গরমে হাস ফাঁস করে উঠল। খরখরে গলায় বলল,,

“আসেন দুইটা চ’ড় লাগাই। এতক্ষণ ধরে আমাকে ওয়েট করাচ্ছিলেন কেন হ্যাঁ? দেখছেন না ভারি শাড়ি পড়েছি? এত এত অরনামেন্টস পড়ে এতক্ষণ অবধি থাকা যায় না-কি?”

দুষ্টু ভাব নিলো রাফায়াত। ঠোঁট কামড়ে ধরে ন্যাকা স্বরে বলল,,

“অহ্, সরি বাবু। আসো আদর দিই!”

আর এক মুহূর্তও ব্যয় না করে অয়ন্তীকে চেপে ধরল রাফায়াত! ফ্রেশ হওয়ার একটুখানি সময়ও দিলোনা অয়ন্তীকে। অয়ন্তীর কোনো কথাই যেন সে কানে তুলছিলনা! নিমিষেই তার অপরিমেয় ভালোবাসায় রাঙিয়ে তুলল অয়ন্তীকে!

#চলবে…?

#এক_খণ্ড_কালো_মেঘ
#পর্ব_৫১
#নিশাত_জাহান_নিশি

আর এক মুহূর্তও ব্যয় না করে অয়ন্তীকে চেপে ধরল রাফায়াত! ফ্রেশ হওয়ার একটুখানি সময়ও দিলোনা অয়ন্তীকে। অয়ন্তীর কোনো কথাই যেন সে কানে তুলছিলনা! নিমিষেই তার অপরিমেয় ভালোবাসায় রাঙিয়ে তুলল অয়ন্তীকে!

ফুলসজ্জার রাত পেরিয়ে অয়ন্তী এবং রাফায়াতের জীবনে নেমে এলো স্নিগ্ধ, সুন্দর এবং প্রশান্তিময় একটি নতুন সকাল। পবিত্র ভালোবাসায় দুজনই পূর্ণ আজ। শরীর-মন দুটিই যেন তৃপ্ত। কত শত অপেক্ষা-দূরত্ব-দুঃখ-কষ্ট ভোগ করার পর নতুন এই সুখকর জীবনটিতে পদার্পণ তাদের। নতুন জীবনের শুভ সূচনাটি অয়ন্তীর ফজরের নামাযের মাধ্যমেই শুরু হলো! শুধু সে নয়। রাফায়াতকেও জোর করে ধরে বেঁধে কাঁচা ঘুম থেকে টেনে উঠালো অয়ন্তী। অতঃপর দুজনই একসাথে ফরজ গোসল শেষ করে একই সাথে নামাজে দাঁড়ালো! পণ করে নিলো আজ থেকে তারা দুজনই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে। নামায নিয়ে আর কোনো হেলাফেলা চলবেনা। আল্লাহ’র প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা নিতান্তই আবশ্যক তাদের। উপর ওয়ালা চেয়েছে বিধায় এত ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে তারা অবশেষে এক হতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে তারা কোনোভাবেই আল্লাহ’র মনে কষ্ট দিতে চায়না।

নামাজ শেষ হতেই রাফায়াত কোনোমতে বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিলো। মনে হচ্ছে যেন অয়ন্তীর থেকেও বেশী ক্লান্ত সে! শরীর একদমই নাড়াতে পারছেনা যেন! হেলেদুলে বেসামাল হয়ে পড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অয়ন্তী কিছুক্ষণ তসবিহ্ পড়ে পরিশেষে আল্লাহ’র সান্নিধ্যে বড়ো একটি মোনাজাত ধরল। পুরো মোনাজাত জুড়ে অয়ন্তী চুপিসারে কেঁদে গেল! তার বোনের জন্য দো’য়া চাইল। তার গোটা পরিবারের জন্য দো’য়া চাইল৷ বাপের বাড়ি থেকে শুরু করে শ্বশুড় বাড়ি এক এক করে সবার জন্য। রাফায়াতের শরীর স্বাস্থ্য যেন আল্লাহ্ সবসময় ভালো রাখেন, তাকে যেন আল্লাহ্ নেক হায়াত দান করেন, জীবনের সর্বক্ষেত্রে যেন সফলকাম হতে সাহায্য করেন, ভালো স্বামী এবং ভালো ছেলে হওয়ার তৌফিক দান করেন এসব চাইতে চাইতে-ই কখন যে তার নিঃশব্দ কান্নার মাত্রা বেড়ে হেঁচকি ওঠে গেল তা বুঝতেও পারলনা অয়ন্তী! অমনি রাফায়াত ঘুম থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠল। ঘুমে আচ্ছন্ন চোখ দুটো তার আ’ত’ঙ্কে জর্জরিত হয়ে উঠল। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে সে জায়নামাজে অয়ন্তীর ঠিক পাশাপাশি হয়ে বসল। অপেক্ষা করতে লাগল কখন অয়ন্তীর মোনাজাত শেষ হবে। আর কখন সে অয়ন্তীর কান্নার কারণ জানতে চাইবে। মিনিট পাঁচেক অতিক্রম হতেই অয়ন্তীর মোনাজাত শেষ হলো। অমনি রাফায়াত ব্যাকুল হয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল অয়ন্তীকে। শুকনো ঢোঁক গিলে ভরাট গলায় বলল,,

“কী হইছে তোমার? এভাবে কাঁদছিলে কেন?”

কান্না জড়িত বিবর্ণ মুখেও অয়ন্তী ফিচেল হাসল। রাফায়াতকে দু’হাত দ্বারা আঁকড়ে ধরল। কোমল স্বরে বলল,,

“অতি সুখে কাঁদছিলাম রাদিফ! না চাইতেও আল্লাহ্ আমাকে এত সুখ দিলেন। বিগত ছয় সাত মাস আগেও আমি ভাবিনি যাকে আমি প্রতিনিয়ত স্বপ্নে চাইতাম সে এভাবে স্বপ্ন ভেঙে আমার বাস্তবে চলে আসবে! তার ভালোবাসায় আমাকে এতটা সিক্ত করে তুলবে। পবিত্র বন্ধনে আমাকে আবদ্ধ করে নিবে। পৃথিবীর সব সুখ আমার ভাগ্যে তুলে দিবে। এভাবে আমাকে ষোল আনায় পরিপূর্ণ করে তুলবে। এত সুখ একসাথে আমার সহ্য হচ্ছিলনা রাদিফ। তাই না চাইতেও আল্লাহ্’র কাছে হাত তুলতেই চোখে জল চলে এলো!”

রুদ্ধশ্বাস ফেলল রাফায়াত। চিন্তিত স্বরে বলল,,

“ইশশশশ। এদিকে আমি ভয় পাচ্ছিলাম কী হলো তোমার। বুকটা এখনো কাঁপছে আমার। কান পেতে দেখো।”

অমনি রাফায়াতের বুকের ঠিক বাঁ পাশটিতে অয়ন্তী তার কান ঠেকাল। সত্যিই হৃদস্পন্দন কাঁপছে তার। দ্রুত বেগে কাঁপছে। ধড়ফড় ধড়ফড় করেই চলছে। কান দুটো যেন তার ঝালাফালা হয়ে যাচ্ছে। মিটিমিটি হাসল অয়ন্তী। মিচকে স্বরে বলল,,

“আমাকে ছুঁয়ে আছেন বলেই বুকটা ওভাবে কাঁপছে। হার্টবিট বেড়ে গেছে। থোরাই না আপনি আমাকে নিয়ে ভয় পান! আল্লাহ্ না করুক আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায় নাচতে নাচতে তো তখন দ্বিতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসে যাবেন!”

তাৎক্ষণিক অয়ন্তীকে ছেড়ে বসা থেকে ওঠে দাঁড়ালো রাফায়াত। অয়ন্তীর মুখের দিকে আর একটিবারের জন্যও তাকালো না সে। রাগে মুখটা যেন লাভার রূপ ধারণ করল! পরিপূর্ণ বি’ধ্ব’স্ত দেখাচ্ছে তাকে। মাথার চুলগুলো অতি জোরালো ভাবে টেনে ধরে সে খাটের কার্ণিশে জোরে এক লা’থ মারল! রাগে-জেদে গোঙাতে গোঙাতে সে এই সাত সকালে হনহনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল! ভয় পেয়ে গেল অয়ন্তী। ভাবতে পারেনি তার কথায় রাফায়াত এতটা রিয়েক্ট করবে! কী অশান্তি লাগালো সে বিয়ের পরের দিনই!

অয়ন্তী বুঝতে পেরে গেল পেছন থেকে রাফায়াতকে ডেকে কোনোভাবেই তাকে আটকানো যাবেনা। বরং তার চ্যাঁচামেচিতে বাড়ির সবাই ওঠে যাবে। তাই তড়িঘড়ি করে অয়ন্তী জায়নামাজ থেকে ওঠে দাঁড়ালো। হন্ন হয়ে দৌঁড়ে রাফায়াতের পিছু নিলো। পেছন থেকে রাফায়াতকে ধাওয়া করতেই হঠাৎ শাড়ির কুঁচি প্যাঁচিয়ে অয়ন্তী ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল! সঙ্গে সঙ্গেই অয়ন্তী ব্য’থা’য় মৃদু স্বরে চিৎকার করে উঠল। হাঁটা থামিয়ে দিলো রাফায়াত। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে সে পিছু ফিরে তাকালো। অয়ন্তীকে ঐ অবস্থায় দেখামাত্রই রাফায়াতের রাগ হাওয়ায় উড়ে গেল। মরিয়া হয়ে দৌঁড়ে এলো সে অয়ন্তীর দিকে। কোমড়ে ব্য’থা পাওয়া অয়ন্তীকে সে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলো। অমনি চোখের জল ফেলতে থাকা অয়ন্তীর দিকে সে ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। অধীর গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,,

“ব্য’থা লেগেছে বেশী?”

ব্য’থায় চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেলল অয়ন্তী। প্রত্যত্তুরে আহাজারি গলায় বলল,,

“আমি সোজা হতে পারছিনা রাদিফ।”

“তো কে বলেছিল পাকামো করে আমার পিছু নেওয়ার?”

“আপনিই তো রাগ করে চলে যাচ্ছিলেন।”

“তোমার কারণে রাগ করেছি। তোমার জন্যে রাগ করেছি। যে কথাগুলো আমি শুনতে চাইনা জানি না কেন তুমি সেই কথাগুলোই আমাকে বেশী বেশী করে বলো। মাথা গরম করে দাও আমার।”

“হইছে তো। এর শা’স্তি তো আমি পেয়ে-ই গেছি! বিয়ের পরের দিনই কোমড় ভেঙেছি!”

“ভাঙেনি কোমড়। স্প্রে করে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

অয়ন্তীকে কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় উবুড় করে শুইয়ে দিলো রাফায়াত। গাঁ থেকে প্যাঁচানো শাড়িটা একটানে খুলে ফেলল। তড়িঘড়ি করে ডেস্কের ড্রয়ার থেকে কোমড়ের ব্য’থা সারানোর স্প্রেটি বের করে বিছানায় কা’ত’রা’তে থাকা অয়ন্তীর পাশে এসে বসল। ব্য’থা’যুক্ত জায়গাটিতে সে ভীরু হাতে কয়েকবার স্প্রে করে দিলো। অতঃপর হালকা করে জায়গাটিতে মালিশ করে দিলো। অয়ন্তী তো রাফায়াতকে ঐ জায়গাটিতে হাত-ই ছোঁয়াতে দিচ্ছিল না! ব্য’থা’য় আ’র্ত’নাদ করে প্রতিবার রাফায়াতের হাতটি সরিয়ে দিচ্ছিল। নাছোড়বান্দা রাফায়াতও কিছুতেই হাল ছাড়ছিল না। জায়গাটি ভালোভাবে মালিশ করে পরেই সে অয়ন্তীকে ছাড়ল! পনেরো থেকে বিশ মিনিট অয়ন্তীকে চুপ করে শুয়ে থাকতে বলল। অতঃপর আস্তে ধীরে ব্য’থাটা কমেও গেল।

ব্য’থা হ্রাস পেতেই অয়ন্তী গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। রাফায়াত বুঝতে পারল অয়ন্তী এখন ঠিক আছে। সুস্থ্য আছে। অয়ন্তীর ঘুমন্ত মুখটির দিকে একটু ঝুঁকল রাফায়াত। তার উষ্ণ ঠোঁটজোড়া অয়ন্তীর কপালে ছুঁয়ে দিলো! চোখের শুকনো জলগুলোকে মুছে দিয়ে অয়ন্তীর পাশে শুয়ে পড়ল। কয়েকদফা প্রশান্তির শ্বাস ফেলে সে ঘুমন্ত অয়ন্তীকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল! ভোর হয়ে আসতেই দুজন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

পরের দিন বড়ো করে বৌভাতের অনুষ্ঠান করা হলো। বিয়েটা সাদামাটাভাবে সম্পন্ন হলেও বৌভাতটা হেলায় ফেলায় নষ্ট করলনা রাফায়াত। এলাকার সর্বস্তরের মানুষদের দাওয়াত করছিল সে তার বৌভাতে। এমনকি তাদের দূরবর্তী সমস্ত আত্নীয়স্বজনদেরও বৌভাতের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেছিল। সবাই দলে দলে এসে রাফায়াত এবং অয়ন্তীর বৌভাতে এটেন্ড করে গেছে। এলাকার মানুষজনও এখন রাফায়াতকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। রাফায়াতের গোটা পরিবারের সাথে একাত্মভাবে মিশতে শুরু করেছে। তাদের সুশীল এবং আন্তরিক আচার-আচরণের জন্য সবাই তাদের অনেকটা কম সময়ের মধ্যেই আপন করে নিয়েছে। অয়ন্তীর বাবাও এখন সন্তুষ্ট রাফায়াতের প্রতি! রাফায়াতের নম্র এবং সহনশীল আচরণে তিনি দিন দিন মুগ্ধ হচ্ছেন। রাফায়াতকে এখন মেয়ে জামাই হিসেবে পরিচয় দিতেও উনার কোনো দ্বিধাবোধ নেই!

বৌভাতের দিন রাতেই অয়ন্তী এবং রাফায়াতের মধ্যে তুখোড় ঝগড়া বেঁধে গেল! মূলত হানিমুনে যাওয়া নিয়েই তাদের ঝগড়া শুরু! অয়ন্তী বলছে হানিমুনে সাজেক যাবে আর অন্যদিকে রাফায়াত বলছে কক্সবাজার থেকে দুই-এক দিনের মধ্যেই ঘুরে টুরে চলে আসবে! কারণ, আগামী তিন দিনের মধ্যেই তার অফিসে জয়েন করতে হবে। নতুন চাকরী তাই বেশী ছুটি নেওয়া যাবেনা। এত কষ্টে অর্জিত চাকরী, তাই সে কোনো প্রকার ঝুঁকি নিতে চাইছেনা। কিন্তু অয়ন্তী তা মানতে নারাজ। সে জেদ ধরে বসে আছে সাজেক যাবে বলেছে মানে সে সাজেক-ই যাবে! রাফায়াতের কোনো কথাই শুনবেনা সে। প্রয়োজনে হানিমুন ক্যান্সেল করে দিবে! তবুও সাজেকের জায়গায় অন্য কোথাও যাবেনা। এই বারের সুযোগটিকে কাজে লাগাতে না পারলে অয়ন্তীর আর এই ইহজন্মে সাজেক যাওয়া হবেনা! অফিস খুইয়ে পরের বার রাফায়াত তাকে নিয়ে সাজেক যাবে বলেও কোনো নিশ্চয়তা নেই! কাজের প্রতি রাফায়াতের সিনিসিয়ারিটি দেখে সমস্ত আশা তার খুইয়ে গেছে! তাই এইবারের ছুটিটিকেই তার কাজে লাগাতে হবে।

জেদ ধরে রাতে না খেয়েদেয়েই অয়ন্তী শুয়ে পড়ল। এখন তারা দুজনই অয়ন্তীর বাপের বাড়িতে আছে। সন্ধ্যার দিকে রাফায়াত একটু বাইরে বের হয়েছিল। রাফায়াত তার বিয়েতে অয়ন্তীকে পার্সোনালি কিছু দিতে পারেনি। তাই সারপ্রাইজ গিফট হিসেবে অয়ন্তীর জন্য সে ডায়মন্ডের একটি নাকফুল কিনে আনল শপিংমল থেকে! চাকরীর প্রথম অবস্থায় উপার্জন কম তার। তাই এরচেয়ে দামী কিছু গিফট হিসেবে অয়ন্তীকে আপাতত গিফট করতে পারল না সে। তবে পরবর্তীতে তার বেতন যখন বাড়বে তখন অয়ন্তীকে অনেক কিছুই গিফট করার আশা আছে তার!

রাত তখন পৌনে এগারোটার কাছাকাছি প্রায়। আরিফের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা সাড্ডা মেরে রাফায়াত বাড়ি ফিরে এলো। তার পকেটে রয়ে গেল অয়ন্তীর জন্য আনা ডায়মন্ডের ছোট্টো নাকফুলটি। রুমে প্রবেশ করে রাফায়াত প্রথমে বুঝতেই পারেনি অয়ন্তী তার সাথে রাগ করে ঘুমিয়ে পড়েছে! ভেবেছে শরীর ক্লান্ত। তাই হয়ত খেয়েদেয়ে এত দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছে। দোটানায় পড়ে গেল রাফায়াত। অয়ন্তীকে ঘুম থেকে জাগাবে কী জাগাবেনা! জাগালে যদি অয়ন্তী আবার বিরক্তবোধ করে? কিংবা রেগে যায়? এই করতে করতে তার চোখ পড়ল অয়ন্তীর পড়ার টেবিলের দিকে। রাতের খাবার সাজানো আছে বড়ো একটি প্লেটে। বুঝতে বেশী বেগ পেতে হলোনা খাবারটা তার জন্যই রাখা। এছাড়াও বাড়িতে প্রবেশের সময় তার শ্বাশুড়ী মা বলেছিল রুমে তার জন্য খাবার পাঠানো হয়েছে। ভালো করে খেয়েদেয়ে এরপর ঘুমাতে। যদিও রাফায়াত পাল্টা জিজ্ঞেস করেছিল অয়ন্তী খেয়েছে কি-না? তখন তার শ্বাশুড়ী মায়ের স্পষ্ট জবাব ছিল, হ্যাঁ খেয়েছে! কারণ অয়ন্তী নিজেই তার মাকে মিথ্যে বলেছিল! তার মা ও সেই মিথ্যে কথাটিই বিশ্বাস করে নিয়েছিল।

খাবারটা না খেয়েই রাফায়াত ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে অয়ন্তীর পাশে চুপটি করে শুয়ে পড়ল। নিষ্পলক দৃষ্টিতে অয়ন্তীকে দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে সেও ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝরাতের দিকে তার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল! তার অবশ্য একটা কারণও আছে। আর সেই কারণটি হলো অয়ন্তী! ঘুমালেও কান খাঁড়া থাকে রাফায়াতের! ঘুমের মধ্যেই সে অয়ন্তীর ফ্যাচ ফ্যাচ কান্নার আওয়াজ শুনছিল। তাই তড়িঘড়ি করে সে ঘুম ভেঙে উঠল। অমনি সে দেখতে পেল অয়ন্তী পাশ ফিরে পেটে হাত চেপে ধরে কাঁদছে। ভয় পেয়ে গেল রাফায়াত। হেঁচকা টানে সে ক্রন্দনরত অয়ন্তীকে তার দিকে ফিরিয়ে নিলো। উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে আ’হ’ত অয়ন্তীর দিকে তাকালো। কাঠ কাঠ গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,,

“কী হয়েছে?”

পেটের ক্ষুধায় মোচড়ে ওঠে অয়ন্তী ফুপিয়ে কেঁদে বলল,,

“আপনি একটা পা’ষা’ণ মানুষ!”

অস্থির হয়ে উঠল রাফায়াত। ক্ষুধার্ত অয়ন্তীর দিকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,,

“কী করেছি আমি? মানে ঘুমের মধ্যে তোমার পেটে আবার লা’থি টা’থি মে’রে বসিনি তো?”

“না।”

“তাহলে কী? কী হয়েছে বলো?”

“আমাকে রেখে একা একা খেয়ে ফেললেন?”

“কী খেলাম? কোথায় খেলাম? কী বলছ তুমি?”

“রাতের খাবার!”

“কেন? তুমি খাওনি?”

“কোথায় খেলাম?”

“তোমার মা তো বলেছিলেন তুমি খেয়েছ।”

“না খাইনি। আপনার সাথে রাগ করেই তো খাইনি।”

“মানে তুমি রাগ করেছিলে?”

“তো কী?”

“ওহ্ মাই গড! দেখি ওঠো ওঠো খেয়ে নাও।”

“না খাবনা! ভেবেছিলাম আপনি এসে জোর করে খাওয়াবেন। রাগ ভাঙাবেন আমার। কাজের কাজ তো কিছুই হলোনা। উল্টো আপনি নিজেই খেয়ে বসে আছেন।”

“আরেহ্ বাপ! আমি খাইনি। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমি কী জানতাম? আমার স্টু’পি’ট বৌ টা সামান্য বিষয় নিয়ে রাগ থেকে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে?”

“ওহ্! আমি স্টু’পি’ট? পুরান হয়ে গেছি না?”

“হ্যাঁ শুরু হইছে! কথা এত প্যাঁচাও কেন হ্যাঁ?”

“এখন তো আমার সব কথাই প্যাঁচানো মনে হবে। কারণ এখন তো আমি….

অয়ন্তীকে থামিয়ে দিলো রাফায়াত। শরীরের শক্তি ছেড়ে দিয়ে অয়ন্তীকে ব্যঙ্গ করে বলল,,

“হ্যাঁ পুরাতন হয়ে গেছ!”

বলেই অয়ন্তীকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো রাফায়াত। বিছানার উপর তাকে সোজা করে বসিয়ে দিলো। গ্লাসভর্তি পানি এনে অয়ন্তীর মুখের কাছে ধরল। ভাবশূণ্য গলায় বলল,,

“নাও। কুলি করো।”

“রাখুন। ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

হুড়মুড়িয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল অয়ন্তী। টেবিলের উপর থেকে খাবারের প্লেটটি হাতে নিয়ে রাফায়াত ভাত মাখাতে লাগল। মিনিট কয়েকের মধ্যে অয়ন্তী রুমে প্রবেশ করতেই রাফায়াত অয়ন্তীর মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসল। ব্যস্ত হয়ে রাফায়াত প্রথম লোকমাটি ক্ষুধার্ত অয়ন্তীর মুখের কাছে ধরতেই অয়ন্তী অভিমানে মুখটা অন্য পাশে ফিরিয়ে নিলো! নাটকীয় স্বরে বলল,,

“খাব না!”

“মানে? কেন?”

“আগে আমার শর্ত মানতে হবে।”

“কী শর্ত আবার?”

“আমরা কাল সাজেক যাচ্ছি!”

“বললাম তো কক্সবাজার!”

“আমি যাবনা কক্সবাজার।”

“আচ্ছা যাও। তাহলে হানিমুন ট্যুর ক্যান্সেল।”

“যাহ্। খাবারই খাবনা আমি! না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ব। তারপর ঘুমের মধ্যেই ম’রে থাকব। ভালো হবে এরপর। বৌ হারা হবেন!”

মাথার সেন্টিমিটার যদিও রাফায়াতের অত্যধিক গরম তবুও সে এই মুহূর্তে যথেষ্ট শান্ত থাকার চেষ্টা করল। ছিঁচকেঁদে অয়ন্তী বিছানার দিকে মোড় নিতেই রাফায়াত খপ করে অয়ন্তীর বাঁ হাতটি টেনে ধরল। বাধ্য গলায় বলল,,

“আচ্ছা যাও। সাজেক-ই যাব। তবুও না খেয়ে ঘুমুবেনা!”

খুশি হয়ে গেল অয়ন্তী! কারণ তার উদ্দেশ্য সফল। রাফায়াতের জেদকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে পেরেছে সে। অতিশয় মুচকি হেসে অয়ন্তী বাধ্য রাফায়াতের দিকে নির্ভেজাল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আনন্দঘন হয়ে সে মুহূর্তেই রাফায়াতকে জড়িয়ে ধরল। রাফায়াতের ঘাড়ে অসংখ্য চু’মু খেয়ে বলল,,

“থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ সো মাচ বর। আমি জানতাম আপনি আমার কথা না রেখে থাকতে পারবেন না।”

“হইছে হইছে। ইমশোনাল ব্ল্যা’ক’মে’ইল!”

“থাক। বউ-ই তো! দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র বউ আপনার! কত আদুরে বলুন?”

“হুম। সেজন্যই তো মানতে বাধ্য হলাম।”

দেঁতো হেসে অয়ন্তী রাফায়াতকে ছাড়ল। এরপর দুজনই মিলেমিশে খাবারটা খেয়ে নিলো। খাওয়ার পর্ব শেষে রাফায়াত কিছুক্ষণ আরিফের সাথে কথা বলে সাজেক যাওয়ার বিষয়টি কনফার্ম করে নিলো। আরিফই সব ব্যবস্থা করল তাদের সাজেক যাওয়ার। ভোর ছয়টার মধ্যে-ই তাদের ঢাকা থেকে রওনা হতে হবে। খবরটা অয়ন্তীর কানে পৌঁছাতেই অয়ন্তী যেন পাগল প্রায় হয়ে গেল! ঘুম নিদ্রা ভুলে সে ব্যাগপত্র গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দূর থেকে দাঁড়িয়ে রাফায়াত মৃদু হেসে অয়ন্তীর পাগলামো দেখছিল! আজ কতটা খুশি অয়ন্তী। শুধুমাত্র তার কথামত তার পছন্দের জায়গায় যাওয়া হচ্ছে তাই। হুট করেই রাফায়াত খেয়াল করল তার চোখ দুটো কেমন যেন জলে ভিজে উঠছে! টপটপ করে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে! এত খুশির মধ্যে হঠাৎ কেঁদে উঠার কারণটা রাফায়াত ঠিক বুঝতে পারলনা! তবে কী এ খুশির কান্না? অয়ন্তীকে এত হাসিখুশি দেখে তার চোখ দুটো আনন্দ অশ্রুতে ভরে উঠেছে?

অয়ন্তী দেখে ফেলার পূর্বেই রাফায়াত তার অশ্রুসজল চোখ দুটি ঝট করে মুছে নিলো। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে তুলল। ব্যাগ পত্র গোছাতে গিয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলছে অয়ন্তী। বিয়ে উপলক্ষ্যে সে গিফটের যত শাড়ি পেয়েছে সব রাফায়াতদের বাড়িতে! তাই সে চেয়েও শাড়িগুলো প্যাক করতে পারলনা। মাথায় যেন হাত পড়ে গেল তার। এই মাঝরাতে সে কী সে ঐ বাড়িতে যাবে? সবার ঘুম ভাঙাবে? নাকি সকাল অবধি অপেক্ষা করবে? কিন্তু সকাল অবধি অপেক্ষা করতে গেলে যদি তাদের দেরী হয়ে যায়?

রাফায়াত বহুকষ্টে অয়ন্তীকে বুঝালো সকাল অবধি অপেক্ষা করতে। দু-এক ঘণ্টা দেরী হলেও বিরাট কোনো সমস্যা হবেনা। রাফায়াতের কথামত অয়ন্তী এই বাড়িতে রাখা তার সমস্ত সাজ সরঞ্জাম, আগের ব্লাউজ পেটিকোটগুলো গুছিয়ে নিলো। এরমধ্যেই রাফায়াতের মনে পড়ল নাক ফুলটির কথা! এত কিছুর মধ্যে রাফায়াত প্রায় ভুলেই গিয়েছিল অয়ন্তীর জন্য সে একটি সারপ্রাইজ গিফট এনেছে!

#চলবে…?