#এক_টুকরো_মেঘ ☁️
#ইফা_আমহৃদ
পর্ব::২৯
নিজের স্বতিত্ব নামক জিনিসটাকে হারিয়ে গত ৫ দিন ধরে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছি হসপিটালের বেডে।।চোখ মেলে এই পৃথিবীটাকে দেখার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আমার।।চোখ মেললেই সেই পুরোনো ঘটনাটা মনটাকে বিষিয়ে দিচ্ছে ।।আমি চাইলেই তো আর এইসবকে অস্বীকার করতে পারবো না,, জ্ঞান হারানোর অভিনয় করে পড়ে থাকতে পারবো না।।
পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালাম আমি।। চোখ খুলতেই নিজেকে কারো বাহুডোরে আবিষ্কার করলাম।।চোখ মেলে অরিশের ক্লান্তিমাখা মুখটা দেখতে পেলাম।। আমার নড়াচড়ার আলাপ পেয়ে ,,অরিশ মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো ।। আমার গালে হাত রেখে কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিলেন।। তারপর আবার টেনে নিজের বুকের খুব কাছে মিশিয়ে নিলেন।।তখনকার কথা মাথায় আসতেই অরিশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে চুপটি করে বসে রইলাম।। আমার জ্ঞান ফেরার কথা শুনতেই পরিবারের সবাই এসে হাজির হলো।। কিন্তু দূরভাগ্যবশত কারো দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস অবধি আমার নেই।।সবাই আমাকে শান্ত করতে এতোএতো কথা বলছে ,, কিন্তু কোনো কথাই আমার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না।।শুধু থেকে থেকে চোখের পাপড়িগুলো উঠা নামা করছে।।কাঁদতে পারছি না,, সব অশ্রু যেন আমার কাছ থেকে পালিয়েছে ।। পাথরের মত হয়ে গেছি আমি।।
— মরতে গিয়েছিলি ভালো কথা ।।তবে মাথার পাতলা বিয়ের ওরনাটা না দিয়ে,,, নিচে পড়ে থাকা শাড়িটা দিয়ে গলায় দড়ি দিলেই ভালো হতো।।তাহলে একলিস্ট সুইসাইড টা হতো ।। ওরনাটা ছিঁড়ে পড়ে যেতিস না।।(ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে অরিশ)
অরিশের কথায় গা জ্বলে যাচ্ছে আমার ।।মানুষ কি আর নিজের ইচ্ছেতে ,, আনন্দ করতে সুইসাইড করতে যায় ,, দুঃখে কষ্টে যায়।।আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।।
— আহহ ভাইয়া কি শুরু করছিস টা কি তুই।।দেখতে পারছি না,, মেয়েটা কষ্টে আছে আর তুই মজা শুরু করে দিয়েছিস।।(আমার পাশে বসে আরশি)
— তো কি করতে বলিস বল । এখন কষ্ট দুঃখে মরতে বলছিস।। জানিস কতোটা ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি ।।ইচ্ছে করছিলো তরীর সাথে নিজেকে শেষ করে দেই ,, কিন্তু সেটা পারলাম না।।(একটু থেমে আবার) এখন থেকে সবসময় ওকে আমার বুকে রাখবো ,, কখনো কাউকে আর কোনো ক্ষতি করতে দেবো না।।
— সেদিন আমি তোমার ঐবুকে মাথা রাখবো অরিশ,, যেদিন তুমি ওদের মারতে মারতে আধমরা করে আমার পায়ের সামনে এনে ফেলতে পারবে।। তার আগে নয় ।।
কথাগুলো বলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।। এখন কারো সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আমার।।
__________________
৬ মাস কেটে গেছে ,, এখনো কোনো খোঁজ খবর নেই সেই ছেলেদের।। আর অরিশেরও কোনো খবর নেই ।। সেদিন অরিশও আমাকে কথা দিয়েছে ,,যেদিন আমার সামনে ওদের আধমরা করে ফেলতে পারবে ,, সেদিন তিনি আমার সাথে দেখা করবে ,, তার আগে নয়।।এই ৬ মাসে বদলে গেছে সবার জীবন ।। আরশি আর ফারহান সুখে সংসার করছে ,, সময় পেলেই আমার কাছে এসে নিজের সব আনন্দের মুহূর্তগুলো সেয়ার করে।। আমি নিজেকে গৃহবন্দি করে নিয়েছি ,, আর সবাই ব্যস্ত আমাকে স্বাভাবিক করতে ।।
আমার ভাবনার মাঝে ঠাস করে কিছু নিচে পড়তেই লাফ দিয়ে উঠে বসলাম আমি।।অন্ধকার রুমে কাউকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম না।।তবে ৩ জন নিচে পড়ে আছে ।।অরিশ দরপর করে কেউ রুমে ঢুকে জানালার পর্দাগুলো খুলে দিতে ,, সারা ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো ।। সূর্যের কিছু রশ্মি তাদের মুখে পড়তেই ভয়ে আঁতকে উঠলাম আমি।।শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে গেল।। আমি দৌড়ে রুম থেকে বের হতে নিলে আমার হাতজোড়া টেনে দাঁড় করিয়ে দিলো অরিশ।।আমি চোখ বন্ধ করে শার্টের হাতাটা খামচে ধরলাম।।হয়তো নখের আটড়ে অরিশের হাতের অনেকটা ছিলে গেছে।। তিনি আমাকে তার থেকে দূরে সরিয়ে এনে গালে হাত রেখে ,, চোখে চোখ রেখে বললো….
— ভয় পাস না তরী ।। একবার ভালোভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে দেখ ।।এখন ওরা তোকে ছোঁয়া তো দূরে থাক ,, উঠে দাঁড়াতে অবধি পারবে না।। ট্রাস্ট মি!!
আমি চোখের পাতা আলতোভাবে খুলে ওদের দিকে তাকালাম।। কারো গায়ে জামা কাপড় নেই।।শরীরটা ফুলে গেছে,,, রক্তের ছড়াছড়ি ।। অসংখ্য কালো দাগ দেখা যাচ্ছে।।
— দেখেছিস ওদের কি অবস্থা করেছি ।। মানুষের শরীরে ২০৬ টা হাড় আছে কিন্তু ওদের শরীরে এখন ৫০০ উপরে হাড়ের টুকরো আছে ।।তুই একবার ওদের আঘাত করে নিজের ভেতরে জমিয়ে ক্ষোভ টা দেখা ,, যাতে আর কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে কুনজরে তাকানোর সাহস এদের না হয়।।
অরিশের কথা কানে পৌঁছানোর আগে আমি হাত দিয়ে ওদের আঘাত করে চলেছি ।।যখন হাতে ব্যাথা অনুভব করলাম,, তখন চারপাশে খুঁজে একটা ঝাড়ু পেলাম।। তারপর ঝাড়ু দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো পিটিয়ে নিজের ভেতর পুষে রাখা ক্ষোভটার সমাপ্তি ঘটাতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।।
পুলিশে নিয়ে গেছে ওদের।। লেডি পুলিশ যদি আজ আমাকে না থামাতো ,, তাহলে ওদের মেরেই ফেলতাম।। পুলিশ যতদূর জানিয়েছে ,, ওরা বাঁচবে না।।তাই ইমিডিয়েট লাইট সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে।।যদি মারা যায় তাহলে আমাদের জেল হতে পারে,, তাতে কোনো আক্ষেপ নেই আমার।।যেটা করেছি বেশ করেছি।।অরিশ তো নিজের হাতে ওদের বাজে অবস্থা করেছে।।তার রাগের কাছে সবাই কাবু।।অনেক কষ্টে অরিশকে ছাড়িয়েছে।।
বর্তমানে ফ্লোরে বসে কাঁদছি আমি।। এতো দিন হাজার চেয়েও কেঁদে নিজেকে হালকা করতে পারিনি ।।আর আজ হাজার চেয়েও নিজেকে সামলাতে পারছি না।।চোখের বাধ মানছে না।। একজন শক্তপোক্ত মানুষ আমার খুব দরকার যাকে জরিয়ে ধরে ইচ্ছে মতো কাঁদবো ।। হঠাৎ কেউ বাহুতে হাত রাখতেই ,,, একবার তার দিকে তাকিয়ে ঝাপটে ধরে কেঁদে দিলাম।।
— আচ্ছা অরিশ কেন এমন হলো বলতে পারো ,, কেন ঐ ছেলেগুলো সবার চোখে ছোট করে দিলো আমায়।। যে আমি কখনো কারো সাথে বাজে ভাষায় কথা অবধি বলিনি ,, সে আমি কেন ওদের ওভাবে মারলাম।। কেন আমার ইচ্ছেগুলো কাঁচের মত ভেঙ্গে দিলো।।
— কেউ যদি তোকে বাজে ভাবে ছুঁয়ে দেয়,,তাহলেই কি তুই অপবিত্র হয়ে যাবি পাগলী।।যেখানে যেখানে ওরা তোকে বাজে ভাবে ছুঁয়েছে ,, সেখানে সেখানে আমি আমার ভালোবাসার পরশ এঁকে দিবো।।দুজনে দেখিস খুব সুখী হবো ।।ভালো থাকবো আমরা।।।(আমার মাথায় হাত বুলিয়ে অরিশ)
— সেটা সম্ভব নয় অরিশ।।আমি চাইনা আমার এই কলঙ্কিত অন্ধকার জীবনের সাথে তোমার ফুলের মতো জীবন জরাক।। আমি এখন অপূর্ণ,, অপবিত্র ।।আর তুমি সম্পূর্ন ।। তুমি আমার থেকে ভালো কাউকে ডিজার্ভ করো।। সুন্দর দেখে একজনকে বিয়ে করে নাও ,, দেখবে তুমি খুব সুখী হবে।।(নিজেকে অরিশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে)
— আমি সুখী হতে চাই না ।।বুঝতে পেরেছি তুই ।।(চেঁচিয়ে কথাটা বলে চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করে আবার বললো)আমি আমার তরীরানীর সাথে ভালো থাকতে চাই।।আমি রোজ আমার তরীরানীর মাথাটা আমার বুকে রেখে ঘুমাবো।। মাঝরাত তাকে ডেকে তুলে নিয়ে যাবো টং এর দোকানে চা খেতে ।। পূর্ণিমা রাতে দুজনে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে জোছনা বিলাপ করবো।।বাকি রইলো সম্পূর্ণ আর অসম্পূনতার কথা।।সেটা নাহয় আমি আমার পূর্ণতা দিয়ে তোর অসম্পূর্ণতা ঢেকে দিবো।।(আমার হাতে হাত রেখে অরিশ)
— সেটা একদম সম্ভব নয় অরিশ।।(হাত সরিয়ে দিয়ে আমি)
— কেন সম্ভব নয় বলতে পারিস।।
— আমি ওতো কথা বলতে পারবো না।। শুধুমাত্র এইটুকু বলছি ,, আমি আপনাকে আমার জীবনের সাথে জরিয়ে আপনার জীবনটা শেষ করতে পারবো না।।
অরিশ আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই দৌড়ে নিচে চলে গেল।। আমি তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস নিলাম।। কিছুক্ষণ পর দৌড়ে রুমে ঢুকলো আরশি ।।এসে যা বলবো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল আমার।।অরিশ ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে।।এক সেকেন্ড অপেক্ষা নাকরে দৌড়ে আমিও নিচে নামলাম।।অরিশকে রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে থাকতে দেখে বুক কেঁপে উঠলো আমার।। কিছুক্ষনের জন্য নিঃশ্বাস আটকে গেছে আমার ।।ধীর পায়ে এগিয়ে অরিশের মাথাটা আমার কোলে তুলে ,, তার গালে হাত দিয়ে ডাকতে লাগলাম।।
— এই অরিশ কি হয়েছে তোমার।। প্লিজ আমার সাথে কথা বলো। ।।এই অরিশ,, শুনতে পারছো।। আমাকে ছেড়ে এভাবে তুমি চলে যেত পারো না।।প্লিজ একবার ওঠো।। আমি তোমার সব কথা মেনে নেবো।। তবুও এভাবে আমাকে একলা ফেলে চলে যেও না।।পাপা ,, মাম্মাম,,আরশি ,, মামনি কোথায় তোমরা অরিশকে বাঁচাও।।(অশ্রুভেজা নয়নে কথাগুলো বললাম)
চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না।।সবাইকে ডাকতে ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই অরিশ আমার হাত টেনে থামিয়ে দিয়ে বললো,, তাহলে চল বিয়ে করে নেই ।। মুহুর্তের মধ্যে মাথা বিগড়ে গেল আমার।।নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলাম তার গালে।।
— নিজেকে তুমি কি মনে করো হে!! সবাই তোমার হাতের পুতুল ।। তোমার ধারনা আছে,, কতোটা দূর্বল লাগছিলো আমার।। বারবার মনে হচ্ছিলো আমার জন্য তোমার কিছু হয়ে গেল।।(চোখ গরম করে আমি)
— ঠিক আছে তাহলে এবার সত্যি সত্যি ঝাঁপ দিচ্ছি।।
— খুন করে ফেলবো তোকে ।।
— আমি তোর হাতে খুন হতেও রাজি ।। শুধু তুই একটু স্বাভাবিক হয়ে যা।।।।
— আমার ভয় করছে অরিশ,,,,,আমি পারবো না।।।
— পারবি ।।আমার তরীরানী সব পারবে ,, আমার বিশ্বাস ।।আমি আছি তোর পাশে।। (আমার হাত ধরে অরিশ)
এক ধ্যানে অরিশের দিকে তাকিয়ে থেকে তাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।।আমাকে পারতেই হবে ।। আমার অরিশের জন্য।।
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
!
৫ বছর পর______
— এই ফুহু আমাল তকনেট দে ।।নাহলে কিন্তু আমি তুপুর কাছে তোল নামে নালিশ করবো!!(কোমরে হাত দিয়ে কান টেনে তুর)
— যা না কে বারন করেছে তোকে !! আমার মাম্মাম তোকে কেন চকলেট কিনে দেবো ।।তাই নিয়ে নিয়েছি।।তোর তো মাম্মাম নেই ,, যে তোকে চকলেট কিনে দিবে ।।তোর বাবাকে বল।।(চকলেট খেতে খেতে ফুহাদ)
— একদম তুপ করবি তুই।।আমাল মাম্মা যখন আমাল কাতে আতবে তখন অলেক তকনেট নিয়ে আতবে ।।যেখান থেকে তোলে একতাও দিবো না।।দেখিস ।।(ইনোসেন্স ফেইস করে তুর)
— আমাল মাম্মা তখন অলেক তকনেট নিয়ে আতবে।। ভালোভাবে কথা বলতে পারে না আবার চকলেট নিয়ে আসবে ।।যত্তসব ডং!!সেই কবে থেকে শুনছি তোর মাম্মা আসবে ।।কই এখনো আসলো না।।আর জীবনেও আসবে না।।(ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে ফুহাদ)
চলবে..🎀🎀