#এক_বেরঙ_চিলেকোঠায়
#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-৫৪
-বাবার বানানো এন্টিডোডের ফর্মুলা শশুড়ের ফার্মাইন্ডাস্ট্রিতেই তো দেবে সাফাত রওশনের মেয়ে। এটা তো আমরা সবাই জানি। কালিংয়ে এসে অন্য মেডিসিন ইন্ডাস্ট্রিকে চাহিদা বুঝিয়ে এতো ফর্মালিটি দেখানোর কি আছে? শেষমেষ তো সেই শশুড়ের কোম্পানিতেই যাবে ফর্মুলা!
আজকে দোয়া ফর্মুলা হ্যান্ডওভার করবে বলে বায়োমেডিতে মেডিসিন ইন্ডাস্ট্রির মালিকেরা এসেছে সবাই। সবে বায়োমেডিতে বাইক পার্ক করেছে আরাব। এরমাঝেই ওর বাইকের পেছনে দোয়াকে দেখে আশেপাশের মানুষগুলো কানাঘুষা করতে শুরু করলো। দোয়া কিছুই বললো না। শুধু মুচকি হেসে বাইক থেকে নামলো। হাতের ফাইলটা বুকে জরিয়ে দাড়ালো ও। একনজর তাকালো ওর জন্য উৎসুক হয়ে বসে থাকা বড়বড় বিজনেসম্যানদের ঢলের দিকে। খানিকটা তাচ্ছিল্যেও হাসলো। আজকে ওর মতো একটা সাধারন মেয়েকে নিয়ে কতো কি! যে মানুষটাকে সবাই মিলে অপমান করতে করতে সুইসাইডের দিকে ঠেলে দিয়েছিলো,তারই আবিষ্কার হাসিল করার জন্য কতো কি! আশেপাশের কথা শুনে আরাব শক্ত হয়ে বাইকেই বসে। ওর দিকে তাকালো দোয়া। বুঝলো ওর রাগের কারনও। ওর কাধে হাত রেখে বললো,
-নামুন?
বাইক ছেড়ে নামলো আরাব। দুজনে এগোলো ভেতরে। দোয়াকে অভ্যর্থনা জানানো শেষে বসতে বলা হলো। আশেপাশে আরাবকে খুজলো দোয়া। আরাব ততোক্ষনে এপ্রোন পরে ওর পাশে এসে দাড়িয়েছে। দোয়া কিঞ্চিত বিস্ময়ে তাকালো। আরাব মুচকি হেসে বললো,
-আমি এখানে তোমার বর বা রংধনুর প্রতিনিধি হয়ে আসি নি দোয়া। বায়োমেডিতে আমারও নিজস্ব কিছু দায়িত্ব আছে।
দোয়া সুন্দর একটা হাসি দিয়ে মাথা উপরনিচে নাড়ালো। চলে আসছিলো ও। আরাব পিছুডাক দিলো ওকে। দোয়া পেছন ফিরতেই আরাব বললো,
-এখনো অবদি তোমাকে বলেছি,এন্টিডোড কাকে দেবে,সেটা সম্পুর্ন তোমার সিদ্ধান্ত দোয়া। কিন্তু শেষমুহুর্তে আমি আমার সিদ্ধান্তটাও তোমাকে জানাতে চাই।
ঠোট আটকে হাসি আটকালো দোয়া। ও জানে আরাব কি বলতে চাইছে। মুখে বললো,
-হ্যাঁ বলুননা।
-আমি চাইনা তুমি ফর্মুলা রংধনুকে হ্যান্ডওভার করো। রংধনু টাকা ছাড়া আর কিছু বোঝে না দোয়া। তোমার বাবার কষ্ট,ইচ্ছে কোনোটারই মুল্যায়ন হবে না রংধনুতে।
দোয়া মুগ্ধভাবে তাকিয়ে রইলো আরাবের দিকে। পাশ থেকে আরাবের এক কলিগ ডাক লাগালো ওকে। আরাব পেছনে তাকিয়ে দোয়াকে বললো,
-যে কোম্পানিকে দিচ্ছো,সেখানে যেনো তোমার বাবার ইচ্ছের প্রাধান্য থাকে। এন্টিডোড যেনো সর্বনিম্ন টাকায় সেল হয়,এটা এনশিওরের দায়িত্ব কিন্তু তোমার দোয়া। আর আমি জানি তুমি পার্ফেক্ট ডিসিশনটাই নেবে।
মাথা উপরেনিচে নাড়ালো দোয়া। আরাব বেরিয়ে আসলো ওখান থেকে। ওকে বলা হয়েছিলো দোয়ার অনুষ্ঠানে বিজনেসম্যানদের ফর্মুলা নিয়ে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার জন্য। ও করেছেও সেটা। তারপর যখন আলোচনা চলছিলো,ফর্মুলা কোথায় কিভাবে যাবে,গেলে উপকারিতা কি,তখনই চলে এসেছে আরাব। বাইরে খানিকটা দুরে দাড়ালো। বাইকে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুজে চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো মাথা নিচু করে। প্রোগ্রাম শেষে বেরোলো দোয়া। হাসিমুখে আরাবের দিকে এগোলো ও। দোয়াকে দেখেই আরাব বৃহৎ হাসির রেখা আঁকলো ওর ঠোটেও। দোয়া এগিয়ে বললো,
-আরাব এন্টিডোড…
-বাইকে ওঠো। একজায়গায় নিয়ে যাবো তোমাকে।
দোয়া কিছুই বললো না। অবাকও হলো না। মুচকি হেসে ব্যাকসিটে উঠে বসলো বাইকের। বাইক স্টার্ট দিলো আরাব। একটুখানি পথ চলার পরই বুকের দিকটায় দোয়ার হাত অনুভব করে সেদিকে তাকালো ও। বরাবর দোয়া ওর কাধে হাত রেখে বসে। আসার সময়ও কাধে হাত রেখেই বসে এসেছে। পাব্লিক প্লেস বিষয়টা সবসময় দোয়ার কাছে প্রাধান্য পায়,এটা জানে আরাব। কিন্তু এখন হুট করেই ওকে জরিয়ে ওর জ্যাকেটটা খামচে ধরেছে দোয়া। ওর পিঠে মাথাও ঠেকিয়েছে। হাসি প্রসারিত করে বাইক ছুটালো আরাব। দোয়া চুপচাপ ওভাবেই রইলো। গন্তব্যে পৌছে বাইক থামিয়ে আরাব বললো,
-ম্যাডাম আজকে লোকে কি বলবে নীতি উপেক্ষা করলেন যে?
দোয়া মাথা তুললো। আরাবের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
-আপনাকে ভালোবেসে,আপনার হৃদস্পন্দন শুনে,নিজেকে সাহসী করে তুলেছি আরাব। সেখানে লোকে কি বলবে নীতি একেবারে তুচ্ছ!
দোয়া বাইক থেকে নামলো। কিন্তু সামনে থাকা দ্বিতল দালানের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো একপ্রকার। চোখ ভরে উঠলো ওর। ছলছল চোখে আরাবের দিকে তাকালো ও। আরাব পকেটে দুহাত গুজে হাসছে। দোয়া আরেকবার তাকালো সামনে। বড়বড় অক্ষরে দালানের সামনের দিকটাতে লেখা স্বপ্নরঙ আর্ট একাডেমি। একাডেমির ভেতরের প্রায় সবটাই দেখা যায় বাইরে থেকে। কাচের দেওয়ালের ওপারে রঙের মেলা বসেছে যেনো। ছোট বড় সবাই রঙ নিয়ে খেলতে ব্যস্ত,হাসিঠাট্টা,আড্ডামস্তিতে আকাতে ব্যস্ত। বাবা মারা যাওয়ার পর এই প্রথম এখানে আসলো দোয়া। আগে ইচ্ছে হলেই মনের সবটুকো রঙ এসে এটে দিয়ে যেতো এখানে এসে। এখানকার সব রঙ,তুলি,ক্যানভাস উন্মুক্ত ছিলো ওর জন্য। সাফাত রওশন নিজে এই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। দোয়ার আর্টগুলো বিক্রির টাকা রাস্তার ছেলেমেয়েদের দিয়ে দেওয়া হতো। কতো সুন্দর ছিলো দিনগুলো! আরাব এগিয়ে এসে আস্তেকরে বললো,
-তোমার স্বপ্নের রঙ দোয়া। স্বপ্নরঙ!
ওকে জাপটে জরিয়ে ধরে দোয়া কেদেই দিলো। আরাবের প্রত্যেকটা কাজে প্রতিবার নিজেকে আটকানো দায় হয় ওর জন্য। দোয়া জানে,তখন ওই আশেপাশের লোকগুলোর কথা শুনে যাতে ওর মন খারাপ না হয়,ভবিষ্যতে যেনো ওকে এমন কোনো কটু কথা শুনতে না হয়,এজন্যই ও সরাসরি বলেছে এন্টিডোড রংধনুতে না দিতে। আরাবের কথায় এন্টিডোড অন্য কোম্পানিতে দেওয়ায় আরাবের মন খারাপ নেই এটা যে দোয়া বুঝবে,সেটাও জানে আরাব। তবুও এটা বুঝাতে আলাদা,কৃত্রিম হাসি ধরে রেখেছে আরাব। আর সবশেষে,এন্টিডোড অন্য কোম্পানিতে দেওয়ায় দোয়ার গিল্টিফিল কাটাবে বলে ওকে এই আর্ট একাডেমিতে নিয়ে এসেছে। দোয়া হুহু করে কাদতে লাগলো ওর বুকে মুখ গুজে। আরাব ওর চুল মুঠো করে নিয়ে কাতরভাবে বললো,
-কাদছো কেনো দোয়া? কেনো কাদছো? আমার কষ্ট হচ্ছে তো! প্লিজ কেদো না! প্লিজ!
একটা জোরে শ্বাস নিয়ে মাথা তুললো দোয়া। আরাবকে ছেড়ে হাতের পিঠে চোখমুখ মুছে দাড়ালো ও। আরাব মুচকি হাসলো। সালমা বেগমের কাছ থেকে দোয়ার এই আকাআকির সবটা শুনেছিলো ও। দোয়ার দুগাল ধরে বললো,
-তুমি এখানে আসবে দোয়া। আগে যেমন আসতে,তেমনই আসবে। আর ছবি আঁকবে। তোমার আঁকা ছবিগুলো যে টাকায় সেল হবে,সে সব টাকা ছেলেমেয়েদের দিয়ে দেওয়া হবে। ঠিক আগের মতো!
আরাবের হাতের উপর হাত রাখলো দোয়া। বললো,
-হ্যাঁ। আসবো আমি! আসবো! তবে তার আগে আমার আরো কিছু দায়িত্ব বাকি আছে আরাব।
আরাব হেসে বললো,
-দিয়ান সুস্থ্য হলেই ওকে বিকেএসপিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে দোয়া। ডোন্ট ওয়ারি। আর মা যেহেতু চিলেকোঠাতেই থাকবেন,ওনার জন্য তোমার বাবার ব্যাংকব্যালেন্স,ফর্মুলা সেলের টাকা,তুমি,আমি আমরা সবাই আছি। তোমার পড়াশোনা বাদ দিয়ে এখানে আসতে হবে না। ফাইনাল এক্সাম পরই না হয় তুমি এখানে এসো? আর রওশন স্যারের ফর্মুলা তো শর্তসাপেক্ষেই মেডিসিন ইন্ডাস্ট্রিতে গেছে। তো ওখানে…
-বাবার ফর্মুলা রংধনু ফার্মাকেমিক্যালসে গেছে আরাব।
আরাব আটকে রইলো কিছুক্ষন। নিমিষেই বিষাদ ছেয়ে গেলো ওর চেহারায়। দোয়ার গাল ছেড়ে অন্যদিক ফিরে শান্তগলায় বললো,
-তোমাকে বলেছিলাম স্বজনপ্রীতি ভুলে যেতে।
দোয়া একদম সামনে এসে দাড়ালো ওর। আবারো ওর দুহাত নিজের গালে নিয়ে বললো,
-আমি স্বজনপ্রীতি দেখাই নি আরাব। আমি তো শুধু আমার বাবার স্বপ্নকে ভালোবেসেছি।
-কিন্তু রংধনু ফার্মাকেমিক্যালসে কোনোদিনও তোমার বাবার স্বপ্নপুরন পসিবল না দোয়া! ওরা কোনোদিনও লোয়েস্ট রেটে এন্টিডোড লঞ্চ করবে না!
-আপনার এই “ওরা” সম্বোধনের দায়িত্বে এখন আমি আরাব।
বিস্ফোরিতো চোখে আরাব তাকালো দোয়ার দিকে। দোয়া মুচকি হেসে বললো,
-আপনার মনে আছে? একবার বলেছিলেন,আপনার বাবাকে নাকি বোঝার কেউ নেই। আপনার বাবা তাকে বোঝার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে আরাব। গতকাল রাতে যখন তার ঘরে তাকে ওষুধ খাওয়াতে গিয়েছিলাম,উনি আমাকে মা বলে ডেকেছেন আরাব। উনি কেদেছেন আমার কাছে। স্বীকার করেছেন,তাকে বোঝার সত্যিই কেউ নেই। রংধনু ফার্মাকেমিক্যালসের এমডি পদবীটা তার এই মায়ের কাছে উনি দিয়ে দিয়েছেন আরাব। উনি চান আমি নিজের মতো করে এন্টিডোড লন্চের সবটা লিড করি। সেটা যতো স্বল্পদামে সম্ভব। বিনিময়ে তার এমন কাউকে চাই,যে তাকে বুঝবে,বুঝাবে। তার আমাকে চাই আরাব। তাকে বোঝার মতো এই মাকে চাই তার। আর আমি তাকে মানা করতে পারি নি আরাব। নিজেহাতে এন্টিডোড লন্চ করাবো,বাবাকেও পাশে পাবো,একসাথে দুটো জিনিস পাওয়ার লোভ আমি সামলাতে পারি নি আরাব। লোভী হয়ে গিয়েছি প্রচন্ড! প্রচন্ড লোভী!
আরাবের চোখ খুশির পানিতে ভরে উঠেছে। ঠোট কামড়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে সামলানোর চেষ্টা করছে ও সেই অশ্রুকে। দোয়া কান্নার মধ্যেও হেসে দিয়ে বললো,
-এবার বুঝুন সাইন্টিস্ট মশাই! খুশির কান্না আটকানো কতো কষ্টের!
কয়েকবার দোয়ার চোখেমুখে চুমো দিয়ে হেচকা টানে ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো আরাব। দোয়া ওর বুকে মুখ গুজে রেখে বললো,
-আমি লোকে কি বলে নীতিতে বিশ্বাসী নই আরাব। আমি তো যেটা ঠিক,সেটাই করনীয় নীতিতে বিশ্বাসী। আপনার মতো।
দোয়ার চুলে আরো দুবার চুমো দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো আরাব। কিছুক্ষন পর দোয়া বললো,
-লোকে কি বলবে নাইবা ভাবলেন,রাস্তায় এভাবে জরিয়ে থাকা কি করনীয় আরাব?
আরাব হেসে ছেড়ে দিলো ওকে। দোয়া মুগ্ধ হয়ে ওর হাসিমুখটা দেখতে লাগলো। দুদন্ড দৃষ্টিবিনিময়ের মাঝেই ফোন বেজে উঠলো আরাবের। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলো আরাব। খুশিতে আপ্লুত চেহারায় হঠাৎই কঠোরতা ফুটে উঠলো ওর।
#চলবে…
#এক_বেরঙ_চিলেকোঠায়
#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-৫৫
আরাব পুলিশস্টেশনের সামনে বাইক ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে। ওর আশেপাশে মানুষজনের ঢল। উত্তল জনগন একের পর এক অপমানজনক সম্বোধন ছুড়ে চলেছে। পুলিশ কোনোভাবে আটকে রেখেছে সবাইকে। ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন ইটের টুকরা ছুড়ে মারলো। ওটা সোজা পুলিশের গাড়ির কাচে গিয়ে লেগেছে। টুকরোটুকরো হয়ে গেলো গাড়ির জানালাটা। একজন ইন্সপেক্টর এগিয়ে এসে বললো,
-ডক্টর আরাব? আপনি প্লিজ নিরাপদ দুরুত্বে সরে যান। এখানে সাধারন জনগন…
-আপার কলিংয়ে আমাকে এখানে থাকার অনুমতি দেওয়া আছে ইন্সপেক্টর।
ইন্সপেক্টর আর কিছুই বললেন না। ক্ষিপ্ত জনগন সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পরলেন। ইতিমধ্যে আরো একটি পুলিশি গাড়ি এসে থামলো জায়গাটায়। আরাব তাকালো সেদিকে। ভেতর থেকে প্রথমেই টানতে টানতে বের করা হলো জারাকে। তারপর পুলিশ টেনে হিচড়ে গাড়ি থেকে বের করলো সুমনকে। সুমনের অবস্থা দেখার মতো নয়। চেহারা পাংশুটে হয়ে গেছে সুমনের। হাতপা নোংরা,চেহারায় ক্ষত,গায়ের গেন্জিটা,প্যান্টটাও ময়লায় ভরপুর,দাড়ি,চুলগুলো বেড়ে গেছে। হাতকড়া পরানো হাতে পাগলের মতো মাথা চুলকাচ্ছে আর আশেপাশে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে। জারা হাত ঝাড়া মেরে বললো,
-লিভ মি! আমাকে কেনো ধরে আনলেন এখানে? আমি কিছুই করি নি! ট্রাস্ট মি ইন্সপেক্টর! শুনছেন না কেনো আমার কথা?
ওর প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না ইন্সপেক্টর। চারপাশ আরো বেশি উত্তেজনাপুর্ন হয়ে উঠেছে। মহিলা পুলিশ পেছন থেকে ধাক্কা লাগিয়ে বললো,
-চল চল! এখান থেকে আগে ভেতরে চল! নইলে এই পাব্লিকের হাতেই মারা পরবি!
জারা চেচিয়ে বললো,
-আমি কিছু করিনি! আমাকে কেনো ধরা হলো?
কেউই ওর কথাকে পাত্তা দিলো না। সাধারন লোকজন ওর আর সুমনের নামে হায় হায় করে চলেছে। আশপাশ দেখে জারার চোখ আটকে গেলো আরাবের দিকে। বাইকে হেলান দিকে বুকে হাত গুজে দাড়িয়ে আরাব। জারা ওর দিকে তাকাতেই ডানহাতের পাঁচআঙুল দুবার মুঠো করে,খুলে,হাই বুঝালো ওকে। রাগে চোখ ভরে উঠলো জারার। একপলক পেছনে পাগলপ্রায় সুমনের দিকে তাকালো অগ্নিদৃষ্টিতে। মুফতাহিরকে দেওয়া কথা অনুসারে এই লোকটাকে বাচাতে গিয়েছিলো ও। আর তখনই পুলিশ পৌছে যায় ওখানে। আর ওই নাকি সুমনকে এতোদিন পুলিশের চোখের বাইরে গায়েব করে রেখেছে,এই দোষে ধরে নিয়ে এসেছে ওকে। কোনো কথাই শোনেনি ওর। পুলিশ টানতে টানতে ওদের দুজনকে ভেতরে নিয়ে এলো। একই লকাপে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো দুজনকেই। জারা ছুটে এসে সুমনের কাছে দাড়িয়ে বললো,
-ডক্টর সুমন? কি হয়েছে আপনার? আপনাকে জেলে নিয়ে এসেছে ওরা! আমি আপনাকে বাচাতে গিয়েছিলাম। আমাকেও জেলে ঢুকিয়ে দিলো ওরা! ওদেরকে বলুন? আমি আপনাকে বাচাতে গিয়েছিলাম! আপনাকে আমি আটকে রাখিনি! শুনছেন?
সুমন এলোমেলোভাবে ওর দিকে তাকালো। পরপরই হেসে দিয়ে বললো,
-হু হু! শুনছি! শুনছি তো!
জারা রাগে ওর কলার চেপে ধরলো। আরো জোরে চেচিয়ে উঠে বললো,
-আপনার ভাই সজল মুফতাহিরের কথায় আমি আপনাকে বাচাতে গিয়েছিলাম ডক্টর সুমন! আমি আপনাকে জিম্মি করে রাখিনি! ওদের বলুন! আমি বাচাতে গিয়েছিলাম আপনাকে! বাচাতে!
ওর কথায় সুমন ভয়ার্ত চেহারা করে কেদে দিলো। উচ্চস্বরে কাদতে কাদতে বললো,
-আমাকে বাচাও! আমাকে বাচাও! আমাকে ইন্জেকশন দেবে! বাচাও আমাকে! কেউ তো বাচাও!
-কি হারামি মেয়ে রে তুই! নিজের কুকীর্তি ঢাকতে এতোদিন তো অত্যাচার করেছিসই আবার এখন জেলে থেকেও অত্যাচার করছিস লোকটার উপর?
এক মহিলা পুলিশের কর্কশকন্ঠে দিশেহারার মতো ওর দিকে তাকিয়ে আবারো সুমনের দিকে তাকালো জারা। বোঝার চেষ্টা করলো কি ঘটেছে আর ঘটছে। কলার ছেড়ে ধাক্কা লাগালো সুমনকে। মহিলাট এসে জারাকে টেনে অন্য আরেকটা মহিলা আসামীর সাথে আটকে দিলো। মাথা নিচু করে নিজের চুলগুলো টানতে লাগলো জারা। এরইমাঝে কেউ বলে উঠলো,
-যতই হও রাস্টিকেটেড! তবুও মেডিকেল স্টুডেন্ট ছিলে। ডাক্তারি পড়ে আমার বাইকে ইন্জিনিয়ারিং স্কিল দেখানোর মতো বোকামি না করলেও পারতে জারা।
আকাশসম বিস্ময়ে জারা মাথা তুলে তাকালো। আরাব পকেটে দুহাত গুজে এগোলো ওর দিকে। জারা উঠে এসে একছুটে লকাপের সামনের লোহাগুলো মুঠো করে নিয়ে বললো,
-এই সব তুমি করেছো আরাব! সব তুমি করেছো!
মুচকি হাসলো আরাব। আশেপাশে দেখে খানিকটা এগিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
-ইয়াপ। আমি।
টপটপ করে পানি পরতে শুরু করেছে জারার চোখ দিয়ে। আরাব চোয়াল শক্ত করে বললো,
-কতো সোজা হিসাব তোমার। আমার বাইকের কিছু মিসপ্লেস করিয়ে দিলে,দোয়াকে নিয়ে আমি বায়োমেডির উদ্দেশ্যে বেরোলাম,এন্ড বাইক এক্সিডেন্টে দুজন মারা পরলাম। কেউ কিছু জানলোও না। আর তোমার উদ্দেশ্যও পুরন হলো। আরাব তোমার নয়,তো এ পৃথিবীতেই নয়! রাইট জারা?
বিস্ফোরিত চোখে তাকালো জারা। আরাব ওর প্লানিংয়ের সবটা জানে,এটা জানার পর আর কিই বা প্রতিক্রিয়া দেখাবে ও? আরাব বললো,
-কোন বাইকে বেরোবো,সে খবরটা তো মুফতাহির দিয়েছিলো তোমাকে। আর তুমিও লোক ঠিক করিয়ে আমার বিবি আইমিন বিলাভড্ বাইকটার সাথে অঘটন ঘটিয়ে দিলে? হাউ রুড জারা!
অভিমানের মতো করে বললো আরাব। জারা বিস্ময়ে ওর রুপবদল দেখে চলেছে একের পর এক। আরাব বললো,
-কি ভেবেছিলে? তুমিই সুমনের খোজ পেয়েছো? তুমিই আমাকে ফলো করেছো? মুফতাহিরকে সুমনকে নিয়ে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করিয়ে অনেক বড় কিছু হাসিল করে নিয়েছো? আমার বাচ্চার মতো আদরের বাইকে উনিশবিশ করিয়ে খুব বড়সর প্লান করে ফেলেছো?
জারা নির্বাক। শুধু পানি গরছে ওর চোখ দিয়ে। আরাব আরেকপা এগিয়ে বললো,
-নাও লিসেন। সেদিন তোমাকে বলেছিলাম না? তোমাকে পরিনতি দেখাবো। একটা মেয়ে তুমি। চড় মারার পরও যখন তুমি শুধরালে না,দ্বিতীয়বার তোমার গায়ে হাত তুলে হাত নোংরা করার ইচ্ছে হচ্ছিলো না। ভাবলাম আইনি ব্যবস্থা নেই। আর এজন্য একটা উপলক্ষ্য দরকার ছিলো আমার। এন্ড গেইস হোয়াট? তুমি নিজে থেকে সে কারনটা দিয়ে দিলে আমাকে। সুমনের খোজ পাওয়ার জন্য তোমার যে সো কল্ড গুপ্তচর আমাকে ফলো করছিলো,তাকে প্রথমদিনেই ধরে ফেলি আমি। এন্ড ইট স্টার্টেড দেয়ার।
পরে শুরু হয় ডাবলগেইম। জানতে পারি ঠিক কি কি তোমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তুমি চেয়েছিলে,সুমনকে মুফতাহিরের কাছে ফিরিয়ে দেবে। তো যখন সুমনকে তুমি ছাড়াতেই যাচ্ছো,ভাবলাম এক ঢিলে দুই পাখি মারা থিওরি এপ্লাই করি। একজন সুনাগরিকের পরিচয়ে পুলিশকে সুন্দর একটা ইনফর্মেশন দিয়ে হেল্প করলাম। তুমিও জড়িত ছিলে সুমনের সাথে। তুমিই সুমনকে আটকে রেখেছো। আর নিজের দোষ ঢাকতে সুমনকে এমন কিছু ইন্জেক্ট করেছো,যাতে ও পাগল হয়ে যায় আর কাউকে কিছু বলতে না পারে। এখন যে কন্ডিশনে আছে ও,জাস্ট লাইক দিস ওয়ে।
….
-এতোদিন একটু একটু করে নিজ হাতে সুমনকে এই স্টেজে এনেছি জারা। যাতে মুফতাহিরের নাম না নেয় ও। এখন ও তোমাকে কেনো,মুফতাহির এমনকি নিজেকেও চেনে না। সো ওকে নিয়ে তুমি যে নির্দোষ সেটা কেনো,ও নিজে যে নির্দোষ,সেটাও বলাতে পারবে না। প্রমান করা তো অনেক দুরের বিষয়।
….
-ও হ্যাঁ! পুলিশকে ঠিকানাটাও আমিই দিয়েছি। দুজনকে ঠিক কোথায় পাওয়া যাবে। তারা গেলো,তোমাকে আর সুমনকে একসাথে পেলো,আর….
-তোমাকে আমি ছাড়বো না আরাব!
জারার উত্তেজনা দেখে আরাব মুচকি হাসলো। ওর মুঠো করা হাতের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো,
-ধরতে পেরেছো আদৌও জারা?
মাথা ঠেকিয়ে কাদছিলো জারা। মাথা তুলে আবারো তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বললো,
-তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। যা করেছিলাম,সবটা তোমাকে ভালোবেসে। তোমাকে পাবো বলে। আর তুমি ঠকিয়েছো আমাকে। ফাসিয়েছো!
-তুমি কোনোদিন কাউকে ভালোই বাসোনি জারা। তুমি ভালোবাসতে জানোই না! ভালোবাসায় কোনো ক্ষোভ,আক্রোশ থাকে না। ভালোবাসায় শুধু ভালোবাসাই থাকে। ভালোবাসার মানুষটা কোনোদিনও না পাওয়ার খাতায় পরে না। বাস্তবে না হলেও,ভালোবাসার মানুষটা আজীবনই নিজের হয়। মনের কোনো এক গহীনে সে মানুষটা একান্তই আপন হয়। এই অনুভব নেই তোমার। ভালোবাসা শব্দটাও তোমার জন্য নয়! আর রইলো কথা ফাসানোর? এটা তোমার কর্মফল! দোয়াকে আঘাত করার,দিয়ানের ক্ষতি করতে যাওয়ার,মুফতাহিরকে ধমকি দেওয়ার,সুমনকে বাচাতে যাওয়ার,আমাকে দোয়াকে দুজনকেই মেরে ফেলার মতো জঘন্য চিন্তা করার। আর সর্বপরি,আরাবের কাছ থেকে দোয়াকে আলাদা করার চেষ্টা করার। নাও বেয়ার দ্যা কনসিকুয়েন্সেস।
আর কোনো কথা বলেনি আরাব। বেরিয়ে আসলো পুলিশস্টেশন থেকে। বাইক ছুটিয়ে সোজা রংধনুতে পৌছালো ও। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে সবাই সুমন জারার খবরটাই দেখছিলো। ও ভেতরে ঢুকতেই দোয়া দাড়িয়ে গেলো। ওর চোখমুখ শুকনো। সবাইকে পেলেও মুফতাহিরকে দেখতে পেলো না আরাব। তৌফিকা উঠে দাড়িয়ে বললো,
-আরাব? দেখ জারা…
আরাব এগিয়ে গিয়ে রিমোট দিয়ে টিভি অফ করে দিলো। শান্তভাবে বললো,
-যে দোষ করবে,সে তো সাজা পাবেই আপু। এসব আমাদের ভাবার বিষয় না। আর সুমনকে বা জারাকে নিয়ে আলোচনা চাইনা আমি রংধনুতে। এতে দোয়ার ওর বাবার কথা মনে পরবে। মন খারাপ হবে ওর। এসব ভুলে যা।
তৌফিকা একপলক দোয়ার দিকে তাকালো। তৌফিক ওয়াহিদ বললেন,
-আরাব ঠিকই বলেছে। এসব নিয়ে কথা হবে না আর এ বাসায়। আরাব? দোয়াকে নিয়ে ঘরে যাও।
জ্যাকেটটা খুলে হাতে ঝুলালো আরাব। দোয়া চুপচাপ চলে আসলো ওখান থেকে। আরাব ঘরে ঢুকে দেখে দোয়া বেডে বসে। জ্যাকেটটা বিছানায় রেখে বললো,
-জারাকে শাস্তি পেতেই হতো দোয়া। তফাৎটা এই,হয়তো সেটা হতে পারতো দিয়ান,আমার বা তোমার বড়সর কোনো ক্ষতির পর। আর এখন হচ্ছে সুমনের সাথে জড়িত থাকার মিথ্যে দায়ে।
দোয়া জলভরা চোখে তাকালো আরাবের দিকে। আরাব হাত মুঠো করে সামলালো নিজেকে। বললো,
-এসব যে আমিই করেছি,চাইলে এটা তোমার থেকে লুকিয়ে যেতে পারতাম আমি দোয়া। কিন্তু করিনি সেটা। বউকে নাকি বরের অর্ধাঙ্গীনি বলা হয়। কিন্তু আমি আমার সবটা মানি তোমাকে। তাই লুকোতে চাইনি কিছুই। এসব ঘটারই ছিলো। তুমি জানলে,না জানলে,চাইলে বা না চাইলেও।
দোয়া এগিয়ে আসলো এবার। আরাবের চোখে চোখ রেখে বললো,
-রনোককে কোনোরকম ওয়ার্নিং ছাড়াই শাস্তি দিয়েছিলেন। আফসোস! জারাপু এতোবার সুযোগ পেয়েও নিজেকে শুধরাতে পারলো না।
মুচকি হেসে দোয়ার দুগাল ধরলো আরাব। তারপর কপালে আলতোভাবে চুমো দিলো ওর। দোয়া গোড়ালি উচিয়ে আরাবের নাকে নাক ঘষে দিয়ে ওর বুকের মাঝে মুখ গুজে রইলো। দোয়াকে দুহাতে জরিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো আরাব।
#চলবে…
[ গঠনমুলক মন্তব্য করে যাবেন সবাই প্লিজ। হ্যাপি রিডিং❤ ]