#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#সূচনা_পর্ব
সদ্য বিয়ে হওয়া বাসর রাতে নিজের বরের জায়গায় ভার্সিটির প্রোফেসর মি. আধার খান-কে দেখে রীতিমতো চারশো চার বোল্ডের ঝটকা খেয়ে থম মে’রে বসে রয়েছে আলো। সে হয়তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি এমন কিছু দেখবে। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে—তার সামনে মানুষ নয়, বরং কোনো য’মদূত দাঁড়িয়ে আছে। একটু নড়লেই খপ করে তার ছোট্ট দেহ থেকে প্রাণ পাখিটি বের করে নিয়ে যাবে। এসির মধ্যেও তরতর করে ঘামছে মেয়েটা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে, বার বার শুকনো ঢোক গিলছে এবং মনে মনে ভাবছে, কেন যে না দেখে বিয়ে করতে গেল? সবাই কতবার করে দেখতে বলেছিল, কিন্তু তখন তো মাথায় ভুত চেপে ছিল। যার ফলে সবাইকে বড় মুখ করে বলেছিল, একেবারে বাসর রাতেই গিয়ে স্বামীর মুখ দেখবে! কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা যে এত বড় বাঁশ দিবে সেটা ভাবতে গেলেও গা শিউরে উঠছে। একটু শুধু একটু যদি সে টের পেত তাহলে বাস্তবে বিয়ে করা তো দূরে থাক কল্পনাতেও এই উজবুকটাকে বিয়ে করত নাহ। আলো আর সহ্য করতে না পেরে গলা ফা’টিয়ে দিল এক চিৎকার।
-“আয়ায়ায়ায়া…!”
-“এই মেয়ে এমন ষাঁড়নির মতো চেচামেচি করছো কেন? মুখ বন্ধ রাখো, না হলে এক থাপ্পড়ে রুম থেকে বের করে দিবো বেয়াদব মেয়ে!!”
ধমক খেয়ে চুপসে গেল বেচারি। কিন্তু মাথায় একটা কথা কিছুতেই ঢুকছে না, সে এর আগে ষাঁড় নাম শুনেছে, কিন্তু ষাঁড়নি এইটা আবার কোন অঞ্চলের ভাষা? আলো কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে তার আগেই আধার খান গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,,
-“কেউ একজন বলেছিল, তার মামার ছেলের বন্ধুর কাজিনের মেয়ের বড় বোনের বিয়েতে যাচ্ছে! তা মিস কালো, আপনি এখানে কি করছেন? আপনার তো অন্যের বিয়েতে থাকার কথা ছিল, রাইট?”
আলো এখন কি জবাব দিবে কিছু বুঝতে পারছে না। তার মিথ্যে বলার পর এইভাবে হাতে-নাতে ধরা পড়বে সেটা বুঝতে পারেনি। আলো মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করল,
-“ইয়ে মানে আসলে স্যার হয়েছেটা কি, মানে না ইয়ে আসলে..”
-“আপনার ইয়ে আপনার কাছেই রাখুন, মিস কালো।”
আলোকে পুরোপুরি কথা শেষ করতে না দিয়ে তার কথার মাঝেই আধার খান ফোড়ন কা’টে। সেটা শুনে মেয়েটি চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,,
-“দেখুন স্যার, মানছি আমি মিথ্যে বলেছি। তার পিছনেও অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে আর আমার নাম মিস কালো নয়, আলো রহমান রিক্তা।”
-“আলো না কালো আই ডোন্ট কেয়ার। আমি নাহয় বিয়ের আগে তোমাকে দেখিনি, বাট তুমি নিশ্চয়ই আমাকে দেখেছো? তাহলে এই বিয়েতে রাজি হলে কেন? জানতে না আমি তোমার শিক্ষক? নাকি জেনে শুনেই এমন করেছো?”
-“আমি যদি জানতাম, আমার বিয়ে যার সাথে হচ্ছে সেটা আপনি! তাহলে আপনাকে বিয়ে করা তো দূরে থাক, দরকার হলে সারাজীবন কুমারী থাকতাম! তবুও আপনার মতো লোককে বিয়ে করতাম নাহ।”
আলো মিনমিন করে কথাগুলো বলে আড়চোখে তাকায়, তার বর রূপে বদমেজাজি স্যারের দিকে। আধার খান কিছু সময় গম্ভীর মুখে আলোকে পর্যবেক্ষণ করে ওয়াশরুমে চলে যায়। পরনের সাদা শেরওয়ানি খুলে ছু’ড়ে মে’রে ঝর্ণা ছেড়ে দিয়ে পানির নিচে দাঁড়িয়ে মাথার চুল দু’হাতে খামচে ধরল। মাথায় তার দাউদাউ করে আগুন জ্ব’লছে। একে তো তার দাদাজান তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে বিয়েতে রাজি করিয়েছে, তারওপর যে মেয়েটিকে দু’চোখে সহ্য করতে পারে না, আজ সেই মেয়েটিই কি-না তার বিয়ে করা বউ, আবার তারই ছাত্রী!! ব্যাপারটা হাস্যকর না?
আধার নিজের ভাগ্যের উপর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। সে যখনই ভাবে নিজের জীবনটা একটু গুছিয়ে নিবে, ঠিক তখনই কোনো না কোনো ঝড়, তুফান এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে যায়। তার নিষ্ঠুর ভাগ্যটা বড়ই অদ্ভুত। যেটা চায় না, সেটাই পায়! আর যেটা খুব করে চায়, সেটাই হারিয়ে যায় তার একাকীত্ব জীবন থেকে। আধার এসব ভেবে শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। অতঃপর একটু সময় নিয়ে গোসল ছেড়ে বেরিয়ে এল।
আলো নিজের মতো বকবক করতে করতে গলায় জড়ানো গহনাগাঁটি খুলতে ব্যস্ত। নিজের ভাগ্যকে দোষ দিবে নাকি নিজেকে দোষ দিবে বুঝতে পারল না। তবে দোষ তার নিজেরই! বিয়ে করবে, বিয়ে করবে বলে লাফাচ্ছিল সে। আর এখন বিয়ে করার পর সব লাফালাফি গাড়ির চাকার মতো পাম্চার হয়ে, ফুঁস করে সব হাওয়া বেরিয়ে গেল! সাথে বিয়ে করার শখও।
-“শা’লার কপাল আমার। কোথাই ভাবলাম বিয়ের পর লাল টুকটুকে সোয়ামির সাথে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করব, ঘুরবো-ফিরবো, শপিং করব, কোনো লেখাপড়ার ঝামেলা থাকবে না! কিন্তু নাহ, তা আর হলো কই? ঘাড়ে তো ওই বদমাইশ, বদমেজাজি, উজবুক, শালা বুইড়া স্যার জুটলো! উফফফ…..এখন ভার্সিটির মতো নিশ্চয়ই এখানেও জীবনটা জ্বা’লিয়ে খাবে। ধুর বা’ল ভাল্লাগেনা।”
আলো এইসব বিরবির করে পিছনে ফিরতেই ভুত দেখার মতো চমকে উঠে দুই পা পিছিয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করার ফলে ড্রেসিং টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে, ধপাস করে চিৎ হয়ে ফ্লোরে পড়ে গেল। লজ্জায় ম’রিম’রি অবস্থা মেয়েটার। শেষে কি-না বাসর ঘরে বরের সামনেই চিৎপটাং। ইশশশ….কি লজ্জার ব্যাপার-স্যাপার! ধ্যাৎ…
মেয়েটি মাথা নিচু করে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ায়। লজ্জায় পুরো চেহারা লাল স্ট্রবেরির মতো হয়ে আছে। মনে মনে নিজেকে ভয়ানক একটা গালি দিয়ে ভাবে, “আচ্ছা লোকটা কি সব কথা শুনে নিয়েছে তার?” ইয়া আল্লাহ, যদি তাই হয় তাহলে তার কপালে আজ দুঃখ আছে। আলো সামনে তাকিয়ে দেখে আধার স্যার ভ্রু কুঁচকে তার দিকেই চেয়ে আছে।
-“মুখের ভাষা ঠিক করো। নয়তো চড়িয়ে ঠিক করে দিবো, অসভ্য মেয়ে কোথাকার!”
একথা বলে আলোর পাশ কাটিয়ে ড্রিম লাইট জ্বা’লিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। মেয়েটা স্যার নামক বরের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে বিরবির করতে করতে নিজের কাজে মন দিল।
শরীরের সব গহনা খুলে পরণের লাল টুকটুকে জামদানী শাড়িটাও টেনেহিঁচড়ে খুলে সোফায় রেখে দেয়! তার আবার শাড়ি-টাড়ি পড়ার অভ্যেস নেই। বিয়ের জন্য খুব শখ করে পার্লারে গিয়ে টানা চার ঘন্টা ধরে সেজেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, নতুন বউয়ের মারাত্মক সৌন্দর্য দেখেই যেন বাসর ঘরে বর জ্ঞান হারায়! কিন্তু এখন বরকে দেখে নিজেরই জ্ঞান হারিয়ে উগান্ডায় চলে যেতে ইচ্ছে করছে। লোকটা মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন পুরুষ হলেও উনার শরীরে র’ক্তের চেয়ে অহংকার, জেদই বেশি। সরু নাকের ডগায় সবসময় ইগো লেগেই থাকে। তার মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করত—ওই স্যারনামক ইগোওয়ালা ড্রামের সুন্দর নাকের আগা চাপাতি দিয়ে কেটে দিতে। তাহলে হয়তো, একটু ভালো হত!
আলো এসব ভাবতে ভাবতে ব্যাগ থেকে টিশার্ট, প্লাজু বের করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। তার আজ মনমেজাজ একটুও ভালো নেই। কোথায় একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে বোঝাবে, এই বিয়েটা মেনে নেওয়ার জন্য! কিন্তু নাহ, উল্টো তারউপর-ই চিল্লাফাল্লা করছে। এই জন্যই বলে অতি আশা করতে নেই। নাহলে এইভাবেই মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। তাও স্যার ওরফে পঁচা গোবরের মধ্যেই!
ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে পিঠ পর্যন্ত কার্ল করা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। ওই লোকটার সাথে একই বিছানায় শোয়ার কোনো ইচ্ছে নেই তার। তবে, এর পিছনেও একটা কারণ রয়েছে। তার শুয়ে থাকার কোনো ছিঁড়ি নেই! ঘুমের ঘোরে মুখের থেকে হাতপা বেশি চলাচল করে। একবার তো ঘুমের মধ্যে তার কাজিনের নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল ঘুষি মে’রে। তারপর থেকে তার সাথে একি বিছানায় কেউ-ই থাকতে চায়না। বিশেষ করে তার ছোট বোন ছায়া। তার থেকে তিন বছরের ছোট হবে। এইবার ছায়া ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে আর সে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। যৌথ পরিবারের খুব আদরের সন্তান সে। বড় মেয়ে হয়েও ভীষণ চঞ্চল! আর হবেও না কেন? সবার এত এত ভালোবাসায় নিজেকে সবসময় খোলা আকাশের মুক্ত পাখি ভেবে এসেছে। যেটা মন চায়, সেটাই করে। আর যেটা করতে ইচ্ছে করবে না, সেটা অন্যরা হাজারবার বললেও করবে না। আফটার অল সে নিজ মর্জিতে চলতে বেশি পছন্দ করে। আর এটাই আজ তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াল! ভবিষ্যতে আরো কি কি দেখতে হবে, খোদা জানে। আলো এসব আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে যায়।
হঠাৎ করে মাঝরাতে কিছু ধপাস করে পড়ে যাওয়ার শব্দে আধারের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল এবং আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কোথায় থেকে শব্দটি এসেছে। ড্রিম লাইটের ঝাপসা আলোয় সবকিছু স্পষ্ট দেখতে না পেয়ে বিছানায় থেকে নেমে রুমের বড় লাইট অন করে দিল। ঠিক তখনই তার চোখ গেল, অদূরে সোফার নিচে সাদা টাইলসের মেঝেতে উবুড় হয়ে বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটির দিকে।
লাল প্লাজু হাঁটুর ওপর উঠেছে, সঙ্গে কালো টিশার্টও কোমরের উপর উঠে রয়েছে। ফলস্বরূপ, ফর্সা দুটো পা ও ধনুকের মতো বাঁকানো সাদা কোমর উন্মুক্ত হয়ে আছে। এই দৃশ্যটা দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল আধারের! এতো বড় দামড়ি মেয়ের ঘুমানোর স্টাইল দেখে অবাক না হয়ে পারল না। রীতিমতো তার হাসি পাচ্ছে। সোফায় থেকে ফ্লোরে পড়ে গেছে, অথচ ঘুম ভাঙ্গলো না ম্যাডামের।
আধার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নিচে পড়ে থাকা রমণীর পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। ঘুমন্ত মেয়েটির টিশার্ট ও প্লাজু ঠিক করে দিতে চেয়েও কিছু একটা ভেবে উঠে দাঁড়াল। পিছনে ফিরে বিছানার পাশে থাকা টি-টেবিলের উপর থেকে পানি ভর্তি জগটা নিয়ে এসে সব পানি রমণীর মাথার ওপর ঠাস করে ঢেলে দিল।
আচমকা এমন হওয়ায় মেয়েটি ভয় পেয়ে হুড়মুড় করে লাফ দিয়ে উঠে বসতে বসতে চেঁচিয়ে উঠলো,
-“বৃষ্টি, বৃষ্টি, বৃষ্টি! আমি ভিজে গেলাম বৃষ্টির পানিতে।”
পর মূহুর্তে ভাবল—বৃষ্টির পানি কই থেকে পরবে? সে তো রুমে শুয়ে আছে, তাহলে? আলো মনে মনে এসব ভেবে একহাতে মুখের পানি মুছে সামনে তাকাতেই ভরকে গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,,
-“পানি কেন দিয়েছেন?”
-“নিচে পড়ে গিয়েছিলে, তাই উঠানোর জন্য ঘুম ভাঙালাম!”
স্যারের সোজাসাপটা উত্তর শুনে আলো আহাম্মক,
হতবাক, হতবিহ্বল, নির্বাক হয়ে গেল। একজন ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য কি-না মুখে পানি ছুঁ’ড়ে মা’রবে? তাও এই মধ্য রাতে? এটা কোন ধরনের কথা?
#চলবে?
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_০২
-“আমার সাথে এমনটা কেন করলে দাদাজান? তুমি জানতে, আমি বিয়ে নামক বন্ধন থেকে নিজেকে কতটা দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। তবুও তোমার জন্য, শুধুমাত্র তোমার জন্য এই বিয়েটা করলাম। কারণ আমি চাইনি, আমার জন্য আমার দাদাজান কষ্ট পাক! তার শেষ ইচ্ছেটা অপূর্ণ থাক! কিন্তু তুমি কি করলে? আমার ডিপার্টমেন্টের ছাত্রীর সাথেই আমাকে বেঁধে দিলে? যাকে আমি একটুও পছন্দ করি না, অথচ আজ সে আমার ওয়াইফ! আমার ভাগ্যের উপর রীতিমতো হাসি পাচ্ছে। ট্রাস্ট মি দাদাজান! তোমার থেকে এমনটা কখনো আশা করেনি। দিনশেষে তুমি মানুষটাও আমাকে চিনলা না। এই অসহনীয় ব্যথা-টা কোথায় রাখি, বলো তো….দাদাজান?”
ভোররাতে সোবহান খান নামাজ আদায় করে বাগানে এসেছিলেন, হাঁটাহাঁটি করার জন্য। এটা উনার নিত্যদিনের অভ্যেস। সকালের শীতল বাতাসটা উনি গায়ে মাখাতে বেশ পছন্দ করেন। একই সঙ্গে বাগানে থাকা হরেকরকমের ফুল-ফল, ঔষধ গাছের ঘ্রাণ নিতেও খুব ভালোবাসেন। পাখিদের মিষ্টি সুরে গাওয়া গান, কিচিরমিচির শব্দও বেশ উপভোগ করেন। বলতে গেলে, মানুষটা একদম প্রকৃতি প্রেমি! পূর্বপুরুষদের ভিটা-জমি সব গ্রামে। উনার জন্ম গ্রামে হলেও পড়ালেখা ও চাকরির সুবাদে শহরে আসা। তারপরই এখানে চিরস্থায়ী হয়ে নতুন সংসার পাতা! মানুষটা আজও নিজের গ্রামে কাটানো কিশোরকাল বড্ড মিস করেন। বারবার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে ওই দূরে সবুজ, প্রাণখোলা গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু চাইলেই তো আর সব সম্ভব নয়! নিজের প্রিয়তমা হারিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সে বউমা, নাতি-পুতিকে আঁকড়ে ধরেই উনার বেঁচে থাকা।
বহুদিন পর আজ একমাত্র ছেলের কথা খুব মনে পড়ছিল সোবহান খানের। শিশিরে ভেজা, তাজা সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে আনমনে চেয়ে ছিলেন ওই দূর আকাশের দিকে। আজ যদি উনার ছেলে ও বড় বউমা বেঁচে থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হত। নিজের চোখে ছেলের বিয়ে, ছেলের বউ, নাতিপুতি, সংসার দেখতে পাওয়াটাও ভাগ্যের বিষয়। যেটা সব মানুষের থাকে না! ঠিক তেমনই উনার ছেলে ও বড় বউমার নেই। এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোবহান খান পিছনে ফিরতেই দেখতে পেলেন, তার বড় নাতি আধার খান গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কিছু বলার আগেই আধার একের পর এক অভিযোগ তুলে ধরল তার দাদাজানের কাছে। সবটা শুনে মোটেও চিন্তিত হলেন না সোবহান খান। হয়তো তিনি আগে থেকেই জানতেন, তার নাতি সাত সকাল এসে এমন কিছুই বলবে। কারণ তিনি কামই করেছে এমন! নাতির আহতভরা চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জানতে চাইলেন,
-“তুমি আমার নাতবউকে কেন পছন্দ করো না?”
দাদাজানের প্রশ্নের প্রতিত্তোরে জবাব দিল আধার,
-“কারণ ওই মেয়েটা একটা দস্যি! একদম বাঁচাল টাইপের। সবসময় এমন কিছু অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকবে, যেটা বিপরীত মানুষকে বিপদে ফেলে দেয়। কোথায় কি বলতে হয় সেটাও জানে না। মেয়ে মানুষের মুখের ভাষা এত বাজে হতে পারে সেটা ওই মেয়েটাকে না দেখলে জানতামই না। সাধারণ কনমসেন্স বলতেও কিছু নেই! এই তো, কয়েক মাস আগেই আমার সাবজেক্টে ডবল জিরো পেয়ে ফেল করেছে। অথচ খুশির ঠেলায় পুরো ডিপার্টমেন্ট মিষ্টি বিতাড়ন করেছে। ভার্সিটিতে গেলে সারাক্ষণ ধেইধেই করে ঘুরে বেড়ায়। সাথে নিজের মতো কয়েকটা পাগলকে জুটিয়ে গিটার নিয়ে কিচিরমিচির করতে থাকে। পুরো ভার্সিটিকে অতিষ্ঠ বানিয়ে রাখে। আর তুমি এমন মেয়েকেই আমার গলায় বেঁধে দিলে? ওই মেয়েটাকে তো পাবনায় রাখা উচিত ছিল। ডিজগাস্টিং একটা মেয়ে!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল আধার! ওই বেয়াদব মেয়েটার ঘটানো ইতিহাসের শেষ নেই। সবটা যদি বলতে শুরু করে তাহলে সকাল গড়িয়ে রাত হয়ে যাবে, তবুও মেয়েটার কুকীর্তিগুলো বলা শেষ হবে না।
সোবহান খান নাতির বলা অভিযোগ শুনে ঠোঁট চেপে হাসলেন। সেটা লক্ষ্য করে আধার গম্ভীর মুখে বলল,
-“আমি কোনো কৌতুক বলি নাই দাদাজান! আর না এখানে হাসার কোনো বিষয় রয়েছে। আ’ম সিরিয়াস!”
-“দেখো দাদুভাই! তুমি একটু বেশিই ভাবছো। মেয়েটা বাঁচাল না! ও খুব সহজসরল একজন মাইয়া। যেটা মনে আসে ওটাই বলে দেয়। এতে খারাপের কিছু দেখছি না তো! আমার নাতবউ চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে, আর তুমি তার উল্টোটা। তাই এমন রিয়াক্ট করছো। কিছুদিন একসাথে থাকো, সংসার করো, তারপর বুঝবা তোমার দাদাজান ক্যান এমনটা করছে।”
সোবহান খানের কথা শুনে আধারের কপাল কুঁচকে গেল। যেখানে সে ওই মেয়েটার সাথে এক মূহুর্তের জন্য থাকতে চাচ্ছে না, সেখানে কি-না সংসার করবে? তাও আবার ওই আধপাগল মেয়ের সাথে? অসম্ভব! সে এটা কিছুতেই করতে পারবে না।
-“দুঃখীত দাদাজান। তোমার এই কথাটা রাখতে পারব না। কারণ আমার ডিভোর্স চাই!”
নাতির মুখে ডিভোর্সের কথা শুনে সোবহান খান চমকে উঠলেন। তড়িঘড়ি করে কাছে এগিয়ে এসে বললেন,
-“এমন অলক্ষ্যে কথা বলতে নেই দাদুভাই। আমাদের সঙ্গে এখন একটি নতুন পরিবারও যোগ হয়েছে। তারা খুব আশা করে আমাদের ঘরে নিজেদের আদরের মেয়েকে দিয়েছে। নাতবউয়ের বাবা তো তাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়েই দিতে চাননি। অথচ আমার এক কথায় রাজি হয়ে নিজের কলিজার টুকরোকে দিয়েছে। আর সেখানে তুমি ডিভোর্সের কথা বলছো?”
-“হ্যাঁ বলছি! কারণ তুমি আর কোনো পথ খোলা রাখোনি দাদাজান।”
-“তাহলে আমার কথাও শুনে রাখো দাদুভাই! তুমি যদি আমার নাতবউরে ডিভোর্স দাও, তাহলে আমি এই বাড়ি ছাইড়া চইলা যামু।”
দাদাজানের কথা শুনে আধার দাঁত কিড়মিড় করল। এই বুড়োটা সবসময় তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে। তার ভালোবাসার মানুষ বলতে এই একজনই রয়েছে। তাই তো সবসময় বাধ্য হয়েই সবকিছু মেনে নেয়। চাইলেও সে তার দাদাজানকে হার্ট করতে পারে না। অথচ এই মানুষটাকে-ই আজ খুব অপরিচিত লাগছে তার কাছে।
-“চ-চা!”
পেছন থেকে চিকন মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে দাদা-নাতি দুজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আলো মাথায় এক হাত লম্বা ঘোমটা তুলে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লাল টুকটুকে মেহেদী রঙা দু’হাতে চায়ের ট্রে ধরে রেখেছে। পরণে সুতির সেলোয়ার-কামিজ! সোবহান খান আলোকে দেখে মুখে লম্বা একটা হাসি টেনে এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে বললেন,
-“এত সকালে উঠেছো কেন? আর রান্নাঘরেই বা কেন গিয়েছো?”
আলো মুখ তুলে ধীর কণ্ঠে বলল, -“ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আর ঘুম আসছিল না দাদু। তাই নামাজ পরে বাহিরে এলাম। আর আমি রান্নাঘরে যাইনি। এটা তো শেফালি চাচি নিয়ে আসছিল তোমার জন্য। উনার কাছ থেকেই আমি নিয়ে এলাম। তুমি তো জানো দাদু, আমি আবার রান্নাবান্না খুব একটা পারি না।”
শেষের কথাটা ফিসফিসিয়ে বলে আলো। সেটা শুনে সোবহান খান খুকখুক করে কেশে আড়চোখে নাতির দিকে তাকায়। আধার নিজের ফোনে ব্যস্ত! তার এইদিকে কোনো খেয়াল নেই। সোবহান খান কিছু না বলে নাতিবউয়ের হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে ধীর কণ্ঠে শুধালেন,
-“তোমার জামাইকে বলেছো নাকি, আমরা আগে থেকেই পরিচিত?”
আলো দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“না দাদু। এখনো বলিনি। তবে আমি তোমার উপর খুব অভিমান করেছি।”
-“কেন? আমি আবার কি করলাম?”
-“তুমি এত বড় একটা অঘটন ঘটিয়ে এখন বলছো, আমি আবার কি করলাম? মানে সিরিয়াসলি দাদু?”
সোবহান খান চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন,
-“আমি যা করেছি, তোমাদের ভালোর জন্যই।”
-“ভালো না ছাই। তুমি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এই হিটলার স্যারের সাথে বিয়ে দিয়েছো। আমি এখন বুঝতে পারছি, তুমি আগে কেন বলো-নি এই উজবুক ব্যাটা তোমার নাতি! যদি বলতে তাহলে আমি বিয়ের রাতে দেয়াল টপকে হলেও পালিয়ে যেতাম। তবুও তোমার বদমাইশ নাতির বউ হতাম না। তুমি এমনটা না করলেও পারতে দাদু।”
আলো গোমড়া মুখ করে তাকায়। সে এই মানুষটাকে বিশ্বাস করেছিল। সাথে খুব ভালোও বাসে, একদম নিজের দাদার মতোই। কখনো সে দাদা-দাদির, নানা-নানির ভালোবাসা পায়নি। এই মানুষটার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে পরিচিত হওয়ার পর থেকেই দাদার ভালোবাসা কেমন, সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাই তো খুব কম সময়ের মধ্যে মানুষটার সাথে মিশে গেছে। যখন জানতে পারল, এই মানুষটার নাতবউ হতে চলেছে, তখন সে খুশিতে প্রায় কেঁদে দিয়েছিল। কারণ সে কখনোই চায়নি এই মানুষটার এত ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হোক। তারওপর নিজেরও বিয়ে করার খুব শখ ছিল। আর এত ভালো একটা মানুষের নাতবউ হতে পারাটাও ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। তাই তো নাচতে নাচতে রাজি হয়ে গিয়েছিল বিয়ের জন্য। সাথে মানুষটার মিষ্টি মিষ্টি কথা তো ছিলই! কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে, কঁচু গাছের সাথে ফাঁ’সি দিতে। নাচতে নাচতে বিয়ে করার মজা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
সোবহান খান আর কথা বাড়ালেন না। বরং নাতবউকে ইশারা করে বললেন, -“যাও, যাও! তোমার স্বামীজানকে গিয়ে চা দাও। নয়তো ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
আলো হাতে থাকা চায়ের দিকে তাকায়। এটা সে নিজের জন্য এনেছিল। একটুও ইচ্ছে করছে না ওই লোকটাকে দিতে। রাতে কি নিষ্ঠুরভাবে তাকে ভিজিয়ে দিয়েছিল। এখন তো মন বলছে, এই গরম চা স্যারের মাথার ওপর ঢেলে দিতে। তাহলে একটু ভালো লাগত। তবে আপাতত গুরুজনের কথাই শুনলো। আলো মাথা নাড়িয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার স্বামীর দিকে।
আধার ফোনে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে, সে খেয়ালই করেনি পিছনে আলো এসে সবে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটি মাথা নিচু রেখেই দু’হাতে ট্রে বাড়িয়ে দিয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, তখনই আধার হুট করে পিছনে ঘুরে সামনে পা বাড়ায়! সঙ্গে সঙ্গে আলোর সাথে ধাক্কা লেগে যায়। ফলস্বরূপ গরম চায়ের কাপ এসে সোজা আধারের জায়গা মতো পড়ে গেল।
-“শীট!”
আধার চেঁচিয়ে ওঠে। হঠাৎ করে এমন হওয়ায় আলো হতভম্ব হয়ে যায়। একই সাথে ভয়ও পেল খুব। এই না আবার তাকে থাপ্পড় মে’রে দেয়। তাই চটজলদি হাঁটু গেড়ে বসে, নিজের ওড়নার অংশ টেনে আধারের ভিজে যাওয়া জায়গা মুছে দিতে দিতে অস্থির গলায় বলে উঠলো,
-“স-সরি, সরি স্যার! আমি খুব সরি। আসলে বুঝতে পারিনি এমনটা হয়ে যাবে। প্লিজ রাগ করবেন না। স-সরি!”
আধার দাঁতে দাঁত পিষে দাদাজানের দিকে তাকায়। যে কি-না এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখা মাত্রই উল্টো পথ ধরে, বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতর যেতে শুরু করেছে। আধার চোখ বুজে লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। এবং খপ করে একহাতে মেয়েটার হাত চেপে ধরে হিসহিসালো,
-“মিস কালো? আপনি আমার কোথায় হাত রেখেছেন, সেটা একবার খেয়াল করুন।”
স্যারের কথা শুনে আলোর হুঁশ ফিরে এল। সে বড়বড় চোখে সামনে তাকিয়ে চট করে নিজের দু’হাত সরিয়ে নিলো। তারপর আর কোনোদিকে না তাকিয়ে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরেই দৌড়ে চলে গেল। ছিঃ! ছিঃ! সে সাত সকাল কামটা করল কি? সোজা স্যারের…..! আস্তাগফিরুল্লাহ! তওবা, তওবা৷ আলো তুই আর জীবনেও ভালো হলি না। ছিহহহহ্!
#চলবে

