#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৩৩
কেটেছে মাসের পর মাস! পাল্টেছে সবকিছুই। তবুও কাছের মানুষদের ভুলতে পারেনি কেউ-ই৷ অনাকাঙ্ক্ষিত এক্সিডেন্টে রহিত, মেঘলার মৃ’ত্যু ও আলোর কোমায় চলে যাওয়ার প্রভাব ভালোই পড়েছে দুই পরিবারে। মেঘলার বাবা মেয়ের মৃ’ত্যু সইতে না পেরে তিনিও ইন্তেকাল করেছেন বহু আগেই। মাহিন কোনোমতে নিজের মাকে নিয়ে অন্য শহরে গিয়ে থাকছে। নয়তো স্বামী, মেয়ের স্মৃতিতে তিনিও শেষ হয়ে যাবেন। ওইদিনের এক্সিডেন্টের পর আধার পুলিশের সাহায্য নিয়ে মাতাল ট্রাকচালক-কে ধরে জেলে ভরেছে। সাথে তিনজন মানুষের জীবন নষ্ট করার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থাও করেছে। এদের মতো কিছু কিছু লোক নেশাগ্রস্ত হয়ে যানবাহন চালিয়ে, অন্যকে মৃ’ত্যুর দুয়ারে পাঠিয়ে দেয়। এমন মানুষদেরকে তো ওই যানবাহন দিয়েই চাপা দেওয়া উচিত। শুধু শুধু নিজেদের গাফিলতির কারনে অন্যের প্রাণ কেঁড়ে নেয়!
মাহবুব রহমান ও নীলিমা রহমান বুকে পাথর চেপে রেখে নিজেদের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছেন। তবে ছেলেকে হারিয়ে উনারাও ভালো নেই। ছায়া, মায়া চেষ্টা করছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার! কিন্তু পারছে না৷ খারাপ মূহুর্তগুলো বারবার মনে এসে হানা দিয়ে, ক্ষতস্থান তাজা করে দেয়। তারা কতদিন যে স্কুল-কলেজে যায়নি, সেটার হিসাব নেই। এইতো গত তিন মাস আগে থেকে যেতে শুরু করেছে। মতিউর রহমান ও আলেয়া রহমান কোনোমতে নিজেদেরকে শক্ত করে রেখেছেন। নয়তো পরিবারকে সামলাবে কিভাবে? সবাই যদি এইভাবে ভেঙে পড়ে, তাহলে কি করে চলবে?
হাসপাতালে সবাই মিলে সপ্তাহে একবার করে আলোকে দেখতে যায়। সময়ের সাথে সাথে মেয়েটার শরীরের সব ক্ষতস্থান মিশে গেলেও কখনো চোখ মেলে তাকায়নি। আর না একটু নড়াচড়া করেছে। কেমন পুতুলের ন্যায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকে৷ মাঝেমধ্যে চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রুও পড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে যখন তার কাছে পঁচা আধার স্যার থাকে, তখন! মানুষটা দিনের বেলা না থাকতে পারলেও সারারাত থাকে। এই কয়েক মাসের মধ্যে একবারের জন্যও খান বাড়িতে রাত কাটায়নি। সবসময় হাসপাতালে অর্ধাঙ্গিনীর পাশের বেডে থেকেছে। কখনো কখনো মেয়েটাকে দেখতে দেখতে পুরো রাতও পার করে দেয়। খুব ইচ্ছে করলে, মেয়েটার বুকে মাথা রেখে চুপটি করে থাকে।
আধারের মধ্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। সে আগের থেকেও বেশি গম্ভীর হয়ে গেছে, সাথে ক্ষিপ্তও হয়েছে। কেউ কিছু বললেই সে ছাৎ করে উঠে। দাদাজান ও শশুর বাড়ির লোক ব্যতীত কারোর সাথেই ঠিকমতো কথা বলে না। এমনকি ভার্সিটিতেও সে অনেক স্ট্রিট হয়ে গেছে! কেউ পড়ায় অমনোযোগী হলে বা পরীক্ষার সময় উঁকিঝুঁকি মে’রে দেখার চেষ্টা করলে, সোজা ফেল করে দেয়৷ সাথে কঠিন কঠিন বাক্য তো রয়েছেই। আগের থেকেও বেশি এখন সকল স্টুডেন্ট স্যারকে ভীষণ ভয় পায়। আলোর বন্ধুমহলদের কিছু জানানো হয়নি। তারা খোঁজ নিলে বলা হয়েছে, আলো তার স্বামীর কাছে গিয়েছে কয়েকমাসের জন্য। শুধু শুধু ছেলে-মেয়েদের কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। এতে পড়ালেখার ক্ষতি হবে।
আজকাল ভার্সিটিতেও থাকতে ইচ্ছে করে না আধারের। কারণ যেখানেই তাকায়, সেখানেই মেয়েটার স্মৃতি মনে পড়ে। এই যে, প্রতিদিন ক্লাসে প্রবেশ করা মাত্রই সে লাস্ট বেঞ্চের দিকে তাকায়। মেয়েটা ওখানে বসে থেকে বান্ধবীদের সাথে ফাসুরফুসুর করত, আর তার বকা শুনত। বাগানে গেলে মনে হয়, মেয়েটা তার চোখের সামনে ফুল চুরি করার চেষ্টা করছে। ক্যাম্পাসের দিকে তাকালে শুনতে পায়, মেয়েটা গিটার নিয়ে গান গাইছে। সে কতবার যে আড়াল থেকে মেয়েটার মিষ্টি কণ্ঠের গান শুনেছে, তার কোনো হিসেব নেই। কফি খেতে খেতে পাঁচ তলা থেকে আর মেয়েটাকে খিলখিল করে হাসতে দেখা যায় না। এই পুরো ভার্সিটিতে মেয়েটার কতশত স্মৃতি রয়েছে। অথচ আজ সেই উড়ন্ত পাখিটাই নেই!
আধার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখে চশমা পড়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎই কিছু একটা দেখে পা জোড়া শ্লথ হয়ে গেল। একটা মেয়ের চুলের বিনুনি চেপে ধরে আছে এক ছেলে। মেয়েটা নিজের বিনুনি ধরে টানাটানি করছে, আর ছেলেটাকে বকছে। এই দৃশ্যটা দেখে আধার আনমনে হাসল। সেও তো তার বউয়ের মাথার চুল ধরে টানাটানি করত। মেয়েটাকে বিরক্ত করতে, তার আলাদাই মজা লাগত। আর এখন সে প্রতিটা মূহুর্তে সবকিছু মিস করে! হয়তো একটু বেশিই।
ভার্সিটি শেষে সন্ধ্যার দিকে একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে হাসপাতালে যায় আধার। সোবহান খানও মাঝেমধ্যে তার নাতবউকে দেখতে আসেন এবং গল্প করে যান। উনার সাথে কয়েকবার তাহমিনা খানও এসেছিলেন। তিথি বাড়িতে আসলেই আগে হাসপাতালে আসে। তারপর ভাবীর সাথে একা একা বকবক করে সময় কাটায়। রাত কয়েকবার এসেছিল, তবে বড় ভাইয়ের অবর্তমানে! এই খবরটা একদিন কানে যাওয়ার পর আধার নার্সের সাথে রাগারাগি করেছিল। কারণ সে সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিল, আলোর কেবিনে সে ব্যতীত অন্য পুরুষ যেন না প্রবেশ করে। এমনকি সে লেডি ডক্টরের অধীনে মেয়েটাকে রেখেছে।
ভিআইপি ডাবল বেডের কেবিনসহ দুজন নার্সকে নিয়েছে। যেন তারা সারাদিন মেয়েটার পাশে থেকে দেখাশোনা করে। এর জন্য প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকাও দেয়! অথচ তার কথায় খেলাপ করেছে। নার্সরা নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে, পরবর্তীতে আর এমন হবে না বলে জানায়! আধার তখন শেষ বারের মতো একটা সুযোগ দেয়। তারপর থেকে শুধু আলোর বাবা, চাচা ও দাদাজান ব্যতীত কোনো পুরুষকে ঢুকতে দেয়নি।
আধার কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। দুজন নার্স তাকে দেখে চুপচাপ বেড়িয়ে গেল। আধার এগিয়ে এসে বেডের পাশে টি-টেবিলের ওপর রাখা, ফুলদানি থেকে আগের ফুল বের করে তাজা গোলাপগুলো রেখে দেয়। তারপর অর্ধাঙ্গিনীর কাছে বসে, ঝুঁকে এসে পুরো চেহারায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে দিল এবং শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের কোণে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,
-“আমাকে মিস করছিলে? উমম…আমি তোমাকে বড্ড মিস করছিলাম।”
মেয়েটার কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে তো নিথর হয়ে শুয়ে আছে বেডে। পরণের হাসপাতালের পোশাক, কোমর পর্যন্ত পাতলা চাদরটা টেনে দেওয়া! একহাতে স্যালাইন চলছে। পুরো নিস্তব্ধ রুমের মধ্যে শুধু হার্টবিট মাপার মেশিন থেকে বিপ..বিপ.. শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে। আধার মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আর কত মাস এইভাবে শুয়ে থাকবে? পাঁচটা মাস কি বেশি নয়? এইবার তো উঠে পড়ো মিস. কালো। আমাকে অনেক শাস্তি দিয়েছো, আর দিও না! আমি যে আর সইতে পারছি না। আমাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব আমাকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছে। আমি তোমাকে চাই, খুব করে তোমাকে চাই!”
আধার কিছুক্ষণ আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বুকের ওপর মাথা রাখল। তারপর আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে, শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চোখদুটো বুঁজে অস্ফুটস্বরে বিরবির করে বলল,
-“আপনার স্বামী আপনাকে ছাড়া ভালো নেই, মিসেস খান! একটুও ভালো নেই। এই পঁচা আমিটার জন্য হলেও ফিরে আসুন। নয়তো দেখা যাবে, আপনার বিরহে আমি-ই দম আঁটকে ম’রে যাবো। তখন আপনি আবার বলবেন, নিজের বউকে ছেড়ে পালিয়ে গেছি। অথচ এই আপনিটাই আমাকে ছেড়ে এখানে দিব্যি ঘুমিয়ে আছেন। এতে যে আমার কষ্ট হয়, বড্ড বেশি কষ্ট হয়, মিসেস খান! আপনার কী কষ্ট হচ্ছে না?”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“জান? তুমি কি আমাকে অনুভব করতে পারছো? নাকি ভুলে গেছো?”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারো ডেকে উঠল,
-“জান…? আমার ডাকে সাড়া দিবে না?”
প্রতিত্তোরে কিছু শুনতে পেল না আধার। শুধু বুক চিঁড়ে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস! একই সাথে আলোর বন্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা নোনা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ল।
———————————-
আজ শুক্রবার হওয়ায় আধার বাড়িতে এল। সে প্রতি সপ্তাহে একবার করে আসে, দাদাজানের জন্য। আবার বিকেলে নয়তো সন্ধ্যায় ফিরে যায় হাসপাতালে। আলোর টুনা, টুনি ছায়াকে দিয়েছে। কারণ এখানে তাদের খেয়াল রাখার মানুষ নেই। শেফালি চাচি রান্নাঘর নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আবার তিনি রাতে চলে যান। একবার তো খবর পেয়েছিল, তাহমিনা খান বাচ্চাদের মে’রেছে। উনার রুমে ঢুকে নাকি বিরক্ত করছিল। এটা শোনা মাত্রই দু’জনকে রহমান বাড়িতে রেখে এসেছে। কারণ সে চায় না, তার প্রিয় মানুষটির শখের জিনিসের কিছু হোক। আর তার বিশ্বাস আছে, ছায়া কখনোই তার আপুর শখের জিনিসকে অবহেলা করবে না। তার আর মায়ার কাছেও দুটো খরগোশের ছানা রয়েছে। ওদের সাথেই থাকছে আর সময়ের সাথে সাথে বড় হচ্ছে।
আধার ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে দেখল, সোফায় তাহমিনা খান, সোবহান খান ও একজন ঘটক বসে আছে। আধার বেশি মাথা ঘামাল না, হতে পারে তাহমিনা উনার ছেলের জন্য মেয়ে দেখছে। নয়তো মেয়ের জন্য পাত্র দেখছে। সে এখন আর খুব বেশি এই পরিবারের মধ্যে নাক গলায় না। নিজেকে বড্ড দূরে সরিয়ে নিয়েছে! কারণ আজকাল তার সবকিছুই অসহ্য লাগে৷ ইচ্ছে করে সারাক্ষণ ওই মেয়েটার কাছে গিয়ে বসে থাকতে। দিনশেষে ওইটাই তার শান্তির জায়গা।
-“দাদুভাই? নাতবউ কেমন আছে?”
দাদাজানের কথায় আধার মাথার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে বিরবির করে বলল,
-“হু, আমাকে ছেড়ে তোমার নাতবউ ভালোই আছে।”
সোবহান খান দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বড় নাতির মলিন মুখটা দেখলে তার খুব কষ্ট হয়। ছেলেটা কি খায়, না খায় কিচ্ছুটি জানে না। সপ্তাহে একবার করে এখানে এলে সে কোনোমতে একটু খাবার নিজ হাতে জোর করে খাইয়ে দেয়। এই কয়েকমাসে আধার অনেকটাই শুকিয়েছে। কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছে, সেটারও হিসেব নেই। হৃদয়টা ক্ষতবিক্ষত হলেও বাহিরে ঠিকই নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করে। অথচ ছেলেটা আগের থেকেও বেশি ছন্নছাড়া হয়ে গেছে।
আধার শার্টের দুটো বোতাম খুলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় পিছন থেকে তাহমিনা খান ডেকে উঠলেন,
-“তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা রয়েছে।”
আধার পিছনে না তাকিয়েই বলল,
-“বলুন!”
-“আর কতদিন এইভাবে থাকবে? নিজের ভবিষ্যতের কথা একবার চিন্তা করছো?”
-“আমি এইভাবেই ঠিক আছি।”
-“তুমি ঠিক থাকলেও এই সংসার ঠিক নেই। এ বাড়িতে বউমাদের প্রয়োজন।”
-“আপনার ছেলেকে বিয়ে দিয়ে বউ নিয়ে আসুন। এতে বাঁধা দিয়েছে কে?”
-“রাত সবে নিজের ক্যারিয়ারের দিকে মন দিয়েছে, আর ও এখন বিয়ে করতে চায় না। তাই তোমার জন্য মেয়ে দেখছি!”
আধার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
-“আমার জন্য মেয়ে দেখছেন মানে? আপনি কী ভুলে গিয়েছেন, আমি একজন বিবাহিত পুরুষ?”
-“ওই জীবন্ত লা’শের জন্য আর কত অপেক্ষা করবে? যদি কখনো ফিরে না আসে, তখন?”
আধারের চোয়াল শক্ত হলো৷ সে এগিয়ে এসে কাঁচের টি-টেবিল তুলে ফ্লোরের মাঝে এক আছাড় মা’রল। সঙ্গে সঙ্গে কাঁচগুলো ভেঙে চারপাশে ছড়িয়ে, ছিটিয়ে পড়ল। তাহমিনা খান ও ঘটক সাহেব চমকে উঠে দাঁড়ালেও সোবহান খান চুপচাপ বসে থাকল। কারণ তিনি আগে থেকেই জানতেন এমন কিছু হবে।
-“আমার বউ শুধু কোমায় আছে, ও ম’রে যায়নি! আর এতই যদি বিয়ের শখ, তাহলে আপনি বিয়ে করুন না? আপনার সো কোল্ড স্বামী তো কবেই মা’রা গেছে।”
আধার দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলে উঠল। তাহমিনা খান চিল্লিয়ে উঠে বললেন,
-“তুমি কী বলছো, একবার ভেবে বলছো? আমি কেন বিয়ে করব? আমি তোমার বাবাকে ভালোবাসি। উনাকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে ভাবতেই পারি না।”
-“তাহলে আমাকে কোন মুখে বিয়ে করতে বলছেন? একটুও বিবেকে বাঁধল না? আপনি যেমন আপনার স্বামীকে ভালোবাসেন, তেমন আমিও আমার বউকে ভালোবাসি। তার জন্য শুধু এই ক’টা মাস কেন? বছরের পর বছরও আমি অপেক্ষা করতে প্রস্তুত। এই অপেক্ষা করতে করতে যদি বুড়োও হতে হয়, তাহলেও আই ডোন্ট কেয়ার! নেক্সট টাইম আমাকে কিছু বলার আগে দশবার ভেবে নিবেন।”
কথাগুলো বলে আধার হনহনিয়ে দোতলায় উঠে গেল। কিছু একটা ভেবে হঠাৎই থেমে গিয়ে, নিচে তাকিয়ে ঘটকের উদ্দেশ্যে বলল,
-“এই যে ঘটক মশাই? আপনি এখান থেকে যাবেন নাকি ডাইনিং টেবিল আপনার মাথায় ভাঙব?”
এহেন কথা শুনে ঘটক সাহেব শুকনো ঢোক গিলে তড়িঘড়ি করে ছবিগুলো নিজের পোটলার মধ্যে ঢুকিয়ে চলে গেল।
-“আপনি দেখলেন বাবা? আপনার বড় নাতি দিনদিন কতটা বেয়াদব হচ্ছে?”
সোবহান খান শান্ত গলায় বললেন,
-“আমি তোমাকে আগেই মানা করেছিলাম এমনটা না করতে। ছেলেটা সারাক্ষণ সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে। একটু ভালো কথা বললেও ছাৎ করে উঠে। আর রাগের কথা তো না-ই বললাম। ও আজকাল আমার সাথেও ঠিকমতো কথা বলে না। আমার নাতিটা এখন ভালো নেই ছোট বউমা! ও যে পরিস্থিতিতে রয়েছে সেখানে, এমন অদ্ভুত ব্যবহার করা কী অস্বাভাবিক কিছু? ও আগে থেকেই অদ্ভুত ছিল, শুধু ধৈর্য্য ধরে থাকত। কিন্তু এখন তার ধৈর্য্য নেই বললেই চলে। তাই এমন বদমেজাজির হয়ে গেছে। তুমি সবকিছু জেনেশুনেও যদি ক্ষিপ্ত সাপের লেজ ধরে টানাটানি করো, তাহলে তো ছোবল খেতেই হবে। তাই বলছি, এখনো সময় আছে, নিজেকে শুধরে নাও! নয়তো ভবিষ্যতে অনেক পস্তাবে।”
কথাগুলো বলে সোবহান খান সেখান থেকে চলে যান। আর তাহমিনা খান রাগে ফুঁসতে থাকলেন!
আধার লম্বা শাওয়ার নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে সিগারেট ফুঁকছে। এটা সাড়ে চারমাস ধরে খাওয়া শুরু করেছে। তবে খুব একটা বেশি খায় না, যখন মন খারাপ বা অতিরিক্ত কষ্ট অনুভব করে, তখন খায়। কিন্তু আজকে কেন জানি সিগারেট টানতেও ভালো লাগছে না। সে নাকমুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে, আগুন নিভিয়ে নিচে ছুঁড়ে মা’রল। তারপর খোলা নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠল,
-“আধার খান যখন একবার কাউকে ভালোবেসে ফেলেছে, তখন শেষ নিঃশ্বাস অবধি তাকেই ভালোবেসে যাবে! তুমি চাইলেও আমি তাকে ছাড়ব না। বরং—আমিও দেখি, তুমি আর কতদিন আমার ভালোবাসার পরীক্ষা নাও।”
#চলবে
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৩৪
(পর্ব নতুন করে সংশোধন করা হয়েছে)
*
*
*
সময়ের স্রোতের সাথে বয়ে চলেছে সবার জীবন। আজ রহিত ও মেঘলার মৃ ত্যুর একবছর পূর্ণ হলো। শুধু তিন দিনের তফাৎ। এমনই একটা সময়ে দুজন নর-নারী এ পৃথিবী ছেড়ে ওই দূর আকাশের বাসিন্দা হয়েছে। সময় কখনো থেমে থাকে না, আর না কারোর জীবন আঁটকে থাকে। সময়ের সাথে সাথে সবাই নিজ নিজ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। তবে মনের গহীনে এখনো ছেলে-মেয়ে দুটো জীবিত আছে। হয়তো সারাজীবন থাকবে।
আজ দাদা-নাতি মিলে সেলুনে এসেছে। মূলত সোবহান খানই বড় নাতিকে টেনেটুনে নিয়ে এলেন। ছেলেটা দিন দিন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। চুল, দাঁড়ি বড় বড় হয়ে গেছে। অথচ ছেলেটার কাটার নাম নেই! আধার চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো চুল, দাঁড়ি কেটে নিল। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে দাদাজানের উদ্দেশ্যে বলল,
-“এখন শান্তি হয়েছে তোমার?”
সোবহান খান পাশের চেয়ারে বসে ছিলেন। নাতিকে দেখতে দেখতে বললেন,
-“মাত্র এক বছরেই নিজের এই হাল করেছো! আর বাকীগুলো বছরে কী করবে? তখন তো তোমাকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
-“খু্ঁজে না পেলে, হারিকেন দিয়ে খুঁজে নিও।”
-“তা আজও কী হাসপাতালে থাকবে?”
-“এর আগে বাড়িতে থেকেছি?”
-“হাসপাতালে থাকলে তুমি ঘুমাতে চাও না। নার্সরা আমাকে বলেছে, তুমি বেশিরভাগই রাত জেগে বসে থাকো।”
-“ঘুমাতে ভালো লাগে না, তাই ঘুমাই না।”
-“তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি, দাদুভাই! কিন্তু…তুমি যদি নিজের খেয়াল না রাখো, তাহলে কীভাবে চলবে বলো তো? নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লে, নিজের বউয়ের সেবা করবে কীভাবে?”
-“ঠিক আছে, নিজের খেয়াল রাখার চেষ্টা করব। এখন জ্ঞান না দিয়ে চলো। তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি আমার বউয়ের কাছে যাবো।”
-“বাড়িতে গিয়ে আগে গোসল করবে, খাওয়াদাওয়া করবে, তারপর বউয়ের কাছে যাবে। এর আগে নয়!”
আধার বিল পে করে, সেলুন থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বিরবির করে বলল,
-“আগে যখন বউয়ের কাছে যেতাম না, তখন আমাকে বলতে বউয়ের কাছে যেতে। আর এখন যখন বউয়ের কাছে যেতে চাচ্ছি, তখন এই বুড়ো তুমিটাই আমাকে বাঁধা দিচ্ছো। দিজ ইজ নট ফেয়ার, দাদাজান!”
সোবহান খান হেঁসে নাতির কাঁধ চাপড়িয়ে বললেন,
-“এইজন্যই বলে—সময় থাকতে প্রিয় মানুষটিকে মূল দিতে শেখো।”
আধার আর কিছু না বলে দাদাজানকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে, তখনই তার নজরে এল একটা কসমেটিকের দোকান। যেখানে ছোট থেকে বড় অনেকগুলো পুতুল রয়েছে৷ সাথে আরো অনেক কিছু আছে।
-“একটু ওয়েট করো দাদাজান, আমি আসছি।”
আধার গাড়ি থেকে নেমে সোজা দোকানের ভেতর ঢুকে গেল। একটু সময় নিয়ে একটা পান্ডা, ডোরেমান, বাঁদর ও আকাশি রঙা একটা বড় পুতুল নিল। টাকা দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গাড়ির ব্যাক সিটের ওপর রেখে দিয়ে, ড্রাইভিং সিটে বসল।
-“এখনো বাপই হতে পারলে না, এর আগেই খেলনা নিতে শুরু করেছো?”
দাদাজানের কথা শুনে আধার ড্রাইভ করতে করতে বলল,
-“ওগুলো আমার বেবিদের জন্য নয়, আমার বউয়ের জন্য।”
দাদাজান মনে মনে হাসলেন। তারপর হেয়ালি কণ্ঠে বললেন,
-“আমি আবার কাকে কি বলছি? তুমি তো আগেই বলে দিয়েছো, আমাকে তোমার সন্তানদের মুখ দেখাবে না। আর না নিজে বাচ্চা পয়দা করবে! সারাজীবন এই সিঙ্গেলদের মতোই থাকো। শুধু শুধু মেয়েটাকে তোমার মতো নিরামিষের সাথে বিয়ে দিয়ে জীবনটা নষ্ট করেছি। আমার নাতবউ ফিরে এলে, তাকে সুন্দর দেখে একটা রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দিবো। তখন তুমি থাইকো, দেবদাস হয়ে!”
আধারের কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু বলল না! শুধু বিরবির করে এইটুকু বলল,
-“আমার বউকে সুস্থ হয়ে ফিরতে দাও। তারপর খান বাড়িতে বাচ্চা দিয়ে ভরিয়ে দিবো৷ তখন আমিও দেখব, তুমি এই বুইড়া বয়সে কত বাচ্চাদের পালতে পারো।”
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আধার বাড়ি থেকে গোসল নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। সোবহান খান খাবার খেতে বললেও সে খায়নি। কোনোমতে নিজেকে ঠিকঠাক করে বউয়ের কাছে ছুটেছে। সে প্রতিদিনই যাওয়ার পথে একগুচ্ছ করে হরেকরকমের ফুল নিয়ে যায়। আজও সেটার ব্যতিক্রম হলো না। সে ফুল হাতে নিয়ে কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই থমকে গেল। কারণ আলোর চোখদুটো খোলা!
আধার ঠোঁট কামড়ে এলোমেলো পায়ে এগিয়ে এল। লেডি ডক্টর আলোকে চেক-আপ করছেন! আর নার্সকে কি যেন বলছেন। তাকে দেখে ভদ্রমহিলা মুচকি হেঁসে বললেন,
-“ফাইনালি আপনার ওয়াইফের জ্ঞান ফিরেছে। এখন উনার সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায়।”
আধার এখনো একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না, তার আলো কোমা থেকে ফিরে এসেছে। সে কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে ফুলগুলো টি-টেবিলের ওপর রেখে বেডের পাশে বসল। আলোর একহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“অনুভব করতে পারছো আমায়?”
আলোর মুখে কথা নেই। সে শুধু তাকিয়ে আছে। আধার অধৈর্য্যের মতো ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল,
-“ও কথা বলছে না কেন?”
-“রিল্যাক্স মিস্টার খান। আপনার ওয়াইফের জ্ঞান ফিরে এলেও উনি এখন পুরোপুরি সুস্থ নয়। কথা বলা থেকে শুরু করে নড়াচড়া, হাঁটাচলা সবকিছু করতে সময় লাগবে। এবং এটাও জানতে হবে উনার স্মৃতিশক্তি ঠিক আছে কি-না। তারজন্য সময় প্রয়োজন!”
ডাক্তারের বলা কথাগুলো আধার বুঝল। এবং মনে মনে খুব করে চাইল মেয়েটা যেন নিজের স্মৃতি ভুলে না যায়। নয়তো সে আরো ভেঙে পড়বে। ডাক্তার নার্সকে ঔষধের কিছু নাম বলে সেখান থেকে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর নার্সও বেরিয়ে গেল। আধার আরো কাছে এগিয়ে এসে আলোর মলিন চেহারার ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বিরবির করে বলল,
-“জলদি সুস্থ হয়ে আমার কাছে ফিরে এসো জান। আমি আর এই দূরত্ব সইতে পারছি না!”
————————————
কেটেছে আরো ছয় মাস! আলো কোমা থেকে ফিরে আসার পর পরিবারের সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। এবং ওইদিন রাতেই সবাই মিলে মেয়েটাকে দেখতে এসেছিল। তারপর থেকে নানান চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে মেয়েটাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ করার জন্য।
আলোকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে
বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের অধীনে রেখে নিয়মিত ব্যায়াম পেশির শক্তি ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা হয়েছে। এবং অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপিও দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ধৈর্য ও পুষ্টির দরকার ছিল! যা সম্পূর্ণভাবে আলোকে দিয়ে সুস্থ করা হয়েছে। সে আপাতত এখন মোটামুটি সুস্থ। তবে কোমা থেকে বেরোনোর পর স্মৃতিশক্তি হারায়নি মেয়েটা।
আধার ভার্সিটি শেষে সন্ধ্যার দিকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে আসে। এবং এখানে এসে জানতে পারে আলোকে নিয়ে তার পরিবার চলে গিয়েছে। এটা শোনার পর কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে অনেক আগে থেকেই খেয়াল করেছিল, মেয়েটা আজকাল তার কাছে থাকতে চায় না। সবসময় দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আলো অসুস্থ হওয়ায় সে কোনোরকম চাপ দেয়নি, বরং মেয়েটা যেভাবে থাকতে চেয়েছে সে ওইভাবেই থাকতে দিয়েছে। নিজের কষ্ট হলেও একটু বুঝতে দেয়নি। মনকে কোনোমতে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে রেখেছে। সে এসব ভেবে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই নার্স বলে উঠল,
একটু থেমে মুচকি হেঁসে পুনরায় বলল,
-“ম্যাম অনেক ভাগ্যবতী, আপনাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে। আপনি যতটা কষ্ট করেছেন, তেমন কষ্ট হয়তো আর কেউ করতে পারত না। আপনি সত্যিই একজন বেস্ট হাসব্যান্ড! দোয়া করি, আপনারা সারাজীবন এইভাবেই একে অপরের পাশে থাকুন।”
আধার দাঁড়ায় না। রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আনমনে বলে উঠল,
-“আপনি ভুল! আমি বেস্ট হাসব্যান্ড নই। আমি খুব, খুউউব খারাপ হাসব্যান্ড। যাকে কখনোই ভালোবাসা যায় না, বরং দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঠিক আজ যেমনটা হয়েছে।”
এতদিন পর নিজ বাড়িতে ফিরে আলো কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে ছিল। তার জীবন থেকে যে এইভাবে দেড় বছর চলে যাবে, সেটা কখনোই কল্পনাও করেনি। সাথে এটাও ভাবতে পারেনি, তাদের মাঝে আর রহিত, মেঘলা নেই।
বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই আলোর সর্বপ্রথম চোখ যায় বাগানে থাকা দুটো কবরের দিকে৷ এবং মূহুর্তেই ছুটে এসে কবর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। এমনটা কেন হলো? এমন হওয়ার তো কথা ছিল না? তাদের দুজনের তো সুখে, শান্তিতে সংসার করার কথা ছিল! তাহলে কেন আজ তারা এইভাবে দূর আকাশে পালিয়ে গেল? তার মতোই না-হয় কোমায় যেত, তবুও কেন তাদেরকে ছেড়ে সারাজীবনের জন্য চলে গেল? তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েও অপূর্ণই রয়ে গেল! মেয়েটার কত স্বপ্ন ছিল, প্রিয় মানুষটির সাথে ছোট্ট একটা সংসার করার। অথচ তাদের নিয়তি অন্য কিছুই ছিল। তাদের দুজনের পথচলা এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
কাঁদতে কাঁদতে আলোর শরীর খারাপ হয়ে যায়। সে অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো ওখানেই। এতে সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে মতিউর রহমান ডাক্তারকে কল দেন। তারপর ডাক্তার এসে চেক-আপ করে একটা ইনজেকশন ও স্যালাইন দিয়ে যান।
আলোর জ্ঞান ফিরে আসার পর নিজের পেটের ওপর দুটো খরগোশকে দেখে চমকে ওঠে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে, এরা আর কেউ নয়! বরং তারই টুনা, টুনি। আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে কোনমতে উঠে বসে একহাতে জড়িয়ে ধরে আদর করে দেয়। এতদিনে অনেকটাই বড় হয়ে গেছে, সাথে গোলুমোলুও!
-“এরা এখানে কীভাবে এল?”
আলো ছোট বোনের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল। ছায়া ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তোমার শশুর বাড়িতে তো এদেরকে দেখার মতো কেউ নেই। দুলাভাই সারাদিন ভার্সিটিতে থাকে এবং সন্ধ্যা হলে তোমার কাছে যেত, তারপর ওখানেই সারারাত থাকত। তাই তোমার শখের জিনিসগুলোর দেখাশোনা করার জন্য আমাকে দেয়। কারণ উনি চাননি, তোমার প্রিয় জিনিসের কিছু হোক। এদেরকে আমি দেখলেও সব খরচ তোমার বরই দিয়েছে। সাথে আমারগুলোর জন্যও!”
আলো কিছু বলল না। ছায়া বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এসে আপুকে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে, কান্নারত কণ্ঠে বলল,
-“তোমাকে খুব মিস করেছি আপু। খুউউউব!”
আলোর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। সে বোনকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিল। তখন খেয়াল করল, দরজায় মায়া দাঁড়িয়ে আছে। আলো হেঁসে একহাত বাড়িয়ে ধরে, কাছে আসতে ইশারা করল। মায়া ছুটে এসে বোনের বুকের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ল। আলো দুজনের মাথায় চুমু খেয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“কষ্ট পাস না বোন আমার। ভাইয়া, আপু যেখানেই থাক, তারা ভালো আছে। আর আমাদেরকে ওই দূর আকাশ থেকে দেখছে। তোরা যদি কষ্টে থাকিস, তাহলে তারাও কষ্ট পাবে। আমরা এই দুনিয়ায় কেউই চিরস্থায়ী নই! আজ হোক বা কাল, আমাদের সবাইকেই ওই আকাশের বুকে যেতে হবে। শুধু আগে আর পরে!”
🌸
আলোর মনটা ভালো নেই। সে হালকাপাতলা খাবার খেয়ে বাগানে এসে বসেছে। পশ্চিমের দিকে সূর্যটা হেলে পড়েছে। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আঁধার নেমে আসবে। মেয়েটা অপলক নয়নে দুটো পাশাপাশি থাকা কবরের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই খেয়াল করল, গেইট দিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করছে। গাড়িটা চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না আলোর।
আধার গাড়ি থেকে নেমে সোজা আলোর কাছে এসে পাশে বসল। তবুও মেয়েটা কিছু বলল না। তাদের মাঝের নীরবতা ভেঙে একসময় আধারই বলে উঠল,
-“আমাকে না বলে এখানে আসার কারণ?”
-“ইচ্ছে করছিল, তাই এসেছি।”
-“ঠিক আছে, এখন চলো। আমি তোমাকে নিতে এসেছি।”
-“এখানে থাকব কিছুদিন।”
-“আপনি বড়োই নিষ্ঠুর, মিসেস খান! এতগুলো মাস জ্বালিয়েও আপনার শান্তি হয়নি।”
আলো কিছু না বলে দোনলা থেকে নেমে যাওয়ার সময় অনুভব করল, লোকটা তার বিনুনি চেপে ধরেছে। একই সাথে একটি বাক্য শুনতে পেল,
-“জান….?”
আলোর হৃদয় থমকালো! সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই আধার চোখে চোখ রেখে বলে উঠল,
-“এবার যদি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার একটুও চেষ্টা করো, তাহলে আই সোয়ার মিসেস খান! আমি ম’রে যাবো!”
আলো নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। মূহুর্তেই ছুটে এসে স্বামীর বুকের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ল এবং দু’হাতে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আধার যেন এতক্ষণ এটারই অপেক্ষায় ছিল। সে নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রিয়তমাকে। গলায় মুখ ডুবিয়ে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার সময় শুনতে পেল,
-“স…সরি! আমি আপনাকে ইচ্ছে করে কষ্ট দিতে চাইনি। এই আমার জন্য আপনি এতগুলো দিন অনেক কষ্ট করেছেন। তাই আপনাকে আর কষ্ট দিতে চাইনি!”
-“হুঁশশশ….আমার একটুও কষ্ট হয়নি। আর নিজের বউয়ের সেবা করতে কিসের কষ্ট হুহ্?”
আলো কিছু না বলল না। সে আসলে দ্বিধায় পড়ে গেছিল, কি করবে না করবে। কোনোকিছু খুঁজে পাচ্ছিল না। মন এক কথা বলছিল ও ব্রেন এক কথা বলছিল। তাই তো সে ইচ্ছে করেই দূরত্ব বাড়িয়েছিল। কিন্তু….মানুষটার কাছে সে আবারো হেরে গেল। পারল না নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। এসব আকাশ পাতাল ভাবার সময় অনুভব করল লোকটা তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির ভেতর এসেছে। ব্যাক সিটে বসে আধার ডোর লাগিয়ে আলোর উদ্দেশ্যে বলল,
-“তুমি চাইলে এখন আমার সব কষ্ট মূহুর্তেই দূর করতে পারো।”
আলো কান্না থামিয়ে চোখমুখ মুছে, মাথা সোজা করে জানতে চাইল,
-“কীভাবে?”
আধার বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলোর ঠোঁট ছুঁয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“তোমার বেয়াদব ঠোঁট জোড়া দিয়ে আমাকে ছুঁয়ে।”
আলো হাসল। অতঃপর এগিয়ে এসে স্বামীর পুরো চেহারায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। ঠোঁটে চুমু খেয়ে সরে আসতে চাইলে, অনুভব করল লোকটা তার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে৷ আলোর চোখদুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়। সে ছটফট করলে, আধার একহাতে তার ঘাড় ও অন্য হাতে কোমর চেপে ধরে ঘনিষ্ঠ করে সফটলি চুম্বন করতে থাকল। আলো বাঙের মতো তিড়িংবিড়িং করতে করতে একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ হয়ে গেল এবং আবেশে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে মানুষটার মাথার পিছনের চুলগুলো শক্ত করে খামচে ধরল।
দীর্ঘ এক চুম্বনের পর আধার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে থাকল। আলো তো নাকমুখ দিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছে! তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি এক্ষুনি দমটা আঁটকে যাবে। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আলো কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, তখনই আধার আবারো রক্তিম ঠোঁটের মাঝে হামলে পড়ল। এবার আলো কিল-ঘুষি যা যা পারছে, সবকিছু মা’রতে মা’রতে লোকটাকে সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু আধার উল্টো তার হাতদুটো ধরে পিছনে নিয়ে গিয়ে
আলতো করে চেপে ধরল। এবং হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ঠোঁটের মাঝে মত্ত হলো।
আলো যখন অনুভব করল, অসভ্য লোকটা তার জামার জিপার খুলে ফেলেছে, তখন চমকে উঠে ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিল৷ আধার বিরক্তিতে ঠোঁট ছেড়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কী সমস্যা? এইভাবে ইঁদুরের মতো কামড়াকামড়ি করছো কেন?”
আলো ঠোঁট মুছে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে হিসহিসিয়ে বলল,
-“আ…আপনি! আপনি আমার জামার জিপার খুলছেন কেন?”
-“তোমাকে আদর করব তাই।”
একথা শুনে আলো আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি করে বলল,
-“আপনার অসভ্য আদর চাই না! আমাকে ছাড়ুন।”
আলো ছটফট করতে করতে কোল থেকে নামতে চাইল। সে এগুলোর জন্য এখন মোটেও প্রস্তুত নয়! আর এই অসভ্য লোকটার মতিগতিও ভালো লাগছে না। নিশ্চয়ই নেশা-টেশা করে এসেছে।
আধার আলোর দু’হাত নিজের কাঁধের ওপর তুলে দিয়ে, গ্রীবাদেশে মুখ ডুবিয়ে চুমু খেতে খেতে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“একটু….একটু আদর করব। প্লিজ জান, বাঁধা দিও না!”
বাঁধা দেওয়া মানে? লজ্জা, ভয়ে, আতঙ্কে এবং অতিরিক্ত টেনশনে মূহুর্তেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো আলো। সঙ্গে সঙ্গে আধারের মুডের বারোটা বেজে গেল। সে থমথমে মুখে অচেতন মেয়েটার লালচে চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
-“এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা!”
#চলবে

